ধারাবাহিকঃ কুরুপাণ্ডব কথাঃ মৈত্রেয় মিত্র



দ্বিতীয় পর্ব

দুর্যোধনের জন্ম


বাণপ্রস্থে যাওয়ার সময় মহারাজ পাণ্ডুর দান নিয়ে যে ব্রাহ্মণ ও পরিজনেরা হস্তিনানগরে ফিরেছিলেন, তাঁরা  ধৃতরাষ্ট্র এবং পিতামহ ভীষ্মকে সকল ঘটনার কথা সবিস্তারে বললেন। দাদা ধৃতরাষ্ট্র মহারাজ পাণ্ডুর বনবাসের কথা জেনে বিষণ্ণ হলেন। তিনি আহার-নিদ্রা ছেড়ে দুঃখসাগরে ডুবে রইলেন।
একদিন মহর্ষি বেদব্যাস ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে ধৃতরাষ্ট্রের ভবনে এসে উপস্থিত হলেন। কল্যাণী গান্ধারী পরম সম্মানের সঙ্গে মহর্ষিকে সেবাযত্ন করলেন। তাঁর সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে মহর্ষি গান্ধারীকে বর দিতে চাইলেন। গান্ধারী বিনীত মুখে বললেন, “হে ভগবান, আমাকে এমন বর দিন, আমি যেন আমার স্বামীর মতো গুণবান শতপুত্রের জননী হতে পারি।”
“তাই হবে।” এই কথা বলে মহর্ষি চলে গেলেন।
এর কিছুদিনের মধ্যে গান্ধারী গর্ভবতী হলেন। কিন্তু দু’বছর পরেও তাঁর সন্তানের জন্ম হল না। আর সেই সময়েই তাঁর কাছে সংবাদ এল, বাণপ্রস্থে থাকা পাণ্ডু ও কুন্তীর একটি পুত্র হয়েছে! তার নাম যুধিষ্ঠির, সে-শিশু ভোরের সূর্যের মতো উজ্জ্বল, পবিত্র এবং সুন্দর! কুন্তীর পুত্রবতী হওয়ার সংবাদে গান্ধারী মনে মনে অত্যন্ত ঈর্ষা এবং অসূয়া অনুভব করলেন। অধৈর্য হয়ে ধৃতরাষ্ট্রকে না জানিয়ে তিনি নিজের গর্ভ মুক্ত করলেন। ওই গর্ভ থেকে একটি কঠিন মাংসপিণ্ড ভূমিষ্ঠ হল। লজ্জায়, ঘৃণায়, নিজের প্রতি বিতৃষ্ণায় গান্ধারী যখন মাংসপিণ্ডটিকে ফেলে দিতে যাচ্ছিলেন, সেই সময় মহর্ষি বেদব্যাস সেখানে এসে পড়লেন। গান্ধারীর হাতে মাংসপিণ্ড দেখে তিনি বললেন, “সুবলকন্যা, তুমি এ কী করেছ?”
গান্ধারী বললেন, “হে মহাত্মন, কুন্তীর পুত্র হয়েছে শুনে আমি ভীষণ দুঃখে গর্ভ মুক্ত করে ফেলেছি। আপনি বলেছিলেন, আমার শতপুত্র হবে। আপনি এই মাংসপিণ্ড থেকে শতপুত্র সৃষ্টি করুন।”
মহর্ষি বললেন, “হে সৌবলেয়ি, আমার কথা মিথ্যা হতে পারে না। এই পিণ্ড থেকেই তোমার শতপুত্রের জন্ম হবে। তুমি গোপন এক কক্ষে একশ কুম্ভ ঘি রাখো। তারপর এই মাংসপিণ্ডে জল সিঞ্চন করতে থাকো।”
মহর্ষি ব্যাসের নির্দেশ অনুযায়ী কিছুক্ষণ জল সিঞ্চনের পর সেই মাংসপিণ্ড ছোটো ছোটো একশো এক খণ্ডে বিভক্ত হয়ে গেল। একেকটি খণ্ডের পরিমাপ বুড়ো আঙুলের মতো। গান্ধারী সেই খণ্ডগুলির প্রত্যেকটি একেকটি ঘি-ভরা কুম্ভের মধ্যে রেখে গোপন কক্ষে স্থাপন করলেন। ভগবান ব্যাস গান্ধারীকে বললেন, “বৎসে সৌবলেয়ি, অধৈর্য হয়ো না। দু’বছরের আগে এই কুম্ভগুলিকে মুক্ত করবে না।”
এই কথা বলে মহর্ষি ব্যাস চলে গেলেন।

জন্ম অনুসারে যুধিষ্ঠির সকলের বড়ো হলেন। কারণ তাঁর জন্মের দু’বছর পরে দুর্যোধনের জন্ম হল। শিশু দুর্যোধন জন্মের পর গাধার মতো কর্কশ স্বরে কেঁদে উঠলেন। তাঁর কান্না শুনে গাধা, শকুনি, শৃগাল, কাক তীব্র ভয়ে চিৎকার করতে লাগল। সে সময় প্রবলবেগে ঝড় উঠল। সে বায়ু আগুনের মতো তপ্ত জ্বালাময়ী। চারদিকেই অমঙ্গলের নানান লক্ষণ দেখা দিল। রাজা ধৃতরাষ্ট্র এই সব দেখে ভয় পেলেন। তিনি সভায় বিদুর, ভীষ্ম, বিজ্ঞ ব্রাহ্মণ, অন্যান্য বন্ধুদের ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে গুণীজন, যুধিষ্ঠির সকলের জ্যেষ্ঠ এবং শুনেছি গুণবান। এ-রাজ্য তিনিই পাবেন, সে বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই। কিন্তু আমার এই জ্যেষ্ঠপুত্র যুধিষ্ঠিরের পর রাজ্যের অধিকারী হবেন কি না সেটাই আমার জানার বিষয়।”
ধৃতরাষ্ট্রের এই কথা শেষ না হতেই ভয়ংকর মাংসাশী জন্তুরা ডাকতে লাগল; শৃগালেরা ভয়ংকর চিৎকার করতে লাগল। এইসব অলক্ষণ দেখে বিদুর ও প্রাজ্ঞ ব্রাহ্মণেরা বললেন, “হে মহারাজ, আপনার জ্যেষ্ঠপুত্রের জন্ম হওয়া মাত্র যে সকল অলক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তাতে স্পষ্টই মনে হচ্ছে, আপনার এই পুত্রের জন্যে কুরুকুল ধ্বংস হবে। আমাদের মত, আপনি জ্যেষ্ঠ পুত্রকে ত্যাগ করে নিরানব্বই পুত্র নিয়ে সুখে দিন কাটান। একে ত্যাগ করলে আপনার বংশের এবং জগতের মঙ্গল হবে। শাস্ত্রে বলা আছে, যদি একজনকে ত্যাগ করলে বংশরক্ষা হয়; যদি একটি বংশ ত্যাগ করলে একটি গ্রাম রক্ষা হয়; যদি একটি গ্রামকে ত্যাগ করলে একটি রাজ্য রক্ষা হয়, তবে তাই করা উচিত।”
কিন্তু ধৃতরাষ্ট্র পুত্রস্নেহে তাঁদের উপদেশ শুনলেন না। দুর্যোধনের জন্মের কিছুদিন পর তাঁর নিরানব্বই জন পুত্র এবং এক কন্যা দুঃশলার জন্ম হল। অন্যদিকে তাঁর বৈশ্যা পত্নীরও একটি পুত্র হল, তাঁর নাম যুযুৎসু।

ভীম, অর্জুন প্রমুখের জন্ম



যুধিষ্ঠিরের মতো ধার্মিক পুত্র পেয়ে মহারাজ পাণ্ডু আনন্দিত হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর মতো বীর ক্ষত্রিয়বংশে একজন বলবান পুত্র পেতেও তাঁর খুব ইচ্ছা হল। একদিন পত্নী কুন্তীকে নিজের ইচ্ছার কথা বলতে, কল্যাণী কুন্তী আগের মতোই পবিত্র পুজা করে মহামন্ত্র স্মরণ করলেন এবং পবনদেব বরুণকে আহ্বান করলেন। বরুণদেবের আশীর্বাদে তাঁর আরেকটি পুত্র হল, তাঁর নাম ভীমসেন। ভীমের জন্মের সময় দৈববাণী হল, “এই পুত্র বলবান বীরদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হবে।”
এরপর একদিন সদ্যোজাত ভীমকে কোলে নিয়ে মাতা কুন্তী ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। অরণ্যে হঠাৎ এক বাঘের গর্জনে তিনি চমকে উঠলেন। তাঁর কোল থেকে ভীম গড়িয়ে পড়লেন এক পাহাড়ের চূড়ায়। সবল ভীমের শরীরের আঘাতে সেই পাহাড় সম্পূর্ণ চূর্ণ হয়ে গেল। মহারাজ পাণ্ডু এই দৃশ্য দেখে আশ্চর্য হলেন। ভীমের জন্মদিনেই হস্তিনানগরে দুর্যোধনের জন্ম হয়েছিল।
মহাবলী ভীমের জন্মের কিছুদিন পরেই মহারাজ পাণ্ডু চিন্তা করতে লাগলেন, কীভাবে আমার সর্বলোকে শ্রেষ্ঠ এক পুত্র লাভ করতে পারি? শুনেছি দেবরাজ ইন্দ্র সকল দেবতার মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং অসীম শক্তিমান। দেবরাজ ইন্দ্রকে সন্তুষ্ট করতে পারলে তাঁর আশীর্বাদে আমার একটি ইন্দ্রতুল্য পুত্র লাভ হতে পারে। যে পুত্র সুর, অসুর, নাগ, নর, গন্ধর্ব প্রভৃতি সকল জাতিকেই পরাজয় করতে পারবে। মহারাজ পাণ্ডু মনে মনে এই সঙ্কল্প করে কঠোর তপস্যা করে দেবরাজ ইন্দ্রকে সন্তুষ্ট করলেন। দেবরাজ তাঁর সামনে উপস্থিত হয়ে বললেন, “হে রাজর্ষি, তোমার তপস্যায় আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। আমার আশীর্বাদে তোমার মনোমত পুত্র লাভ হবে।”
পত্নী কুন্তীকে মহারাজ পাণ্ডু দেবরাজ ইন্দ্রের থেকে বর পাওয়ার কথা বললেন। তখন কল্যাণী কুন্তী মহর্ষি দুর্বাসার মহামন্ত্র জপ করে দেবরাজ ইন্দ্রকে আহ্বান করলেন। দেবরাজ ইন্দ্রের আশীর্বাদে কুন্তীর একটি পুত্র লাভ হল। ওই পুত্রের নাম অর্জুন। অর্জুনের জন্মে পরেই দৈববাণী হল, “হে পৃথে, তোমার পুত্র কার্তবীর্য ও শিবের মতো পরাক্রমশালী হবেন। দেবরাজ ইন্দ্রের মতো অজেয় হবেন। বিষ্ণুমাতা অদিতি যেমন পুত্রের গৌরবে আনন্দ পেয়েছিলেন, তেমনি অর্জুনের জন্যে তোমারও গৌরব বৃদ্ধি পাবে। অর্জুন নিজের বাহুবলে কুরু, সোম, চেদি, কাশী, করুষ প্রভৃতি বিখ্যাত জনপদকে বশীভূত করে কুরুকুলের শ্রীবৃদ্ধি করবেন। ইনি খাণ্ডববন দহন করে ভগবান অগ্নিকে সন্তুষ্ট করবেন। হে কুন্তী, তোমার পুত্র পরশুরামের মতো তেজস্বী, বিষ্ণুর মতো পারাক্রান্ত হবেন। ইনি দেবাদিদেব মহাদেবকে সন্তুষ্ট করে তাঁর থেকে পাশুপত নামে মহা অস্ত্র লাভ করবেন। ইনি দেবরাজ ইন্দ্রের আদেশে দেবতাদের পরমশত্রু নিবাত-কবচ নামের দৈত্যদের সংহার করবেন।”
অর্জুনের জন্মের শুভ লগ্নে আকাশ থেকে দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি করলেন। দেবতারা সকলে অর্জুনের স্তব করতে লাগলেন। প্রজাপতি, সপ্তর্ষি, ভরদ্বাজ, কশ্যপ, বিশ্বামিত্র, বশিষ্ঠ, গৌতম, অত্রি, জমদগ্নি – সকল মুনি ও ঋষিরা সেখানে এসে অর্জুনকে আশীর্বাদ করলেন। গন্ধর্ব ও অপ্সরাগণ অর্জুনকে ঘিরে নাচ ও গান করতে লাগলেন। দ্বাদশ আদিত্য আকাশে থেকে অর্জুনের মহিমা বাড়িয়ে তুললেন। একাদশ রুদ্র সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। দুই অশ্বিনীকুমার, অষ্টবসু, মরুৎগণ, বিশ্বদেব ও সাধ্যগণ সেই স্থানে এসে অর্জুনকে ঘিরে রইলেন। কর্কোটক, বাসুকি, তক্ষক প্রমুখ মহানাগগণ, অরিষ্টনেমি, গরুড়, অরুণ প্রমুখ বিনতার পুত্রেরাও সেখানে উপস্থিত হলেন। সাধারণ লোকেরা কেউই এঁদের দেখতে পেলেন না; শুধুমাত্র মহর্ষি ও তাপসেরা এঁদের দেখতে পেলেন। মহর্ষিরা এই আশ্চর্য ব্যাপার দেখে অত্যন্ত অবাক হলেন এবং সেই থেকে তাঁরা মহারাজ পাণ্ডু ও পাণ্ডুপুত্রদের আরও বেশি শ্রদ্ধা করতে লাগলেন।
অর্জুনের জন্মের পর মহারাজ পাণ্ডু আরও এক পুত্রের জন্যে কুন্তীকে অনুরোধ করলেন। কিন্তু কল্যাণী কুন্তী কিছুতেই রাজি হলেন না। এদিকে মহারাজ পাণ্ডুর অন্য মহিষী মাদ্রী একদিন মহারাজের কাছে অনুযোগ করলেন, “হে মহারাজ, কুন্তী ও আমি দু’জনেই আপনার পত্নী। আমরা দু’জনেই সমান। অথচ কুন্তী তিন-তিনটি পুত্রের জননী হলেন, আর আমি কোনও পুত্রের মাতা হতে পারলাম না? হে মহারাজ, কুন্তী আমাকে একটু অনুগ্রহ করলে আমিও সন্তানের মাতা হতে পারি। কিন্তু কুন্তী আমার সতীন, তাঁর কাছে আমি একথা মুখ ফুটে বলতে পারব না। তবে আপনি যদি আমার হয়ে বলে দেন, তাহলে কুন্তী না করতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে আপনারও আরও পুত্রলাভ হয়।”
মাদ্রীর প্রস্তাবে মহারাজ পাণ্ডু সম্মত হলেন। তিনি কুন্তীকে এ বিষয়ে অনুরোধ করাতে কুন্তীও অসম্মত হলেন না। তিনি মাদ্রীকে বললেন, “তুমি তোমার মনোমত কোনও দেবতার নাম একনিষ্ঠ মনে স্মরণ করতে থাকো।”
তারপর তিনি মুনি দুর্বাসার সেই মহামন্ত্র জপ করতে লাগলেন। অনেক চিন্তাভাবনা করে মাদ্রী দুই অশ্বিনীকুমারকে আহ্বান করলেন। তাঁদের আশীর্বাদে নকুল ও সহদেব নামে যমজ পুত্র হল। তাঁরা ভূমিষ্ঠ হওয়ামাত্র দৈববাণী হল, “হে দুই কুমার, তোমরা দুইজনেই অশ্বিনীকুমারদের থেকেও বেশি সত্ত্বসম্পন্ন হবে এবং রূপবান, গুণবান ও তেজস্বী হয়ে পরমসুখে বড়ো হবে।”

হস্তিনানগরে যখন দুর্যোধনসহ একশো ভাই সরোবরে পদ্মের মতো দিনদিন বেড়ে উঠতে লাগলেন, তখন মহারাজ পাণ্ডুর পুত্রেরা শতশৃঙ্গ পর্বতের আশ্রমে বড়ো হতে থাকলেন, বেদচর্চা করতে লাগলেন। তাঁরা অন্যান্য আশ্রমের মুনি এবং মুনি পত্নীদেরও চোখের মণি হয়ে উঠলেন। মহারাজ পাণ্ডুও পাঁচ-পাঁচটি গুণবান ও রূপবান পুত্র পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলেন।

মহারাজ পাণ্ডুর অকালমৃত্যু


পাঁচপুত্র লাভের আনন্দে আত্মহারা হয়ে মহারাজ পাণ্ডু মুনি কিন্দমের অভিশাপের কথা ভুলেই গেলেন। একদিন গভীর অরণ্যে পত্নী মাদ্রীর সঙ্গে আনন্দ করতে গিয়ে তিনি প্রাণ হারালেন। স্বামীর মৃত্যুতে শোকাচ্ছন্না কুন্তী স্বামীর সহমরণে যাওয়ার সংকল্প করলেন। কিন্তু মাদ্রী বললেন, “হে কুন্তী, মহারাজ আমার সঙ্গেই প্রাণ হারিয়েছেন, অতএব পরলোকেও তাঁর সঙ্গে এখন আমারই থাকা উচিত। তাছাড়া আমি বেঁচে থেকে আমার নিজের দুই পুত্রের মতো তোমার তিনপুত্রকে যদি স্নেহ করতে না পারি? সেক্ষেত্রে আমাকে লোকনিন্দা এবং অপযশ সহ্য করতে হবে। কিন্তু আমি জানি, তুমি আমার দুই পুত্রকেও তোমার নিজের পুত্রের সঙ্গে সমান স্নেহে লালনপালন করতে পারবে। এখন তোমার কাছে আমার এই অনুরোধ, আমাকে স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যেতে দাও।” এই কথা বলে মদ্ররাজকন্যা মহারাজের মৃতদেহ আলিঙ্গন করে নিজেও দেহত্যাগ করলেন।

মহারাজ পাণ্ডুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া

মহারাজ পাণ্ডুর দেহরক্ষার পর শতশৃঙ্গ পর্বতের আশ্রমে থাকা মহর্ষি ও ব্রাহ্মণেরা সকলে মিলে পরামর্শ করলেন, “রাজর্ষি পাণ্ডু নিজের রাজ্য ছেড়ে এখানে এসে আমাদের সঙ্গে থেকে এতদিন তপস্যা করলেন। এখন তিনি শিশুপুত্রদের ও পত্নীকে রেখে সুরলোকে চলে গেছেন। অতএব আমাদের উচিত মহারাজ পাণ্ডু ও রানি মাদ্রীর শবদেহ এবং রানি কুন্তীসহ তাঁর পাঁচ শিশুপুত্রকে মহাত্মা ভীষ্ম ও রাজা ধৃতরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেওয়া।” মহর্ষিরা এই চিন্তা করে দুই শবদেহ শিবিকায় সাজিয়ে সকলকে নিয়ে হস্তিনানগরের দিকে রওনা হলেন।
কিছুদিনের মধ্যেই তাঁরা একরাত্রে কুরুজাঙ্গল রাজ্যের সীমানায় এসে পৌঁছোলেন। পরেরদিন ভোরে রাজদ্বারে উপস্থিত হলেন। হস্তিনাপুরবাসী সকলে তাঁদের দেখতে এলেন। রাজভবন থেকেও সবাই এলেন। এলেন মহামতি ভীষ্ম, সোমদত্ত, বাহ্লীক, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, বিদুর, সত্যবতী, যশস্বিনী অম্বালিকা, রানি গান্ধারী এবং অন্যান্য রাজমহিষীরা। তখন শতশৃঙ্গবাসী সিদ্ধ তাপসদের মধ্যে যিনি শ্রেষ্ঠ, প্রাজ্ঞ ও বয়োজ্যেষ্ঠ - তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “হে উপস্থিত মান্যবরগণ, কৌরববংশের যোগ্য উত্তরাধিকারী মহারাজ পাণ্ডু রাজ্যসুখ ত্যাগ করে অরণ্যে গিয়েছিলেন বাণপ্রস্থ নিয়ে। সেখানে তাঁর কল্যাণী বড়ো পত্নী কুন্তী সাক্ষাৎ ধর্মদেবের আশীর্বাদে যুধিষ্ঠির, ভগবান বায়ুর আশীর্বাদে ভীমসেন এবং দেবরাজ ইন্দ্রের আশীর্বাদে অর্জুন – এই তিন পুত্র লাভ করেছেন। অর্জুনের যশ ও পরাক্রম ভবিষ্যতে অনেক বীরের খ্যাতিকে ম্লান করে দেবে। আর এই যে দুই রাজকুমার, নকুল ও সহদেব, এঁরা কল্যাণী মহারাজ পাণ্ডুর ছোটো পত্নী মাদ্রী লাভ করেছেন দেব অশ্বিনীকুমারের আশীর্বাদে। আপনারা মহারাজ পাণ্ডুর পুত্রদের বেদপাঠে সন্তুষ্ট হতে পারবেন।
“রাজর্ষি পাণ্ডু আজ সতেরোদিন হল পরলোক গমন করেছেন। পতিব্রতা রানি মাদ্রীও স্বামীর মৃত্যুতে শোকার্ত হয়ে প্রাণত্যাগ করেছেন। আপনারা মহারাজ পাণ্ডু ও রানি মাদ্রীর শবদেহদুটি নিয়ে কুন্তী এবং পাঁচ ভাইয়ের সঙ্গে তাঁদের অগ্নিকার্য, প্রেতক্রিয়া ও শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করুন।”
উপস্থিত কুরুজ্যেষ্ঠদের এইকথা বলে সিদ্ধ তাপসেরা চলে গেলেন। তাঁদের উপস্থিতিতে হস্তিনানগরের যে অপূর্ব শোভা হয়েছিল এখন আর সেই শোভা আর রইল না।
মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র বিদুরকে ডেকে বললেন, “হে বিদুর, পাণ্ডু ও মাদ্রীর সৎকার এবং সমস্ত শ্রাদ্ধকর্ম যেন সুন্দরভাবে অনুষ্ঠিত হয় তার আয়োজন করো।”
ধৃতরাষ্ট্রের আদেশ অনুযায়ী বিদুর মহামতি ভীষ্মকে নিয়ে অতি পবিত্র স্থানে মহারাজ পাণ্ডু ও রানি মাদ্রীর দেহ-সৎকার করলেন। সৎকারের পর সকল কৌরব রাজপুরুষ ও রমণীরা শোকে বিহ্বল হলেন। পাণ্ডুপুত্রেরা শোকে অস্থির হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়লেন। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র নির্বিশেষে সকল নাগরিক এবং পুরবাসী দশদিন শোকসাগরে মগ্ন রইলেন।
দশদিন পর বেদের বিধান অনুযায়ী রাজা ধৃতরাষ্ট্র ও মহামতি ভীষ্ম পাণ্ডুর শ্রাদ্ধকর্ম সম্পন্ন করলেন। তাঁরা হাজার হাজার ব্রাহ্মণকে ও জ্ঞাতিদেরকে অন্নদান করলেন। প্রধান প্রধান ব্রাহ্মণদের প্রচুর রত্ন এবং অনেক সম্পন্ন গ্রাম দান করলেন। অশৌচ অন্তে কুন্তী এবং পাণ্ডুপুত্রদের হস্তিনানগরে নিয়ে এলেন।

সত্যবতীর বাণপ্রস্থ


মহারাজ পাণ্ডুর শ্রাদ্ধকর্ম শেষ হওয়ার পরেও নিজের জননী সত্যবতীকে শোকাচ্ছন্ন দেখে মহর্ষি বেদব্যাস বললেন, “হে মাতঃ, সময় দিন দিন নিদারুণ হয়ে উঠছে। এখন সুখের লেশমাত্র আর নেই, পাপের বৃদ্ধি হয়েই চলেছে। পৃথিবী শস্যশূন্য এবং ফলহীনা হয়ে উঠছে। কালক্রমে লোকেরা মায়াজালে আরও জড়িয়ে যাবে এবং নানান দোষে দোষী হয়ে উঠবে। সকলেই নানান কুকর্ম ও অনাচারে লিপ্ত হবে। ধর্ম লোপ পেতে থাকবে। কুরুবংশের ভাগ্যশ্রী তাদের ত্যাগ করবেন। কিছুদিনের মধ্যেই তারা সকলেই সবংশে মৃত্যুর কবলে পড়বে। অতএব আপনি নিজের চোখে নিজের সন্তানদের ধ্বংস হতে দেখার আগেই বনে চলে যান, সেখানে যোগসাধন করুন।”
সত্যবতী অন্তঃপুরে গিয়ে পুত্রবধূ অম্বিকাকে বললেন, “অম্বিকে, শুনলাম তোমার নাতিদের দৌরাত্ম্যে অল্পদিনের মধ্যেই আমাদের বংশ ধ্বংস হয়ে যাবে। তোমার যদি মত হয় তাহলে অম্বালিকাকে নিয়ে চলো আমরা বনে চলে যাই।”
এই কথা শুনে দুই পুত্রবধূ, “যে আজ্ঞা” বলে শাশুড়িমাতার সঙ্গে বনে চলে গেলেন। সেখানে অনেকদিন কঠোর তপস্যা করতে করতে তাঁরা দেহত্যাগ করলেন।

(চলবে)

কৃতজ্ঞতাঃ মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহের মূল মহাভারতের বঙ্গানুবাদ, প্রকাশকঃ বসুমতী সাহিত্য মন্দির।

অঙ্কনশিল্পীঃ দীপিকা মজুমদার

No comments:

Post a Comment