চলো যাইঃ জঙ্গল আর সমুদ্র নিয়ে যেন দিগন্তপটে আঁকা ছবিঃ তনুশ্রী কাঞ্জিলাল মাশ্চরক


জঙ্গল আর সমুদ্র নিয়ে যেন দিগন্তপটে আঁকা ছবি

তনুশ্রী কাঞ্জিলাল মাশ্চরক


বাঙালি মানেই মাছভাত, বারো মাসে তেরো পার্বণ, আর পায়ের তলায় সর্ষে - এই তকমা একেবারে গায়ে সাঁটা। এই গুণকীর্তনের মহিমাকে মাথায় রেখেই সপ্তাহান্তের ছুটি জোগাড় করতে পারলেই ‘মন চল মুসাফির বাঁধ গাঠরিয়া’।
আমার এবারের গন্তব্য কলকাতা থেকে সামান্য দূরত্বে আস্ত একটা একলা দ্বীপ ‘হেনরি আইল্যান্ড’। জায়গাটার নামে যেমন চমক তেমনি যাত্রাপথের বৈচিত্র্যও কম নয়। একদম কুসুমরঙা ভোরেই গাড়িতে করে যাত্রা শুরু হল। সকালবেলায় সূর্যদেব সবে তাঁর পরিক্রমায় বেরিয়ে পড়েছেন নরম আলো ছড়িয়ে। চারপাশটা কী মায়াময়! বেশ লাগছিল দেখতে। ক্রমে শহরের ইট-কাঠ, হাইরাইজ ছাড়িয়ে গাড়ি গ্রামবাংলার ভেতরে ঢুকছে। চারধারে ধানক্ষেত, পুকুর, বড়ো খেলার মাঠ, ছোটো ছোটো বাড়ি - সবকিছু যেন আঁকার বইয়ের পাতা থেকে তুলে এনে বসানো।
দেখতে দেখতেই ডায়মন্ড হারবার পৌঁছনো গেল। জলখাবারের পর্ব ওখানে সেরে গাড়ি ছুটল। এবার নামখানা। নামখানা পৌঁছনোর পরে সাময়িক গাড়ির পথ শেষ। কেননা, এবার হাতানিয়া, দোয়ানিয়া নদী পেরোনোর পালা। বিস্তীর্ণ নদী। ভেসেল করে পারাপারের ব্যবস্থা। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, কী দারুণভাবে বড়ো বড়ো গাড়ি, বাস, লরি দিব্যি উঠে দাঁড়াচ্ছে ভেসেলের ওপরে। গাড়ির ভেতরে বসে জানালায় চোখ রেখে বা অতি উৎসাহী হলে নেমে ভেসেলে যে বসার জায়গা আছে সেখান থেকেও উপভোগ করা যায় যাত্রাপথের সৌন্দর্য।

হাতানিয়া, দোয়ানিয়া নদী পেরিয়ে পৌঁছতে হল বকখালি। সেখান থেকে আরও তিন কিলোমিটার হেনরি দ্বীপ। বাসে বসে বসেই পার হলাম নদী। কতরকমের লোকজন। নানা জনের নানাদিকে গন্তব্য। একটা দুটো গ্রামের পথ পেরিয়ে তবেই আমাদের দিন দুয়েকের নিবাস সুন্দরী টুরিস্ট কমপ্লেক্সের দোরগোড়ায় পৌঁছনো। প্রথম দর্শনেই দিলখুশ একেবারে। জায়গাটা জঙ্গল ও সমুদ্র নিয়ে যেন দিগন্তপটে আঁকা ছবি।
কলকাতা থেকে মাত্র ১৩০ কিমি দূরে হেনরি আইল্যান্ড। বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ অরণ্য আর অজস্র ঝাউ, গরান, হেঁতাল-গেঁওয়াগাছের সম্ভার নিয়ে হেনরি দ্বীপ সুশোভিত। প্রথম দর্শনেই মন ছুঁয়ে গেল জায়গাটা। এইরকম একটা জায়গার জন্যই বুঝি রবি কবি লিখেছিলেন, “প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হারিয়ে মোরে আরও আরও দাও প্রাণ।” চারদিকে গভীর জঙ্গল। মাঝে গাছেদের নামে ছোট্ট ছোট্ট গেস্ট হাউস ভারি সুন্দর। সুন্দরী, গরান, হেঁতাল, বাণী - কেমন মিষ্টি সব নাম। হরিণের দেখা মেলে বলে কোনওটার নাম আবার মৃগনয়না। লেকের পাশে বলে লেক ভিউ।
ওয়েস্ট বেঙ্গল ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের কাছ থেকে ২০০ একর জায়গা লিজ নিয়ে ওয়েস্ট বেঙ্গল ফিসারিজ ডিপার্টমেন্ট গড়ে তুলেছে এই সুন্দরী টুরিস্ট কমপ্লেক্সটি। এইখানেই আমাদের দিন কয়েকের জন্য বাস আর ছুটি উপভোগ করা। তৎকালীন মন্ত্রী কিরণময় নন্দীর তৎপরতায় ও তত্ত্বাবধানে এটি গড়ে ওঠে বলে শুনলাম। বাষট্টিটা মাছের ভেড়ি রয়েছে। বড়ো বড়ো রূপালি পার্শে, ট্যাংরা, তেলাপিয়া, ভেটকি, চিংড়ি, গুরজালি থেকে শুরু করে তালিকায় কে নেই? সকালবেলা ভেড়িতে যখন জাল ফেলা হয় তখন ঝাঁক ঝাঁক জলের শস্যরা জালবন্দী একেবারে। আগেই বলেছি, বাঙালি মানেই মাছভাত। আর সেই মাছ যদি হয় টাটকা, তাজা তাহলে তো কথাই নেই। আর এইসব নানান মাছের অকৃত্রিম স্বাদ দিয়ে রসনার তৃপ্তি ঘটাতে চাইলে সেই সুব্যবস্থাও এখানে রয়েছে। শহরের বরফ ছাওয়া চালানি মাছের অভ্যস্ত মুখে এও এক অন্যরকম পাওয়া।
হেনরি দ্বীপের আরও একটা অন্যতম আকর্ষণ হল এর সমুদ্র। এত নির্জন আর বিস্তৃত সৈকত বড়ো একটা দেখিনি। প্রায় জনমানবশূন্য, দূষণহীন, কোলাহলহীন এক অপূর্ব সমুদ্র সৈকত। প্রচুর ঝিনুকের সমারোহ গোটা বেলাভূমি জুড়ে।
সৈকতে পৌঁছনো বেশ রোমাঞ্চকর। দু’পাশের গভীর জঙ্গল, বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে গিয়ে দূর থেকে উঁকি দিতে দেখা গেল বিস্তীর্ণ বেলাভূমি আর ঝাউবন। শোনা গেল সমুদ্রের মৃদু গর্জন। সামনে আসতেই উন্মুক্ত প্রান্তর, শান্ত সমুদ্রের একটার পর একটা ঢেউ বালুকাতটে আছড়ে পড়ছে। চারদিকে কেউ কোথাও নেই। অসীম নিস্তব্ধতা। তবে দূর থেকে দেখলে মনে হবে, গোটা সৈকতে যেন লাল কার্পেট বিছানো। সামনে আসতেই দে ছুট, দে ছুট। আসলে এরা লাল কাঁকড়ার দল। মানুষের পায়ের শব্দ শুনলেই নিমেষের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে পালায় তারা। মনের আনন্দে এই নির্জন দ্বীপ উপভোগ করা যায় নিজের মতো করেই। প্রচুর সবুজ গাছগাছালি, জোয়ারভাটার লুকোচুরি ফ্রেমবন্দী করা যায় ইচ্ছেখুশি অনুযায়ী।
সুন্দরবনের শেষ অংশ এই হেনরি দ্বীপ। এইখান থেকে যন্ত্রচালিত নৌকোতে যাওয়া যায় ‘বাঘের ঘর’, ‘বুড়োবুড়ির তট’, ‘লুথিয়ান’ নামক দ্বীপে। এর মধ্যে একমাত্র বুড়োবুড়ির তটেই মানুষের বসবাস আছে। অন্য দুটিতে নেই। অ্যাডভেঞ্চার উৎসাহী হলে তবেই এই ঝুঁকি নেওয়া চলে। নচেৎ নয়। এসবে না গেলেও দুটো দিনের নির্ভেজাল ছুটি কাটাতে চাইলে আসা যেতেই পারে হেনরি আইল্যান্ডে। সমুদ্রের জলে পা ভিজিয়ে, সৈকতে ক্রিকেট খেলে, গান গেয়ে, নাচ করে, সাইট সিন দেখে ওই রাতে ঐ ভয়ানক জঙ্গলের বুকে বসে ‘তেনাদের’ অর্থাৎ ভূতের গল্প শুনে নিজে ভয় পেয়ে, অন্যকে ভয় পাইয়ে ছুটির প্রতিটা মুহূর্তকে নিখাদভাবে উপভোগ করার আদর্শ জায়গা এই দ্বীপ। এছাড়া মন মাতাল করা নানান নাম না জানা পাখিদের কনসার্ট শুনতে চাইলে আসতেই হবে হেনরি আইল্যান্ডে।
বাংলো চত্বরে দেখা মিলল সাতভায়া পাখি। খয়েরি আর ধূসর রঙের মিশেল সারা গায়ে। একসঙ্গে অনেকে মিলে বেশ পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়ায়। আরও একটা নাম না জানা পাখির সঙ্গে বেশ সখ্যতা হয়েছিল আমার। গায়ের লাল টুকটুকে রং আর পেটের কাছে বেগুনি, গলার কাছে আবার ফিকে হলুদ, বেশ লম্বা লেজ। রোজ আমার বারান্দায় বসে মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে কী যেন বলত। আমিও চেয়ে চেয়ে দেখতাম। পায়ের শব্দেও ওড়ার নাম নেই। ঐ নাম না জানা সুন্দরী পাখিটার খুনসুটিতে ভোরবেলাটা আমার দারুণ জমত। চারপাশে মন মাতাল করা বনজ গন্ধ। পরিবেশটাই অন্যরকম।

ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে। ওয়াচ টাওয়ারে ওঠার পর চোখের সামনে কেবল সবুজ আর সবুজ। কোনওটা পান্না সবুজ, কোনওটা মখমলি সবুজ, কখনও সমুদ্র সবুজ, কোনওটা আবার শ্যাওলা সবুজ। চোখ জুড়োবেই। সুন্দরবনের একাংশের ম্যানগ্রোভ অরণ্য আর পুরো জঙ্গল দেখা যায় ওয়াচ টাওয়ার থেকে। অল্প ঠাণ্ডা হাওয়ার শিরশিরানি আর সবুজের সমারোহ যেন বিশ্ব-প্রাণের স্পন্দন সারা চরাচর জুড়ে। শুনলাম, গভীর জঙ্গলে রয়েছে বুনো ভালুক, শুয়োর, বিষধর সাপ, হরিণ আর শিয়াল। নতুন একটা প্রাণীর নাম শুনলাম এখানে খুব দেখা যায়, বাঘরোল। ভামের চেয়ে আকৃতিতে বড়ো। আবার এও শুনলাম, মাঝেমধ্যেই ‘তেনারা’ও নাকি দেখা দেন। রাত্রে সাধু সাবধান! ‘তেনারা’ ঘুরে বেড়ান জঙ্গলের নীরবতা ভঙ্গ হলেই। আসলে জঙ্গলের নীরবতা পালন অবশ্য কর্তব্য। শহুরে মানুষজনদের হয়তো এই নীতিশিক্ষাটুকু দেওয়ার জন্যই তাদের আগমন ঘটে।

সুন্দরী টুরিস্ট কমপ্লেক্সে একটি মনসা মন্দিরও রয়েছে। আসলে গভীর জঙ্গল তো, তাই দেবী পূজিতা হন নিত্যদিন।

হেনরি আইল্যান্ড থেকে ঘোরা যেতে পারে কাছের বকখালি, ফ্রেজারগঞ্জ, জম্বুদ্বীপ। বকখালিতে জোয়ারভাটার সমুদ্র আর লাল কাঁকড়ার দৌড়ঝাঁপ দেখার মতো। স্যার অ্যানড্রুজ ফ্রেজার সাহেবের তৈরি সৈকত নগরী ফ্রেজারগঞ্জ আজও ইতিহাস বুকে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। জম্বুদ্বীপে নৌকাভ্রমণের মজাই আলাদা। হঠাৎই উঁচু ঢেউ - সে এক অন্যরকম অ্যাডভেঞ্চার।
তাহলে পরিণতমনস্ক শান্ত, সৌম্য সমুদ্র (কেননা আমাদের অভ্যস্ত চোখের সমুদ্রের নবযৌবনের উদ্দামতা এখানে নেই), অজস্র সবুজ গাছগাছালি আর নাম না জানা বিচিত্র পাখির মধুর সঙ্গ - এই সমস্ত কিছুর পসরা সাজিয়ে হেনরি দ্বীপ কিন্তু আপনারই অপেক্ষায়। ক্যালেন্ডারের পাতায় দু’দিনের লাল কালির দাগ দেখলেই প্রকৃতির উদার সান্নিধ্যকে উপভোগ করতে প্রস্তুতি নিয়েই নিন। এতকিছু জানবার পর আপনাদের ‘মন দে উড়ান’-এর পালা।
_____

কীভাবে যাবেন
ট্রেনঃ শিয়ালদা থেকে লক্ষ্মীকান্তপুর বা নামখানা লোকাল ধরে নামখানা পৌঁছে হাতানিয়া দোয়ানিয়া নদী ভেসেল বা দেশি নৌকোয় পার হতে হবে। এরপর বকখালি পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি বা ভ্যানে হেনরি আইল্যান্ড যেতে হবে।
গাড়িঃ নামখানা পৌঁছে ভেসেলে চেপে বকখালি। সেখান থেকে হেনরি আইল্যান্ড মাত্র ৩ কিমি।
বাসঃ ধর্মতলা থেকে নামখানার বাস সার্ভিসও রয়েছে।

কোথায় থাকবেন
হেনরি আইল্যান্ডে দুটি টুরিস্ট কমপ্লেক্স রয়েছে। একটা সুন্দরী টুরিস্ট কমপ্লেক্স, অন্যটা ম্যানগ্রোভ টুরিস্ট কমপ্লেক্স। রাজ্য মৎস্য উন্নয়ন নিগম, নর্থ ব্লক, বিকাশ ভবন, সল্টলেক থেকে বুকিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

2 comments: