গল্পঃ এক অলৌকিক দুপুরঃ সায়ন্তনী পলমল ঘোষ


এক অলৌকিক দুপুর

সায়ন্তনী পলমল ঘোষ


ট্রেনটা হুইসেল দিতেই আমার মনটা বাতাসের মতো ফুরফুরে হয়ে ফানুসের মতো আনন্দে ভাসতে লাগল। কেউ আবার ভেবে বসো না যে আমি পাহাড় বা সমুদ্রে কোথাও বেড়াতে যাচ্ছি। আসলে চলেছি আমার মামার বাড়ি। সেই ছোট্টবেলা থেকে মামাবাড়ি যাবার নাম হলেই আমার মনটা উচ্চিংড়ে পোকার মতো লাফায়। একটা ছড়া আছে না, ‘মামাবাড়ি ভারি মজা, কিল চড় নাই।’ আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার মামাবাড়ি দেখেই লেখক লিখেছিলেন ছড়াখানি। এবারে আবার মামাতো দাদার বিয়ে মানে মজাটা আরও তিনগুণ।

সারাবাড়ি নিশ্চুপ, সবাই আয়েশি ভাতঘুমে মগ্ন। শুধু আমাদের তিনমূর্তির চোখে ঘুম নেই। আমি, আমার মামার মেয়ে চিনি আর মাসির মেয়ে গিনি - এই তিনজনে দুপুরটা কাটাবার উপায় খুঁজছি। এখনও তিনদিন বাকি বিয়ের। বাড়িতে থাকলে নিদ্রাদেবী আসন পাতার জন্য আমার চোখের পাতাদুটোই খুঁজে পান, কিন্তু আমি মামাবাড়ি এলে নিদ্রাদেবীও বোধহয় মাসিবাড়ি, পিসিবাড়ি কোথাও চলে যান।
আম পাড়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে তিনজনে মুখ ব্যাজার করে আমগাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছি। এমন সময়, “এই মেয়েগুলো, ভরদুপুরে এখানে কী হচ্ছে?”
তাকিয়ে দেখি, চিনির মামাদাদু দাঁড়িয়ে আছেন। চিনি চোখ পাকিয়ে বলল, “দুপুরবেলা তুমিই বা এখানে কী করছ শুনি?”
“আমার তো কোনও কালেই ভাতঘুমের অভ্যেস নেই, দিদিভাই। এই দুপুরবেলাই আমার জীবনে কত অভিজ্ঞতা হয়েছে তার হিসাব নেই।”
“কীরকম, কীরকম?” আমরা সমস্বরে বলে উঠি।
“সে অনেকরকম। আমি তো গ্রামের ছেলে। ভরদুপুরে সেখানে করার মতো অনেক কিছু আছে। তোদের মতো মুখ হাঁড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকার কোনও প্রশ্নই নেই। সেইসব করতে গিয়েই আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিটা ভরে উঠেছে।”
“তাহলে দাদু, সেই কাহানিগুলোর মধ্যে যেটা সবসে অনোখি সেটা বলো।” গিনি বলল। পাটনায় মানুষ হওয়ার জন্য গিনির বাংলায় এত সুন্দর দখল!
“তাহলে তো আমার শৈশবের একটা ঘটনা বলতে হয়। যেটা গিনির কথামতো অনোখি আর সেই ঘটনাটা আমার হৃদয়ের খুব কাছের।” দাদু যেন ভাবুক হয়ে গেলেন।
বারান্দায় এসে দাদুকে ঘিরে বসে গেলাম তিনমূর্তি। দাদু শুরু করলেন।
তখন আমার বছর দশেক বয়স। ওই বয়সে গ্রামের ছেলেরা যেমন ডানপিটে হয়, আমিও তেমনই ছিলাম। আমরা দুই ভাই আর এক বোন। আমার আর ভাইয়ের দুরন্তপনায় বাড়ির লোকের প্রাণ ওষ্ঠাগত। একদিন এমনি এক দুপুরবেলায় মা আমাদের দুই ভাইকে শুইয়ে ছোটো বোনটাকে নিয়ে পাশের ঘরে শুতে গেলেন। ভাই তো একটু পরেই ঘুমিয়ে কাদা। আর আমি যেই বুঝতে পারলাম মা ঘুমিয়ে গেছেন পাশের ঘরে, অমনি পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে আস্তে আস্তে খিড়কির দরজা খুলে একছুটে পৌঁছে গেলাম চৌধুরীদের পোড়ো ভিটেয়। এখানে একটা পেয়ারাগাছ আছে, তাতে বেশ ডাঁসা পেয়ারা হয়। কিন্তু মা কিছুতেই আমাকে আসতে দেন না। কারণটা হল, একরাতে আগুন লেগে চৌধুরীদের সবাই পুড়ে মারা গিয়েছিল। সেই থেকে এই ভিটেটা পরিত্যক্ত।
চৌধুরীদের ভিটেটা পাড়া ছাড়িয়ে একটু ফাঁকার দিকে, বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে। আমি ঝোপঝাড় ডিঙিয়ে পেয়ারাগাছের নিচে পৌঁছে গেলাম। অদ্ভুত কাণ্ড, আমি দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গাছ থেকে দুটো পেয়ারা খসে পড়ল! নুন-লঙ্কা আমার কাছে সবসময় মজুত থাকে। পেয়ারাগুলো উদরস্থ করে আমি ওই ভিটের মধ্যেই ইতিউতি ঘুরতে লাগলাম।
আমি যেন এক অজানা দেশের সন্ধান পেয়ে গিয়েছিলাম যার একলা মালিক আমি। একটা আমগাছ ছিল। গাছটা এত উঁচু যে তার থেকে আম পাড়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু আবার সেই একই ব্যাপারের পুনরাবৃত্তি ঘটল। আমি আমগাছের নিচে দাঁড়ানো মাত্র গাছ থেকে আম খসে পড়ল। গাছগুলো যেন আমার অপেক্ষায় ছিল। সে আম এত মিষ্টি, কী বলব!
একসময় যেটা উঠোন ছিল, তার একপাশে তুলসিমঞ্চটা অবহেলায় পড়ে আছে। বহুকাল সেখানে প্রদীপ জ্বলেনি, শাঁখ বাজেনি। চারদিকে ঝোপজঙ্গল। পায়ে পায়ে ঘুরতে ঘুরতে আমি এগিয়ে গেলাম চৌধুরীদের পোড়ো বাড়িটার দিকে। বিশেষ আর কিছুই নেই, তাও অল্প কিছু অবশিষ্ট আছে নিভে যাওয়া এক গৃহস্থালির অন্তিম নিদর্শন স্বরূপ।
বাড়িটা আমায় যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। এক দুর্নিবার আকর্ষণে আমি ভাঙাচোরা বাড়িটার মধ্যে ঢুকে গেলাম। বিশ্বাস করবি না, আমি বাতাসে যেন কাদের কথা শুনতে পাচ্ছিলাম। রান্নাঘরে রান্নার সময় যেমন বাসনের টুংটাং আওয়াজ হয় তেমনি শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। কখনও আবার শিলনোড়ার আওয়াজ, কখনও হামানদিস্তার শব্দ। আমার কেমন যেন মনে হচ্ছিল, একটা গৃহস্থের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা চলছে। আর একটা কথা বিশ্বাস করবি না, আমার কোনও ভয় লাগছিল না। বরং বেশ খুশি মনে আমি ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম।
একটা ভাঙা ঘরে কয়েকটা অর্ধদগ্ধ বাচ্চাদের খেলনা দেখে আমি অবাক হয়ে একদৃষ্টিতে বাহ্যজ্ঞান শূন্য হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। এমন সময়, ‘খোকা-আ-আ’ বলে ডেকে কেউ আমায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। আমি কোনওমতে একটা ভাঙা দেওয়াল ধরে নিজেকে সামলে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। তারপর যা দেখলাম তাতে আমার এতক্ষণের সব সাহস উড়ে গেল। সামনেই ফণা উঁচিয়ে আছে জাত গোখরো। আমি গাঁয়ের ছেলে। এসব আমাদের চেনাতে হয় না। সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত। আমি ধাক্কা খেয়ে সরে না এলে এতক্ষণে আমার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যেত। অবশ্য তখনও যমের দুয়ারের দিকেই পা বাড়িয়ে আছি। ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ছে, ঘামে ভিজে যাচ্ছি, একটু একটু কান্নাও পাচ্ছে - মানে ওই অবস্থায় একটা দশ বছরের ছেলের যা যা হতে পারে সবই আমার হচ্ছে।
এমন সময় আমার রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূতা হলেন একজন। লাল পাড় ডুরে শাড়ি পরা সাধারণ একজন গৃহবধূ। অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় মাথাটা চেপে ধরে সাপটাকে বাইরে ছুড়ে ফেললেন। ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, তাঁর সারা মুখে বসন্তের দাগ আর চিবুকে একটা ছোট্ট আঁচিল। বড়োই মায়াভরা চোখ।
“খোকা এখানে কী করছিস তুই?” স্নেহভরা কন্ঠে বললেন তিনি।
তাঁর গলার স্বরে এমন আন্তরিকতা ছিল যে আমি কেঁদে ফেললাম। কাঁদতে কাঁদতে বললাম কেন এসেছিলাম।
“পাগল ছেলে। এমন কেউ করে! এ ভিটের তো সব শেষ হয়ে গেছে। পড়ে আছে শুধু হাহাকার। আর কোনওদিন এমন করে আসিস না এখানে। আজ যদি আমি না আসতাম, কী বিপদ হয়ে যেত বল তো।” দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন তিনি।
একটা ওম অনুভব করছিলাম। যেন ওই মহিলার ছায়ায় আমি খুব নিশ্চিন্ত, নিরাপদ, সব বিপদমুক্ত।
“তুমি এখানে কী করছ?” আমি প্রশ্ন করি তাঁকে।
ম্লান হেসে পরম মমতায় বললেন, “মায়ার টানে রে, নাড়ির টানে আজ আমায় আসতে হয়েছে। সে তুই বুঝবি না। এখন যা বাবা, ঘরে ফিরে যা।”
আমি বাইরে এসে পেছন ফিরে দেখলাম, তিনি সেই ভাঙা ঘরের মধ্যে থেকে সজল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমারও বুকের মধ্যে কেমন একটা কষ্ট হচ্ছিল তাঁকে ছেড়ে আসতে। একটা মনখারাপ জড়িয়ে ধরছিল আমাকে।
আমি বুঝতেই পারিনি এত সময় পেরিয়ে গেছে। সুয্যিমামা বাড়ি ফেরার তোড়জোড় করতে ব্যস্ত।  চারদিকে আমার খোঁজ পড়ে গেছে। গুটিগুটি পায়ে বাড়ি ফিরে আসতেই মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে আরম্ভ করে দিলেন আর বাবা, কাকা, দাদু সবাই প্রশ্ন করতে লাগলেন। একটা ঘোরের মতো সব সত্যিকথা বললাম। অবাক হয়ে দেখলাম, মায়ের চোখের জল দ্বিগুণ হয়ে গেছে আর সবাই চুপচাপ। ঠাকুমা আস্তে করে মাকে বললেন, “বৌমা ওকে সব বলে দাও। শুধু নাড়ির টানে সে আজ ওকে বাঁচাতে এসেছিল। লোকে বলে ওপার থেকে আসতে নাকি ভারি কষ্ট হয় তাদের। তার পরিচয়টা বিলুকে না জানালে ওদের দু’জনের প্রতিই অবিচার হবে।”
মা কথা বলার অবস্থায় ছিলেন না। বাবা আমাকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন, “যিনি তোকে বাঁচিয়েছেন, তিনি তোর মা।”
আমি চরম বিস্ময়ে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর জানলাম, আমি ওই পুড়ে যাওয়া চৌধুরীবাড়ির ছেলে। আমার বাবা আর জন্মদাতা বাবা, দু’জনের মধ্যে খুব বন্ধুত্ব ছিল। দুই মায়েও সই পাতিয়েছিল। একবার আমার জন্মদাত্রী মা এবং আমার ঠাকুমা দু’জনেরই একসাথে বসন্ত হয়। আমি তখন একবছরের। আমার কাকিমা একসাথে বাড়ির কাজ, রোগীর পথ্য আবার আমার দেখাশোনা করবে কী করে? তাছাড়া বসন্ত ছোঁয়াচে রোগ। তাই আমার বর্তমান বাবা-মা আমাকে তাঁদের কাছে নিয়ে আসেন। আমাকে আনার পাঁচদিনের মাথায় এক রাতে বাড়িতে আগুন লেগে আমার পুরো পরিবার শেষ হয়ে যায়। রাত্রিবেলা ঘটনাটা ঘটায় গ্রামের লোক জেগে উঠে যেতে যেতে অনেক দেরি হয়ে যায়। তখন তো এখনকার মতো ফোন বা দমকলের সুবিধা ছিল না। আমার জন্মদাতা পিতা বহুকষ্টে তাঁর দগ্ধ শরীরটা নিয়ে বেরিয়ে এসে আমার পালকপিতাকে শুধু বলতে পেরেছিলেন, “আমার বিলুকে দেখিস।”
আমার বাবা-মা সেকথা রেখেছিলেন। তাঁদের মৃত্যুদিন পর্যন্ত আমি কোনওদিন অনুভব করিনি যে আমি তাঁদের নিজের সন্তান নই। আজও আমার ভাইবোন আমাকে বড়ো দাদার মর্যাদাই দেয়। চিনি তো খুব ভালো করেই জানিস, তোর ছোড়দাদু আর পিসিদিদা তোদেরও কত ভালোবাসে।
“হুম। আমি তো ভাবতেই পারছি না যে তুমি ওঁদের নিজের দাদা নও। বোঝাই যায় না।”
একটু চুপ করে দাদু আবার বলতে লাগলেন, “একটা কথা জানিস? এত বছর কেটে গেলেও আমি সেই অল্পক্ষণ দেখা আমার মায়ের মুখটা চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই। বিপদে পড়লেই মায়ের মুখটা মনের মধ্যে ভেসে ওঠে। মায়ের সেই বসন্তের দাগে ভরা মুখটাই আমার মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর চেহারা।”
দাদুর চোখে জল। চিনি আস্তে করে বলল, “দাদু তোমাদের সেই ভিটেটা আমায় দেখাবে?”
দাদু স্বল্প হেসে বললেন, “সেটা তুই দেখেছিস। যেখানে আমি অনাথ ছেলেমেয়েদের জন্য ‘আশার আলো’ তৈরি করেছি, ওটাই আমার পূর্বপুরুষের সেই ভিটে। আমার জন্মদাত্রী মায়ের নাম ছিল আশালতা।”
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ বিশ্বদীপ পাল

3 comments:

  1. দারুণ লাগল। মিষ্টি মিষ্টি একটা ছোঁয়া।

    ReplyDelete
  2. খুব ভালো লাগলো পড়ে।।😃😃😃

    ReplyDelete
  3. opurbo,pujor sera galpo

    ReplyDelete