অতীতের আয়নাঃ হন্তারক হেমলকঃ সৌম্যকান্তি জানা



শহরের কেন্দ্রে বসেছে এক বিশাল বিচারসভা। বিশাল হবে নাই বা কেন! যাঁর বিচার হবে তিনি তো আর এলেবেলে কোনও ব্যক্তি নন। তিনি হলেন সেই সময়ে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক, সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তি। তাই বিচারকের সংখ্যা গুনে গুনে পাঁচশো। তাঁরা বসে আছেন কাঠের বেঞ্চে সারি দিয়ে। তাঁদের সামনে দণ্ডায়মান উন্নতশির দার্শনিক। কিছুক্ষণ আগেই তাঁর বিরুদ্ধে বিচারকদের সামনে টানা তিনঘন্টা ধরে অভিযোগের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন তিন অভিযোগকারী। তা অভিযোগ কী? মূল অভিযোগ তিনটে। প্রথমত, তিনি কেবল এথেন্সের প্রচলিত দেবদেবীদের উপেক্ষা করেছেনই নয়, তিনি নতুন নতুন দেবদেবী প্রবর্তনের চেষ্টা করেছেন। দ্বিতীয়ত, তিনি এথেন্সের তরুণ প্রজন্মের নৈতিক চরিত্র কলুষিত করেছেন। তৃতীয়ত, এথেন্সের সামাজিক ও নৈতিক ক্ষেত্র নিয়ে কঠোর সমালোচনা করার নামে এথেন্সের শত্রু স্পার্টার অনেক নীতির প্রশংসা করে প্রকারান্তরে রাষ্ট্রদ্রোহিতার কাজ করেছেন। অভিযোগকারীরা যখন একের পর এক অভিযোগের বাণে দার্শনিককে বিদ্ধ করছে তখন ওষ্ঠে স্মিত হাসি মাখিয়ে মৃদু মাথা ঝাঁকিয়ে চলেছেন সত্তর বছর বয়স্ক প্রবীণ পণ্ডিতপ্রবর। আর সেই আলোড়ন ফেলা ঐতিহাসিক বিচারসভা প্রত্যক্ষ করার জন্য মুখে-চোখে উৎকণ্ঠা নিয়ে বিচারস্থল ঘিরে রয়েছে হাজার হাজার নগরবাসী। অভিযোগের পালা শেষ হওয়ার পর অভিযুক্তের বলার পালা। অভিযোগকারীরা যতটা সময় নিয়েছে অভিযোগ জানাতে, নিয়ম অনুযায়ী সমপরিমাণ সময় পাবে অভিযুক্ত আত্মপক্ষ অবলম্বন জন্য। কিন্তু অল্প সময়েই অভিযুক্ত দার্শনিক তাঁর নিজের কথা উপস্থাপন করলেন। বলা বাহুল্য, তিনি তাঁর কাজের জন্য আদৌ অনুতপ্ত ছিলেন না, বরং চুইয়ে পড়ছিল আত্মবিশ্বাস।
কিন্তু এবার তো বিচারকরা তাঁদের রায় দান করবেন। প্রত্যেকের কাছে দেওয়া হয়েছে দুটো করে পোড়া মাটির চাকতি। তার একটাতে লেখা ‘অপরাধী’, আর একটাতে লেখা ‘নিরপরাধ’। বিচারকরা তাঁদের ব্যক্তিগত মতানুযায়ী একটা চাকতি ফেলবেন সামনে রাখা একটা কলসিতে।
সব বিচারক তাঁদের মতের চাকতি ফেললেন। চাকতি গোনা হল। অপরাধী হিসেবে রায় দিয়েছেন দু’শো আশি জন, আর নিরপরাধ হিসেবে রায় দিয়েছেন দু’শো কুড়ি জন। দোষী সাব্যস্ত হয়ে গেলেন দার্শনিক। এবার শাস্তি শোনার পালা। বিচারকেরা অভিযোগকারীদের কাছে শাস্তি জানাতে প্রস্তাব করলেন। সমস্বরে তারা বলে উঠল, “মৃত্যুদণ্ড!”
এবার অভিযুক্তের পালা। দার্শনিক চেষ্টা করলে নিজের দোষ কবুল করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে নিজের মৃত্যুদণ্ড এড়াতে পারতেন। কিন্তু নির্ভীক দৃঢ়চেতা পণ্ডিত বলে বসলেন, “শাস্তি কী বলছেন আপনারা? আমার কাজের জন্য তো আমাকে পুরস্কৃত করা উচিত!”
অভিযোগকারী এবং জনতা তো বটেই, জুরিরাও এমন উত্তরে হতবাক! শুরু হয়ে গেল গুঞ্জন। বিচারকেরা আদেশ করলেন, কিছু না কিছু শাস্তির কথা নিজ মুখে তাঁকে বলতে হবেই। একান্ত অনিচ্ছায় শেষে তিনি বললেন, “আমাকে সামান্য কিছু অর্থই না হয় জরিমানা করা হোক!”
অতঃপর নিয়মমাফিক অভিযোগকারী এবং অভিযুক্তের কাছ থেকে শাস্তির পরিমাণের কথা শোনা হল। এবার চূড়ান্ত ঘোষণার পালা। বিচারকেরা শাস্তি ঘোষণা করলেন – মৃত্যুদণ্ড। আবারও স্মিত হাসলেন দার্শনিক। চোখেমুখে উত্তেজনার লেশমাত্র নেই। যেন শাস্তিটা তাঁর জানাই ছিল। বৃদ্ধ দার্শনিকের সাময়িক ঠাঁই হল কারাগারে। এখানেই হবে তাঁর শাস্তি। এথেন্সের আইন মোতাবেক অপরাধীকে নিজেকেই নিজের মৃত্যু ঘটাতে হবে, অর্থাৎ বাধ্যতামূলক আত্মহত্যা। আর মৃত্যুবরণের নিয়ম হল একপাত্র বিষ পান। মন্থর ক্রিয়াশীল ও যন্ত্রণাহীন কিন্তু নিশ্চিত হন্তারক এই বিষের নাম হল হেমলক।

সময় ঘনিয়ে এল। কারাগারের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক যুবা একপাত্র হেমলক বিষ এনে দাঁড়াল দার্শনিকের সামনে।
“তুমি নিশ্চয়ই ঠিকঠাক বুঝে নিয়েছ তোমার উপরওয়ালাদের কাছ থেকে আমাকে ঠিক কী কী করতে হবে।” দার্শনিক শান্তভাবে বললেন।
“হ্যাঁ। আপনি এটা শুধু পান করবেন। তারপর এই কক্ষের মধ্যে পায়চারি করবেন যতক্ষণ না আপনার পাদুটো ভারী হয়ে আসে। তারপর আপনি সটান শুয়ে পড়বেন। আর কিছু না। বিষটা শীগগির আপনার শরীরে কাজ করা শুরু করে দেবে।” যুবাটি যান্ত্রিকভাবে কথাগুলো বলে গেল।
দার্শনিক খুব আনন্দের সঙ্গে দু’হাত বাড়িয়ে যুবাটির কাছ থেকে বিষপাত্র নিজের হাতে নিলেন।
“আচ্ছা, আমি কি এই বিষটা কারও কাছে কিছুক্ষণ রেখে দিতে পারি?” দার্শনিক জানতে চাইলেন।
যুবাটি একইরকম যান্ত্রিকভাবে বলল, “না। আপনাকে দেওয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই এই বিষটা পান করতে হবে।”
“বুঝলাম। এসো আমরা প্রার্থনা করি, পৃথিবীতে আমাদের এই সুখী সহাবস্থান যেন কবরেও বজায় থাকে।” এই কথা ক’টি বলে তিনি সানন্দে বিষপাত্রটি দুই ঠোঁটের মাঝে নিয়ে দ্রুত সমস্ত বিষ পান করে নিলেন। বিষের শেষবিন্দুটাও তিনি ফেলে রাখতে রাজি নন। আর তাই বিষপাত্রটিকে উপুড় করে শেষবিন্দুটিও যেন পরম তৃপ্তিতে গলাধঃকরণ করে নিলেন।

দার্শনিকের অনুগামী ছাত্ররা সমস্ত দৃশ্য লক্ষ করছিল গরাদের ওপাশ থেকে। তাদের শিক্ষক, বন্ধু তথা পথপ্রদর্শক দার্শনিককে অবিচল চিত্তে বিষপান করতে দেখে আর নিজেদের আবেগ সংবরণ করতে পারল না। তারা আকুল হয়ে সশব্দে কেঁদে উঠল। সেই ক্রন্দনরোল দার্শনিকের কানে পৌঁছোতেই একটু বিরক্ত হলেন। “তোমরা তো দেখছি ভারি অদ্ভুত! কী হয়েছে তোমাদের? যে কারণে আমি এখানে মেয়েদের আসতে বারণ করেছিলাম সেই কাজটা তোমরাই করছ? আমি শুনেছি, প্রত্যেকের মৃত্যু হওয়া উচিত নিস্তব্ধতার মধ্যে। তাই তোমরা শান্ত হও। নিজেদের সংযত করো।”
দার্শনিক পায়চারি করতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই যুবাটির কথামতো তাঁর পাদুটো ভারী হয়ে আসতে লাগল। তিনি শুয়ে পড়লেন। যুবাটি একটু দূর থেকে সব ঘটনা লক্ষ রাখছিল। সে এগিয়ে এসে দার্শনিকের পায়ের পাতা সজোরে মুচড়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “ব্যথা লাগছে?”
চোখ বন্ধ রেখে তিনি উত্তর দিলেন, “না।”
যুবাটি তাঁর শরীর স্পর্শ করেই বুঝতে পেরেছিল, দার্শনিকের শরীর ক্রমশ শীতল ও দৃঢ় হয়ে আসছে। সে বিড়বিড় করে বলে উঠল, “বিষ হৃৎপিণ্ডে পৌঁছোলেই সব শেষ!”
দার্শনিকের দু’চোখের পাতা ভারী হয়ে এসেছে। তিনি তাঁর অন্যতম প্রিয় ছাত্র ক্রিটোর উদ্দেশ্যে বললেন, “ক্রিটো, অ্যাসক্লিপিয়াসের কাছে আমার একটা মোরগ মানত করা আছে। ওটা শোধ করে দিতে যেন ভুলো না।”
অ্যাসক্লিপিয়াস হলেন আরোগ্যলাভের গ্রিক দেবতা। হয়তো কোনও মুমূর্ষু ছাত্রের আরোগ্য কামনা করে তিনি এই মানত করেছিলেন। দু’নয়নে অশ্রুবর্ষণ করতে করতে ক্রিটো কথা দিলেন, “অবশ্যই। আর কিছু কি বলবেন?”

আর কোনও কথা শোনা গেল না; কেবল তাঁর ঠোঁটদুটো একটু নড়ে উঠল। যুবাটি তাঁর চোখের পাতা একটু টেনে চোখ পরীক্ষা করল। তারপর তাঁর চোখের পাতা আর আধখোলা ঠোঁটদুটো বন্ধ করে দিল। যুবাটি এবার গরাদের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল, যার অর্থ বুঝতে কারও বাকি রইল না – সব শেষ! আর সাথে সাথে শেষ হয়ে গেল খ্রিস্টের জন্মের প্রায় চারশো বছর আগে তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষটির জীবনের যাত্রাপথ। সেই মানুষটি হলেন এক এবং অদ্বিতীয় দার্শনিক তথা পাশ্চাত্য দর্শনের স্থপতি সক্রেটিস। আর তাঁর হন্তারক হয়ে বিশ্বজগতের কাছে কুখ্যাত হয়ে রইল হেমলক।

শুধু সক্রেটিস নন, প্রাচীন গ্রিসে শাস্তির নামে হেমলক বিষ পান করিয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে আরও অনেক মানুষকে। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আরও দু’জন হলেন থেরামেনেস এবং ফোকিওন।
এথেন্সের এক নামী রাজনীতিক ছিলেন থেরামেনেস। চরমপন্থী শাসকের নীতির বিরোধিতা করায় ৪০৪ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে তাঁকে হেমলক বিষ পান করিয়ে হত্যা করা হয়।
এথেন্সের আরেক সফল রাজনীতিক ছিলেন ফোকিওন। জনগণের কাছে তিনি ‘উত্তম’ (The Good) নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। লোকে বলত, এথেন্সের রাজসভার সবচেয়ে সৎ রাজনীতিক হলেন ফোকিওন। ৩২০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের শেষার্ধে ম্যাসিডন যখন এথেন্স দখল করে নেয় তখন তিনি শত্রুপক্ষের সমস্ত প্রলোভন উপেক্ষা করে এথেন্সের নাগরিকদের রক্ষা করার জন্য মরণপণ লড়াই করেন। স্বভাবতই ম্যাসিডোনিয়ার শাসক পলিপারকনের চোখে তিনি চরম শত্রুতে পরিণত হন। আর তাই ৩১৮ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে হেমলক বিষ পান করিয়ে তাঁকেও হত্যা করা হয়।

কী এই হেমলক (Hemlock)? এটি হল দ্বিবর্ষজীবী একপ্রকার বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। বিজ্ঞানসম্মত নাম Conium maculatum। গোত্র এপিয়েসি (Apiaceae) বা  গাজর পরিবারভুক্ত উদ্ভিদ হল হেমলক। এর আদি নিবাস ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকা। তবে পৃথিবীর নানা দেশেই এই গাছ ছড়িয়ে পড়েছে। গাছটি ৫ থেকে ৮ ফুট লম্বা হয়। ভেজা মাটিতে এই গাছ ভালো জন্মায়। জলাশয়ের পাড়ে বা রাস্তার ধারে বা পতিত জমিতেও হেমলক গাছ দেখা যায়। এই গাছটির সমস্ত অংশই বিষাক্ত। অবশ্য কাঁচা অবস্থায় বিষের মাত্রা যত তীব্র হয়, শুকনো অবস্থায় ততটা হয় না।

হেমলকের বিষক্রিয়ার জন্য দায়ী উপাদান হল কোনাইন (Coniine) নামক উপক্ষার (Alkaloid)। কোনাইন কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ওপরে ক্রিয়া করে এর কাজ স্তব্ধ করে দেয়। পেশি ও স্নায়ুর সংযোগস্থলে কোনাইন উদ্দীপনা প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে শ্বাসপেশির সংকোচন ঘটে না বা হৃৎপিণ্ডের সংকোচন হয় না। সামান্য মাত্রার কোনাইন শ্বাসক্রিয়া ও হৃৎস্পন্দন বন্ধ করে দিয়ে মৃত্যু ঘটাতে পারে। কোনাইন বৃক্কের ক্রিয়াও স্তব্ধ করে দিতে পারে। ছয় থেকে আটটি তাজা পাতায় প্রায় ১০০ মি.গ্রা. কোনাইন থাকে যা একজন মানুষের মৃত্যু ঘটানোর পক্ষে যথেষ্ট। সামান্য বীজ বা মূল খেলেও মানুষের মৃত্যু হতে পারে। গবাদি পশুও যদি এই উদ্ভিদের কোনও অংশ খায় তো মারা যেতে পারে। আবার হেমলক উদ্ভিদ খাওয়া কোনও গাভীর দুধ মানুষ খেলে তারও বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ত্বকে এই উদ্ভিদের কোনও অংশ ঘষা লাগলে চর্মরোগ হতে পারে। হেমলক উদ্ভিদের মূলের সাথে গাজরের সাদৃশ্য থাকায় ভুল করে কেউ খেয়ে নিলে মৃত্যু অবধারিত। উত্তর আমেরিকার কয়েকটি উপজাতির মানুষ শিকারের জন্য তিরের আগায় এই হেমলক উদ্ভিদের পাতার নির্যাস লাগিয়ে নেয়। হেমলক খেয়ে নিলে আধঘন্টা থেকে একঘন্টার মধ্যেই বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা যায়। হেমলক বিষে আক্রান্ত হলে চিকিৎসার কোনও ব্যবস্থা অন্তত আজ পর্যন্ত নেই।
এমন মারাত্মক বিষাক্ত যে উদ্ভিদ, সে-ই কিন্তু আবার একটা প্রাণীর বাঁচার রসদ। Agonopterix alstroemeriana নামে একপ্রকার মথের লার্ভা হেমলকগাছের পাতা খেয়েই বাঁচে, কিন্তু ওদের মধ্যে কোনও বিষক্রিয়া ঘটে না। প্রকৃতি সত্যিই বড়ো বিস্ময়কর।

_____

2 comments:

  1. অসাধারণ স‍্যার।।। Hats off

    ReplyDelete
    Replies
    1. পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ

      Delete