গল্পঃ তুলতুলির চোর ধরাঃ অনন্যা দাশ


তুলতুলির চোর ধরা

অনন্যা দাশ


ছোট্ট মুরগির ছানা তুলতুলি। হলুদ নরম তুলতুলে পালকগুলো তার, তাই মা আদর করে নাম দিয়েছে তুলতুলি। ওরা দু’জনে যদু পালের খামারবাড়িতে থাকে আরও একগাদা জন্তুদের সঙ্গে। তা তুলতুলির মা তো ভারি ব্যস্ত। ওর বিচ্ছু ভাইগুলো সবসময় এদিক ওদিক পালিয়ে যায়, আর মাকে গিয়ে গিয়ে ওদের খুঁজে নিয়ে আসতে হয়।
মা বলে, “তুলতুলি, তুই কোথাও যাসনি বাবা। শেষে আবার তোকে খুঁজতে বেরোতে না হয় যেন।”
তুলতুলি অবশ্য খুবই বাধ্য। মার কথা শুনে চুপ করে বসে থাকে।
লক্ষ্মী গরু মাসি গলার ঘণ্টা নাড়াতে নাড়াতে ওর পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলে, “কী রে তুলতুলি? ভালো আছিস তো? তোর মা বুঝি আবার তোর বিচ্ছু ভাইগুলোর পিছনে গেছে? তা তুই ঘাবড়াসনি। কিছু হলে আমাকে ডাকবি ‘হাম্বা হাম্বা’ বলে, কেমন? আমি ঠিক চলে আসব।”
তুলতুলি ঘাড় নেড়ে সায় দেয়। কী করবে বেচারা, সে তো কথাই বলতে পারে না! আসলে একটা কথা হলে তবে তো বলবে! মা শেখান ‘কোঁকর কোঁ’ বলতে, লক্ষ্মীমাসি বলে ‘হাম্বা’ বলতে, পুসিমাসি বলে ‘মিয়াও’ বলতে, ভোল্লুদাদা বলে ‘ভৌ ভৌ’ বলতে, হাঁসমামি বলে ‘প্যাঁক প্যাঁক’ বলবি, বিশাল উঁচু চৈতকমামা বলে ‘চিঁহিঁ-হি’ বলতে। তুলতুলি তো ভেবেই পায় না কী বলবে সে। মাথার মধ্যে সবকথাগুলো যেন কেমন তালগোল পাকিয়ে যায়, আর মুখ দিয়ে কোনও শব্দই বেরোয় না।
সবাই বলে, বেচারা তুলতুলি! ওর ভাইগুলো তো দিব্যি কথা বলে, চুপ করে থাকে কেবল সে। তবে খুব নিরীহ আর মিষ্টি স্বভাব বলে সবাই ওকে খুব ভালোবাসে। যদু পালের নাতনি রিয়ার তো তুলতুলিকে ভীষণ পছন্দই হয়ে গিয়েছিল। সে দাদুর কাছে কান্নাকাটি জুড়েছিল যে তুলতুলিকে নিজের সাথে কলকাতা নিয়ে যাবে। তুলতুলি তো ভয়েই একসা! মাকে ছেড়ে যেতে হলে সে কী করে থাকবে? ভাগ্য ভালো রিয়ার মা বুঝতে পেরে বলেছিল, “না রিয়া, ও এখন খুব ছোটো, নিজে নিজে খেতেও পারে না! ওকে ওর মার কাছ থেকে আলাদা করলে ও থাকতে পারবে না। তাছাড়া আমাদের ওই ছোটো ফ্ল্যাটবাড়িতে মুরগি রাখার মোটেই জায়গা নেই।”
ওই কথাগুলো শুনে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিল তুলতুলি।
রিয়া বলল, “মা, ও তো ঠিক ভাইটির মতন। কিছুই বলতে পারে না!”
ওর মা বললেন, “হ্যাঁ, রিশান যেমন বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি সব শুনে কোন ভাষাতে কথা বলবে বুঝতে পারছে না, ঠিক সেইরকম।”
সেটা শুনে তুলতুলির খুব মজা লাগল। যাক, রিয়ার ভাই রিশানও তাহলে ওর মতন কথা বলতে পারে না!

তারপর একদিন চুপ করে বসে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখছিল তুলতুলি। হলুদ আর কমলা নামের দুটো হাঁসছানা খুব হুটোপাটি করে খেলছিল। তুলতুলিকে দেখতে পেয়ে প্যাঁক প্যাঁক করে জিজ্ঞেস করল, “কী রে তুলতুলি, খেলবি নাকি আমাদের সঙ্গে?”
তুলতুলি মাথা নাড়ল। মা যে ওকে কোথাও যেতে বারণ করেছে! দুষ্টু হাঁসগুলো হি হি করে হেসে বলল, “এমা ছি ছি! তুলতুলি কথা বলতে পারে না!” বলেই পালিয়ে গেল।
তুলতুলির একটু মনখারাপ হল। কিন্তু কী আর করবে। কথাটা তো সত্যি।
একটু পরেই সব দুঃখ ভুলে চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মজা দেখতে লাগল তুলতুলি। পুসিমাসি আর ভোল্লুদাদাতে আবার মারামারি লেগেছে। পুসিমাসি নাকি ভোল্লুদাদার দুধ খেয়ে নিয়েছে। এই নিয়ে ওদের প্রায় রোজই লাগে। খুব হাসি পায় তুলতুলির।
একটু পরেই মা ফিরে এল চুলবুল আর কিলবিলকে নিয়ে। ধপাস করে মাটিতে বসে মা বলল, “উফ্‌, বড্ড হাঁপিয়ে গেছি! তুলতুলি ছুট্টে যাও তো মা, ওই জলার ধারে কয়েকটা কেঁচো রয়েছে, যা পারো মুখে করে নিয়ে এস। আমি আর নড়তে পারছি না।”
চুলবুল আর কিলবিল লাফিয়ে উঠল, “আমরাও যাই মা?”
মা গর্জে উঠল, “খবরদার, না! সারাদিন খালি টো টো করে ঘোরা, না? একদম চুপ করে বসে থাকো।”
দু’জনে তাও ফিসফিস করে ফোড়ন কাটতে ছাড়ল না, “তুলতুলি কথা বলতে পারে না।”
তুলতুলি ওদের কথা গায়ে মাখল না। মনের আনন্দে খাবার আনতে জলার দিকে চলল। সন্ধ্যা তখন নামব নামব করছে। হঠাৎ কী একটা শব্দ শুনে একটা গাছের পিছনে লুকাল সে। ও মা, দুটো লোক! কারা এরা? কোনওদিন তো এদের দেখেনি তুলতুলি!
লোকগুলো নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। কান পেতে শোনার চেষ্ট করল সে।
একজন বলল, “এই সু্যোগ, রাজা আজ তাড়াতাড়ি কাজ মিটিয়ে চলে গেছে। তাড়াহুড়োতে আস্তাবলের দরজাটা বন্ধ করতে ভুলে গেছে। আমি অনেকদিন ধরে এই দিনটার অপেক্ষায় ছিলাম। ঘোড়াটাকে সরিয়ে নিয়ে পালাব আজকে। ব্যাটার চেহারা বেশ ভালো। বাজারে ভালো দাম পাওয়া যাবে। কী বলিস?”
“সে আর বলতে! কেশবদা তো বলেই রেখেছে, ভালো কিছু আনতে পারলে বাড়তি টাকা দেবে।”
তুলতুলি কথা বলতে না পারলে কী হবে সে সবকিছু বুঝতে পারে। রাজা কে সেটাও সে জানে। রাজা বলে লোকটা চৈতকমামার দেখাশোনা করে। আর আজকে সে আস্তাবলের দরজা বন্ধ করতে ভুলে গেছে। কী হবে? লোকগুলো চৈতকমামাকে নিয়ে চলে যাবে! কী করবে তুলতুলি? মাকে গিয়ে বলার সময় নেই। মা অনেক দূরে, আর সে তো উড়তেও পারে না!
হঠাৎ ওর মনে হল, ভোল্লুদাদা ওকে একবার বলেছিল, “জানিস, সব চোরেরা আমাকে খুব ভয় পায়। আমার ডাক শুনেই পালায়।”
আর সময় নেই দেখে তুলতুলি মনে করার চেষ্টা করল ভোল্লুদাদার ডাক। নিজেকে বলল, ‘তুই পারবি তুলতুলি, তুই পারবি!’ তারপরেই মুখ খুলে ডাক দিল তুলতুলি, “ভৌ-ভোউ-ভৌউ!”
লোকগুলো একটু চমকে গেল বটে, কিন্তু থামল না। আস্তাবলের দিকে দৌড় দিল। তুলতুলির ভৌ শুনে ভোল্লু আশ্চর্য হয়ে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে এদিক ওদিক তাকাল। অন্য কোন কুকুর এল রে বাবা? ঠিক তখনই সে দেখতে পেল লোকদুটোকে। আরে, এরা কারা? প্রবল জোরে ভৌ ভৌ করে ডাকতে শুরু করল সে।
এদিকে তুলতুলি লোকগুলোর পিছন পিছন ছুটে চলেছে। গোয়ালঘরটার সামনে দিয়ে যেতে যেতে একটা দম নিয়ে সে ডাক দিল, “হাম্বা-হাম্বা-হাম্বা!”
লক্ষ্মী গরু গোয়াল থেকে বেরিয়ে এল। এই সন্ধ্যার সময় আবার কোন গরু এল? বেরিয়েই লোকদুটোকে দেখতে পেল। বেদম জোরে হাম্বা হাম্বা করতে লাগল সে।
এমনি করে একে একে তুলতুলি সবার ডাক ডেকে ফেলল। সবশেষে লোকগুলো যখন আস্তাবলে ঢুকে পড়েছে তখন ওর ছোট্ট দেহের সবটুকু শক্তি দিয়ে সে ডেকে উঠল, “‘কোঁকর-কোঁ” বলে।
যদু পাল আর তার স্ত্রী ঘরে বসে ছিলেন। হঠাৎ মুরগির ডাক শুনে যদু পাল বললেন, “এই সন্ধেবেলা মুরগি ডাকছে কেন দেখে আসি।”
ওঁর স্ত্রী বললেন, “শুধু কি মুরগি? আরও অন্য অনেক ডাক শুনতে পাচ্ছি মনে হচ্ছে! যাও যাও, গিয়ে দেখো কী হল।”
তারপর আর কী! চোরগুলো ধরা পড়ল, পুলিশ এল। সবকিছু ভালোয় ভালোয় মিটল।
তবে তুলতুলির এখন ভারি আনন্দ। এখন আর ওকে কেউ বলে না যে তুলতুলি কথা বলতে পারে না।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ রাখি পুরকায়স্থ

2 comments:

  1. অসম্ভব ভালো

    ReplyDelete
  2. Dhanyabad Rakhi Purakayastha eto mishti ekta chhobi ankar janye _/\_

    ReplyDelete