উপন্যাসঃ ভয়াল রাক্ষসতালঃ পুষ্পেন মণ্ডল



প্রলম্বিত সাদাকালো দাড়িগোঁফ। চওড়া ভাঁজ পড়া কপাল। প্রশস্ত কঠিন চিবুক। মহীরুহের মতো ঋজু শরীরের শিরা-উপশিরা সমেত পেশীগুলি দৃশ্যতই স্পষ্ট। বয়েস আনুমানিক অর্ধ শতকের আশেপাশে। তাঁর চোখগুলি কোটরে ঢোকা। কিন্তু সেই চোখের দৃষ্টি যেন বুকের ছাতি ফুটো করে সোজা মস্তিষ্কের ঠিকুজিকুষ্ঠী জেনে নিচ্ছে। হিমালয়ের কোলে বরফে মোড়া ‘বুনি’র একপ্রান্তে ছোট্ট একটা কাঠের কুঁড়েঘর। তার বাইরে পাথরের চাতালে ফ্লাক্স থেকে বের করা গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে বেশ কয়েক বছর আগে এক দুর্যোগের দিনে গোধূলি লগ্নে পরিচয় হয়েছিল জীবনবাবুর সাথে। পায়ে চলা পথের পাশে যেমন চোখ ঝলসানো রংবাহারি ফুলেল গুল্ম দেখে আমাদের মতো শহুরে লোকের মনে অগাধ বিস্ময় তৈরি করে, তেমনি তাঁকে দেখে সেই সাঁঝবিকেলে অবাক হয়েছিলাম। তারপর তাঁর কথা শুনে শ্রদ্ধা মিশ্রিত শিহরনে কেঁপে উঠেছিল সারা শরীর। চোখ বন্ধ করলে কথাগুলি এখনও কানে বাজে।
গোঁফের তলায় মুচকি হেসে বলেছিলেন, “হিমালয়! তার কতটুকুই বা তোরা জানিস? সে এক গভীর গোপন রহস্য। সে রহস্যের কোনও সীমা পরিসীমা হয় না। তাকে বোঝাও কোনও সাধারণ মানুষের কম্ম নয়।”
সামনে পড়ন্ত বিকেলের কমলা রঙের বরফে মোড়া শৃঙ্গগুলি থেকে চোখ ঘুরিয়ে তাঁর গাঁজা টানা অর্ধনমিত চোখের পাতাগুলির দিকে তাকালাম। তখনও আমি আর কল্লোল অবজ্ঞা ভরে ভাবছিলাম, এ আবার কোন হরিদাস পাল! কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তিনি আমাদের থট রিডিং করে জানিয়ে দিলেন, “হরিদাস পাল নয়, আমার নাম জীবনচন্দ্র দাস।”
আমাদের বিস্ময়ের তখন শুধু শুরু। ধূসর রঙের তাপ্পি দেওয়া একটা আলখাল্লা জড়িয়ে বসে থাকা লোকটাকে তখনও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না ঠিকঠাক।
মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্স পড়িয়েছি টানা কুড়ি বছর। তোদের বাপ-ঠাকুরদা তখন হয়তো জন্মায়নি।”
আবার হোঁচট খেলাম। কল্লোল বরাবরই বিশ্ববখাটে। মুখের কোনও রাখঢাক নেই। শয়তানি হাসি দিয়ে বলল, “আপনাকে দেখে তো অত বয়স্ক মনে হয় না, দাদু!”
তিনি কল্লোলকে উপেক্ষা করে মৃদু হেসে মন্তব্য করলেন, “পৃথিবীটাকে উপর থেকে যেমন দেখতে, আদপে সেটা তেমন নয়। আবার যেটা তোরা দেখতে পাস না, তেমন অনেক কিছু আছে তোদের চারপাশে।”
কল্লোল গলা চড়াল, “কী বলতে চাইছেন আপনি? আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন হবেন। বাপ-ঠাকুরদার আগে প্রফেসারি করেছেন মানে?”
আধ বোজা চোখে বিড়বিড় করে উঠলেন, “ঐ যে বললাম, যা দেখছিস তা সত্যি নয়। আমার বয়েস এখন একশো পাঁচ। এবার তোরা ভিরমি খাবি। তাই তো?”
কথাটা শুনে আমরা হাঁ। “মা-মানে! আপনি দেশ স্বাধীন হতে দেখেছেন!”
তিনি মাথা নেড়ে জানালেন, “আরও অনেক কিছু দেখেছি। দেশভাগ থেকে গান্ধী হত্যা। নেতাজী থেকে নেহেরু। সবই! কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার পাশাপাশি গুপ্ত সমিতির জন্য মিটিং করেছি, লাঠি, ছুরি, বন্দুক চালানো শিখিয়েছি কত। হগ মার্কেটে এক সাহেবকে নাকে ঘুসি মেরে জেলও খেটেছি। তারপর...”
আমরা নড়েচড়ে বসলাম। লোকটা বলে কী!
“রক্তে ছিল পাহাড়ের নেশা। সময় সুযোগ পেলেই দৌড়ে চলে আসতাম হিমালয়ে।”
কল্লোল দুম করে ভ্রূ নাচিয়ে প্রশ্ন করল, “ফিজিক্সের প্রফেসারের ঘরে ওটা কীসের মূর্তি?”
কাঠের দরজার ফাঁক দিয়ে চোখ গেল ঘরের ভিতরে। একটা বড়ো প্রদীপের সামনে সাজানো অদ্ভুত এক রূপালি মূর্তি। চোখগুলি বড়ো বড়ো। মুখটা ভয়ংকর। হাতদুটো নাচের ভঙ্গিতে ছড়ানো। তার নিচে পড়ে আছে একগোছা রঙিন পাহাড়ি ফুল। মনে মনে কল্লোলের দৃষ্টির প্রশংসা না করে পারলাম না।
গাঁজায় আরেকটা টান দিয়ে তিনি প্রশ্নটা ছুড়ে দিলেন, “তোরা বন উপজাতির নাম শুনেছিস?”
আমরা যখন এ ওর মুখের দিকে ভুলভুলে চোখে তাকাচ্ছি, তখন তিনি উক্তি করলেন, “তোদের অবশ্য শোনার কথা নয়। পৃথিবীর নিরানব্বই শতাংশ মানুষই জানে না এদের কথা। মূর্তিটা ‘টোনপা সেনরাব মিওচে’র।”
“তা ইনি কে?” অবশ্যম্ভাবী প্রশ্নটা বেরোল আমার মুখ থেকে।
কল্লোল চোখ টিপে বলল, “নিশ্চয়ই কোনও তিব্বতি বিপ্লবী!”
বাইরে তখনও বরফ পড়া থামেনি। বরং বেড়েই চলেছে উত্তরোত্তর। এই অবস্থা জারি থাকলে মুন্সিয়ারি ফেরার সব রাস্তা বন্ধ। মনে মনে কল্লোলকে আচ্ছা করে গালাগালি দিচ্ছি তখন। অচেনা রাস্তায় ট্রেকিং করবে বলে মুন্সিয়ারি থেকে টেনে আনল জোর করে। প্রায় কুড়ি-পঁচিশ কিলোমিটার চড়াই উৎরাই পায়ে চলা রাস্তা। দুর্যোগ যা শুরু হয়েছে, এবার মুন্সিয়ারি ফেরা অসম্ভব। আর হোটেলে ফিরতে না পারলে এখানে থাকা খাওয়ার কী ব্যবস্থা হবে কে জানে! দুয়েক মিনিটের মধ্যেই অন্ধকার ঘনাবে টের পাচ্ছিলাম।
জীবনবাবু বললেন, “তিব্বতের আদি নাম ছিল ঝেংঝুং। এই যেখানে আজকে বসে আছিস, সেটাও আদিতে ঝেংঝুং প্রদেশেই পড়ত। বৌদ্ধধর্ম ওখানে প্রবেশ করার আগে যে তন্ত্র সেখানে চলত তার নাম ছিল বন। আসলে দেবতারা মানুষের মনে প্রভাব বিস্তার করার পূর্বে পৃথিবীতে ছিল তন্ত্রের যুগ। পরে অবশ্য সেই বন তান্ত্রিকদের সিংহভাগ বৌদ্ধধর্মের সাথে মিলে যায়। এটা বেশ কয়েক শতাব্দী আগের কথা। এখনও হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে যে বৌদ্ধতান্ত্রিকদের দেখা যায় তারা আসলে হল এই বন জনগোষ্ঠীর অংশ।”
আমাদের মুখের উপর আবার চোখটা ঘুরিয়ে নিয়ে তিনি বলে চললেন, “মূর্তিটি যাঁর, তিনি বন ধর্মের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রায় হাজার বছর আগে। তিব্বতে গিয়ে শুনেছিলাম এঁর কথা। এই মূর্তিটি প্রায় ষাট বছর আগে আমি পেয়েছিলাম হিমালয়ের অনেক নিচে সিরিঞ্জুদের গুহা থেকে।”
“আপনি তিব্বতেও গেছেন?”
“গেছি বললে ভুল বলা হবে। নিয়তি নিয়ে গেছে। বুঝলি?”
বাইরের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে তিনি একগাল হেসে মন্তব্য করলেন, “তুষার ঝড় এখন থামবে না। রাত তোদের এখানেই কাটাতে হবে। চল, ভিতরে গিয়ে বসবি।”
বাঙালি পেয়েই বোধহয় তাঁর উৎসাহটা বেড়ে গিয়েছিল। ওঁর মস্তিষ্ক বিভ্রমের কোনও লক্ষণ এখনও পাইনি। তাই ভরসা করা যায়। আমরা ঘরের ভিতরে ঢুকে কাঠের মেঝের উপর পাতা এক মাদুরে বসলাম। পিঠের ব্যাগপত্র নামিয়ে রাখলাম এককোণে। ঠাণ্ডার প্রকোপটা একটু কমল। গুছিয়ে বসে কল্লোল একটা প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেলল, “যাক! মাথা গোঁজার ঠাঁই তো একটা হল। এবার শোনা যাক আপনার বয়েস ধরে রাখার গল্পটা।” কথাটা বলেই চোখ টিপল আমাকে।
তিনি কিছুটা ধোঁয়া নাক দিয়ে ছেড়ে খক খক করে কেশে নিলেন। তারপর বললেন, “অনেক বছর আগের কথা। সম্ভবত ১৯৫২ সাল। মাঝে মাঝেই ট্রেকিংয়ের জন্য ছুটে আসি হিমালয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এখন যেমন তোরা ঘুরছিস। তবে আমি সঙ্গী না পেলে একাই বেরিয়ে যেতাম। নেশার মতো টানত হিমালয়। পার্থিব কোনও নেশায় সে জোর নেই। অবশ্য এ টান পেয়েছিলাম আমার বাবার কাছ থেকে। তিনি ইংরেজ আমলে সরকারি জরিপ বিভাগে কাজ করতেন। হিমালয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলি ছিল তাঁর হাতের তালুর মতো চেনা। আবার হারিয়েও গিয়েছিলেন এই হিমালয়ে। মনে হত পাহাড়ের পথে হাঁটতে হাঁটতে হয়তো কখনও দেখা হয়ে যাবে তাঁর সাথে।
“সত্যিই দেখা পেলাম। তবে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত কিছু জিনিসের। আর সেখান থেকেই পালটে গেল আমার জীবন। এই যে মুন্সিয়ারি তোরা দেখছিস, এখন সেখানে অনেক হোটেল-টোটেল হয়েছে। সেই সময়ে একটা ধর্মশালা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। একটা পুরনো ছোট্ট শিবমন্দিরের লাগোয়া এক ধর্মশালায় আশ্রয় নিয়েছিলাম সেবার। সেদিন রাতেও এইরকম তেড়ে বৃষ্টি এল। ঝড়জলের মধ্যে পাহাড়ের কোলে বসে কনকনে ঠাণ্ডায় পূজারির হাতে তৈরি গরম ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি খেলাম। মন্দিরের পূজারি বয়স্ক ব্রাহ্মণ। তিনিই সেই ধরমশালার দেখাশোনা করেন। আমাকে তাঁর কেন জানি হঠাৎ করে খুব ভালো লেগেছিল।
“বললেন, জীবন কেটে গেছে এই মন্দিরে দেবতার সেবা করে। আমি প্রকৃতির অনেক রুদ্রমূর্তির সাক্ষী থেকেছি। আবার দেখেছি শান্ত সমাহিত শ্বেতশুভ্র দেবাত্মা হিমালয়কে। তবে উপর থেকে আমরা যেমন দেখি, ভিতরটা তেমন নয়। এই হিমালয়ের এমন গোপন কথা আমি জানি, যা পৃথিবীর কেউ জানে না।
“বাইরে বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরে তখন কনকনে ঝড়ো হাওয়া চলছে। ঘরের মধ্যে আগুনের কুণ্ডতে কাঠগুলিকে খুঁচিয়ে হাতদুটো সেঁকতে শুরু করেছি। হিমাঙ্কের কাছাকাছি হাড় কাঁপানো তাপমাত্রা। প্রশ্ন করলাম, হিমালয়ের গোপন কথা, সেটা আবার কী?
“পূজারি তামাক পাতায় একটা বড়সড় টান দিয়ে একরাশ ধোঁয়ায় ঘর ভর্তি করে বললেন, সে জিনিস সবার জানার জন্য নয়। পৃথিবীর সব অজানা গূঢ় রহস্য যদি মানুষ উদ্ঘাটন করে ফেলবে তাহলে এই সভ্যতা শেষ হয়ে যাবে যে! তাঁর চোখে তখন রহস্যজনক চাউনি।
“আমি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তাঁকে বললাম আমার বাবার কথা। জানালাম, তিনিও হারিয়ে গেছেন এই পাহাড়ে। বহুদিন ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছি তাঁকে। তারপর তিনি চমকে উঠলেন আমার বাবার নাম শুনে, নগেন্দ্রচন্দ্র দাস! তিনি প্রথমে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। তারপর এগিয়ে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, তাই ভাবছিলাম, মুখটা এত চেনা চেনা লাগছে কেন? তিনি ছিলেন এক সাহসী বাঙালি সন্তান, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার গোয়েন্দা দপ্তরের এক কর্মচারী।
“আমি তাঁকে থামিয়ে বললাম, উনি তো জরিপ বিভাগে কাজ করতেন!
“তিনি মাথা নেড়ে জানালেন, সেটা ছিল তাঁর বাইরের মুখোশ। বহুবছর আগে এই মুন্সিয়ারিতেই দেখা হয়েছিল তাঁর সাথে। শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর মৃত্যুর পর আমিই মুখাগ্নি করেছিলাম।
“পূজারি মুখ দিয়ে আবার একটু ধোঁয়া ছেড়ে উঠে গেলেন। তারপর কুলুঙ্গি থেকে একটা কাঠের বাক্স নামিয়ে এনে বসলেন। বললেন, মৃত্যুর সময় এই বাক্সটা ছিল তাঁর কাছে। এটা তোর হাতে তুলে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হলাম।
“কাঠের বাক্সটা খুলে দেখি, একটি চশমা। দিব্যি চিনতে পারলাম জিনিসটা। এছাড়া ছিল পেন, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার দেওয়া তাঁর পরিচয়পত্র আর একটা লাল শালুতে মোড়া ধপধপে সাদা রঙের চৌকো স্ফটিক। তাতে আবার কিছু আঁকিবুঁকি করা রয়েছে। প্রশ্ন করলাম, এ জিনিসটা কী? ভারি অদ্ভুত তো!
“পূজারি জানালেন, তা জানি না। তবে এটা নাকি হিমালয়ের পেটের ভিতর থেকে এসেছে। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ভারতের বড়লাট লর্ড কার্জনের নির্দেশে এই পথে তিনবার লামা সেজে তিব্বত গিয়েছিলেন তোর বাবা। সেখানে দুর্গ, মঠ, মানুষজন, খাদ্যাভ্যাস, পথঘাট সবকিছুর রিপোর্ট আর ম্যাপ তৈরি করেছিলেন নিখুঁতভাবে। যার উপর নির্ভর করে পরে ইংরেজ সৈন্য তিব্বত অভিযান করেছিল এবং সেখানকার রাজারা ইংরেজদের সাথে বাধ্য হয়েছিলেন সমঝোতা করতে।
“আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, এত কথা তো জানি না কিছু! তিনি বললেন, হয়তো তাঁর বিপজ্জনক জীবনের কথা পরিবারকে জানতে দেননি কোনও দিন। তবে এই গল্প ইংরেজদের অভিযান নিয়ে নয়। এ-ঘটনা শুরু হয়েছিল অনেক পরে। সরকারি কাজে ইস্তফা দিয়ে নগেন্দ্রচন্দ্র আবার ফিরে এসেছিলেন তিব্বতের রাস্তায়। এটা অবশ্য তাঁর সরকারি অভিযান ছিল না। ভ্রমণের নেশা এবং একটা কৌতূহল নিবারণের জন্য তাঁর এই যাত্রা।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে জীবনবাবু হাতে ধরা ছিলিমে দুটো ছোটো টান দিয়ে একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন আমাদের দিকে, “তোরা লিপু-লা পাসের নাম শুনেছিস কি?”
বললাম, “এটা তো একটা গিরিপথ।”
“হ্যাঁ, নাথু-লা, সিপকি-লা, জাজু-লা, ধারচু-লা, লিপু-লা এগুলি হচ্ছে হিমালয়ের উপর একেকটা গিরিপথ বা পাস। তিব্বতের মানস সরোবরে যাওয়ার জন্য বহুযুগ ধরে ভারতের পুণ্যার্থিরা এই সতেরো হাজার পাঁচশো ফিট উঁচু ভয়ংকরতম লিপু-লা পাস পেরিয়ে যাতায়াত করত। এর রাজনৈতিক গুরুত্বও অপরিসীম। কারণ এটা ভারত, নেপাল আর তিব্বত ওরফে চিনের সীমান্ত-সংযোগকারী রাস্তা। তো এই লিপু-লা পাস পেরিয়ে তিব্বতে প্রবেশ করলে একটা বিস্তীর্ণ রুক্ষ প্রান্তর পড়ে, যেটার গড় উচ্চতা চোদ্দ হাজার ফিটের আশেপাশে। মাইলের পর মাইল শুধু ছোটোবড়ো পাথর। তাপমাত্রা থাকে সারাবছরই মাইনাসের কাছাকাছি। আর সবসময় ঝড়ো হাওয়া। বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ খুবই কম। দৃশ্যটা অনেকটাই মরুভূমির সাথে তুলনা করে চলে। শুধু তফাতটা রঙে আর টেম্পারেচারে। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পনের থেকে তিরিশ ফুট বরফের নিচে চলে যায় পুরো অঞ্চলটা। তখন আরও দুর্গম হয়ে ওঠে। মার্চ থেকে আবার বরফ গলতে শুরু করে। মানস সরোবর যাবার তাই সবচেয়ে ভালো সময় হল জুলাই, সেপ্টেম্বর আর অক্টোবর।
“লিপু-লা পাস পেরিয়ে মানসের হ্রদ প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার উত্তরে। এখন যদিও বুরাং থেকে রাস্তা হয়ে গেছে। কিন্তু আমি যে সময়ের কথা বলছি, তখন পুরোটাই পায়ে হাঁটাপথ। মানস সরোবরের বাঁয়ে আছে রাক্ষসতাল। এখন থেকে প্রায় একশো বছর আগে আমার বাবা তিব্বতে যাতায়াতের পথে কিছু অদ্ভুত জিনিস লক্ষ করেছিলেন। এই বিস্তীর্ণ রুক্ষ উপত্যকার উপর কোনও নির্দিষ্ট রাস্তা কিছু ছিল না। কম্পাস দেখে সমুদ্রের মাঝে যেমন নাবিকরা দিকনির্ণয় করে তেমনই এখানেও সম্পূর্ণ আন্দাজের উপর নির্ভর করে পথ চলতে হয়। অবশ্য দিগন্তে গিরিশৃঙ্গগুলিও দিকনির্দেশ করে। কিন্তু প্রথমবার যখন তিব্বতে যাওয়ার সময়ে ভুল করে মূল রাস্তা থেকে অনেকটা বাঁয়ে সরে গিয়েছিলেন তিনি তখন কিছু অচেনা প্রাণীর পায়ের ছাপ লক্ষ করেন। প্রায় সাত-আট ইঞ্চি লম্বা ও প্রায় গোলাকার চওড়া পায়ের পাতা। ছাপ আটকা বরফের মধ্যে। সঙ্গের ভুটিয়া কুলিরা সেই ছাপ দেখেই ভয়ে দৌড়াতে শুরু করে। পরে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জানিয়েছিল, ওগুলো নাকি সিরিঞ্জুদের পায়ের ছাপ। যারা তাদের দর্শন পেয়েছে, বেঁচে নেই আর।
“পরের ঘটনাটা ঘটেছিল যখন তিনি ফিরছেন তিব্বত থেকে। রাক্ষসতালের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শুরু হল প্রচণ্ড তুষারঝড়। প্রলয়ঙ্কর ঝড়ের মধ্যে পড়ে সঙ্গীরা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াতে লাগল। তারপর সেই মৃত্যুর ফাঁদে পড়ে একে একে হারিয়ে গেল সবাই। ঐরকম স্থানে বরফ চাপা পড়া মানে প্রাণ নিয়ে ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কিন্তু তিনি বেঁচে গেলেন। অবশ্য সেটা ভাগ্যের জোরে। পাহাড়ের একটা খাদে পড়ে গিয়েছিলেন বরফের নরম আস্তরণ ভেদ করে। কুড়ি-পঁচিশ ফুটের একটা এয়ার পকেট।
“প্রথমে ভিতরে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। পরে চেতনা ফিরতে দেখলেন অন্ধকার পাথরের চাতালে শুয়ে। হাঁটুতে আর মাথায় চোট। পিঠের বড়ো ব্যাগ আর মোটা শীত পোশাকের জন্য খুব বড়ো কোনও দুর্ঘটনা ঘটেনি। ব্যাগ থেকে টর্চটা বের করে জ্বালতে দেখলেন, ওটা পাহাড়ের মাঝে একটা প্রাকৃতিক ফাটল এবং দেয়ালটা পুরো মসৃণ আর খাড়াই। নিচে সমতল একটা ঘরের মতো সাইজের ছোটো চাতাল। পাহাড়ের খাদটা নেমে গেছে তার পাশ দিয়ে অতলে। উপরে ওঠা বা নিচে নামার কোনও রাস্তাই নেই। অতএব বেঁচে ফেরার আশা না করাই ভালো।
“শুকনো খাবার সঙ্গে যা ছিল তা দিয়ে মাস খানেক কষ্টে করে হয়তো বেঁচে থাকা যাবে। কিন্তু জল নেই সঙ্গে এক ফোঁটাও। আর এই অন্ধকারে সঙ্গের ব্যাটারিও বেশিদিন সঙ্গ দেবে না। আলোটা নিভিয়ে চুপ করে ভাবতে লাগলেন, কী করবেন। এই অজানা জনমানবশূন্য দুর্গম পাহাড়ে কে এগিয়ে আসবে তাঁকে সাহায্য করতে? সাহায্য করা তো দূরে থাক, কেউ কোনও দিন জানতেও পারবে না কী হল, কোথায় গেলেন নগেন্দ্রচন্দ্র দাস।
“এইসব ভাবতে ভাবতেই গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল তাঁর। তখন ঠাণ্ডাটা যেন আর আগের মতো অতটা মালুম হচ্ছে না। কিন্তু তেষ্টায় ফেটে যাচ্ছে গলা। পাথারের গায়ে জমে থাকা বরফ ভেঙে নিয়ে দু’হাতে ঘষে গরম করে ফোঁটা ফোঁটা জল গালে দিতে থাকলেন। কিন্তু তাতে তৃষ্ণা তো মিটলই না, আরও বেড়ে গেল কয়েক গুণ। শুকনো আখরোট, বাদাম, কিসমিস খেয়ে অতিকষ্টে বাঁচিয়ে রাখলেন নিজের প্রাণটা।
“দিনক্ষণের হিসেব তখন আর ঠিক নেই। আচমকা একটা রাস্তা বেরোল। পাথরের গা থেকে বরফ ছাড়াতে ছাড়াতে একটা চাঙড় নড়ে উঠল একটু। ভাবলেন, হয়তো মনের ভুল। তবুও আবার একবার পরখ করার জন্য ধাক্কা দিলেন সেখানে। এবারেও নড়ল। তারপর বারংবার ধাক্কা দিতে দিতে সরে গেল পাথরখণ্ডটি। নিজের চোখকেই ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না তখন। একটা সরু সুড়ঙ্গ নেমে গেছে সেখান দিয়ে। অন্য কোনওদিকে যাওয়ার যখন কোনও রাস্তা নেই, তখন এটাই একমাত্র ক্ষীণ আশার আলো। সন্তর্পণে এগোলেন সেদিকে।
“সুড়ঙ্গটা এঁকে বেঁকে এগিয়েছে সাপের মতো। হামাগুড়ি দিয়ে চলতে হচ্ছে। কিছুটা এগিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। সেখান থেকে গুহাটা বেশ চওড়া। চলছে তো চলছে। এ-যাত্রার যেন শেষ নেই কোনও। শুধু এটা বুঝতে পারছিলেন যে পথটা নামছে নিচের দিকে। আর যত নামছেন তত তাপমাত্রা বাড়ছে ধীরে ধীরে। যখন ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছেন, কিছুটা ঘুমিয়ে নিচ্ছেন পাথরের মেঝেতে শুয়ে। ভিতরে অক্সিজেনের পরিমাণ কম হওয়ায় সহজেই হাঁফিয়ে পড়ছেন। সঙ্গের ফ্লাক্সে কিছু বরফ ভরে নিয়েছিলেন এখানে প্রবেশের আগেই। সেগুলি গলে জল হয়ে গেছে। তাই ফোঁটা ফোঁটা গলায় দিয়ে ভিজিয়ে নিচ্ছেন। ক্রমশ পথটা প্রশস্ত হচ্ছিল। সুড়ঙ্গটা কোনও জায়গাতেই প্রায় সরলরেখায় নেই। হয় নিচে, নয় উপরে বা ডাইনে-বাঁয়ে এঁকে বেঁকে চলেছে। রাস্তাটা শেষ হল আরও প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা পর।
“একটা খোলা জায়গায় এসে দাঁড়ালেন তিনি। কয়েক কিলোমিটার ব্যাপী বিশাল একটা অন্ধকার প্রাকৃতিক গুহা। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পুরোটা দেখাও যায় না। মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো পাহাড়ের মতো পাথর খাড়াই উঠে গিয়ে ছাদের সাথে লেগে আছে। উপর থেকে স্কাই লাইটের মতো মৃদু আলো এসে পড়ছে নিচে কয়েকটা স্থানে। ভালো করে লক্ষ করে দেখলেন, কিছু স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো পাথরের মধ্যে দিয়ে হালকা আলোটা আসছে উপর থেকে। ছোটো ছোটো গুহা আছে প্রচুর চারপাশের পাথরের দেয়ালের গায়ে। যেন পুরো একটা কলোনি। কিন্তু কারা থাকে এখানে? পুরো জায়গাটা একদম শুনশান। কিছুটা করে এগোচ্ছেন, আর থমকে দাঁড়িয়ে পড়ছেন।
“পুরো জায়গাটা ঘুরে দেখতে দিন তিনেক সময় লাগল। রাত্রিবেলা উপর থেকে আলো আসা যখন একেবারে বন্ধ হয়ে যায় তখন কোনও ফাঁকা ছোটো গুহায় ঢুকে ঘুমিয়ে পড়েন। তবে মিষ্টি পানীয় জলের একটা কুয়া খুঁজে পেয়ে তেষ্টা নিবারণের সমস্যাটা দূর হয়েছিল। উপর থেকে পাথরের কোল দিয়ে চুঁইয়ে সরু জলের ধারা নেমে জমা হচ্ছে তাতে। কিন্তু জীবিত কোনও প্রাণীর দেখা তিনি পেলেন না। শুধু পেলেন মানুষের থেকে ছোটো আকৃতির বেশ কিছু কঙ্কাল। আর জন্তুর হাড়গোড়। তাঁর ধারণা হয়েছিল সেগুলি কোনও হরিণ জাতীয় প্রাণীর কঙ্কাল হতে পারে। তিব্বতের দিকে নদীর ধারে ঘাস আর গুল্মলতা খাওয়ার জন্য এদের পাল দেখা যায়। কিন্তু এখানে, এত দূরে এল কীভাবে? এটা কি তাহলে কোনও মাংসাশী প্রাণীর আস্তানা ছিল? একটা বোঁটকা গন্ধ নাকে আসছিল প্রথম থেকেই। হয়তো কোনও ভয়ানক প্রাণী লুকিয়ে আছে আড়ালে। সুযোগ বুঝে লাফিয়ে পড়বে ঘাড়ের উপর। পাথরের দেয়ালে ছোটো ছোটো গুহাগুলি দেখে আন্দাজ করা যাচ্ছিল যে প্রাণীটির আকার খুব বড়ো নয়। চার থেকে পাঁচ ফুট লম্বা। প্রাণীর হাড়গোড়গুলিও সেইরকম ইঙ্গিত দিচ্ছে। পাথর খোদাই করে গুহাগুলি বানানো হয়েছে এটাও স্পষ্ট। আরও কিছুক্ষণ অনুসন্ধান করার পর একটা গুহা থেকে গ্রানাইট পাথরের তৈরি কিছু ছেনি, হাতুড়ি, আর বল্লমের ফলার মতো কিছু জিনিস দেখতে পেলেন। যেরকম আদিম মানুষরা ব্যবহার করত। ফলে অনুমান করা যায়, তারা এই ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহারে পটু। আগুনের ব্যবহারও তারা জানত। কয়েক জায়গায় পোড়া কাঠের চিহ্ন পাওয়া গেল।”
কল্লোল বলে উঠল, “বুঝেছি, ওরা হল ইয়েতি। কাকাবাবুর গল্পে পড়েছি।”
আমি বললাম, “ইয়েতি বলে আদৌ কিছু নেই। ওগুলো নিশ্চয়ই তুষার ভাল্লুক।”
জীবনবাবু মুচকি হেসে বললেন, “ইয়েতি বা বিশালকায় তুষার ভাল্লুক, যাদের কথা আমরা বইতে পড়ি তারা হয়তো বহুবছর আগে এ পৃথিবীতে ছিল। কিন্তু ইদানিং কালে কেউ সচক্ষে তাদের দেখেনি। তবে একটা বিষয়ে সন্দেহ আছে, যে তারা কি ছেনি-হাতুড়ি ব্যবহার করতে পারে? বোধহয় না। তাহলে এরা কারা? কোনও নতুন প্রজাতির প্রাণী?”
কল্লোল বলল, “তাহলে কি এরা এলিয়েন? অন্য গ্রহ থেকে এসে এখানে বাসা বেঁধেছে?”
“এই সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মানে আমি যখন গল্পটা সেই পূজারির মুখে শুনছিলাম, তখন ঠিক এই কথাটাই মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে ভাবলাম, ভিনগ্রহীরা অতদূর থেকে স্পেস শিপে চড়ে যদি পৃথিবীতে আসে তাহলে তো তারা আমাদের থেকে অনেক উন্নত প্রাণী হবে। কিন্তু এদের হাবভাব দেখে তো সেরকম মনে হচ্ছে না। সেখানে কোনও আধুনিক যন্ত্রপাতির দেখাও পাননি তিনি।
“এরপরের ঘটনা আরও অবাক করা। আমার বাবা খুঁজতে খুঁজতে একটা ছোটো গুহার ভিতরে মেঝেতে লক্ষ করলেন লম্বাটে আলগা পাথরখণ্ড। তাতে কিছু আঁকিবুঁকি করা ছিল। ভালো করে লক্ষ করতে বুঝলেন ছোটো ছোটো ছবির মাধ্যমে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে।”
“তারপর?” জীবনবাবু এই পর্যন্ত বলে চুপ করে যেতে আমি প্রশ্ন করলাম।
কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন, “উনি ভাবলেন হয়তো এর নিচে বাইরে যাওয়ার কোনও রাস্তা থাকতে পারে। অনেক কষ্টে ঠেলেঠুলে সরিয়ে দেখলেন, সেখানে একটি পূর্ণবয়স্ক মানুষের মৃতদেহ। মানে সেখানে সমাধি দেওয়া হয়েছিল কাউকে। কঙ্কালের উপর লেগে আছে কিছু ক্ষয়ে যাওয়া বহু যুগের পুরনো ছেঁড়াখোঁড়া তিব্বতি পোশাক ও অলঙ্কার। আর পাশে পড়ে ছিল এই সাদা স্ফটিক। এটা হাতে নেওয়া মাত্রই শরীরে একটা বিদ্যুতের শকের মতো ঝটকা লাগল ওঁর। পিছোতে গিয়ে একটা পাথরে পা আটকে পড়ে যান। আঘাত লাগে মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারান।
“পরে যখন জ্ঞান ফিরল, অন্ধকার গুহায় পাগলের মতো দশা। অনেক সময় যেন শুনেছেন হাড় হিম করা কোনও জান্তব শব্দ। সে শব্দ যে কোথা থেকে আসছিল তার কোনও হদিশ নেই। বেশ কিছুদিন না খেয়ে মস্তিষ্ক বিভ্রম হয়েছে। উন্মাদের মতো দৌড়ে বেড়াচ্ছেন প্রতিটা গুহায়। অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ একটি পথ পেলেন। বিশেষ একটি গুহা সরু হয়ে একটা টানেল তৈরি করেছে। তারপর এঁকে বেঁকে উঠেছে উপর দিকে। অনেকটা ঘুরপথে গিয়ে মিশেছে জলের মধ্যে। শেষে ডুবসাঁতার দিয়ে ভেসে উঠলেন রাক্ষসতালে।
“অনেক কষ্টে সেখান থেকে ফিরে আসেন প্রাণ হাতে করে। পথের গোলকধাঁধায় ঘুরে জীবনের শেষ শক্তি নিয়ে মুন্সিয়ারিতে যখন এসে পৌঁছেছিলেন, শরীর গুরুতর অসুস্থ। দীর্ঘ দিনের খেতে না পাওয়ায় আর প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় বুকে অসুখ হয়েছিল মারাত্মক। অস্পষ্ট ভাষায় পূজারিকে শুনিয়েছিলেন এই কাহিনি।”
কথাটা শেষ করে মাথা নিচু করলেন জীবনবাবু। তাঁর চোখে জল। কল্লোল অবাক হয়ে কিছুক্ষণ বসে থেকে জানতে চাইল, “এর পরেই আপনার তিব্বত যাত্রা শুরু?”
“না, ওভাবে তো অভিযান করা যায় না। তখন ঐ দুর্গম রাস্তায় যাওয়ার অনেক অসুবিধা। তাছাড়া মৃত্যুমুখে বাবা এক পাহাড়ি গ্রাম্য পূজারিকে কী বলতে কী বলেছিলেন, তার কোনও সাক্ষীও নেই। পূজারি বানিয়েও বলতে পারেন। অথবা এমনও হতে পারে যে দীর্ঘদিন অভুক্ত থেকে আর মস্তিষ্কে অক্সিজেন কম যাওয়ার কারণে বাবা হ্যালুসিনেশনের শিকার হয়েছিলেন। ভাবছেন ঐসব দেখেছেন, কিন্তু আসলে হয়তো সেগুলি ছিল তাঁর বিকারগ্রস্থ কল্পনা। তবে সেই চৌকো ধাতব বস্তুটি আমাকে নিঃশব্দে অনেক কথা বলে যেত। ঘুমের মধ্যে মনে হত, বাবা আমাকে ডাকছেন হাতছানি দিয়ে।”
“তারপর?”
“একথা ঠিক যে ঐ গল্পটা শোনার পর তিব্বতে যাওয়ার একটা তীব্র আকর্ষণ অনুভব করছিলাম। চোখ বন্ধ হলেই স্বপ্ন দেখছিলাম, হাঁটছি মাইলের পর মাইল বরফের উপর দিয়ে। ধূ ধূ সাদা প্রান্তর। সোঁ সোঁ করে ঠাণ্ডা হাওয়ার দাপটে কেঁপে উঠছে শরীর।
“খোঁজ নিয়ে জানলাম, তিব্বতের যাত্রা শুরু হয় ভারতের নেপাল লাগোয়া অসকোট নামে একটি শহর থেকে। হাজির হলাম সেখানে। অসকোটে পাহাড়ি রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে একদিন সকালে আকস্মিকভাবে এক ব্যক্তির সাথে আলাপ হল। একগাল সাদা গোঁফ-দাড়ি আর হাতে একটা বড়ো স্ট্যান্ড লাগানো বাক্সের মতো ক্যামেরা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বিপজ্জনকভাবে খাদের ধারে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে পড়ে একটা পাহাড়ি প্রজাপতির ছবি তুলতে গিয়ে পড়েই যাচ্ছিলেন যদি না আমি ওঁর জ্যাকেটটা খামচে ধরতাম ঠিক সময়মতো।
“বললেন, থ্যাঙ্ক ইউ ইয়ং ম্যান।
“জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি অ্যানথ্রোপলজিস্ট?
“হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে বললেন, না হে, আমি আদপে একজন জিওলজিস্ট।
“ভূবিজ্ঞানী! বেশ। তা এখানে কি কোনও কাজে, না নিছকই ঘুরতে? ওঁর পাশে হাঁটতে হাঁটতে প্রশ্ন করলাম আমি।
“বললেন, দুটোই। আসলে এখান থেকে তিব্বতে যাবার ইচ্ছা আছে। পারমিট করতে দিয়েছি। আমার কয়েকজন সঙ্গী আসার কথা আছে। তারা এলেই বেরিয়ে পড়ব।
“তিব্বতে কোথায় যাবেন? লাসা?
“কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটার পর তিনি উত্তর দিলেন, না, মানস সরোবর আর রাক্ষসতালের দিকেই যাওয়ার কথা আছে একটা অনুসন্ধানের জন্য।
আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলাম, “অনুসন্ধান! ব্যাপারটা একটু খুলে বলবেন কি?”
“তারপর একটা গুমটি ধাবায় বসে চা পান করতে করতে জানলাম, ওঁর নাম ডঃ পেলমন্ট পেত্রোভিচ। রাশিয়ান ভদ্রলোক পেশায় অধ্যাপক। জানালেন, বছর খানেক আগে একটা ব্যাপার বেশ নিয়ে সোরগোল পড়েছিল বিলেতে। এক পর্বতারোহীর চিঠি প্রকাশিত হয় সানসাইন পত্রিকায়। বিষয়টা ছিল হিমালয়ের লিপু-লা পাসের কাছে একটা গ্লেসিয়ারের মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল একটি মৃতদেহ। আসলে এক অভিযাত্রী দল পর্বতারোহী জন ম্যাকমিলানের মৃতদেহ খুঁজে পেয়েছিল বছর দুয়েক আগে। চিঠিটি পর্বতারোহীর লেখা। ওটি সর্বসমক্ষে আসার পর জানা যায়, ১৯৩৯ সালে তিব্বতের রাক্ষসতাল যাওয়ার পথে এক তুষারঝড়ে পড়েছিল আগের সেই অভিযাত্রী দলটি। সেই বিপর্যয়ে বাকিরা হারিয়ে যায়। ম্যাকমিলান মাস খানেক ধরে প্রায় অনাহারে ঘুরে ঘুরে যখন মৃত্যুর দোরগোড়ায়, তখন তিনি দেখেন একদল সাদা প্রাণী দল বেঁধে হরিণ শিকার করে নিয়ে যাচ্ছে কাঁধে ফেলে। দু’পায়ে হাঁটছিল ওরা। দূর থেকে তারা দেখতে পায় জনকে। তিনি তখন মৃত্যুর জন্য খাবি খাচ্ছেন পাথরের কোলে শুয়ে। এরপর তাদেরই ফেলে যাওয়া হরিণের কাঁচা মাংস খেয়ে শরীরে নতুন করে বল ফিরে পান তিনি। হয়তো সেখান থেকে ফেরার পথে লিপু-লা পাসের কাছাকাছি এসে তিনি ঝুরো বরফের নিচে চাপা পড়ে মারা গিয়েছিলেন। আর তাঁর স্ত্রীকে লেখা চিঠিটি উদ্ধার হল কয়েক বছর পর।
“আমি কথাটা শুনে বেশ কিছুক্ষণ গুম খেয়ে রইলাম। তারপর আমার বাবা স্বর্গীয় নগেন্দ্রচন্দ্র দাসের গল্পটা শোনালাম ওঁকে। মুন্সিয়ারির পূজারি যা বলেছিলেন, সব। উনি গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে জানালেন, তার মানে কিছু তো একটা নিশ্চয়ই আছে ওখানে। আর মিঃ দাসের কথা যদি সত্যি হয় তাহলে তাদের আস্তানা রাক্ষসতালের কাছাকাছি কোথাও পাহাড়ের নিচে।
“আরও কিছু কথা বলতে গিয়েও চেপে গেলেন মনে হল। আমি বললাম, তা হিমালয়ের মধ্যে এত বড়ো গুহা কি থাকা সম্ভব?
তিনি হাঁটতে হাঁটতে জানালেন, কেন নয়? ভূতাত্ত্বিকদের মতে দু’কোটি বছর আগে পৃথিবীর সমগ্র স্থলভাগ জুড়ে ছিল এক সাথে। যাদের নাম ছিল গণ্ডোয়ানা আর লাউরাসিয়া। বাকি পুরোটাই ছিল জলভাগ। এই গণ্ডোয়ানা আর লাউরাসিয়ার মধ্যে যে ফাঁক ছিল তাকে বলা হয় টেথিস সাগর। যে টেথিস সাগরের জায়গায় এখন অবস্থান করছে পৃথিবীর উচ্চতম হিমালয় পর্বত। দুটি স্থলভাগের নড়াচড়ার মাধ্যমেই সাগর শুকিয়ে পাললিক শিলা দ্বারা তৈরি হয়েছে এই বিশাল পাহাড়। হিমালয় তৈরি হয়েছিল টেথিস সাগর থেকে। সেই সময়ে মাঝামাঝি কোনও জায়গায় যে ফাঁকা অংশ তৈরি হয়নি তা কে বলতে পারে?
“তা বটে। টেথিস সাগর থেকে হিমালয় তৈরি হয়েছে সে তো আমিও জানি। কিন্তু কথা হচ্ছে, জন ম্যাকমিলান এবং আমার বাবা নগেন্দ্রচন্দ্র দাস, এঁদের কথা অনুযায়ী ঐ অঞ্চলে কি সত্যি অজানা কোনও প্রাণীর বাস রয়েছে?
“দেবদারুগাছের ছায়ায় তিনি দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, এটাও একেবারে অসম্ভব নয়। বানর থেকে মানুষ হবার প্রসেসটা তো আর একবারে হয়নি। বহু যুগ লেগেছিল এই বিবর্তনের জন্য।
“আমি জানালাম, পদার্থবিদ্যার ছাত্র হলেও বিষয়গুলি আমার কিছুটা জানা আছে। যতদূর মনে পড়ছে, ভূ-পরিবর্তনের ইতিহাসকে বিজ্ঞানীরা পাঁচটি যুগে ভাগ করেন। আমরা যে যুগে বাস করি তার নাম নবভূতাত্ত্বিক যুগ। আনুমানিক ছ’কোটি পঞ্চাশ লক্ষ থেকে ছ’কোটি সত্তর লক্ষ বছর ধরে এই যুগ চলছে। এর আগের যুগ হল মধ্যভূতাত্ত্বিক ও প্রত্নভূতাত্ত্বিক যুগ।
“একদম ঠিক বলেছ। তাঁর মুখে প্রশস্ত হাসি দেখে ভরসা পেলাম। বললেন, সবচেয়ে প্রাচীন যুগ – প্রাকভূতাত্ত্বিক ও আদিযুগ। আদিযুগের অবসান অর্থাৎ অতি সাধারণ স্তরের প্রাণের আবির্ভাব থেকে আমাদের যুগের ব্যবধান তিনশো কোটি বছরের। প্রতিটা যুগ আবার কয়েকটা পর্বে ভাগ করা হয়। যেমন নবভূতাত্ত্বিক যুগের ভাগগুলি হল, প্রত্নজীবোদ্ভবপর্ব, নবজীবোদ্ভবপর্ব, স্তন্যপায়ীদের আবির্ভাবকাল ও শেষপর্ব অর্থাৎ মানবজাতির আবির্ভাব কাল। ইউরোপে ও সাইবেরিয়ায় এই সময়ে ম্যামথ বিচরণ করত।
“আমি কিছুটা পড়েছিলাম। তবে বিস্তারিত শুনতে খারাপ লাগছিল না। তিনি বলে চলেন, আনুমানিক দশ লক্ষ বছর আগে মানবজাতির আবির্ভাবকালের সূচনায় বিশেষ এক জাতের বানর খাড়া হয়ে দু’পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে শিখল। তাদের থেকেই মানুষের পূর্বপুরুষ পিথেকানথ্রোপাস বা বনমানুষের উদ্ভব। পরে বনমানুষ থেকে এল আদিম মানুষ। যাকে আমরা বলি নিয়ানডারথ্যাল। প্রথম আধুনিক মানুষের উদ্ভব ঘটে প্রায় এক লক্ষ বছর আগে। প্রায় তিন কোটি সত্তর লক্ষ বছর আগে প্রথম একটা বানরশ্রেণীর প্রাণী সোজা হয়ে হাঁটতে শুরু করল। যাদের বলা হয় গ্লিয়োপিথেক।
“একটা থেকে আরেকটা ধাপে উত্তীর্ণ হতে লেগেছে কয়েক হাজার থেকে লক্ষ বছর। এখনও প্রতি মূহুর্তে আমাদের মানব জিনে চলেছে সেই বিবর্তনের ধারা। হয়তো কয়েকশো বা হাজার বছর পরে মানুষ হয়ে উঠবে সুপার হোমোস্যাপিয়েন্স। অবশ্য যদি ততদিন আমাদের পৃথিবী টিকে থাকে বা বিজ্ঞান এতটা উন্নত হয় যে মানুষ গ্রহান্তরে পাড়ি দিতে পারে।
“কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি আবার বললেন, এই কয়েক লক্ষ বছরের বিবর্তন তো নিজের চোখে কেউ দেখেনি। বিজ্ঞানীরা ফসিল, গুহাচিত্র, পুরনো হাড়ের কার্বন টেস্ট, মানব জিনের পরীক্ষানিরীক্ষা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। কিন্তু ধরো এর মধ্যে কোনও মিসিং লিঙ্ক এখনও টিকে আছে আমাদের আধুনিক মানুষের চোখ এড়িয়ে। হয়তো তারা এই আদিম হিমালয়ের গভীরেই থেকে গেছে।
“আমি মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ, আপনার কথায় যুক্তি আছে। এমনটা হতেও পারে।”
বাইরে ভারী তুষারপাতের পাশাপাশি ঝড়ো ঠাণ্ডা হাওয়ায় ঘরের ভিতরে বসেও আমাদের শরীর কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। জীবনবাবু কাঠের আগুন জ্বেলে তাতে জল চড়িয়ে বললেন, “কনকনে ঠাণ্ডায় কফি পান করার অভ্যেসটা এখনও যায়নি বুঝলে।”
বন্ধ দরজার ভিতরে বেশ একটা আধিভৌতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে তখন। জ্বলন্ত প্রদীপের সারিগুলি যেন কোনও মায়ালোকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের। গল্পটা শুনতে বেশ ভালোই লাগছে। কিছুক্ষণের মধ্যে হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ উঠে এল। চুমুক দিয়ে মনে হল ফ্লেভারটা বেশ অন্যরকম। জীবনবাবু জানালেন, “এটা চমরী গাইয়ের দুধ দিয়ে তৈরি।”
তারপর শুরু করলেন, “তিব্বতের মানস সরোবর যাওয়ার জন্য পুণ্যকামীদের একটা দল যাচ্ছিল। তাদের সাথেই ভিড়ে গেলাম আমরা। পুরোটাই হাঁটাপথ। অনেকে যদিও ঘোড়া বা খচ্চরের পিঠে চলেছে। মোট অভিযাত্রী সংখ্যা ছিল প্রায় তিরিশ জন। তাদের মধ্যে পাঁচজন বিদেশি। ডঃ পেলমন্ট পেত্রোভিচ ছাড়াও ওঁর সাথে যোগ দেওয়ার জন্য বিদেশ থেকে এসেছিলেন ওঁর চার গবেষক ছাত্রছাত্রী - ম্যাথু, জন, রিক আর ওলি। শেষের দু’জন আমেরিকান, বাকিরা ইউরোপের বাসিন্দা। এর মধ্যে শারীরিকভাবে ম্যাথু ছিল সবথেকে ফিট। ডঃ পেত্রোভিচ একবার ফাঁকা সময়ে একাকী আমাকে ডেকে বলেছিলেন, আমাদের এই তিব্বত যাত্রার পিছনে ওলির যথেষ্ট হাত রয়েছে, বুঝলে! এই বিষয়ে ওর আগ্রহ আর পড়াশোনাও আমার থেকে বেশি। ওলির দাদু ক্যাপ্টেন মল্ড ছিলেন একজন তিব্বত বিশেষজ্ঞ। ওঁর লেখা তিব্বতের উপর কয়েকটা বইও আছে। এই অঞ্চলগুলিতে আগে বহুবার এসেছেন তিনি।
“আমি শুনে ঘাড় নাড়লাম। হাঁটা শুরু হল অসকোট থেকে। সেখান থেকে কিছুটা পূর্বে গিয়ে ভারত আর নেপালের বর্ডার দিয়ে সরাসরি উত্তরের পথ। পুরোটাই পাহাড়ি সরু রাস্তা। ডানহাতে কালিনদী। এই কালিনদী হল এখানে নেপাল আর ভারতের বর্ডার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বলে বোঝানো যাবে না। নাম না জানা বিভিন্ন রঙের অজস্র ফুল ফুটে রয়েছে পথের ধারে। তার মধ্যে গুনগুন করছে মৌমাছি। ফরফর করে ওড়ে বেড়াচ্ছে প্রজাপতির দল। প্রথমদিকে জঙ্গল আর সবুজের ভাগ বেশি থাকলেও যত উপরে উঠতে থাকলাম ক্রমশ কমতে থাকল গাছপালার সংখ্যা। মাঝে মাঝে পাইন, আমলকি, পাকুড়গাছের বন। ধূ ধূ ফাঁকা আঁকাবাঁকা পাহাড়ি জমি। দূরে পাহাড়ের মাথাগুলি মোড়া বরফের মুকুটে।
“সরাসরি উত্তরে তাকালে দেখা যাচ্ছে ওম পর্বত। ওটার পাশ দিয়েই যেতে হবে আমাদের। যার নাম কালিন্দী পাস বা লিপু-লা ওরফে লিপুধুরা পাস। এখন অবশ্য কৈলাস মানস সরোবর যেতে হলে নেপালের কাঠমান্ডু হয়ে সরাসরি গাড়ি করে যাওয়া যায়। ওতে শারীরিক কষ্ট কম, কিন্তু খরচা বেশি। আরেকটা রাস্তা আছে, সিকিমের সিল্করুট হয়ে নাথু-লা পাস পেরিয়ে সরাসরি ঢুকে পড়া যায় তিব্বতে। কিন্তু সেদিক দিয়েও রাস্তার পরিমাণ অনেক বেশি।
“যাই হোক, জাউলজিবি, বালুয়াকোট, ধারচুলা, হুটি হয়ে আমরা চারদিন পর পৌঁছলাম গারবেয়াং। এটা তিব্বতে ঢোকার আগে ভুটিয়া সম্প্রদায়ের শেষ ছোট্ট জনপদ। প্রায় বরফে মোড়া। সবুজ পাতার চিহ্নমাত্র নেই। শুকনো খটখটে আবহাওয়া। মাঝে মাঝে উত্তরের দমকা বাতাসে হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। খাওয়া বলতে ভেড়ার পোড়া মাংস, চমরী গাইয়ের ঘন দুধ আর ভুট্টার আটার মোটা রুটি। সামনের দিনগুলোর জন্য খাদ্য সংগ্রহ করে নেওয়া হল এখান থেকেই। এই বিস্তীর্ণ নো-ম্যানস ল্যান্ডে না আছে কোনও প্রশাসন, না কোনও আইন। এখানে নিয়ম হল, জোর যার মুল্লুক তার। কিছু যাযাবর শ্রেণীর তিব্বতি ডাকাতের দল এখানে মাঝে মাঝেই উৎপাত করে। তারা যাত্রীদের সর্বস্ব লুঠ করে ছেড়ে দেয়, বা অনেক সময়ে মেরে বরফে পুঁতে দিয়ে চলে যায়। মূলত তাদের থেকে আত্মরক্ষার জন্য একমাত্র উপায় হল দলে ভারী হয়ে চলাফেরা করা আর কিছু আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে রাখা। এই দুটো জিনিসই আমাদের যথেষ্ট পরিমাণে ছিল তাই ওদের দেখা পাইনি যাওয়ার সময়ে। কিন্তু পরে আমরা পড়েছিলাম ওদের খপ্পরে। সেকথা পরে বলছি।
“আমাদের সাথে যে ভক্তের দলটি যাচ্ছিল, তাদের প্রধান ছিলেন শঙ্কর মিশ্র নামে উত্তরপ্রদেশের এক পণ্ডিত। এমনিতে অমায়িক ব্যবহার। ঠোঁটের কোণে লেগে রয়েছে সর্বক্ষণের হাসি। কিন্তু চোখের চাউনিটা একটু অন্যরকম। একদিন সন্ধ্যার মুখে তাঁবু খাটানোর পরে গুটি গুটি পায়ে এসে আমাকে ডেকে বললেন, মশাই আপনি তো ভারতীয়। ঐ বিদেশিদের দলে ভিড়েছেন কেন? ওরা ধর্মটর্ম মানে না। কৈলাস আর মানসের হ্রদ হিন্দুদের পবিত্র জায়গা। সেখানে এসব বিধর্মীদের না যাওয়াই ভালো।
“আমি একটু চুপ করে থেকে বললাম, “সে আপনি যেমন ভালো বোঝেন পণ্ডিতজি। তবে কিনা সরকার বাহাদুর তো এদের যাওয়ার পারমিশন দিয়েছেন। তাই আমি-আপনি বারণ করার কে বলুন! কিন্তু আমি যতদূর জানি, এঁরা রাক্ষসতালের পাশেই ঘাঁটি গাড়বেন। এর আগে এগোনোর অভিপ্রায় নেই।
“তাই নাকি? আপনিও কি এদের সাথেই থাকবেন? দেবালয়ের এত কাছে এসে কৈলাস দর্শন করবেন না?
“বললাম, দেখি যদি ভাগ্যে থাকে তাহলে সেটাও হয়ে যাবে।
“পূর্বের আকাশ লাল আবির মেখে তখন অদ্ভুত নৈসর্গিক এক দ্যুতি ছড়িয়ে মোহিত করে রেখেছিল আমাকে। দূরের সাদা বরফের চূড়াগুলি তখন উজ্জ্বল সোনালি রঙের রাংতায় মোড়া গম্বুজের মতো দেখাচ্ছে। সে দৃশ্য যেন ভোলার নয়। মিশ্রজী আবার বললেন, শুনেছি আপনারা নাকি দানবদের খুঁজতে যাচ্ছেন?
“একথা কে জানাল আপনাকে?
“আপনাদেরই শেরপা সর্দার। এমন সর্বনাশ করবেন না। ওরা নরকের কীট। একটা কিংবদন্তী আছে এদের নিয়ে। স্বয়ং মহাদেব ওদের রাক্ষসতালের জলে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। মন্ত্রবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে রয়েছে তারা হিমালয়ের নিচে। তারা সূর্যের আলোয় আসতে পারবে না কোনও দিন। কারণ, ভগবান নিজে বিরাজ করছেন কৈলাস পর্বতে। মনে রাখবেন, পৃথিবীর শেষ লগ্ন উপস্থিত হবে তারা বাইরে বেরোলে।
“আমি হেসে বললাম, এসব বিশ্বাস করেন আপনি?
“বিশ্বাস না করার কী আছে? একথা লেখা আছে আমাদের প্রাচীন গ্রন্থে। তাছাড়া রাক্ষসতাল হ্রদে কোনও প্রাণী বাঁচে না এটা জানেন নিশ্চয়ই? এমনকি কোনও উদ্ভিদ বা শ্যাওলাও নেই ওখানে। কারণ জানেন? ঐ হ্রদের জলে আছে শয়তানের বিষ। আর সেই শয়তানকে ঘাঁটালে কেউ বাঁচবে না। আপনারা তো মরবেনই, সেই সঙ্গে কয়েক কোটি মানুষের জীবন নিয়ে টানাটানি হবে।
“কথাটা শুনিয়েই তিনি হনহন করে হাঁটা দিলেন উলটোদিকে। আমি কথাটা পরে ডঃ পেত্রোভিচকে বলতে তিনি পাহাড় কাঁপিয়ে হেসে উঠলেন হো হো করে। তারপর বললেন, রাক্ষসতালের জলে মিশে আছে বিশেষ একধরনের খনিজ লবণ। যার জন্যই কোনও মাছ বা উদ্ভিদ বাঁচে না। এর সাথে শয়তানের কোনও সম্পর্ক নেই।
“এরপর সেরকম বড়ো কোনও সমস্যা ছাড়াই সতেরো হাজার পাঁচশো ফুট উঁচু কালিন্দী পাসের ভারতীয় বর্ডার পেরিয়ে আমরা পা রাখলাম তিব্বতের ভূমিতে। প্রাথমিক অসুবিধা যেটা হল সেটা অক্সিজেনের অভাব। তবে ধীরে ধীরে সেটাতেও শরীর অভ্যস্ত হয়ে গেল কয়েকদিনে। পাথুরে উপত্যকার উপর সোঁ সোঁ করে ঝড়ো হাওয়া। রাতে তাঁবু খাটিয়ে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকে পড়তাম। প্রথমদিকে সারাদিনে পাঁচ-ছয় কিলোমিটার হাঁটতেই দম শেষ হয়ে যেত। পরে ধাপে ধাপে সেটা বাড়ল। ফলে লিপুলেখ পাস পেরিয়ে প্রায় সপ্তাহ খানেক লাগল রাক্ষসতালে পৌঁছাতে। চমরী গাইয়ের দুধ থেকে তৈরি একধরনের শক্ত মাখনের টুকরো, যাকে ভুটিয়ারা বলে ‘ছুরপি’ সংগ্রহ করা হয়েছিল গারবেয়াং থেকে। এগুলি লম্বা যাত্রাপথে মুখের মধ্যে রেখে চুষতে হয়। ফলে জিভটা শুকিয়ে যায় না, আর এনার্জিও যথেষ্ট পাওয়া যায়।
“চারদিকে ধূসর বাদামী পাহাড়ের সারি। মাথাগুলি সাদা বরফে মোড়া। শীতের সময় এগুলি পুরোটাই ঢেকে যায় তুষার-চাদরে। সামনে ঘন নীল জলাশয়। তার ওপারে বহুদূরে শ্বেতশুভ্র গম্বুজের মতো দেখা যাচ্ছে কৈলাস পর্বত। তীব্র হাওয়ার বেগ। প্রথমদিন আমরা টেন্ট লাগিয়ে শুধু বিশ্রাম নিলাম। পুণ্যকামীদের দল আমাদের ফেলে চলে গেল কৈলাসের দিকে।
“গরম ধোঁয়া ওঠা কফির সাথে গারবেয়াং থেকে কেনা মাখনের টুকরো উনুনে গলিয়ে কফির দানা ফেলে নাড়তে নাড়তে চুমুক দিচ্ছিলাম। আর তাকিয়ে ছিলাম সামনে তিরতির করে কাঁপতে থাকা হ্রদের জলের দিকে। আচমকা ওলির গলা শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি সে জলাশয়ের পাড়ে হাঁটু মুড়ে বসে হাতদুটো আকাশের দিকে তুলে চিৎকার করে অচেনা ভাষায় কিছু একটা বলছে। আমি এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করতে বলল, এটা কিনাউরি ভাষায় একটা মন্ত্র। এটা তেরো বার চেঁচিয়ে বললে অশুভ শক্তিরা সব দূরে পালাবে।
“আমি হেসে বললাম, তা ভালো। কিন্তু এখানে কোনও অশুভ শক্তি আছে বলে তো আমার মনে হচ্ছে না।
“সে কী, তুমি জানো না? রাক্ষসরাজা রাবণ এখানে বসে তপস্যা করেছিলেন। সেজন্য একে বলা হয় শয়তানের লেক বা রাক্ষসতাল। কোনও অশুভ শক্তি যে এখানে আছে সেটা এখানে আসতেই টের পেয়েছি আমি।
“তাই নাকি! আমি ভেবেছিলাম রামায়ণের উপর শুধুমাত্র ভারতীয়দেরই একছত্র অধিকার। তা শয়তানের উপস্থিতিটা টের পেলে কীভাবে?
“সে জানাল, আমার কাছে একটা বন সম্প্রদায়ের যাদুযন্ত্র আছে। সেটা দিয়ে আমি পরীক্ষা করে দেখেছি, আমাদের চারপাশে আছে শয়তানি শক্তি।
“তখন আমি নতুন শুনছি কথাটা। প্রশ্ন করলাম, বন সম্প্রদায়! এরা কারা?
“ওলি বলল, তুমি এদের নাম শোননি? দাদু তাঁর আত্মজীবনীতে লিখে গিয়েছিলেন আদিম তিব্বতি বন উপজাতির কথা। আনুমানিক হাজার বছর ধরে তারা এখানেই থাকত। গত একশো বছরের মধ্যে তাদের সংখ্যা কমেছে অনেক। তবুও একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। বৌদ্ধধর্ম ভারত থেকে তিব্বতে আসার আগে এখানকার ঝেংঝুং সভ্যতা তিব্বতের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম অংশে আঠারোটি রাজ্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ঝেংঝুং সংস্কৃতিটি পবিত্র কৈলাস পর্বতমালা থেকে পশ্চিমে সিকিয়া ও বর্তমান লাদাখ ও বাল্টিস্তান থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে জলধর, দক্ষিণে নেপালের রাজধানী মুস্তাঙ্গের পূর্বদিকে কেন্দ্রীয় তিব্বত ও উত্তরাংশের বিস্তৃত চাঙ্গ তং মালভূমি এবং সানসান ও তাকলামাকান মরুভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত।
“বললাম, বাপ রে! তুমি তো অনেক কিছু জানো দেখছি!
“সে রহস্যজনক একটা হাসি হেসে বলে চলল, বলা যায় ঝেংঝুং ছিল সেই সময়ে বিশ্বের ছাদ। গড় চোদ্দ হাজার ফিট উচ্চতায় পৃথিবীর উচ্চতম অংশের সভ্যতা। তাদের ধর্ম ছিল বন। তন্ত্রবিদ্যা, অলৌকিক ক্ষমতা, বশীকরণে সিদ্ধ ছিলেন তাদের কিছু মঙ্ক। সেইরকম এক সাধু জিয়ামিংর সাথে পরিচয় হয়েছিল আমার দাদুর। তিনি বার তিনেক এসেছিলেন তিব্বতের রাজধানী লাসাতে। তিব্বতি তন্ত্রবিদ্যার প্রতি তাঁর ছিল প্রবল আগ্রহ। জিয়ামিং তাঁকে অনেক কিছু শিখিয়েছিলেন।
আমি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে হ্রদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর বললাম, “কীভাবে করলে পরীক্ষাটা, আমাকেও দেখাও একটু।
“আমার কথা শুনে সে নিজের তাঁবু থেকে দৌড়ে নিয়ে এল জিনিসটা। একটা গোল পেতলের চাকতি। তাতে অচেনা ভাষায় আঁকিবুঁকি কাটা আছে হরেকরকম। ঠিক মাঝখানে একটা ছোট্ট ছিদ্র। একটা ওলনের মতো দেখতে ধাতব শঙ্কুর সূচালো দিকটা নিচের দিকে করে সেই ছিদ্রের সামনে ঝুলিয়ে রাখল। তারপর বলল, যদি কোনও খারাপ শক্তি থাকে আমাদের চারপাশে তাহলে এই ওলনটা বাঁদিক থেকে ডানদিকে গোল হয়ে ঘুরতে শুরু করবে। না হলে স্থির থাকবে।
“বেশ কিছুক্ষণ ওলনটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর মনে হল, সত্যিই সেটা পশ্চিম থেকে পূর্বে ঘুরছে এবং গতি বাড়ছে ক্রমশ। বুঝতে পারলাম না এটা ওলির কোনও কারসাজি কি না! ওলি আবার বলল, শেষবার দাদু যখন এসেছিল তিব্বতে, আর জীবিত ফিরতে পারেননি। কীভাবে তিনি মারা গেছেন তাও জানি না। আমি বড়ো হয়ে খুঁজে পেয়েছিলাম তাঁর দুটো তিব্বতের ডায়রি। সেখানে একটা কথা লাল কালি দিয়ে লিখেছিলেন, ঝেংঝুং অর্থাৎ এই তিব্বত হল পৃথিবীর মাথা। এর নিচে আছে পৃথিবীকে পায়ের তলায় নিয়ে আসার রাস্তা। কথাটির প্রকৃত অর্থ আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়নি এখনও।
“আমি তাকে জানালাম আমার বাবার কথা। তারপর সেদিন রাতেই ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকে শুয়ে আছি। আচমকা মনে হল, কেউ বুঝি নড়াচড়া করছে টেন্টের মধ্যে। কিন্তু আধো ঘুম থেকে আমি কিছুতেই বেরিয়ে আসতে পারছিলাম না। চোখ খুলতে চাইছি, কিন্তু পারছি না। কেউ যেন আঠা দিয়ে চোখের পাতাগুলো জুড়ে দিয়েছে। মনে হল, স্লিপিং ব্যাগ সমেত আমাকে কেউ চাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমি চিৎকার করতে চাইছি, কিন্তু কোনও শব্দ বের হচ্ছে না। কতক্ষণ পরে হঠাৎ মনে হল, ওরা আমাকে নামিয়ে দিয়েছে। নিচে শক্ত পাথরের ঠাণ্ডা মেঝে। চোখ খুললাম এবার। চারপাশটা অন্ধকার। একটা গহ্বরে আটকে গেছি। স্পর্শ করছি এবড়োখেবড়ো পাথরের ঠাণ্ডা দেয়াল। কিন্তু বাইরে বেরনোর কোনও রাস্তা নেই। আচমকা একটা বিকট চিৎকারে আমার সারা গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। ছিটকে উঠে দেখি স্লিপিং ব্যাগের মধ্যেই শুয়ে শুয়ে স্বপ্ন দেখছি।
“উঠে বসে কাউকেই দেখতে পেলাম না। বেশ অবাক হলাম। তারপর শিরশির করে উঠল শরীর। হাত বের করে টর্চটা জ্বালতে দেখি টেন্টের চেন খোলা। সোঁ সোঁ করে ঠাণ্ডা হাওয়া ঢুকছে ভিতরে। একটু আওয়াজ দিতেই প্রফেসর উঠে বসলেন। তিনিও আমার মতো অবাক। ওঁর পাশের বিছানাটা ফাঁকা। স্লিপিং ব্যাগটা পড়ে রয়েছে। কিন্তু মানুষ নেই। এই মাঝরাতে বাইরে যাওয়ার কোনও কারণ আছে বলে তো মনে হয় না। ওলির এরকম বাল্যখিল্য খামখেয়ালিপনায় বেশ বিরক্ত হলাম আমি।
“প্রফেসরের সাথে আমিও হাতে একটা অস্ত্র নিয়ে ঠাণ্ডার পোশাক গায়ে চাপিয়ে বেরোলাম বাইরে। কোটি কোটি নক্ষত্রের আলোয় ধূসর প্রান্তর স্পষ্টতই দৃশ্যমান। চোখে পড়ল, বেশ অনেকটা দূরে ওলি একা হেঁটে চলেছে রাক্ষসতালের কিনারা বরাবর। আমি দৌড়ে গিয়ে বাকি তিনজনকে ডেকে তুললাম পাশের টেন্ট থেকে। এদের আবার একটু বদভ্যাস ছিল। রাত হলেই নেশা ভাং করত। ফলে এক ডাকে ওঠার পাত্র নয়।
“প্রফেসর খোলা প্রান্তরে গলা ছেড়ে চেঁচালেন ওলির নাম ধরে। কিন্তু তার ভাবগতির কোনও পরিবর্তন হল না। সে যেমন হাঁটছিল, তেমনই চলতে থাকল। আমরা দৌড় দিলাম তার পিছনে। অক্সিজেন কম থাকায় সহজেই হাঁফিয়ে উঠছিলাম। বারবার দম নিয়ে আমরা যখন পৌঁছলাম ওর কাছে, দেখি বাঁহাতে একটা ধারালো ছুরি। ডানহাতে একটা কাটা মুণ্ডু ঝুলছে! সেটা থেকে রক্ত ঝরছে টপটপ করে।
“হ্যাঁ, কাটা মুণ্ডুই বটে। তবে সেটা কোনও জীবন্ত প্রাণীর নয়। একটু পুতুলের। কাপড়ের তৈরি একটি পুতুলের কাটা মুণ্ডু। তার লম্বা চুলের মুঠিটা ডানহাতে চেপে ধরে আছে ওলি। মাথাটা পেন্ডুলামের মতো দুলছে। আর রক্তটা ওর নিজের। ছুরি দিয়ে নিজের হাত কেটেছে। আরও অবাক হলাম, যখন সামনে গিয়ে দেখি মেয়েটার চোখদুটো বন্ধ।
“প্রফেসর তার কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে ডাকতেই ঝুপ করে শরীরটা পড়ে গেল নুড়িপাথরে। মনে হল হুঁশ নেই। শরীরে না আছে শীতের পোশাক, না আছে মাথায় টুপি। কিন্তু এরকম অবস্থায় বাইরে ও বেরোলই বা কেন? স্বপ্নে হাঁটার কথা শুনেছিলাম। চাক্ষুষ দেখলাম সেবার।
“সবাই মিলে ধরাধরি করে টেন্টে নিয়ে আসা হল। তখনও অচৈতন্য। আমরা সবাই রীতিমতো বিস্মিত। পরের দিন থেকে শুরু হল ধুম জ্বর। একশোর নিচে ওর টেম্পারেচার নামতেই চায় না। আর তেমনই ভুল বকতে শুরু করল। আমি ভাবলাম রাতের মারাত্মক ঠাণ্ডা লাগার ফল। ভুটিয়া কুলির দল এসব দেখে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। বিড়বিড় করে কীসব মন্ত্র উচ্চারণ করছে দল বেঁধে।
“কিন্তু প্রফেসরের কপালে চিন্তার গভীর দাগ আমাকে ভাবিয়ে তুলল। ওঁকে কথাটা জিজ্ঞেস করতে কিছুই বলতে চাইলেন না খুলে। এদিকে আমাদের এখানে আসার উদ্দেশ্য যে বিফলে যেতে বসেছে সেটা বেশ টের পাচ্ছিলাম। পেত্রোভিচ অনেক ভেবে বললেন, আমি নিজে ওলির দেখাশোনার জন্য টেন্টে থেকে যাচ্ছি। বাকিরা কাজটাকে এগিয়ে নিয়ে যাও। ওলির ওষুধ চলছে। আশা করছি কয়েকদিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠবে সম্পূর্ণভাবে। চিন্তা করো না।
“সেইমতো পরের দিন সকাল থেকে শুরু হল আমাদের হ্রদ পরিক্রমা। সমুদ্রতল থেকে প্রায় পনের হাজার কিলোমিটার উপরে আড়াইশো বর্গ কিলোমিটার এলাকা দখল করে রয়েছে এই রাক্ষসতাল। উত্তরদিকটা সরু হয়ে গেছে। ডানপাশে মানস সরোবরের আয়তন এর থেকেও বেশি। আমরা বাঁদিক দিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। উদ্দেশ্য কোনও পাহাড়ের বা হ্রদের গায়ে কোনও গুহা, ফাটল বা পথ যদি পাওয়া যায়। হ্রদের চারপাশে প্রায় তিনশো মিটার এলাকা চিহ্নিত করে প্রতি বর্গফুট স্থান আমরা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে করতে এগোলাম।
“উঁচুনিচু শুকনো পাথর আর গুঁড়ো বরফ ছাড়া কিছুই চোখে পড়ল না আমাদের। প্রাণী বলতে কিছুই নেই। প্রায় সপ্তাহ খানেক লাগল আমাদের হ্রদটি ঘুরে আবার পূর্বের জায়গায় ফেরত আসতে। কিন্তু এর মধ্যে আশাব্যঞ্জক কিছুই চোখে পড়েনি। না কোনও গুহাপথ, আর না কোনও অচেনা প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর চিহ্ন। দেখা পেয়েছিলাম শুধু একদল যাযাবরের।
“কিন্তু মাথায় বজ্রাঘাত হল যখন পুরনো জায়গায় ফিরে এসে দেখলাম টেন্ট তছনছ। জিনিসপত্র সমস্ত লণ্ডভণ্ড। ভুটিয়া কুলিগুলো সমেত ডঃ পেত্রোভিচ আর ওলি বেপাত্তা। বেশ ভয় পেলাম। ম্যাথু, জন আর রিক আমার মতোই অবাক হয়েছে। হঠাৎ মাটিতে কিছু একটা দেখতে পেয়ে রিক হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। আমরা এগিয়ে গিয়ে দেখি একটা বুলেটের খোল। তারপর এদিক ওদিক আরও তিন-চারটে খুঁজে পেলাম ঐ একই জিনিস। সঙ্গে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ!
“তার মানে!
“ম্যাথুর কথার সুর ধরে আমি মন্তব্য করলাম, তিব্বতি ডাকাতের দল।
“আমাদের হাতে তখন নিজের অজান্তেই উঠে এসেছে পিস্তল আর রাইফেলগুলি। কিন্তু প্রতিপক্ষ তো আর তখন সেখানে বসে নেই। আমরা উন্মাদের মতো খোলা প্রান্তরে দৌড়ে বেড়ালাম।
“মনে পড়ল, এর মধ্যে একদল যাযাবরশ্রেণীর তিব্বতি মানুষের সাথে দেখা হয়েছিল রাক্ষসতালের উত্তরপ্রান্তে। যারা বিভিন্ন জিনিসের পসরা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় পাহাড়ি উপত্যকায়। পুণ্যকামী আর অভিযাত্রী দল দেখলেই এগিয়ে আসে মালপত্র বিক্রির জন্য। আমরা প্রধানত খাবারদাবারই কিনতাম ওদের কাছ থেকে। শুকনো মাংস, মাখন, ছুরপি, আটা, চাল প্রভৃতি। বেশ একটা ভ্রাম্যমান বাজারের মতো। ওরা নিশ্চয়ই এই ডাকাত দলের কথা জানে। চারজনে মিলে ছুটলাম সেইদিকে। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলাম তারা পাততাড়ি গুটিয়ে চলে গেছে অন্য কোথাও। শেষ আশার টিমটিমে প্রদীপটা ঝুপ করে নিভে যেতে আমরা বেশ হতাশ হয়েছিলাম।
“কৈলাস পর্বতের চূড়াটিকে রক্তের রঙে রাঙিয়ে ডুবে গেল সূর্য। রাত্রি নামল। হ্রদের ধারে উত্তরপ্রান্তে আমরা আবার তাঁবু খাটালাম। বসে রইলাম কোটি কোটি নক্ষত্রের আলোর নিচে। হঠাৎ হঠাৎ দুয়েকটা তারা খসা দেখতে দেখতে কখন যেন জড়িয়ে এল চোখের পাতা। খিদে-ভাবটা চলে গেছে। ক্লান্ত শরীরে গিয়ে ঢুকলাম স্লিপিং ব্যাগের ভিতর। কিন্তু তন্দ্রাটা বারবার ভেঙে যাচ্ছিল। শুধু ভেসে উঠছিল ওলির করুণ মুখ। জ্বরের ঘোরে তার ভুল বকে চলা অসংলগ্ন কথাগুলি মনে পড়ছিল। তার ডানহাতে আটকে থাকা পুতুলের কাটা মুণ্ডুটা থেকে রক্ত পড়ছিল টপ টপ করে। মনে হচ্ছিল, এ প্রাগৈতিহাসিক অভিশপ্ত অঞ্চল আমাদেরকেও ছাড়বে না। সে রক্ত চায়! তাজা মানুষের রক্ত!
“মনে পড়ছে তাকে ছেড়ে যাবার আগের রাতে সে বিড়বিড় করে বলছিল, পালাও! তোমরা পালাও! ওরা আসছে। সবাই মারা পড়বে! আবার কখনও বলছে, মাটির নিচে ওরা আছে। ডাকছে আমাকে। যেতে দাও। চলো সবাই মিলে সেখানে যাই।
“সে এই কথাগুলি ঘোরের মধ্যে বলত; তখন তার মানে বুঝিনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে হয়তো এর কিছু অন্তর্নিহিত অর্থ আছে। আমরা চলে যাওয়ার পরে ঠিক কী ঘটেছিল সেটা কি আর জানা যাবে না কোনও দিন?
“পরের দিন ভোরবেলা ঘুম ভাঙল রিকের ডাকাডাকিতে। সে একজন লোককে ধরে এনেছে কোথা থেকে। আমি বাইরে বেরিয়ে লোকটাকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলাম। মুখের ও সারা শরীরের চামড়া কুঁচকে ছাল উঠছে। উসকোখুসকো চুল। গালে বহুদিনের না কাটা দাড়ি। পোশাকের ছিরিও তথৈবচ। ছেঁড়াখোঁড়া, তালি মারা একটা জোব্বা পরে আছে। ঠোঁটের কোণ দিয়ে ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে। লোকটা বারবার জিভ দিয়ে চাটছিল সেটা। জিজ্ঞেস করলাম, ব্যাপার কী হে রিক? পেলে কোথায় একে?
“সে জানাল, পূর্বদিকে একটা সরু খাঁড়িতে পাথরের পিছনে ঘাপটি মেরে বসে ছিল। আমাকে পিছন থেকে আক্রমণ করে। পিঠের উপর দিয়ে ঘুরিয়ে ওকেই সামনে এনে আছাড়ে ফেলে মারলাম এক ঘুসি। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কীসব বকছে! ভাষাটা বুঝতে না পেরে ধরে আনলাম তোমার কাছে।
“আমি একটু এগিয়ে গেলাম। পরিষ্কার হিন্দিতেই প্রশ্ন করলাম প্রথমে। দেখি মাঝবয়সী লোকটার চোখমুখ চকচক করে উঠল। সেও বিশুদ্ধ হিন্দিতে উত্তর দিল, আমার নাম মোহনলাল তিওয়ারি, বাবুজি। গতবছর সরকারের অনুমতি না নিয়েই আমরা কয়েকজন ঢুকে পড়েছিলাম তিব্বতে। মানস সরোবর আর কৈলাস দর্শন করে মানবজন্ম সার্থক করব এই উদ্দেশ্য ছিল আমাদের। কিন্তু পথে তিব্বতি দস্যুরা সবকিছু লুঠ করল। তারপর ধরে নিয়ে গেল আমাদের। দিবারাত্র তাদের ডেরায় পশুর মতো খাটুনি। না পারলেই চাবুক। একে একে না খেতে পেয়ে মারা গেছে আমার পাঁচজন সাথী। আমি কোনওরকমে পালিয়ে এসেছি প্রাণ বাঁচিয়ে। আমাকে তোমরা বাঁচাও। ফিরে যেতে দাও নিজের দেশে।
“লোকটা হাত জড়ো করে হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছে। প্রশ্ন করলাম, দেশ কোথায় তোমার?
“বরেলিতে। আমার ছোটো ছোটো দুটো মেয়ে আছে বাড়িতে। চাষবাস করে দিন গুজরান করি। আমাকে সাহায্য করলে ভগবান তোমাদের ভালো করবেন।
“হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেছে তখন। মনটা নরম হয়ে গেল। বাকিদের বুঝিয়ে বললাম ব্যাপারটা। তারপর লোকটার কাছে জেনে নিলাম ডাকাতদের আস্তানার খুঁটিনাটি। কোনদিক দিয়ে গেলে তাড়াতাড়ি পৌঁছাব সেখানে। সে একটা ম্যাপ এঁকে বুঝিয়ে দিল। কোনাকুনি উত্তর-পশ্চিমে তিনটে পাহাড় টপকে দুটো বড়ো গুহায় থাকে ওরা। মোট জনা চল্লিশ লোক। প্রত্যেকেই নাকি একেকটা হিংস্র শয়তানের বাচ্চা। দল বেঁধে ডাকাতি করে মুখোশ পরে। অস্ত্র বলতে তাদের কাছে আছে কয়েকটা বন্দুক, কিছু গোলাবারুদ আর ছোরা।
“বহুদিনের অভুক্ত লোকটাকে কিছু খাবার দিয়ে বিশ্রাম নিতে বললাম। তারপর আমরা ছকে নিলাম আগামী পথ। পরের দিন সকালে তাঁবু গুটিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম উত্তরদিকে।
“তারপর দেখা পাওয়া গেল সেই পুণ্যকামীদের দলটাকে। মিশ্রজিকে দেখতে পেলাম সবার আগে। আমাকে দেখেই দৌড়ে এসে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। ভীষণই বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল পুরো দলটাকে। তারপর জানালেন, দু’দিন আগে মাঝরাতে আচমকা তাদের তাঁবু আক্রমণ করেছিল তিব্বতি ডাকাতরা। সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে গেছে। দুয়েকজন জোয়ান লোক যারা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, তাদের মারধর করেছে। দেখলাম, সত্যিই মর্মান্তিক ব্যাপার। তারা এতটা রাস্তা বিনা খাদ্য আর অর্থে কী করে পার হবে জানি না। যতটা সম্ভব আমরা সাহায্য করলাম। আর বললাম, মোহনলাল তিওয়ারিকেও যেন তারা সঙ্গে নিয়ে যায়।
“তারপর আমরা এগোলাম উত্তর-পশ্চিমের পাহাড়গুলির দিকে। এদের মুখে সবকিছু শুনে আশঙ্কা বাড়ছিল ওলির জন্য। তারাও যদি ডাকাতের খপ্পরে পড়ে, কী জানি কী ঘটবে তার সাথে।
“অস্ত্রশস্ত্র বলতে আমাদের কাছে ছিল তিনটি শক্তিশালী উইনচেস্টার রাইফেল, দুটি উইলসনের রিভলবার ও দুটি ম্যাগজিন পিস্তল। এছাড়াও কয়েকটা বড়ো ড্যাগার ও ছুরি। গুলি মজুত আছে মোটামুটি। তবে ডাকাত দলের কাছে সেগুলি কতক্ষণ কাজে লাগবে জানি না। এটা বেশ বুঝতে পারছিলাম যে ওদের সাথে শক্তি দিয়ে নয়, লড়তে হবে বুদ্ধি দিয়ে। তবে আশার কথা, ম্যাথু জার্মান সেনাবাহিনীর স্কুলে বড়ো হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পালিয়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ডে। মিলিটারির কৌশল ও অস্ত্রচালনা ওর কাছে জলভাত। খালি হাতের লড়াইয়েও অসম্ভব দক্ষ। আগেই বলেছি, শারীরিক সক্ষমতা ওর আমাদের সবার থেকে বেশি। পথে যেতে যেতে অনেকরকমের যুদ্ধের কৌশল শিখিয়ে দিল আমাদের। খালি হাতে লড়াই থেকে বন্দুক-পিস্তল চালানো, সব। আমিও গুপ্তসমিতিতে যোগ দিয়ে শিখেছিলাম অনেক কিছু।
“পাহাড়ের পাদদেশ ধরে এগোলাম। এখানে ছোটো ছোটো কিছু ঘাস ও গুল্ম গজিয়েছে পথের ধারে। সাদা সাদা গুঁড়ো গুঁড়ো ফুল ফুটেছে। কালো লোমশ চমরী গাইয়ের দল জবুথুবু হয়ে বসে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। কোথাও দাঁড়িয়ে আছে একপাল তিব্বতি ঘোড়া। সরু বরফ গলা জল বয়ে চলেছে পাশ দিয়ে তিরতির করে। কখনও বা চোখে পড়ছে পাহাড়ি লোমশ ভেড়ার পাল। শুনেছি কস্তূরীমৃগ পাওয়া যায় এ অঞ্চলেই। যদিও তাদের দেখা পাওয়া ভগবান দর্শনের সামিল। আমরা জলের রেখা পাশে রেখে এগোলাম। মনের মধ্যে একটা একটা জেদ চেপে বসেছে। নিজেদের প্রাণ যায় যাক, তবুও এর শেষ না দেখে কাপুরুষের মতো ফিরব না দেশে। চারজনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে হাঁটছিলাম। উদ্দেশ্য, যদি প্রতিপক্ষ লুকিয়ে আক্রমণ করে, তাহলে যেন সকলের উপর এক সাথে আঘাত হানতে না পারে।
“তিনদিনের মাথায় এঁকে বেঁকে দুটি পাহাড় পেরিয়ে আমরা পৌঁছলাম একটা ছোটো জলাশয়ের সামনে। পথ এবার বরফে মোড়া। আরও কঠিন। এবার ম্যাথুর পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা ভাগ হয়ে গেলাম দু’দলে। ম্যাথু আর জন বাঁদিক দিয়ে পাহাড়ের উপর উঠবে। আমি আর রিক পাদদেশ ধরেই এগোব। তবে সাবধানে। যথাসম্ভব নিজেদেরকে পাথরের আড়ালে লুকিয়ে এগোতে হবে। তিওয়ারির ম্যাপ অনুযায়ী এই পাহাড়ের ওপারেই আছে দস্যুদের গুহা। আমরা দিনের বেলা পাহাড়ের গায়ে বড়ো পাথরের খাঁজে গা আড়াল দিয়ে বসে থাকতাম। সূর্য ডুবলে এগোতাম সন্তর্পণে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় কষ্ট হত খুবই। কিন্তু এটাই নিরাপদ ছিল সবথেকে। সারারাত হেঁটেছি বরফের মধ্যে।
“প্ল্যানিং করাই ছিল। দু’দিন পর ভোর চারটের সময়ে অ্যাটাক করা হবে এক সাথে। আমরা তিনটে নাগাদ পৌঁছে গিয়েছিলাম গুহাদুটির চৌহদ্দির মধ্যে। অন্ধকারে দূর থেকে আগুনের ক্ষীণ আলোয় স্পষ্ট হয়ে গেল ডাকাতদের গুহাগুলির অবস্থান। দূরবীন দিয়ে লক্ষ করলাম। বাইরেটা তখন ফাঁকা। কিন্তু বাদ সাধল আট-দশটা লোমশ পাহাড়ি কুকুর। এরা প্রচণ্ড প্রভুভক্ত ও হিংস্র প্রজাতির। বাগে পেলে দল বেঁধে মানুষের টুঁটি ছিঁড়ে নিতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগবে। ঘ্রাণশক্তিও অত্যন্ত প্রখর। অতএব বেশি কাছে গেলেই চ্যাঁচামেচি করে সতর্ক করে দেবে চল্লিশজন ডাকাতকে। তিওয়ারি আগেই সাবধান করেছিল আমাদের।
“ম্যাথু অবশ্য এদের জন্যও কিছু ভেবে রেখেছে। দূরবীন চোখে বসে ছিলাম পাহাড়ের খাঁজে। হঠাৎ ভোররাতে কুকুরগুলির মধ্যে একটা চাঞ্চল্য লক্ষ করলাম। একে একে তারা এগিয়ে যাচ্ছে নির্দিষ্ট দিকে। দু’নম্বর গুহার ডানদিকে অন্ধকার অংশে গিয়ে যেন মিলিয়ে যাচ্ছে তারা। রিক মন্তব্য করল, নিশ্চয়ই ম্যাথু ওদের জন্য লোভনীয় খাবারের ব্যবস্থা করেছে।
“মানে পাহাড়ি ভেড়ার মাংস!
“ঠিক তাই। বিষ মেশানো মাংসগুলি খেয়ে ওরা নিস্তেজ হয়ে পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে আমাদের।
“আমরা তাই করলাম। চুপ করে বসে রইলাম আরও কিছুক্ষণ। তারপর ভোরের আলো বাড়ার সাথে সাথে ধীরপায়ে এগোলাম। কুকুরগুলির তখন সাড়াশব্দ বন্ধ হয়েছে। আচমকা একটা গুলির কানফাটা আওয়াজে কেঁপে উঠল নিস্তব্ধ পাহাড়ের কোল। আমি আর রিক পাহাড়ের ধাপ বেয়ে নিচে নামার আগেই গুলির লড়াই শুরু হয়ে গেছে দু’পক্ষের। কিন্তু ম্যাথুর ক্র্যাক-শট নিশানায় একের পর এক ধরাশায়ী হচ্ছে তিব্বতি ডাকাতগুলি। গুহার মুখ থেকে পিলপিল করে বেরিয়ে আসছে নরকের কীটের মতো। আমি আর রিক নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে পাথরের আড়াল থেকে একটা একটা করে নিশানা বানাচ্ছিলাম ওদের। দু’দিন আগে তীর্থ অভিযাত্রীদের লুট করার পর বেশ নিশ্চিন্ত মনে ব্যাটাগুলো নেশা করে ঘুমাচ্ছিল। ওদের দুর্গম ঘাঁটিতে এমন অতর্কিতে হামলা হতে পারে স্বপ্নেও ভাবেনি। গোলাবারুদের গুদামটা দখল নেওয়ার জন্য আমাদের প্ল্যান আগে থেকেই রেডি ছিল। আমরা দু’জন, ম্যাথু আর জনকে ব্যাক আপ ফায়ার দেব দূর থেকে। সেইমতো আমাদের উইনচেস্টার রাইফেলগুলি গর্জে উঠছিল যথাসময়ে।
“মিনিট পনেরোর মধ্যে বুঝলাম মিশন আমাদের মুঠোয় চলে এসেছে। পিছু হটতে শুরু করেছে তিব্বতি ডাকাতরা। ঠিক সেই সময়ে রিক আচমকা আমার ডানদিকের পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে গুলি করতে করতে এগিয়ে গেল একনম্বর গুহার দিকে। ডাকাতগুলো ঐ গুহাটাই বেশি করে কভার করছিল। মনে হচ্ছে ওদের সর্দার হয়তো লুকিয়ে রয়েছে ওখানেই।
“কিন্তু চোখের পলকে ঘটল আমাদের অভিযানের প্রথম দুঃখজনক ঘটনা। পাহাড়ের অপরপ্রান্ত থেকে ছুটে আসা একটি গুলি তাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল চোখের সামনে। রিকের রক্তাক্ত শরীরটা পাহাড়ের গা বেয়ে গড়াতে গড়াতে গিয়ে পড়ল সামনের সাদা বরফে মোড়া গুহার চাতালে। তারপরেই ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটে আসতে লাগল আমার দিকে। বুঝলাম, শত্রুপক্ষের পরের টার্গেট আমি। বড়ো পাথরের পিছনে ঘাপটি মেরে বসে পড়লাম। মুহুর্মুহু গুলির আওয়াজ। দমবন্ধ অবস্থা। গুলির আওয়াজের সাথে ছিটকে উঠছিল বরফের গুঁড়ো আর বারুদের গন্ধ।
“কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো পাহাড় সমেত এলাকাটা কেঁপে উঠল তীব্র আওয়াজের সাথে। বন্ধ হল গুলিবর্ষণ। পাথরের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম, একটা বড়ো আগুনের গোলা কালো হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে আকাশে। ডাকাতরা সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। নয়তো হাতদুটো মাথার উপর দিয়ে শুয়ে পড়েছে বরফের উপর। জন আর ম্যাথুর হাতে উদ্যত বন্দুক। তাদের সামনে হাঁটু মুড়ে হাত জড়ো করে বসে রঙচঙে তিব্বতি টুপি আর জোব্বা পরা এক গাঁট্টাগোট্টা লোক। ওটাই মনে হয় পালের গোদা। জন শিস দিয়ে নেমে আসতে বলল আমাকে। বুঝলাম, ডাকাতদের অস্ত্র-গুদামটা বিস্ফোরণে উড়ে যেতে মনোবল ভেঙে গেছে ওদের।
“নেমে এসে দেখলাম রিকের শরীরে কোনও স্পন্দন নেই। সে নিথর হয়ে পড়ে রয়েছে উপুড় হয়ে বরফে মিশে। মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল ওর মৃত্যুটা।
“যন্ত্রণায় বিকৃত হয়ে যাচ্ছিল সর্দারের মুখ। সারা গায়ে বাঁধা বিভিন্ন জন্তুর হাড়, করোটি, মাদুলি। ঘোলাটে চোখ। গায়ে একটা বোঁটকা গন্ধ। কালো জোব্বা পরা তিব্বতি বয়স্ক ডাকাত সর্দারের মাথায় বন্দুকের নল ঠেকিয়ে ম্যাথু প্রশ্ন করল, আমাদের সাথী প্রফেসর পেত্রোভিচ আর ওলি কোথায়?
তিনি মাথা নাড়লেন। জন তার চোয়াল লক্ষ্য করে মারল এক মোক্ষম ঘুসি। চিত হয়ে শুয়ে পড়ল লোকটা। দাঁত ভেঙে রক্ত বেরোচ্ছে। জোড়হাত করে আবার মাথা নাড়ল। আমরা অবাক হলাম। কী বলতে চায় ও? জন দৌড়ে গেল গুহার ভিতরে। পরপর দুটো গুহা খুঁজে এসে সেও মাথা নাড়ল। ব্যাপার কী? এতক্ষণ তাহলে আমরা মরীচিকার পিছনে দৌড়চ্ছি? নিজেদের জীবন বাজি রেখে ডাকাতদের ডেরায় হামলা করাটা পুরো বেকার গেল!
“আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে ডাকাত সর্দার ভাঙা ভাঙা ইংরাজিতে জানতে চাইল, কী ঘটেছিল তোমাদের সাথে?
“আমি তখন তাকে তুলে ধরে বসিয়েছি। ভাবলাম, হয়তো আমরা যা খুঁজছি সে প্রশ্নের উত্তর এই লোকটাই জানে। কারণ, এলাকাটা এর থেকে ভালো কেউ চেনে না। আমি সংক্ষেপে বললাম পুরো ঘটনাটা। লোকটা বলল, আমার দলের লোক তীর্থযাত্রীদের লুট করেছে এটা সত্যি। কিন্তু রাক্ষসতালের কাছ থেকে কাউকে কিডন্যাপ করেনি।
“মানে?
“রাক্ষসতালে শয়তানের বাস। আমদের দলের লোক ও-এলাকাটা এড়িয়ে চলে। তবে আন্দাজ করতে পারছি ওদের কারা নিয়ে গেছে।
“কারা?
“সিরিঞ্জুরা।
“তারা কারা? জানতে চাইল অধৈর্য ম্যাথু।
“ডাকাত সর্দার জানাল, রাক্ষসতালের নিচে সিরিঞ্জুদের বাস।
“সিরিঞ্জুদের নাম আমি শুনেছিলাম মুন্সিয়ারির পণ্ডিতের কাছে। ম্যাথু জানে না সেকথা। সে প্রশ্ন করল, এরা কারা? এরকম কোনও জাতির নাম তো শুনিনি।
“না সাহেব, ওরা মানুষ নয়। আমাদের ঝিংঝুংয়ের উপকথায় আছে, ওরা নাকি পৃথিবীর পেটের ভেতর থাকে। তারা অন্য জগতের প্রাণী।
“জন অবাক গলায় জিজ্ঞাসা করল, অন্য জগতের প্রাণী! মানে? একটু খুলে বলো।
“আমাদের ব্যাগ থেকে ওষুধ দিয়ে সর্দারকে একটু সুস্থ করতে সে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, তার গড়গড়াটা চাই।
“কিছুক্ষণ পর তার গুহার মধ্যে বসে গড়গড়ায় টান দিতে দিতে শোনাল অদ্ভুত এক গল্প। বলল, সে বহুযুগ আগের কথা। লাসায় অনেক কাল আগে এক অত্যাচারী রাজা ছিলেন। ভারি অদ্ভুত ছিল তাঁর শাস্তি। যদি কোনও ব্যক্তি তাঁর রাজ্যে কোনও বিষয়ে প্রশ্ন করত তাহলে তার জিভ কেটে নেওয়া হত। অথবা জীবন্ত পুঁতে দেওয়া হত পাহাড়ের খাঁজে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও মানস সরোবর আর কৈলাস পর্বতসংলগ্ন বন জনগোষ্ঠীকে কিছুতেই বাগে আনতে পারছিলেন না। যতবার সৈন্য পাঠান, ততবার চরম দুর্গতির শিকার হতে হয় তাদের। ঝেংঝুং অঞ্চলে পাহাড়ের কোলে লুকিয়ে দারুণ ক্ষিপ্রতার সাথে যুদ্ধ করত বন উপজাতি। শোনা যায় এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন উচ্চমার্গের তন্ত্রসাধক। যুদ্ধবিদ্যায় অলৌকিক শক্তি প্রয়োগ করে বারবার রাজার সৈন্যকে পর্যুদস্ত করে ছাড়ত। শেষে রাজা এক ছলের আশ্রয় নিলেন। বনদের সমস্ত তন্ত্রসাধককে লাসায় কূটনৈতিক নিমন্ত্রণ পাঠালেন। প্রথমে বন্ধুবেশে রাজগৃহে আপ্যায়ন করে, পরে প্রায় দুশোজন সাধুকে রাজকীয় ভোজ খাওয়ানোর নামে পানপাত্রে মিশিয়ে দিলেন বিষ। আর ঠিক সেই ক্ষণেই বিশাল সৈন্যবাহিনী আছড়ে পড়ল ঝেংঝুং প্রদেশে। গ্রাম-কে-গ্রাম জ্বালিয়ে দিল। লুঠ করল, ধ্বংস করল মঠ, পুঁথি। হাজার হাজার মানুষের রক্তে লাল হল রাক্ষসতাল।
“তারপর?
“রাজার লোক ভাবল বিদ্রোহীদের ঠিক শাস্তি হয়েছে। কিন্তু লোকচক্ষুর অন্তরালে, পাহাড়ের গোপন গুহায়, হিমালয়ের গভীরে পৃথিবীর দুর্গম স্থানে টিমটিমে সলতের মতো বেঁচে রইল কিছু বনগোষ্ঠী। তারা সমঝোতা করে নিল পাহাড়ের নিচে থাকা সিরিঞ্জুদের সাথে। এই সিরিঞ্জুরা যে কবে আর কোথা থেকে এখানে এল তা কেউ জানে না। অনেকে বলে, তারা অন্য কোনও জগতের প্রাণী। একবার যদি কোনও মানুষকে দংশন করে সিরিঞ্জুরা, তার শরীরের রক্তে মিশে যায় বিষাক্ত লালা। তখন সে মানুষটিও ধীরে ধীরে সিরিঞ্জুর রূপ ধারণ করে। এমনটাই লেখা আছে আমাদের উপকথায়। শোনা যায় তন্ত্রমন্ত্র আর যোগ সাধনার দ্বারা সেই মানুষগুলি সিরিঞ্জুদের বশ করেছিল।
“মনে পড়ল মুন্সিয়ারির পূজারির কথা। আমার বাবাও দেখেছিলেন হিমালয়ের নিচে এক গুহা বসতি। সর্দারের মুখে আর সারা শরীরে ভর্তি বলিরেখা। আমি পূজারির কাছ থেকে পাওয়া সেই চৌকো ধাতব জিনিসটা ওকে দেখিয়ে প্রশ্ন করলাম, এই চৌকো পাথরটা কী, বলতে পার?
“হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে মাথা নেড়ে জানাল, এমন জিনিস এর আগে আমি কখনও দেখইনি সাহেব।
“ম্যাথু জিজ্ঞেস করল, সেই নিচের দেশে যাওয়ার রাস্তাটা কোথায়?
“রাস্তা তো একটা নয়। অনেক আছে। কিন্তু সে পথের দরজা যারা খুলতে জানত, তারা তো বেঁচে নেই কেউ!
“মানে!
“ঐ উত্তর-পশ্চিমে যে খাড়াই পাহাড়টা দেখছেন, তার ঠিক পিছনে পাহাড়ের চূড়ার কাছে আছে একটা বনতান্ত্রিকদের পুরনো মঠ। এখন আর সেখানে কেউ থাকে কি না জানি না। আমরা ওদিকটা এড়িয়ে চলি। শুনেছি ওখানে বহু পুরনো সব পুঁথি রয়েছে। তার মধ্যে আছে সিরিঞ্জুদের কথা। সেখানে থাকতে পারে ঝেংঝুংয়ের পাতালপুরীর রাস্তা। বহুকাল আগে এক বৃদ্ধ লামা একথা বলেছিলেন আমাকে। তবে সত্যি-মিথ্যা যাচাই করার কথা ভাবিনি কোনও দিন। আসলে এই জগতের যা কিছু আমরা দেখি, তার সবটাই তো আর সত্যি নয়। আবার সব সত্যি জিনিসও আমরা উপলব্ধি করতে পারি না।
“বাস্তব বুদ্ধিতে অনেক কিছুই হেসে উড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু আধুনিক সভ্যতা থেকে হাজার মাইল দূরে সেই শুষ্ক আধিভৌতিক প্রকৃতির মধ্যে বসে যেন সবকথাই সত্যি বলে মনে হচ্ছিল। ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছিল রহস্য। আকর্ষণও বাড়ছিল ক্রমশ পাল্লা দিয়ে। সিরিঞ্জুরা কেন তুলে নিয়ে যাবে ওলি আর পেত্রোভিচকে? কেউ বলছে রাক্ষস বা শয়তানের বাস, কেউ বলছে আদিম যুগের কোনও প্রাণী, আবার কেউ বলছে বন উপজাতি আর অজানা জগতের কোনও জীবের কথা। ভেবে দেখলাম, এই রাক্ষসতালের ভৌগোলিক অবস্থান, পৌরাণিক গল্প ও স্থানীয় উপকথায় এমন কিছু ইঙ্গিত রয়েছে, যে সন্দেহ হয় এসবের পিছনে হয়তো সত্যিই আছে কোনও অদৃশ্য শক্তির অঙ্গুলিহেলন। আমরা সবাই মিলে ঠিক করলাম, উত্তরপশ্চিম কোণে যে বড়ো পাহাড়টি রয়েছে সেটির পিছনে বৌদ্ধমঠে গিয়ে খোঁজ করা হবে। দেখতে হবে রাক্ষসতালের গোপন কোনও পুঁথি আছে কি না।
“রিকের শরীরটা সমাধিস্থ করে পরের দিন সকালেই তল্পিতল্পা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম তিনজনে। প্রায় আড়াই দিন লাগল ডাকাতদের ঘাঁটি থেকে মঠে পৌঁছাতে। শুকনো পাহাড়ের গা বেয়ে ঘুরে ঘুরে উঠেছে একটি সরু পায়ে চলা পথ। জনমানবের দেখা নেই কোথাও। রাতের দিকে এত ঠাণ্ডা পড়ছে যে না ঘুমিয়েই কেটে গেল দু’রাত। পায়ের নিচে বরফ। শরীর আর চলছে না। শেষের দিকে প্রায় টিকটিকির মতো ঝুলে ঝুলে উঠতে হল কোমরে দড়ি বেঁধে। সত্যিই দুর্গম! দূর থেকে দেখা গেল, পাহাড়ের গায়ে যেন আঠা দিয়ে আটকে আছে একটি রঙিন দেশলাই বাক্স।
“ভাবছিলাম এরকম দুর্গম স্থানে মঠ বানানোর প্রয়োজন কী ছিল? উত্তরটা পেলাম মঠে পৌঁছে। পাহাড় কেটে গুম্ফাটা তৈরি করা হয়েছে। নির্মাতারা নিশ্চয়ই চেয়েছিল সভ্য পৃথিবীর আলো যেন এখানে এসে না পৌঁছায়। আর বনতান্ত্রিকরা জনমানব থেকে দূরেই সাধনা করেন বলে শুনেছি। লোকজন এখানে নেই। তবে বেশ কিছু রূপালি মূর্তি আর অলঙ্কার চোখে পড়ল।
“জন মন্তব্য করল, তিব্বতি ডাকতদের দলটা এত কাছে থাকা সত্ত্বেও এত মূল্যবান জিনিসগুলি অক্ষত রয়েছে কী করে?
“আমি বললাম, এরা সবাই ধর্মভীরু। ধর্মীয় স্থানে চুরি করে মরার পর নরকে যেতে রাজি নয়।
“ম্যাথু মাথা নেড়ে আমাকে সমর্থন করে মন্তব্য করল, সেটা ঠিক কথা। কিন্তু মঠে কি কেউ থাকে না? কেমন যেন ভূতুড়ে লাগছে!
“আমি বললাম, এমনও হতে পারে, যিনি এই মঠের দায়িত্বে আছেন তিনি হয়তো কোনও প্রয়োজনে গেছেন বাইরে।
“একটা ভাঁড়ার ঘরও খুঁজে পেলাম আমরা। সেখানে যথেষ্ট পরিমাণ চাল-ডালসহ রান্নার সমস্ত সরঞ্জাম মজুত ছিল। অতএব কিছুদিন খাওয়ার চিন্তা করতে হল না এখানে। আর পাওয়া গেল মঠের লাইব্রেরিটা। প্রায় দুশো-আড়াইশো পুঁথি লাল শালুতে জড়িয়ে পরপর রাখা আছে এক পাথরের কুলুঙ্গিতে। একটা একটা করে খুলে দেখতে শুরু করলাম আমরা। কাজটা বেশ সময়সাপেক্ষ।
“কাগজ জিনিসটা প্রথম তৈরি হয়েছিল চিনে। এগুলি সবই সেই প্রাচীন পদ্ধতিতে হাতে তৈরি মোটা কাগজের উপর কালো কালি দিয়ে লেখা পুঁথি। বেশিরভাগই এত পুরনো যে হাত দিলেই মুচমুচ করে ছেড়ে যাচ্ছে পাঁপড়ভাজার মতো। তাই সাবধানে ওলটাতে হচ্ছে পাতাগুলি। তবে সবই সংস্কৃত ভাষায় লেখা। পড়ছিলাম বটে, কিন্তু শব্দকোষ ছাড়া এই ধরনের দুরূহ প্রাচীন শব্দের অর্থ উদ্ধার করা একপ্রকার অসম্ভব।
“জন ধৈর্য হারিয়ে মন্তব্য করল, এত বইয়ের মধ্যে সঠিক পুঁথি খুঁজে বের করা খড়ের গাদায় সূচ খোঁজার থেকেও ভয়ংকর কঠিন।
“আমি জানালাম, কিছু শব্দের মানে বুঝে যা মনে হচ্ছে বেশিরভাগ বইই ধর্মীয় উপাসনা ও তন্ত্রবিদ্যার উপর।
“ম্যাথু মাথা নেড়ে বলল, তাও চেষ্টা তো করতেই হবে। এতদূর এলাম এত কষ্ট সহ্য করে। পেত্রোভিচ আর ওলিকে উদ্ধার করার জন্য যা করার আছে করব। এর শেষ দেখে ছাড়ব।
“বললাম, তার জন্য প্রয়োজন অসীম ধৈর্যের।
“জনমানবহীন নিভৃত দুর্গম মঠে কেটে গেল তিনদিন। এই বাহাত্তর ঘণ্টা আমরা তিনজনে পালা করে জেগে পাহারা দিয়েছি। আমার বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে অজানা রহস্যময় পুঁথিগুলি ঘেটে। একটা ক্যাটালগ বানালাম। বইগুলি নম্বর দিয়ে কোনটা কী বিষয় সেগুলি নোট করলাম খাতায়। বহু শতাব্দীর পুরনো পুঁথিগুলি যেন জীবন্ত মানুষের হাতের স্পর্শ পেয়ে উষ্ণ রক্তের ছোঁয়ায় চঞ্চল হয়ে উঠছিল। যেন কতকিছু বলার ছিল তাদের। জানানোর ছিল কত গভীর গোপন রহস্য। কিন্তু খটোমটো ভাষার জন্য তারা ঠিকমতো সংযোগ তৈরি করতে পারছিল না আমাদের সাথে। সে যন্ত্রণা যতটা আমি উপলব্ধি করেছি, তার থেকেও বেশি হয়তো সেই নির্জীব নিষ্প্রাণ পুঁথিগুলি করেছে।
“রাতে শিউরে উঠেছি ঘুমের মধ্যে। মোটা গাঁদের মতো চর্বির পিলসুজে প্রজ্বলিত হলুদ আলোয় অচেনা পৃথিবীর অলীক অস্তিত্ব যেন আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। মনে হচ্ছিল আমাদের চারপাশে হয়তো আরও অনেক প্রাণ আছে। মানুষের ভোঁতা ইন্দ্রিয় দিয়ে তাদের পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। সেই নির্জন মঠে দমকা এক ঝলক হাওয়া অচেনা ভাষায় কানে কানে বলে যেত কতকিছু! দেয়ালের রঙিন কিম্ভূতকিমাকার তৈলচিত্রগুলি সারারাত জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত আমাদের দিকে। কতবার চমকে উঠেছি ভয়ে।
“অনেক পরিশ্রমের পর শেষে হাতে এল একটি পুঁথি। সেখানে শ্লোকের মাধ্যমে একটি ঘটনার বর্ণনা দেওয়া আছে। ‘বহুযুগ আগে এই জনগোষ্ঠী পৃথিবীর উপরিভাগ ছেড়ে প্রবেশ করছিল গভীরে। সেখানে খুঁজে পেয়েছিল তারা অনন্ত মুক্তি আর শান্তির পথ। সিরিঞ্জুরা হল ধরিত্রীর আদিম সন্তান। অনন্তকাল আগে দু’পেয়ে মানুষরা এসেছিল মহাকাশ থেকে। ক্রমে তারাই উপরতলার পৃথিবীর অধীশ্বর হয়ে ওঠে। পৃথিবীর পেটের ভিতর রয়েছে আরও অনেক সভ্যতা। যার খবর উপরের দুনিয়ার মানুষ জানে না। তারা মানুষের চেতনায় ধরা দেয় না কখনও। আমারা খুঁজে পেয়েছি সেখানে যাবার রাস্তা…’
“এটুকুই পড়া গেল। তার পরের লাইনগুলি এতই অস্পষ্ট আর পাতা এত ভঙ্গুর যে পাঠোদ্ধার করা সম্ভব ছিল না। বেশ কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে বসে থাকার পর ম্যাথু বলল, কিন্তু সেখানে যাবার রাস্তার কথা তো কিছু বলা নেই!
“জনের বয়েস আমাদের মধ্যে সবচেয়ে কম। সমানুপাতিক তার ধৈর্যও। বিরক্তি ঝরে পড়ল তার আচরণে। একটা জপযন্ত্র নিয়ে এই তিনদিন ধরে আপন মনে ঘোরাচ্ছিল সে। দুম করে জিনিসটা ছুড়ে মারল দেয়ালে। ধাতব শব্দ করে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল সেটা মেঝেতে। বলল, এত পরিশ্রম আর সময় নষ্টের পরেও যদি রাস্তা না পাওয়া যায় তাহলে বসে থেকে লাভ কী? দেশে ফিরে যাই চলো।
“ম্যাথু গলা উঁচিয়ে মন্তব্য করল, মাথা ঠাণ্ডা করো জন। দেশে ফিরে স্বজাতিকে মুখ দেখাতে পারবে তো? ইংরেজরা তো বীরের জাত। রিক নিজের প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করেছে সেটা। তুমি, প্রফেসর আর ওলিকে অন্ধকার পৃথিবীতে ফেলে রেখে চলে যাবে! কথাটা ভাবছ কী করে?
“সে মাথা নেড়ে চোখ লাল করে বলল, আমরা সবাই মরব এক এক করে। মিশ্রজি আমাকে বলেছেন, এ আদিম শয়তানের গোলকধাঁধা। এখানে ঢোকার রাস্তা আছে, বেরোনোর নেই।
“চুপ করো তুমি! অশিক্ষিত লোকেদের মতো কথা বলতে লজ্জা করে না? তুমি না একজন প্রথম বিশ্বের নাগরিক!
“আমি দেখলাম, কথার পারদ উত্তরোত্তর চড়ছে। ওদের এখুনি থামানো প্রয়োজন। নইলে শেষে হাতাহাতি পর্যন্ত গড়াবে। বলা বাহুল্য, দু’জনেই গরম মস্তিষ্কের অধিকারী। ম্যাথুকে থামিয়ে বললাম, ও যদি যেতে চায় যাক। তুমি আর আমি এই অভিযানের শেষপর্যন্ত আছি। পিছুটান আমার নেই। যদি মৃত্যু আসে তাও আচ্ছা।
“জনের মাথা কিছুটা ঠাণ্ডা হতে বলল, আমার কিন্তু মনে হয় পরের ধাপে এই অভিযানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো লোকজন আমাদের দলে নেই। আপাতত দেশে ফেরাই ভালো।
“ম্যাথু জানাল, তুমি তাহলে কালকে নিজের ব্যাগ গুছিয়ে দেশের রাস্তা দেখো।
“কথাটা শুনে গুম খেয়ে গেল জন। সে বুঝল, ম্যাথু তাকে কথার প্যাঁচে কোণঠাসা করছে।
“পিঠে ব্যাগ বেঁধে আমরা যখন মঠের প্রশস্ত উঠোন পেরিয়ে চলে আসছি আচমকা প্রচণ্ড গতিতে ঝড়ো হাওয়া শুরু হল। মনে হল আমাদের পোকামাকড়ের মতো উড়িয়ে নিয়ে যাবে সেই ঝড়। আর যে রাস্তা বেয়ে উঠে এসেছি আমরা সেই রাস্তায় এই দুর্যোগ মাথায় নিয়ে ফেরা অসম্ভব। বাধ্য হয়ে আবার ফিরে এলাম মঠে। শুরু হল প্রতীক্ষা। আর সেই রাতেই ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা।
“সূর্য ডোবার পর ঝড় থামল বটে, কিন্তু অন্ধকারে এই রাস্তায় পা বাড়ানো মানে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। অগত্যা রাতটা কাটিয়ে পরের দিন সকালে ফেরার পথ ধরা স্থির করলাম। জ্বলন্ত ঘন চর্বির পিলসুজের পাশে বসে আমরা তিনজনে গল্প করছি। চারপাশে ছড়িয়ে আছে একটা কড়া ধূপের গন্ধ। ওখানে যে ক’দিন ছিলাম নিয়ম করে ধূপ জ্বেলে দিতাম প্রধান বুদ্ধমূর্তির সামনে। একটা বাক্সে জমা করা ছিল এরকম হাতে তৈরি গোছা গোছা ধূপ।
“হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে ভূতের মতো হাজির হলেন এক লামা। প্রথমে চমকে উঠেছিলাম। তিনিও অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন আমাদের দিকে। লক্ষ করলাম, সাধারণ মানুষের তুলনায় তিনি বেশ খর্বকায়। মাথা নেড়া। এমন কী ভ্রূ যুগলও লোমহীন। গায়ের রঙ উজ্জ্বল ফর্সা। চকচকে ত্বক। লাল রঙের একথান কাপড় পরনে। চোখের দিকে তাকানো মাত্রই একটা ভয়মিশ্রিত ভক্তি জেগে ওঠে। আমি মাথা নিচু করে প্রণাম করে তাঁকে জানালাম আমাদের এখানে আসার কারণ। দেখলাম হিন্দি বা ইংরাজি ভাষা তিনি কিছুই বুঝতে পারলেন না। শেষে আমি ভাঙা ভাঙা সংস্কৃত ভাষায় কথা বলতে তাঁর চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। গ্রামের পণ্ডিতমশাইয়ের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল তখন। যাঁর কাছে ছোটোবেলা বেতের বাড়ি খেয়েছিলাম সংস্কৃত শেখার জন্য।
“ধীরে ধীরে সবকথা বুঝিয়ে বললাম তাঁকে। ওঁর মুখমণ্ডল এক রহস্যময় হাসিতে ভরে গেল। তারপর সংস্কৃতেই ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন, তোমরা যে জিনিস খুঁজতে বেরিয়েছ তা সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ যেন পিঁপড়ের দল উইয়ের ঢিপির বদলে হিমালয় জয় করার জন্য বেরিয়েছে। বিশ্বসংসারের যতটুকু জ্ঞান মানুষের মস্তিষ্ক ধারণ করতে পারে তার তুলনায় এই রহস্য সহস্রগুণ বড়ো। তোমাদের দেহের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা এ-জিনিস উপলব্ধি করা হাস্যকর। মহাবিশ্বের অনেকগুলি স্তরের মধ্যে সব থেকে উপরের স্তরে বিচরণ করছে মানুষ। সেই স্তর ভেদ করে অন্য স্তরগুলিতে উঁকি মারা সম্ভব নয়।
“কিছুক্ষণ থেমে তিনি আবার বললেন, ফিরে যাও তোমরা। তাতেই তোমাদের মঙ্গল।
“আধো অন্ধকারের মধ্যে মৃদু হলুদ আলোয় আমি তাকিয়ে রইলাম সেই সন্ন্যাসীর চোখের দিকে। অদ্ভুত একটা দ্যুতি আছে সেই চোখে। মন বলছিল কোনও সাধারণ মানুষ নন তিনি। মনে হচ্ছিল এমন অনেক কিছু জানেন যে প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য আমরা ছুটে এসেছি এতদূর। জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি জানেন হিমালয়ের ভিতরে যাওয়ার রাস্তা?
“তিনি প্রথমে উপরনিচে মাথা নাড়লেন। তারপর একটু থেমে আবার দু’পাশে। অর্থাৎ হ্যাঁ, তিনি সেই রাস্তা জানেন। আর না, সেকথা বলা বারণ। পুনরায় প্রশ্ন করলাম, কেন?
“যারা গেছে সেখানে, ফেরেনি কোনও দিন। সে এক অনন্তযাত্রা। মানুষের একটা জীবনে শেষ হবে না।
“আমরা নাছোড়বান্দা। আমাদের দুই সাথী হয়তো আটকে আছে সেখানে। তাদের বাঁচাতে আমাদের যেতেই হবে। অভীষ্ট রহস্যের সিংহদুয়ারে দাঁড়িয়ে ভিতরে প্রবেশ না করেই ফিরে যাব! কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না মনে মনে। কিন্তু তিনিও কোনওভাবেই মুখ খুলবেন না। হঠাৎ কী মনে হল, পিঠের ব্যাগ থেকে বের করলাম মুন্সিয়ারির পূজারির কাছ থেকে পাওয়া সেই চৌকো ধাতব বস্তুটি। হাতের তেলোয় রাখতেই তিনি চমকে উঠলেন সেটা দেখে। আমরাও চমকে উঠেছি। কারণ, মঠের অন্ধকার ঘরে সেই সাদা চৌকো পাথরটি থেকে একটা অদ্ভুত ধোঁয়া বেরিয়ে পাক খেতে খেতে মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে।
“প্রশ্ন করলেন, কোথায় পেলে এটা?
“আমি বিস্তারিত বললাম আমার বাবার কথা। শুনে কিছুক্ষণ গুম খেয়ে থেকে বললেন, যেদিন পূর্ণচন্দ্র থাকবে রাতের আকাশে, সেই সময়ে রাক্ষসতালের উত্তরদিকের জল নেমে গিয়ে খুলে যাবে সেই গুহামুখ। তখন হাতের উপর এই বস্তুটি ধারণ করলে রূপালি জ্যোৎস্নার আলো তোমাদের পথ দেখাবে। তবে মনে রেখ, বিপদের সময়ে সেখানে তোমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয় কোনও কাজে আসবে না। আশীর্বাদ করলাম সব বাধা কাটিয়ে তোমরা গভীরে যাবে।
“এরপর পিছন ফিরে আবার মিলিয়ে গেলেন অন্ধকারে। আমরা সম্মোহিতের মতো বসে রইলাম অনেকক্ষণ।
“পরের দিন ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে আমরা ফেরার পথ ধরলাম। মঠের বাইরে আসতে দেখলাম আকাশ তখন ঝকঝকে, ঘন নীল। নতুন আশার আলোয় আমাদের মনে ফুর্তির বাতাস।
“জন শেষপর্যন্ত আমাদের সঙ্গ ছেড়ে যায়নি। তিনজনে মিলে আবার ফিরে এলাম পুরনো সেই জায়গায়। রাক্ষসতালের উত্তরে হ্রদটা যেখানে সরু হয়ে গেছে, সেখানেই তাঁবু ফেলে শুরু হল প্রতীক্ষা। দুটি দক্ষিণমুখী বরফগলা জলের স্রোত এসে মিশেছে হ্রদের সাথে। পূর্ণিমা আসতে তখনও কয়েকদিন বাকি। যাযাবরদের থেকে খাবার আর প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে মজুত করলাম। যে আদিম রহস্যময় পথে এগোতে চলেছি সে রাস্তা যে খুব সাধারণ নয়, টের পাচ্ছিলাম ভালোরকম। ধু ধু উন্মুক্ত উপল বিস্তৃত হ্রদের প্রান্তে চিত হয়ে পাথরের উপর শুয়ে আকাশের বিক্ষিপ্ত পেঁজা তুলোর মতো মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকতাম সারাদিন।
“কিন্তু ভাগ্য যেন খুব মজা পাচ্ছিল আমাদের নিয়ে জাগলিং খেলতে। সেই অনাবিল আনন্দ বেশিদিন ভোগ করতে হল না আমাদের। সদাপ্রসন্ন নীল আকাশ ঢেকে গেল ঘন মেঘের আড়ালে। শুরু হল ভয়ংকর দুর্যোগ! অঝোর ধারায় বৃষ্টি। তারপর তুষারপাত। প্রথমে চারপাশ ভরে গেল সাদা মোমের মতো গুঁড়ো বরফে। ঝড়ের সাথে তুষারপাতের পরিমাণও বাড়তে লাগল হু হু করে। রাতে তাঁবুর বাইরে যে আগুন জ্বলছিল, নিভে গেল সেটা। আমরা ভিতরে বসে ঠকঠক করে কাঁপছি ঠাণ্ডায়। এদিকে চারপাশে জমা বরফ উঁচু হতে হতে ছাড়িয়ে গেল আমাদের মাথা। তাঁবুর দেয়ালগুলি বরফের চাপে বেঁকে যেতে শুরু করেছে।
“ম্যাথু বলল, হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে আমরা বরফচাপা পড়ে মারা যাব।
“মাইনাস কত ডিগ্রি তাপমাত্রা তার কোনও আন্দাজ নেই তখন। সমস্তরকম শীতের পোশাক গায়ে চড়িয়ে বেরোলাম বাইরে। তারপর শুরু হল প্রকৃতির সাথে অমানুষিক লড়াই। অন্ধকারের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম আমরা। টেন্টের চারপাশের বরফগুলি সরাচ্ছিলাম পাগলের মতো। কিন্তু আমাদের শীতল সমাধি দেওয়ার জন্য আকাশ থেকে অদৃশ্য শত্রুপক্ষ যেন টন টন বরফ ঢেলে দিচ্ছিল আমাদের গায়ে। বিনিদ্র সারারাত কাটল। দিনের সূর্য ওঠার পর ধীরে ধীরে বন্ধ হল তুষারপাত। দেখলাম, কোথায় হ্রদ! যতদূর চোখ যাচ্ছে ধু ধু সাদা বরফে মোড়া প্রান্তর। বরফের নিচে চাপা পড়েছে রাক্ষসতাল।
“পরের প্রায় সারাদিন তাঁবুর মধ্যে আমাদের ঘুমিয়ে কাটল। শরীর আর টেনে তোলার ক্ষমতা ছিল না আমাদের। সূর্য ডোবার আগে আমি খিচুড়ি তৈরি করে ডাকলাম বাকি দু’জনকে। খাওয়ার পর ম্যাথু একটু ঘুরতে গিয়েছিল বাইরে। হঠাৎ দৌড়াতে দৌড়াতে এসে আমাদের জোর করে টানতে টানতে নিয়ে চলল।
“এগুলি কী! উদ্বেগ আর বিস্ময় দুটোই ফুটে বেরচ্ছিল ওর গলা দিয়ে। দেখলাম, সাত-আট ইঞ্চি লম্বা চ্যাটালো জোড়ায় জোড়ায় পায়ের ছাপ পড়েছে ঝুরো বরফের উপর এবং সেটা হয়েছে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। বিস্ময়ের সেখানেই শেষ নয়। হাঁটু মুড়ে বসে আমরা অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ করে বুঝলাম, প্রাণীগুলি হ্রদের দিক থেকে এসে আমাদের তাঁবুর চারপাশে দু-তিন বার পাক দিয়েছে। আবার ফিরে গেছে সেইদিকে। তখন আমরা সবাই ঘুমাচ্ছিলাম বেঘোরে।
“ম্যাথু চিন্তিত গলায় মন্তব্য করল, “পায়ের ছাপ দেখে প্রাণীটির আকার ও অন্যান্য খুঁটিনাটি যিনি বলতে পারতেন তিনি ডঃ পেত্রোভিচ। কিন্তু আমরা তো ও-বিষয়ে তেমন দক্ষ নই।
“আমি বললাম, তবে তিব্বতি উপকথা থেকে উঠে আসা সিরিঞ্জুদের অস্তিত্ব যে অলীক নয় সে বিষয়ে একটা প্রত্যক্ষ প্রমাণ তো পাওয়া গেল!
“তবে জনের কথাটা নাড়িয়ে দিল আমাদের, ডঃ পেত্রোভিচ আর ওলি নিখোঁজ হয়েছেন পাক্কা পনেরো দিন হতে চলল। এতদিনে কি তারা জীবিত আছে বলে মনে হয় তোমাদের?
“আমাদের নিরবতা লক্ষ করে সে আবার খোঁচাল, এই অবস্থায় আমদের জীবনের ঝুঁকিটা বড্ড বেশি হয়ে যাচ্ছে নাকি?
“তোমাকে তো আগেও বলেছি, জন। আবারও বলছি, ফিরে যাও। পথে যাযাবরদের কাছে ঘোড়াও পেয়ে যেতে পার। কথাটা গম্ভীর গলায় জানিয়ে ম্যাথু হনহন করে হাঁটা দিল হ্রদের দিকে।”
এতটা বলার পর কেন জানি চুপ করে গেলেন জীবনবাবু। তাঁর কথা শুনতে শুনতে আমরা নিজেরাও কখন যে পৌঁছে গেছি রাক্ষসতালে, টের পাইনি। তবে পিলসুজের আলোয় লক্ষ করলাম, ওঁর চোখেমুখে একটা আতঙ্ক ফুটে উঠেছে। মুখটা কুঁচকে যাচ্ছে ক্রমশ। মনে হল সেই স্মৃতিগুলি মনে পড়তে হয়তো ভিতরের অভিব্যক্তিটা বেরিয়ে আসছে। চোখের পাতাগুলি ধীরে ধীরে বন্ধ হল। হাঁটুর উপর থুতনি রেখে বসে রইলেন তিনি।
কিছুক্ষণ পর কল্লোল নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রশ্ন করল, “বলুন! কী হল তারপর?”
একটা বড়ো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জীবনবাবু আবার মুখ খুললেন। “সেই রাতে ঝলসে যাচ্ছিল আমাদের চোখ। দিগ্বিদিক ভাসিয়ে দিয়ে রূপালি আলোর যেন বৃষ্টি নামছিল আকাশের গা থেকে। আকাশে এত বড়ো চাঁদ আমি দেখিনি কোনও দিন। হাত বাড়ালেই যেন ছোঁয়া যাবে চাঁদের গায়ের কলঙ্কগুলি। কিন্তু রাত গভীর হতেই আবার শুরু হল তুষারপাত। সাদা পেঁজা তুলোর মতো গুঁড়ো গুঁড়ো বরফ নেমে আসতে শুরু করল আকাশ থেকে। হু হু করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আগের দিনের মতো হ্রদের পাশে পাথুরে মাটি সাদা হয়ে গেল বরফের চাদরে। আমরা আগে থেকেই হ্রদের উত্তরদিকে ঘাঁটি গেড়ে ছিলাম। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখলাম, সেই লামাজীর কথামতো জলস্তর নেমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। তখন হাতের তেলোর উপর চৌকো বস্তুটি রাখতেই তার থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী বেরিয়ে দিক নির্দেশ করল আমাদের। লক্ষ করলাম, জলস্তর নেমে যেতেই দেখা যাচ্ছে গুহার মুখ। যেটা এতক্ষণ ছিল জলের তলায়।
“আমরা তল্পিতল্পা নিয়ে দৌড় দিলাম সেইদিকে। গুহাটা ইউ আকৃতির। হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশ করলাম আমরা একে একে। প্রথমদিকটা বেশ কষ্ট করে উঠতে হল। পাহাড়ে চড়ার সমস্ত সরঞ্জামই সঙ্গে ছিল। ভিতরে ঢুকে অন্ধকার গুহাপথে শুরু হল যাত্রা। এঁকে বেঁকে সাপের মতো চলেছে পথ। আমরাও এগোচ্ছি ধৈর্য ধরে। কখনও হামাগুড়ি, কখনও বা মাথা নিচু করে, কখনও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে। বলা বাহুল্য, বেশ কষ্টসাধ্য সে রাস্তা। মাঝে আবার পাহাড়ের ফাটল রয়েছে কয়েকটা। সেখানে দড়িতে ঝুলে ঝুলে পেরোতে হচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম, আমরা নামছি নিচের দিকে।
“টানা দু’দিন পর শেষপর্যন্ত পৌঁছলাম একটা উন্মুক্ত স্থানে। এটাই সেই বিশাল গুহা। আমার বাবা যেটার কথা বলেছিলেন মুন্সিয়ারির পূজারিকে। জমাট অন্ধকার চারপাশে। তবে ঠাণ্ডা একেবারেই নেই। শীতের সমস্ত পোশাক খুলে ফেলতে হল আমাদের।
“ম্যাথু কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে মন্তব্য করল, এই গুহার অবস্থান মনে হয় রাক্ষসতালের ঠিক নিচে।
“আমি মাথা নাড়লাম, ঠিক তাই! সম্ভবত একটা কড়াইয়ের আকৃতির মোটা শক্ত গ্রানাইট পাথরের স্ল্যাব জল থেকে আলাদা করে রেখেছে এই গুহাকে। প্রকৃতির অভাবনীয় বিস্ময়। আর মাটির নিচে বলেই বেশ উষ্ণ এখানের পরিবেশ।
“ভিতরের ছোটো ছোটো গুহাগুলিতে যে কোনও প্রাণীরা এক সময়ে বাস করত সে চিহ্ন পেলাম আমরা। বেশ কিছু গুহাচিত্র, অচেনা ভাষায় আঁকিবুঁকি রয়েছে। খুঁজে পেলাম একটা কবরস্থান। সেখানে মানুষের পাশাপাশি আদিম বানরশ্রেণীর প্রাণীর হাড়গোড় আবিষ্কার করলাম আমরা। তারপর মাপজোখ করে একটা ম্যাপ তৈরি করলাম জায়গাটার। পুরো এলাকাটা ডিম্বাকৃতির মতো। লম্বায় পাঁচশো মিটার ও চওড়ায় প্রায় তিনশো মিটার। মাঝে চার জায়গায় গুহার উচ্চতা কমে ছাদ ও মেঝে জুড়ে গেছে। উপরে রাক্ষসতালের সাথে যে পাথরের স্ল্যাবটা ভাগ করে রেখেছে এই গুহাকে, তাতে প্রায় স্বচ্ছ কয়েকটা পাথর রয়েছে। ফলে উপরে যখন সূর্য ওঠে, জলের মধ্যে দিয়ে ও ঐ স্বচ্ছ পাথরগুলি ভেদ করে মৃদু আলো এসে পড়ে এখানে। অক্সিজেনযুক্ত বাতাস আসা যাওয়া করার জন্য নিশ্চয়ই অন্য কোনও রাস্তা আছে।
“ম্যাথু উত্তেজিত হয়ে বলল, পৃথিবীর মানচিত্রে এটা একটা বড়ো আবিষ্কার। ডঃ পেত্রোভিচ যে মিসিং লিঙ্কের কথা বলেছিলেন, এরাই সেই গুহামানব।
“জনের হাতে ধরা একটা মোটা হাড়ের টুকরো। এতদিন পর ওর চোখেমুখে একটা আনন্দের ছাপ ধরা পড়ল স্পষ্টতই। বলল, অনেক আগে হয়তো এখানে গুহামানবরাই থাকত, বুঝলে। তারা মারা যাবার পরে কোনও তিব্বতি দল এই স্থানের খোঁজ পেয়ে এখানে এসে বসতি তৈরি করে।
“কিন্তু এখানে কোনও জীবিত প্রাণীর চিহ্ন নেই কেন? ডঃ পেত্রোভিচ আর ওলিই বা গেল কোথায়?
“ম্যাথু মন্তব্য করল, আমার মনে হয় আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজন।
“বললাম, একটা জলাধারের কথা বলেছিলেন আমার বাবা। চলো, পশ্চিমদিকটা দেখা যাক।
“সেখানে গিয়ে দেখলাম জল শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে। অর্থাৎ জীবিত প্রাণী থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ, জীবিত প্রাণী থাকলে পানীয় জল তো নিশ্চয়ই লাগবে। তবে তিনি যে পাথরের সমাধির কথা বলেছিলেন, সেটা খুঁজে পেলাম আমরা। এখনও শোয়ানো আছে সেই কঙ্কাল। পাথরের ঢাকনাটি খোলা পড়ে রয়েছে পাশে। জন খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে বলল, এখানে কিছু লেখা রয়েছে দেখো! ছবির মাধ্যমে।
“দেখলাম বাদামি পাথরের গায়ে মেঘ, সূর্য, চৌকো ঘর, আরও নানারকম ছবি। জন আবার বলল, এর মাথামুণ্ডু তো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আমাদের জানা কোনও ভাষার সাথে এর মিল নেই।
“বলতে বাধ্য হলাম, এত সহজে তো বোঝা যাবার কথাও নয়। সেই আদিম প্রাণী বা মানুষ যারা এখানে বাস করত, তাদের আর আমাদের চিন্তাভাবনা তো এক নয়। তাই সাংকেতিক ভাষা উদ্ধার করতে সময় লাগবে। ঐতিহাসিকদের সারাজীবন লেগে যায় প্রাচীন ভাষা বুঝতে।
“হাঁটতে হাঁটতে আমরা এগোলাম গুহার অন্যদিকে। এখানেও কিছু গুহাচিত্র রয়েছে। সেখানে রেখার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে প্রাণীর ছবি, শিকারের ছবি প্রভৃতি। তার মানে এরা উপরের পৃথিবী থেকে শিকার ধরে আনত।
“ম্যাথু কী একটা ভাবছিল অনেকক্ষণ ধরে। প্রশ্ন করতে বলল, এটাও একটা মরীচিকা, বুঝলে! ক’দিন আগে যে জীবিত প্রাণীগুলির পায়ের ছাপ দেখলাম আমরা, তারা গেল কোথায়? তবে কি আমরা অন্য কোনও গুহায় ঢুকে পড়লাম?
“বললাম, বনতান্ত্রিকের একটা কথা মনে পড়ছে আমার। তিনি বলেছিলেন নিচের পৃথিবীতে অনেকগুলি স্তর। তার মানে ঐ প্রাণীগুলি হয়তো অন্য কোনও স্তরে থাকে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পথটা কোথায়?
“তারপরেই কানে এল একটা চিৎকার। গুহার উলটোদিক থেকে। জনের গলা। টর্চ জ্বেলে আমরা দৌড়ালাম সেদিকে। কিন্তু চিৎকারটা একবার হয়েই বন্ধ হয়ে গেল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও জনকে পাওয়া গেল না।
“ম্যাথু বলল, শেষ ওকে দেখা গিয়েছিল সমাধি-গুহার দিকে যেতে।
“দৌড়ে গুহাটিতে ঢুকতেই প্রথম চোখ গেল জনের পিঠে বাঁধা ব্যাগের দিকে। সমাধির খোপের পাশেই রাখা ছিল সেটা। কিন্তু সেখানে একটু আগে যে কঙ্কালটি শোয়ানো ছিল, তার আর কোনও চিহ্ন নেই। আশ্চর্য! কোথায় গেল? সেই জায়গাতেই পা দিয়ে একটা জোরে ধাক্কা দিল ম্যাথু। সঙ্গে সঙ্গে পাথরের ঢাকনাটা সরে গেল। আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই দুলে এসে এঁটে গেল মুখ। আমার মুখ দিয়ে বের হল, এটা একটা আদিম লিভার। জন হয়তো ওখানে উঠে দাঁড়িয়েছিল আর ঢাকনাটা সরে গিয়ে নিচে পড়ে গেছে।
“আমরা আবার সেটাকে সরিয়ে মুখে একটা শক্ত কাঠের টুকরো বসিয়ে দিলাম। ফলে দুলে এসে আর বন্ধ হতে পারল না। আটকে গেল। এরপর লম্বা দড়ি কোমরে বেঁধে নিচে নেমে গেলাম। আমার পরে নামল ম্যাথু।
“প্রায় পনেরো ফুট নিচে পায়ের তলায় ঠেকল পাথর। কিন্তু সেটাও প্রচণ্ড ঢালু। ফলে গড়িয়ে গড়িয়ে নামতে লাগলাম। খেয়াল হল এতক্ষণে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। ম্যাথুরও একই অবস্থা। অবশ্য তার জন্য আমরা আগে থেকেই তৈরি হয়ে এসেছিলাম। দু’জনেরই পিঠের ব্যাগ থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডারযুক্ত মাস্ক বার করে লাগিয়ে নিলাম নাকে। কিন্তু জানি এর আয়ু চব্বিশ ঘণ্টার বেশি নয়।
“ঐ তো পড়ে আছে জন! টর্চের আলো ফেলে চেঁচিয়ে উঠল ম্যাথু।
“উপর থেকে পড়ে গড়িয়ে এসেছে এখানে। আঘাত লাগার কারণে বা অক্সিজেনের অভাবে সংজ্ঞা হারিয়েছে হয়তো। আমি তার গায়ে হাত দিয়ে জানালাম ম্যাথুকে। তার নাকে মাস্ক পরিয়ে একটু পাম্প করতে জ্ঞান ফিরে এল। জল খেয়ে একটু ধাতস্থ হয়ে ভয়ার্ত গলায় জানাল, একটা জ্বলজ্বলে চোখ! উফ্‌ কী ভয়ংকর! অন্ধকারে যেমন নিশাচর প্রাণীদের চোখ জ্বলে, সেরকম।

“আমরা চারপাশে দেখলাম টর্চের আলো ফেলে। অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ল না। ভয়ে বেচারা কথা বলতে পারছিল না বেশি। ম্যাথু চারপাশে টর্চ ঘুরিয়ে বলল, এটাও মনে হয় আর একটা প্রাকৃতিক গুহা। কী আছে এখানে একবার দেখে এলে হয়।
“আমাদের হাতে কিন্তু সময় বেশি নেই। অক্সিজেন শেষ হলেই আমাদের আয়ুও শেষ।
“ও বলল, তোমরা দাঁড়াও এখানে, আমি ঘুরে আসি।
“জন বলল, যেখানে কোনও অক্সিজেন নেই সেখানে প্রাণী বাঁচবে কী করে?
“জলের মধ্যেও তো প্রাণ আছে। তাদের শরীর সেভাবেই তৈরি।
“কথাটা ঠিক। তারপর আমরা সবাই এগোলাম। হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম, এই গুহাতে আগেরটার মতো একলপ্তে খুব বড়ো কোনও জায়গা নেই। একেকটা চারশো-পাঁচশো বর্গফুট ঘরের মতো। কোনওটা ডিম্বাকৃতি, কোনওটা চৌকো, আবার কোনওটা ত্রিভুজাকৃতি। এক বা একাধিক সুড়ঙ্গের সাথে জুড়ে আছে সেগুলি। কোনও কোনওটার উপর আর নিচ দিয়েও বেরিয়েছে সুড়ঙ্গের পথ। হিমালয়ের এত নিচে যে এরকম একটা গোলকধাঁধা রয়েছে, এখানে না এলে জানতেই পারতাম না। বিস্ময়ের এখানেই শেষ নয়। ম্যাথু হঠাৎ মেঝেতে এক জায়গায় টর্চের আলো ফেলে বলল, এগুলো কী?
“কাছে গিয়ে দেখি, সাদা লম্বা লোম। এ যে কোনও পার্থিব জন্তুর সে আর বলে দিতে হয় না। অমসৃণ পাথরের দেয়ালে কোনও প্রাণী গা ঘষেছে নিশ্চয়ই। সেখানেও লেগে আছে। আর তার শরীর থেকেই খসে পড়েছে এই লোমগুলি। মানে সেই জীবন্ত প্রাণী আমাদের কাছাকাছিই আছে। ম্যাথুর নির্দেশে আমাদের হাতে উঠে এল আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রগুলি। প্রাণীটি যত শক্তিশালীই হোক, এই অস্ত্রগুলির সামনে দাঁড়াতে পারবে না আশা করি। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটল একটা দুর্ঘটনা। একটা ভয়ানক চিৎকারের শব্দ কানে এল অন্ধকারের মধ্যে থেকে। আর সঙ্গে সঙ্গে জন গুলি চালিয়ে বসল। গমগমে আওয়াজে কেঁপে উঠল গুহাটা। আর তারপরেই ভেসে এল এক প্রলয়ঙ্কর গর্জন। এটা যে কোনও পার্থিব প্রাণীর হতে পারে, সেটা ছিল আমার ধারণার বাইরে। হাড় হিম করা সেই আওয়াজে আমদের সবারই পিলে চমকে গেল। যেন একটা বিদ্যুৎ বয়ে গেল শিরদাঁড়া দিয়ে। ঝিনঝিন করে উঠল সারা শরীর।
“তারপর হুড়মুড় করে দৌড়। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াতে থাকলাম আমরা। পিছনে তাড়া করে আসছে সেই দৈত্য। একবার শুধু পিছন ফিরে দেখলাম তার জ্বলজ্বলে চোখদুটো। কিন্তু গোলকধাঁধায় তাড়াহুড়ো করে দৌড়াতে গিয়ে ফেরার রাস্তা গেল গুলিয়ে। ঢালু পথে নামতে নামতে কিছুক্ষণ পর যখন খেয়াল হল পিছনে আর কেউ তাড়া করছে না, একটু থিতু হলাম।
“হাঁফাতে হাঁফাতে যেখানে এসে দাঁড়ালাম স্থানটা একেবারে অদ্ভুত। আমাদের মাথার হেলমেটে লাগানো টর্চের আলো চারপাশে পড়তে চমকে উঠলাম। দেখি সাদা সরু সরু গম্বুজের মতো পাথর উঁচু হয়ে আছে চতুর্দিকে। এগুলি কী বস্তু ঠিক বোধগম্য হল না। চুনাপাথর থেকে গড়িয়ে জল টপে টপে হাজার হাজার বছর ধরে এরকম জিনিস তৈরি হয়েছে হয়তো। ম্যাথু তাতে হাত ঘষতে ঘষতে বলল, “রূপোর মতো এত চকচক করছে, পাথর তো নয়। কী ধাতু এটা?
“উপরের দিকে তাকালাম। সেখানেও ছাদ থেকে এরকম তীক্ষ্ণ ফলার মতো সাদা বল্লম নেমেছে অজস্র। পুরোটাই প্রকৃতির নিজস্ব নিপুণ হাতে তৈরি অপার্থিব অলঙ্করণ। সেই গুহার অদ্ভুত সৌন্দর্য আমাদের সমস্তরকম বিপদের কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য। কিন্তু একটি জিনিস আমাদের চোখ টানল। জনই প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল আমাদের। হাঁটতে হাঁটতে আমরা তখন অনেকটা গভীরে চলে এসেছি। আঙুল তুলে জন বলল, কী ওটা?
আলো পড়তেই ঝকমক করে উঠেছে জিনিসগুলি। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম। কয়েকটি সাদা ফলা পেরোতে দেখি সেখানে শুয়ে আছে একটি মুণ্ডুবিহীন কঙ্কাল। আর তার পোশাক-আশাক প্রাচীন যুগের রাজামহারাজাদের মতো। গায়ে সোনার ভারী ভারী গয়না। তলোয়ার, ছোরা, আর বর্শা দেখে বোঝা যায় বেশ কয়েক শতক পুরনো সেই মৃতদেহ। কিন্তু ধড় থেকে মুণ্ডুটি আলাদা হল কীভাবে? আমি বললাম, এই পোশাক আর অলঙ্কার কিন্তু ভারতীয় সভ্যতার নয়। ছবিতে দেখা চৈনিক রাজাদের মতো।
“ম্যাথু উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠল, আরও অনেক আছে। ঐ যে!
“দেখলাম সত্যিই গুহার মাঝ বরাবর এলোমেলোভাবে শুয়ে আছে পর পর অনেক কঙ্কাল। কারও হাত কাটা, কারও পা বা মুণ্ডু।  ম্যাথু মন্তব্য করল, তার মানে এখানে আমরাই প্রথম মানুষ নই। আগে আরও একদল এসেছিল।
“এবং তাদের মৃত্যু যে খুব স্বাভাবিকভাবে হয়নি তা তো বোঝাই যাচ্ছে। জনের গলায় একটা আতঙ্ক মিশে ছিল। আমি আর ম্যাথু নমুনা হিসাবে কয়েকটি জিনিস সংগ্রহ করলাম। জন আবার আমাদের খোঁচা দিল, অক্সিজেন সিলিন্ডার কিন্তু কমে আসছে ধীরে ধীরে। প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবে তো এখান থেকে?
“ম্যাথু কম্পাসটা বের করে কীসব হিসেব করল। তারপর বলল, দ্রাঘিমাংশ আর অক্ষাংশের হিসেবে আমরা এখন রাক্ষসতাল থেকে সরে এসেছি অনেক উত্তরে। পিছনে ফেরার রাস্তা বন্ধ। ওখানে ওত পেতে আছে সিরিঞ্জুরা। গুহাটা পূর্বদিকে সরু হয়ে এসেছে। চলো ঐদিকেই এগোনো যাক।
“আমরা সেইমতোই চলা শুরু করলাম। এদিকে আমাদের ব্যাটারির আলোও কমে আসছিল ধীরে ধীরে। সেই ক্ষীণ আলোয় যা দেখলাম তাতে আমাদের শরীরে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্য। প্রথমে নাকে ধাক্কা মারল একটা পচা গন্ধ! তারপর আমার চোখে পড়ল একটা জুতো। দৌড়ে গেলাম। এটা তো ডঃ পেত্রোভিচের! আর তারপরেই দৃষ্টি গেল তাঁর উপুড় হয়ে পড়ে থাকা শরীরের দিকে। একটা সাদা পাথরের ফলার পাশে পড়ে রয়েছেন। কিন্তু মুণ্ডুটা সম্পূর্ণ উলটোদিকে ঘোরানো। সাদা হয়ে গেছে শরীরটা। ফুলে উঠেছে। চোখদুটো খোবলানো।
“ম্যাথু বসে পড়েছে হাঁটু মুড়ে। চোখের কোণে জল। জন চিৎকার করে কেঁদে উঠল। আমি তখন পাথরের মতো স্থবির। ওরকম একটা সাহসী মানুষের এরকম নৃশংস মৃত্যু কল্পনা করতে কষ্ট হচ্ছে।
“আমাদের সাময়িক বিহ্বলতার সুযোগ নিয়ে অন্ধকারের মধ্যে থেকে একটা প্রাণী নিঃশব্দে ঝাঁপিয়ে পড়ল জনের ঘাড়ে। আমি আর ম্যাথু ছিটকে পড়েছি ততক্ষণে। এক ঝলক দেখলাম প্রাণীটাকে। সারা গায়ে বড়ো বড়ো সাদা লোম। ধারালো নখ। হিংস্র শ্বদন্ত বিঁধিয়ে দিয়েছে জনের ঘাড়ে। তার মুখ দিয়ে একটা ক্ষীণ গোঙানি ছাড়া কিছুই বেরলো না। তারপরেই আরেকটি ঐ একইরকম প্রাণী আক্রমণ করল আগের প্রাণীটিকে। দু’জনের মধ্যে মারামারি লাগল ভীষণরকম।
“ম্যাথু মুহূর্তের মধ্যে ম্যানলিকার রাইফেলটা কাঁধ থেকে নামিয়ে ফায়ার করল। আগুনের ঝলকানির সাথে কানফাটা আওয়াজ। প্রাণীদুটো ছিটকে পড়েছে দূরে। আমি দৌড়ে গেলাম জনের কাছে। তার চোখেমুখে ভয়ংকর আতঙ্ক। শুধু ডানহাতের আঙুল তুলে বলল, ওলি, ওলি!
“আমি ঘুরে তাকিয়ে আর দেখতে পাইনি প্রাণীগুলিকে। কিন্তু একটা ভয়াল চিৎকার কানে এল। কিছুক্ষণ আগে যে আওয়াজ আমরা শুনেছি, এ তার দশগুণ। মনে হচ্ছে কয়েকশো প্রাণী জড়ো হয়েছে গুহার প্রান্তে। তাদের জোড়ায় জোড়ায় জ্বলন্ত চোখ, তাদের সমবেত হুঙ্কার আমাদের শরীরের সমস্ত নার্ভকে অকেজো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে গোটা শরীর। ম্যাথু আমার কাঁধ ধরে প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, দৌড়াও!
দৌড়াতে দৌড়াতে গুহার প্রায় শেষপ্রান্তে এসে পৌঁছেছি। সিরিঞ্জুরাও তাড়া করে আসছে পিছনে। সামনে অন্ধকারের মধ্যে চোখে পড়ল, গুহাটা শেষ হয়েছে। মোটা পাথরের দেয়াল উঠেছে সামনে। ম্যাথু ব্যাগ থেকে বের করল কয়েকটা সকেট বোমা। তিব্বতি ডাকাতের গুহা থেকে সংগ্রহ করেছিল এগুলি। আগুন জ্বেলে ছুড়ে দিল পিছনদিকে। একটার পর একটা। আগুনের গোলার সাথে প্রচণ্ড বিস্ফোরণে পরপর কেঁপে উঠল গুহাটা। উপর থেকে খসে পড়তে লাগল ছাদে আটকে থাকা সূচালো ফলাগুলি। এর মধ্যেই আমাদের পায়ের তলার মাটিটা কেঁপে গেল। হঠাৎ পাথরের স্ল্যাব ভেঙে আমরা পড়ে গেলাম। মুহূর্তের মধ্যে বুকটা যেন শূন্য হয়ে গেল একেবারে। উপর থেকে পড়ছি তো পড়ছিই। বুঝলাম, এবার নিশ্চিত মৃত্যু! তারপরেই একটা চটচটে আঠালো ঘন তরল ছেঁকে ধরল আমাদের। তারপরে দম আটকে গেল আমাদের। মনে নেই আর।”
জীবনবাবু আবার চুপ করলেন। সেই নির্জন তদ্রাচ্ছন্ন ঘরের মায়ায় তখন আমি আর কল্লোল আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছি। তাঁর শব্দের জাদুতে আমরা মোহিত হয়ে আবার প্রশ্ন করলাম, “তারপর?”
ছিলিমে পুনরায় আগুন দিয়ে দুটো টান দিলেন। তারপর শুরু করলেন।
“কতক্ষণ পর চোখ খুলতেই দৃষ্টিটা যেন ঝলসে গেল তীব্র আলোতে। তাকানো যাচ্ছে না। চোখের পাতা বন্ধ করে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। আবার চোখ খুলতে একই অবস্থা। হাতের স্পর্শে মনে হল, একটা ঠাণ্ডা শক্ত মসৃণ মেঝের উপর বসে আছি। মনের সমস্ত উদ্বেগ কাটিয়ে বুকের ধুকপুকুনিটাকে কম করার চেষ্টা করলাম। ধীরে ধীরে শান্ত হল।
“অবাক ব্যাপার! চোখের পাতা বন্ধ, কিন্তু ধীরে ধীরে দেখতে পাচ্ছিলাম চারপাশটা। অথচ চোখ খুললেই আবার ঝলসে যাচ্ছে চোখ। বন্ধ চোখে যেটা খেয়াল হল, মেঝেটা পুরোটাই সাদা। এখনকার দিনে যেমন এলইডি আলো, তেমনই শান্ত অথচ স্থির আলো বেরিয়ে আসছে সেখান থেকে। ওর উপরেই বসে আছি আমি। উপরের আকাশ কুচকুচে কালো। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। দিগন্তও অন্ধকার। আবার চোখের পাতা খুললেই প্রচণ্ড আলোয় যেন অন্ধ হওয়ার জোগাড়। জায়গাটা আমাদের চেনা জগত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
“অনেকক্ষণ ঐভাবে বসে থাকার পর উঠে দাঁড়িয়ে চোখের পাতা বন্ধ রেখেই এগোলাম। ম্যাথুকে পেলাম বেশ কিছুটা দূরে। ও হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে সাদা মেঝেতে। স্পর্শেন্দ্রিয়ও কাজ করছে না। হাত বাড়াচ্ছি ওকে ছোঁয়ার জন্য। কিন্তু হাতে যেন কিছুই ঠেকছে না। অথচ চোখ বন্ধ অবস্থাতেই উপলব্ধি করছি, ওর গায়ে হাত দিলাম, শরীরে প্রাণের সাড়া আছে। নড়ে উঠল। তারপর ওর চোখ খুলতে যেতেই আমার মতো একই অবস্থা। আরও অবাক করা ব্যাপার যেটা আবিষ্কার করলাম, আমাদের কারোর মুখ দিয়েই কোনও শব্দ বের হচ্ছে না। বা বের হলেও অন্যে সেটা শুনতে পাচ্ছে না। মুখ বন্ধ রেখে মনে মনে কথা বললে ও বুঝতেও পারছে, আর উত্তরটাও মনে মনে দিলে আমি বুঝতে পারছি ওর কথা।
“এই ব্যাপারটার সড়গড় হতে বেশ কিছুটা সময় গেল আমাদের। খিদে বা তৃষ্ণা অনুভূত হচ্ছে না একেবারেই। আমরা দু’জনেই বাহ্যিক চোখ বন্ধ রেখে, মনের জানালা খুলে হাঁটতে শুরু করলাম এক সাথে। বেশ বুঝতে পারছিলাম, আমাদের পৃথিবীর সাথে এই জগতের তেমন কোনও মিলই নেই।
“ম্যাথু কিছুক্ষণ পর মনে মনে প্রশ্ন করল, আমরা কোথায়?
“বললাম, জানি না। অচেনা এক জগত।
“সেই গুহার মেঝেটা ভেঙে গেল। তারপর আমরা হুড়মুড় করে পড়তে শুরু করলাম। কিন্তু এখানে এসে পৌঁছলাম কীভাবে জানি না!
“মনে হচ্ছে যেন মাঝের কিছুটা সময় আমাদের মস্তিষ্ক থেকে কেউ মুছে দিয়েছে।
“দু’জনে চোখ বন্ধ করেই হাঁটতে শুরু করলাম। হাঁটছি তো হাঁটছি। কতটা সময় চলে গেল তার কোনও হিসাব নেই। হয়তো সময় বলে কোনও কিছু নেই সেখানে। ক্লান্ত হওয়ারও নেই। যেন মনে হচ্ছিল অনন্তকাল ধরে আমরা হাঁটতে পারি, কোনও সমস্যাই হবে না। কিন্তু কোথায় যাচ্ছি? সেটাও তো বুঝতে হবে। মনে পড়ল লামাজী একটা কথা বলেছিলেন, যারা গেছে সেখানে ফেরেনি কোনও দিন। সে এক অনন্ত যাত্রা। মানুষের একটা জীবনে শেষ হবে না। তার মানে কি সত্যিই আমরা ফিরতে পারব না এখান থেকে কোনও দিন!
“প্রশ্নটা মনে মনে করেছিলাম। ম্যাথু সেটা বুঝতে পারল। বলল, এ স্থানটা শুধু অদ্ভুত নয়, খুবই রহস্যজনক। চারপাশে ঘন অন্ধকার ছাড়া কিছুই নেই। আরও কিছুক্ষণ হাঁটার পর ও বলল, আমাদের ইন্দ্রিয়গুলি বিশেষ কোনও কাজে লাগছে না। মন থেকেই যখন সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, তখন উদ্দেশ্যহীনভাবে না হেঁটে এস আমরা দু’জনে মিলে একবার মনে মনে আহ্বান করি এখানকার প্রভুদের।
“তার ইঙ্গিতটা বুঝে আমাদের ইচ্ছাশক্তিগুলিকে একত্রিত করে এক জায়গায় বসে মনঃসংযোগ শুরু করলাম। বেশ কিছুক্ষণ সময় পর মনে হল জমিটা মৃদু দুলছে। যেন কোনও ভেলায় চেপে বসেছি আমরা। এরপর ক্রমশ সেই দুলুনি বাড়তে লাগল। আবার কিছুটা সময় পরে থেমে গেল সেই দুলুনি।
“আমি এর মধ্যে চোখের পাতা খোলার চেষ্টা করে দেখলাম, আগের মতোই অভিজ্ঞতা হল। উজ্জ্বল আলোতে ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ করে মনের অনুভূতিতে টের পাচ্ছিলাম, আমরা দু’জন ছাড়া কোনও প্রাণীর অস্তিত্ব এখানে নেই। তাহলে কী আছে? মেঝেটা এরকম আন্দোলিতই বা হল কেন?
“ম্যাথু বেশ ভয় পেয়েছে। বলল, আমার একটা সন্দেহ হচ্ছে, বুঝলে?
“আমি দেখলাম, ওর মনের কথাটা বুঝে নিয়েছি। বললাম, আমরা কেউ আর বেঁচে নেই। তাই তো?
“ঠিক সেই সময়েই অন্য একটা শব্দের অনুভূতি হল। একটা রিনরিনে আওয়াজ। সরু বাঁশির মতো। আরও মনোযোগ দিয়ে শোনার পর শব্দটা যে একরকম ভাষা সেটা উপলব্ধি করলাম। যদিও তার উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বোঝা গেল না। সে যেন ক্রমাগত বলছে, এদিকে এস, এদিকে এস, এদিকে এস…
“আমরা আবার চোখ বন্ধ করে শব্দের উৎস আন্দাজ করে হাঁটতে থাকলাম। বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর অন্ধকারের মধ্যে সাদা আলোয় উদ্ভাসিত একটা গম্বুজ দেখা গেল। আমরা এগিয়ে গেলাম সেইদিকে। গোলাকার সিংহদুয়ার দিয়ে প্রবেশ করে উপলব্ধি করলাম অন্দরের এক অদ্ভুত দৃশ্য! জায়গাটা সাদা ধোঁয়ায় ভর্তি। এখানে সবকিছুই সাদা আর কালো। ম্যাথু হঠাৎ চমকে উঠে মনে মনে বলল, একটা জিনিস খেয়াল করেছ? আমাদের পোশাক, গায়ের রঙ সবই কিন্তু সাদাকালো রঙের হয়ে গেছে।
“জানালাম, যেন পুরনো আমলের কোনও চলচ্চিত্র দেখছি। আসলে চোখের মাধ্যমে রঙের বিভাজনটা আমাদের মস্তিষ্ক গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে আমাদের মাথার মধ্যে যে ছবিটা তৈরি হচ্ছে, তা কিন্তু পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে নয়।
“একটু ভেবে ম্যাথু মন্তব্য করল, তার মানে কি আমাদের শরীরে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আছে?
“নিশ্চয়ই আছে। তবে সেই ইন্দ্রিয়ের ব্যবহার আমরা করতে জানি না। এখন যেমন আমরা দু’জনে যে পদ্ধতিতে মনের ভাব আদানপ্রদান করছি সেটা তো একরকম টেলিপ্যাথি, তাই না?
“ম্যাথু আমার কথা সমর্থন করে মাথা নাড়ল। বিশাল বড়ো সাদা তোরণ পেরিয়ে একটি পথ চলে গেছে সাপের মতো এঁকে বেঁকে। সেই রাস্তায় চলতে চলতে কতদূর পেরিয়ে এলাম। পিছন ফিরে তোরণটাও দেখতে পেলাম না আর। তারপর দেখি কিছু গোলাকৃতি ছোটোবড়ো সাদা বল এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। গুনে দেখলাম গোটা দশেক হবে। চকচকে সাদা মার্বেলের মতো। নিজে থেকেই গড়িয়ে এল। এই অচেনা অবাক করা দুনিয়ায় এসে আমাদের বিস্ময়ের অভিব্যক্তিগুলি যেন মরে গেছে। কোনও কিছুতেই আর অবাক হচ্ছি না। আমরা দাঁড়িয়ে পড়লাম। এক-দেড় ফুট ব্যাসের বলগুলি আমাদের সামনে এসে স্থির হল। তারপর গোল করে ঘিরে ধরল আমাদের। আবার ধীরে ধীরে গড়াতে শুরু করল সামনের দিকে।
“তার মানে, এরা আমাদের কোথাও নিয়ে যেতে চাইছে। মন্তব্য করল ম্যাথু।
“তাই তো মনে হচ্ছে! আমি জানালাম।
“কিছুটা যেতে পথ তিন ভাগে ভাগ হল। আমরা ডানহাতের পথ ধরে এগোলাম। তারপর সেই পথটা আবার তিন ভাগে ভাগ হয়েছে। আমদের মাঝেরটা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। পরের বারে আবার বাঁদিকের রাস্তাটা ধরলাম। এইভাবে কত ফ্যাঁকড়া এল আর আমরা এগিয়ে চললাম সেই গোল করে ঘিরে রাখা বলগুলির মাঝে দাঁড়িয়ে। এগুলি যে একেকটি যন্ত্রের মতো কাজ করছে সেটা বুঝে গেছি এতক্ষণে। এদের নির্দেশ দেওয়ার লোক আলাদা।
“অনেকক্ষণ পর একটা সাদা গম্বুজের নিচে পৌঁছলাম। তার মধ্যে একটা চৌকো উজ্জ্বল পাথরের উপর বসে আছেন এক সাদা পোশাক পরা মানুষ। লম্বা শুভ্র চুলদাড়ি সম্বলিত মানুষটির চোখ বন্ধ। যে গোলাকৃতি পাথরের মতো বলগুলি আমাদের ঘিরে নিয়ে এসেছিল তারা এগিয়ে গিয়ে মিশে গেল সামনের বড়ো চৌকো সাদা পাথরটি মধ্যে। খেয়াল হল, আমার কাছে যে চৌকো পাথরটি রয়েছে এটি তারই মতো। একইরকম আঁকিবুঁকি ওতেও করা আছে। শুধু আকারে অনেকটা বড়ো। সেখান থেকে ধোঁয়া বেরিয়ে যেন ঐ মনুষ্যাকৃতির অবয়বটা তৈরি করেছে। একটা শব্দ এল কানে। না কানে নয়, মস্তিষ্কে বলাই ভালো। ‘তোমাদের কাছে যে সাদা পাথরটি আছে সেটা রেখে দাও এখানে।’
“ম্যাথু আমাকে বাধা দিয়ে বলল, তার আগে আমাদের ফিরে যাওয়ার রাস্তাটা বলে দিন।
“চিন্তা করো না, ফিরে তোমরা যাবে। কথা দিলাম। তবে…
“তবে কী?
“টেলিপ্যাথির মতো রিনরিনে সুরে কথাগুলি বাজছিল আমাদের মস্তিষ্কের ভিতর। আমি অনুগত ভৃত্যের মতো জিনিসটি পকেট থেকে বের করে এগিয়ে দিতেই চুম্বকের মতো সেটিকে টেনে নিল বড়ো সাদা বস্তুটি। জানালাম, কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর চাই।
“বলো।
“আপনি কে?
“আমিই আদি। তবে তোমরা যে মানব রূপটি দেখছ, সেটি একটি প্রতীক মাত্র। সে আসল আমি নই।
“ম্যাথু জিজ্ঞাসা করল, আপনি কি ঈশ্বর?
“উত্তর এল, সে কে? আমি তাকে চিনি না।
“আপনার আসল চেহারা আমাদের দেখচ্ছেন না কেন?
“আমার আসল শরীর তোমরা দর্শন করতে অক্ষম।
“আপনি আমাদের ভাষায় কথা বলছেন কীভাবে?
“আমি ভাব প্রকাশ করছি মহাবিশ্বের এক বিশেষ তরঙ্গের মাধ্যমে। যেটা তোমাদের মস্তিষ্কে গিয়ে নিজের নিজের ভাষায় রূপান্তরিত হচ্ছে।
“এ জায়গাটা কি পৃথিবীর মধ্যে?
“কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলে উঠলেন তিনি, হ্যাঁ। গভীরে, অনেক গভীরে।
“আপনি কি অন্য গ্রহ থেকে এসেছেন?
“না। এখানেই থাকি। অনন্তকাল। একা।
“আপনার কোনও কথাই বুঝে উঠতে পারছি না আমরা। সব যেন হেঁয়ালির মতো লাগছে।
“মানুষের সভ্যতা এখনও এত বড়ো হয়নি যে তারা আমাকে উপলব্ধি করতে পারে।
“বুঝলাম না।
“তিনি জানালেন, মনুষ্য সভতা হল এই গ্রহের উপর একটি স্তর। এইরকম বিভিন্ন স্তর রয়েছে। তাতে বেঁচে আছে আলাদা আলাদা সভ্যতা। তোমাদের কাছে যে সাদা চৌকো বস্তুটি ছিল সেটা একটা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মহাজাগতিক কম্পন যন্ত্র। যার দ্বারা একস্তর থেকে অন্য স্তরে পৌঁছে দিতে পারে কোনও প্রাণীকে। ঐটা তোমাদের সাথে ছিল বলে সিরিঞ্জুরা তোমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। এখানে একইরকম যে বড়ো সাদা খণ্ডটি দেখছ আমার নিচে, এটা থেকেই ওর উৎপত্তি। মহাবিশ্বের কিছু জ্যোতিষ্কের অবস্থান অনুযায়ী কোনও এক বিশেষ মুহূর্তে পথ খোলা পেয়ে তোমাদেরই এক পূর্বসুরি এসেছিল এখানে। জিনিসটি সেই সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল। আর তোমরা সেটা ফিরিয়ে এনেছ। এটা ছিল পূর্ব নির্ধারিত। ওটার জন্যই তোমরা প্রবেশ করতে পেরেছ এই জগতে।
“আমাদের বিজ্ঞান এখন অনেক উন্নত। মহাশূন্যে আর মহাবিশ্বের সমস্ত রহস্য ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে। কিন্তু এ জগত আমাদের চেনা দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আপনাকে আমরা চিনতে পারছি না কেন? ম্যাথু জানতে চাইল।
“তোমাদের বিজ্ঞান এখনও মহাজ্ঞানসমুদ্রের মাঝে কয়েক বিন্দু জলের মতো। মাত্র কয়েকদিন আগে শুরু হয়েছে সেই আধুনিক বিজ্ঞান। তোমরা যেটাকে শূন্য বলো, সেটাই মহাবিশ্বের মূল শক্তির আধার। তোমাদের এখনও পর্যন্ত জানা বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের চিত্রটা আসল ছবির এক শতাংশও নয়। সবকিছু বিচার, পরীক্ষা ও যাচাই করার জন্য তোমাদের যে ইন্দ্রিয়গুলি আছে তা দিয়ে মূল সত্য প্রকাশিত হতে বহু সময় লাগবে। তবে তোমরা হয়তো পারবে। আর ততদিনে তোমাদের এই আধুনিক সভ্যতা ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাবে অনেকটা।
“ধ্বংস হবে কেন?
“কারণ, ধ্বংসের দিকেই তোমরা এগিয়ে চলেছ ক্রমশ। পশু থেকে মানুষের সৃষ্টির পিছনে রয়েছে বিশেষ একটি জিন বা ডি.এন.এ.। যা এসেছিল কয়েক লক্ষ আলোকবর্ষ দূর থেকে। আদিতে অনন্ত সময় মানুষ অতিবাহিত করেছে শিকার ও সংগৃহীত খাদ্যের জোগাড় করে। তারপর মস্তিষ্ককে কাজে লাগিয়ে শুরু করল কৃষিকার্য। কৃত্রিমভাবে নিজেরাই উৎপাদন করল খাদ্যের। এরপর শুরু হল কুটিরশিল্প, হস্তশিল্প, ভাস্কর্য। আর এখন শুরু হয়েছে বৃহৎ শিল্প। সারা পৃথিবী জুড়ে মনুষ্যজাতি শুধু সেই বৃহৎ শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের বাজার অর্থাৎ বিক্রয় করে মুনাফা লাভের পিছনে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। যে কারণে কিছুদিন আগেই দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ কাঁপিয়ে দিয়ে গেল পৃথিবীকে।
“কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর আমি মন্তব্য করলাম, “আপনি প্রকৃত জ্ঞানীর মতোই বলছেন। কিন্তু আপনার পরিচয়টা এখনও কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলাম না।
“আমি এই গ্রহের সমস্ত প্রাণীর সৃষ্টিকর্তা। আমার দ্বারাই প্রথম তৈরি হয়েছিল জীবিত কোষ। তারপর ধাপে ধাপে এসেছে আজকের প্রাণীকুল। তবে তোমাদের কল্পনাতীত বৃহৎ ব্রহ্মাণ্ড-চিত্রের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। তোমরা যা কিছু দেখছ সবই একরকমের মায়া। যেমন শক্তির বিভিন্ন চেহারা। যা কিছু জড় বস্তু রূপে দেখছ তোমরা, সবের মধ্যেই আছে প্রাণ। কারোর মধ্যে প্রকটভাবে, কোথাও তা প্রচ্ছন্ন।
“কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর ম্যাথু প্রশ্ন করল, বেশ কয়েক বছর আগে একদল তিব্বতি রাক্ষসতালের নিচে বসতি তৈরি করেছিল। তারা কোথায় গেল?
“ওরা মুক্তির পথ পেয়েছে। সে পথ মৃত্যুর ঊর্ধ্বে। সে স্তর তোমাদের সভ্যতা থেকে অনেক দূরে। বাকি যারা অস্ত্র হাতে দখল করতে এসেছিল তারা মারা গেছে সিরিঞ্জুদের হাতে।
“সিরিঞ্জুরা কি পৃথিবীর প্রাণী?
“হ্যাঁ। ওরা আমার এই গোপন পৃথিবীর প্রহরী। আমার অনুমতি ছাড়া এখানে কেউ প্রবেশ করতে পারে না।
“আমাদের সাথী ওলির কী হয়েছে আপনি জানেন?
“ওই তোমাদের টেনে নিয়ে এসেছে এই অজ্ঞাত স্থানে। ওলির দাদু সারাজীবন সন্ধান করেছিলেন এই গোপন পথের। ওঁর বিশেষ কিছু ধাতুর প্রতি ছিল মারাত্মক লোভ। তন্ত্রের মাধ্যমে সিরিঞ্জুদের আহ্বান করার কৌশল রপ্ত করেছিলেন তিনি। কিন্তু সিদ্ধিলাভের আগেই ফিরতে হয়েছিল শারীরিক অসুস্থতার জন্য। সেই পদ্ধতিতেই ওলি আহ্বান করেছিল সিরিঞ্জুদের। তারা পেত্রোভিচ আর ওলি দু’জনকেই বন্দী করে নিয়ে যায়। কিন্তু ওলি জানত না যে সিরিঞ্জুদের ডাকা যায়, কিন্তু তাদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ নয়। সে জন্য যে তন্ত্রের প্রয়োজন সেটা লিখে যাননি তার দাদু।
“ওলিকেও তাহলে সিরিঞ্জুরা মেরে ফেলেছে?
“ওলির মৃত্যু হয়নি। ও এখন সিরিঞ্জুদের একজন। উপরের পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার অধিকার হারিয়েছে।
“কথাটা শোনার পরে আমার মনে পড়ল জনের মৃত্যুর মুহূর্তটা। সে আঙুল তুলে চিৎকার করে বলেছিল, ওলি, ওলি! সেই কি তাহলে আমাদের রক্ষা করার জন্য বাকি সিরিঞ্জুদের সাথে লড়াই করছিল!
“এরপর আমরা আরও কিছু প্রশ্ন করেছিলাম। কিন্তু কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি। ধীরে ধীরে ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যে মিলিয়ে গেল সেই অতিমানবের অবয়বটি। আর কোনও সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। ঠিক তখনই কেঁপে উঠল মেঝে। পরক্ষণেই একটা যেন বিস্ফোরণ হল। যেন মাথার মধ্যে আলোটা যেন দপ করে নিভিয়ে দিল কেউ।
“এরপর নিজেদেরকে একদিন আবিষ্কার করলাম উপরের পৃথিবীতে। চারদিকে বরফে মোড়া অন্য এক সরোবরের তীরে।”
অবধারিত প্রশ্ন বেরোল আমার মুখ থেকে, “অন্য সরোবর! সেটা কোথায়?”
“তিব্বতে গিরিপর্বতের আড়ালে ওরকম অনেক ছোটোবড়ো হ্রদ লুকিয়ে আছে। সেখানে এখনও কোনও সভ্য মানুষের পা পড়েনি। সেরকমই একটা নামগোত্রহীন জলাধার ছিল সেটা। কৈলাস থেকে অনেকটা উত্তরপূর্বে। তারপর আমরা কীভাবে ফিরে এলাম এখানে, সেটা তোদের না শুনলেও চলবে। পরে জানতে পারলাম, আমাদের জীবনের পঞ্চাশ বছরের কোনও হিসাব নেই। শরীরের বয়েস বাড়েনি, কিন্তু সালটা গড়িয়ে গেছে অনেক। যাত্রা করেছিলাম ১৯৫২-তে আর ফিরলাম ২০০২-এ। কিন্তু...”
ঘরের নিস্তব্ধতা তখন চূড়ান্ত। আমরা দু’জনেই হতবাক। কল্লোল রা কাড়ল, “আপনারা পঞ্চাশ বছর ছিলেন রাক্ষসতালের নিচে?”
জীবনবাবু গভীর চিন্তার জাল ছিঁড়ে বাইরে এসে বললেন, “হিসাব তো তাই বলছে।”
আমি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পরে প্রশ্ন করলাম, “ওলির দাদুর বিশেষ কোনও ধাতুর প্রতি প্রচণ্ড লোভ ছিল। এই ব্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না, জীবনবাবু!”
আমার প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, “সিরিঞ্জুদের গুহায় আমরা যে ধারালো ফলার মতো চকচকে রূপালি বস্তুগুলি দেখেছিলাম, সেগুলি ছিল আসলে প্লাটিনাম। আমাদের অনভিজ্ঞ চোখ ধরতে পারেনি। ঐ প্লাটিনামের তৈরি কিছু মূর্তি আমরা বনতান্ত্রিকদের দুর্গম মঠেও দেখেছিলাম। হিমালয়ের অনেক নিচে লুকিয়ে আছে প্লাটিনামের বিশাল খনি। কিন্তু সেখানে পৌঁছানো কোনও সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।”
হঠাৎ একটা দুম দুম আওয়াজে আমরা ছিটকে উঠেছি ভয়ে। আচমকা এত রাতে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে কে? জীবনবাবু উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দিতে ওঁরই সমবয়সী এক মানুষ ভিতরে ঢুকে কাঁধ থেকে কাঠের বোঝা আর একটা ঝোলা নামিয়ে রাখলেন পাশে। আমাদের লক্ষ করে একটা রহস্যময় হাসি হেসে মাথা নাড়লেন। দেখলাম লোকটির ঘাড় পর্যন্ত নেমে আসা সোনালি চুল, পেশীবহুল গৌরবর্ণ চেহারা, বাদামি রঙের চোখের মণি। পরনে জীবনবাবুর মতোই পা পর্যন্ত একটা ধূসর জোব্বা। বললেন, “কাঠ নিয়ে ফেরার পথে হঠাৎ আবহাওয়াটা খারাপ হল। তুষারপাতের মধ্যে আটকে পড়েছিলাম ঘণ্টা চারেক। তবে তোমার অতিথিদের জন্য আজকে সংগ্রহ করেছি ভেড়ার মাংস।” তারপর আমাদের দিকে ফিরে প্রশ্ন করলেন, “কী জেন্টেলমেন, ভেড়ার পোড়া মাংস দিয়ে ডিনার চলবে তো?”
জীবনবাবু হেসে পরিচয় করিয়ে দিলেন ওঁর সাথে, “এ হল আমার প্রাণের বন্ধু ম্যাথু সিলভারস্টিন। ও-ব্যাটা এত বছর পরে আর দেশে ফিরে যায়নি। আমার সাথেই রয়ে গেছে এখানে।”
আমি ঢোঁক গিলে বললাম, “আচ্ছা! কিন্তু উনি জানলেন কী করে যে আমরা এখানে আছি?”
“কেন, টেলিপ্যাথি! হা হা হা!”
দরজা খোলা পেয়ে এক ঝলক দমকা ঠাণ্ডা ঝড়ো হাওয়া ঢুকে এল ঘরের মধ্যে। পিলসুজের শিখা আর নিভে আসা কাঠের আগুনটাকে দপ করে নিভিয়ে দিয়ে একটা ঝড় তুলে মিলিয়ে গেল সে। তারপরেই একরাশ নিস্তব্ধতা। কল্লোল পকেট হাতড়ে লাইটার বের করে যখন জ্বালল, তখন ঘরের মধ্যে শুধু আমরা দু’জন। কেউ কোথাও নেই। শুধু দরজার কোণে পড়ে রয়েছে একগোছা কাঠ আর টাটকা ভেড়ার মাংস!
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ পুষ্পেন মণ্ডল

12 comments:

  1. হুমম..পড়ে ফেললাম..একশৃঙ্গ অভিযানের কথা মনে পড়ল..গল্পটা আমার মনে হয় একটু লিনিয়ার হলে আরো ভালো লাগত..পরে আরেকবার পড়ব

    ReplyDelete
  2. সত্যিই খুব ভাল লেখা হয়েছে।চাঁদেরপাহাড়ের কথা মনে পড়ে গেল।লেখকের হিমালয়ের জ্ঞান অভিভূত করেছে আমাকে।লেখার বাঁধুনিও খুব ভাল।এ লেখা হারিয়ে যাবে না।টিকে থাকবে বলেই আমি মনে করি।প্রথম থেকে শেষ অধি একটানা পড়ে গেছি।মন্ত্রমুগ্ধের মত।শেষে চাঁদের পাহাড়যে ভাবে শেষ হয়েছে সেভাবে হলে বিশ্বাসযোগ্যতা আরও বাড়ত।এটা গল্প নয়, সত্য কাহিনী, লেখা এত ভাল হয়েছে যে বার বার এমনই মনে হয়েছে আমার, এই পরিণত বয়সেও! এ লেখা আমাকে অভিভূত করেছে।অনেক ভাল থাকুব লেখক।আনন্দে থাকুন।

    ReplyDelete
  3. Golpota khub valo laglo, ek nihswas e pore fellam, darun likhechen, aro onek valo lekhar asha Kofi apnar theke.......

    ReplyDelete
  4. সাংঘাতিক লিখেছেন তো!

    ReplyDelete
    Replies
    1. তাই নাকি! ভালো লেগেছে জেনে খুব খুশি হলাম 😊

      Delete
  5. দুর্দান্ত লাগলো। আরো পড়ি মনে হচ্ছিল, শেষ যেন এখনি না হয়। আঁকা ও বেশ লেগেছে।

    ReplyDelete
  6. দারুণ পুষ্পেনদা। খুব ভালো লাগল।

    ReplyDelete
  7. দুর্ধর্ষ বর্ণনা, নিখুঁত ডিটেলিং, রুদ্ধশ্বাস ঘটনা...এবং সর্বশেষের ওই মোচড়। দারুণ লাগল।

    ReplyDelete