গল্পঃ ভয়ংকরঃ শিবশঙ্কর ভট্টাচার্য

ফিরে দেখা গল্প



বাঁদরছানারা গুছিয়ে বসেছে বটগাছের মগডালে। তাদের থুত্থুড়ি বুড়ি ঠাকুমা সবার মাঝখানটিতে বসে একটা একটা করে ছানাদের টেনে আনছে আর পটাপট তাদের গা থেকে উকুন বেছে মুখে চালান করছে। এই ছানা ক’টাকে দেখেশুনে রাখার কাজ তার। দলের বাকিরা গেছে চড়ায়। মানে বনজঙ্গলে, এ-বাগান সে-বাগান আর অসাবধান গেরস্তবাড়ির ওপর চড়াও হয়ে খাবার নিয়ে আসতে। ফিরবে সারাদিনের পর সেই সন্ধেবেলায়। একেবারে দুধখেকো, গোলাপিমুখো কচি ছানাগুলো গেছে মা-বাপের সঙ্গে বুকের লোম আঁকড়ে ঝুলতে ঝুলতে। একটু বেড়ে ওঠা দুধ-ছাড়া ছানাগুলো জঙ্গলের বাসায় থেকে গেছে বুড়ির জিম্মায়। এগুলোকে দেখেশুনে রাখা বড়ো সহজ কাজ নয়! বুড়ির পরাণ ওষ্ঠাগত। ফোকলা দাঁতে খিঁচিয়ে খিঁচিয়ে আর পারা যায় না! বাঁদরছানা বলে কথা।
একটা আবার এরই মধ্যে কোন গেরস্ত বাড়ি থেকে হাতসাফাই করে আনা ছোট্ট পেন্টুল ভুল জায়গায় পরতে গিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে বসেছিল। কোনওমতে তাকে উদ্ধার করে দুই থাপ্পড় কষিয়ে বুড়ি হাঁপাচ্ছিল। সেই ফাঁকে তিনটে ছানা মিলে ঠাকমাকে ধরে নতুন বিদ্যে উকুন বাছা মকশো করতে গিয়ে সুড়সুড়ি দিয়ে থাকবে, চমকে উঠে বুড়ি বিষম-টিষম খেয়ে পড়ে যায় আর কী! উহ্‌। কী দুষ্টু, কী দুষ্টু! গুছিয়ে বসে কাছে ডাকল ওগুলোকে, “আয়, তোদের ভয়ংকরের গল্প শোনাই।”

গুটি গুটি ঠাকমার কাছ ঘেঁষে এসে বসল সবাই। ছানারা গুনতিতে ঠিকঠাক আছে কি না একবার দেখে নিয়ে চোখ পিট পিট করে খানদুয়েক লম্বা হাই তুলে তুড়ি দিয়ে দোষ কাটিয়ে নিল বুড়ি, তারপর বলতে শুরু করল।
“বনজোনাকের নামেই মালুম হয় থানটি কেমন! বন তো বন, ঘোর জঙ্গল যাকে বলে। বড়ো বড়ো গাছেরা ঠেসাঠেসি করে দাঁড়িয়ে হাজার ডালপালা বাড়িয়ে আকাশ ঢেকেছে তো বটেই, তাদের পায়ের কাছে গজিয়ে ওঠা ছোটোখাটো গাছেরাও পাতার কড়ে আঙুল বাড়িয়ে আড়ি করেছে সুয্যিমামার সাথে। ফলে দিনের আলো আর মাটি ছোঁয় না। দিনের বেলাতেই ঘন আন্ধার, রেতে তো কথাই নেই। রাত্তিরে দিনে অন্ধকার ঘুরঘুট্টি। বনের এখেনে ওখানে বন জোনাকের বুনোঠাকুর ক্ষুদে ক্ষুদে হাজার-লাখো-কোটি আলেয়ার লন্ঠন জ্বালান পাহারাদারির কারণে। সেই আলেয়ার দল ছুটে বেড়ায়, এই জ্বলে, এই নেভে জোনাকের মতো। বনের বাইরে ঘর বেঁধে থাকা জনমনিষ্যি সে আলো দেখলে ডরায়। দিনে রাতে নিজেরাও বনের দিকে আসে না, অন্য কারোকে ঘেঁষতেও দেয় না এদিকে। নানানরকম উদভুট্টি গপ্পো তোয়ের করে বুনোঠাকুরের নামে, পুজোটুজোও দেয়। বনের খাস পাহারাদার শেয়ালদের কাছ থেকে এসব খবর পেয়ে খুশি থাকে কেউ কেউ। তারা বনজোনাকের বাসিন্দে। আকাশপাতালজোড়া গাছপালা লতাপাতা শেকড়-বাকড়ের ঘন বুনুনির মধ্যে হাজারো জন্তুজানোয়ারের ঠেক।”
“কারা থাকে এখানে?” আরও গা ঘেঁষে বসল ছানাগুলো।
“পোকামাকড়, সাপখোপ, পশুপাখি, ইঁদুর-বাঁদর, বনবেড়াল, বনকুত্তা, বনরুই, খ্যাঁকশেয়ালেরা বনসো-পরম্পরায় বনজোনাকের বাসিন্দে।”
“আমরাও কেন থাকি না গো?” সবচাইতে কচি বাঁদরটা দুঃখী দুঃখী মুখ করে বলল। সায় দিয়ে মাথা নাড়ল আরও ক’জন।
“আরে শোন না চুপ করে! তো সেই বনজোনাকের মধ্যিখানে কয়েকখান লাজুকরকমের গুলবাঘাও থাকেন ছানাপোনা ইত্যাদি নিয়ে সপরিবারে। দেখাটেখা কম দেন তাঁরা। তেনাদের বাঘ বলে ডাকলে বনবেড়ালের বাচ্চারাও চোখ টেপাটিপি করে হাসাহাসি করে। কবে নাকি হায়নার তাড়া খেয়ে ঢুকে পড়েছিল এ বনের মধ্যে। আর আছে গোটাকতক সাপখোপ, সজারু, মেছোবেড়াল, গন্ধগোকুল, বাদুড় ইত্যাদি। লোক হিসেবে বেজায় ভালো সবাই। রাগারাগি নেই, কাউকে কিচ্ছু বলে না তারা। তা বাঘাই হোক আর ইয়েই হোক, সবাই এখানে এক জলার মাছ খেয়েই মানুষ। খেয়োখেয়ি নেই নিজেদের ভেতর বিলকুল।
“কেবল একজন ছিল সবার থেকে আলাদা। যেমন পাহাড়ের মতো চেহারা তেমনি বদমেজাজ। মস্ত বড়ো বড়ো কলাগাছের মতো দাঁত। রক্তের মতো টুকটুকে লাল চোখদুটো। শালগাছের গুঁড়ির মতো মোটা চারখানা পা। এক ধাক্কায় গাছ উপড়ে ফেলতে পারে, এমন শক্তি। ওর এলাকায় পা রাখার হুকুম ছিল না কারও।”
“ইস! আমাদের ঠাকুরদাদার চাইতে বেশি গায়ের জোর! বিশ্বাস হয় না যে!” লাফিয়ে উঠল বাঁদরছানাগুলো। অবিশ্বাসে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে ওদের।
বাঁদর-ঠাকুমা মুখ বেঁকাল। “আরে দু-উ-উ-র। তোদের ঠাকুদ্দা। ঢক ঢক করছে বুড়ো, মাথায় টাক! ওর কাছে তোদের ঠাকুদ্দার ঠাকুদ্দাও নস্যি! ওর শুঁড়ের এক ফুঁয়ে উড়ে যাবে! আরে বাপু, ওর নাম ভয়ংকর। দেখা দূরে থাক, নাম শুনলেই প্রাণ ঠাণ্ডা।”
“হাতি, হাতি! খুব বুঝেছি শুঁড় শুনেই।” লাফালাফি শুরু হয়ে গেল সবক’টার। বটগাছ উসকোখুসকো হয়ে উঠল নিমেষের মধ্যে।
“শোন রে মুখপোড়ার দল, আরও বলি ওর কথা। সেই একটা বুনো শুয়োর ছিল। যেমন মোটাসোটা চেহারা তেমনই বাঁকা দাঁতের বাহার, তেমনই দেমাক! ওর চিৎকার শুনলে দাঁতে দাঁতে কটকটি লাগে, লেজ কাঁপতে থাকে সবার। কথায় কথায় একে মারে, তাকে মারে। গুলবাঘাদের কর্তারা তো মার-গুঁতো খেয়ে খেয়ে কাঁদুনে হয়ে উঠল। ভয় পেত তাকে সবাই। গেল একদিন ভয়ংকরের এলাকায়। পড়বি তো পড় একেবারে মুখোমুখি। এক লাথিতে ডিগবাজি খেতে খেতে বনের বাইরে। এখন ছাপোষা সংসারী হয়ে গেরস্ত বাড়িতে ফাইফরমাশ খাটে, আর এ-মুখো হয়নি।”
“তারপর? তারপর?”
“একদিন বনে আগুন লাগল। সেবারে বোশেখ-জষ্টি মাসে বনজোনাক শুকিয়ে খটখট করছে। জলা পর্যন্ত শুকিয়ে কাঠ। হঠাৎ রাতের বেলা হুলুস্থুল! ঝোড়ো হাওয়ায় গাছে গাছে ঘষা লেগে আগুন ধরে গেছে। বড়ো বড়ো গাছের মাথা ছাড়িয়ে আগুন আকাশ ছুঁয়েছে। দাবানল! দাবানল! কালো ধোঁয়ায় দম আটকে আসে। বনের ভেতর থেকে ছুটে আসা আগুনের হুঙ্কার শুনে শরীর ঠাণ্ডা মেরে যায়। দলে দলে বনজোনাকের বাসিন্দেরা ছানাপোনা কোলে করে ছুটে চলল বনের বাইরে। ভয়ে সবাই দিশেহারা। খোলা মাঠে এসে বসল যে যার ছানাদের হিসেব কত্তে। গুনতি করে দেখা গেল সব আছে ঠিকঠাক, কেবল বাঁদরদের সবচাইতে ছোটো আর বেজায় দুষ্টু মেয়ে বাচ্চাটা কী করে থেকে গেছে বনের মধ্যে। আর একজনের কথা কেউ জানে না, সে হল ভয়ংকর।
“কান্নাকাটি হুলুস্থুল পড়ে গেল সবার মধ্যে! ভেবে দ্যাখ। বাঁদর-মায়ের দুঃখে কেঁদে ভাসাচ্ছে বনকুত্তো। তাকে সান্ত্বনা দিতে এসে ভির্মি খাচ্ছে গুলবাঘা। শেয়ালছানার ছেঁকা খাওয়া ঘা চেটে পরিষ্কার করে দিচ্ছে ময়াল সাপ। হায়নাকে কেউ আটকে রাখতে পারছে না, সে যাবেই যাবে আগুনের মধ্যে থেকে সেই কচি বাঁদরিটাকে উদ্ধার করে আনতে। কান্নাকাটি কিচিরমিচির হৈ-হট্টগোলে সে এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। পুরো বনজোনাক তখন জ্বলছে দাউ দাউ করে।”
বুড়ি ঠাকুমা দম নিচ্ছে। চোখ বুজে আছে। মুখে কথা নেই। যেন মনে মনে দেখে নিচ্ছে একবার সেদিনকার ব্যাপারটা। ছানারা তাকে থামতে দেবে কেন! অমনি ঝটাপটি লাফালাফি শুরু হয়ে গেল।
“ও ঠাকুমা, তারপর কী হল বলো বলো। কচি বাঁদরমণির কী হল গো?”
ঠাকমা চোখ মেলে চাইল। তার ঘোলা চোখের কোনায় জল। ফিসফিস করে বলল, “বাঁদরির কথা বলছি রে। সেই দুষ্টু হাতিটার কথা কেউ শুনতে চাস না?”
“না না, সে ব্যাটা আগুনে পুড়ে মরুক। বেশ হয় তাহলে। কচি বাঁদরির কী হল বলো!”
ফোকলা দাঁত বার করে খেঁকিয়ে উঠল বাঁদরদের বুড়ি ঠাকুমা, “বনজোনাকের বাসিন্দেরা মোটেই অমন ছিল না। তারা সবার কথাই ভাবত, শুধু নিজেরটুকু নয়। তোরাও অমন হ। ওমা! শুধু নিজের জাতটাই সব নাকি? আর কেউ বুঝি মানুষ নয়!”
ল্যাজ-ট্যাজ গুটিয়ে ভদ্র হয়ে বসল আবার সবাই। গোলাপি চোখের পাতা পিট পিট করছে, মাথায় সোনালি লোম খাড়া খাড়া। চেয়ে আছে ঠাকুমার মুখের দিকে।
বুড়ি শুরু করল, “হঠাৎ বনের মধ্যে মড়মড় আওয়াজ। ভূমিকম্পমতো মাটি কাঁপিয়ে কী যেন একটা ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে বনের মধ্যে। মটমট করে ডাল ভাঙছে, উপড়ে পড়ছে গাছ। তার সাথে কানে তালা লাগানো চিৎকার! গোলগোল চোখ করে তারপর সবাই কী দেখল জানিস?”
‘কী, কী গো, ঠাকুমা? কী দেখল সবাই?”
“বুড়ো দুষ্টু হাতি ভয়ংকর বনের আগুন নিভিয়ে ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে আসছে। তার মাথার ওপর লতাপাতায় জড়ানো ছোট্ট সেই দুষ্টু ছানাটা। বাঁদরদের কাছে এসে শুঁড় দিয়ে যত্ন করে মায়ের ছানা মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিয়ে কোথায় যে চলে গেল কে জানে! বনের বাসিন্দেরা জলভেজা চোখে উবু হয়ে নমো করল সবাই। ভয়ংকরকে সকলে দুষ্টু বলে জানত, তার ভেতরে তো ভালোও ছিল। ভেতরকার ভালোগুলো বিপদের দিনে বাইরে বেরিয়ে আসে।”
“তারপর সেই ছানা বাঁচল?”
“বাঁচল বৈকি! বাঁচল, বড়ো হল, বুড়ো হল। এখন তোদের কাছে গল্প বলছে।”

_____

অঙ্কনশিল্পীঃ শিবশঙ্কর ভট্টাচার্য

কৃতজ্ঞতাঃ জয়ঢাক

2 comments:

  1. অসাধারণ গল্প।

    ReplyDelete
  2. এমন কেন সত্যি হয় না, আহা!

    ReplyDelete