গল্পঃ মুখোশঃ বৈশাখী ঠাকুর



আমাদের এখানে জ্যৈষ্ঠ মাসে জামাইষষ্ঠীর দিন থেকে একটা মেলা শুরু হয়। মা বিন্ধ্যবাসিনীর পুজোকে কেন্দ্র করে মেলাটা হয়। এ চত্বরে যত মেলা হয় তার মধ্যে এই মেলা সবচেয়ে বিখ্যাত। মায়ের পুজো  তো আছেই, এছাড়া নানা জায়গা থেকে ব্যাপারীরা তাদের পসরা নিয়ে আসে। একদিকে যেমন ক্লিপ, দুল, হার, হরেক সাজের জিনিস পাওয়া যায় তেমনি ঘর সাজাবার জিনিসেরও অভাব নেই। বড়ো বড়ো স্টিকার, শো-পিস, প্লাস্টিকের রঙিন ফুলপাতায় মেলা প্রাঙ্গণ জ্বলজ্বল করতে থাকে। কাপ-ডিশের সম্ভারও চোখে পড়ার মতন। বেতের জিনিস নিয়ে আসেন এক ব্যাপারী সেই ত্রিপুরা থেকে। কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুলের দোকানে তো ভিড় ঠেলে ঢোকা দায়। প্রতিবছর ফজলভাই টিয়া, চন্দনা, বদড়ি পাখি নিয়ে আসে। কচিকাঁচারা ফজলভাইয়ের আশেপাশে কেবল ঘোরাঘুরি করে ওই পাখিদের টানে। কাঠের দোকানে প্রবীণাদের জমায়েত সবচেয়ে বেশি। পিঁড়ে, বটি, হাতা, খুন্তি, বেলুনচাকি, নুনদানি, মরিচদানি, নারকোল কুড়ুনি, পিঠের ছাঁচ - এইসব এখন দুর্লভ হয়ে উঠেছে। মেলাতলা ছাড়া কাঠের এই সম্ভার বড়ো একটা চোখে পড়ে না। অঞ্চলের অনেকেই এ-মেলার জন্য অপেক্ষা করে থাকে নির্দিষ্ট কিছু জিনিস কিনবে বলে। তাছাড়া বাচ্চাদের খেলনা-পুতুলের কথা তো ছেড়েই দিলাম। বাবা-মায়েদের প্রাণ ওষ্ঠাগত বায়নার ঠ্যালায়। উপরন্তু খাবারের অঢেল আয়োজন। রোল, ফুচকা, মোগলাই, ফ্রাই, মোমো, বিরিয়ানি, আইসক্রিম ইত্যাদি। ঝালমুড়ি, ভেলপুরি, ঘুগনি এইসবও বাদ নেই।
বছর বছর তো এসব থাকেই। এবারেই রিঙ্কার একটা নতুন দোকান চোখে পড়ল। আগেরদিনই বন্ধুদের সাথে এসে দেখে গেছে। বিচিত্রসব মুখোশ নিয়ে বসেছেন এক মাঝবয়সি ভদ্রলোক। মুখোশ একেবারে মেলায় নেই বললে মিথ্যে কথা বলা হবে। কিন্তু তা ওই পাতলা প্লাস্টিকের মিকি-মাউস, রাক্ষস আর স্পাইডারম্যানেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু এটা শুধু মুখোশের একটা স্টল। কেবলই মুখোশ। অদ্ভুতসব মুখোশ। বিচিত্রসব দেশ-বিদেশের বড়ো বড়ো মুখোশ। দামও নেহাত কম নয়। তাই বন্ধুদের সাথে এসে রিঙ্কা একটাতেও হাত দিতে পারেনি। শুধু চেয়ে চেয়ে প্রতিটা মুখোশ অনেক সময় নিয়ে দেখেছে। রঙের বাহার আর তুলির নিখুঁত টান তাকে মুগ্ধ করেছে। দেখে দেখে তার কেমন ঘোর লেগে গেছিল। সে ইস্কুল থেকে ফেরার পর খেলতে যাবার নামে মেলা-প্রাঙ্গণে এসে রোজই মুখোশের দোকানে চলে আসত। বিশেষ করে সবুজ রঙের একটা মুখোশ যেন তাকে কেবল টানে। মেঝের যেমন মোজাইক হয়, তেমন ছোটো ছোটো সবুজ টুকরো দিয়ে যেন বানানো। রোজ রোজ আসতে আসতে ভদ্রলোকের সাথে আলাপও হয়ে গেছে ভালোই। তিনি তাঁর এই মুখোশ বানানোর এক বিচিত্র কাহিনি শুনিয়েছেন।
ভদ্রলোকের নাম বটবিহারী। ওঁরা নাকি চার পুরুষ ধরে মুখোশ বানাচ্ছেন। ওঁদের মুখোশের খ্যাতি আজ দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষত আগে নাটকে ভীষণ প্রয়োজন হত। তা সেই মুখোশ এখন বহু জায়গায় যায়। আগে পৌরাণিক চরিত্রের ওপর মুখোশই বেশি বানানো হত কারণ, চাহিদা ছিল বিপুলভাবে। বিক্রিও হত প্রচুর। কিন্তু দিনে দিনে রুচির পরিবর্তনের সাথে সাথে মুখোশ তৈরিতেও অনেক বদল আনতে হয়েছে। এরই মধ্যে তাঁদের এক পূর্বপুরুষ ভাগ্য অন্বেষণে দেশবিদেশ ভ্রমণে  বেরিয়েছিলেন। সঙ্গে নিয়েছিলেন নিজেদের তৈরি বেশ কিছু মুখোশ। জাহাজে করে ঘুরতে ঘুরতে উনি উপস্থিত হয়েছিলেন উত্তর আমেরিকা মহাদেশের একপ্রান্তে। সেখানে নেমে ওঁর এত ভালো লেগে যায় সেই জায়গা যে উনি সেখানে বেশ কিছুদিন থেকে যান। সেইসব স্থানীয় মানুষদের সাথে মিশে তাদের ভাষা, আদবকায়দা সব রপ্ত করেন। তাদের থেকেই তিনি এক অভিনব কৌশল শেখেন মুখোশ বানানোর। কী সেই অভিনব কৌশল তা অবশ্য বলেননি বটবিহারী। তাঁর দাদু তাঁর ছেলেকে দিয়ে যান এই বিদ্যা। তিনি তাঁর ছেলেকে দিয়ে যান। ওঁর বাবা আবার মৃত্যুর আগে এ বিদ্যা তাঁকে শিখিয়ে যান। বংশানুক্রমে এ-বিদ্যা তাঁদের পরিবারে বয়ে চলেছে।
কী সেই বিদ্যা, এ নিয়ে হাজার মাথা খুঁড়েও কিছু টের পায় না রিঙ্কা। আর অত ভেবে লাভও নেই। তবে ওই অভিনব মুখোশ তার একটা চাই। চাই-ই চাই। অতএব রিঙ্কা তার ভাঁড়ের সব পয়সা বার করেও দুশো টাকা জড়ো করতে পারল না। অনেক কষ্টে ঠাম্মা আর কাকুনের কাছ থেকে পয়সা জোগাড় করে সেদিন বিকেলে সে নাচতে নাচতে ফের মেলাতলায় গেল। তাকে দেখেই বটবিহারী ঠিক টের পেয়েছন।
“কী, পয়সা জোগাড় হল?”
“হ্যাঁ গো, শেষপর্যন্ত হয়েছে।”
“তা কোনটা নেবে? ওই সবুজটাই?”
“হ্যাঁ। ওটাই আমার পছন্দ।”
“কিন্তু ওটার যে দাম অনেক বেশি। তুমি অন্য একটা পছন্দ করো। আমি হাতের কাজটা সেরে নিই।”
“না। আমি ওটাই নেব। ওটার স্বপ্নই আমি দিনরাত দেখি।”
বটবিহারী চেয়ারে উঠে মুখ ঘুরিয়ে মুখোশগুলো সব ঝাড়ছিলেন। প্রতিদিনের কাজ তাঁর। রিঙ্কার কথা শুনেই তৎক্ষণাৎ মাথা ঘোরালেন। অদ্ভুত চোখে তার দিকে তাকালেন। রিঙ্কার মনে হল মুখটা কেমন রক্তশূন্য হয়ে গেছিল বটবিহারীর। চোখেমুখে ভয়ের ভাব।
“আমি দুশো টাকা এনেছি গো। এই যে দেখো।”
“তুমি যে নাছোড়বান্দা দেখছি।”
“হ্যাঁ। আমি তো কত সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখছি মুখোশটাকে নিয়ে।”
“কী দেখছ রিঙ্কা তুমি?” বটবিহারী তার দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করলেন। বড়ো আগ্রহ, বড়ো কৌতূহল তার দু’চোখে।
“সে এক আজব দুনিয়া গো। কী বলব তোমায়। না দেখলে বিশ্বাসই হবে না। বহু পুরনো দিনের অলিগলি রাস্তা দিয়ে আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি। বড়ো বড়ো পিরামিডের মতো সব স্তম্ভ। কত কত সিঁড়ি। সেখানকার মানুষদের কী অদ্ভুত পোশাক-পরিচ্ছদ! সে না দেখলে বিশ্বাস হবে না।”
“দাঁড়াও দাঁড়াও, রিঙ্কা। তুমি কি এইসব স্বপ্নে দেখেছ! এ হতেই পারে না। তুমি নিশ্চয়ই আমার চোখের আড়ালে এ-মুখোশ পরে দেখেছ।”
রিঙ্কার উজ্জ্বল মুখটা মুহূর্তে নিষ্প্রভ হয়ে গেল।
“এটা তো তোমাকে দেওয়া যাবে না, রিঙ্কা দিদিমণি। অজান্তে তোমার ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।”
“না, আমার চাই ওটা দাদু। আমার চাই-ই চাই। তবে আমি পরে দেখেছি এটা তুমি ঠিক কথাই বলেছ। সেদিন যখন তুমি কোণের দোকানে গিয়ে চা খাচ্ছিলে, আমি লাঠি দিয়ে পেড়ে ওই মুখোশ পরে দেখেছি। সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা! তারপর থেকেই ঠিক করেছি, ওটা আমাকে কিনতেই হবে। আমাকে ওটা পেতেই হবে।” বলেই কাল বিলম্ব না করে দ্রুত স্টলের পাশে রাখা একটা লম্বা লাঠি নিয়ে ওপর থেকে সবুজ মুখোশটাকে নাড়িয়ে দিল। অমনি সেটা ওপর থেকে পড়ে যেতেই সে কুড়িয়ে নিল মাটি থেকে। তারপর দুশো টাকা স্টলে রেখে ছুট ছুট।
ততক্ষণে বটবিহারী নেমে এসেছেন তাঁর টুল থেকে। তিনিও পেছনে ধাওয়া করলেন। ছুটছিল বলে হাওয়ায় রিঙ্কার চুল উড়ছিল। বটবিহারী তার নাগাল না পেয়ে শেষপর্যন্ত তার চুল ধরার চেষ্টা করলেন। হাত বাড়িয়ে কয়েক গোছা চুল এল বটে তবে রিঙ্কা নাগালের বাইরে পালাল।
একটু চিন্তায় রইলেন বটবিহারী। মেয়েটা বিপদে না পড়ে! চুলগুলোকে পাকিয়ে হাতে রেখে দিলেন যত্ন করে।
কয়েকদিন আর কেউ কিছু খবর দিল না বলে বটবিহারী ভাবলেন, তবে বুঝি ফাঁড়া কাটল। এবার তাঁদের তল্পিতল্পা গুটিয়ে ফিরে যাবারও সময় হয়েছে।
যেদিন চলে যাবেন সেদিন আচমকাই এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক এলেন। তাঁর পাশের স্টলের ছেলেটা সঙ্গে করে নিয়ে এল। “ও বটবিহারীদা, তোমার খোঁজই করছেন মনে হচ্ছে।”
উদ্বিগ্ন মুখে উসকোখুসকো চুলে এক ভদ্রলোক ঢুকলেন। “আপনারই মুখোশের দোকান?”
“হ্যাঁ। কেন বলুন তো!”
“আমার ভাইঝি দিন কয়েক আগে একটা মুখোশ নিয়ে গেছিল। কিছু জানেন সে ব্যাপারে?”
“কত লোকই তো মুখোশ নিয়ে যায়, বাবু। এভাবে কি কিছু বলতে পারি বলুন!”
“ছোটো মেয়ে ছিল। রোজ আসত আপনার এই দোকানে। রিঙ্কা নাম তার।”
“হ্যাঁ বাবু, বুঝেছি বুঝেছি। বলুন বলুন। সবুজ রঙের মুখোশ নিয়ে গেছিল তো।”
“হ্যাঁ। ওটা একটা অ্যাজটেক মুখোশ। আমি দেখে আশ্চর্য হয়ে যাই। সেই প্রসঙ্গে ওকে আমি মায়া সভ্যতার কাহিনি শুনিয়েছিলাম। তাই ভেবেছিলাম...”
“কী ভেবেছিলেন? কী হয়েছে, বাবু? আমাকে সব খুলে বলুন।” বটবিহারীর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে।
“রিঙ্কা বলত যে ও অনেক কিছু দেখতে পাচ্ছে। আজব পোশাক-পরিচ্ছদ পরা মানুষ, পিরামিডের মতো স্থাপত্য, ভিন্ন রকমের মন্দিরে কত হিরে–সোনাদানা। আমি ভাবতাম, আমার গল্প শুনে বুঝি ও কল্পনা করে এমন বলত। কিন্তু দিনে দিনে ও যেন কেমন অন্যমনস্ক হয়ে যেতে লাগল আর কেবল ঘর বন্ধ করে থাকতে পছন্দ করত। প্রথম প্রথম ভাবতাম বুঝি পড়াশোনা করছে। তারপর আওয়াজ শুনতে পেতাম ঘর থেকে। কার সাথে যেন কথা বলছে, গল্প করছে। একদিন জানালার ফাঁক দিয়ে দেখলাম, মুখোশটা পরে কী অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাত-পা নাড়ছে। যেন যুদ্ধ করতে যাচ্ছে বীরবিক্রমে। আর লেখাপড়া, ইস্কুল কোনও কিছুতে যেন মন নেই আর। অথচ ওর কিন্তু ইস্কুলে খুব সুনাম। সব বিষয়ে মনোযোগী। ইস্কুলের সব অনুষ্ঠানে উৎসাহের সাথে যোগদান করে। কিন্তু দিনে দিনে ও কেমন যেন হয়ে যাচ্ছিল। আমার বিশ্বাস, ওই মুখোশই এর জন্য দায়ী। গতকালের ঘটনাতে আমরা তো রীতিমতো বিস্মিত ও আতঙ্কিত। তারপরই ভাবলাম আপনার খোঁজ না করলেই নয়।”
“গতকাল কী ঘটনা ঘটেছিল, বাবু?”
“সারাদিন কাল গৃহবন্দী। নাওয়া  নেই, খাওয়া নেই - কী যে সব করছে চার দেওয়ালের ভেতর কে জানে! অনেক ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকির পরও সাড়া না পেয়ে শেষে আমরা যখন দরজা ঠেলে, বলতে গেলে প্রায় ভেঙে ঘরে ঢুকলাম, দেখলাম, কী সাংঘাতিক মারমুখী চেহারা ওর! এমন অভিনব কায়দায় হাত ঘুরিয়ে ওর পেনসিল দিয়ে আমদের চাকর রামুর দিকে মারল যে ওর একটা চোখ প্রায় অন্ধ হতে বসেছে। আমরা তো অবাক! শান্তশিষ্ট নিরীহ মেয়ের এ কী আমূল পরিবর্তন! রিঙ্কাকে এই চেহারায়, এই রূপে কখনও দেখিনি। আমি কোনওমতে ওর হাত থেকে মুখোশ কেড়ে নিয়ে চলে এসেছি। রিঙ্কাকে নিয়ে বাড়ির লোকেরা ডাক্তারের কাছে গেছে। কিন্তু আমি এসেছি আপনার  কাছে। আমার বিশ্বাস, আপনিই পারবেন ওকে ঠিক করতে। কেন এমন হল বলুন দেখি? আর আমাদের মেয়েটা আবার আগের মতন কবে হবে?”
“একবার মুখোশ যখন নিয়ে এসেছেন তখন চিন্তা নেই। ওর আর কিছু হবে না। এবার হয়তো অন্য কেউ...”
“কী বলছেন, বলুন তো! আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না।”
“কিছু না, বাবু। আমায় এখন কাজে বসতে দিন। আমার হাতে বেশি সময় নেই। কখন কী হয়ে যায়! রাতের মধ্যে রিঙ্কা ঠিক হয়ে যাবে। আমি কথা দিলাম। এবার আমায় কাজে বসতে দিন, বাবু। আজ আর যাব না আমি। কালকে যাব। আজ রাত জেগে কাজটা সারি।”
“কিন্তু এরকম অতিপ্রাকৃত অদ্ভুত মুখোশ বানানোর পেছনে আপনার কারণটা কী? ছোটো বাচ্চারা পরবে, সেখানে আপনি এরকম কাজ করবেন কেন?”
“সে এক লম্বা গল্প, বাবু। আমরা নিরুপায়। আমি ঠিক রিঙ্কার ব্যবস্থা করব। আপনি চিন্তা করবেন না।”
রিঙ্কার জেঠুর প্রস্থানের পর উদাস হয়ে পড়লেন বটবিহারী। মনে পড়ে গেল তার পরিবারের সেই অভিশপ্ত কাহিনি। তাঁর যে পূর্বপুরুষ উত্তর আমেরিকায় গিয়েছিলেন, তিনি এক অদ্ভুত গুনিনের পাল্লায় পড়েছিলেন। গুনিন গুণী মানুষও ছিলেন বটে। হাতের কাজ এত অপূর্ব ছিল যে ওঁর কাছ থেকে কিছু হাতের কাজ শেখার আগ্রহ ছিলও বটবিহারীর পূর্বপুরুষ কেষ্টবিহারীর। তাই গুনিনকে তোয়াজ করেই চলতেন। সেই গুনিন কীভাবে যেন বেশ কিছু জিনকে বশ করে সব কাজ করাতেন। এই গূঢ় রহস্যটা জানার প্রবল আগ্রহ কেষ্টবিহারীর। এই জিনরাও কত সময় পরিশ্রম করে শুধু মুখোশ নয়, আরও অনেক কাজও করে দিত। দূরদূরান্তে গিয়ে খোঁজ আনত প্রয়োজন হলে। বাজারহাট, রান্নবান্না সবই চলত সমানতালে। যা হুকুম করা হত তাই মুহূর্তে তামিল করে দিত। কিন্তু এদের বশ করার রহস্যটা গুনিন কিছুতেই বলতেন না। আর কেষ্টবিহারীরও অদম্য জেদ, তিনি জানবেনই এদের বশ করার মন্ত্র। রোজই তিনি নজর রাখেন গুনিনের ওপর। কিন্তু কখনওই কিছু দেখতে পান না। তার মানে গভীর রাতেই যা করার করেন গুনিন। কেষ্টবিহারী চুপিসারে বেশ ক’টা রাত জেগে রইলেন। তারপর দেখতে পেলেন, সিঁড়ির তলার একটা গোপন ঘরে গুনিন রোজ চলে যান। একদিন তাল করে তিনিও গেলেন সে ঘরে। গিয়ে তো হতবাক। কতরকমের কিম্ভূতকিমাকার মুখোশ দেয়ালে ঝুলছে! গুনিন একটা ছোটো আলমারি থেকে বেশ কিছু ছোটো ছোটো বাক্স বের করলেন। সেখানে কারও জামার ছোটো টুকরো, কারও মাথার চুল, কারও নখ ইত্যাদি রাখা যত্ন সহকারে। সেগুলো নিয়ে কী দুর্বোধ্য মন্ত্র উচ্চারণ করার সাথে সাথে মুখোশগুলো নড়াচড়া শুরু করে দিল। প্রথমদিন আর সেখানে থাকেননি কেষ্টবিহারী। ফেরার সময় কেবল লক্ষ করেছিলেন আরও কিছু বড়ো বাক্স রাখা একটা কোণে। মনে অদম্য কৌতূহল নিয়ে তিনি ফিরে এলেন। রহস্য যেন আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কিন্তু সারারাত আর দু’চোখের পাতা এক করতে পারলেন না। পাতালঘর কেবল তাঁকে টানতে লাগল।
শেষপর্যন্তও আর থাকতে না পেরে সেদিন ভোররাত্রে ফের তিনি চুপিসারে সেই পাতালঘরে প্রবেশ করলেন। বড়ো বাক্সগুলো সাহস করে খুলতেই চমকে উঠলেন তিনি। প্রতিটা বাক্সে যে একটা করে মড়ার খুলি! কিন্তু শেষ বাক্সটা তাঁকে আরও আশ্চর্য করে দিয়েছিল। শেষ বাক্সের মড়ার খুলির ওপর সবুজ মোজাইকের মতো টুকরো টুকরো জিনিস বসানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তার মানে কেষ্টবিহারী যা ভাবছেন, সত্যিই কি তাই! এইসব মুখোশ মড়ার খুলির ওপর তৈরি করা হয়েছে! তিনি হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে পরে দেখলেন একবার। ব্যস! অমনি এক বিচিত্র অনুভূতি হতে থাকল কেষ্টবিহারীর। কোন অন্ধকার গলিতে যেন উপস্থিত হয়েছেন তিনি। রাত্রির সময়। নিজেকে কেমন চোর চোর মনে হচ্ছিল। রাতের অন্ধকারে যেন চুরি করতে বেরিয়েছেন। চারপাশে যেন আচমকাই কাদের সব ফিসফিস শব্দ শুনতে পেলেন। কারা যেন এগিয়ে আসছে তাঁর দিকে। হালকা আগুনের হলকা অনুভব করলেন। আচমকাই মনে হল, পরমুহূর্তে সব দূরে সরে গেল। তারপরই শূন্য থেকে একটা হাত তাঁর গলা টিপে ধরল। ভালো করে গলা দিয়ে আওয়াজ পর্যন্ত বের করতে পারলেন না কেষ্টবিহারী। ভয়ে চোখ যখন বুজেই ফেলেছেন, বুঝেছেন বিদেহী আত্মার হাতে তাঁর মৃত্যু অনিবার্য। ঠিক সেই সময় মনে সেই গুনিনের কণ্ঠস্বর কানে এল, “কেন এসেছিলি? বল, কেন এসেছিলি?”
গলার কাছটা হালকা হতেই একটু দম নেবার চেষ্টা করলেন কেষ্টবিহারী। তারপর হাঁপাতে  হাঁপাতে কোনওমতে বললেন, “মুখোশ বানানো শিখতে। এর বাইরে আর কিচ্ছু না, হুজুর।”
“সত্যি কথা বলছিস?”
“বিশ্বাস করুন, হুজুর। একদম সত্যি কথা। আপনাকে ছুঁয়ে বলছি।”
গুনিন তাঁর চোখে চোখ রেখে নির্নিমেষে বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। সে সময় কেষ্টবিহারীর বুঝি দম বন্ধ হয়ে আসছিল। অতঃপর গুনিন বললেন,
“যা। আজ সন্ধেবেলা চান করে ঠিক সাতটার সময় পাতালঘরে আসবি।”
সেদিনের সন্ধে ছিল এক চিরস্মরণীয় রাত কেষ্টবিহারীর জন্য। তিনি যখন প্রবেশ করলেন পাতালঘরে, দেখতে পেলেন গুনিন প্রতিটা বাক্সই খুলে রেখেছেন তাঁর জন্য। গুরুগম্ভীর স্বরে তাঁকে আহ্বান জানিয়ে বললেন, “আমি আর বেশিদিন এই পৃথিবীতে নেই। কিন্তু তার আগে আমার এই বিদ্যা কাউকে দিয়ে যেতে হবে। তোর যখন এত আগ্রহ তখন তোকেই দিয়ে যাব। কিন্তু তুইও এ পৃথিবী ত্যাগ করতে পারবি না এ-বিদ্যা কাউকে না দিয়ে। কিছু নিয়ে আসিসনি এই ধরণীতে, তাই কিছু নিয়েও যেতে পারবি না।”
“কিন্তু সে টের পাব কেমন করে, হুজুর? তার আগেই যদি মরে যাই?”
“সে আমি বলে দেব কী করে টের পাবি, আর তুই এ-বিদ্যা কাউকে না দিয়ে গেলে তোর মৃত্যুই হবে না। যেমন তুই আমার সামনে হাজির হয়েছিস তেমনি কেউ নিজে সাগ্রহে তোর কাছে এসে মুখোশ বানানো শিখতে চাইবে। না হলে তোর বংশধরকে এই বিদ্যা দিয়ে যাবি।”
“আপনি যেমন বলবেন, হুজুর।”
“এই দেখ, আমার এইসব মুখোশ সব মরা মানুষের খুলির ওপর তৈরি করা। যে এই মুখোশ পরবে সে এই মানুষের জীবদ্দশার জীবনযাপন দেখতে পাবে। তার সাথে কথা বলতে পারবে। এই মুখোশ যে পরবে তাকে নিয়ে যাবে যার খুলি তার সময়ক্রমে। কিন্তু...”
চোখদুটো বড়ো বড়ো করে শুনছিলেন কেষ্টবিহারী।
“কিন্তু কী, হুজুর?”
“যে পরবে সে বাঁধা হয়ে থাকবে তোর কাছে।”
“বুঝলাম না, হুজুর।”
হা হা করে অট্টহাসি হাসলেন গুনিন। “এই যে তুই পরলি, তুই বাঁধা হয়ে থাকলি। আমি না এলে তুই মুক্তি পেতিস না তো!”
“না, হুজুর।”
“এখন তো তুই আমার চোখের সামনে নাগালের মধ্যে রয়েছিস। ধর, যদি কেউ দূরে রইল অথচ জানতে পারলি সে ভীষণ বিপদে পড়েছে কোনওক্রমে এই অতিপ্রাকৃত মুখোশ পরে। তখন!”
“তখন কী হবে, হুজুর? যে পরবে সেই বাঁধা হয়ে থাকবে?”
“একদমই তাই। আমি জানি তুই কি ভাবছিস। তোর যখন মুখোশের ব্যাবসা, তুই একটামাত্র মুখোশ এমন তৈরি করে রাখবি। সচারচর কাউকে বিক্রি করবি না। তোর সময় হয়ে এলে দেখবি কোন যাদুবলে ঠিক কেউ ও-মুখোশ পরে নেবে।”
“তারপর, তারপর কী হবে হুজুর! তার তো ক্ষতি হয়ে যাবে! ছোটো ছোটো বাচ্চারা তো আমার মুখোশ কিনতে আসে। এ আমি পারব না।”
“না, তুই বুঝতে পারছিস না। যে মুখোশটা পরবে সে সেই মৃত ব্যক্তির সময়ক্রমে চলে যাবে। দেখতে পাবে তার জীবনযাপন। তার সত্ত্বা উজ্জীবিত হলে হয়তো কথা বলতে পারবে তার সাথে। তার জীবনযাপনের নানা দিক উঠে আসবে। এ এক নেশার মতন। এমন অদ্ভুতুড়ে ঘটনা ঘটলে মানুষ কেবল সেটা ছায়াছবির মতো বার বার দেখতে চায়। স্বপ্নলোকের মতো মনে হয় সেই অতীতকাল। কিন্তু এর ফলে তার বর্তমান জীবনযাপন যারপরনাই ব্যাহত হয়। এই জীবনের ব্যক্তিসত্ত্বা সে প্রায় ভুলতে বসে। তার মুক্তির তখন সতত প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সেই হেতু সেই ব্যক্তির শরীরে স্পর্শ করা কোনও জিনিস তোকে সংগ্রহ করতে হবে। সেই ব্যক্তির আদলে একটা মুখোশ বানিয়ে তুই তার সত্ত্বাকে বেঁধে রাখবি।”
“সেই ব্যক্তি তখন সুস্থ হয়ে যাবে?”
“হ্যাঁ, সুস্থ হয়ে যাবে। কিন্তু একটা শর্ত আছে।”
“কী সেই শর্ত?”
“তোকে পুরনো মুখোশটা সম্পূর্ণরূপে বিনাশ করতে হবে। করলে নতুন ব্যক্তির মুখোশে তার সত্ত্বা তোর কাছে বাঁধা পড়ে গেল। পুরনোটা মুছে গেল। তারপর তোর দায়িত্ব তোর এই বিদ্যা তুই ইহলোক ত্যাগ করার আগে কাউকে প্রদান করে যাবি। নচেৎ তোর মৃত্যুই হবে না। তুই হাঁকুপাঁকু করবি যোগ্য কাউকে এ বিদ্যা প্রদান করার জন্য। নইলে তোর যে মুক্তি নেই। তাই তোকে দিয়ে যেতেই হবে। চাইলে তোর পরিবারের মধ্যেই দিয়ে যেতে পারিস। তবে এর সমস্ত দিক সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল করতে হবে সেই ব্যক্তিকে। তাকে প্রতিটা জিনিস অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। নচেৎ তৈরি থাকতে হবে বড়ো কোনও বিপর্যয়ের জন্য।”
“কিন্তু যার মুখোশ বানালাম তার অন্য কোনও বিপদ হতে পারে কি?”
“যতক্ষণ না অন্য কোনও ব্যক্তি পরছে সেই মুখোশ, সে সানন্দে তার স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে।”
শেষের কথাগুলোই যা আশা জাগিয়ছিল বটবিহারীর মনে। বাবার প্রতিটা কথা তাঁর এখনও স্পষ্ট মনে আছে। খুব শীঘ্র তাঁকে সব ব্যবস্থা করতে হবে। কোনও পাণ্ডববর্জিত জায়গায় চলে যাবে মুখোশ নিয়ে। লুকিয়ে রাখবে যাতে চট করে কারও নজরে না পড়ে। ছোটো মেয়েটা না জানি কী অবস্থায় আছে কে জানে!
রিঙ্কার জেঠু চলে যেতেই বটবিহারী কাজে বসলেন। রিঙ্কার মাথার চুল তিনি সযত্নে গচ্ছিত রেখেছিলেন একটা ছোট্ট কৌটোয়। সেটা বার করে ফের মুখোশ বানাতে বসলেন।

রাত যখন গভীর রিঙ্কা ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগল। সকালে একদম আগের রিঙ্কাকে ফিরে পাওয়া গেল। রিঙ্কার জেঠু বুঝতে পারলেন, এ বটবিহারীর ভেলকি।
বটবিহারীকে ধন্যবাদ জানাবেন বলে সকাল সকালই বেরিয়েছিলেন। কিন্তু এসে দেখলেন, দোকান তালা মারা। সবাই বলল, বটবিহারী বাজারের দিকে গেছেন। বাজারের দিকে যেতে যেতেই চোখে পড়ল একটা ট্রাকে করে তাঁর সব মুখোশ স্ট্যান্ডে ঝুলিয়ে বটবিহারী চলে যাচ্ছেন। সব মুখোশ সেই আগের মতোই আছে। সবুজ মুখোশটা কেবল দেখতে পেলেন না। অমন বিদঘুটে বলে হয়তো নষ্ট করে দিয়েছে। তার জায়গায় একটা ছোটো মেয়ের মুখের আদলে মুখোশ দেখলেন। মুখের আদলটা ঠিক রিঙ্কার মতো লাগল। রিঙ্কার জেঠুর বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল।
_____

গ্রাফিক্সঃ পুণ্ডরীক গুপ্ত

No comments:

Post a Comment