গল্পঃ সর্ষের মধ্যে কেঃ আনন্দদীপ চৌধুরী



।।এক।।

রাত আটটা বাজে প্রায়। ফোনটা হঠাৎই পরপর দু’বার বেজে উঠল। শুনতে পেলেও ফোনটা ধরছিল না অর্চি। আসলে সবে চার্জে বসিয়েছে ফোনটাকে। ভেবেছিল একটু চার্জ সঞ্চয় করে নিক, তারপর না হয় ধরা যাবে। কিন্তু ফোনটা যে আবার বেজে উঠল! নিশ্চয়ই জরুরি কেউ ফোন করছে। সদ্য ক্লাস টুয়েলভে ওঠা অর্চি ফিজিক্স বইটা ঘাঁটা থামিয়ে ফোনটা এবার হাতে নেয়। মেঘের ফোন। সুন্দরপুরে চারটে দিন ঘোরার প্ল্যানটা শোনাবে নির্ঘাত।
এই সুন্দরপুর জায়গাটা আসলে দারুণ লাগে অর্চির। ওদের ঝিলমপুরের মতো এত ঘিঞ্জি নয়, আর পলিউশনের মাত্রাও খুবই কম সেখানে। বেশ ছিমছাম জায়গা। চারদিক কেবল ঘন সবুজে ঘেরা, আর কিছু দূর অন্তর একটা করে বড়ো পুকুর। কী পরিষ্কার সেসব পুকুরের জল! ও তো সাঁতারও কেটেছে বেশ কয়েকবার। আর প্রতিবছর শীতকালে যায় বলে হাজারো পাখি দেখার সৌভাগ্যও হয় অর্চির। তবে এটা মানতেই হবে, সুন্দরপুরে ঘোরার পুরো প্ল্যানটাই বানায় মেঘ। আসলে দাদু-দিদা মারা যাবার পর মামার বাড়ি যাবার প্রধান আকর্ষণই থাকে মামাতো ভাই মেঘের সাথে চুটিয়ে ঘোরা আর আড্ডা মারা। বয়সে একবছরের ছোটো হলেও মেঘ কিন্তু অর্চিকে নাম ধরেই ডাকে। দু’জনের বন্ডিংটা এতটাই ভালো যে অর্চি তাতে কিছু মনেও করে না।
সুন্দরপুরে অত বড়ো তিনতলা মামার বাড়িতে তো এখন লোক বলতে কেবল পাঁচজন। মামা, মামি, মেঘকে বাদ দিয়ে হারুদা আর ম্যানেজারবাবু। হারুদা লোকটা বেশ ভালো। মামার বাড়ির কেয়ারটেকার বলা যেতে পারে হারুদাকে। দোকানপাট করা থেকে কেবল টিভির পেমেন্ট করা সব নিজের হাতেই সামলায় হারুদা। মামাও চোখ বুজে বিশ্বাস করেন তাকে। দাদু মারা যাবার পর হারুদাই মামার অঘোষিত অভিভাবক হয়ে উঠেছে। ম্যানেজারবাবু লোকটিও মন্দ নয়। তবে বড়ো বেরসিক আর গম্ভীর টাইপের। ভদ্রলোকের নাম সুকোমল পাল, বাড়ি ফুলনগর। কিন্তু মামার অত বড়ো হার্ডওয়ারের দোকানের ম্যানেজার হবার সুবাদে সুন্দরপুরে সবাই তাকে ম্যানেজারবাবু বলেই চেনে।
খুব বড়ো কিছু অঘটন না ঘটলে ফি-বছর এই বড়দিনের ছুটিতে চারদিনের জন্য মামার বাড়ি যাওয়াটা এখন অর্চিদের কাছে কিছুটা অলিখিত নিয়ম হয়েই দাঁড়িয়েছে। এবারও ওদের যাওয়াটা কনফার্মড। কাল সকাল ছ’টায় বাস। সুন্দরপুর পৌঁছাবে বেলা একটায়। মেঘের ফোনটা ধরেই অর্চি তাই হেসে হেসে বলল, “কী রে, রাত আটটায় সুন্দরপুর ঘুরবার প্ল্যান বলবি নাকি!”
“না রে। একটা বাজে কেস হয়ে গেছে।” উদ্বিগ্ন শোনায় মেঘের গলা।
না, গেসটা তো ভুল ছিল। মেঘ তো বেড়াবার প্ল্যান জানাতে ফোন করেনি। কী কেসের কথাই বা বলছে ও? মামার বাড়ির কারও কি শরীর খারাপ করল, নাকি অন্যকিছু? অজানা আশঙ্কাগুলো মাথার মধ্যে ঘুরতে ঘুরতেই অর্চি জানতে চাইল, “কী হল হঠাৎ?”
একটু চাপা গলায় বলতে থাকে মেঘ, “আর বলিস না। একটু আগে বাবা হার্ডওয়্যারের দোকানটা বন্ধ করার সময় হঠাৎই খেয়াল করে মোবাইলে আসা ব্যাঙ্কের মেসেজটা। সেই মেসেজ অনুযায়ী দেখা যায় কুড়ি হাজার টাকা বাবার অ্যাকাউন্ট থেকে ডেবিট হয়ে গেছে আজ সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ। ঘাবড়ে গিয়ে ওই ব্যাঙ্কের এ.টি.এম কার্ডটা পেতে মানিব্যাগটা খুঁজতে থাকে বাবা। কিন্তু এদিক ওদিক অনেক খোঁজাখুঁজি করেও মানিব্যাগটা পাওয়া যায় না। বাবার সন্দেহ, আজ বিকেলের দিকে যখন দোকান ছেড়ে বাইরে চা খেতে গিয়েছিল, তখনই মনের ভুলে মানিব্যাগটা নিজের ক্যাশ কাউন্টারের পাশে রেখে গিয়েছিল। ওই সময়েই কেউ ওটাকে সরিয়েছে।”
“সে কি রে! কী ছিল মানিব্যাগে? পুলিশে জানিয়েছিস? কার্ড ব্লক করেছিস?”
ছুড়ে দেওয়া প্রশ্নগুচ্ছের জবাব মেঘ একে একে দিতে থাকল। “কার্ড তো বাবা তার পরেই ব্যাঙ্কে ফোন করে ব্লক করে দিয়েছে। ওই ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে বাবা খুব একটা টাকাও রাখে না। যা ছিল তার পুরোটাই প্রায় ওই চোর বাবাজি তুলে নিয়েছে। তবে ব্যাবসার টাকাটা যে অ্যাকাউন্টে রাখে তার ডেবিট কার্ড তো বাবা বাড়িতেই রেখে দেয়। আর কাউকে পেমেন্ট করতে হলে বাবা সাধারণত চেকেই পেমেন্ট করে। এই একটা বাঁচোয়া যে মানিব্যাগে আর তেমন ইম্পরট্যান্ট কিছু ছিল না। আসলে বাবা কার্ডের উপরে পিন নম্বরটা লিখে রাখাতেই বিপত্তিটা ঘটল। তাও বাবা পুলিশে একটা অভিযোগ করে এসেছে। দিনে-দুপুরে এরকম একটা চালু দোকান থেকে মানিব্যাগ চুরি করা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়।”
“সে তো একশোবার ঠিক। আচ্ছা, তোদের দোকানটা তো সুন্দরপুর থানার আন্ডারেই পড়ে, তাই না?”
“হ্যাঁ, ওখানেই বাবা অভিযোগ জানিয়েছে।” মেঘ জানায়।
কথাটা শুনেই অর্চি হঠাৎ জানতে চাইল, “মেঘ, তুই অসীমদাকে চিনিস তো?”
অসীমদা! অর্চিকে ফাইভ থেকে এইট অবধি বাড়িতে পড়াতে আসত তো। বেশ দারুণ চেহারা ছিল অসীমদার। কীসব চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন। মনে পড়তেই মেঘ জানাল, “হ্যাঁ, মনে পড়েছে। ছ’ফুটের পেটানো অ্যাথলিট চেহারা ছিল তো ওঁর। একবার দেখলে আর কি কেউ ভোলে?”
মেঘের কথা শুনে হেসে ওঠে অর্চি। চমকে দেওয়া খবর জানায় মেঘকে। “জানিস তো, অসীমদা এখন তোদের সুন্দরপুর থানায় এস.আই. হিসেবে জয়েন করেছে। দু’বছর আগেই পুলিশের চাকরিটা পেয়েছে অসীমদা।”
মেঘের গলায় উচ্ছ্বাস। “তাই নাকি! তবে কাল থানায় গিয়ে দু’জনে একবার দেখা করে আসব তার সাথে। যদি এই মানিব্যাগ চুরির কিনারা কিছু হয়ে থাকে।”
ফোনের ওপারে হেসে সম্মতি জানায় অর্চিও।

।।দুই।।

ছ’টায় টাইম থাকলেও শীতের কুয়াশায় বাসটা আধঘন্টা লেটেই ছাড়ল আজ। ফলত নির্ধারিত সময়ের ঘন্টা খানেক পরেই সুন্দরপুর পৌঁছল অর্চি। তবে একা নয়। প্রতিবারের মতো এবারেও সঙ্গে ছিল বাবা ও মা। গতকাল মেঘের ফোনটা রাখার পরে অর্চি ঠিক করেছিল চুরির ঘটনাটা বাড়িতে গোপনই রাখবে। কারণ, এ-ঘটনা জানতে পেরে বাবা যদি আবার সুন্দরপুর যেতে বেঁকে বসে? কিন্তু মেঘের ফোনটা ছাড়ার একটু পরে আসা মামির ফোনটাই ওর হিসেবগুলো সব কেমন যেন গুবলেট করে দিয়েছিল। মানিব্যাগ চুরির ঘটনাটা সবিস্তারে মাকে জানিয়েছিল মামি। তবে ওর আশঙ্কাকে খণ্ডন করে সুন্দরপুরে যাওয়ার নির্ধারিত সূচিতে কোনওরকম বিঘ্ন ঘটায়নি বাবা। কিন্তু এটা ঠিক যে, মামার মানিব্যাগ চুরির ঘটনাটা অর্চির মতোই ওর বাবা-মায়েরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে কিছুটা।
বাসটা দেরি করাতে আজ মামাবাড়ি ঢুকতে ঢুকতেই ভীষণ খিদে পেয়ে গেল অর্চির। দুপুরে মামির হাতে তৈরি সর্ষে-পাবদা আর চিংড়ির মালাইকারি দিয়ে এক থালা ভাত সাবাড় করে বেশ তৃপ্ত হল ও। খাওয়া শেষে একটু ঘুমালে অবশ্য মনটা আরও তৃপ্ত হত। কিন্তু মেঘ শুনলে তো! আসার পর থেকেই ঘ্যানর ঘ্যানর করে যাচ্ছে সুন্দরপুর থানায় যাবে বলে। সত্যি, মেঘটা যে কী মনে করে ওকে! ও কি এতটাই কাণ্ডজ্ঞানহীন? সকালে বাসে আসার সময়েই অসীমদাকে ফোন করে মিটিং টাইম ঠিক করে রেখেছে। প্রথমে টুকটাক কথাবার্তা বলে ধীরে ধীরে মামার মানিব্যাগের কেসটা উত্থাপন করেছিল অর্চিই। কিছুটা চমকে গিয়েছিল যখন অসীমদা জানিয়েছিল, সে-ই এই চুরির কেসটার ইনভেস্টিগেটিং অফিসার। কেবল চমক নয়। মনটা বেশ খুশি খুশিও হয়েছিল তখন। এরপর অর্চি আবদার রেখেছিল অসীমদার সাথে দেখা করার। অসীমদা বিকেল পাঁচটায় সুন্দরপুর থানা-সংলগ্ন পুলিশ কোয়ার্টারে আসতে বলেছে ওকে। আর এটা শোনার পর থেকেই মেঘ একটু হাইপার অ্যাকটিভ হয়ে পড়েছে। অর্চিকে   কেবলই তাড়া দিচ্ছে অসীমদার সাথে দেখা করতে যাবে বলে।
একটু পরেই একটা সাইকেল করে বেরিয়ে পড়ল দুইজন। বাড়িতে ব্যাপারটা একটু গোপনই রাখল ওরা। মামার বাড়ি থেকে সুন্দরপুর থানার দূরত্ব মেরেকেটে দেড় কিলোমিটার। সাইকেলে আস্তে আস্তে প্যাডেল চালিয়েও দশ মিনিটেই সেই পথ অনায়াসেই ছুঁয়ে ফেলল দুই ভাই।
ঘড়িতে এখন চারটে পঁয়তাল্লিশ। সুন্দরপুরের এই পুলিশ কোয়ার্টারের লোকেশনটাও বেশ। সামনে সারি সারি নারকেল আর সুপুরিগাছ। এইসব গাছের ফাঁক দিয়েই উঁকি মারছে ডিসেম্বরের শীতকাতুরে বিকেলের অস্তগামী সূর্যের মৃদু লালাভ শিখা। আহা! মনে ভরে ওঠে  স্বভাব ভাবুক অর্চির। সম্বিৎ ফেরে মেঘের হ্যাঁচকা টানে। তড়িঘড়ি দৌড়ায় পুলিশ কোয়ার্টারের দিকে। ফোনে বলে দেওয়া ঠিকানা মতো ফার্স্ট ফ্লোরে পৌঁছয় ওরা। সিঁড়ির বাঁদিকের ফ্ল্যাটটার বাইরেই দেখে নেমপ্লেটে জ্বলজ্বল করছে এক সময়ের গৃহশিক্ষক অসীমদার নাম। মনটা বেশ প্রসন্ন হয় অর্চির। বেল বাজানোর সেকেন্ড দশেক পরেই দরজা খোলে স্বয়ং অসীমদা।
“অসীমদা, তুমি তো একদম একরকম আছ! ডার্ক, টল, হ্যান্ডসাম!” কথাগুলো বলেই ঢিপ করে প্রণাম ঠোকে অর্চি। ওকে অনুসরণ করে মেঘও।
অর্চির কাঁধে হাত রেখে স্মিত হেসে অসীমদা বলে, “তুই কিন্তু একরকম নেই। বেশ বড়ো হয়ে গেছিস। এখন তো আবার গোঁফও হয়ে গেছে তোর।”
হেসে ওঠে অর্চি। বলে, “বড়ো হব না! এ-বছর যে টুয়েলভে উঠলাম। তুমি তো সেই এইটে আমাকে শেষ দেখেছ। মাঝের ক’বছর তো কেবল ফোনে যোগাযোগ।”
“হ্যাঁ, তা ঠিক। আচ্ছা, এবার তোর মামার মানিব্যাগ চুরির ব্যাপারটা একটু গুছিয়ে বল তো দেখি।”
নিজেই চুরির প্রসঙ্গে ঢুকে যাওয়ায় অর্চি মেঘের সাথে অসীমদার আলাপ করিয়ে দেয়। মেঘের থেকেই এরপর গোটা ব্যাপারটা শোনে অসীমদা। তারপর কী যেন ভাবতে থাকে মিনিট দুয়েক।
নীরবতা ভাঙে হঠাৎই। “কাল তোর মামা মেঘের মতো এতটা ডিটেলে জানায়নি ব্যাপারটা। যাই হোক, আজ আমার কেসটা নিয়ে বিশদে জানতে তোর মামার বাড়ি যাবার কথা ছিল। ভালোই হল, পুরোটা এখানেই ডিটেলে পেয়ে গেলাম।”
একটু থেমে অসীমদা মেঘের কাছে জানতে চায়, “আচ্ছা মেঘ, দুটো প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রথমত, তোমার বাবার কালকের লিখিত রিপোর্ট অনুযায়ী টাকাটা তোলা হয়েছে অগ্রদূত ব্যাঙ্কের এ.টি.এম থেকে। কিন্তু কোন ব্রাঞ্চ সেটা জানো কি? দ্বিতীয় প্রশ্ন হল, মানিব্যাগটা চুরির সময় তোমার বাবার দোকানে ক্রেতা ছাড়া আর কে কে ছিল?”
প্রথম প্রশ্নের উত্তরটা মেঘের ভালোই জানা ছিল। বাবার মোবাইলে টাকা ডেবিটের মেসেজটা কালকেই দেখেছে সে। স্পষ্ট লেখা ছিল, ‘টোয়েন্টি থাউজেন্ড ডেবিটেড ফ্রম অগ্রদূত ব্যাঙ্ক, সুন্দরপুর ব্রাঞ্চ। টাইম সেভেন-টেন পি.এম।’ কিন্তু দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরটা একটু অজানা ছিল তার। মোবাইলটা বার করে বাবাকে একটা ফোন করে মেঘ। জানতে পারে, মানিব্যাগটা চুরির সময় দোকানে ক্রেতারা ছাড়াও ম্যানেজারবাবু আর দু’জন কর্মচারী ছিল। দোকানের এই দুইজন কর্মচারীও বেশ পুরনো। নয় নয় করে দু’জনেই প্রায় দশবছর ধরে কাজ করছে হার্ডওয়্যারের এই দোকানে। মোবাইলটা রেখে তথ্যগুলো সব ঝটপট অসীমদাকে জানায় মেঘ।
মাথাটা হালকা নেড়ে গোটা দুয়েক ফোন করে অসীমদা। চাপা স্বরে বিড়বিড় করে কিছু বলে। শুনতে না পেয়ে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে দুইভাই।
ফোনগুলো সেরে অসীমদা জানায়, “আচ্ছা মেঘ, তুমি অগ্রদূত ব্যাঙ্কের সুন্দরপুর ব্রাঞ্চটা চেনো তো?”
মেঘ ঘাড় নেড়ে জানায় সে চেনে।
অসীমদা জানায়, “কাল সকাল সাড়ে দশটায় ওখানে আমরা মিট করছি, কেমন?”

রাতে ঘুম আসছিল না অর্চির। অসীমদা কেন ব্যাঙ্কে যেতে বলল? কী করবে ওখানে? মনের মাঝে জাগ্রত উত্তরহীন প্রশ্নগুলো উপহার দিল নিদ্রাহীন এক রাত।
সকাল সকাল উঠে মামার বাড়ির ছাদে চলে গেল ও। কতরকমের পাখি যে এসে ভিড় করে এই শীতের সকালে। বিশেষ করে মামার বাড়ির পাশের বড়ো পুকুরের পাড়টাতে। দেখতে দেখতে নিদ্রাহীন রাতের ক্লান্তিটা মুহূর্তে বিলীন হয়ে যায় অর্চির।
একটু পরে নিচে গিয়ে সবার সাথে বসে ব্রেকফাস্ট সারে অর্চি। তারপর মেঘের সাথে আড়ালে একটু আলোচনা সারে অসীমদার প্ল্যানের ব্যাপারে।
দেখতে দেখতে কখন যে সাড়ে ন’টা বেজে গেছে খেয়ালই করে না দু’জনে। সম্বিৎ ফেরে হারুদার ডাকে। হাতভর্তি বাজার নিয়ে এসে দালানে দাঁড়িয়ে মামিকে ডাকছিল হারুদা।
আর দেরি না করে সাইকেল করে দুইভাই বেরিয়ে পড়ে অগ্রদূত ব্যাঙ্কের উদ্দেশ্যে। সাড়ে দশটা বাজার একটু আগেই পৌঁছে যায় সেখানে। দেখে, অসীমদা দাঁড়িয়ে ঘড়ি দেখছে। ওদের দেখে স্বভাবসিদ্ধ স্মিত হাসে অসীমদা। এরপর তিনজনে মিলে যায় ব্যাঙ্কের ম্যানেজারের ঘরে।
ম্যানেজার সাহেব অসীমদাকে দেখেই হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলেন। অসীমদা এরপর মেঘ আর অর্চির সাথেও আলাপ করিয়ে দিল তাঁর। আলাপচারিতা শেষ হলে ম্যানেজার সাহেব সামনে রাখা ডেস্কটপের দিকে তাকিয়ে বললেন, “অসীমবাবু, আপনার সম্মতি পেলে গত পরশু সুন্দরপুর ব্রাঞ্চের  এ.টি.এম.-এর রাত সাতটা থেকে আটটার সিসিটিভি ফুটেজটা দেখাতে পারি। হেড অফিসের পারমিশন নিয়ে কাল রাতেই সিসিটিভির হার্ড ডিস্কটা আনিয়ে রেখেছিলাম।”
অর্চির বুঝতে অসুবিধা হল না যে গতকাল সন্ধ্যায় অসীমদা চাপা গলায় ফোনগুলো আদতে অগ্রদূত ব্যাঙ্কের আধিকারিকদেরই করেছিল। রাতের নিদ্রাভঙ্গকারী প্রশ্নগুলোর উত্তরগুলোও অনুমান করতে পেরে স্বস্তি পায় ও। মেঘের দিকে তাকায় আড়চোখে। দেখে, উত্তেজনায় ফুটছে সে।
এরপর অসীমদা গ্রিন সিগন্যাল দিলে ম্যানেজার সাহেবের এক সহকারী দেখাতে থাকেন ভিডিও ফুটেজটা। গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকে সবাই।
সিসিটিভি ফুটেজে টাইম দেখাচ্ছে সাতটা বেজে আট। দেখা যায়, একটা দোহারা গড়নের লোকের প্রবেশ ঘটল এ.টি.এম.-এ। পরনে হাফ হাতা সোয়েটার, আর প্যান্ট। হাতে একটি ব্যাগ। লোকটির বয়স অননুমেয়। কারণ, মাঝারি উচ্চতার লোকটির মুখটি মাফলার দিয়ে ঢাকা। চোখদুটো কেবল খোলা। এদিক ওদিক একটু দেখে প্যান্টের পকেটের মানিব্যাগ থেকে ডেবিট কার্ড বার করে লোকটি। তারপর মেশিনে ইনসার্ট করে। প্রথমবার ঠিকমতো কার্ড পাঞ্চ হয় না। পুনরায় চেষ্টা করে। সাফল্য পায়। এরপর টাকা বার করে বেরিয়ে যায়। সিসিটিভি ফুটেজে টাইম দেখায়, সাতটা দশ।
অসীমদা অস্ফুটে বলে ওঠে, “ভেরি ক্লেভার। ফেসটাকে কভার করে রেখেছে যাতে চেনা না যায়।”
সেকেন্ড কয়েক পরেই একটু ভেবে ম্যানেজার সাহেবের সহকারীকে অসীমদা অনুরোধ করে, “একটু জুম করা যাবে ভদ্রলোকের মুখটা?”
সহকারী ভদ্রলোক ফুটেজের একটা অংশ পজ করে জুম করেন। না, মুখটা তাতেও অস্পষ্ট। আসলে ক্যামেরাটা খুব একটা হাই রেজোলিউশনের নয়। তবে মেঘ হঠাৎই চিৎকার করে জানায়,  লোকটার হাতের মানিব্যাগটা তার বাবার। অসীমদা তৎক্ষণাৎ মোবাইলে একটা ছবি তুলে নেয় জুম করা লোকটির মাফলার-ঢাকা মুখটার। অর্চি বলে ওঠে, “অসীমদা, লোকটির হাতের ব্যাগটা দেখো! কোনও শাড়ির দোকানের মনে হচ্ছে। এটা কিন্তু আমাদের ক্লু দিতে পারে।”
অসীমদা অর্চির পিঠ চাপড়ে বলে, “সাবাস, দারুণ বলেছিস।”
ম্যানেজার সাহেবের সহকারী ভদ্রলোকটি এবার ওই লোকটির ব্যাগটাকে জুম করে। নামটা খুব পরিষ্কার না হলেও মোটামুটি বোঝা যায়। সুনন্দ শাড়ি হাউস, ফুলনগর। অসীমদা সঙ্গে আনা ডায়েরিতে পুরো পর্যবেক্ষণগুলো নোট করে নেয়। মিনিট পনেরো পর  ম্যানেজার সাহেবকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটা পেন ড্রাইভে ওই সিসিটিভি ফুটেজটা নিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে আসে অসীমদা। সাথে অর্চি আর মেঘ।
বাইরে এসে মেঘই প্রথম শুরু করে, “এবার তবে আমরা কী করব, অসীমদা? চোর তো মুখ ঢেকে রেখেছে!”
অসীমদা বলে, “তাতে তো আর পার পাবে না। তাছাড়া হামেশাই দেখা যায়, ক্রাইম করার সময় একটা না একটা ভুল অপরাধীরা করে যায়। এখানে যেমন শাড়ির দোকানের ব্যাগটা ক্যারি করা। তবে অর্চিকে থ্যাঙ্কস জানাই জায়গাটা আমাকে সঠিকভাবে ধরিয়ে দেওয়ায়।”
একটু লজ্জা পেয়ে যায় অর্চি। বিনয় দেখায়। “কী যে বলো, অসীমদা! তোমার প্রাক্তন ছাত্র তো আমি। যা শিখেছি তাতে তো তোমারও দান আছে।”
অসীমদা হেসে বলে, “বাবা, বেশ কথাও শিখেছিস তো। এখন আর কথা না বাড়িয়ে আমার গাড়িতে ওঠ। সবাই মিলে সুনন্দ শাড়ি হাউস যাব।”

।।তিন।।

গাড়িতে সুন্দরপুর থেকে ফুলনগর যেতে মিনিট পনেরোর বেশি লাগার কথা নয়। কিন্তু ওদের পৌঁছাতে ঘন্টা আধেক লেগে গেল। আসলে মাঝরাস্তায় ঝিলমের মোড়ের পুরনো কচুরির দোকানটা কড়াইশুঁটির কচুরির জন্য বেশ বিখ্যাত। এই শীতে ওরকম কচুরি কি হাতছাড়া করা যায়! তাই গাড়িটা ওখানে থামিয়ে হালকা ভোজ সেরে নিল সবাই। সকালে হালকা ব্রেকফাস্ট করায় বেশ খিদেও পেয়ে গিয়েছিল অর্চির।
খেয়েদেয়ে গাড়ি যখন ফুলনগর বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছল ঘড়ির কাঁটা তখন পাক্কা সাড়ে বারোটার দরবারে উপস্থিত। গাড়ি থেকে উঁকি মেরে এক পথচারীর কাছে অর্চি জানতে চাইল শাড়ির দোকানের লোকেশনটা। পথচারী ভদ্রলোক দোকানের নামটা শুনেই চিনতে পারলেন। বোঝা গেল, দোকানটি বেশ প্রসিদ্ধ এ-অঞ্চলে। এরপর ভদ্রলোক বুঝিয়ে দিলেন শাড়ির দোকানে পৌঁছাবার শর্টকার্ট রাস্তাটা।
খুব একটা বেগ পেতে হল না দোকানটা খুঁজে পেতে। ভদ্রলোকের বলা পথ ধরে সামনের বড়ো রাস্তায় গিয়ে একটু এগোতেই চোখে পড়ল দু’পাশে থাকা দোকানের সারি। হরেকরকম দোকান সেখানে। তবে শাড়ির দোকান একটাই। তাতে জ্বলজ্বল করে লেখা, সুনন্দ শাড়ি হাউস। গাড়ি থেকে একে একে নামল অসীমদা, অর্চি, মেঘ। তারপর সটান হাজির হল দোকানে।
অসীমদা কার্ডটা বার করে নিজের পরিচয় জানালে দোকানের মালিক একটু চমকে যান। শঙ্কার আঁকিবুঁকি ফুটে ওঠে তার চোখেমুখে।
“অমল পাল। বলুন, কীভাবে সাহায্য করতে পারি।” সাবলীল থাকার চেষ্টা করেন দোকান মালিক।
অসীমদা মানিব্যাগ চুরির ঘটনাটা সংক্ষেপে জানিয়ে মোবাইলটা বার করে একটা ছবি দেখিয়ে জানতে চায়, “মিঃ পাল, আপনি কি এই লোকটিকে চিনতে পারছেন?”
অর্চি ঝুঁকে পড়ে ছবিটা দেখে। আরে, এ তো সকালে সিসিটিভি ফুটেজ থেকে মুখঢাকা লোকটির জুম করে নেওয়া ছবিটা!
মিঃ পাল ভালো করে তাকিয়ে থাকেন ছবিটার দিকে। চিন্তান্বিত মুখ করে খানিক পরে জানান, “ছবিটা তো স্পষ্ট নয়। তবে চোখ আর চেহারার গড়ন দেখে মনে হচ্ছে পিন্টু। আমার দোকানের প্রাক্তন কর্মচারী ছিল ও।”
“প্রাক্তন কেন? এখন কেন নেই?” অসীমদার গলায় পুলিশি জেরার ছোঁয়া।
“দু-দু’বার চুরি করলে আর কি কাউকে রাখা যায়?”
“কী চুরি করেছিল? কবে ছাড়ালেন? লোকটি থাকে কোথায়? আপনার সাথে আলাপ কীভাবে?”
অসীমদার উড়ে আসা ঝাঁকে ঝাঁকে প্রশ্নে একটু বেসামাল দেখায় মিঃ পালকে। ব্যাপারটা বুঝতে পারে অসীমদাও। পরিস্থিতি সহজ করতে বলে, “উই নিড ইয়োর হেল্প, মিঃ পাল। প্লিজ।”
অসীমদার কোমল অনুরোধে একটু স্বস্তি পান মিঃ পাল। একটু উদাস হয়ে বলতে থাকেন, “পিন্টুর বয়স ত্রিশের আশেপাশে। পড়াশোনা বেশিদূর করেনি। বাপ-মা মরা ছেলেটা এই ফুলনগরে মামার বাড়িতেই মানুষ। ওর মামা আবার আমার বাল্যবন্ধু। তো ওর অনুরোধেই ছেলেটাকে দোকানে হেল্পারের কাজে নিযুক্ত করলাম একদিন। কিন্তু আমার অসাবধানতায় দু-দু’বার আমার ক্যাশ বক্স থেকে টাকা চুরি করায় মাস দেড়েক আগে ওকে তাড়িয়ে দিই।”
“পিন্টুর মামার বাড়ির আড্রেসটা পাওয়া যাবে?”
“লাভ নেই। ওর মামা দিন পনেরো হল এই ভাড়াবাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে গেছে। আমায় কিছু জানায়ওনি।”
মিঃ পালের কথা শুনে সামান্য হতাশ দেখায় অসীমদাকে। খানিকক্ষণ ভেবে বলে, “আচ্ছা, এই পিন্টু ছেলেটির কি বিশেষ কোনও হবি বা শখ ছিল, মিঃ পাল?”
কাল বিলম্ব না করে মিঃ পাল জানান, “হবি! সে আর বলবেন না। মাঝে মাঝেই দেখতাম নতুন নতুন মোবাইল বা আধুনিক ইলেকট্রনিক গ্যাজেট কিনছে। কোত্থেকে টাকা পেত কে জানে! নিশ্চয়ই মামার পকেট কাটত। শেষের দিকে তো দামি একটা স্মার্ট ওয়াচ কিনবে বলে পাগল হয়ে উঠেছিল।”
স্মার্ট ওয়াচটা শুনে অসীমদা কী ভাবল কে জানে। মিঃ পালের কাছে আচমকাই জানতে চাইল, “এতসব তথ্য দেওয়ার জন্য অনেক থ্যাঙ্কস, মিঃ পাল। শেষ প্রশ্ন। স্থানীয় প্রসিদ্ধ মোবাইল বা ইলেকট্রনিক গ্যাজেটসের দোকানগুলো কোথায় আছে যদি একটু বলেন।”
হেসে ওঠেন মিঃ পাল। “কী যে বলেন, অসীমবাবু! এই ছোটো শহরে আর ক’টা প্রসিদ্ধ মোবাইলের দোকান থাকবে? আমার দোকানের সারিতেই কয়েকটা দোকান বাদে একটা বড়ো মোবাইলের দোকান আছে। নাম  ওনলি কম্যুনিকেশন। এ-চত্বরের কেউ মোবাইল কিনলে গেলে ওটাকেই প্রেফার করে।”
মোবাইল দোকানের ঠিকানাটা পেয়েই হাতদুটো জড়ো করে নমস্কার জানিয়ে শাড়ির দোকান থেকে বেরিয়ে হনহন করে হাঁটতে থাকে অসীমদা। কিছু বুঝতে না পেরে পিছু নেয় অর্চি আর মেঘ।
অসীমদা হঠাৎ এত জোরে হাঁটতে থাকল কেন? যাচ্ছেই বা কোথায়? ভেবে পায় না দুই ভাই। উওরটা মেলে মিনিট দুয়েক হাঁটার পরেই। অসীমদা গিয়ে যে ঝাঁ-চকচকে দোকানের সামনে দাঁড়াল তার নাম ওনলি কম্যুনিকেশন।
“তুমি কি মোবাইল কিনবে নাকি, অসীমদা?”
অর্চির প্রশ্নে হাসে অসীমদা। মাথা নেড়ে জানায়, “হ্যাঁ, স্মার্ট ওয়াচ কিনব।”
মেঘ বলে বসে, “অসীমদা, স্মার্ট ওয়াচটা কী জিনিস একটু বলবে? মিঃ পাল বললেন, পিন্টুও নাকি এটাই কিনতে চেয়েছিল।”
অসীমদা বলার আগেই জ্ঞান জাহির করতে থাকে অর্চি। “এটা জানিস না? স্মার্ট ওয়াচ আসলে একটা হাতঘড়ি যেটাকে মোবাইল ফোনের মতোও ব্যবহার করা যায়। কথা বলা, গান শোনা থেকে স্পীডোমিটার, অল্টিমিটার, থার্মোমিটার সবই থাকে এতে।”
অবাক হয়ে যায় মেঘ। নিচু স্বরে  বলে, “তাই নাকি? জানতাম না। আসলে আমি অতটা গ্যাজেট-ফ্রিক নই যে।”
ইতিমধ্যে অসীমদা তাড়া দেয় দোকানে ঢুকবে বলে।
দোকানটি বেশ বড়ো। দোকান না বলে মোবাইল শো-রুম বলা যায়। দুশো স্কোয়ার ফিটের মতো কার্পেট এরিয়া। দামি থেকে কমদামি হরেক মোবাইলে সুসজ্জিত সে দোকান। দু’জন কর্মচারী  দোকানটির  নাম লেখা টি-শার্ট পরে কাস্টমার সামলাচ্ছে। আর ক্যাশ কাউন্টারে নীল টি-শার্ট পরা এক ভদ্রলোক বসে আছেন। হাতে সোনার ব্রেসলেট, আঙুলে বেশ কয়েকটি সোনার আংটি। অসীমদার চোখ চিনতে ভুল করেনি দোকান মালিককে। নিজের পরিচয় দিয়ে অসীমদা বলল, “একটি চুরির কেসের ইনভেস্টিগেশন করতে এখানে এসেছি। একটা তথ্য চাই আপনার কাছে। শেষ দুই দিনে আপনার দোকানে ক’টা স্মার্ট ওয়াচ বিক্রি হয়েছে যদি জানান।”
দোকান মালিক চুরির ইনভেস্টিগেশন শুনে একটু ঘাবড়ে গেলেও পুরনো বিল রেজিস্টারটা একটু ঘাঁটতে থাকলেন। একসময় ঘাঁটা থামিয়ে বললেন, “গতকাল সকালেই নামি কোম্পানির একটি  স্মার্ট ওয়াচ বিক্রি হয়েছে।”
“দাম কত ছিল? আর ক্রেতার নামটা প্লিজ।” টু দ্য পয়েন্ট প্রশ্ন অসীমদার।
দোকান মালিক বিলটা এগিয়ে দিলে অসীমদা পড়তে থাকে - ক্রেতার নাম মিঃ পিন্টু কুমার। আড্রেস দুই-এ সাগরপাড়া লেন, ফুলনগর। আর দাম লেখা আছে পনেরো হাজার।
অর্চি বলে বসে, “হিসেব মিলে গেছে, অসীমদা।”
হাসি চওড়া  হয় অসীমদারও। মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
একটু চিন্তিত দেখায় মেঘকে। জানায়, “অসীমদা, কোথাও কি ভুল হচ্ছে?”
“কেন?”
“কারণ, এ-আড্রেস তো আমাদের দোকানের ম্যানেজারবাবুর।”
বিস্মিত হয় অসীমদা। চমকের ঘনঘটা ফুটে ওঠে অর্চির মুখেও।
ওদের কথাবার্তা শুনে কী বুঝলেন কে জানে। দোকান মালিক হঠাৎই জানালেন, “এই পিন্টুবাবু কিন্তু সকালে আমাদের দোকানে ফোন করেছিলেন একবার। আজ দুটো নাগাদ আবার আসবেন  বলেছেন। স্মার্ট ওয়াচের কয়েকটা ফিচার বুঝতে।”
বাহ্‌! এ তো মেঘ না চাইতেই জল। অসীমদা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে জানায়, “এখন একটা পঞ্চান্ন। আমরা তবে আপনার দোকানেই ওয়েট করছি। ও এলে একটা ইশারা করবেন। আমরা তখন কাস্টমার সেজে মোবাইল দেখব।”
অসীমদার কথা শেষ করবার আগেই অর্চি চাপা গলায় বলে, “অসীমদা, দোকানে কে ঢুকছে দেখো।”
মেঘ আমতা আমতা করে। “সেই সোয়েটার, সেই হাফ হাতা শার্ট। দোহারা চেহারাটাও এক।”
অসীমদা এবার ক্ষিপ্রগতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে দোকানে সদ্য পা রাখা লোকটির উপর। ঘটনার আকস্মিকতায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় পিন্টু। এরপর অসীমদা নিজের পরিচয় দিয়ে ওকে চেপে ধরতেই একবাক্যে নিজের কৃতকর্ম স্বীকার করে ও। বোঝা যায়, বেচারা পাকা চোর নয় একেবারেই।
এও ফাঁস হয়, মোবাইল বিলে পিন্টুর ম্যানেজারবাবুর ঠিকানাকে নিজের ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করার কারণ। পিন্টু অকপটে জানাতে থাকে, মিঃ পালের দোকানে চুরি করার পর থেকেই তার মামা কেবল ফুলনগরের বাড়িই ত্যাগ করেনি, সাথে ত্যাগ করেছিল পিন্টুকেও। সামান্য আশ্রয়ের খোঁজে পিন্টু তখন পড়ে অর্চির মামার হার্ডওয়্যারের দোকানের ম্যানেজারবাবুর খপ্পরে। অর্চির মামার বাড়িতে যে কিছু বহুমূল্য অ্যান্টিক মূর্তি আছে সেটা কোনও একটা সোর্সে জানতে পেরেছিলেন এই ম্যানেজারবাবু। ইচ্ছা ছিল, পিন্টুকে দিয়ে ওগুলো চুরি করিয়ে উনি বেশ কিছু টাকা কামিয়ে নিজেই একটা হার্ডওয়্যারের দোকান খুলবেন। আর সেই কাজেরই প্রাথমিক হাতেখড়ি বা হাত পাকানো ছিল এই মানিব্যাগ চুরি। পুরোটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে যায় অর্চি। মেঘ বিড়বিড় করে বলতে থাকে, “একেই বোধহয় বলে সর্ষের মধ্যে ভূত।”
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ পুষ্পেন মণ্ডল

1 comment: