গল্পঃ যেমন ছাড়া বনের পাখিঃ রম্যাণী গোস্বামী



তিতলি বাড়ি থেকে নিয়ে আসা কুলের আচার-ভর্তি টিফিন বাটিটা ঠেলে দিল অর্কর দিকে। আঙুলে লেগে থাকা আচার চকাস চকাস করে চেটে নিয়ে ঠিক যেন সভার কর্ত্রীর ভূমিকায় নেমে পড়ে শাম্বর উদ্দেশ্যে বলে উঠল, “নে নে, এবার শুরু কর। একদম ফার্স্ট থেকে বলবি। কিচ্ছু বাদ দিবি না যেন।”
শাম্বকে ঘিরে বসেছে ওর তিন প্রাণের বন্ধু। কৌশিক, তিতলি আর অর্ক। এটা শাম্বদেরই বাড়ি। বছরের শেষদিন। বারুইপুরের বাতাসে হিম হিম পরশ। রবিবারের শেষ-দুপুরের মিঠে রোদ গায়ে মেখে আড্ডার মুডে ফুরফুর করছে চারজনের মন। খোলামেলা আয়তাকার বারান্দায় মাদুর পেতে বসেছে ওরা সবাই। শাম্ব কিছু বলার আগেই অর্ক তড়িঘড়ি ওকে বাধা দিয়ে বলল, “কী কী গেম খেললি ওখানে সেটা আগে বল।”
“না, না, আগে আমাদের বল যে জায়গাটা কেমন। কতরকমের ফুল-পাখি-গাছপালা দেখেছিস তুই? মানে কী কী ফ্লোরা আর ফনা সেটাই জানতে চাইছি।” বিজ্ঞের মতো বলল কৌশিক।
“খুব ঠাণ্ডা ছিল ওখানে, না রে? বরফ পড়েছিল নাকি?” তিতলি একগাদা আশঙ্কা নিয়ে জিগ্যেস করল।
“পাগলি একটা!” কৌশিক একটা গাট্টা মারল তিতলির মাথায়। “নিউজে বলেছে যে এবার ছাব্বিশে ডিসেম্বরে সান্দাকফুতে বরফ পড়েছে। সাম্ব যেখানে গিয়েছিল সেখানে তো অনেক লো অল্টিটিউড। তাই না রে শাম্ব?”
শাম্ব এবার হেসে ফেলল। দু’হাত তুলে বন্ধুদের অভয় দেওয়ার ভঙ্গি করে বলল, “বলছি, বলছি। সব বলছি।”
সবাই এবার ক্যাচরম্যাচর বন্ধ করে উৎসুক হয়ে শুনতে লাগল ওর কথা।
শাম্ব বলতে শুরু করল, “জায়গাটা যেমন ফ্যান্টাস্টিক, জায়গার নামটাও সেরকম। সামসিং নামের একটা পাহাড়ি জায়গায় সুন্দরী নামের গ্রাম। হিমালয়ান নেচার অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার ফাউন্ডেশন, সংক্ষেপে ন্যাফ, তারাই অর্গানাইজ করছিল এই নেচার স্টাডি কাম অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্প। আমার মামাবাড়ি তো শিলিগুড়িতে। ছোটোমামাই উদ্যোগী হয়ে আমার নাম এনরোল করিয়েছিলেন। আমাদের কিছু জানাননি অবধি। সারপ্রাইজ! তারপর যখন বড়দিনের ছুটিটায় গেলাম মামাবাড়ি, দেখি এই কাণ্ড! মামা আমার জন্য স্লিপিং ব্যাগ মায় রুকস্যাকটা পর্যন্ত গুছিয়ে রেখেছিলেন। একটাই যা, এবার মামাবাড়িতে থাকাই হল না। তবে সেজন্য কোনও দুঃখ নেই। ব্যাপক কাটিয়ে এলাম চারটে দিন।”
“বলিস কী! এ তো ঝক্কাস ব্যাপার রে!” অবাক গলায় বলল কৌশিক। বাকিরাও সায় দিল।
“রিয়েলি! সবাই মিলে বাসে করে যাওয়া। রাতে টেন্টে থাকা। তেরাই-ডুয়ার্সের তেরোটা নদীর নামে তেরোটা টেন্ট। আমি ছিলাম ‘কালজানি’-তে। তারপর একসঙ্গে রান্না করে খাওয়া। বাসন মাজা। পরিবেশটা ভাব একবার। চারদিকে ভুটান পাহাড়ের রেঞ্জ। মাঝে একটা ভ্যালি। ফাঁকা নির্জন মাঠে একের পর এক টেন্ট। ভাবতে পারিস? কী এক্সাইটিং! বরফ না পড়লেও জ্যাকেট-টুপিতেও শীতে কাঁপুনি লেগে যাচ্ছিল শরীরে। অবশ হয়ে যাচ্ছিল হাত-পা। কী শীত! কী শীত!”
“এত শীতে তোরা ক্যাম্প ফায়ার করিসনি?” অর্ক ঝুঁকে বসল শাম্বর দিকে।
“করব না আবার! একটা অদ্ভুত মজাদার কায়দায় আগুন জ্বালানো হত ওখানে। একটাই বড়ো কাঠের লগকে করাত দিয়ে পিৎজার মতো ছয় টুকরোতে চিরে দিত ওরা। নিচে এই ধর ছয় ইঞ্চি জোড়া। মাঝের গ্যাপটায় এক কাপ কেরোসিন তেল ঢেলে দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিত। তারপর ওতেই হাত-পা সেঁকা, ওতেই বসানো হচ্ছে চায়ের কেটলি। আবার কখনও ঢাউস ডেকচি বসিয়ে তৈরি হচ্ছে ডিমসেদ্ধ। ওই আগুন প্রায় দু-তিন ঘণ্টার আগে নিভত না! কী যে ইন্টারেস্টিং! কী যেন নাম ওটার। শুনেছিলাম, ভুলে গেছি।”
“ওর নাম সুইডিশ ফ্লেম। জঙ্গলে ট্রেকিং করেন যারা তাঁদের নখদর্পণে ওটা। আমি ডিসকভারি চ্যানেলে দেখেছি। নেটেও পাবি।” অর্ক উত্তর দিল। তারপর উদাস চোখে তাকাল আকাশের দিকে।
“বাব্বা! ভয় করল না তোর? মা-বাবাকে ছেড়ে? বাড়ি থেকে অতটা দূরে?” ভিতু গলায় জিগ্যেস করল তিতলি, যদিও ও আঙুল মটকাচ্ছিল প্রবল উত্তেজনায়।
“ধুর! আমি একা নাকি? পাঁচ থেকে পনেরো। কতগুলো গ্রুপ জানিস? সবচাইতে কচিদের নিয়ে র‍্যাবিট গ্রুপ। তারপর রেড প্যান্ডা গ্রুপ। আট অবধি। তারপর আমরা। পোলার বেয়ার গ্রুপ। আমাদের পরেও একটা ছিল। লেপার্ড গ্রুপ। আর সঙ্গে গ্রুপ লিডারসরা। ভয় করবে কেন? র‍্যাবিট গ্রুপের সবচাইতে খুদেটার বয়স জানিস কি? ইউ পিপল জাস্ট কান্ট ইম্যাজিন! সাড়ে চার। তারও কী এনার্জি! তবেই ভাব!”
“বলিস কী!” ব্যস, তিতলি একেবারে চুপ। আচারের বাটির কথাও সব্বাই ভুলে গিয়েছে।
“বাহ! দারুণ ব্যাপার তো!” কৌশিক এবার মুখ খুলল, “কী করতিস তোরা সারাটা দিন?”
“ভোর পাঁচটায় উঠে ব্যায়াম। অথবা মাঠেই দৌড়ঝাঁপ। ব্রেকফাস্ট সেরেই জঙ্গলে ট্রেকিং করতে যাওয়া। ডুয়ার্সের গাছপালা, ফুল-পাখি চেনা। ফিরে এসে লাঞ্চ করে একটু রেস্ট নিয়েই নানারকম অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস। সন্ধেবেলা কোনওদিন সিট-অ্যান্ড-ড্র কনটেস্ট, কোনওদিন নিজেদের অভিজ্ঞতার গল্প বলা। আর রাতে ডিনারের আগে আগুনের ধারে গোল হয়ে বসে বিভিন্ন পর্বতারোহীদের মুখ থেকে পর্বত অভিযানের ঘটনা শোনা, প্রজেক্টারে সেই ভিডিও দেখা। ডিনারের পর কাকুদের মুখে জঙ্গলের রোমাঞ্চকর গল্প শোনা। ভালুকের গল্প, চিতার গল্প। উফ্‌, অ্যামেইজিং!”
সবাই চুপচাপ। মনে মনে কল্পনায় ডানা মেলে উড়ে গিয়ে ওরা যেন এতক্ষণ ভেসে বেড়াচ্ছিল ডুয়ার্সের অদেখা বনানীতে, উন্মুক্ত সবুজ প্রান্তরে। এদিকে ধীরে ধীরে বেলা পড়ে এসেছে। আকাশে লালচে আভা বুঝিয়ে দিচ্ছে যে রোববারের আড্ডার আসর ছেড়ে এবার সব্বাইকে বাড়ির পথ ধরতে হবে। প্রত্যেকের বাড়ি কাছাকাছি বলে রক্ষা। একই পাড়ার বন্ধু ওরা। উঠি উঠি করেও উঠতে মন চায় না ওদের। কিন্তু কৌশিকের ম্যাথস স্যার আসবেন। তিতলি দাদার কাছে পড়তে বসবে আর অর্কর ভূগোল টেস্ট রয়েছে। সুতরাং একরকম জোর করে, নিজের অগোছালো মনকে শাসন করে, গুছিয়ে নিয়ে ঘরে ফেরার জন্য প্রস্তুত হল ওরা।
“আসি রে, শাম্ব।”
তিতলি সবার আগে উঠে পড়েছে। ওর হাত ধরেছে কৌশিক। তিতলি আর অর্ক এখানকার স্পেশাল স্কুলে পড়ে। তিতলি জন্মান্ধ। অনেক ডাক্তার দেখানো হয়েছে। দৃষ্টি ফিরবে না কোনওদিন।
অর্কর ছেলেবেলায় ভয়ানক টাইফয়েড হয়েছিল। তার পর থেকে ওর দুটো পাই অকেজো।
অর্ককে ট্রাই-সাইকেলে উঠতে সাহায্য করল শাম্ব আর কৌশিক দু’জনে মিলে। কৌশিক ফিরল শাম্বর দিকে। ইশারায় হাত নেড়ে না করে বলল, “ডোন্ট ওরি। আমি ওদের দু’জনকে পৌঁছে দিয়ে বাড়ি ফিরব। তোকে আর আসতে হবে না। আজই সকালে ট্রেন থেকে নেমেছিস। ইউ মাস্ট টেক রেস্ট। পরশু স্কুলে দেখা হবে। বাই।”
তিনজন মাঠ পেরিয়ে বড়ো রাস্তার দিকে যাচ্ছে। হঠাৎ নিজেদের নাম শুনে থেমে গেল ওরা। শাম্ব আসছে দৌড়ে। ওর হাতে একটা কাগজ রোল করে ধরা। কাছে এসেই সেটা মেলে ধরল ও। সূর্যের পড়ন্ত আলোয় ডুবে যাওয়া কালো অক্ষরগুলোর ওপরে ঝুঁকে পড়ল তিতলি ছাড়া আর বাকি দু’জন।
হাঁপাতে হাঁপাতে বলল শাম্ব, “যাহ্‌, আসল জিনিসটার কথাই বলতে ভুলে গেছিলাম। এটা ওদের নেক্সট ইয়ারের নেচার ক্যাম্পের অ্যানাউন্সমেন্ট। দিস ইজ স্পেশালি ফর দ্য চ্যালেঞ্জড চিলড্রেন। তবে চাইলে অন্যরাও যোগ দিতে পারে সেম ক্যাম্পে। সামনের বছর আমরা চারজন একসঙ্গে যাব। কী রে কৌশিক? তুই আর আমি মিলে অর্ক আর তিতলির বাড়ি থেকে পারমিশনটুকু জোগাড় করতে পারব না?”
কৌশিক তাকাল শাম্বর দিকে। ওর চোখ চিকচিক করে উঠল নিমেষে। তারপর দৃঢ় চোয়ালে হাত মুঠো করে বলল, “পারব। পারতেই হবে। নেক্সট ডিসেম্বরের দেরি আছে, তার আগে থেকেই বড়োদের কনভিন্স করতে হবে একটু একটু করে। থ্যাঙ্কস, শাম্ব। থ্যাঙ্কস ফর দ্য ইনফরমেশন।”
ওদিকে তিতলি নাক টানছিল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। অর্ক কিছুক্ষণ চেষ্টার পরে ধরা ধরা গলায় বলল, “আমরাও যেতে পারব ওরকম রূপকথার দেশে? বাড়ি থেকে অত দূরে? আমার কিন্তু এখনও ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না রে।”
কৌশিক এবার গাট্টা তুলল অর্কর মাথা লক্ষ্য করে। কপট রাগের ভঙ্গিতে বলল, “এই, একদম নেগেটিভ চিন্তা করবি না তো। শাম্ব ঠিকই বলেছে। নেক্সট ইয়ারে আমরা চার বন্ধু একসঙ্গে যাব। চল, লেটস সেলিব্রেট। বিশুদার দোকানের কাটলেট হয়ে যাক।”
সঙ্গে সঙ্গে সবাই তাকাল তিতলির দিকে। আর কী আশ্চর্য! তিতলি যেন সেটা মনে মনে দেখতে পেয়েই ফিক করে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই বলল, “কিপটের দল! খাওয়ানোর বেলায় সবার আগে আমি! তোদের পাল্লায় পড়ে আমার ফুল পকেটমানি গন। কত কষ্টের জমিয়ে রাখা টাকা। যা পালা, এক পয়সা দেব না।”
যথারীতি কেউই কথাটাকে পাত্তা দিল না।
কিছুক্ষণ পরই দেখা গেল চার বন্ধু গলা ছেড়ে গান গাইতে গাইতে মাঠ পেরিয়ে চলেছে পাড়ার মোড়ে বিশুদার দোকানে, রকমারি ভাজাভুজির নিষিদ্ধ স্বাদের সন্ধানে। ওদের দেখে মনে হচ্ছিল ঠিক যেন খাঁচার পাখিরা আজ বাঁধন থেকে ছাড়া পেয়েছে।
_____

No comments:

Post a Comment