গল্পঃ ছোটো বড়োঃ দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য


ছোটো বড়ো

দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য


“সাবধান। যার যার আসনে শক্ত করে ধরে বসুন। জন্তুটা আবার ফিরে আসছে।”
লালচে গোলাপি পাঁচটা বিশাল আকর্ষী ফের একবার এগিয়ে এসে চেপে ধরেছে অতিকায় যানটাকে। পোর্টহোলগুলো ঢেকে গিয়ে বাইরের আলো বন্ধ হয়ে যেতে জেগে উঠেছে যানের স্বয়ংক্রিয় আলোকব্যবস্থা।
প্রথমবার যানটাকে তুলে নিয়ে সে তার পর্বতগহ্বরের মতো মুখের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। সাগরতলের কাল্পনিক মহাদানব স্নর্কের মতো দেখতে অতিকায় একটা জিভ বের করে বুলিয়ে দিয়েছিল যানের গায়ে। তবে বাঁচোয়া হল, অ্যালবেড্রন যৌগের বহিরাবরণের স্বাদ পছন্দ হয়নি তার। তাই খাবার হবার হাত থেকে বেঁচে গেছে নক্ষত্রযান।
“এঞ্জিনিয়ারিং… আর কতক্ষণ?”
“অ্যান্টিগ্র্যাভ জেনারেটর চালু করা গেছে।”
“লেজার ব্যাঙ্ক?”
“তিন-চতুর্থাংশ সক্ষম।”
“এইবার একে একটু শিক্ষা দেব। পূর্ণশক্তিতে আঘাত করো।”
মৃদু গুনগুন শব্দ আর সামান্য কাঁপুনি বুঝিয়ে দিচ্ছিল, যুদ্ধযানের গোপন গহ্বরগুলোতে জেগে উঠছে মারণরশ্মি ছুড়ে দেয়া অজস্র কামান। কম্পিউটারের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ তাদের নিশানায় ধরছিল আকর্ষীগুলোর বিভিন্ন এলাকাকে।
নির্দিষ্ট নকশায় যানের চারপাশ থেকে জেগে উঠছিল কামানগুলো। যানের গায়ে হঠাৎ ঝিকিমিকি ঝলসে ওঠা স্ফটিকবিন্দুগুলো মারণরশ্মির আঘাত ছুড়ে দিচ্ছিল যানটাকে ধরে থাকা আকর্ষীগুলোর গায়ে।
হঠাৎ একেবারে থেমে গেছে আকর্ষীগুলো। কামড়টা টের পাচ্ছে? পাওয়া উচিত। সিট্রানের মৃত্যু-তারকার আলোক-কামানের আঘাত পরিচিত নক্ষত্রমণ্ডলগুলোর সর্বত্রই সমীহ আদায় করে আসছে গত এক সহস্রাব্দ ধরে।
“আমরা উঠছি!”
হঠাৎ আকর্ষীগুলো ছেড়ে দিয়েছে যানটাকে। বন্ধনমুক্ত হয়ে তীব্র বেগে খাড়া ওপরের দিকে উঠে চলেছে অতিকায় নক্ষত্রযান। তার চতুর্দিকে ফুটে উঠেছে সদ্য সারাই হওয়া জেনারেটার থেকে বের হয়ে আসা প্রতি-অভিকর্ষের বলয়।
একটা হর্ষধ্বনি ছড়িয়ে গেল ব্রিজরুমে। আর তারপরেই সেটা থেমে গেল ফের।
“এটা অ্যান্টিগ্র্যাভ থ্রাস্ট হতে পারে না,” ডায়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বলছিলেন ক্যাপ্টেন।
বাকি মাথাগুলোও ততক্ষণে ঝুঁকে পড়েছে ডায়ালগুলোর পর্দায়। তারা বুঝতে পারছিল, এই অকল্পনীয় ভারী গ্রহের মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে এই অতিকায় নক্ষত্রযানের প্রতিমাধ্যাকর্ষণ ধাক্কাও নিতান্তই নগণ্য হতে বাধ্য। এর আওতায় থেকে এই প্রচণ্ড ঊর্ধ্বগতির সৃষ্টি করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
“জন্তুটা আমাদের ছুড়ে দিয়েছে। এত অকল্পনীয় শক্তিধর জীব—”
“ক্যাপ্টেন, পর্দায় দেখুন!”
ন্যাভিগেটরের তীক্ষ্ণ স্বরে ভয়ের ছাপ ছিল। পর্দায় হঠাৎ যানের ঠিক নিচে একটা কুলকিনারাহীন অতিকায় গহ্বর ভেসে উঠেছে। তার মাথার ওপরে ক্রমশই আরও উঁচুতে উঠে যাচ্ছিল নক্ষত্রযান।
“প্রায় দু’হাজার ফ্লিক উচ্চতা। গতি সেকেন্ডে পাঁচশো ফ্লিক। আমাদের গ্রহ হলে কক্ষপথে পৌঁছে মুক্তিবেগ পেয়ে যাবার পক্ষে যথেষ্ট ছিল, ক্যাপ্টেন। কিন্তু হতচ্ছাড়া দানব গ্রহের অভিকর্ষ...”
গতি ফের কমে আসছিল যানের। এই অকল্পনীয় উচ্চতা থেকেও পর্দায় গহ্বরটার আয়তন বিশেষ কমেনি। ঠিক কতটা বড়ো ওটা? কে জানে!
“সাবধান। আমরা ফের পড়ছি। যার যার নিরাপত্তা বর্ম চালু করুন।”
যন্ত্রমস্তিষ্কের যান্ত্রিক মিঠে গলার সাবধানবাণী ছড়িয়ে পড়ছিল সত্তর ফ্লিক দীর্ঘ গোটা একটা শহরের মতো আয়তনের যানটার প্রত্যেকটা কোনায়। তার সহস্রাধিক যোদ্ধা যার যার কাজ ছেড়ে নিরাপত্তা খোলসের আলোকবৃত্ত জাগিয়ে তুলছিল নিজেদের ঘিরে। চূড়ান্ত উচ্চতায় পৌঁছে গিয়ে তখন হঠাৎ করেই স্থির হয়ে গিয়ে গতিমুখ উলটে নিয়েছে ভাঙাচোরা নক্ষত্রযান। শুরু হয়েছে পায়ের বহু নিচে ছড়িয়ে থাকা গহ্বরটার দিকে তিরবেগে নিম্নমুখী যাত্রা।
বিপদের সেই অন্ধকার মুহূর্তেও জানালা দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে মুখে আতঙ্কের চিহ্ন ফুটে উঠছিল ক্যাপ্টেনের। ব্যাপারটা প্রায় অবিশ্বাস্য। তাঁর নক্ষত্রমণ্ডলের যেকোনও সাধারণ বসবাসযোগ্য গ্রহের ক্ষেত্রে, এই উচ্চতায় ভূসমলয় স্পেস-স্টেশনগুলো কাজ করে। নিকট মহাকাশের এই উচ্চতা থেকে শক্তিশালী দূরবীনের সাহায্য দরকার হয় গ্রহের মহাদেশগুলোকে দেখতে। অথচ এই দানবিক গ্রহে সে উচ্চতায় উঠে আসবার পর চারপাশে দাঁড়ানো গাছগুলোর মাথা অবধিও পৌঁছানো যায়নি। তাদের একেকটা পাতা, যদি তারা পাতাই হয়, এরকম দশবারোটা বিপুল আয়তনের যুদ্ধযানকে ঢেকে দিতে পারে। প্রকৃতির কী বিচিত্র সৃজনক্ষমতা!
পতনের গতি ক্রমশ বাড়ছিল তাদের। করাল মৃত্যুর মতো হাঁ করে ধেয়ে আসছে পায়ের নিচের গহ্বরটা। প্রতি-অভিকর্ষ ইঞ্জিন পূর্ণশক্তিতে চলছিল। তার শক্তি সিট্রানের বুক থেকে একটা আড়াই লক্ষ ক্রাল ওজনের পাহাড়কেও ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে নিকট মহাকাশের কক্ষপথে। অথচ এই গ্রহের ভয়াল অভিকর্ষ তাকে তুচ্ছ করে যানটাকে টেনে নিয়ে চলেছে তার বুকের ওই মৃত্যুগহ্বরের দিকে।

তারপর কয়েক মুহূর্তের মধ্যে গহ্বরের তলায় অপেক্ষা করে থাকা সুগভীর জলরাশি উঠে এসে গিলে নিয়েছিল সেই অতিকায় নক্ষত্রযানকে। জলতলের সঙ্গে তীব্র সংঘাতে ফের অচল হয়ে গিয়েছিল তার কোনওমতে সারাই করা প্রতি-অভিকর্ষ ইঞ্জিন।
সেই মৃত্যুজলের অতলে তীব্র মাধ্যাকর্ষণের চাপ নিয়ে মাত্রই কিছুক্ষণ টিকে থাকতে পেরেছিল অকেজো যানের আরোহীরা। তাদের শক্তিবর্ম ব্যর্থ হয়েছিল তাদের রক্ষা করতে।
কম্পিউটারের ছোট্টো একটা ভুল। গ্যালাক্সির প্রান্তদেশে নতুন কলোনির সন্ধানে আসা যুদ্ধযান, এক অতিমহাকাশ লাফ থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক মহাকাশে ভেসে উঠেছিল এই দানবিক গ্রহের আবহমণ্ডলের ভেতরে। শত চেষ্টা করেও তার তীব্র টান থেকে নিজেদের আর মুক্ত করতে পারেনি তারা। অভিকর্ষের করাল টানে আছড়ে পড়ে আহত যানটার সব প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে গিয়েছিল এক নিমেষেই। আর, তারপর… ওই দানব জীবের পাঁচটা আকর্ষীর আক্রমণ!
ভাঙা যান তলিয়ে যাচ্ছিল সেই জলরাশির গহনে। একে একে বন্ধ হয়ে আসছিল তার প্রধান সিস্টেমগুলো। প্রতি-অভিকর্ষ ইঞ্জিন অকেজো হবার কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্ষীণ হয়ে এসেছিল তাকে ঘিরে থাকা শক্তিবর্মের সুরক্ষাবলয়ও। অসহনীয় চাপে মড়মড় করে ওঠা কঠিন আলবেড্রনের চামড়ার ফাটাফুটি দিয়ে হিসহিস করে বের হয়ে যাওয়া যানের আবহমণ্ডলের জায়গা নিচ্ছিল মৃত্যুহিম জলরাশি।

একে একে সকলেই চলে গেছে। চারপাশে ছলছল করা জলের ভেতর তাঁর সহস্র বীর যোদ্ধার মৃতদেহগুলো কেমন দুঃস্বপ্নের মতো ভেসে বেড়ায়। সেদিকে চোখ পড়তে একটা অদ্ভুত শান্তি ছড়িয়ে পড়ছিল ক্যাপ্টেন স্নাহ্‌-এর মনে। আর বেশিক্ষণ এ-দৃশ্য সহ্য করতে হবে না তাঁকেও। রেসপিরেটর ট্যাঙ্কের বাতাসের সঞ্চয় তাঁরও তলানিতে ঠেকেছে এইবার।
হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি দিয়ে নিজেকে সতর্ক করলেন ক্যাপ্টেন স্নাহ্‌। একটা কাজ এখনও বাকি আছে। একটা শেষ কর্তব্য। তার পালন না করে শান্তিতে মৃত্যুরও অধিকার নেই সিট্রানের যুদ্ধযানের ক্যাপ্টেনের।
অভিকর্ষের তীব্র চাপ তাঁর ওজন বাড়িয়ে তুলেছে বহুগুণ। নিঃশ্বাস নিতে বাধা দিচ্ছিল ফুসফুসের ওপর চেপে আসা পাঁজরগুলো। তবুও এক আসুরিক ইচ্ছাশক্তিতে তাকে প্রতিরোধ করে যানের নিয়ন্ত্রণ প্যানেলের এক কোনায় লাল রঙের সংখ্যা চিহ্নিত বোতামের সারিটার ওপর ঝুঁকে পড়লেন তিনি। নিজের নিজের যানের অন্তিম মেসেজের সংখ্যা-সারণীটি স্মৃতিতে রাখতে হয় প্রত্যেক ক্যাপ্টেনকেই।
৫, ৭, ১, ২, ১… ৬, ৪… আসুরিক একটা চেষ্টায় পাথরের মতো ভারী হয়ে আসা আঙুলের মাথা দিয়ে শেষ বোতামটাকে ছুঁয়ে দিলেন ক্যাপ্টেন স্নাহ্‌। জ্ঞানহীন শরীরটা এইবার লুটিয়ে পড়েছে প্যানেলের ওপর। ক্যাপ্টেনের কাজ শেষ। জেগে উঠেছে যন্ত্রমস্তিষ্কের অন্তিম প্রোগ্রাম। যানের আলো নিভে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে তার সমস্ত ইঞ্জিনের প্রাণপণ চেষ্টাও।
প্রতিবস্তু ইঞ্জিনের অবশিষ্ট সবটুকু শক্তিকে এইবার একটা বিন্দুতে সংহত করে আনল যন্ত্রমস্তিষ্ক। তারপর ক্যাপ্টেনের শেষ নির্দেশ মেনে একটা শক্তিশালী বিচ্ছুরণে তাকে ছুড়ে দিল সামনের অতল জলের গভীরে।
দেশকালের পর্দায় সেই শক্তির সুসংহত ধারা যখন ছোট্টো ফাটলটাকে খুঁড়ে তুলছিল, তখন তা দেখবার জন্য সে-যানের একজনও বেঁচে ছিল না। থাকলেও লাভ হত না কোনও। ইঞ্জিনের অবশিষ্ট শক্তির শেষ দুর্বল ঝলকে গড়ে ওঠা দুর্বল সেই ফাটল বেয়ে একটা তথ্যবাহী ঝলকই যেতে পারে শুধু, একটা পূর্ণায়তন নক্ষত্রযান নয়।
ফাটল বেয়ে শক্তির ধারাটা একটা বিদ্যুৎচমকের মতো উধাও হয়ে গেল অতিমহাকাশের দেশকালহীন ঠিকানায়। জন্মগ্রহের সাম্রাজ্য বিস্তারের পবিত্র কর্তব্যে প্রাণ দিয়েছেন ক্যাপ্টেন স্নাহ্‌ আর তাঁর সহস্র বীর যোদ্ধা। কিন্তু শেষ কর্তব্যটি পালনে তাঁর কোনও ত্রুটি হয়নি। গভীর মহাকাশ পার হয়ে সিট্রান গ্রহের উদ্দেশ্যে অবশেষে ভেসে গেছে তাঁর সতর্কবাণী। একটি মহাকাশ স্থানাঙ্ক। সঙ্গে একটি-দুটি কথা…
চেতনার শেষ বিন্দুটুকুর দখল ছেড়ে দিতে দিতে ক্যাপ্টেন স্নাহ্‌-এর মনে একটা অদ্ভুত তৃপ্তির স্পর্শ লাগছিল। এইবার গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় অঞ্চল থেকে ত্রিশ হাজার আলোকবর্ষ দূরের এই প্রান্তীয় এলাকাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে। এই দানবিক গ্রহ আর তার দানব পশুর দল আর কোনওদিন সভ্য দুনিয়ার কোনও বাসিন্দার মৃত্যুর কারণ হতে পারবে না।
*****

“হাতটা ভালো করে ধোও। কুয়োর পাশে কী নিয়ে এত ঘাঁটছিলি শুনি?”
“কিচ্ছু না তো, মা। একতা পাথর। এইতুকুনি। চকমক চকমক।”
“চকমকে পাথর? কোথায়? দেখি?”
“নেই। কুয়োর ওপর ধিল দিয়ে ফেলে দিয়েছি। আমায় কামড়ে দিল তো! তাই।”
“দূর বোকা। পাথর কামড়ায় নাকি?”
“হুঁউউ। এই দ্যাখো না?”
হাতদুটোর তেলোতে বেশ কয়েকটা কালচে লাল ফোঁটা। পুড়ে যাবার মতো দাগ। বিশেষ কিছু নয় অবশ্য। কী ধরেছিল কে জানে। পাথরটার গায়ে শুঁয়োপোকা-টোকা লেগে ছিল না তো?
সাবান দিয়ে হাতদুটোকে ভালো করে ধুইয়ে দিতে দিতেই ছেলেকে বকছিলেন তিনি, “তিন বছর বয়স হল। এখনও যা পাবে কুড়িয়ে তুলবে রাস্তা থেকে। ইশকুলে মিসরা এই শেখাচ্ছে তোমাদের? তাও ভালো মুখে যে দাওনি।”
“দিয়েছিলাম তো! বিচ্ছিরি। তেতো।”
“ভারি দুষ্টু হয়েছ তুমি সোনা। কতবার করে বলি তোমায়, যা-খুশি জিনিস মুখে দেবে না, কুয়োর পাশে কক্ষনও একলা একলা যাবে না। আর তুমি...”
বেসিনে ছেলের মুখ ধুইয়ে দিতে দিতে মা গজগজ করছিলেন। কুয়োটার মুখে এইবার একটা ঢাকনা দিতে বলতে হবে ওর বাবা বাড়ি এলে। নইলে কখন যে কী হয়...
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ অনির্বাণ সরকার

2 comments:

  1. অসাধারণ লাগলো। সাসপেন্স বলছে, এর দ্বিতীয় পর্ব চাই!☺️

    ReplyDelete