গল্পঃ জ্যান্ত ভূতঃ সুস্মিতা নাথ


জ্যান্ত ভূত

সুস্মিতা নাথ


ঘটনাটির শুরু পাড়ার নন্দীজেঠু মারা যাওয়ার পরপরই। নন্দীজেঠুর ভূত নাকি প্রতিরাতেই বাড়িতে হানা দিচ্ছে! সবাই জানে নন্দীজেঠু ও জেঠিমার মাঝে কেমন প্রেমপ্রীতি সদ্ভাব ছিল। মর্নিং ওয়াকে, বাজার-হাটে, এমনকি পড়শি বাড়ি নেমন্তন্ন খেতে গেলেও দু’জনকে একসঙ্গেই দেখা গেছে। নন্দীজেঠুদের কোনও সন্তান নেই। দু’জনেই ছিলেন একে অপরের সহায় ও সঙ্গী। সুস্থ সবল সেই নন্দীজেঠুই জেঠিমাকে একা ফেলে হঠাৎ করে চলে গেলেন। অত বড়ো পেল্লায় বাড়িখানায় বাকি জীবনটা জেঠিমার একাই কাটাতে হবে। ফলে ওপরে গিয়েও নন্দীজেঠু শান্তিতে থাকতে পারছেন না। জেঠিমার জন্যে চিন্তা করছেন। সেজন্যেই হয়তো বারবার ফিরে আসছেন নিজের বাড়িতে।
খবরটা জানাজানি হতেই পাড়ার লোকেরা চিন্তিত হয়ে পড়ল। শেষপর্যন্ত এলাকায় ভূতের উপদ্রব শুরু হল! সবচাইতে বেশি মুশকিলে পড়েছে নন্দীজেঠুদের পাশের বাড়ির মুখুজ্জেরা। ভূতের ভয়ে দরজা-জানালা বন্ধ করে বাড়ির সবাই ঘরের ভেতর সেধিয়ে আছে। কেউ ডোর বেল বাজালেও দরজা খুলছে না। আর শুধুই কি মুখুজ্জেবাড়ির লোকেরা?  ভূতে বিশ্বাসী লোকের তো অভাব নেই পাড়াতে। মায়েরা বাচ্চাদের নন্দীবাড়ির আশেপাশে ঘেঁষতে দিচ্ছে না। ছেলে-বুড়োরাও অনেকে ওদিকটা এড়িয়ে চলছে।
নন্দীজেঠু যেদিন মারা গেলেন, ঠিক তার পরেরদিন থেকেই বিষয়টার সূত্রপাত। সেদিন সাতসকালে বাসন্তী, অর্থাৎ নন্দীজেঠুর বাড়ির কাজের মেয়েটি ছুটতে ছুটতে এসে রায়বাড়ির কাজের বউ মলিনাকে বলল, “কী ভয়ানক কাণ্ড গো! কাল রেইতে নন্দীদাদার ভূত এইসে চড়াও হয়েছিল বাড়িতে। সারা রেইত ধরি ডোর-বেল বাজিয়েচে। অথচ দরজা খুললি কাউকে দেখা যায় না। কী কাণ্ড বলো দিকিনি! আসলে বৌদিকে যে খুব ভালোবাসত দাদা। মরার পরেও তাকে ছেইড়ে থাকতে পাচ্চে না গো। ভাগ্যিস ও-বাড়িতে এখন পচ্চুর আত্মীয়স্বজন। নইলে নন্দীবৌদি একা থাকলে যে কী হত!”
কথা শেষ করেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল বাসন্তী।
এমন একখানা খবর শুনে মলিনার চোখ স্বভাবতই বিস্ফারিত। টাটকা ভূতের গন্ধ পেয়ে উৎসাহী হয়ে বলে উঠল, “বলিস কী! তুই দেখলি ভূতটাকে?”
“না গো, ভূত দেকিনি। মানে নন্দীদাদা দেখা দেয়নি। কেবল সারা রেইত ধরি ডোর বেল টিপেচে। বোধহয় বৌদিকে দেখতে এইসেছিল।” বিষণ্ণ মুখে বলল বাসন্তী। তারপরেই যোগ করল, “কী কাণ্ড শুরু হল, বলো দিকিনি! আত্মীয়স্বজনই আর কদ্দিন? সেরাদ্দ-শান্তি মিটলেই সবাই চলি যাবে। তারপর নন্দীবৌদি একা একা কী করে যে অত বড়ো বাড়িটায় থাকবে, কে জানে।”
এমন একখানা টাটকা ভূতের তাজা খবর নিয়ে মলিনা হন্তদন্ত হয়ে রায়বাড়িতে ঢুকল।
রায়গিন্নির সঙ্গে মলিনার খুব ভাব। ও-বাড়িতে মলিনা যতটা না কাজ করে, গপ্পো করে তার চেয়ে ঢের গুণ বেশি। আসলে রায়গিন্নি মলিনার কাছ থেকে পাড়া-প্রতিবেশীদের হাঁড়ির খবর নেন। মলিনাও কোনও মুখরোচক খবর পেলে সবার আগে রায়গিন্নিকে শুনিয়ে যায়। রায়গিন্নি তাই মলিনাকে খুব ভালোবাসেন। ওকে চর্ব্যচোষ্য বানিয়ে খেতে দেন। মাঝেসাঝে এটা সেটা উপহারও দেন। আজ তো মলিনার কাছে সাংঘাতিক খবর আছে। মলিনা হন্তদন্ত হয়ে রায়বাড়িতে ঢুকেই প্রায় চেঁচিয়ে বলে উঠল, “শুনছ গো বৌদি, কী মারাত্মক খবর! ওকেই বলে প্রেম, বুঝলে? একেই বলে প্রেম।”
“প্রেম? কার প্রেমের কথা বলছিস রে মলিনা?” গল্পের গন্ধ পেয়ে রায়গিন্নি মলিনাকে বসার জন্যে পিঁড়িটা এগিয়ে দিলেন। “তুই তো হাঁপাচ্ছিস রে মলিনা! আগে একটু বসে জিরিয়ে নে। তারপরে ধীরেসুস্থে গুছিয়ে বল তোর প্রেমকাহিনি।”
মলিনা বলে, “বলছি, বলছি। গুছিয়েই বলছি। তবে আমার প্রেমকাহিনি নয়কো বৌদি, নন্দীবাবুদের প্রেমকাহিনি। শোনো, এইমাত্র খবর পেলাম। একেবারে একশোভাগ সত্যি খবর।”
“কী খবর!” রায়গিন্নি অদম্য কৌতূহলে জিজ্ঞাসা করেন।
“ঐ নন্দীবাবুদের খবর গো বৌদি। জানো? নন্দীবাবুর ভূত নাকি রাতেরবেলা ও-বাড়িতে হানা দিচ্ছে। আসলে তো স্বামী-স্তীর মধ্যে খুব প্রেম ছিল, তাই এখন আর বউকে ছেড়ে থাকতে চাইছে না মানুষটা। কাল নাকি সারারাত ধরে ডোর বেল বাজিয়েছে নন্দীবাবু, মানে উনার ভূত। আর থেকে থেকেই নাকি গলায় শিউলি, শিউলি বলে ডেকে উঠেছে। শিউলি হল নন্দীবৌদির নাম।” খানিক কল্পনাপ্রসূত মশলা মিশিয়ে খবরটাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে মলিনা।
সব শুনে রায়গিন্নি ভয়ানক বিস্মিত। “ওমা! তাই নাকি? কী বলছিস তুই? এসব সত্যি? তারপর কী হল?” আরও উৎসুক হয়ে উঠেছেন তিনি।
“তারপরে আর কী?” মলিনা বলে চলে, “আওয়াজ পেয়ে নন্দীবৌদি তো দরজা খুলবেই। কিন্তু আত্মীয়স্বজনেরা, যারা মারা যাওয়ার খবর পেয়ে এসেছে, তারাই নন্দীবৌদিকে ধরে বেঁধে আটকে রেখেছে। ভাগ্যিস, বাড়িতে এখন পচ্চুর লোক।”
“ভয়ানক ব্যাপার তো! এ যে মারাত্মক খবর! এমন গল্প কেবল বইতেই পড়েছি। আর এখন দেখছি পাড়াতেই এসব ঘটছে!” রায়গিন্নির বিস্ময় এখনও কাটেনি। বলেন, “তুই কোথায় এ-খবর পেলি?”
মলিনা বলে, “কোথায় আবার? আমাকে খবরটা দিল খোদ বাসন্তী, যে নাকি ঐ নন্দীবাড়িতেই হোল-টাইম থাকে।”
এরপর আর অবিশ্বাসের প্রশ্নই আসে না। তবুও খবরটা সম্পর্কে আরও কিছু বিশদে জানতে, বা অন্যদের সেটা জানাতে রায়গিন্নি মলিনাকে কাজ বুঝিয়েই বেরিয়ে পড়লেন পাড়া বেড়াতে।
প্রথমেই তিনি হানা দিলেন বান্টিদের বাড়িতে। বান্টিদের বাড়িতে মা-কাকিমারা তখন রান্নাঘরে জলখাবার তৈরিতে ব্যস্ত। বান্টিরাও স্কুলে যাওয়ার জন্যে তৈরি হচ্ছে। ঠাম্মা বান্টিকে খাইয়ে দিচ্ছেন। ঠিক তখনই রায়গিন্নির প্রবেশ ঘটল। ঠাম্মাকে দেখেই বলে ওঠেন, “মাসিমা, এ-পাড়ায় আর বোধহয় থাকা যাবে না। পাড়াটা যে ভূতুড়ে হয়ে গেল!”
হাতের কাজ থামিয়ে ঠাম্মা বলেন, “এমন কথা কেন বলছ, বৌমা? কী হয়েছে?”
“সাধে কি আর একথা বলি, মাসিমা? ঘটনাটাই যে এমন। ওই যে ওই অলকেশ নন্দী, মরে গিয়েও লোকটা যে পাড়া  ছাড়ছে না! এখন প্রেত হয়ে রাতবিরেতে হানা দিচ্ছে পাড়ায়।”
“সে কি! এসব কী বলছ?” ঠাম্মা ভীষণ অবাক হয়ে বলে ওঠেন।
রায়গিন্নি এবারে ভালো করে বসে হাত নাচিয়ে বলেন, “আমি এইমাত্র খবরটা পেলাম, মাসিমা। শতকরা একশোভাগ খাঁটি খবর। খোদ নন্দীবাড়ির কাজের মেয়ে বাসন্তীর কাছ থেকে শোনা। ঐ বাসন্তী তো ও-বাড়িতে সবসময় থাকে। ওর থেকে ভালো খবর আর কে জানবে বলুন?”
“কী হয়েছে খুলে বলো তো, বৌমা।” বান্টির ঠাম্মা উৎসুক হয়ে বললেন।
ইতিমধ্যে ওর মা ও কাকিমারাও রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। বান্টিও খাওয়া ভুলে গল্পে মন দিয়েছে। ছোটকা শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে।
রায়গিন্নি শুরু করলেন, “মাসিমা, আপনারা তো জানেনই নন্দীবাবু আর ওঁর স্ত্রীর মাঝে কেমন প্রেম-ভালোবাসা ছিল। এখন হয়েছে কী, নন্দীবাবু মরে গিয়েও বউকে ছেড়ে আর থাকতে পারছেন না। ফলে কাল রাতে বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন। বার বার ডোর বেল টিপেছেন। আর নাকি স্বরে ‘শিঁউলি দঁরজা খোঁলো, শিঁউলি দঁরজা খোঁলো, আঁমি এঁসে গেঁছি’ বলে বলে নন্দীবৌদিকে ডেকেছেন।”
“কী বলছেন, দিদি? এসব সত্যি? তারপর কী হল?” এবারে বান্টির মা রায়গিন্নির কাছে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করেন। বাকি শ্রোতারাও উদগ্রীব হয়ে আছে।
উৎসাহী শ্রোতা পেয়ে রায়গিন্নিও মূল বক্তব্যে রঙ মিশিয়ে চলেন। “তারপর হল কী, নন্দীবাবুর বাড়িতে তো এখন  অনেক আত্মীয়স্বজন, তাদেরই কেউ দোতলার ওপর থেকে জানালা খুলে দেখে, নিচে গেটের সামনে ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে নন্দীবাবু দাঁড়িয়ে আছেন। ভয়ে সঙ্গে সঙ্গে ওরা দরজা-জানালা সব বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ওঁর স্ত্রী মানে নন্দীবৌদি তো দরজা খুলে দেবেনই। নন্দীবাবুকে দেখে পাগলের মতো হয়ে গেছেন। আত্মীয় যারা ছিল, তারাই ওঁকে জোর করে ধরে বেঁধে আটকে রাখেন।”
“ওমা! এ তো সাংঘাতিক খবর!” বলে উঠল কেউ।
“সেটাই তো!” দ্বিগুণ উৎসাহে রায়গিন্নি বলে চলেন, “সেজন্যেই খবরটা পেয়েই জানাতে চলে এলুম। এখন কী হবে বলো দেখি? পাড়াতে যে ভূতের উপদ্রব শুরু হয়ে গেল!”
বেণু গোয়ালা বান্টিদের বাড়িতে দুধ দিতে এসেছিল। রায়গিন্নির গল্প শুনে সেও সাইকেল নিয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে পড়েছিল। পুরো ঘটনাটা শোনা হলে তবেই সে দুধ দিতে অন্য বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
বান্টিদের বাড়ির পরে বেণু গোয়ালার পরবর্তী গন্তব্য মহেশ মিত্রের বাড়ি। বেণু গোয়ালা সেখানে গিয়ে মহেশবাবুকে দেখেই বলে উঠল, “একখানা সাংঘাতিক খবর শুনে এলাম, দাদা। আপনাদের পাড়ায় তো ভয়ংকর সব ঘটনা ঘটছে!”
মহেশবাবু ভুরু কুঁচকে বেণু গোয়ালার দিকে তাকালেন। যার অর্থ, কী বলতে চাও তুমি?
বেণু গোয়ালা জারিক্যানে দুধ ঢালতে ঢালতে বলল, “আপনি এখনও খবরটা শোনেননি, দাদা? আপনাদের পাড়াতে যে ভূতের উপদ্রব শুরু হয়েছে।”
“ভূতের উপদ্রব! তোর মাথাটা ঠিক আছে তো, বেণু?” মহেশবাবু তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেন।
কিন্তু বেণু গোয়ালা বলে, “আমার মাথা ঠিকই আছে, দাদা। সারা পাড়ার লোকেরা খবরটা জানে। কেবল আপনিই শোনেননি। অবিশ্বাস্য কাণ্ড। লোকে বলে ভূতপ্রেত বলে কিছু নেই। অথচ দেখেন, কেমন দিনেদুপুরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ভূতেরা!”
মহেশ মিত্রের এখনও কিছু বোধগম্য হয়নি। বেণু গোয়ালার দিকে খানিক বিরক্তি ভরা চোখে তাকিয়ে বললেন, “আবার কীসব ভূতের গপ্পো ফেঁদে বসলি তুই? যা বলার ঝেড়ে কাশ না বাপু!”
“গপ্পো নয়কো, দাদা। এক্কেবারে খাঁটি সত্যি।” বেণু বলে।
“কেমন খাঁটি? তুই যে দুধ দিস তার মতো?” মহেশবাবু কৌতুক করে বলেন।
বেণু গোয়ালা জিভ কেটে বলে, “অমন খোঁচা দিয়েন না, দাদা। যাই বলুন, দিব্যি করে বলছি, আমি দুধে সামান্য জল ছাড়া অন্য কিচ্ছু মেশাই না। ঐ জলটুকু শুকিয়ে নিলে দুধ আমার পাকা সোনার মতোই খাঁটি। সে যাক গে, যেটা বলছিলাম। আপনাদের পাড়ায় যে দিনেদুপুরে ভূতের দৌরাত্ম্য শুরু হয়েছে, দাদা। সত্যিকারের ভূত।”
“আরে ব্যাপারটা কী খুলে বলবি তো! কখন থেকে কেবল হাবিজাবি বকে যাচ্ছিস।”
“সেকথাই তো বলতে চাইছি। আপনাদের পাড়ার নন্দীবাবু, যিনি সেইদিন মারা গেলেন, সেই নন্দীবাবু ভূত হয়ে  রাতবিরেতে পাড়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। অনেকেই নাকি দেখেছে তাকে। ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী পরে চলে ফিরে বেড়াচ্ছে। শুধু তাই নয়, কালকে নিজের বাড়িতে গিয়ে বার বার কলিং বেল টিপেছে, আর বউকে নাম ধরে ডেকে ডেকে বলেছে দরজা খুলে দেবার জন্যে। ভাগ্যিস, ওঁর বাড়িতে এখন অনেক আত্মীয়স্বজন রয়েছে। ওরাই দরজা-জানালা বন্ধ রেখে, আগুন ধরিয়ে, সর্ষে ছিটিয়ে, শাঁখে ফুঁ দিয়ে ভূত তাড়িয়েছে। তাই বলছি, একটু সাবধানে থাকবেন দাদা। বিশেষ করে সন্ধের পর আর বাইরে বেরোবেন না।” বেণু গোয়ালাও রঙ-মশলা মাখিয়ে পরিবেশন করল খবরটা।
মহেশবাবু সব শুনে কতটা বিশ্বাস করলেন কে জানে, তবে দুধটা রেখেই গায়ে একটা শার্ট জড়িয়ে বেরিয়ে পড়লেন খোঁজ নিতে।

বিকেলের মধ্যেই কেমন করে যেন সমস্ত পাড়া-প্রতিবেশী এই খবরটা জেনে গেল। শুধু পাড়ার লোকই নয়, পাশের পাড়াগুলো থেকেও দলে দলে লোক আসতে লাগল এখানে। ছেলেছোকরা তো আছেই, এমনকি মহিলারা পর্যন্ত ভিড় জমাতে লাগল নন্দীবাড়ির আশেপাশে। ভূত তথা ভূতুড়ে বাড়ি দেখার কী আগ্রহ লোকের! শোনা গেল, স্টার-দর্শন, তারকা টিভি, সি-টিভি, সহায় গোল্ড, ইত্যাদি টিভি চ্যানেল থেকেও যোগাযোগ করেছে নন্দীবাড়ির সঙ্গে। জনগণ আর মিডিয়ার কৌতূহল মেটাতে নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে নন্দীবাবুর আত্মীয়দের নাজেহাল অবস্থা।
সন্ধের ঠিক আগ দিয়ে বান্টির ছোটকা বরুণ তার কয়েকজন বন্ধু নিয়ে হাজির হল নন্দীবাড়িতে। ছোটকাকে দেখে  নন্দীজেঠি যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। কেননা দায়িত্বশীল ছেলে বলে পাড়াতে ছোটকার খুব খ্যাতি আছে। নন্দীজেঠি ছোটকাকে পেয়ে ঝরঝর করে কেঁদে বললেন, “বরুণ, এসেছিস ভাই? দেখ তো কী অদ্ভুত বিড়ম্বনায় পড়লাম। মানুষটা হঠাৎ করে চলে গেলেন, অথচ একটু শান্তিতে যে শোক পালন করব, তারও উপায় রইল না।”
ছোটকা বলল, “আচ্ছা বউদি, লোকে যে কীসব বলাবলি করছে, সেসব কি সত্যি? কাল রাতে ঠিক কী ঘটেছিল বলুন তো।”
“ওরে শুধু রাতে নয়, দিনের বেলাতেও যখন তখন একই ব্যাপার ঘটছে। তবে লোকে যেসব বাড়াবাড়ি কথা বলছে, সেগুলো সত্যি নয়। আমাদের ডোর বেলটা কে যেন বারে বারে বাজিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু মানুষটাকে দেখা যাচ্ছে না।”
“কিন্তু লোক যে বলছে, নন্দীদা নাকি সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী পরে…”
“ওরে, ওগুলো সব বাজে কথা। মানুষটাকে দেখতে পেলে তো মনটায় শান্তি পেতাম।” বলেই নন্দীজেঠি আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।
ছোটকা তাকে সান্ত্বনা দিতে বলল, “কাঁদবেন না, বউদি। যা হবার তো হয়েই গেছে। এখন আপনি কাঁদলে দাদারও কষ্ট হবে।”
নন্দীজেঠি বললেন, “জানিস বরুণ, এই লোকজনের ভিড়ে একটু প্রাণ খুলে কাঁদতেও পারছি না। টিভি চ্যানেলের লোকগুলোও একই প্রশ্ন করে চলেছে বারবার। মানুষটা নাকি সাদা পোশাক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কোত্থেকে যে এসব খবর পেয়েছে কে জানে। এমন হলে তো ভালোই হত। তাঁকে আবার দেখার জন্যে তো আমি মুখিয়ে আছি। কিন্তু তিনি বারে বারে আসছেন ঠিকই, কিন্তু অদৃশ্য হয়েই থাকছেন।”
নন্দীগিন্নির কথাও শেষ হয়নি, অমনি আবার তাদের ডোর বেলটা বেজে উঠল। ছোটকা ও তার বন্ধুরা সঙ্গে সঙ্গে ছুটল সদর দরজার সামনে যেখানে বেলটা আছে। কিন্তু সেখানে কাউকে দেখা গেল না। আশেপাশেও কেউ নেই।  নন্দীজেঠিও পেছনে পেছনে এসেছেন। তিনি বললেন, “তোদের নন্দীদাদা আবার এসেছেন রে বরুণ। মানুষটা নিশ্চয়ই আমাকে কিছু বলতে চান। আমি একা থাকলে হয়তো দেখা দিতেন।”
ছোটকা মুখে কিছু বলছে না। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা যাচ্ছে। বন্ধুদের নিয়ে ফিসফিস করে কীসব যেন আলোচনা করল ছোটকা। এমন সময় বেলটা আবার বেজে উঠল। এবারে ছোটকারাও রীতিমতন চমকে উঠল। কেউ কোত্থাও নেই, অথচ বেলটা কী করে বাজল? ছোটকার মতো সাহসীদেরও ভাবিয়ে তুলেছে। ছোটকার বন্ধু ভোম্বলদা খানিক ভিতুগোছের ছেলে। সে বলল, “বরুণ, আমার মনে হয় এখান থেকে কেটে পড়াই ভালো। অশরীরীদের সঙ্গে আমরা কি পেরে উঠব?”
তাকে এক ধমকে থামিয়ে দিলেও ছোটকাকেও খুব একটা নিশ্চিন্ত মনে হল না। বন্ধুদের সঙ্গে আরও বেশ কিছু গম্ভীর আলোচনা হল। হঠাৎ ছোটকার কী মনে হতেই নন্দীজেঠীর কাছে একটা চামচ চাইল। তারপর চামচটা হাতে নিয়ে একটা চেয়ারে উঠে দাঁড়িয়ে দেওয়াল থেকে ডোর বেলের যন্ত্রটা নামিয়ে আনল। আর নিচে নেমে যন্ত্রটা উলটিয়ে দেখতেই ভূত ধরা পড়ে গেল।
কিন্তু ভূতকে দেখে নন্দীজেঠি মোটেই খুশি হলেন না। নন্দীজেঠুকে আবার দেখতে পাবেন এমন আশায় বুক বেঁধেছিলেন তিনি। কিন্তু তার মতো অনেকেই খুশি হল না জলজ্যান্ত ভূতটাকে দেখেও। খুশি হল না ‘খবর’ ধরতে আসা টিভি চ্যানেলের লোকেরা, খুশি হল না মুখরোচক পরচর্চা তথা পরলোক চর্চা করতে ভালোবাসা প্রতিবেশীরা। কেবল খুশি হল সেই ‘ভূত’ যে ধরা পড়ল বলেই মুক্তি পেল।
ব্যাপারটা তাহলে খুলেই বলি। ডোর বেলের যন্ত্রটা দেওয়াল থেকে খুলে আনার পর দেখা গেল, একটা বড়সড় টিকটিকি কী করে যেন যন্ত্রটার ভেতরে আটকা পড়ে গেছে। ওটার থেকে বেরোবার চেষ্টায় যখনই টিকটিকিটা নড়ছে, যন্ত্রটায় এমন কম্পন ও সংযোগ স্থাপন হচ্ছে যে, ওটা বেজে উঠছে। ছটফট করতে করতে টিকটিকিটা ক্লান্ত হয়ে যতক্ষণ থেমে থাকছে, বেলটাও বাজছে না। কিন্তু একটু পরেই মুক্তির আশায় ওটা আবার নতুন উদ্যমে শরীর নাড়ালেই বেলও বেজে উঠছিল। বলাই বাহুল্য, ছোটকারা যন্ত্রটার থেকে টিকটিকিটাকে মুক্ত করার পর আর নন্দীজেঠুর ভূত এসে বেল বাজায়নি কখনও।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ বিশ্বদীপ পাল

2 comments:

  1. দারুণ গল্প। নিপাট মজার এবং তরতরিয়ে এগিয়ে যাওয়া। গতিময়।

    ReplyDelete