গল্পঃ সামংঃ কস্তুরী মুখার্জি



একদিকে প্রবাল সবুজ, অন্যদিকে ফ্লুরোসেন্ট নীল রং। পেছনে দিগন্তবিস্তৃত গেরুয়া পাহাড়। প্যাঙগং লেকের এই স্বর্গীয় রূপে আচ্ছন্ন হয়ে লেকের ধারে একটা পাথরের ওপর বসে আছে গুঞ্জা। মাথার ওপর ঝকঝকে নীল আকাশ। পৃথিবীর কোনও মালিন্য এই জায়গাকে ছুঁতে পারেনি। উলের মোজাটা খুলে হ্রদের জলে পা ছোঁয়ানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু হিমশীতল জল সারা শরীরে কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছিল। গুঞ্জা, টিনা আর রঞ্জন - এই তিনজন কলেজের বন্ধু। এখন যদিও গুঞ্জা আর রঞ্জন আইটি সেক্টরে ভালো পোস্টে চাকরি করে, আর টিনার বুটিক আছে। Tina’s এখন সারা পশ্চিমবঙ্গ কেন ভারতের অন্য রাজ্যেও পরিচিত নাম। ওরা তিনজনে লাদাখ ভ্রমণে বেরিয়েছে। আজ দুপুর নাগাদ লেহ থেকে প্যাঙগং লেকে এসেছে।
পিঠে হঠাৎ একটা নরম হাতের স্পর্শ পেয়ে গুঞ্জা চমকে পেছন ফিরে তাকাল। একটা বছর দশেকের বাচ্চা ছেলে ওকে ডেকে পেছনের তাঁবুগুলোর দিকে দেখাচ্ছে। গুঞ্জা ওদের তাঁবুর দিকে তাকিয়ে কিছু বুঝতে না পেরে ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করল, “ক্যায়া?”
ছেলেটা বারবার ইশারায় তাঁবুর দিকে দেখাচ্ছে। গুঞ্জা লেদার জাকেটটাকে আর একটু টেনে আস্তে আস্তে তাঁবুর দিকে এগিয়ে গেল। ছেলেটাও ওর পাশে পাশে চলেছে।
“কোই বুলায়া মুঝকো?” নুড়িপাথরের রাস্তা পেরিয়ে যেতে যেতে গুঞ্জা জিজ্ঞেস করল।
ছেলেটা একটু হাসল ওর দিকে তাকিয়ে। গুঞ্জার মনে হল, এক বিষণ্ণতা লুকিয়ে আছে হাসির মধ্যে। গুঞ্জা খেয়াল করেছে যে ছেলেটা ওর দিকে মধ্যে মধ্যেই তাকাচ্ছে।
গুঞ্জাদের তাঁবুর সামনে ছোট্ট একফালি ইট আর খোয়ার এবড়োখেবড়ো বারান্দা আছে। সেখানে একটা বেতের চেয়ারে রঞ্জন আর টিনা বসে আছে। সামনে একটা বড়ো ফ্লাস্ক রাখা আর পাশে তিব্বতি থাংকার ছবি আঁকা একটু বড়ো চায়ের কাপ। গুঞ্জা হেসে বারান্দার এককোণে বসে পড়ল। ছেলেটার দৃষ্টি কিন্তু গুঞ্জার দিক থেকে একটুও সরেনি।
“কী রে, ডাকছিলি?”
“হ্যাঁ। চা খাবি?” রঞ্জন উত্তর দিল।
“হ্যাঁ, খাবো। এই জন্য ডাকলি?” ছেলেটাকে দেখিয়ে গুঞ্জা বলল, “ও তো ইশারায় দেখাচ্ছে। বুঝতেই পারছি না। জিজ্ঞেস করলাম, ওই এক ইশারা। কোনও উত্তর দিল না। হিন্দিও বোঝে না।”
“ওরা দেহাতি। নিজেদের ভাষা ছাড়া কিছুই বোঝে না। বুঝবে কী করে? এই অঞ্চলের বাইরে কোনওদিন যায়নি মনে হয়।”
“কিন্তু টুরিস্ট তো প্রচুর আসে। একটু হিন্দিও বুঝবে না?” মাথায় একটা উলের টুপি, তার ওপর দিয়ে কাশ্মীরি স্টোলটাকে ভালো করে জড়াতে জড়াতে গুঞ্জা রঞ্জনের দিকে তাকিয়ে বলল।
“না রে, বুঝবে না। ওদের আঞ্চলিক ভাষা মূলত হল লাদাখি বা তিব্বতি। কিছু কিছু অঞ্চলে বাল্টি আর উর্দু চলে।” টিনা তাঁবুর ভেতর থেকে কম্বল নিয়ে এসে নাক আর চোখ বাদে সব জড়িয়ে বসে আছে। কোনওরকমে মুখটা বার করে উত্তর দিল।
“যাই বলিস, এটা মানা যায় না। টুরিস্টদের সাথে কম্যুনিকেশন করবে কীভাবে? আর ব্যাবসা চালাতে হলে হিন্দি শেখা মাস্ট।” গুঞ্জা বিকেলের মরে আসা আলোয় দূরে তাকিয়ে বলল।
ছেলেটা কটেজের একপাশে গিয়ে ওদের মুখের দিকে লক্ষ করছিল। তবে গুঞ্জার দিকেই তাকাচ্ছে বারবার। বড়ো করুণ সেই দৃষ্টি। গুঞ্জা সেটা লক্ষ করে ওকে ডাকতেই একটা মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে দৌড়ে চলে গেল।
“আরে, ওর বয়সটা দ্যাখ। ও হয়তো টুকটাক ফাইফরমাশ খাটে। ওর বাবা বা ওরকম কেউ এই টেন্টের ডাইনিংয়ে কাজ করে বোধহয়। সেই এসে তো টিনাকে লাদাখি চায়ের কথা বলল।” রঞ্জন বলল।
গুঞ্জা ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “লাদাখি চা! স্পেশাল?”
“ইয়েস। এই লাদাখি চাকে গুড় গুড় চা বলে। বাঁশের সিলিন্ডারে এই চা-টা ফোটানো হয়। তারপর স্বাদ অনুযায়ী নুন দেওয়া হয়। আরেকটা ইন্টারেস্টিং জিনিস হল, এই চায়ে মাখন দেওয়া হয়।”
“মাখন!”
“খুব ড্রাই ওয়েদার তো, তাই লাদাখে চায়ে মাখনের চল।”
“তুই এত খবর জানলি কী করে, রঞ্জন?”
“আমি তো ডাইনিংয়ের টেন্টের সামনে গিয়ে ওখানকার যে ম্যানেজার রামলাল তেওয়ারি, তার সাথে কথা বলছিলাম, তখনই জানলাম। জানিস টিনা, তেওয়ারিজি বাংলা জানে।”
“তাই?” টিনা আবার কম্বলের ভেতর থেকে মুখটাকে বার করে কথাটুকু বলে ভেতরে মুখটাকে ঢুকিয়ে দিল।
“তেওয়ারিজি পুরুলিয়াতে দশ বছর কোনও এক কারাখানাতে কাজ করেছেন। আমার সাথে ভালো বাংলায় কথা বললেন।”
রঞ্জনের কথার মধ্যে দূর থেকে দেখা গেল সেই ছেলেটা আবার দৌড়ে আসছে। হাতে আরেকটা ফ্লাস্ক। এসেই বারান্দায় সেটাকে রেখে আবার উলটোদিকে দৌড় লাগল। গুঞ্জা চেঁচিয়ে ওকে ডাকল। পেছন ফিরে একটু দেখল সে। গুঞ্জা হাত দিয়ে কাছে আসতে বলল।
“ক্যায়া নাম হ্যায় তুমহারা?”
ছেলেটা একটু হেসে আবার দৌড় লাগাল।
এর মধ্যে  সূর্য অস্ত গেছে। হঠাৎ করেই লেকের জলটা ঘন কালো হয়ে গেল। পাহাড়ের গেরুয়া রংটা কেমন ধূসর লাগছে।
“মাই গুডনেস! দেখেছিস প্রকৃতি কী অদ্ভুত রঙের খেলায় মেতেছে!” গুঞ্জার অস্ফুট স্বরে সবাই লেকের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।

“মিঃ মুন্সী, মিঃ মুন্সী…”
কে ডাকছে ওকে? পেছন ফিরে তাকিয়ে রঞ্জন দেখল, তেওয়ারিজি প্রায় দৌড়োতে দৌড়োতে আসছেন। লেক আর তাঁবুর চারপাশটায় কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া সশব্দে বয়ে চলেছে। তীক্ষ্ণ ছুরির ফলার মতো সেই হাওয়া ভারী লেদার জ্যাকেট ভেদ করে যেন শরীরে এসে লাগছে। তবুও তার মধ্যে রঞ্জন আর গুঞ্জা কলুষমুক্ত প্রকৃতিকে উপভোগ করার জন্য বাইরে বসে আছে। টিনা টেন্টের মধ্যে বিছানায় কম্বলের তলায় নিজেকে চালান করে দিয়েছে।
তেওয়ারিজির ডাকে রঞ্জন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। “কী ব্যাপার তেওয়ারিজি, আপনি হাঁপাচ্ছেন? কী হয়েছে?”
“মিঃ মুন্সী, আপনারা সামংকে দেখেছেন?”
“সামং কে?”
“ওই যে বাচ্চা ছেলেটা যে আপনাদের চা দিল, ওর নাম সামং।”
“কেন তেওয়ারিজি, ওকে পাচ্ছেন না? ও তো অনেকক্ষণ আমাদের চায়ের ফ্লাস্ক দিয়ে ওই পেছনের রাস্তা দিয়ে ঐদিকে দৌড়ে গেল।” বলে রঞ্জন তাঁবুর পেছনের রাস্তা দেখাল।
“ও তো না বলে যায় না। তাছাড়া ওই সময় ও গাঁওতে যায় না তো!”
“ওদিকে ওর গ্রাম?”
হালকাভাবে মাথা নেড়ে তেওয়ারিজি বিড়বিড় করছিলেন। “এত অন্ধকারে একা একা... খুব ডরপুক আছে!”
“সামং এখানে কাজ করে?” গুঞ্জা জিজ্ঞেস করল।
“নহি, ম্যাডাম। ওর চাচা ওই যে একটু খুঁড়িয়ে হাঁটছে যে তার কাছে থাকে। চাচা কাজে ব্যস্ত থাকলে তখন গেস্টদের চা, পানি এসব দেয়।”
“হুম, খুব চিন্তার ব্যাপার। আর ছেলেটা মনে হয় খুব লাজুক। নাম জিজ্ঞেস করলাম। বুঝল না নাকি বলতে লজ্জা পেল জানি না। হিন্দি বোঝে না মনে হয়। দৌড়ে চলে গেল।” গুঞ্জা ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে বলছে।
“ম্যাডাম, ওর একটা খুব দুখভরি কহানি আছে।” তেওয়ারিজি টর্চ জ্বালাতে জ্বালাতে বললেন।
“সামংয়ের!” রঞ্জন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ, মিঃ মুন্সী। ওর মা-বাবা পাথর কাটার কাজ করত। আর চাচা এই টেন্টে কাজ করে। ওদের গাঁও এই লেকের পেছনে। গাঁওয়ের নাম সামলাং। তো বছর তিন আগে সামংয়ের বাবা-মা ওকে চাচির কাছে রেখে... সোমরিরি লেকের নাম শুনেছেন তো?”
“হ্যাঁ, আমরা সোমরিরি হয়েই এখানে এসেছি।” গুঞ্জা বলল।
“হ্যাঁ, সেই লেকের নজদিগ কোই পাথর কাটার কাজে চলে গেছিল। লগভগ দো মহিনা বাদ ফিরে আসবে বলে গিয়েছিল। কিছুদিন বাদে এই ধরুন পনেরো দিন বাদে ওর চাচার কাছে খবর আসে ওই জায়গার ল্যান্ড ব্লাস্ট করে যতজন লেবার ছিল সবার মৌত হয়ে গেছে।”
“সে কি!” গুঞ্জা আঁতকে চেঁচিয়ে উঠল।
“হ্যাঁ, ম্যাডাম। সামংরা এখানকার লোক। ওদের এখানে বহুত জান পহেচান আছে। তো খবর পেয়েই সব চলে গিয়েছিল। ওর চাচা ভি গিয়েছিল।”
তেওয়ারিজি একটু চুপ করলেন। সেই নির্জন প্রান্তে নিঃসীম অন্ধকারে হিমকুচির মতো হাওয়া বয়ে চলেছে আর তিনটে মানুষ কেমন বোবা হয়ে গেছে।
“ম্যাডাম, বাচ্চা হলেও সামং সেই খবর শোনার পর থেকে একদম চুপ হয়ে গিয়েছিল। রাতে চাচির কোল ঘেঁষে শুয়ে থাকত। এখনও খুব কম কথা বলে। কিছু জিজ্ঞেস করলে ইচ্ছে হলে উত্তর দেয়। তবে খুব কম।”
“তবে পড়াশুনা?” গুঞ্জা জিজ্ঞেস করল।
“ম্যাডাম, এখানে খুব ভালো স্কুল নেই। আর চাচা তো সুবহ সে লে কর শাম তক এখানে কাজ করে। চাচি লিখাপড়া জানে না। সবচেয়ে বড়ি বাত হল, ও স্কুলে যেতেই চায় না। কীভাবে ওর পড়াশুনা হবে বলুন? তবে এখন জোর করে চাচা এখানে নিয়ে আসে। দেখলে খুব কষ্ট হয়।”
হঠাৎ দূর থেকে টর্চের আলোর মতো দুটো, তিনটে আলোর ফুটকি দেখা গেল। আলোর রশ্মি ক্রমশ এগিয়ে আসছে। তেওয়ারিজি নিজের টর্চটা জ্বালিয়ে এগিয়ে গেলেন। রঞ্জন, গুঞ্জাও সাথে সাথে গেল।
“ম্যানেজার সাব, ম্যানেজার সাব…” সামংয়ের চাচা এদিকে আসছে, সাথে আরও দুই-তিনজন।
কাছে আসতে সামংকে দেখতে পেল গুঞ্জারা। গুঞ্জার বুকের ভেতরটা শিরশির করে উঠল। গুঞ্জা টের পাচ্ছে যে এটা আনন্দের শিরশিরানি। সামংকে পাওয়া যাওয়ার আনন্দই বোধহয়। ও প্রায় লাফিয়ে সামংয়ের কাছে চলে গেল।
“সামং... সামং…” গুঞ্জা ওর কাঁধ ধরে ঝাঁকাচ্ছে।
তেওয়ারিজি ওর চাচাকে জিজ্ঞেস করলেন, “ও কোথায় গিয়েছিল?”
“ম্যানেজার সাব, উধর গাঁও কি নজদিগ এক সো হ্যায়। উয়হা পর বহুত বড়িয়া ফুল হ্যায়। দেখিয়ে, সামং ওয়হ ফুল লানে কে লিয়ে গয়া থা ইতনি অন্ধেরে মে।”
“লেকিন কিউ!” তেওয়ারিজি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
“ওয়হ তো ম্যায় ভি সোচতা হ্যায় সাব। সামং কি মা কি বহুত পসন্দ কি ফুল থি ওয়হ। লেকিন…”
সামং চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। তেওয়ারিজি জিজ্ঞেস করলেও কোনও উত্তর পাওয়া গেল না। হঠাৎ সামং ফুলটা নিয়ে গুঞ্জাকে দিল। চোখে মুখে অদ্ভুত এক আনন্দের ছোঁয়া লেপটে আছে। ওই কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যেও ওর চাচা ঘামছে। সামংয়ের এই আচরণটায় চাচার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছে। “ভাবীর মৌতের পর এ ফুল আনলেই ও কেঁদে উঠত, অউর আজ সামং খুদ হি এই ফুল নিয়ে আসল!”
গুঞ্জা ফুলটা হাতে নিয়ে নিচে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। আস্তে আস্তে সামংকে কাছে টেনে নিল। গুঞ্জার চোখদুটো টলটল করছে জলে। নিকষ অন্ধকারে কেউ টের পেল না। শুধু সামং বড়ো বড়ো লাল চোখে তাকিয়ে আছে। গুঞ্জার মধ্যে ও যা দেখতে পেয়েছে সেটা শুধু সামংই জানে।
রঞ্জন তেওয়ারিজির দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে বলল, “তাজ্জব কি বাত হ্যায়!”
“হাঁ সাব, বড়ি তাজ্জব কি বাত। ইস দুনিয়া মে কত তাজ্জবের ব্যাপার ঘটে আমাদের বুদ্ধি দিয়ে ওয়হ সমঝ না বড়ি মুশকিল কি বাত হ্যায়।” তেওয়ারিজি বলে উঠলেন।
হঠাৎ সামং গুঞ্জার বুকে মুখ লুকিয়ে জোরে কেঁদে উঠল। ওর গলার আওয়াজে চাচা হাতজোড় করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কী বলে উঠল।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ নচিকেতা মাহাত

3 comments:

  1. আমার তো মনে হলো শেষ পর্যন্ত পাঠকের আগ্রহটা লেখিকা ধরে রাখতে পেরেছে।ধন্যবাদ

    ReplyDelete
  2. Khub bhalo laglo pore :)

    ReplyDelete