অতীতের আয়নাঃ ময়ূরবন মুরৈনাঃ অভীক মুখোপাধ্যায়




ময়ূরবন অর্থাৎ ময়ূরদের বন, যা আজ মুরৈনা হিসাবে পরিচিত। যেখানে কিছুদিন আগে অবধিও গুঞ্জরিত হত বন্দুকের শব্দ, সেই স্থানই এককালে মুখরিত হত ময়ূরের কেকায় এবং বাসুদেব কৃষ্ণের বাঁশির সুরে। লোকমানসে তাঁর স্মৃতি বাঁশির সুরে এবং তাঁর প্রিয় ময়ূরের রূপে এমনভাবে পাকাপাকি জায়গা করে নিতে পেরেছে যে এই অঞ্চলে ময়ূরের শিকার করা অক্ষম্য অপরাধ, সনাতন হিন্দুধর্মে গোহত্যার মতই ঘৃণ্য। হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবেই কখনও না কখনও ভগবান কৃষ্ণ এখানে তাঁর ঘোষযাত্রায় অবশ্যই এসেছিলেন, যেভাবে আজও রাজস্থানে যান ওঁর কর্মবংশজ পশুপালকের দল। কত স্নেহধন্যতায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল এই ভূমি তাঁর শিশু চরণের স্পর্শে, অথচ তখনও তিনি এই সংবাদে সূচিত হননি যে পাশেই অবস্থান করছেন তাঁর বাস্তবিক জনক বসুদেবের ভগিনী, তাঁর পিতৃস্বসা ‘পৃথা’, যিনি পুরাণেতিহাসে তাঁর পালক-পিতা কুন্তিভোজের নামানুসারে ‘কুন্তি’ রূপেই অধিক পরিচিত।
এই ভূমিই হল মহাভারতের সেই অভাগা এবং চিরদুঃখী পাত্র কর্ণের জন্মভূমি যা আজ ‘কুতবার’ নামে বহুল প্রচারিত এবং সেই স্থানও চিহ্নিত ‘কর্ণখার’ নামে যা সেই অবোধ, কুমারী মাতাকে স্বহস্তে ভাসিয়ে দিতে দেখেছিল জন্ম হতে কবচ-কুণ্ডলধারী পুত্রকে অশ্বিন নদীর স্রোতে। সেই অশ্বিন নদীও আজ ‘আসন’ নামে অধিক পরিচিত।
তারপর কৃষ্ণ টেনে গেলেন নিজের শূরসেন/শৌরসেনী জনপদের গোচারণ ক্ষেত্রের এক সীমানা, যা আজ প্রসিদ্ধ ‘গোহদ’ নামে। তবে কৃষ্ণের সঙ্গে এই ভূমির সম্পর্ক কিন্তু কেবল গরু চরানো বা গোপালনেরই নয়। তিনি শিখিয়েছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কীভাবে লড়তে হয়। কৃষ্ণ এখানকার বাসিন্দাদের রক্তদীক্ষিত করেছিলেন তাঁর নারায়ণী সেনায় এবং তাঁর স্কন্ধাবার স্থাপিত হয়েছিল চর্মণ্বতী নদীর দুরূহ উপত্যকার বুকে, যাকে আজ বলা হয় ‘চম্বল কি ডাং’।
সেই যুগে কালযবনকে এই উপত্যকার গোলোকধাঁধায় ফাঁসিয়ে তার অন্তিম সৈন্য অবধি নষ্ট করে ‘রণছোড়’ নীতি গ্রহণ করে আপাতদৃষ্টিতে যুদ্ধ থেকে পলায়ন করে তাঁকে ধোলপুরের কাছে মুচকুন্দ ঋষি দ্বারা নিধন করিয়ে যুদ্ধনীতির অদ্ভুত শিক্ষা আমাদের দিয়েছেন কৃষ্ণ বাসুদেব। একটি সারই সত্য হয়েছে সেখানে – প্রশ্ন যখন দেশ এবং সংস্কৃতির হবে তখন যুদ্ধের এক এবং একমাত্র লক্ষ্য হবে বিজয়লাভ। তারপর যখন নারায়ণী সেনার অংশ ওই সকল গোপালক এবং আভীর যোদ্ধাগণ ধর্ম মার্গ থেকে বিচ্যুত হল তখন কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে নির্মোহী কৃষ্ণ তাদের ধ্বংস করিয়ে দিলেন, আর আমাদের শেখালেন ‘ধর্ম’ কী। সান্ত্বনা স্বরূপ আমাদের হাতে তুলে দিলেন মানবতার এক অমূল্য সম্পদ – ‘গীতা’।
কিন্তু এখানকার মাটি ধরে রাখতে পেরেছে কেবলমাত্র কৃষ্ণের বাল্যকালের স্মৃতিকে। তাঁর যোদ্ধা এবং রাজনৈতিক চরিত্রকে অনুধাবন করা যায় না মুরৈনার ভূমি থেকে। আমাদের কাছে অবশ্য সেই কৃষ্ণও বড়ো প্রিয় - ছোট্ট, নিষ্পাপ, প্রাঞ্জল কৃষ্ণ।
আজও, হ্যাঁ, আজও পূর্ণ সমারোহে উৎসবময়ভাবে স্বাগত জানানো হয় ভগবান কৃষ্ণকে, দুই দিন ব্যাপী ‘লীলামেলা’র রূপে দীপাবলির সময় মুরৈনার এই গ্রাম হয়ে ওঠে ৩,৫০০ বছর পুরনো ময়ূরবন।
অনুষ্ঠানের ক্রম সমাপ্ত হলে এলাকাবাসীর প্রিয় কানহা বিদায় নিয়ে চলে যান দ্বারকার উদ্দেশ্যে দ্বারকাধীশ হতে। নিজের বালরূপ এবং বাল্যকালের স্মৃতি মুরৈনা/মোরেনার অধিবাসীদের মনে জলছাপের মতো ফেলে রেখে পরের বছর আবার ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান দামোদর।
বিয়োগের বোঝা বুকে নিয়ে, চক্ষে নিয়ে অশ্রু যেন কত শত বঁধু-বধূ খুঁজে ফেরে তাঁর পদচিহ্ন; সুখ সাহচর্যের স্মৃতি মনে ধারণ করে দিগন্তে উড্ডীয়মান পক্ষীমধ্যে তাঁর প্রেমাবয়ব কল্পনাচিত্রিত করে নিরন্তর রোমন্থন করে বরনারী। বলে – কোথায় তুমি? হা কৃষ্ণ... হা কৃষ্ণ!
ময়ূরবন আজ মুরৈনা।
মহাভারতের পর বহু বহু সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। কত রাজবংশের পত্তন এবং পতন ঘটেছে। ব্রজের এই ক্ষেত্র মানবে পরিপূর্ণ হয়েছে এবং উজাড় হয়ে গেছে বারংবার। কিন্তু কৃষ্ণ এই অঞ্চলে যে সামরিক গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন তা কখনও ম্লান হয়নি।
এই কারণেই গোপাঞ্চল পর্বত সাক্ষী হয়ে আছে মৌর্য হতে গুপ্ত সৈন্যদলের স্কন্ধাবারের এবং তাঁদের সৈনিক অভিযানের।
সম্ভবত এই কারণেই সম্রাট অশোক নিজের রাজাদেশ অঙ্কিত করিয়েছিলেন আরও একটি স্তম্ভলেখ এবং তাকে রোপণ করেছিলেন দাতিয়ার কাছেই গুর্জরা গ্রামের মাটিতে।
গুপ্তবংশ প্রায় এই স্থানকে নিজেদের দ্বিতীয় রাজধানীর মর্যাদা প্রদান করেছিলেন এবং তাঁদের এই রাজধানী ক্ষেত্রের নামকরণ করেছিলেন ‘দ্বিতীয়া’, যা কালক্রমে ‘দাতিয়া’ হয়েছে, (দ্বিতীয়া > দাতিয়া)। অবশ্য বুন্দেলকালখণ্ডে এই স্থান আরও একটি নাম পেয়েছিল, দিলীপনগর। কিন্তু প্রাচীন নামের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়েছে।
তবে কেবলমাত্র সামরিক দৃষ্টিভঙ্গী দিয়েই এই স্থানের বিচার করলে অন্যায় হবে। মৌর্য এবং গুপ্ত শাসনের সাংস্কৃতিক বৈভব, বিশেষত স্থাপত্যশিল্প এবং কলার কেন্দ্র হিসাবেও মুরৈনার গুরুত্ব অপরিসীম। মৌর্যকালীন, মৌর্যোত্তরকালীন এবং গুপ্তকালীন মূর্তির প্রাচুর্য আমাদের জানায় যে কোন কোন প্রকারের স্থাপত্যের অনুপম উদাহরণ তাঁরা স্থাপন করে গেছেন, যার অনেকটা সময়ের ধারায় বিলীন হয়ে গেছে কিংবা কিছুটা আজও আমাদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে চলেছে।
নাগদের অশ্বমেধ দেখেছিল এই ভূমি।
গোপাদ্রি হতে বিতাড়িত হস্তীকুলের করুণ চিৎকারে মনোরঞ্জন অনুসন্ধানে রত মিহিরকুলের রূপে হূণ জাতির ক্রূরতা সহ্য করেছে।
হূণদের অস্তিত্ব নিঃশেষিত হলে এলেন উজ্জয়নীর রঘু বংশজ সূর্যবংশী প্রতিহার। বীরত্ব এবং শৌর্যের সঙ্গে ধার্মিক চেতনা মুখরিত হয়ে উঠল। কৃষ্ণের বংশীর সুরের পাশে বাতাসে হুঙ্কার উঠল ‘হর হর মহাদেও!’ কিন্তু কোনও সংঘর্ষ স্থান পেল না, যেমন ‘ণমোকার’-র জৈন মন্ত্রের গুঞ্জরনেও হয়নি। তখনও হয়নি, যখন ভারতের বৌদ্ধ, জৈন, শৈব এবং বৈষ্ণবরা শাস্ত্রার্থে নিজেদের শিখা নাচাচ্ছিলেন এবং চোল রাজা জৈন ও বৈষ্ণবদের নিজের রাজ্য হতে বিতাড়িত করছিলেন।
এখানকার রাজারা যেন এক হাতে খড়্গ এবং অন্য হাতে রোটিকা নিয়ে দণ্ডায়মান হয়ে ছিলেন যাতে ক্ষেত্রে হলধর কৃষক নির্বিঘ্নে লাঙল চালাতে পারে, ব্রাহ্মণেরা যজ্ঞশালায় নিরাপদে যজ্ঞ সম্পন্ন করতে পারেন এবং ভারতের শ্রদ্ধা বিশ্বকর্মার পুত্রেরা পাথরের বুকে অঙ্কিত করতে পারেন কলার অঞ্চল। এমনি একটি স্মারক আছে গোপাদ্রি পর্বতে।
ঐসলামিক ঝঞ্ঝাকে রোধ করে তাকে সিন্ধু প্রদেশে ঠেলে দেওয়া প্রতিহার সম্রাটদের বিজয় প্রতীক এবং দ্রাবিড় শৈলীর একমাত্র মন্দির হল তৈলঙ্গ মন্দির, যাকে এখন বলা হয়ে থাকে ‘তেলী কা মন্দির’, যা প্রতিহারদের বিজয়স্তম্ভকে দেখে আসছে কোন পুরাকাল হতেই।
তবে আবারও আমরা ফিরে আসব মুরৈনায়, কারণ মন আমাদের ময়ূর হয়ে ময়ূরবনে ফিরে ফিরে আসে। গোপাঞ্চলের বিস্তৃত বিবরণ অন্য কোথাও, অন্য কোনওখানে হবে’খন।
সেই মুরৈনায়, যেখানে যশস্বী প্রতিহারেরা দিয়ে গেছেন স্থাপত্যের অদ্ভুত উপহার, যার গৌরবমণ্ডিত নিদর্শন আজও ধৈর্যের সঙ্গে নিজের সৌন্দর্য বিজ্ঞাপন এবং স্থাপত্যের প্রেমী এবং গুণগ্রাহীদের জন্য অপেক্ষা করছে বলে প্রতীত হয়।
এর মধ্যে একটি হল পড়াবলীতে স্থিত মন্দিররাজি, যা নিজের আরাধ্য দেবতা ভূতেশ্বর শিবের নামানুসারে পরিচিত হয়েছে ‘বটেসর’ রূপে। শিবকে সমর্পিত এই সকল মন্দিররাজির সাধারণত্বের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এদের অসাধারাণত্ব। কিন্তু একই স্থানে দুইশত মন্দিরের নির্মাণ? এ কি কোনও অনন্ত কীর্তিলাভের প্রয়াস, নাকি অটল শ্রদ্ধা? কীরূপ মানদণ্ডে বিচার করা হবে?
সময়চক্র ঘুরল। ভারতের দ্বাররক্ষক প্রতিহারদের সৌভাগ্য-সূর্য অস্তাচলে গেল এবং তখন গজনির সুলতান মামুদের বিরুদ্ধে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে নিজের যশস্বী পূর্বজদের কীর্তিকে কালিমালিপ্ত করতে রাজ্যপাল প্রতিহারকে দণ্ডিত করে ও নাগদের এই ক্ষেত্র হতে উচ্ছেদ করে দিয়ে অর্জুন কচ্ছপঘাতের নেতৃত্বে আগত কচ্ছপঘাতদের কেন্দ্র হয়ে উঠল ‘সিংহপাণি’ নগর, যা আজ পরিচিত ‘সিংহোনিয়া’ নামে।
কেই বা জানত এই কচ্ছপঘাত বংশের একজন আগামীপুরুষ রাজপুত কক্ষপথ হতে বিচ্যুত হয়ে আকবরের দাসত্ব স্বীকার করে নিয়ে আমেরের রাজবংশকে তাঁর অধীনস্থ করবে? তবে এই ক্ষেত্রটিকে তিনিও নিজের মতো করে সুসজ্জিত করেছিলেন, যার প্রমাণ আজও বিদ্যমান – মিতাবলিস্থিত চৌষট্টি যোগিনী মন্দির।
এর একমাত্র যমজ জবলপুরে অবস্থিত। এই মন্দিরকে দেখেই লুটিয়েন অধুনা নিউ দিল্লিতে নির্মাণ করেছিলেন বিধানভবনের স্থাপত্য, যা পরবর্তীকালে ভারতের সংসদভবন রূপে পরিচিতি পায় - ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রতীক।
শৈব তন্ত্র এবং তান্ত্রিকদের এই গড় ভারতীয় স্থাপত্যের বিভিন্নতাকে তো প্রদর্শিত করে, কিন্তু না জানি কেন এর দৃশ্য অবলোকনে মনে ভীতির জন্ম হয়, যেন এই ব্রহ্মাণ্ডে এই গড়ই আমাদের একাকীত্বের প্রতীক। অথবা তন্ত্র এবং তান্ত্রিকদের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে কোনও এক অনন্তকাল হতে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা যেন এই স্থানের সঙ্গে জুতে আছে।
যাই হোক, এই অঞ্চল আমাদের এবং আমাদের দেশের ধরোহর, গৌরব, যা ভারতীয় লোকতন্ত্রের প্রতীককে উৎকীর্ণ করে তুলতে নিজের অসামান্য যোগদান প্রদর্শন করেছে এবং যা আজও দণ্ডায়মান এক অদ্ভুত ভারসাম্যতা নিয়ে যেখানে আগে হত প্রেতসাধনা, তন্ত্রসাধনা।
সময় থেমে থাকেনি। ময়ূরবনের ময়ূরেরা দেখেছে গোপাদ্রির দুর্ভেদ্য দুর্গের নির্মাণ। প্রথমে সুরজ সেনের দ্বারা এবং পরে অন্য রাজারা তার দায়িত্ব হাতে নিলেন। ক্রমশ তার বিস্তার ঘটল এবং নাম হল পূর্বের জিব্রাল্টার।
এভাবেই কচ্ছপঘাতেরা নিশ্চিত পদ্ধতিতে কৃষ্ণ দ্বারা চিহ্নিত সামরিক শিখর গোপাদ্রিকে দুর্গ রূপে বিস্তার করলেন। সৈন্যকেন্দ্র রূপে তাঁদের মন নিজেদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সিংহোনিয়াতেই পড়ে থাকত, যার বিশাল প্রকোষ্ঠ দ্বারা সুরক্ষিত ছিল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং যার ভগ্নাবশেষ আজও ‘হস্তীদ্বার’ রূপে বিরাজ করছে।
এই অঞ্চলে ধনসম্পদের অভাব কোনও কালে ছিল না। তবে আজ আছে। ‘তৈল সিঞ্চিত ক্ষেত্র’ রূপে চিহ্নিত এই অঞ্চলে ‘কোলহু’ নামে একরকমের পাথরে ভরা এলাকা থেকে তৈল উত্তোলিত হয়ে থাকে। তাই এখানকার অনেক গ্রাম এবং বস্তিকে ‘কোলুয়া’ও বলা হয়। এই অতুলনীয় সম্পদ থাকার কারণেই পরশপাথরের কিংবদন্তি জন্ম নিয়েছিল, যার স্পর্শে লোহাও সোনা হয়ে যায়।
কচ্ছপঘাতেরা এই অতুল্য সম্পদের সদ্ব্যবহার করেছিল। স্থাপত্যের নতুন নতুন প্রতিমান স্থাপিত হল। কেবল শৈব এবং বৈষ্ণব মন্দিরই নয়, জৈনদের জিনালয় এবং রম্য মূর্তির রূপেও ঘটল তার বহিঃপ্রকাশ। এগুলির মধ্যে একটি তো আজও জৈনদের অবিচল আস্থার কেন্দ্র রূপে সিংহোনিয়ার ভূমিকে গৌরবান্বিত করে চলেছে।
একাদশ শতকে তখন সুবর্ণকাল চলছে। নিজ আরাধ্যের প্রতি ভক্তির সাত্ত্বিক আবেশে কচ্ছপঘাত রাজা কীর্তিরাজের অভিমানিনী রানি ককনাবতী প্রতিজ্ঞা করলেন যে, যতক্ষণ অবধি না তাঁর ইষ্টদেব শিবরাজার জন্য পৃথক মন্দির নির্মিত হচ্ছে, তিনি অন্নগ্রহণ করবেন না।
অন্ন নাহয় না-ই গ্রহণ করলেন। দুধ আছে, ফল আছে। কিন্তু দুধ, ফল খেয়ে রানি কতদিন থাকবেন?
পত্নীপ্রেমে চিন্তিত রাজন সকল শিল্পীদের কাজে লাগিয়ে দিলেন। সেইসময়ে প্রচলিত ছিল নাগর শিল্পশৈলী। কিন্তু সেই রীতি মেনে মন্দির তৈরি করতে তো বহুবছর সময় লাগার কথা। তবে কী উপায়?
তখনই এক অজ্ঞাত, অনামা শিল্পীর ছেনি-হাতুড়িতে জন্ম নিল শিল্পকলার এক অদ্ভুত চমৎকার। আধুনিক অভিযন্তারাও সেই ইন্দ্রজাল দেখাতে অক্ষম হবেন বলেই মনে হয়। বাস্তুশিল্পের ক্ষেত্রে গড়ে উঠল এক নতুন ইতিহাস। ককনমঠ।
চন্দেলদের খর্জূরবাহোর উদ্দামকলায় অলঙ্কৃত নাগরশৈলীতে এই মন্দিরের নির্মাণ আরম্ভ করা হলেও সময়াভাব এবং নির্মাণে শীঘ্রতা সম্পন্ন করার চাপে স্তম্ভ এবং কিছু ভাগে অলঙ্কৃত করার পরে কয়েক মন অখণ্ড, কুমারী পাথরের মাধ্যমেই স্থিত হল ভারসাম্য এবং প্রতি-ভারসাম্য। পাথরকে জমিয়ে রাখার জন্য মশলা কী দিয়ে তৈরি হয়েছিল পড়বেন? উড়দ কি ডাল, বা মাষকলাই।
দিনেরাতে নিরন্তর কাজ চলল এবং ১১৫ মিটার উচ্চ, সুন্দর মন্দির মাথা তুলে দাঁড়াল মাত্র ছয়মাস সময়কালের মধ্যে। আর এভাবেই লোকমানসে জন্ম নিল এক কিংবদন্তিঃ প্রেতের দল ছয়মাসের একটি রাত বানিয়ে ককনমঠ মন্দিরের নির্মাণ করেছে।
মন্দিরে শিবের অধিষ্ঠান হল। দেখুন, মন্দির হল শিবের অথচ রানির নামে মন্দিরের নাম হল ককনমঠ। আর মন্দিরের অনামী শিল্পীর মুখে খেলা করল মৃদু হাসি, যা ইতিহাসের পাতায় কোথাও, কখনও লেখা হয়নি বা হবেও না। কিন্তু সেই অনামী শিল্পীর মৃদু হাসি আজও বক্র হয়ে এবড়োখেবড়ো, জড় পাথরের রূপ নিয়ে ইতিহাসের কীর্তিমান কীর্তিরাজকে মুখ ভেঙিয়ে চলেছে।
সময় বদলেছে। মুহম্মদ ঘোরির হাতে চৌহানদের দুর্ভাগ্যপূর্ণ পরাজয়ের পর দিল্লি থেকে আগত তোমররা এই অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ল। আজ তাই একে ‘তোমরঘার’ও বলে। তোমররা নিজেদের রাজধানীর জন্য বেছে নিল গ্বোয়ালিয়রকে। সিংহোনিয়ার সৌভাগ্যসূর্য অস্তাচলে রওনা দিল। প্রাচীনকালের সেই বিশাল নগরী আজ ছোটো গ্রামে পরিণত হয়েছে।
১৫২৭ সালে খানওয়ার রাষ্ট্রীয় সংগ্রামের পরে ময়ূরবনের পশ্চিম অংশে বসবাসকারী সিকরবারেরা মোগলদের বিরুদ্ধে শাশ্বত সংঘর্ষের সংকল্প নিলেন এবং এই অঞ্চলের নাম হল ‘সিকরবারি’। তোমর এবং সিকবার, এই দুই রাজপুতকুলের মধ্যখানে ময়ূরবন যেন হয়ে উঠল এক সীমারেখা।
সংগঠিত এবং অসংগঠিত রূপে মোগলদের বিরুদ্ধে রাজপুত সংঘর্ষ বজায় থাকল। প্রতি জাতি, প্রতি বর্গ এই সংঘর্ষে নিজের নিজের ভূমিকা পালন করেছিল। শুধু তা-ই নয়, আজকের চম্বলভূমি নামে পরিচিত এই জমির দুর্গম খানাখন্দও যেন সাহায্য করেছিল সেই মোগল বিরোধী সংগ্রামে। পারেননি, কোনও মোগল ভারতেশ্বর এই এলাকা থেকে একটি দানাও আদায় করতে পারেননি। বুন্দেল, মরাঠা, রাজপুত, জাট, শিখ - সমগ্র ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল এবং জাতির ভারতবাসীরা আওরেঙজেবের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়ালেন এবং তাঁকে ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মুখে ফেললেন। মোগল শাহেনশাহ জিন্দাপীর তখন এই ককনমঠের মন্দিরের দিকে থাবা বাড়ালেন। কারণ? পরশপাথর। কিংবদন্তি যে মোগল বাদশাহের কানেও পশেছিল।
ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে পরশপাথর। কিন্তু পায় না।
ভারতেশ্বর ভাবলেন সোনা পাবেন। পেলেন না। ক্রোধ বর্ষিত হল মন্দিরের উপরে। ক্ষয়ক্ষতির বাকি কাজটা কালচক্র নিজের হাতে সম্পন্ন করেছে। আজ হয়তো আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইণ্ডিয়ার পক্ষ থেকে অনেক কিছু সংরক্ষিত করা হয়েছে। কিন্তু আজও এই কলামুক্তা আসমুদ্রহিমাচলে তেমন বিখ্যাত স্থান বলে চিহ্নিত হয়নি। এ যে বড়ো আক্ষেপের বিষয়!
ফিরে আসি ইতিহাসে।
ক্রমশ বুন্দেলরা এলেন। এলেন মরাঠা। অতপর ইংরেজ।
গেঁদালাল দীক্ষিতের মতো ক্রান্তিকারীরা এই ভূমির পুত্র। তাঁরাই ভগীরথ হয়ে ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্টের স্বাধীনতার গঙ্গা এনেছিলেন। কিন্তু রক্তদেবতা মঙ্গলের কোপদৃষ্টি যে এখনও বাকিই ছিল। এই ভূমির ললাটে তখনও যে অনেক খুনে সময় দেখা অবশিষ্ট রয়ে গিয়েছিল। ‘বোলি অউর গোলি’র যুগ। দুর্দান্ত সব ‘বাগী’দের পদপ্রহারে কেঁপে উঠেছিল এই মাটির বুক।
বাস্তবে কিন্তু ‘চম্বলের দস্যু’ বলে কুখ্যাত হলেও এদের অধিকাংশই ছিল চরিত্রবান, সিদ্ধান্তবাদী এবং ভাগ্যাহতের দল। এদের ডাকু বলা চলে না। উচ্চবর্গের বা স্বজনের অত্যাচারে তিক্তবিরক্ত হয়ে অথবা প্রাণ বাঁচাতে তারা হাতিয়ার তুলে নিয়েছিল। আবার তাদের মধ্যেই কেউ কেউ হয়ে উঠেছিল দুর্জন, ক্রূর। পরে অবশ্য সঞ্চার-সাধনগুলির হস্তক্ষেপে, পুলিশ, প্রশাসন এবং সমাজবাদীদের বিভিন্ন নৈতিক এবং মানবিক পদক্ষেপে এই অঞ্চল বেহড়, বাগী, বন্দুকের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়।
কার্পাস তুলোকে ধুনে নেওয়ার জন্য মুরৈনার রেলওয়ে স্টেশনের খুব কাছেই তুলোধোনার মেশিন বা ‘পেঁচ’ বসানো হয়। এই থেকে এর নাম হয়ে যায় পেঁচমুরৈনা।
ন্যাশনাল হাইওয়ে ৩ এবং রেললাইন যাওয়ার ফলে মুরৈনার উন্নতি হয়েছে। ব্যাবসার জন্য বাজার আছে। চম্বল নহর বা খালের ফলেও এলাকা সমৃদ্ধ হয়েছে।
বহু পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু যা বদলায়নি, তা হল মুরৈনার আত্মায় অধিষ্ঠিত ময়ূরবন, যেখানে আজও ময়ূরদল নিজেদের নীললোহিত গ্রীবা তুলে নিজেদের কৃষ্ণকে খোঁজে এবং কেকাধ্বনিতে মুখর হয় বনপরিসর – কানহা কাঁহা?
_____

ছবিঃ আন্তর্জাল

1 comment:

  1. তোমার সব নন ফিকশন এর মত informative এবং সাবলীল.. ভালো লাগল

    ReplyDelete