গল্পঃ টেনডং গুম্ফার প্রেতশ্রমিকঃ সৈকত মুখোপাধ্যায়

ফিরে দেখা গল্প



।।এক।।

“আমি পারলাম না, গুরু জিগমে। বৃষ্টির কাছে আমি হেরে গেলাম। আমাকে ক্ষমা করুন।”
মনীশের এই কথায় এক মুহূর্তের জন্যে লামা জিগমে নামগিয়ালের মুখটা ম্লান হয়ে গেল।
পরক্ষণেই আবার চিরপরিচিত স্নিগ্ধ হাসিতে ভরে গেল সেই মুখ। বার্ধক্যের প্রকোপে শীর্ণ হাতখানা মনীশের কাঁধে রেখে তিনি বললেন, “তোমার কী দোষ, মনীশ? এ তো আমার দুর্ভাগ্য। তা না হলে এই শীতের শুরুতে সিকিমে এমন প্রলয়ংকর বৃষ্টি নামে?”
পদাধিকারবলে গুরু জিগমের পরেই যাঁর অবস্থান, সেই ছোটোলামা সেন্ডুপ দোরজে বন্ধ জানালার শার্সির ভেতর দিয়ে বাইরে চেয়েছিলেন। ঘন মেঘ আর প্রবল বৃষ্টিতে এই বেলা তিনটের সময়েই যেন সেখানে রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে। খয়েরি আলখাল্লাটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিতে নিতে তিনি বললেন, “দুর্ভাগ্য কার জানি না, তবে লজ্জা আমাদের সকলের। লাসা আর ধরমশালা থেকে সংঘপিতারা কাল সকালেই এখানে এসে পৌঁছোচ্ছেন। পরশু নবস্বস্তিকাচক্রের মধ্যে দিয়ে তাঁদের নতুন গুম্ফা উদ্বোধন করবার কথা। সমস্ত পরিকল্পনা বানচাল হয়ে গেল!” ছোটোলামার দীর্ঘশ্বাসে ঝাপসা হয়ে গেল জানালার কাচ।
দক্ষিণ সিকিমের ডামথাং গ্রামের প্রান্তে অবস্থিত জরাজীর্ণ কাঠের বাড়িটার দোতলায় দাঁড়িয়ে ওঁরা তিনজন কথা বলছিলেন। বৃষ্টির শব্দকে ছাপিয়ে একতলা থেকে ভেসে আসছিল শিক্ষার্থী লামাদের পাঠাভ্যাসের গুনগুনানি।
গত দশ বছর ধরে এই ভাঙা বাড়িটারই একটা ঘরে বনগোষ্ঠীর বৌদ্ধদের আরাধ্য দেবতা ও অপদেবতাদের নিয়ে এই গুম্ফা চালাচ্ছেন লামা জিগমে নামগিয়াল।
কথা ছিল, আর দু’দিন পরেই নতুন বাড়িতে স্থানান্তরিত হবে সেই গুম্ফা। কিন্তু তা আর হল কই?
এই পুরনো কাঠের বাড়ির উত্তরদিকে দৃষ্টি মেলে দিলে দেখা যাবে, ডামথাং গ্রামের ঠিক গা ঘেঁষে উঠে গেছে টেনডং পাহাড়ের চূড়া। তিন হাজার ফুটের অমানুষিক চড়াই। তিন হাজার ফুটের দুর্ভেদ্য জঙ্গল।
ওই তিন হাজার ফুটের ব্যবধানেই টেনডং পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি একটা সমতল মাঠে আকার ধারণ করছে লামা জিগমের স্বপ্নের সৌধ। তাঁর বহু সাধনার নতুন গুম্ফা।
আর লামার সেই স্বপ্নকে আকার দেওয়ার জন্যেই এখানে আসা মনীশ মিত্রর। গত তিন মাস ধরে শিলিগুড়ির বিখ্যাত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার মনীশ মিত্র এই জনবিরল ডামথাং গ্রামে পড়ে রয়েছে টেনডং গুম্ফা বানানোর কাজ নিয়ে। ওই পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি সে গত তিন মাসে বানিয়ে তুলেছে ইট-কাঠ-পাথরের তৈরি এক বিশাল বেদি।
বেদি নয়, ওইটাই আসলে গুম্ফা, মানে বৌদ্ধমন্দির। দোতলা, চতুষ্কোণ এক বিশাল ইমারত, যার বাইরের দিকের সমস্ত অংশটাই বনগোষ্ঠীর বৌদ্ধধর্মের নানান মূর্তি, প্রতীক আর মন্ত্রমালায় অলঙ্কৃত।
সেই বাড়ির একতলায় তৈরি হয়েছে বিশাল সাধনকক্ষ আর নতুন দীক্ষিত লামাদের শিক্ষালয়। দোতলায় ছাত্রাবাস।
আর এই সম্পূর্ণ বাড়িটাই তার মাথায় ধরে থাকবে এক বিশাল মূর্তি - বৌদ্ধ তন্ত্রসাধক গুরু রিমপোচে অথবা পদ্মসম্ভবের পঁয়ত্রিশ ফুট উঁচু পাথরের মূর্তি, যার জুড়ি গোটা এশিয়ায় আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। আকাশ পরিষ্কার থাকলে নিচে পাহাড়তলির সমতল থেকে শুরু করে উত্তরে কাঞ্চনজঙ্ঘার পাদদেশ থেকেও দেখা যাবে নানান রঙে রঙিন সেই মূর্তি। সেই দিব্যদর্শনের সঙ্গে সঙ্গে পদ্মসম্ভবের অলৌকিক মহিমা ছড়িয়ে পড়বে এই সিকিমের কোনায় কোনায়।
বাড়ি তৈরি শেষ। শুধু এই মূর্তিস্থাপনের কাজটুকুই বাকি ছিল। আর সেই সময়েই আকাশ ভেঙে নেমে এল অকালবর্ষা।

।।দুই।।

বনগোষ্ঠীর বৌদ্ধরা ভারতে খুবই সংখ্যালঘু। এদের ইতিহাসটাও ভারি অদ্ভুত।
মধ্যযুগে তিব্বতসহ সমস্ত চীনেই বনদের প্রভাব ছিল অপরিসীম। তারা তখন মোটেই বৌদ্ধ ছিল না, ছিল তান্ত্রিক। তন্ত্রমন্ত্র, ঝাড়ফুঁক, মারণ-উচাটনে সিদ্ধহস্ত ছিল বনপুরোহিতেরা। এমনকি চীনের রাজসভাতেও ছিল তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য।
সেই আধিপত্য টলে গেল অষ্টম শতাব্দীতে, আজকের পাকিস্তানের এক জনপদ থেকে যখন বৌদ্ধতান্ত্রিক গুরু রিমপোচে, যাকে ভারতে আমরা গুরু পদ্মসম্ভব বলেই জানি, তিনি বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্যে তিব্বতে উপস্থিত হলেন। গুরু পদ্মসম্ভব নিজেও ছিলেন ডাকিনীসিদ্ধ। অলৌকিক মায়াজালের অধিকারী। ফলে বনপুরোহিতেরা তাঁর সঙ্গে দ্বৈরথে পেরে উঠল না। তাদের ধর্ম ক্রমশ বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে মিশে গেল। তৈরি হল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধারার বনবৌদ্ধধর্ম।
সেই ধারায় যেমন রয়েছেন বৌদ্ধ দেবদেবীরা, তেমনই রয়েছেন সেই প্রাচীন বনতান্ত্রিকদের আরাধ্য অপদেবতা। রয়েছে অন্যান্য সমাজের কাছে সম্পূর্ণ গোপন সব তান্ত্রিক আচার-আচরণ, গুপ্তমন্ত্র, অন্ধবিশ্বাস।
কিন্তু এই বৈশিষ্ট্যের ফলেই উত্তর ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ নিংমা বা গেলুগগোষ্ঠীর বৌদ্ধরা বনদের বৌদ্ধ বলেই স্বীকার করে না। বনদের সম্বন্ধে তাদের মনে রয়ে গেছে এক ভয়মিশ্রিত ঘৃণা।
আর স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে এই দূরত্বের কারণেই লামা জিগমেকে সাহায্য নিতে হয়েছিল সমতলের মানুষ মনীশ মিত্রর। নতুন গুম্ফা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ আসছিল তিব্বতের জনপ্রিয় বনমনাস্টারিগুলো থেকে, আর শ্রমিক নিয়ে আসছিল মনীশ মিত্র শিলিগুড়ি আর তার আশেপাশের গ্রাম থেকে।
কাজটা প্রায় সম্পূর্ণও করে ফেলেছিল মনীশ। একটা তৃপ্তিবোধ আস্তে আস্তে তার মনকে ছেয়ে ফেলেছিল। কারণ কাজটা ছিল কঠিন, ভীষণই কঠিন। এমন দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায় অমন বিশাল একটা স্ট্রাকচার খাড়া করা মুখের কথা নয়। বিশেষত, যেখানে ক্রেন, ডাম্পার, বুলডোজারের মতন আধুনিক যন্ত্রপাতির কোনও সাহায্যই পাওয়া যায়নি। পুরো কাজটাই করতে হয়েছিল শিলিগুড়ি থেকে নিয়ে আসা শ্রমিকদের পেশিশক্তি আর চেইন পুলির মতন কিছু আদিম যন্ত্রপাতির সাহায্যে। কারণটা খুব সহজ। টেনডং পাহাড়ের চূড়ায় ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়ার মতন কোনও রাস্তাই ছিল না। সত্যি কথা বলতে কী, মানুষ ওঠবার মতন কংক্রিটের সিঁড়িগুলোও মনীশকেই তৈরি করে নিতে হয়েছিল। তবেই তার মিস্তিরিরা মালপত্র নিয়ে অতিকষ্টে পাহাড়ে উঠতে পেরেছিল।
তবুও শেষরক্ষা হল না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাইরে তাকাল মনীশ। তখনও তুমুল বেগে ঝরে পড়া বৃষ্টির চাদর ঢেকে রেখেছে পাইনগাছের বনকে, সেই বনের ওপারে ঘুমিয়ে পড়া ছোট্ট ডামথাং গ্রামকে, এমনকি গোটা টেনডং পাহাড়টাকেই।
তবুও একটু আগেই যেহেতু মনীশ বর্ষাতি গায়ে দিয়ে বাইরে বেরিয়েছিল, তাই সে জানে অত মানুষের অত পরিশ্রমে বানানো সেই কংক্রিটের পাকদণ্ডী পথ সম্পূর্ণটাই পাহাড়ের চূড়া থেকে ঝাঁপিয়ে নেমে আসা জলস্রোতে ধুয়ে-মুছে গেছে।
তার মানে, বৃষ্টি থামলে আবার মাস খানেকের পরিশ্রমে সেই পথ বানিয়ে তুলতে হবে। আর যতক্ষণ তা না হচ্ছে ততক্ষণ একদিকে পাহাড়ের মাথায় পড়ে থাকবে জনহীন গুম্ফা, আর একদিকে এই বাড়ির পেছনের বাগানে ধুলো মাখবে পদ্মসম্ভবের মূর্তির বিশাল খণ্ডগুলো। কিছুতেই তাদের মিলিয়ে দেওয়া যাবে না।
অথচ কাল সকালেই বহুদূরের পথ পেরিয়ে তিব্বত থেকে, হিমাচল প্রদেশ থেকে এই প্রত্যন্ত ডামথাং গ্রামে এসে পৌঁছোবেন বনবৌদ্ধগোষ্ঠীর সবচেয়ে সম্মানিত সন্ন্যাসীরা। তাঁরা আসছেন নতুন গুম্ফার উদ্বোধন করতে। কী দেখবেন তাঁরা এসে?
আজ থেকে চার কি পাঁচ মাস পরে যদি গুম্ফার কাজ শেষ করাও যায়, আর কি ফিরিয়ে আনা যাবে ওই সন্ন্যাসীদের?
সেই কথা ভাবতেই অসম্ভব একটা ব্যর্থতাবোধ আচ্ছন্ন করে ফেলল মনীশকে।
তার নিজেরই যদি এই অবস্থা হয়, তা হলে কী হচ্ছে ওই বৃদ্ধ মানুষটার মনে? কেমন করে সহ্য করছেন তিনি তীরে এসে তরী ডোবার এই বেদনা?
মনীশ সাবধানে একবার তাকাল লামা জিগমে নামগিয়ালের মুখের দিকে। কাঁদছেন না তো উনি? আর সেই মুখের দিকে তাকিয়েই শক খাওয়ার মতন চমকে উঠল মনীশ।

।।তিন।।

জল নয়, সন্ন্যাসীর চোখে আগুন জ্বলছে।
সৌম্য বৃদ্ধের এমন মূর্তি মনীশ এতদিন এখানে কাটিয়েও আগে কখনও দেখেনি। এত অল্প সময়ের মধ্যে একজন মানুষ এভাবে বদলে যেতে পারে!
মনীশের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই লামা জিগমে এগিয়ে এসে তার হাতদুটো নিজের হাতের মধ্যে চেপে ধরলেন। দৃঢ় স্বরে বললেন, “গুরু রিমপোচের মূর্তির প্রাণপ্রতিষ্ঠা হবেই মনীশ, উদ্বোধন হবেই আমার নতুন গুম্ফার।”
“নিশ্চয়ই হবে, গুরু জিগমে। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, তিন মাসের মধ্যে ওই মূর্তিকে আমি গুম্ফার মাথায় স্থাপন করে দেব।”
“তিন মাস নয়, মনীশ। কাল। কাল ভোরবেলার মধ্যে মূর্তি বসে যাবে নিজের জায়গায়। তৈরি হয়ে যাবে নতুন গুম্ফায় যাওয়ার পথ। তারপর সংঘপ্রধানরা সেই পথ ধরে পৌঁছোবেন টেনডং পাহাড়ের চূড়ায়, শুরু হবে নবস্বস্তিকাচক্র। বনদেবতারা সেই চক্রের মধ্যে দিয়ে জেগে উঠবেন। দায়িত্ব নেবেন নতুন গুম্ফাকে রক্ষা করার।”
“আপনার মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি, গুরু জিগমে। কিন্তু আমি একজন ইঞ্জিনিয়ার। আমি আপনাকে বলছি, এই দুর্যোগের মধ্যে পৃথিবীর কোনও শক্তি এই পঁয়ত্রিশ টন ওজনকে একবেলায় তিন হাজার ফুট ওপরে নিয়ে যেতে পারবে না। তাকে জোড়া লাগানো তো পরের কথা। জানি না আপনি হেলিকপ্টারের সাহায্য নেওয়ার কথা ভাবছেন কি না। কিন্তু এই আবহাওয়ায় হেলিকপ্টারও যে উড়বে না, তা নিশ্চয়ই আপনি বোঝেন।”
মনীশকে তার কথার মধ্যেই থামিয়ে দিয়ে লামা বললেন, “পৃথিবীর কোনও শক্তি যদি না পারে, আমি অপার্থিব শক্তিকে ডাকব মনীশ। আমি জানি আমাকে কী করতে হবে। আজ রাতের সময়টুকুই যথেষ্ট।”
ঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে ওঁদের কথোপকথন শুনছিলেন ছোটোলামা সেন্ডুপ দোরজে। এতক্ষণে তিনি কথা বললেন। কথা বললেন না বলে বলা ভালো, হাহাকার করে উঠলেন। লামা জিগমের ওই শেষকথাটা শোনামাত্র লামা সেন্ডুপ দ্রুতপায়ে তাঁর দিকে এগিয়ে এসে তাঁর কাঁধদুটো ধরে ঝাঁকানি দিতে দিতে বললেন, “আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন, গুরু জিগমে? আপনি কী ভাবছেন, আমি বুঝতে পারছি না! আপনি কীসের কথা বলছেন? আপনি প্রেতশ্রমিকদের কথা ভাবছেন গুরু জিগমে, আপনি প্রেতশ্রমিকদের কথা ভাবছেন! কিন্তু কেমন করে ভাবছেন তাদের কথা আপনি! জানেন না তাদের পারিশ্রমিক?”
“জানি, সমস্তই জানি লামা দোরজে। কাল নতুন গুম্ফার প্রতিষ্ঠা হয়ে গেলে আমার আর বেঁচে থাকার প্রয়োজন কী? স্বর্গ-নরক যেখানেই যাই, এটা জেনে যাব যে, আমার সন্তানের মতন শিক্ষার্থীরা আর ভাঙা ছাদ থেকে ঝরে পড়া জলে ভিজছে না, হাজার প্রদীপের আলোয় উজ্জ্বল সাধনকক্ষে পুজো পাচ্ছেন আমাদের আরাধ্যরা, টেনডং গুম্ফা থেকে বনধর্মের আলো ছড়িয়ে পড়ছে সারা ভারতে। আমার মতন একজন সামান্য সন্ন্যাসীর পক্ষে কি এটাই চূড়ান্ত প্রাপ্তি নয়?”
মনীশের কাছে দুই সন্ন্যাসীর এই কথোপকথনের মানে প্রায় কিছুই বোধগম্য হল না। সে তাঁদের কাছে বিদায় নিয়ে একতলায় তার জন্যে নির্দিষ্ট ঘরটায় ফিরে গেল।
যদিও এই মুহূর্তে ডামথাংয়ে তার কোনও কাজ নেই, তবুও যতক্ষণ না বৃষ্টি থেমে যান চলাচল শুরু হচ্ছে সে কোথাও যেতে পারবে না।

।।চার।।

মনীশ যখন আবার দোতলায় উঠে এল, তখন রাত্রি প্রায় ন’টা। রোজ এই সময়েই সে ওপরে আসে; ঘরের মাঝখানে পেতে রাখা লম্বা কাঠের টেবিলটার ধারে সাজানো চেয়ারগুলোর কোনও একটাতে বসে দুই লামার সঙ্গে একসঙ্গে নৈশ আহার সারে। আজ মনীশ দেখল, লামা দোরজে একাই তার খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছেন।
“গুরু জিগমে কোথায় গেলেন?” প্রশ্ন করল মনীশ।
আঙুলের ইশারায় জানালা দিয়ে বাইরের বাগানের দিকে দেখালেন গুরু দোরজে। মুখে বললেন, “গুরু জিগমে প্রেতযজ্ঞে বসেছেন।”
সত্যিই তাই। পদ্মসম্ভবের মূর্তির অংশগুলো যে ছাউনিটার নিচে রাখা ছিল, সেই ছাউনিটার দিক থেকে মাঝে মাঝেই ঝাঁঝরের শব্দ ভেসে আসছে। এখানে বসবাসের অভিজ্ঞতায় মনীশ জানে, ওই ঝাঁঝরের ঝমঝমানি বনতন্ত্রসাধনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেদিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকার পর মনীশ বৃষ্টির চাদর ভেদ করে যজ্ঞের আগুনের লাল আভাও দেখতে পেল। একটুকরো রুটি মুখে পুরে সে ছোটোলামাকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি সত্যিই এইসব প্রেতশ্রমিক-টমিকে বিশ্বাস করেন?”
লামা দোরজে কী যেন এক গভীর চিন্তায় ডুবেছিলেন। মনীশের এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে উলটে প্রশ্ন করলেন, “তুমি কখনও তিব্বত বা ভুটানের প্রত্যন্ত জায়গাগুলোতে গেছ?”
মনীশ ঘাড় নাড়ল।
“গেলে দেখতে পেতে, ওসব জায়গায় পাহাড়ের উঁচু দেওয়ালের গা থেকে বেরিয়ে থাকা পাথরের তাকের ওপর অনেক পুরনো কিছু গুম্ফা আছে। দক্ষ পর্বতারোহীরাও উঠতে ভয় পান, এমনই খাড়া আর পেছল সেইসব গুম্ফায় পৌঁছোবার সুঁড়িপথ। পাশাপাশি দু’জন হেঁটে যাওয়া যায় না যেসব পথে, বলো তো মনীশ, সেইসব পথ ধরে গুম্ফা বানানোর মালমশলা কেমন করে ওই আকাশছোঁয়া উচ্চতায় তুলে নিয়ে গিয়েছিল সেদিনের মানুষেরা?”
“আপনিই বলুন।” সামান্য কৌতূহলী হয়ে বলল মনীশ।
“মানুষ নয়। প্রেতশ্রমিকেরা পাহাড়ের মাথায় বয়ে নিয়ে যেত সেইসব ভারী ভারী কাঠের গুঁড়ি, পাথরের টালি, ধাতুর দরজা। আমাদের প্রাচীন পুঁথিতে বর্ণনা আছে সেসব প্রেতশ্রমিকদের। রয়েছে প্রেতলোক থেকে তাদের পৃথিবীতে আবাহনের পদ্ধতি। শুধু প্রেতশ্রমিকদের পারিশ্রমিক বড়ো ভয়ংকর। সেই পারিশ্রমিক কী জানো? যে তাদের ডেকে আনবে এই জীবন্ত মানুষের পৃথিবীতে, কাজ ফুরোলে তার প্রাণটা তারা নিয়ে যাবে।” তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লামা দোরজে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “তারাদেবীর ইচ্ছাই পূর্ণ হোক।”
ঘরের পরিবেশের সঙ্গে তাল রেখেই যেন বাইরের প্রকৃতিও ক্রমশ আরও থমথমে হয়ে উঠেছিল। কিছুক্ষণের জন্যে বৃষ্টি থেমেছিল, কিন্তু আকাশে চাপ চাপ কালো মেঘ তখনও পাক খেয়ে ঘুরছিল। ভেজা মাটি থেকে ঘন কুয়াশা উঠে ঢেকে ফেলছিল সারা চরাচর। হঠাৎ বীভৎস এক দুর্গন্ধ খোলা জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। নিশ্চয়ই জলের তোড়ে কুকুর-শেয়াল কিছু মারা পড়েছে - এই ভেবে মনীশ চেয়ার ছেড়ে জানালা বন্ধ করবার জন্যে এগোল।
লামা দোরজে অস্ফুট স্বরে বললেন, “ওরা এসে গেছে।”
জানালার সামনে গিয়ে মনীশ একটু থমকাল। সে অবাক হয়ে দেখল, লামা জিগমের জ্বালানো আগুনের কুণ্ডটা থেকে লাল আভার একটা রেখা তলোয়ারের মতন সটান আকাশের দিকে উঠে গেছে। চঞ্চল আগুনের শিখা থেকে এমন স্থির আভা বেরোনোর কথা নয় তো! মনীশের মনে হল যেন ডামথাং গ্রামের মাটি থেকে আকাশ অবধি একটা অপার্থিব রাস্তা বানিয়ে দিয়েছে কেউ।
মনীশ ছোটো লামাকে এসব কিছুই বলল না। বরং বলল, “আমি শুতে যাচ্ছি। আপনিও শুয়ে পড়ুন। গুরু জিগমের জন্যে চিন্তা করবেন না। ওসব প্রেতশ্রমিক-টমিক কেউ আসবে না। রাস্তা আমার মিস্তিরিরাই বানাবে।”

।।পাঁচ।।

কিন্তু তারা এল।
তখন রাত কত কে জানে! ভীষণ শব্দে একটা বাজ পড়ার আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল মনীশের।
আরেকবার বিদ্যুৎ চমকাল। সাইকেডেলিক আলোর মতন এক মুহূর্তের চোখ ধাঁধানো সাদা আলোয় মনীশ দেখল, জানালার ওপারে, বাগানের মাঝখানে তারা দাঁড়িয়ে রয়েছে। দীর্ঘ এক সারিতে, অনুগত শ্রমিকদের মতনই শৃঙ্খলাবদ্ধ তাদের দাঁড়াবার ভঙ্গি। যেন কারোর আদেশের জন্যে অপেক্ষা করছে তারা।
তারা শ্রমিক, কিন্তু মানুষ নয়।
বিছানা ছেড়ে উঠে জানালার শার্সিতে মুখ ঠেকিয়ে দাঁড়াল মনীশ। আবার বৃষ্টি আসবে। তারই প্রস্তুতি হিসেবে মুহুর্মুহু বিদ্যুতের রেখায় চিরে যাচ্ছে আকাশ, আর সেই বিদ্যুতের আলোতেই মনীশ এখন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে সেই নরকের জীবদের। তাদের লোম ঝরে যাওয়া, ফ্যাকাশে, সাদা চামড়ার ওপর বিদ্যুতের ছটা পিছলে যাচ্ছে। তাদের পুরনো মৃতদেহগুলো থেকে চোখের পাতা খসে পড়েছে। গলে গেছে ঠোঁটের মাংসও। তাই মনে হচ্ছে, প্রতিটি প্রেতশ্রমিকই বিস্ফারিত নয়নে হেসে চলেছে - নির্বোধের হাসি।
আরেকবার বিদ্যুৎ চমকাতেই মনীশ দেখল, প্রেতশ্রমিকরা কাজ শুরু করে দিয়েছে। তাদের কাঁধে মাথায় ভর দিয়ে পদ্মসম্ভবের মূর্তির গুরুভার খণ্ডগুলো ভেসে চলেছে টেনডং পাহাড়ের চূড়ার দিকে। পথ নেই? তাতে কী হয়েছে? প্রেতশ্রমিকদের পা তো মাটিতে পড়ছে না। যে উল্লাসে তারা পাঁচশো ছ’শো বছর আগে তিব্বত আর ভুটানের দুর্গম পাহাড়ের খাঁজে ঈগলের বাসার মতন বনগুম্ফাগুলো বানিয়ে দিয়েছিল, সেই একই উল্লাসে তারা আজ প্রেতসিদ্ধ পদ্মসম্ভবের মূর্তি বয়ে নিয়ে যাচ্ছে নতুন গুম্ফার দিকে।
আতঙ্কে আর শীতে মনীশ থরথর করে কাঁপছিল। এ কী দৃশ্য দেখছে সে! এ কোন নরকের দরজা খুলে দিলেন গুরু জিগমে আজ ডামথাং গ্রামের প্রান্তে?
হঠাৎ মনীশের মনে হল, তিনি কোথায়, গুরু জিগমে? তাঁকে তো দেখা যাচ্ছে না। তাঁর আগুনের কুণ্ডটাও বোধহয় নিভে গিয়েছে। আবার নতুন করে শুরু হয়েছে বৃষ্টি। আপাতত আকাশ আর মাটির মধ্যে শুধুই বৃষ্টির জলস্তম্ভ, শুধুই বৃষ্টির শব্দ। আর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে না। তাই দেখাও যাচ্ছে না জানালার বাইরের ওই দুনিয়ায় কী ঘটে চলেছে।
তীব্র আশঙ্কায় মনীশ জানালার পাল্লাদুটো হাট করে খুলে দিয়ে, সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠল, “গুরু জিগমে, আপনি কোথায়? ফিরে আসুন, গুরু জিগমে।”
তৎক্ষণাৎ পূতিগন্ধ বাতাসের এক প্রবল দমকা খোলা জানালা দিয়ে ছুটে এসে মনীশকে আছড়ে ফেলল শক্ত মেঝের ওপর। মনীশ জ্ঞান হারাল।

।।ছয়।।

মনীশের যখন জ্ঞান ফিরল, তখন ভোরের মেঘছেঁড়া সোনালি রোদ্দুরে ভেসে যাচ্ছে সিকিমের আকাশ। চারদিন বাসায় বন্দি থাকার পরে আজ আবার উড়তে পেরে পাখিরা দারুণ খুশি। তাদের কলধ্বনিতে কান পাতা যাচ্ছে না।
মাথার প্রচণ্ড যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে মনীশ খোলা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। চোখ ফেরাল টেনডং পাহাড়ের দিকে।
হ্যাঁ, রাতারাতি ফিরে এসেছে কংক্রিটে বাঁধানো পাকদণ্ডী পথ।
আরও ওপরদিকে দৃষ্টি মেলল সে। নতুন গুম্ফার ছাদে প্রতিষ্ঠিত পদ্মসম্ভবের বিশাল মূর্তিটিকে এত নিচ থেকে পদ্মের একটা সুন্দর কুঁড়ির মতন লাগছিল।
মনীশ দেখল, লাল টুকটুকে আলখাল্লায় শরীর মুড়ে শিশু লামার দল হইহই করতে করতে ছুটে গেল নতুন গুম্ফার দিকে। উদ্বোধনের আয়োজনে তাদেরও হাত লাগাতে হবে।
একের পর এক গাড়ি এসে দাঁড়ানোর শব্দ হচ্ছে সামনের বাগানে। তার মানে লাসা আর ধরমশালা থেকে প্রধান পুরোহিতেরা নির্বিঘ্নেই পৌঁছে গেছেন।
এবার মনীশ তার চোখের দৃষ্টিকে পাহাড়চূড়া থেকে নামিয়ে আনল বাগানের সীমানায়।
বাগানের প্রান্ত থেকে নেমে গেছে যে গভীর খাদ, তার ঢাল বেয়ে উঠে আসছেন ছোটোলামা সেন্ডুপ দোরজে। তাঁকে অনুসরণ করে উঠে আসছে চারজন বিষণ্ণ বাহক। তাদের কাঁধে লামা জিগমে নামগিয়ালের দোমড়ানো মোচড়ানো মৃতদেহ।
_____

অলঙ্করণঃ Scorpy Design

2 comments: