গল্পঃ পরিশোধঃ প্রতীক কুমার মুখার্জি




স্যারের বাড়িতে থাকার সময় থেকেই মেঘ ডাকার গুরুগম্ভীর শব্দে বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, ভীষণ ভারী একটা রোলার আকাশময় টেনে বেড়াচ্ছে কেউ। দিনের আলোর মতো চারদিক আলো করে চমকানো বিদ্যুৎ, পড়ায় মন বসাতে দিচ্ছিল না। প্রতিটি বিদ্যুচ্চমকের সাথে কান ফাটানো বাজের আওয়াজে চোখাচোখি হয়ে যাচ্ছিল ওদের।
ওদের মানে বিশাল, পল্লব, বিপ্র আর সুব্রত। প্রত্যেকের মুখের নীরব অভিব্যক্তিতে একই আশঙ্কা - আজ ভালোয় ভালোয় বাড়ি ফিরতে পারলে হয়! কিন্তু স্যার আজ যেন থামার নামই করছেন না। মডিউলার জেনেটিক্স-এর রিসার্চার, পড়াতে পড়াতে কোনওদিকে খেয়াল নেই। বাইরের দামাল আবহাওয়ার আস্ফালনেও ভাবলেশহীন, তিনি ডুবে আছেন ডি.এন.এ স্ট্রাকচারের ত্রিমাত্রিক গলিঘুঁজিতে।
অবশ্য এরকমই তো হবার কথা। ডঃ অশোক রায়ের মতো সুনিপুণ শিক্ষক, আত্মভোলা স্কলার আজকালকার দিনে হাতেগোনা। ওঁর মতো প্রফেসর এ-তল্লাটে কেন, আশেপাশের জেলাতেও পাওয়া যাবে না। ছাত্ররা মাথা কোটে স্যারের কাছে পড়ার জন্য, কত দূর দূর থেকে ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে। এই যে চার বন্ধুর কথা বললাম, ওদের বাড়িও কি এখানে! সেই শিলিগুড়ি থেকে সপ্তাহে দু’দিন মালবাজারের ক্যাল্টেক্স মোড়ে স্যারের বাড়িতে পড়তে আসে কলেজ সেরে। শিলিগুড়িতে একই পাড়ার বাসিন্দা। সেই ক্লাস ফাইভ থেকে ওদের বন্ধুত্ব। একসাথে বড়ো হতে হতে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে আজ ওরা মালবাজার কলেজের ছাত্র। প্রত্যেকেই মাইক্রোবায়োলজি ফার্স্ট ইয়ার।
শিলিগুড়ি শহরের গিজগিজে ভিড়, যানবাহনের জগঝম্প, সংকীর্ণ রাস্তাঘাটে গলা টিপে ধরতে আসা ট্রাফিক জ্যামের কবল এড়িয়ে মালবাজারে কলেজ করতে পেরে বিপ্ররা বেজায় খুশি। দম বন্ধ করা শহর থেকে মাত্র এক-দেড় ঘন্টায় সবুজে সবুজ ডুয়ার্সে পালিয়ে আসতে পারলে ওরা বেচে যায়। ভাবে, মাত্র আশি কিলোমিটারের ব্যবধানে কীভাবে ইট-কাঠ-পাথরের জঙ্গল বদলে যায় নীল পাহাড়ে সাজানো সবুজের বিস্ফোরণে! ধবধবে সাদা চলমান ফিতের মতো গতিময় পাহাড়ি ঝরনা, বুদ্ধদেবের মাথার চুলের প্যাটার্নে সাজানো চা বাগানে চোখের সামনে বদলে যায় অপরূপ পিকচার পোস্টকার্ডে। প্রতিটা স্টেশনের নাম যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে; বুকের ভিতর তালে তালে বেজে ওঠে ধামসা-মাদলের তাল। গুলমা, সেবক, বাগরাকোট, ওদলাবাড়ি, ডামডিম হয়ে মালবাজার। ট্রেন বা বাসের জানালা দিয়ে হাত বাড়ালেই জঙ্গল। আকছার ময়ূর, হরিণ, এমনকি ভাগ্য খুব সহায় থাকলে বাইসন বা মহাকালবাবার পিঠের ঝলক উত্তেজনার পারদ বাড়ায়। উত্তরবঙ্গ সংলগ্ন তরাইয়ের মানুষ হাতিকে শিবঠাকুর বা মহাকালবাবা রূপে পূজো করে। তাই দেখা মিললেই প্রণামের হিড়িক পড়ে যায়।
ঘটাং ঘটাং শব্দে পেরিয়ে যাওয়া মহানন্দা, নেওড়া, ডায়না, তিস্তার মতো নদী - প্রতিটা ফ্রেম যেন উপরওয়ালার নিপুণ তুলির টান। কী করে সম্ভব এই অপার্থিব অথচ ঘোর বাস্তবের ক্যানভাস? এই যাত্রাপথ আর ডুয়ার্সের  হাতছানি যেন তাদের মন ও মগজের রসদ, রোজকার ক্লান্তিকর ছাত্রজীবনে এক ছটাক রিলিফ।

কিন্তু আজ ওদের কপালে কী আছে কে জানে। ঘন কালো মেঘ আর বিদ্যুতের ঝলকানির সাথে এবার ঝড়ো ঠাণ্ডা হাওয়া শুরু হতেই বরাবরের সাবধানী পল্লব আর থাকতে পারল না। “স্যার, বাইরে ভীষণ ঝড়বৃষ্টি। আপনি একটু আগে ছাড়লে, মানে, আমরা সাড়ে পাঁচটার শিলিগুড়ি ডি.এম.ইউ.-টা পেয়ে যাব। ছেড়ে দিন না স্যার।” যেন ডুকরে উঠেই আবার শামুকের খোলে ঢুকল সে।
তার মুখচোরা স্বভাবের বিরুদ্ধাচরণে বাকি তিন বন্ধু হতবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। অবশ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের হাতগুলো এদিক ওদিক ছড়ানো বইপত্র গোছাতে শুরু করেছে। পল্লবের প্রশ্নে স্যার যেন হঠাৎ করে সম্বিৎ ফিরে পেয়েই পড়া থামালেন। জানালার পর্দা সরিয়ে হাওয়ায় নুয়ে পড়া সুপারি, জারুল, দেবদারু, আর বিকেলের আকাশে অসময়ের অন্ধকার দেখে চমকেই উঠলেন। বটানির অতল থেকে যেন বাস্তবে ফিরলেন তিনি। “এক্ষুনি ঝড় উঠবে! আরে, উঠবে কী, উঠে গেছে! বলবে তো আমায়? আরে, তোমরা এতদূর ফিরবে কী করে? ট্রেনের কোনও ঠিকঠাক থাকবে না আজ। তোমাদের আমি এই অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারি না। এক কাজ করো, একতলার ক্লাসরুমটা খুলে পরিষ্কার করিয়ে দিচ্ছি, রাতে থেকে যাও। আমি বরং বাজার থেকে এক চক্কর দিয়ে আসি, সবাই মিলে আজ পিকনিক করব।”
“না, মানে স্যার, বাড়ি না ফিরলে…”
এরা আমতা আমতা করছে বুঝে স্যার বললেন, “আচ্ছা, বুঝেছি। এক কাজ করো, বাড়িতে ফোন করে দাও। দরকার হলে বলো, আমি তোমাদের বাড়ির বড়োদের সাথে কথা বলে নিচ্ছি। তোমাদের ম্যাডামও আজ বাপের বাড়ি গেলেন আলিপুরদুয়ার, আমিও একা। তার চেয়ে চলো সবাই মিলে খিচুড়ি বানাই। গল্পগুজব করে রাতটা কাটাই, কাল এক সাথেই কলেজ চলে যাব। ভালোই হবে, বিশালের ক্যামেরাটা স্টাডি করা যাবে। হট শট দিয়ে অনেকদিন হল, এবার ভাবছি একটা ডি.এস.এল.আর নেব। কিন্তু সাহস হয় না, বুঝলে কি না।”
বিশাল যারপরনাই আনন্দিত হয়ে বাকিদের মুখের দিকে তাকিয়েই একটু দমে গেল। একমাত্র বিপ্রই হাসিমুখে স্যারের বাড়িতে রাত্রিবাসের আশায় হাতের মোবাইলটা নাড়াচাড়া করতে লেগেছে, বাড়িতে ফোনটাই শুধু করা বাকি। কিন্তু বাকি দু’জনকে দেখে বিশাল নিজেই চুপসে গেল। সে ভালো করেই জানে সুব্রতর বাড়ির অবস্থা। তার বাবা গত হয়েছেন দু’বছর আগে। বাড়িতে শুধু মা আর ছোটো বোন। তার পক্ষে বাইরে রাত্রিবাস অসম্ভব।
আর বাকি থাকল পল্লব। ওর কথা আলাদা করে বলতে হবে। কারণ বেঁটেখাটো, ক্ষীণজীবী, ভীতু কিন্তু ওদের ভিতর সবচেয়ে মেধাবী ছেলেটার ব্যাপার ওদের থেকে একেবারেই আলাদা।

হাকিমপাড়ায় বিশালদের বিরাট বাড়ি। তাদের সবকিছুই দেখার মতো। তিনপুরুষ ধরে শিলিগুড়ির সবচেয়ে ওজনদার ব্যারিস্টাররা এই বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন। সুতরাং এই অবস্থাপন্ন পরিবারের শহর জুড়ে পরিচিতি। পল্লব হল এই বাড়ির আশ্রিত। তার নিজের বলতে কেউ নেই দুনিয়ায়।
এটা লোকে জানলেও বাড়ির কেউ তাকে বিশালের চেয়ে আলাদা ভাবে না। ছোটো থেকে বাবা-মায়ের স্নেহের পরশ পায়নি বলেই বোধহয় সে বেশ ভীতু। সে সাবধানী, স্বাবলম্বী, গোছানো ছেলে। বিশাল আর সে কলেজে একই ক্লাসে পড়লেও বড়োলোকের একমাত্র ছেলেটির অনেক দায়িত্ব সে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।
তাকে এঁরা বাড়ির ছেলের মতো বড়ো করছেন। বিশাল যা যা পায়, পল্লব কোনও অংশে কিছু কম পায় না। এই ভালোবাসার ভারে সে এতটাই আপ্লুত, মরমে মরে থাকে সে। বিশাল এটা জেনে তার পিছনেও লাগে অনেক সময়ে, আর পল্লব কেঁদে ফেললে তখন তাকে বুকে চেপে ধরে। সে জানে যে পল্লবের ভালোবাসা তাকে সবসময়ে ঘিরে আছে।
পল্লব অন্যের অনুগ্রহে পেয়ে বড়ো হচ্ছে বলে কি না জানা নেই, তার ভিতরে পরোপকারের নেশা। অর্থ, ক্ষমতা না থাকলেও সে গায়ে গতরে খেটে দেয় সবার বিপদে, সাথে ছায়ার মতো থাকে বিশাল।
বিশাল আবার জন্তুজানোয়ার-অন্ত প্রাণ। সে নিয়ম করে রাস্তার অন্তত তিরিশটা কুকুরকে খাওয়ায় রোজ। বড়ো বড়ো হাঁড়িতে চাল, ডাল, আলু আর মাংসের ছাট রান্না করে দুটো রিক্সায় বাড়ির কাজের লোকেরা রাস্তায় রোজ কুকুরদের খাইয়ে আসে। নিয়মিত তদারকে থাকে বিশাল। শুধু কুকুর নয়, বিড়াল, খরগোশ, নানারকমের পাখি, সাদা ইঁদুর, পায়রা, সবাই সযত্ন শুশ্রূষা পায় তার তত্ত্বাবধানে। কত অসুস্থ প্রাণী যে বিশালের অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রাণ ফিরে পেয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। পাড়ায় বেরোলেই যখন তার পোষ্যরা তাকে ঘিরে নিয়ে সাথে সাথে চলতে থাকে, তখন বিশালের চেয়েও বেশি বুক ফুলে ওঠে পল্লবের।
জন্তুজানোয়ার, পাখপাখালি, নদী, বনজঙ্গল, ঝরনা, পাহাড়ের ছবি তোলার তুমুল আগ্রহে বিশাল তার মামার কাছে ঝোলাঝুলি করে জন্মদিনে জব্বর একটা ক্যাননের ক্যামেরা হস্তগত করেছে। আর এই দু’মাস ধরে কলেজে আসার সময়ে ক্যামেরাটা সাথে নিয়ে যাতায়াত করছে। ইতিমধ্যেই প্রচুর ভালো ভালো ছবি সে তুলেছে, আর সেসব তার পরিচিতদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে।
ইতিমধ্যেই তার তিনটি ছবি উত্তরবঙ্গের একটি বহুল পরিচিত পত্রিকাতে স্থান পেয়েছে, সাথে মানুষের প্রশংসা। এর ফলে বিশালের মামা না চাইতেই একটি দামি লেন্স-সেট উপহার দিয়েছেন আনন্দের আতিশয্যে। অশোকস্যার কয়েকদিন ধরেই ক্যামেরাটার একটা টিউটোরিয়াল চাইছেন। আজও বোধহয় সেটা ওঁর ভাগ্যে নেই।
স্যারের বাড়িতে আজ পড়তে পড়তে একটা কথা ভাবছিল পল্লব। ঠিক যেভাবে তার মতো একজন অনাথ শিশুকে বুকে তুলে মানুষ করেছেন বিশালের বাবা-মা এবং বাড়ির লোকেরা, বিশালও একইভাবে মায়ামমতায় মুড়ে রেখেছে তার পুষ্যিদের - সেই জেনেটিক্সের জাদু! পল্লবের মনটা আবার খারাপ হয়ে যায়। সে ভাবতে চেষ্টা করে তার বাবা-মায়ের কথা। কিন্তু কিচ্ছু মনেই পড়ে না তার।
তারপর আবহাওয়া ক্রমশ খারাপ হতে থাকায় তার চিন্তা শুরু হয় কী করে সবাই মিলে আজ বাড়ি ফিরবে। ডুয়ার্সে এরকমটা প্রায়ই হতে থাকে। কিন্তু ওরা এতটা দেরি করে না অন্যদিন। ওরা কলেজ থেকে এসে স্যারের কাছে পড়ে বিকেল সাড়ে চারটের ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস ধরে বাড়ি ফেরে। কিন্তু আজ স্যারের এক্সট্রা ক্লাস আর মিটিং থাকায় অনেক দেরি হয়েছে।
আজও স্যার যখন বললেন তার বাড়িতে রাতে থেকে যেতে, বিশাল আর বিপ্র রাজি হলেও একমাত্র সুব্রতর কথা ভেবেই থাকতে রাজি হয়নি পল্লব। রাশভারী স্যারের সামনে খুব কুন্ঠিতভাবে সুব্রতর বাড়ির অবস্থাটা তুলে ধরল। স্যার সব শুনে কিচ্ছু বলতে পারলেন না। শুধু পল্লবকে কাছে ডেকে তার দুটো কাধ ধরে ঝাঁকিয়ে দিয়ে মাথার চুলগুলো ঘেঁটে দিয়ে বললেন, “তাহলে আয় বাবা। সাবধানে যাস, আর ফিরে একটা ফোন করিস।” তাঁরও গলাটাও ধরে এল।
নানা স্বরে চারটে ‘আসছি স্যার’-এর সাথে সাথেই চারজন দুদ্দাড় করে সিঁড়ি দিয়ে লাফাতে লাফাতে নেমে অসময়ের গোধূলিতে মিশে গেল। অশোকস্যারের হাতদুটো অজান্তেই এক বিশেষ মুদ্রায় কপাল ছুঁল। ঠোঁটদুটো নড়ে উঠল, “জয় মহাকালবাবা!”
নিচে নামতেই ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটার সাথে জলের কুচি ওদের স্বাগত জানাল। তখনও ঝড় পুরোদমে শুরু হয়নি সেটাই বাঁচোয়া। একছুটে বড়ো রাস্তায় এল চারজনে। রাস্তায় কমে আসা যানবাহনের ভিতর দাঁড়িয়ে থাকা মালবাজার যাওয়ার টাটা ম্যাজিকে উঠল ওরা। চালক বেশি ভাড়ার প্যাসেঞ্জার চাইছিল হয়তো, কিন্তু কলেজের ছাত্র দেখে আর জনবিরল রাস্তার দিকে তাকিয়ে হতাশ হয়ে সোজা গাড়ি স্টার্ট দিল। সাথে সাথেই মাথার উপর ঝুলে থাকা আকাশটা মাটি ছুঁল।
গাড়িতে বসেই প্রত্যেকে ঘড়ি, মোবাইল আর বিশাল তার ক্যামেরা ভালো করে প্লাস্টিকের কভারে মুড়ে ব্যাগে ঢোকাতে লাগল তড়িঘড়ি। এত জোরে নামল বৃষ্টি, ড্রাইভার রাস্তার পাশে গাড়িটা দাঁড় করাতে বাধ্য হল। ঘড়িতে তখন ঠিক পাঁচটা পঁচিশ। ফোন ঢোকাবার আগে ওরা নেটে জেনে নিয়েছে, যে শিলিগুড়ি ডি.এম.ইউ এখন আগের স্টেশন হাসিমারাই আসেনি। নিশ্চিন্ত হয়ে গাড়িতে বসে ডুয়ার্সের বর্ষা দেখতে লাগল চার বন্ধু।
মিনিট কুড়ি পরে ওরা মালবাজার স্টেশনে ঢুকে পড়ল।
ঝড় কিন্তু আর কিছুক্ষণ পরেই থামল। আকাশ এখনও ঘোলাটে, তবে আগেকার অসময়ের অন্ধকার এখন যেন অনেকটাই কেটে গেছে। একপশলা বর্ষণেই সবুজ ডুয়ার্স যেন স্নান করে উঠে অপরূপা। বিশাল ক্যামেরা বার করতে গেল। অর্ধেক বার করেও ফেলেছিল, কিন্তু তখনই লোহার রেল পেটানোর ঢং ঢং শব্দে বোঝা গেল ওদের ট্রেন মালবাজার স্টেশনে আসছে।
ওই আবহাওয়াতেও কোথা থেকে ছুটে আসতে লাগল মালবাজারের বিখ্যাত শিঙাড়াওয়ালারা। পলকে মালবাজার স্টেশনের একনম্বর প্ল্যাটফর্ম ভরে উঠল চা, কফি, ঝালমুড়ি ইত্যাদি আবহমান পসরায়। ওরা চারজন ওভার ব্রিজের দিকে এগোতে লাগল স্টেশনের ছাদ বেয়ে পড়া জমা জলের ছোটো ছোটো জলপ্রপাত এড়িয়ে।
এতক্ষণে পল্লব একটু শান্ত হল। চার বন্ধুতে দেরি হলেও বাড়ি ফিরতে পারবে। সুব্রতর দিকে তাকাতে সে পল্লবের দিকে তাকিয়ে হাসল। সে হাসিতে নির্ভরতা, সম্ভ্রম আর নিখাদ ভালোবাসা।
ট্রেন ফাঁকাই ছিল। অন্যদিন হলে হয়তো কলেজ আর অফিস ফেরত যাত্রীদের ভিড় থাকত। কিন্তু মোক্ষম সময়ে ঝড়বৃষ্টি নামায় অনেকে আটকে পড়েছে, তাই টেন মিস অনেকেরই। ওভার ব্রিজের সামনের কামরায় উঠে পড়ল ওরা। চারটে খালি সিটে মুখোমুখি বসে পড়ল চার বন্ধু। ক্লান্তিতে তাদের শরীর ভেঙে আসছে। বিপ্র কখন যেন সবার চোখ এড়িয়ে শিঙাড়া কিনেছিল। ব্যাগ থেকে হাসিমুখে সেগুলো বার করতেই পাশে এসে দাঁড়াল মজিদুলভাই। বালতিভর্তি জিভে জল আনা গরম ঘুগনিতে হাতা ডুবিয়ে চারটে শালপাতার প্লেটে বেড়ে, লঙ্কা-পেঁয়াজ আর ধনেপাতা মিশিয়ে সেটাকে আরও সুস্বাদু বানিয়ে ধরিয়ে দিল ওদের হাতে নীরবে। চল্লিশ টাকা বাড়িয়ে ধরতে একগাল হেসে ওদের আদাব জানিয়ে কামরা থেকে বেরিয়ে গেল সে। মজিদুল কথা না বলতে পারলেও ওর হাতের ঘুগনি কথা বলে, আর এটা ওদের রোজকার কোটা।
খাওয়াদাওয়া সেরে এক কাপ করে লেবু-চা খেয়ে চলন্ত ট্রেনের তালে দুলতে দুলতে ঝিমোতে লাগল বেচারিরা। শরীর আর দিচ্ছিল না।

ট্রেন যখন ডামডিম ঢোকার জন্য ব্রেক কষল, তখন বিশাল জেগে আছে পুরোপুরি। বাকিরা রীতিমতো নাক ডাকছে। বিশাল ব্যাগ থেকে ক্যামেরাটা বার করল। যাত্রাপথে হাজার ক্লান্ত হলেও সে ঘুমোয় না, পাছে কোনও বিরল ফ্রেম মিস হয়ে যায়। আজ তো সোনায় সোহাগা। স্নান করে ওঠা ডুয়ার্স, তারপর গোধূলি, আর সামনে এগিয়ে আসছে সেবক! লো লাইটে ওয়াটার এফেক্ট দিয়ে জঙ্গলের ছবি, সাথে পুরো লেন্স সেট - আজ ওকে পায় কে? একটা ফ্রেমও ছাড়বে না সে।
বিশাল একমনে ক্যামেরা আর তার লেন্সের সম্ভার খুলে বসল। তাড়াতাড়ি করতে হবে।
ট্রেন ওদলাবাড়ি ছাড়াল। এরপর বাগরাকোট ছাড়ালেই সেবক। তারপর তিস্তা পেরোলেই কু-ঝিক-ঝিক করে ট্রেন এগিয়ে চলবে ‘এলিফ্যান্ট করিডোর’-এর ভিতর দিয়ে, আর ওদের ঘিরে থাকবে রহস্যে ভরা সেবকের জঙ্গল!
কিন্তু বাগরাকোটে ট্রেন দাঁড়িয়ে পড়ল প্রায় সাত মিনিট। হয়তো উলটোমুখ থেকে কোনও ট্রেন আসবে। এই অংশটা সিঙ্গল লাইন।
বাগরাকোট ছাড়াতে আস্তে আস্তে ক্যামেরাটা গলায় ঝুলিয়ে দরজার দিকে পা টিপে টিপে এগোল বিশাল। বন্ধুদের কাউকে নিয়ে কোনও ঝামেলা নেই, কিন্তু পল্লবটা একবার জেগে উঠলেই ছবি তোলার দফারফা। চলন্ত ট্রেনের দরজায় দাঁড়ানোর বিপদ, সাবধানতা অবলম্বন ইত্যাদি নিয়ে এমন বিরক্ত করতে আরম্ভ করে দেবে, যে ছবি তোলার কোনও ইচ্ছেই থাকবে না আর। যদিও পল্লব তাকে একটা সেফটি বেল্ট কিনে দিয়েছে, তাও যে কেন এত চিন্তা করে তাকে নিয়ে ছেলেটা! ওর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে কী মনে করে স্লিং ব্যাগ থেকে বেল্টটা বার করে আনল বিশাল।
আজ ট্রেনে একেই লোকজন কম ছিল, বাগরাকোটে অনেক লোক নেমে গেছে, ওদের কামরাতেও মেরেকেটে সাত-আটজন। তারা স্থানীয় মানুষজন, রোজ তাদের যাতায়াত। তাই আশেপাশের পাহাড়, বনজঙ্গল, বন্যপ্রাণী তাদের রোজনামচা। বেশিরভাগ হয় ঘুমোচ্ছে, দুয়েকজন কানে হেডফোন গুঁজে হয় মোবাইল গেম, নয় সিনেমায় নিবিষ্ট। মোবাইল বার করে মুচকি হেসে সেটাকে আবার পকেটে ঢোকাল সে। নিয়ম মেনেই সিগনাল ফুড়ুৎ হয়েছে সেটার থেকে। সেফটি বেল্টটা বেঁধে, টুপিটা উলটো করে মাথায় পরে, ট্রেনের রড ধরে মাথা বার করতেই দেখা গেল ট্রেন বাঁক নিচ্ছে; সুন্দরী তিস্তার নীলচে সবুজ ধারাও দু’হাত বাড়িয়ে তৈরি। ঝড়বৃষ্টির পর আবহাওয়া ঠাণ্ডা হয়েছে, তাই তিস্তা রেল ব্রিজ পেরোবার সময় শিরশিরে জলো বাতাস হাড় কাঁপিয়ে দিয়ে গেল।
সেবক স্টেশনে ট্রেন দাঁড়াতে ছটফটানি শুরু হল বিশালের। দিনের আলো তাড়াতাড়ি মরে আসছে, তাই আরেকটু দেরি হলে ছবি তোলার আর কিছু থাকবে না যতই লো লাইট আর নাইট ভিশন থাকুক না কেন। তাকে নিশ্চিন্ত করে ঠিক একমিনিটের ভিতর ট্রেন ছেড়ে দিতে সে বাইরে মনঃসংযোগ করল। বন্ধুরা এখনও ঘুমোচ্ছে। ট্রেন ঝুক ঝুক শব্দে জঙ্গলের ভিতর ঢুকে পড়তেই ক্যামেরা বাগিয়ে ধরে দরজায় পজিশন নিল ছবি শিকারি।
সব ট্রেনই সেবকের জঙ্গলে ঢুকেই স্পীড কমিয়ে দেয় বনদফতরের নিয়মাবলী মেনে। আজও এমন ধীরগতিতে চলতে লাগল যে বিশালের মন আনন্দে নেচে উঠল। ফটোগ্রাফারের কাছে এর চেয়ে বেশি আর কী চাই? যা ফটো তুলবে সে আজ ভাবা যায় না - এটুকু ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ গতি নিল ট্রেন। হকচকিয়ে গেলেও ক্যামেরা বাগিয়ে ধরে ছবি তুলে যেতে লাগল বিশাল।
ট্রেন আরও দশ মিনিট এভাবে এগোতে এগোতেই একেবারেই দাঁড়িয়ে পড়ল হঠাৎ। দাঁড়াতেই তার দরজার আট-দশ ফুট দূরে লাইনের পাশেই ঝোপের ভিতর কী একটা নড়ে উঠল। লো লাইট ওয়াইল্ডলাইফ! ব্যাগ থেকে টেলিজুম লেন্স বার করে ক্যামেরায় লাগাতে যেতেই ব্যাপারটা ঘটে গেল। গোটা লেন্স সেটটাই হাত গলে ছিটকে পড়ল লাইনের পাশের ঝোপঝাড়ের ভিতর।
পাঁচ সেকেন্ড সময় লাগল বিশালের ব্যাপারটা বুঝে উঠতে। তারপর মরিয়া হয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হল তাকে। স্লিং ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে, সিকিউরিটি বেল্ট খুলে ফেলে, প্যান্ট গুটিয়ে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে একবার বন্ধুদের দিকে তাকাল সে। ওরা একইভাবে ঘুমোতে ব্যস্ত, তাকে দেখার মতো কেউ নেই। যদিও প্ল্যাটফর্ম ছাড়া এই ট্রেনে ওঠা দুষ্কর, ‘নেমে আগে লেন্সটা তো উদ্ধার করি, তারপর ওদের ডাকা যাবে, তখন গালাগাল দিলে দেবে’ ভেবেই ডি.এম.ইউ থেকে লাফ দিল বিশাল।
মাটিতে পড়ার সাথে সাথেই ডান পায়ের গোড়ালি বেয়ে উঠে আসা একটা অসহ্য ব্যথা তাকে জানাল যে বোল্ডারে তার পা মচকেছে। লাফানো আর পায়ের ব্যাথার ধাক্কাটুকু সামলাতে বোল্ডারের পাশের হালকা ঢালু ঝোপঝাড় ভরা জমিতে গড়িয়ে গেল বিশাল। দাঁতে দাঁত চেপে গোড়ালি চেপে ধরে অতিকষ্টে উঠে দাঁড়াল সে। লেন্সটা খুঁজেই তাকে ট্রেনে উঠতে হবে। আর এই পরিস্থিতিতে বন্ধুদের সাহায্য ছাড়া সেটা অসম্ভব। খোঁড়াতে খোঁড়াতে লেন্সটা খুঁজতে শুরু করল বিশাল। ভাগ্য সুপ্রসন্ন, চটজলদি লেন্সটা পেয়ে গেলো সে। সম্ভবত ডি.এম.ইউ-এর কামরা থেকে ঠিকরে পড়া উজ্জ্বল এল.ই.ডি লাইটের আলোয় ঝোপের ভিতরেই চকচক করছিল জিনিসটা। ওটা হাতে নিয়ে অসহনীয় ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে ট্রেনের দিকে পা বাড়াতেই সুতীব্র হুইসেলের আওয়াজ তাকে স্থাণুবৎ করে দিল। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে সে যখন তার ফুসফুসের যাবতীয় ক্ষমতা দিয়ে বন্ধুদের নাম ধরে ডাকতে শুরু করল, ততক্ষণে ডি.এম.ইউ প্যাসেঞ্জারের কামরাগুলো তার নাকের ডগা দিয়ে পিছলে বেরিয়ে যাচ্ছে। ঘটনার আকস্মিকতায় সে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখান থেকে এক পাও নড়তে পারেনি। ট্রেনের পিছনের লাল চোখের মতো আলোটাও যেন তাকে বিদ্রূপ করতে করতে সেবকের ঘন জঙ্গলের ভিতর মিলিয়ে গেল!
বিশাল কিছুক্ষণ অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে লাইনের পাশে বসে পড়ল। লেন্সের দামি সেটটা আবার ছিটকে পড়ল হাত থেকে। সে ঘুরে তাকালও না সেদিকে। তার মাথাটা ঘুরে উঠল। বমি উঠে এল পেট গুলিয়ে। সে রীতিমতো লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। ট্রেনের ধাতব শব্দটা মিলিয়ে যেতেই ফিরে এল কান জ্বালানো ঝিঁঝিঁর ডাক, নিশ্ছিদ্র অন্ধকার আর জঙ্গলের আদিমতার সাথে জঙ্গুলে বুনো গন্ধ। বিশালের হতাশা অনর্গল কান্না হয়ে ঝরে পড়তে লাগল। এভাবে সে মরে যাবে? সকলের অগোচরে?
নিকষ কালো জঙ্গলটা তার চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসতেই ভয়ে শিউরে উঠল সে। খুব কাছ থেকে তার ঠিক ডানদিক থেকে শিয়ালের ডাক। বিশাল যেন মানসচক্ষে দেখতে পেল তাদের নড়াচড়া। তাদের জ্বলন্ত চোখগুলো যেন অপ্রত্যাশিত অতিথি সৎকারের আশায় লালায়িত।
ওয়াইল্ডলাইফ? কাঁদতে কাঁদতে হেসে ফেলল বিশাল। নাকি উলটোটা? জানার বা ভাবার অবস্থায় নেই সে। পকেট হাতড়ে ফোনটা বার করতেই কুচি কুচি টুকরো কাচে হাত লাগল তার। স্ক্রিন গার্ডটা ভেঙে ফেলেছে সে। তবে ফোনটা কাজ করছে। অন্তত টর্চের কাজটা চলবে মনে করেই এই অবস্থাতেও পুলকিত বিশাল। এ যেন মগ হাতে সমুদ্রে নামা।

কিছুক্ষণ এইভাবে থাকার পর মনে একটা চিন্তা এল। আচ্ছা, এইভাবে হাল ছাড়ার তো কোনও মানেই হয় না। সে জঙ্গল ভালোবাসে। হয়তো সেইজন্যেই সে এভাবে জঙ্গলের মুখোমুখি হল। হাজারবার মানুষ নানান জঙ্গলে সাফারি করতে পারে, কিন্তু একা অন্ধকারে ঘন জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়ার স্বাদ তো সবাই পায় না। এভাবে যে তাকে ভাবতে শিখিয়েছে পল্লব। সে সব হারিয়েও কোনওদিন হেরে গিয়ে হাল ছেড়ে দেয়নি জীবনে। তার মনে একটা কথাই বারবার ঘুরে আসছে, ঘুম থেকে উঠে তার বন্ধুরা, বিশেষ করে পল্লব কী করবে তাকে খুঁজে না পেয়ে? দরজার মুখে রাখা তার স্লিং ব্যাগটা দেখে কী করবে সে? চেন টেনে ট্রেন থামাবে?
ওরা তো তাকে ফোনেও পাবে না, যতক্ষণ না সে এই জঙ্গল থেকে বেরোতে পারবে। পারতেই হবে তাকে। হঠাৎ করে একটা জান্তব গোঙানি তার মুখ থেকে বেরোতেই দুটো জিনিস হল। এক, তার পাশের জঙ্গলের ভিতর নড়াচড়াগুলো কমে গেল, আর দুই, আবার আকাশ ভেঙে অঝোর ধারায় বৃষ্টি শুরু হল।
একটু কষ্ট করে উঠে দাঁড়িয়ে দু’পা হাটার চেষ্টা করল সে। চমকে গেল বিশাল। ব্যথাটা তো আছেই, আর পাটা যেন পাথরের মতো ভারী! পাশেই পড়ে থাকা একটা খড়ির টুকরো তুলে আর ভেঙে যাওয়া লেন্সটা নিয়ে এক পা, এক পা করে নিজেকে বয়ে নিয়ে যেতে লাগল সে। বৃষ্টির বড়ো বড়ো ফোঁটাগুলো যেন তার সারা শরীরে কেটে বসতে লাগল, আর চারধারের ঘন জঙ্গল নিঃশব্দে ভিজতে ভিজতে এই অসম লড়াই প্রত্যক্ষ করে যেতে লাগল।
তৈরি হল এক অপার্থিব জলছবি। তুমুল বৃষ্টিতে স্নান করতে থাকা রাতের সেবকের জঙ্গলের ভিতর দিয়ে মানবসভ্যতার একচিলতে উপস্থিতি দুটি চকচকে রেল লাইন। আর সেই লাইন বেয়ে এক অসহায় মানুষ এগিয়ে চলেছে জীবনের দেখা পেতে প্রাণ হাতে করে। হাতি, গণ্ডার, গউর, সাপখোপ আর নানান বিষাক্ত পোকামাকড়ে ভর্তি হাড়হিম করা রাতের সেবকের জঙ্গল, যেখানে মাঝেমাঝে ছোটোখাটো চিতাবাঘেরও দেখা মেলে।
জঙ্গলে পদে পদে বিপদ ওত পেতে থাকে, সেটা সাধারণ মানুষমাত্রই জানে। আর এই উত্তরবঙ্গের ছেলে বিশালেরও বিলক্ষণ জানা। ঝড়বৃষ্টিতে জন্তুজানোয়ার পারতপক্ষে বেরোয় না - এই কথাটাই তাকে যেন তাড়িয়ে নিয়ে চলল। যতক্ষণ বৃষ্টি চলবে, তাদের হাত থেকে সে বেঁচে গেলেও যেতে পারে। অবশ্য সাপখোপ, পোকামাকড় তাকে আক্রমণ করতেই পারে।
তাড়াতাড়ি চলার চেষ্টা করছিল বিশাল। কিন্তু তার পা যেন তাকে মাটির দিকে টানছিল। সে ভাবছিল যে সে খুব তাড়াতাড়ি জঙ্গল পেরোচ্ছে, কিন্তু আসলে সেই জায়গা থেকে মাত্র কয়েক ফার্লং দূরেই এগোতে পেরেছিল মাত্র।
অ্যাডভেঞ্চার মুভির পোকা বিশাল ইতিমধ্যে টের পেয়ে গেছে, পর্দায় দেখা রুদ্ধশ্বাস সিকোয়েন্সগুলো ঠিক কতটা হাস্যকর তার এই বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে। এক পা, এক পা করে এগিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো সে। পিছনে বেশ কিছুটা দূরে গাছ ভেঙে পড়ার শব্দ। আতঙ্কে, নাকি বরফঠাণ্ডা জলে ভেজা কেঁপে উঠল বিশাল? ওটা কীসের শব্দ? বৃষ্টিতে গাছ ভেঙে পড়ার আওয়াজ, নাকি স্বয়ং মহাকালবাবা? মুখ সাদা হয়ে গেল বিশালের। বাঁচার তাগিদে মরিয়া হয়ে সামনে তাকিয়ে হেঁচড়ে হেঁচড়ে নিজেকে টানতে থাকল সে।
থমকে গেল সে অচিরেই। আন্দাজ দশ-বারো ফুট দূরে ওর ঠিক সামনে ছোট্ট সাদামতো ওটা কী দাঁড়িয়ে লাইনের মাঝবরাবর?
নিকষ কালো অন্ধকারে চোখ সইয়ে নিয়ে তাকাতে বিশাল বুঝতে পারল, ওটা একটা খরগোশ। কাকভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে তুড়ুক তুড়ুক করে লেজ উপরনিচ করছে। ভঙ্গিটা এরকম যেন তাকে বলছে, ‘ভয় কী? বাঁচতে চাও তো থেমো না।’
এই শোচনীয় অবস্থাতেও হাসি পেল বিশালের। সে এগোতে লাগল তার স্বঘোষিত গাইডের পিছন পিছন। এগোতে তো তাকে হবেই। পাটা যেন আগের চেয়ে একটু ধাতস্থ হয়েছে, আর একটা নিষ্পাপ প্রাণের উপস্থিতি তার তাগিদকে যেন বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে।
মনে পড়ে গেল তার ছোট্ট রুবিকের কথা। অনেক পুষ্যির ভিতর রুবিক ছিল তার ভীষণ ন্যাওটা। সারাক্ষণ কোলে চড়ার লোভে ঘুরে বেড়াত পায়ে পায়ে। কিন্তু বহুবছর তার কাছে থাকার পরে পেটে আলসার হয়ে মারা গেছিল। বেচারির পেটে নেক্রোসিস হয়ে গেলেও বিশাল হাল ছাড়েনি। ওই আধপচা প্রাণীটাকে প্রাণ দিয়ে সেবা করেছিল সে। কেউ তাকে নিরস্ত করতে পারেনি। নাওয়াখাওয়া ভুলে ভেটের কাছে ছুটোছুটি করেছিল রুবিকের পরিণতি জেনেও। কিন্তু শেষে তার হাতের তালুর উপর শুয়েই রুবিকের চুনির মতো উজ্জ্বল চোখদুটো স্থির হয়ে গেছিল।
রুবিকের একটা বিশেষত্ব ছিল। চমকে উঠল বিশাল। পকেট থেকে মোবাইল বার করে টর্চ জ্বালিয়েই ফোকাস করল খরগোশের দিকে। চোখে আলো পড়তে খরগোশটার লাল চোখদুটো ঝিকিয়ে উঠল। তার কপালের খয়েরি চন্দ্রবিন্দুর মতো স্পটদুটো বিশালের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বইয়ে দিল। টর্চ নেভাতেই সামনে ইস্পাতের চকচকে ভেজা রেল লাইনদুটো ছাড়া আর কিছু দেখা গেল না। খরগোশ কেন, কোথাও কোনও প্রাণের লেশমাত্র নেই। রুবিক কি সত্যি এসেছিল? নাকি এই অবস্থায় তার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে?
অসম্ভব! এই অবস্থায় এসব আর ভাববে না সে। ভালো করে খড়িটা বাগিয়ে ধরে এগোতে যেতেই দূরে দেখল কালো, জমাট অন্ধকারের মতো কী একটা পাশের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে লাইনের উপর থেমে গেল। কপালে থাকলে আমি বেঁচে থাকব, ভেবে যথাসম্ভব দ্রুত এগোতে লাগল বিশাল।
অনেকটা এগিয়ে এসে টর্চ ফেলতেই কালো ভেলভেটের মতো লোমের উপর আলো পিছলে গেল। শিম্পাঞ্জি একটা। বিচ্ছিরিভাবে দাঁত দেখিয়ে দু’হাত প্রসারিত করে তার দিকে এগিয়ে এল দু’কদম।
একেই মাথা কাজ করছিল না বিশালের। পায়ের অসহ্য ব্যথা, তার এই ভয়ংকর অবস্থায় মরণবাঁচনের চিন্তা, বাবা-মা, বন্ধুবান্ধব তার চিন্তাকে জট পাকিয়ে দিল। এই প্রথম কান্নাটা তার গলার ভিতর থেকে মুচড়ে বেরোল। আর এর সাথে সাথেই আরেকটা কথা তাকে ওই ঠাণ্ডাতেও ঘামিয়ে তুলল, সেবকের জঙ্গলে নানা প্রজাতির বানর থাকলেও সে ভালোমতো জানে যে এইখানে শিম্পাঞ্জি নেই!
বিশাল এক লহমায় অনেক কিছু ভেবে নিল। ভূত বলে কিছু হয় না। ভূত মানে হল ভূতপূর্ব, অর্থাৎ যা আগে ঘটে গেছে। আর সে যে পরিস্থিতিতে আছে, ধরে নেওয়া যায় যে তার বেঁচে ফেরার ব্যাপারটা মিরাক্যাল হিসাবে গণ্য হবে। হয় সে বন্যজন্তুর হাতে মরবে, নয় অন্য কোনওভাবে। যদি এরা তার পুষ্যিদের আত্মাও হয়, তার ক্ষতি তারা হয়তো করবে না, কারণ সে তার জীবন উজাড় করে ওদের সারিয়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। তাহলে আজ তারা আসছে কেন? পরপর? চকিতে একটা গল্পের নাম মনে এল বিশালের - মিস্টার শাসমলের শেষ রাত্রি!
মরিয়া হয়ে দুঃসাহসে ভর করে একটা হাত বাড়াল শিম্পাঞ্জির দিকে। ‘ও-ও-ও কুকি!’ দেখাই যাক না কী হয়। মাড়ি অবধি দাঁত বার করে মাথা ঝাঁকিয়ে একটা বিজাতীয় শব্দ করে পিছনে ঘুরে সটান চলতে শুরু করে দিল জন্তুটা। পিছনে পিছনে যথাসম্ভব জোরকদমে পা মেলাল বিশাল। টর্চের আলোয় তার ডানপায়ের হাঁটুর পিছনে কাটারির আঘাতের পুরনো দাগটা বিশালকে বলে দিল, এটা তার কুকিই। হাত বাড়িয়ে ছুঁতে ইচ্ছে হলেও তাদের মধ্যে দুরত্ব একই থেকে গেল। অসম্ভবের পিছনে ছুটতে থাকল বাস্তব, জীবনের আশায়।
প্রবল ম্যালেরিয়ায় ভুগতে ভুগতে মারা গেছিল কুকি। ওকে বাঁচাতে তিন রাত ধরে ভেট হাসপাতালে ছিল বিশাল আর পল্লব। কিন্তু কিচ্ছু করতে পারেনি কেউ। ওর নিস্পন্দ শরীরটা বাগানের বকুলগাছের নিচে মাটিচাপা দিয়েছিল দুই বন্ধুতে। বিশ্বাস হচ্ছে না বিশালের। যদি ও আজকে বেঁচেও যায়, দুনিয়ার কেউ এই কাহিনি বিশ্বাস করবে কি? সে চোখের সামনে কুকির পিঠ ও কোমরের ওঠাপড়া দেখেও বিশ্বাস করতে পারছিল না। কথায় বলে না, মানুষ যখন কোনও অতিপ্রাকৃতিক অবস্থায় পড়ে তখন সে অবাক হতেও ভুলে যায়। তাই হয়তো এই অপার্থিব অবস্থার প্রমাণ রাখতে সে মোবাইলটা বার করতে লাগল। উদ্দেশ্য, একটা অন্তত ছবি।

ট্রেন এসে গুলমা স্টেশনে দাঁড়াতে ভীষণ জোরে ঝাঁকুনির সাথে একটা ধাতব ঝঙ্কারে ঘুমটা ভেঙে গেল পল্লবের। পাশে দাঁড়ানো বিশাল মালগাড়িটায় ঘটাং ঘটাং শব্দ হচ্ছে। সে উঠে আড়মোড়া ভেঙেই চারপাশে তাকিয়ে বিশালকে দেখার চেষ্টা করল। না, সে এই কামরায় নেই। এই এক দোষ বিশালের। যে স্টেশনে ট্রেন দাঁড়াবে, তাকে নামতে হবেই। আজ এত ঝড়জল, প্ল্যাটফর্ম ভিজে, ট্রেনের কামরার মেঝে ভিজে, তাও নেমেছে নিচে! ভাবতে ভাবতেই তার চোখদুটো আটকে গেল কামরার দরজায় পড়ে থাকা স্লিং ব্যাগ আর সিকিউরিটি বেল্টের দিকে। তড়াক করে লাফিয়ে উঠল পল্লব। ছুটে গেল দরজার কাছে। মুখ বাড়িয়ে কাউকে দেখতে পেল না সে। বিশাল যেন উবে গেছে। তার ব্যাগ আর বেল্টটা তুলে নিয়ে এসে সিটে রেখেই সে বিপ্র আর সুব্রতকে ডেকে তুলল।
তিনজন মিলে পালা করে ফোন করে যেতে লাগল বিশালকে। কিন্তু তার ফোন পরিষেবা সীমার বাইরে। এটা উত্তরবঙ্গ বলে বিশালের ফেলে যাওয়া জিনিসগুলো একই জায়গায় থেকে গেছে। এখানকার মানুষজন এখনও অনেকমাত্রায় সৎ ও নিষ্পাপ।
অগত্যা নেমে পড়ল তিনজনে গুলমা স্টেশনে। তোলপাড় করে ছোট্ট স্টেশনটায় খুঁজতে লাগল অসহায়ভাবে। এই ছবির মতো সাজানো স্টেশনটায় নামমাত্র তিনজন স্টাফ, স্টেশন মাস্টার, একজন লাইনসম্যান আর একজন রেল পুলিশ। তাদেরকে বলতে তারা ঘটনার গভীরতা না বুঝতে পেরে গদাইলশকরি চালে, ‘দেখিয়ে, কহি উতর গয়া হোগা।’ বলে দায়িত্ব এড়াল। এর ভিতর পাশের মালগাড়িটা নড়ে উঠতেই ওদের ট্রেনের সিগন্যাল লাল থেকে হলুদ হয়ে গেল। ঘড়িতে তখন রাত সাতটা পঞ্চাশ।
ছুটতে ছুটতে আস্তে আস্তে চলতে শুরু করা ট্রেনে রানিংয়ে উঠে পড়ল বিপ্র আর সুব্রত। পল্লবের এভাবে ট্রেনে চাপা অভ্যাস নেই। তাই সে ওই কামরায় উঠতে পারল না। সে দুটো কামরা ছেড়ে পরেরটায় ওঠার চেষ্টা করল। ডি.এম.ইউ ট্রেনগুলো ভীষণ তাড়াতাড়ি স্পীড নেয়। আজ প্ল্যাটফর্ম একদম জলে থইথই। আর ট্রেনের দরজার হাতলগুলোও ভেজা।
ভাবতে শুরু করল পল্লব। কী হতে পারে বিশালের! ও তো সেবকের ছবি তুলবে বলে ক্যামেরা ঠিকঠাক করছিল, যখন ওরা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাহলে কি বিশাল সেবক স্টেশনে নেমে আর উঠতে পারেনি ট্রেনে? ওর ফোন না পেলে কিছুতেই কিছু জানা যাচ্ছে না। সত্যি কি তাহলে গুলমা স্টেশনের স্টেশন মাস্টারের কথাই ঠিক?
এই স্টেশনে বিশাল নেই, আর এখানে ওরা কোনও সহায়তা পাবে না রেল বা রেল পুলিশের কাছ থেকে, এটা ওরা গুলমাতেই বুঝে গেছিল। তাই এর ভিতরেই ঠিক করে ফেলেছিল পরের স্টেশন শিলিগুড়ি জংশনে নেমে জি.আর.পির কাছে মিসিং রিপোর্ট করবে, আর বিশালের ফেলে যাওয়া জিনিসগুলো দরকার পড়লে জমা করে দেবে পুলিশের কাছে।
দুর্বল চিত্তের পল্লবের এই এক চরিত্র। বিপদের সময় সবাই যখন গুটিয়ে যায়, তখন তার যাবতীয় মনের জোর একত্রিত হয়, আর মাথা কাজ করে চকিতে। সেও এখন আর কিছু ভাবতে পারল না, কারণ বিশাল নিজের থেকে ফিরে না এলে বা তার ফোন কাজ না করতে আরম্ভ করলে তাকে ধরার কোনও উপায় নেই। গুলমা থেকে শিলিগুড়ি জংশন অবধি শুধু ডায়াল করে যেতে হবে বিশালকে। পল্লবের চোখে জল এল না, মনও ভারাক্রান্ত হল না। শুধু বিশালের উপর রাগে আর অভিমানে তার চোয়ালের হাড়গুলো নিষ্পেষিত হতে লাগল। একবার দেখা হোক ওর সাথে। ওকে যে কী করবে পল্লব তা সে নিজেই জানে না।

ওদিকে জঙ্গলের ভিতর ইতিমধ্যে অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছে বিশাল। বারবার ভিজেছে, মুখ থুবড়ে পড়েছে, আবার উঠেছে। কিন্তু থেমে থাকেনি। তাকে রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে এসেছে পালাক্রমে তার পুষ্যিরা, অদ্ভুতভাবে যারা বহুদিন আগেই নানারোগে ভুগে ওর হাতের সেবা পেয়ে মারা গেছে। কীভাবে যেন বিশালের পুরো ব্যাপারটা মাথায় ঢোকেনি বা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েনি। শিম্পাঞ্জিটা তাকে অনেকদূর অবধি এগিয়ে দিয়ে জঙ্গলের ভিতর একটা রেল ব্রিজের শুরুতেই চোখের সামনে থেকে মুছে গেল।
তারপর যথাক্রমে তাকে পথ দেখায় তার একদা পোষা বেজি নইপাল, তারপর তার প্রাণাধিক প্রিয় অ্যালসেশিয়ান ক্রুশো। সে যখন আরেকটা রেল ব্রিজ পেরোচ্ছিল, ঠিক মাঝামাঝি এসে সামনের দিক থেকে ভেসে এসেছিল ট্রেনের আওয়াজ। আশায় দুলে উঠেছিল বুক। ভেবেছিল প্রাণপণে হাত-পা নাড়িয়ে সে যে ট্রেনই হোক, থামিয়ে দিয়ে তাতে উঠে অন্তত জঙ্গল থেকে বেরিয়ে একটা ফোন করে তার বেঁচে থাকার খবরটা দিতে পারবে।
কিন্তু সে ভাবল এক, আর হল আরেক। তার মনে থাকল না সে সরু রেল ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেন থামলে ভালো। কিন্তু না থামলে তার তো আর একচুল সরার জায়গা থাকবে না। ট্রেন তাকে পিষে দিয়ে চলে যাবে! দূর থেকে ট্রেনের আলো তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল গাছপালার ভিতর দিয়ে, আর বিশাল সবকিছু ভুলে ব্রিজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দিগ্বিদিক ভুলে দু’হাত বাড়িয়ে ফুসফুসের ক্ষমতা ছাপিয়ে চিৎকার করতে শুরু করল।
ট্রেন তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল হুড়মুড়িয়ে। ঠিক তখনই আরেকটা অপার্থিব শব্দে চারদিকের সমস্ত শব্দ চাপা পড়ে গেল। পেডিগ্রীড কুকুরের ভারী গলার শাসন। ট্রেনটা ব্রিজের উপর উঠতেই ঠাণ্ডা হাওয়ার একটা ঝাপটা বিশালকে তুলে নিয়ে ফেলে দিল ব্রিজের নিচে, পাহাড়ি ঝরনার পাশে গজিয়ে ওঠা নরম ঘাসজমিতে।
নিচে চিত হয়ে শুয়ে শুয়ে দেখল, মালগাড়িটা দুদ্দাড় করে ব্রিজের ওপারে চলে গেল তার সাধের ক্রুশোর উপর দিয়ে। ট্রেন চলে যেতে আবার অন্ধকার ফিরে এল, আর উঠে দাঁড়াতে গিয়ে বিশাল টের পেল যে তার মচকানো পা আবার আঘাতপ্রাপ্ত। ক্রুশোকেও আর দেখা গেল না। অনেক কষ্টে হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে বুকে হেঁটে, হামাগুড়ি দিয়ে সে উঠে এল লাইনের উপর। ক্রুশোর জন্যে তার চোখের জল আর বাধা মানল না। ক্যান্সার হয়েছিল কুকুরটার। সব শেষ জেনেও লড়ে গেছিল বিশাল। হয়তো আজ তার বরফশীতল ছোঁয়া দিয়ে তার সমস্ত ভালোবাসার পাওনা পরিশোধ করে গেল সে। সবার ছবি সে তুলেছে ক্যামেরায়, যুক্তি বা অযুক্তির ধার না ধেরেই।
উপরে উঠে আবার পায়ে পায়ে লাইনের উপর দিয়ে চলতে শুরু করল বিশাল। এবার জঙ্গল শেষ হয়ে আসছে। গাছপালার নিশ্ছিদ্র প্রাচীরের ভিতর দিয়ে ফাঁকফোকর দেখা দিতে শুরু করেছে। বাঁচার আশায় নতুন করে বুক বাঁধতে শুরু করল সে।
কিন্তু তারপরেই সে স্বাদ পেল সাক্ষাত মরণের। সামনের অন্ধকারটা হঠাৎ যেন চোখের সামনেই তরলীকৃত হয়ে নড়ে উঠল! অন্ধকার জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল পরপর হাতির একটা ছোটো দল। দুটো বিরাট বুল টাস্কার, দুটি মাঝারি মাপের হাতি আর একটি বাচ্চা। একেবারে বিশালের সামনে! পালাবার পথ নেই। নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে দু’পক্ষই। টাস্কার কান নাড়া শুরু করতেই বিশাল আস্তে আস্তে মাটিতে বসে পড়ল। তার মরণ আগত!
ঠিক সেই সময়ে তার ডানদিক থেকে দুলতে দুলতে রাজকীয় চেহারা নিয়ে উঠে এল ডেসডিমোনা। বিশালের পোষা বিরাট ইগুয়ানা, সম্ভবত যার গায়ের থেকে বেরোনো বিজাতীয় গন্ধের চোটে মহাকালবাবার পরিবার ফোঁস ফোঁস করতে করতে লাইন পেরিয়ে ওধারের ঢালে নেমে চোখের আড়ালে গেল। একদম হাতের কাছে ডেসডিমোনার মাথাটা পেয়ে তাকে আদর করতে ইচ্ছে হল বিশালের। হাত ওঠাবার সাথে সাথেই মাথাটা তার দিকে ঘোরাল ইগুয়ানাটা। তার চোখ দিয়ে সে যেন বিশালকে আশীর্বাদ করে মিলিয়ে গেল।
বাড়ির সামনের রাস্তায় গাড়ি চাপা পড়ে মারা গেছিল ছোটোখাটো ঘড়িয়ালের আয়তনের ডেসডিমোনা। সেই অবস্থায় তাকে নিয়ে হাসপাতালে দু’দিন ধরে পড়ে ছিল বিশাল। আজ হয়তো সেও তার ভালোবাসার পুঁজিটা উজাড় করে দিয়ে গেল সেই পাগল ছেলেটাকে।
আবার ঝড়জল শুরু হল। যদিও এইবার তার শক্তি অনেকটাই কমে এসেছে। বিশাল আবার খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটা শুরু করল। এবার জঙ্গল সত্যিই শেষ হবার মুখে। কারণ, গাছপালার মাঝখান দিয়ে দূরে আস্তে আস্তে ফুটে উঠছে শিলিগুড়ি শহরের আলো। আর কিছুটা কাছে, প্রায় আরও দু’কিলোমিটার দূরে দেখা যাচ্ছে গুলমা স্টেশন। আনন্দে চিৎকার করে উঠল বিশাল। পেরেছে সে! সে সশরীরে বেঁচে ফিরে আসতে পেরেছে মরণের মুখ থেকে। কালান্তক সেবকের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে সে! এইসব ভাবতে ভাবতে বিশাল গুলমা স্টেশনের দিকে এগোতে এগোতেই টের পেল অনেক দূরে পিছন থেকে ট্রেনের এগিয়ে আসার শব্দ।
হঠাৎ রেল লাইনের পাশের ঢালু ঝোপঝাড় ভেদ করে কোনও একটা প্রাণীকে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখল বিশাল। তার মনে আর ভয় নেই। সে জীবনের যুদ্ধ জিতে ফেলেছে ভাবতে ভাবতে আবিষ্কার করল যে দু’পায়ে হেঁটে যেটা তার দিকে এগিয়ে আসছে সেটা মানুষ, আর তার হাঁটার ধরন ভীষণ চেনা। আরে, এ তো পল্লব! ভিতু ছেলেটা তাকে খুঁজতে গুলমা স্টেশন থেকে সোজা সেবকের জঙ্গলের দিকে হাঁটা দিয়েছিল? তাকে তো তার আপনজনেরাও এত ভালোবাসে না! ভাবতে ভাবতেই তার ভয় হল যে পল্লব তাকে আজ একহাত নেবে। বকুনি আর অপমানে তাকে ভরিয়ে দেবে সে।
কাছে চলে এসে পল্লব একটা কথাও না বলে সটান বিশালের কাঁধের কাধের কাছের জামাটা খামচে ধরল। তারপর থমথমে গম্ভীর গলায় বলল, “আজ যা করেছিস তার হিসেব পরে হবে। এখন একটা কাজ কর, পিছনে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস আসছে, এখানে দাঁড়াবে, উঠে পড়বি। আমি ওদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। তুই আর আমি একসাথে বাড়ি ফিরব। তুই ওঠ, আমি আসছি।” বলে ডানহাতের কড়ে আঙুল তুলে বিশেষ মুদ্রা করে গাছের দিকে পা বাড়াল।
বিশাল ওকে কারণ জিজ্ঞেস করতে পল্লব গলা তুলে বলল, “গুলমায় একটা রেলে কাটা পড়েছে। একটা একটা করে ট্রেন পাস করাচ্ছে। আমি আসছি।”
বলতে বলতেই হুড়মুড়িয়ে এসে পড়ল কাঞ্চনকন্যা, আর বিশাল একমিনিট দেরি না করে উঠে পড়ল ট্রেনে। উঠেই মুখ ঘুরিয়ে পল্লবকে ডাকতে গিয়ে সে দেখল পিছনে জনমনিষ্যির চিহ্নও নেই। কামরার লোকজন তাকে এই অন্ধকার ঘন জঙ্গল থেকে উঠতে দেখে অবাক চোখে চাইতেই তার মাথাটা স্রেফ ঘুরে উঠল। সে সোজা বাথরুমের সামনে মেঝেতে থেবড়ে বসে পড়ল। এতক্ষণের মানসিক টানাপোড়েন আর অতিমানবিক পরিশ্রমের ফলে ওখানে বসেই বমি করে লুটিয়ে পড়ল বিশাল।
ট্রেন নড়ে উঠতেই তার মনের ভিতর একটা চিন্তা পাক খেয়ে উঠল, কোথায় গেল পল্লব? আজ জঙ্গলের ভিতর থেকে যারা তাকে নিরাপদে বার করে আনল, তারা তো কেউ আর ইহজগতে নেই। সবার শেষে তো পল্লব এসেছিল তার কাছে। তবে কি... চোখের সামনে হঠাৎ করে সব দুলে উঠল। কালো পর্দায় ঢেকে গেল তার সামনের যাবতীয় কিছু।
গুলমা স্টেশন তখন রেল পুলিশে ছয়লাপ। অ্যাম্বুল্যান্স আর গ্রামের লোকের ভিড়। পল্লবের দুমড়োনো শরীরটাকে পুলিশের তত্ত্বাবধানে অ্যাম্বুল্যান্সে তোলা হচ্ছে।
পাশ দিয়ে গড়িয়ে চলা কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস বিশালের অবচেতন শরীরটা নিয়ে আস্তে আস্তে আলোকোজ্জ্বল শিলিগুড়ি শহরের দিকে রওনা হয়ে গেল। তাকে ঘিরে তখন টিকিট চেকারের সাথে উত্তেজিত যাত্রীদের জটলা। তার পকেটে মোবাইল ফোনটা সিগন্যাল ফিরে পেয়ে মুহুর্মুহু বেজে চলেছে। সেটাতে একটা ছবিও ওঠেনি।
_____

গ্রাফিক্সঃ পুণ্ডরীক গুপ্ত

10 comments:

  1. ভাল বললে কম হবে। শুভেচ্ছা জানাই

    ReplyDelete
    Replies
    1. Pranito holam Dadabhai apnar Snehe. Bhalobasha roilo.

      Delete
  2. Replies
    1. Boner kach theke ei kothaguloi Amar kache onektai. Bhalobasha nio.

      Delete
  3. opurbo,just opurbo,twist tao mokkham..
    prosenjit

    ReplyDelete
    Replies
    1. Onek onek dhonyobad Dada/Bhai... Utshahito holam...Sharodiyar Shuveccha

      Delete
  4. ভীষণ ভালো হয়েছে গল্পটা। শাম্ব

    ReplyDelete
    Replies
    1. Daktarbabuke onek onek Bhalobasha. Amio Porte shuru korbo. Danrao ekbar Dooars e pouchoi!!!

      Delete
  5. নামকরণ সার্থক। ভাষা শব্দের প্রয়োগের পাশাপাশি ভ্রমণকাহিনি আর অলৌকিকতা চমৎকার মিশেলে গল্পটি সুখপাঠ্য হয়ে উঠেছে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. Pranito holam Bhai... Protibar Sivok perobar shomoye dekhte dekhte ar bhabte thaktam...

      Delete