গল্পঃ পুষ্যি নিলেন মহীনবাবুঃ দেবলীনা দাস



“মহীনবাবু ভূত পুষেছেন, জানিস?”
“অ্যাঁ!” বিনা ভূমিকায় এমন বিষয়ের অবতারণা, চুয়িংগামটা লাল্টুর গলায় চলে গেছিল আরেকটু হলে। সামলে নিয়ে বলে, “কী আবোলতাবোল বকিস বল তো সকাল সকাল? খেয়ে আছিস নাকি?”
হাবুল প্রচন্ড চটে গিয়ে রক ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। “তোরা মাইরি বিশ্বাস করিস না কোনও কথা! বাবা যায় না মহীনবাবুর বাড়ি তাস খেলতে? বাবাকে নিজে বলেছেন!”
পাশ থেকে ভুটাই ফুট কাটে, “মহীনবাবু ঘোড়া পুষলে তাও একটা বিশ্বাসযোগ্য কথা হত, তুই একেবারে ভূতে এনে ফেললি!”
সমবেত হ্যা হ্যা হাসির মধ্যে খেপে লাল হাবুল হন হন করে বাড়িমুখো হাঁটা দেয়। হাস্যরত তরুণবৃন্দ জানে না যে দু-তিনদিনের মধ্যেই গোটা হেতমপুর জুড়ে এ-খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে, আর তখন হাবুল পাল্টা হাসি হাসবে কলার তুলে।
যাঁকে নিয়ে এত রটনা, জল্পনা সেই মহীনবাবু ঘটনাটা ঘটিয়েছেন সত্যিই। ভূত কিনেছেন একটা, দশ হাজার কড়কড়ে নগদে, দিনু তান্ত্রিকের কাছ থেকে। বোতলবন্দী ভূতটার সঙ্গে দিনু দিয়ে গেছে কাগজে লেখা একটা মন্ত্র, ভূতকে বশে রাখবার জন্য। এখন ভূতটাকে বশ করে কী কাজে লাগানো যায় সেই চিন্তা। মহীনবাবুর বিশাল বাড়ি, ধনসম্পত্তি পাহারা দিতে কাজে লাগতে পারত। কিন্তু গতবছর ছিঁচকে চোর খদু ধরা পড়েছিল। তাকে সারারাত উপদেশমূলক কবিতা শোনানোর পর থেকে হেতমপুরের চোর-ছ্যাঁচড়রা আর এদিকে ঘেঁষে না তেমন। ভূত ব্যাটাকে কবিতা শোনানো যেতে পারে! এমন জব্বর একটা ফন্দি পেয়ে মহীনবাবুর চিন্তান্বিত মুখে হাসি ফুটে ওঠে। ঠিক আছে, ভূতটাকে ইচ্ছেমতো হুকুম করা যাবে, চটপট যা বলা হবে করে দেবে।
প্রসঙ্গত জানাই, মহীনবাবুর কাজের লোকের অভাব নেই। বরং সংখ্যায় তারা দরকারের কিছু বেশিই। তবে ওই, ওদের মধ্যে চটপটে একমাত্র রাখালকেই বলা যায়। বাকি তিনটি বুড়ো এবং নানান ডিগ্রিতে কালা। বিশাল বাড়ির কোন কোণে কে বসে ঝিমোয়, মাঝেমাঝে দিন কয়েক করে তাদের দেখা পর্যন্ত পান না মহীন। একবার স্রেফ পরীক্ষামূলকভাবে সবচেয়ে বয়স্ক মাধবকে চাকরি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। সে শুনতেই পায়নি এবং থেকে গেছে প্রত্যাশিতভাবেই। রাঁধুনি বিনোদিনী এ-বাড়িতে একমাত্র মহিলা। তাকে সবাই ভয় করে চলে। মহীনবাবু বিনোদদিদি ডাকেন, মাঝেমাঝে ভুলে ভয়ে ভক্তিতে দাদা বলেও ডেকে ফেলেন। সে কালা নয়, কিন্তু তারও এক কাঠি ওপরে। সে কারওর কথায় কান দেওয়ার দরকারই মনে করে না। স্বামী মারা গেছে আজ বছর কুড়ির ওপর। অজগাঁয়ে তার দেশবাড়ি ছেড়ে পেটের দায়ে এসেছিল এই হেতমপুরে। সেই থেকে রয়ে গেছে এ-বাড়িতেই, আর কবে যেন রাঁধুনি থেকে সর্বময় কর্ত্রী হয়ে উঠেছে। মোট কথা, নিজের বাড়িতে মহীনবাবুর কোনও ভয়েস নেই, কোনও স্ট্যাটাস নেই। জীবনে ঘেন্না ধরে গেল। একটা ভূত হলে সুবিধে হবে বইকি। নিজেকে বেশ কর্তাব্যক্তিমতো মনে হবে। মনের আনন্দে মাথা নাড়তে নাড়তে মহীনবাবু গোঁফে তা দিতে যান, আর মনে পড়ে যায় তা দেওয়ার মতো গোঁফ তাঁর কোনোওকালেই ছিল না। সমস্ত আনন্দের গুড়ে বালি ঢেলে দিয়ে বিনোদের কাংস্যবিনিন্দিত কন্ঠ ভেসে আসে, “কাঁচকলা আনতে বলেছিলুম কি না? বাবুর কাল পেট খারাপ হয়েছিল, ফুলকপি খাইয়ে খুনের দায়ে পড়বি তুই! যা আবার বাজারে যা, এবার ভুল করলে দুপুরে হাওয়া খাইয়ে রাখব!”
ভূতটা কিন্তু মোটেও মহীনবাবুর মনোমতো হল না। রাতের খাওয়াদাওয়ার পরে ঘরের দোর দিয়ে গুছিয়ে বসেছিলেন তিনি। গত দু’দিন যাবত দু’বেলা কাঁচকলার ঝোল-ভাত খেয়ে জীবনে ঘেন্না ধরে এসেছিল প্রায়। মন্ত্র লেখা কাগজটা হাতে নিয়ে একটু চনমনে বোধ করছিলেন। হাতে কাগজ, সামনে বোতল। খোলার আগে তিনবার স্পষ্ট উচ্চারণে পাঠ করতে হবে মন্ত্র। বেশ রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি, গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। কাগজটা দু-চারবার কপালে ঠেকিয়ে ভাঁজ খুলতেই কিন্তু চোখ কপালে উঠল। অপরিষ্কার হাতের লেখা, তায় আবার দিনু জামার বুক পকেটে রেখেছিল বোধহয়, ঘামে ভিজে অস্তিত্বসংকটে পড়েছে। এমন অস্পষ্ট লেখা স্পষ্ট উচ্চারণে মানুষে পড়তে পারে! চশমা নাকে চড়িয়ে মনে মনে বার কয়েক পড়লেন মহীনবাবু, এটা ‘ভূতনাথায়, ভূতেশ্বরায়’ হবে না? ‘ভূতনাথেয়, ভূতেশ্বরীয়’ লিখেছে কেন? ভুলটাই পড়া ঠিক হবে, না ঠিক করে নিয়ে পড়বেন - দোলাচলে তিনবার পড়া হল না চারবার মনে রইল না। বার দুয়েক আটকালেন, একবার গলা খাঁকারি দিতে হল শুরুতেই, স্পষ্টতার ধারকাছ দিয়ে যাওয়া গেল না। অতঃপর বোতল খুলতেই একটা অদ্ভুত গন্ধ আর কিছুটা ধোঁয়া বেরিয়ে এল। পূতিগন্ধ আশা করেছিলেন মহীনবাবু, বদলে পেলেন বিড়ির গন্ধ। বুকভরা আশা যেন ধুক করে নিভে গেল ওতেই। তবু ধোঁয়া থেকে তৈরি হতে থাকা অবয়বটার মুখ চেয়ে বুক বেঁধে ছিলেন, কিন্তু সে পুরোপুরি দৃশ্যমান হতে সন্দেহের আর অবকাশ রইল না - মহীনবাবুর কপালে আলাদিনের জিন নয়, জুটেছে একটি ক্ষয়াটে গোবেচারা চেহারার ভূত, পরনে আবার তার ফুটো গেঞ্জি আর লুঙ্গি। খক খক করে কাশতে কাশতে খানিকটা দিশেহারা তাকায় সে এদিক ওদিক। ভূত কাশে কেন? মর্মাহত মহীনবাবু প্রশ্ন করেন, “এই যে, নাম কী তোমার?”
ভূতের চোখে সামান্য ফোকাস আসে। সে করজোড়ে বলে, “আজ্ঞা, পরাণ মন্ডল।”
পরাণ! ভূতের নাম কি পরাণ হওয়া উচিত? তা কি আর করা যাবে, জীবিতাবস্থায় যা নাম ছিল। নামটাও যেন সাদামাটা, কোনও চটক নেই। আর কী প্রশ্ন করা যায় বুঝতে না পেরে মহীনবাবু জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কী করতে পার?”
ভূত ফ্যাল ফ্যাল তাকায়, “আজ্ঞা?”
কী আজ্ঞা করা যায় সেটা মহীনবাবু ঠিক করতে পারেন না। গলায় গাম্ভীর্য এনে বলেন, “আচ্ছা, কাল সকালে ডাকব, তুমি এখন বোতলে ঢুকে যাও আবার।”
পরাণ মাথা নাড়িয়ে বলে, “পারবনি আজ্ঞা।”
বোঝা যায়, চেহারায় একটু ঝাপসা ভাব থাকলেও পরাণ এখন পুরোপুরি বায়বীয় রূপ ধারণ করতে পারবে না।
এ মহা জ্বালা হল! ভূতকে বোতলবন্দী করার আলাদা মন্ত্র থাকে বোধহয়। দিনু তো বলেনি কিছু! অতএব মহীনবাবু খাটে ওঠেন, ভূত দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে ঝিমোয়। ঘুমের মধ্যেও হতাশা চেপে ধরে মহীনবাবুকে - তাঁর পোষা ভূতও ঝিমোয়, তাঁর কাজের লোকদের মতো!

চটপট করা দরকার এমন কোনও কাজের কথা ঝটপট মাথায় আসে না মহীনবাবুর। সকালবেলা হঠাৎ দেখেন, মোবাইলটা খুঁজে পাচ্ছেন না। একটা আদ্যিকালের মোবাইল, দরকারেও লাগে না তেমন। তাও পরাণকে একটু বাজিয়ে দেখতে চেয়ে বলেন, “যাও তো পরাণ, আমার মোবাইলটা খুঁজে আনো তো।”
পরাণ সকাল থেকে চেষ্টা করে এই সবে পেপার ওয়েটটা তুলতে পেরেছিল। নাহলে হাত ফসকে পড়ে যাচ্ছিল সবই। প্রভুর আজ্ঞা শুনে সে কোথা থেকে এক তেলচিটে বোতলভর্তি মবিল নিয়ে এল, তাও আবার চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে ফেলে ভেঙেছিল প্রায়।
“আরে না না, মোবাইল, মবিল নয় - ফোন, ফোন!” বলতে সে এবার ল্যান্ড ফোনটাকে টেনে হিঁচড়ে বসার ঘর থেকে এনে ফেলে। তারের দৈর্ঘ্য বাদ সাধে বলে ঘরের ভেতরে আনতে পারে না।
পরাণের সময়কালের বোধ ধোঁয়াটে। কিন্তু এই ঘটনা থেকে মহীনবাবু ধারণা করেন যে পরাণের মৃত্যু মোবাইল পূর্ববর্তী যুগে হয়েছিল।

একদিন পরাণকে একটা চিঠি ডাকবাক্সে ফেলতে পাঠিয়েছিলেন। সে দুপুর গড়িয়ে বিকেল করে ফিরল। পথ হারিয়ে ফেলেছিল। হয়তো চিঠিটাও। হেতমপুর তার গ্রাম নয়। কাছের কোনও গ্রামেই সে থাকত, কিন্তু নাম এখনও মনে করতে পারেনি।

পরাণ বেশ খাদ্যরসিক অবশ্য। একটু যাকে বলে নোলা আছে। মহীনবাবুর অনুমতি নিয়েই লুচিটা মিষ্টিটা খায় মাঝেমাঝে। তবে বিনোদের রাজত্বে লুচির আবির্ভাব হয় মাসে একবার কি দু’বার। বাকি কাঁচকলা, ঝিঙে, হ্যানত্যানের ঝোল, ঘ্যাঁট-তরকারি, পাতলা ডাল - পেটের রোগীর পথ্য বারোমাস খেয়ে মহীনবাবু তিতিবিরক্ত। একদিন পরাণকে বলেন, “যা দিকি পরাণ, কিছু একটা সুখাদ্য নিয়ে আয় তো, এ অত্যাচার আর সইছে না!”
পরাণ আশ্চর্য হয়ে বলে, “কী সুখাদ্য, আজ্ঞা?”
সুখাদ্য মহীনবাবুর কপালে এতই কম জোটে যে হুটহাট নামও মনে আসে না কিছু। রেগে বলেন, “আরে, আন না কিছু একটা ভালো খাবার!”
পরাণ হাত পাতে। বলে, “দ্যান পয়সা, দেখি কী পাই।”
মহীনবাবু পরাণকে এই মারেন কি সেই মারেন। “ভূত হয়ে খাবার কিনে আনবি, তোর লজ্জা করবে না! ম্যাজিক কর, ম্যাজিক!”
পরাণ তোম্বা-মুখে বেরিয়ে যায়। ফেরে ঘন্টা দুই পর, একটা কলাই করা থালায় পান্তা আর শুঁটকির ঝালচচ্চড়ি নিয়ে। তখন মুখে একগাল হাসি। বলে, “খান কত্তা, আমার গিন্নি বাঙাল ছিল। যেমন মুখের ঝাঁঝ তেমন হাতের রান্না! একদম তার কথা মনে পড়িয়ে দিলে। একটু পেসাদ রাখবেন আমার জইন্যে!”
মহীনবাবুর একগাল মাছি - সুখাদ্য শেষে পান্তা আর শুঁটকি! তায় আবার কলাই করা থালা, কার মুখের গ্রাস কেড়ে এনেছে কে জানে! শুঁটকির ভবিতব্যের ভাবনা মুলতুবি রেখে আগে সে-কথা পাড়েন মহীন। উত্তরে পরাণ পায়রার মতো বুকের খাঁচাখানা ফুলিয়ে দাঁত বের করে হাসে। “সে কি আর আমি ভেবে দেখিনি, কত্তা! গরিবের দুপুরের খাবারটুকু বদলে কিছু না দিয়ে তুলে আনতে পারি! ঠান্ডা আলমারির মইধ্যে থেকে মুড়ো সমেত বড়ো কাতলা মাছের দাগা-পেটিগুলো...  এ কী, এ কী কত্তা, কী হল?”
হয়নি কিছুই, মহীনবাবু ধপ করে বসে পড়েছেন আরামকেদারায়। কাল সকালে জানতে পেরে বিনোদদিদি কী মূর্তি ধারণ করবে, সে চিন্তায় তাঁর হৃদযন্ত্র কাজে ইস্তফা দেওয়ার উপক্রম করছে।

সে রাতে আর ঘুম এল না মহীনবাবুর। বিনোদের আক্রমণের ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয় হয় অবস্থা। স্থূলদেহ না থাকলে পরাণের বোতলে আশ্রয় খোঁজা যেত। কিন্তু দেহখানা পরিত্যাগ করার বিশেষ ইচ্ছে এই মুহূর্তে না থাকায় জোর করে মনে জোর এনে আক্রমণ প্রতিহত করার উপায় ভাঁজতে বসলেন মহীনবাবু। শুঁটকি আর পান্তার ভোজ সাবড়ে পরাণ তখন মেঝেতে শুয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুম দিচ্ছে। কে জানত ভূতেরা নাকও ডাকে! নাসিকাগর্জন না হলেও মনঃসংযোগ নষ্ট করার পক্ষে যথেষ্ট সেই ডাকাডাকি। তা সত্ত্বেও পৈত্রিক প্রাণটিকে রক্ষা করার জন্য ভাবনার কাজটাকে চালু রাখতেই হল। পালটা আক্রমণ করবেন, নাকি মাছের অন্তর্ধান কোনওরকম যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করবেন, নাকি ভাজা মাছটি উলটে খাননি গোছের ভাব করবেন - ঠিক করতে করতে ভোর চারটে বেজে গেল। অবশেষে মহীন মনস্থ করলেন, মাছের সম্বন্ধে তিনি কিছু জানেন না এবং বিন্দুমাত্র কেয়ার করেন না গোছের ব্যবহার করাই উচিত হবে। তিনি বাড়ির কর্তা, ফ্রিজ-ভাঁড়ারের খবর তো তাঁর রাখার কথা নয়। তাও একটা সামান্য দু’কেজির কাতলা মাছ - হেতমপুরের জমিদারবাড়ির বংশধর শেষে অমন একটা তুচ্ছ জিনিস নিয়ে মাথা ঘামাবে! ছোঃ!
‘ছোঃ’ কথাটা মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, আর বেরোতেই কেমন যেন বুকে বল পেলেন মহীনবাবু। একটু এক্সপেরিমেন্টালিই আবার ছোঃ বললেন। হ্যাঁ, সত্যিই তো! সাহসের লেভেলটা যেন হাফ ইঞ্চি খানেক বেড়ে গেল মনে হল! নবলব্ধ সাহসে ভর করে মহীনবাবু বলতে থাকলেন, “ছোঃ! ছোঃ! ছোঃ!”
বার কুড়ি-পঁচিশ বলার পরে নাক ডাকা থামিয়ে ঘুম চোখে উঠে বসে পরাণ। বলে, “কত্তা, এত হাঁচতেছেন ক্যানো? সর্দি লাগল?”
সর্দির মতো বিচ্ছিরি জিনিসের নামে কার না উৎসাহে আর সাহসে ভাটা পড়ে! মহীনবাবুরও পড়ল। মুখ চোখ কুঁচকে শেষবারের মতো ‘ছোঃ’ বলে খাটে শয়ান হলেন। পরাণ জুলজুল করে তাকিয়ে বলে, “তুলসীপাতা নে’ আসব? মধু দে’ মেড়ে খেলে...”
মহীনবাবু পরাণের দিকে ফিরে হাতজোড় করে বলেন, “ক্ষ্যামা দে বাপ। আজকে এই যথেষ্ট কাজ বাড়িয়েছিস। দরজার ছিটকিনিখানা বন্ধ আছে কি দেখে নে একবার, তারপর মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাক।”
পরাণ উঠে দরজার ছিটকিনি দেখতে যায়। আর মহীনবাবুর মনে প্রশ্ন আসে। জিজ্ঞেস করেন, “হ্যাঁ রে, তুই তো ভূত। তুলসীগাছে হাত দিতে পারবি? ঠাকুরদেবতার গাছ না? আমার মা তো নারায়ণপাতা বলত!”
পরাণ শক্ত করে ছিটকিনি আটকে ফিরে আসতে আসতে দেঁতো হাসে। বলে, “আজ্ঞা না, ভগবানের কাছে মানুষে ভূতে ফারাক নাই। ভূত বলে আমাদের হেলাচ্ছেদ্দা করেন নেকো।”
মহীনবাবু হাঁ হয়ে যান। আধ্যাত্মিক আলোচনায় নামতে বড়ো ইচ্ছে হয়, কিন্তু কাঁচকলা-লাউ-ঝিঙে খাওয়া পেটে রাত জাগার দরুন ভুটভাট শুরু হয়ে গেছে। ঝুঁকি না নিয়ে ঘুমিয়ে পড়াই শ্রেয় মনে করে পাশ ফেরেন।

ভোরের ঘুমটা জম্পেশ এসেছিল। একটা বেড়ে স্বপ্নও এসেছিল। বাড়ির উঠোনে বসে আছেন মহীন, আর সামনে পক্ককেশ, শ্মশ্রুমন্ডিত মুখমন্ডলের এক বৃদ্ধ - অনেকটা প্রাণের ঠাকুর রবীন্দ্রনাথের মতো দেখতে। তুলসীগাছ থেকে পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে নিজের হাতে করে খাইয়ে দিচ্ছেন তাঁকে। খাইয়ে যাচ্ছেন, আর মহীন খেয়ে যাচ্ছেন। চারদিকে একটা পবিত্র পবিত্র গন্ধ - ধূপ, ধুনো আর খিচুড়ি ভোগের। মহীনের মনটা খিচুড়ি খিচুড়ি কচ্ছে, কিন্তু বলতে পারছেন না। পাতা খেতে খেতে গাছ ফাঁকা হতে চলল, নিজেকে ছাগল ছাগল মনে হচ্ছে, তবুও বলতে পারছেন না। কারণ, পাতা খাওয়া ছাড়া অন্য কোনও কারণে মুখ খুলতে গেলেই বৃদ্ধের মুখ বিনোদদিদির মুখের মতো হয়ে যাচ্ছে। অবশেষে পাতা শেষ হয়ে গেল। তখন বৃদ্ধ একটা বিশাল জামবাটি থেকে কাঁচকলা সিদ্ধ তুলে তুলে মহীনের মুখে দিতে লাগলেন। এবার মহীন কেঁদেই ফেলতেন, কিন্তু মোক্ষম সময়ে ঘুমটা ভেঙে গেল।
ঘুম ভাঙল বিনোদিনীর মাজা গলার চিৎকারে, সেকথা বলাই বাহুল্য। উঠোনের মাঝখানে নেমে গলা তুলে বিনোদদিদি চেঁচাচ্ছে, “বলি অতগুলো মাছ সেরেফ উবে গেল ফিরিজ থেকে? তোরা আনসান বলবি, আর আমায় বিশ্বেস করতে হবে! সদর দরজা এঁটে বন্ধ করা, সব দরজা ভেতর থেকে ছিটকিনি দেওয়া - এ-বাড়ির মধ্যেকার কারওর কাজ না হয়ে যায় না! তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে সব, কার এত নোলা বল? দু’কিলো মাছ এক রাত্তিরে কোথায় সরালি!”
শুয়ে শুয়েই দাঁতকপাটি লাগে মহীনবাবুর। বুকে বল-টল রাতের স্বপ্ন বলে মনে হয়। গোয়েন্দার বাড়া বিনোদ, বাড়ির ভেতরের লোকের কাজ ঠিক বুঝে গেছে! তাঁকে কেউ ডাকেনি, সাড়া করা উচিত কি না সেটা বুঝে উঠতে পারেন না মহীনবাবু। দুর্গা ঠাকুর, কালী ঠাকুর, লক্ষ্মী ঠাকুর, সরস্বতী ঠাকুর - সব দেবী মায়েদের বারে বারে স্মরণ করেন তিনি। শিব-বিষ্ণু-কৃষ্ণকে ডাকেন না - বিনোদকে সামলানো ওঁদের কম্ম বলে মনে হয় না। শেষটা রবি ঠাকুরকে প্রাণপণ ডাকেন। বলেন, “মূক মুখে ভাষা দাও, ঠাকুর। খান দুয়েক কথা হিক্কা না তুলে বলতে পারলেই যথেষ্ট মনে করব।” তারপর পরাণকে ইশারায় ডাকেন। পরাণ জেগে বসে ছিল; উৎকর্ণ হয়ে বিনোদের চিৎকার শুনছিল। তাকে বলেন, “শোন, শিগগির আমার আলমারি খুলে তার ভেতর সেঁধিয়ে যা দিকি। আমার রান্নার দিদি তোকে দেখতে পেলে কুরুক্ষেত্তর করবে। তোর আমার দু’জনেরই এ-বাড়ির বাস উঠবে।”
গোটা গাঁয়ে মহীনবাবুর ভূত বা মতান্তরে ‘ঝাপসা মতো মানুষটা’কে নিয়ে চর্চা হচ্ছে বটে, কিন্তু বাড়ির লোকজন কেউ এখনও তাকে চাক্ষুষ করেনি। করুক বলে মহীন চানও না।
একটু গাঁইগুঁই করে পরাণ। বলে, “দম বন্ধ হয়ে যাবে যে, কত্তা!”
দাঁত মুখ খিঁচিয়ে মহীনবাবু বলেন, “ভূতের আবার দম, সে আবার বন্ধ হবে!”
পরাণ যুঝে চলে। বলে, “নিশ্বেস নিই তো আমি! নাক ডাকছিলাম শোনেননি!”
মহীন একপ্রকার তাড়িয়েই তাকে আলমারিতে ঢোকান। দরজায় একচিলতে ফাঁক রেখে দেন যদিও। খুনের পাপ করতে পারবেন না।
আস্তে আস্তে দরজা খোলেন মহীন। গলাটা একটু বাইরে বের করে সিংহনাদ ছাড়ার চেষ্টা করেন। কোনও নাদই বেরোয় না, একটা চিঁ চিঁ শোনা যায় মাত্র। তা লাউ আর কাঁচকলা খেয়ে আর কত বা হবে। মিনতির সুরে বলেন, “অ বিনোদদা, মানে দিদি, সকাল সকাল এ কী শুরু করলে গো!”
শেষদিকটা গলা ক্ষীণ হয়ে আসে, শোনা যায় না আর। নিজের কানেই কথা পৌঁছয় না। বিনোদ ভারি চেহারা নিয়ে ধপ ধপ করে এগিয়ে এসেছে ততক্ষণে। সে দরজার যত কাছে আসে, মহীন তত পিছু হটেন। শেষটা খাটে বসে পড়েন তিনি, আর বিনোদ দরজায় দাঁড়িয়ে শাণিত গলায় বলে, “দেখুন বাবু দেখুন, সকাল সকাল কী অশৈলে কান্ড, অত্ত বড়ো কাতলা মাছটা, মুড়ো সমেত একদম গায়েব! মুখপোড়ারা কোনও কথা স্বীকার যায় না! সব আমি কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেব, এই আপনাকে বলে দিলাম। বলি এ কী, এ কী, এ-ঘরে কলাই করা থালা কেন! দেখি দেখি। অ মা-আ-আ, এ তো এঁটো থালা, শুঁটকি মাছের গন্ধ! এ-বাড়িতে তো শুঁটকি মাছ আসে না আপনি খান না বলে। তবে কি সত্যি কথা শুনছি, বাবু? আপনি কি বাড়িতে ভূত পুষেছেন?”
প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষা করে না বিনোদ। মহীনবাবু তেমন একটা উত্তর দেওয়ার অবস্থায় ছিলেন বললেও মিথ্যে বলা হবে। ব্রেক ফেল করা দানব ট্রাকের মতো দুর্দান্ত গতিতে বিনোদ বলতেই থাকে, “কী অশৈলে কান্ড গো মা! সর সর, মুখপোড়া ড্যাকরা! রাখাল ভাত নামা, আমি গণেন ওঝার কাছে যাচ্ছি! এর একটা হেস্তনেস্ত না করে আমি ছাড়ব না! এ হরেন, এই থালাখানা ফেলে দে বাইরে ছুড়ে। ভজকাকা আমার হাতে জল দাও দিকিনি। ভূতপেরেতের এঁটো, মা গো!” বাক্যবাণ বর্ষাতে বর্ষাতে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় বিনোদ। আগুন ঝরানো দৃষ্টি হেনে যায় মহীনবাবুর দিকে।
খাবি খাওয়া বন্ধ হলে পর কাঁপতে কাঁপতে আলমারির কাছে গিয়ে মিহি গলায় ডাক দেন, “অ পরাণ!”
ভেতর থেকে সন্ত্রস্ত স্বরে জবাব আসে, “ও গেছে?”
“ওঝা আনতে গেছে রে! তুই কিছু ম্যাজিক কর না!”
ভেতর থেকে কম্পিত গলা ভেসে আসে, “ও ম্যাজিকে কিছু হবেনি, কত্তা। আশপাশ খালি থাকে তো ক’ন, আমি বাড়ির বাইরে যেয়ে লুকাই কোথাও।”
মহীনবাবু সাহস দিতে চেষ্টা করেন পরাণকে, “ও ওঝা-টোঝা বুজরুকি বাবা, ওদের কোনও ক্ষমতা নেই। তুই একটু ম্যাজিক করে...”
পরাণ মাথা গলিয়ে উঁকি মারে বাইরে। বলে, “ওঝাকে ভয় পাই না, আজ্ঞা। বিনোদিনী মন্ডলকে ভয় পাই।”
স্থাণুবৎ হয়ে যান মহীন। বলেন, “তুই নাম জানলি কী করে?”
আপাদমস্তক একবার শিউরে উঠে পরাণ বলে, “বিনোদিনী আমার পরিবার, আজ্ঞা।”

আরামকেদারায় বসে আছেন মহীনবাবু। আরামকেদারায় বসে আছেন বটে, কিন্তু আরামে বসে আছেন এ-কথা শত্তুরেও বলতে পারবে না। বারুদের স্তূপের ওপরে বসে থাকলে যেমন অনুভূতি হয় ঠিক তেমনটা মনে হচ্ছে মহীনবাবুর। বারুদের স্তূপের ওপর বসার অভিজ্ঞতা কখনও হয়নি সে-কথা সত্যি বটে, কিন্তু ঝড়ের পূর্ববর্তী আবহাওয়ার মতো এই দমচাপা উৎকন্ঠার চেয়ে বারুদের স্তূপ ঢের বেশি ভালো এবং অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বোধ হচ্ছে এই মুহূর্তে। ওঝা নিয়ে বিনোদিনী ফেরেনি এখনও, পরাণ কোথায় গিয়ে লুকিয়েছে কে জানে।
মহীনবাবুর অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে একখানা দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে। এ-সংসারে একান্ত ব্যক্তিগত বলতে তাঁর আছে ওই একখানা ভূত, হোক সে রোগা দুর্বল ক্ষয়াখপ্পুরে। সেটুকুও যদি বিনোদিনীর নাগাল থেকে রক্ষে না পায়! সুখাদ্যের লোভটাই কাল হল। সাধে কি আর মহাপুরুষেরা বলে গেছেন - লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু! নাহ্‌, আর প্রাণ টিঁকছে না এই সংসারে। সন্ন্যাস নিয়ে নিলে হয়। রোজ রোজ লাউ আর কাঁচকলা আর ঝিঙে - এও তো একপ্রকার কৃচ্ছ্রসাধনই! হ্যাঁ, সেটাই ভালো। গণেন ওঝা সমেত বিনোদিনীর প্রত্যাবর্তনের আগেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে পারলে সবদিক রক্ষে হয়!
সন্ন্যাস গ্রহণের বুদ্ধিটা পালানোর পথ হিসেবে মন্দ মনে হয় না। কিন্তু সন্ন্যাস নিতে গেলে ঠিক কী কী প্রয়োজন হয় সেটা ভালো মনে পড়ে না মহীনের। আচ্ছা, পিসিঠাকমার নামাবলিটা যেন কোথায় রাখা আছে? কাঁপা গলায় মাপা কাঠিন্য আর বৈরাগ্য সঠিক অনুপাতে মেশানোর চেষ্টায় একটা আর্তনাদসম স্বর বেরোয় মহীনের গলা থেকে। আওয়াজ দেন, “রাখাল! রাখাল!”
রাখাল বিনোদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে উঠোনে হাত-পা মেলে বসে বিড়ি খাচ্ছিল। অমন হাহাকারের টানে বিড়ি ফেলে কোনওরকমে ছুটে আসে। বলে, “কী হল, কত্তাবাবা? বুকে ব্যতা হচ্চে? মাতা ঘুরচে?” তারপর যখন খেয়াল করে যে মহীনবাবুকে ঠিক মুমূর্ষু দেখাচ্ছে না, তখন সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে একগাল হাসে। বলে, “অ বুয়েচি। খিদে লেগেচে, না কত্তা?”
মহীনের বুকের ভেতর লেলিহান বৈরাগ্যের শিখার ওপরে যেন ঝপ করে এক বালতি জল এসে পড়ে। এইবারে বোঝা যায়, বৈরাগ্য-টৈরাগ্য নয়, চিনচিনে ওটা চির চেনা গ্যাসের ব্যথা। আর পেটের মধ্যে আরও পরিচিত একটা অনুভূতি - খিদে, চাগাড় দিচ্ছে।
রাখাল প্রশ্ন করে, “কী খাবেন, কত্তা? মুড়ি ভিজিয়ে আনব, না আজ শসা-মুড়ি খাবেন?”
মাথাটা চড়াৎ করে গরম হয়ে যায় মহীনের। দাঁত খিঁচিয়ে বলেন, “কেন, রোজ ওরকম রুগীর পথ্য খেতে যাব কেন রে? আজ আমি নারাণের দোকানের জিলিপি দিয়ে মুড়ি খাব।”
রাখাল থতমত খেয়ে যায় প্রথমটা। কিন্তু তারপর বলে, “তা আনা যায় বটে। গণেনের বাড়ি নেহাত কম দূর নয়।  দ্যান কত্তা পয়সা দ্যান, ঝপ করে নে আসি গে। বিনোদদিদি আসার আগে খে’ শেষ কত্তে হবে।”
দেরাজ খুলে দরাজ হাতে টাকা বের করে দেন মহীনবাবু। বলেন, “সবার জন্য আনিস অমনি। ভজকাকার জন্য দুটোর বেশি আনবি না, ও আমার চেয়েও বেশি পেটরোগা। আর, আর শোন, মাধবকাকা কোথায়? সকালে এত চেঁচামেচিতেও সে সাড়া দিল না - বেঁচেবর্তে আছে কি না খোঁজ নিয়েছিস?”
রাখাল একগাল হেসে বলে, “না কত্তা, সে ঠিক আচে। সত্যি বলতে কী, আপনার আমার চেয়ে ভালো আচে আজকে। ভগবানের দয়ায় তার কান এক্কেরে খারাপ হয়ে গ্যাচে কি না। খিড়কিপুকুরের ধারে বসে দিব্য হুঁকো টানচিল দেখলুম ছাত থেকে। ও-বুড়োকে একটার বেশি দেব না - দাঁত নাই তো, গোটা দিন ধরে ওই চুষে চুষে খাবে এখন।”
জিলিপির ভাগ ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে একটা বেশ পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা ফেঁদে বসার তালে ছিল রাখাল। মহীনবাবুর তাড়নায় সেটা বাস্তবায়িত হল না আর।

জিলিপি-মুড়ি চিবোতে চিবোতে রাখালের সঙ্গে পরামর্শ করতে বসেন মহীন। ঝিমিয়ে পড়া বুদ্ধির গোড়ায় জিলিপির রস দিয়ে তাকে একটুখানি চাঙ্গা করা গেছে। কিন্তু পুরো বিষয়টা বিশদে গুছিয়ে রাখালকে বোঝাতেই দশ মিনিট লেগে গেল। তারপর আবার পরাণ বিনোদিনীর মৃত স্বামী, সে-খবর শুনে রাখাল ফোঁস ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে শুরু করল। এক ফাঁকে কাঁধের গামছাটা দিয়ে চোখও মুছল যেন মনে হল। তারপর খানিকক্ষণ ভাবুক মুখে বসে থেকে বলল, “নিয্যস পাপীতাপী মানুষ ছিল, কত্তা। নাহলে কী কপাল দেখেন, মরার বিশ বছর পরে আবার সেই মারকুটে ঝগড়ুটে পরিবারের মুখে পড়তে হয়! আমার তো ভাবলেই হাট অ্যাট্যাক মতো মনে হচ্চে!” দুঃখে মুখে চুকচুক শব্দ করে সে। তারপর বলে, “কত্তা, চক্কোত্তিমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলি চলেন, গয়া-গঙ্গা-শ্রাদ্ধশান্তি করে যদি লোকটাকে মুক্তি দেওয়া যায়।”
হাঁ হাঁ করে ওঠেন মহীনবাবু। বলেন, “আরে, মুক্তি মানে? দশটা নয়, পাঁচটা নয়, একটা মাত্র ভূত আমার - না না, আমার মাথায় একটা ভালো বুদ্ধি এসেছে, গণেন এলে ওর কাছে ভূতকে বোতলে পোরার মন্ত্রটা জেনে নেব, হ্যাঁ! আর বোতল থেকে বের করার মন্ত্রটা তো দিনু লিখেই দিয়েছিল। চিরকুটটা খুঁজে বের করতে হবে স্রেফ। তারপর ইচ্ছেমতো ডাকব আর বোতলে ফেরত পাঠাব। বিনোদদিদি ঘুণাক্ষরেও টের পাবে না। খালি গণেনের সাথে একটু আলাদা করে কথা বলতে হবে।”
আপত্তিসূচক কী একটা বলতে গিয়েছিল রাখাল, কিন্তু হরেন তিরবেগে সিঁড়ির ওপরে তার নজরদারির পোস্ট থেকে নেমে ছুটে আসে তক্ষুনি। না, ঠিক তিরবেগে নয় বোধহয়। ষাট বছর বয়সে বেতো কোমরে কি আর তিরের গতিতে দৌড়তে পারা যায়? অতএব তার, “কত্তা, কত্তা, বিনোদ...” ইত্যাদি প্রভৃতি কথাবার্তা ভালোমতো শেষ হওয়ার আগেই সদর দরজা ঝনাৎ করে ঠেলে বিনোদিনী পদার্পণ করে, পেছনে চিমসে চেহারার গণেন ওঝা। হঠাৎ ঘাবড়ে গিয়ে মহীনবাবু হাতের শেষ জিলিপিটা, যেটা তারিয়ে তারিয়ে খাবেন ভেবেছিলেন সেটাকে পাঞ্জাবির পকেটে চালান করে দেন।
বাড়িতে ঢুকেই বিনোদিনীকে একপ্রকার সাইড করে দেয় গণেন। দরজার পাল্লা, সিঁড়ির রেলিংয়ে নাক ঠেকিয়ে কী যেন শোঁকে, তারপর পকেট থেকে একটা আতস কাঁচমতো কী বের করে মেঝেতে হামাগুড়ি দিয়ে ঘুরে ঘুরে এ-ঘর ও-ঘর করে। আলমারি, খাট, বৈঠকখানা ঘরের চেয়ারপত্তর, মায় ফ্রিজের নিচে উঁকি মারে, একটা কঞ্চি ঢুকিয়ে খোঁচাখুঁচি করে। প্রায় মিনিট চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ ধরে এই চলে। বিনোদের অতক্ষণ এক সঙ্গে মুখ বন্ধ রাখার অভ্যেস নেই। সে বার কয়েক প্রশ্নবাণ ছোড়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু গণেন গাম্ভীর্যপূর্ণ ইশারায় তাকে থামিয়ে দিয়েছে।
মহীনবাবুর খাটের নিচে ঢুকতে গিয়ে মাথায় পেল্লায় একটা গুঁতো খেয়ে শেষে গণেন ভূতান্বেষণে ক্ষান্তি দেয়। মানে দিতেই হয়। চোখ উলটে চিৎপটাং হয়ে মিনিট পাঁচ সে পড়ে ছিল। চোখেমুখে জলের ছিটে দিয়ে তবে তার জ্ঞান ফেরানো গিয়েছিল। উঠে বসে ভয়ানক বিরক্ত মুখে কপালের আলুটায় হাত বোলাতে বোলাতে সে বলে, “খামখা আমার সময় নষ্ট করলে পিসি, এখানে ভূত-ফুত কিছু নেই। আগে থেকে থাকতে পারে, কিন্তু এখন একদম কিচ্ছু নেই। ফক্কা। উঠোনে একটু বিড়ির গন্ধ আছে খালি, আর জ্যাঠামশাইয়ের ঘরটায় শুঁটকি শুঁটকি একটা গন্ধ। আর কোত্থেকে একটা জিলিপির বাস আসছে...”
বাকি আর বলতে পায় না গণেন। কনুইয়ে টিপ দিয়ে মহীন তাকে চুপ করিয়ে দেন।
বিনোদিনী যারপরনাই আশাহত হয়েছে, তার মুখ দেখেই বোঝা যায়। কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্রী সে নয়। অতএব ঝঙ্কার দিয়ে উঠে সে বলে, “আ মরণ মুখপোড়া, ওঝারা আবার কবে থেকে পুলিশ কুকুরের মতো শোঁকাশুঁকি করে রে! লঙ্কাপোড়া দিয়ে ভূতটাকে তাড়িয়ে বের করতে পারছিস না! সুরেন ওঝার ছেলে হয়ে, তোর লজ্জা করে না?”
কপালের ফোলার চিন্তা ছেড়ে গণেন এবার তেরিয়া হয়ে ওঠে। বলে, “বাপ তুলবে না পিসি, হ্যাঁ! ওঝাগিরি তুমি আমায় শেখাবে? দূর দূর গাঁ থেকে লোকে গণেনকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে - শোনো পিসি, সোজা কথা বলে দিই। আমি বুজরুকি করে পয়সা নেওয়া ওঝা নই। ভূত নেই, ব্যস নেই! ওসব ভড়ং করে ভূত তাড়ানোর খেলা আমি দেখাতে পারব না, ব্যস!”
চাপানউতোর আরও কিছুক্ষণ চলত, কিন্তু বর্ষীয়ান ভজহরি এবার মঞ্চে প্রবেশ করে। বলে, “অ বিনোদ, হল তো মা? রান্না চাপাবিনি আজ? সকাল থেকে সুদ্ধু দুটি মুড়ি খেয়ে আচেন কত্তা, সে খেয়াল আচে? তুই না পারিস, আমি না হয় গিয়ে দুটি ভাতে ভাত বসিয়ে দি’ গে।”
এবার টনক নড়ে বিনোদের। বৈঠকখানা ঘরের মধ্যে উঁকি দিয়ে ঘড়িখানা দেখে সে। সাড়ে দশটা বেজে গেছে দেখে ভারি অপ্রস্তুত হয় সে। তাছাড়া রান্নাঘর তার রাজত্ব। সেখানে আর কারওর অনুপ্রবেশের কথা সে চিন্তায় আনতে পারে না। ভেতরের দিকে হাঁটা দেয় সে। কিন্তু যাওয়ার আগে মহীনবাবুকে দুটো কথা শুনিয়ে যেতে ছাড়ে না। “যাচ্ছি ভজকাকা, তবে বাবুর চিন্তা মিছেই করছ। বাবু এখন পোষা ভূতের সঙ্গে মিশে লুকোছাপা করে শুঁটকি খাওয়া শিখেছেন। তাঁর আর খাবার চিন্তা নেইকো!”
বিনোদ অন্তর্হিত হতেই গণেন তেতো মুখে মহীনবাবুকে বলে, “দিন জ্যাঠামশাই, আমার আড়াইশোটা টাকা ফেলে দিন। সকাল সকাল গাঁয়ের এ-মাথা থেকে ও-মাথা দৌড় করালে! নবীগঞ্জের কাজটা সেরে এসে বসতেও পাইনি জানেন! আরে, এ-বাড়িতে ঢুকবে কোন ভূতের বুকের পাটা আছে বলুন তো? বিনোদপিসির চিলচিৎকারে আপনার বাড়ি কাকপক্ষী অবধি বসতে পায় না সেটা জানেন!”
আরও বলত গণেন, মহীন কতকটা জোর করেই তাকে থামিয়ে দেন। পকেটে টাকা ছিল না। জিলিপিটা গণেনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেন, “ও গণেন, একটু বোস, মহা সমস্যায় পড়েছি রে। বিনোদদিদি ভেতরে গেছে, এই সুযোগে বলে ফেলি। আমায় একটা সুরাহা করে দে এর - তোকে আড়াইশো কেন, আড়াই হাজার দিতে রাজি আছি আমি। যত লাগে তত দিতে রাজি আছি। আয় বাবা, আয়। এই রাখাল, মাধবকাকার ভাগের জিলিপিটা গণাকে দিয়ে দে তো শিগগির।”

জিলিপি চিবোতে চিবোতে সবটাই মন দিয়ে শোনে গণেন। মহীনবাবুর বুকে একটুখানি আশা ধুকপুক শুরু করে। কিন্তু তারপর আঙুল চাটতে চাটতে মাথা নাড়াতে থাকে গণেন। বলে, “সবই তো বুঝলাম, জ্যাঠামশাই। কিন্তু পবলেমটা হচ্ছে গিয়ে, ওই ভূত বোতলবন্দী করার ব্যাপারটা আমি জানি না।”
আঁতকে উঠে মহীন বলেন, “সে কী রে! সুরেন ওঝার ছেলে...”
মহা বিরক্ত হয়ে হাত তুলে তাঁকে থামিয়ে দেয় গণেন ওঝা। বলে, “বার বার বাবার কথা তোলেন কেন বলুন তো! আরে বাবার যুগ ছিল অন্য, আর এই যুগ হচ্ছে আলাদা। এই মোবাইল ফোন ইলেকটিকের যুগে গাঁয়ে একটা ওঝা পাচ্ছেন, সেটা চাট্টিখানি কথা! বাবার সময়ে গাঁয়ে গাঁয়ে ওঝার বাস ছিল। আর এখন দেখুন তো, আশেপাশের দশ-বারোটা গ্রাম - কোথাও একটা কাউকে যদি পান! সাধে এত দূর দূর থেকে আমার ডাক আসে! কাত্তিকগঞ্জের দুলু ওঝার ছেলে মোবাইলের শোরুম দিয়েছে জানেন!”
কথাগুলো নিয্যস সত্যি। মহীনবাবু ভয়ানকরকম লজ্জিত হয়ে ক্ষমা চাইতে যাচ্ছিলেন, তাঁকে আবার হাত তুলে থামিয়ে দেয় গণেন। বলে, “দেখুন, আমি পোফেশনাল। মিথ্যের ব্যবসা করি না, সোজা কথা। অন্য লোক হলে খানিক অং বং চং করে একটা খালি বোতল আপনার হাতে ধরিয়ে টাকা হাতিয়ে চলে যেত। কিন্তু গণা ওঝা সেরকম মানুষ নয়। আর যুক্তি দিয়ে ভাবুন - ওঝারা ভূতকে বোতলবন্দী করতে জানবে কেন? লোকে আমাদের ডাকে ভূত তাড়াতে। কোন গেরস্ত ভূত পুষে ঘরে রাখতে চায় বলুন? হ্যাঁ, তান্ত্রিকরা এসব পারে। ভূতকে বশ করে কাজকম্ম করানোর জন্য।”
বলতে বলতে গণেনের চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বোঝাই যায়, তার মাথার মধ্যে বুদ্ধির সলতে জ্বলে উঠেছে। সে বলে ওঠে, “দিনু তান্ত্রিকের কাছ থেকে কিনেছিলেন তো ভূতটা? তা দিনুকে ধরলেই তো হয়। ওরই তো সার্ভিস দেওয়ার কথা! লিখিত গ্যারেন্টি নেননি কিছু?”
মহীনবাবু হাঁচোড়পাঁচোড় করে আরামকেদারার ওপর সোজা হয়ে উঠে বসার চেষ্টা করেন। বলেন, “আরে, তাই তো! দিনুটাই যত নষ্টের গোড়া! একটা আফটার পারচেজ সার্ভিস থাকবে না! দশ হাজার টাকা নিয়েছিস ব্যাটা, মন্ত্রটার বানান পর্যন্ত ঠিক করে লিখিসনি! কোনও প্রফেশনালিজম নেই! এই যা তো রাখাল, দিনুকে ডেকে আন জলদি। আরে দাঁড়া দাঁড়া, খিড়কি দরজা দিয়ে আসতে বলবি, বিনোদদিদি দেখতে পেলে মহা বিপদ হবে!”
ব্যাপার দেখে দেখে গণেন হাঁটুতে চাপড় মেরে খ্যাঁকখেঁকিয়ে হাসে। বলে, “ভুল বানানে মন্ত্র? তা হবে না কেন, পাট-টাইম তান্ত্রিকের বিদ্যের বহর আর কদ্দূর হবে! দিনে সাইকেল মিস্তিরি, রাতে তন্ত্রসাধনা! হ্যাহ্‌! যাই বলুন আর তাই বলুন, গণা ওঝা অন্তত ওসব আধাখ্যাঁচড়া কাজ করে না। দিন জ্যাঠামশাই, আমার আড়াইশো প্লাস অ্যাডভাইজের পঞ্চাশ। বড্ড দেরি করিয়ে দিলেন, এহ্‌।”

দিনুর আড্ডা থেকে ঘুরে আসতে রাখালের বেশি সময় লাগে না। ব্যাজার মুখে ঘরে ঢুকে সে বলে, “মিছে এসব ওঝা-তান্ত্রিক করে সময় নষ্ট কচ্চেন, কত্তা! আধখানা কতা ভালো করে না শুনেই একটা বোঁচকা বেঁধে দিনু পগার পার হয়ে গ্যালো!”
টলে উঠে মহীনবাবু কোনওমতে জিজ্ঞেস করেন, “সে কী রে? পালাল কেন?”
মুখ আরও তুম্বো করে রাখাল বলে, “ওই যে, যেই শুনেছে লোকটা মানে ভূতটা বিনোদদিদির সোয়ামী! বলল এখন বছরখানেক এ-মুখো হবে না। সোয়ামী ইস্তিরির ঝামেলার মধ্যে পড়তে চায় না নাকি। আসলে ওসব মিছে কথা। বিনোদদিদিকে গোটা গাঁ ভয় খায় কিনা!”
কেদারায় এলিয়ে পড়ে মহীন গুঙিয়ে উঠে বলেন, “ধরতে পারলি না চেপে!”
এবার নিরীহ রাখালও খ্যাঁক করে ওঠে। বলে, “নেহাত কম বয়েস তো আমারও হলনি, কত্তা! ছুটন্ত মানুষকে অমনি খপ করে ধরে ফেলতে পারি আমি!”
মহীন কাঁউ কাঁউ করে বলেন, “এবার?”
রাখাল হাত উলটে বলে, “এবার চক্কোত্তিমশাই।”

ভবতারণ চক্রবর্তী পুরুষানুক্রমে রায়বাড়ির পূজারি। এখনও প্রতিদিন গৃহদেবতার মন্দিরে ঘন্টা নাড়িয়ে ফুল-বেলপাতা দিয়ে যান। কয়েকদিন যাবত জ্বরে ভুগছেন, তাই আসেন না। মহীনবাবুকে একরকম টানতে টানতেই তাঁর বাড়ির দিকে নিয়ে যায় রাখাল। মহীনের পা চলে না। মনটা সত্যিই বড়ো ভারাক্রান্ত লাগে। পরাণের প্রতি একটা স্নেহমিশ্রিত টান তৈরি হয়ে গিয়েছিল কয়েকদিনে। ধুতির খুঁটে লুকিয়ে চুরিয়ে বার দুই চোখও মোছেন। রাখালের ডাকে মন ফেরে বর্তমানে। রাখাল তাঁকে নাড়া দিয়ে বলে, “অ কত্তা! শুনচেন?”
শোনেন মহীনবাবু। শুনতেই হয়, কারণ চক্কোত্তিমশাইয়ের বাড়ির ভেতর থেকে ভয়ানক জোরে ‘জয় জয় দেবী চরাচরসারে’ শোনা যাচ্ছে। আজ সরস্বতীপুজো নাকি? মাস খানেক আগে সবে লক্ষ্মীপুজো গেল, এখনই সরস্বতীপুজো কেমন করে হয় তা মাথায় ঢোকে না মহীনবাবুর। পাড়ার ছেলেরা চাঁদা চাইতেও তো আসেনি!
দরজায় বার দুই কড়া নেড়ে কোনও উত্তর পান না মহীন আর রাখাল। মন্ত্রোচ্চারণ তখন সরস্বতীবন্দনা থেকে ‘জয়ন্তী মঙ্গলা কালী’তে গিয়ে পৌঁছেছে। জপ করতে করতে মধ্যে মধ্যে হেঁচকি তুলছেন চক্কোত্তিমশাই। জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছেন কি না কে জানে। অগত্যা ভেজানো দরজা ঠেলেন মহীন; উঁকি দেন ভেতরে এবং মুখোমুখি হন পরাণের।
লুকোনোর জায়গা খুঁজতে খুঁজতে বোধহয় চক্কোত্তিমশাইয়ের একটেরে নিরিবিলি ছোট্ট বাড়িখানাকে পছন্দ হয়েছিল পরাণের। ঘরের ভেতর ওপরের তাকে গা ঢাকা দিতে গিয়ে পুরুতগিন্নির সাধের কাঁসার বাসনকোসন ফেলে ছইছত্তর করেছে। গাঁয়ে পুরুতগিন্নির গলার নামডাক বিনোদের চেয়ে কিছু কম নয়। কিন্তু সেই জাঁদরেল মহিলাও ঝাপসা পরাণকে দেখে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়েছেন। অতএব ভূতের মোকাবিলা করার জন্য জ্বোরো চক্কোত্তিমশাই ছাড়া আর কেউ নেই বাড়িতে। কাঁদো কাঁদো গলায় আঙুলে জড়ানো পৈতে দেখিয়ে তিনি মহীনের উদ্দেশ্যে বলেন, “যা যা মন্ত্র জানি তার কোনওটা বলতে বাকি রাখিনি, কর্তামশাই। এই ঝাপসাটে জিনিসটা মোটে যায় না যে!”
পরাণকে হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকেন মহীন। কানে আঙুল দিয়ে খোঁচাতে খোঁচাতে পরাণ একটু কাছে আসে। বলে, “কানে একদম তালা পড়ে গ্যাচে, কত্তা। মা ঠাউরুন এমন চিৎকার দিয়ে পড়লেন! আর কী পড়লেন কত্তা, সে কী বলব! বাড়ি এক্কেরে কেঁপে গ্যালো! তাপ্পর পুরুতমশাইও সমানে চিক্কুর ছাড়ছেন। আমার কানটা মনে হয় এক্কেরে শেষ হয়ে গ্যালো গো!”
চক্কোত্তিমশাইকে আশ্বস্ত করেন মহীনবাবু, পরাণকে বগলদাবা। বলেন, “বৌঠানের চোখেমুখে জল দিন, পুরুতমশাই। দাঁড়ান দাঁড়ান, এক্ষুনি দেবেন না, পাঁচটা মিনিট অপেক্ষা করুন, আমরা বেরিয়ে যাই।”
বেরিয়ে যেতে যেতে রাখাল তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকায় পুরোহিতের দিকে। বিড়বিড় করে বলে, “ভূত তাড়াতে সস্বতীঠাকুরের মন্তর পড়ে যে পুরুত, সে করবে শ্রাদ্ধশান্তি! ছ্যা ছ্যা ছ্যা!”
পরাণের কী গতি করবেন সেটা ঠিক না করতে পেরে পরাণ আর রাখালকে নিয়ে গাঁয়ের অলিতে-গলিতে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ান মহীনবাবু। দিনু তান্ত্রিক বোধহয় গ্রাম ছাড়ার আগে খবর ছড়িয়ে দিয়ে গেছে। লোকে পরাণকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখে কিন্তু কাছে ঘেঁষে না। বিনোদিনীর হাতে অকালমৃত্যু বরণ করার দুঃসাহস বা ইচ্ছে কোনওটাই তাদের নেই, স্পষ্ট বোঝা যায়।
পরাণ আর রাখালের মধ্যে ইতিমধ্যেই একটা সখ্যতা গড়ে উঠেছে। আবেগঘন গলায় রাখাল পরাণকে বলে, “তুমি মরে গিয়ে বেঁচে গ্যাচো, দাদা। এই আমাদের ওপরে দ্যাকো, কী অত্যেচার, কী অত্যেচার! ক্যাঁচকলা খে’ খে’ শরীর শুকিয়ে গ্যালো!”
ঢকঢক করে ঝাপসা ঘাড় নাড়ায় পরাণ। বলে, “অন্যেয়, অন্যেয়! তবে কিনা সেবাযতনো কত্তো বিনোদ। মিথ্যে কথা কইব না, শেষদিন ক’টায় ওষুধপথ্য খুব করেছিল গো।”
ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাখাল। তারপর পরাণের হাতখানা ধরার চেষ্টা করে। ফসকে যায় আধা বায়বীয় সেই হাত। কিন্তু তাতে দমে না গিয়ে রাখাল বলে, “তুমি বাড়ি চলো, দাদা। মাধবদার চিলের ঘরে লুক্যে রাকব তোমাকে। ওপরে বিনোদদিদি ওঠে না, জানতে পারবে না মোট্টে।”
পাশ থেকে খ্যাঁক করে ওঠেন মহীনবাবু। “এ-এহ্‌, কী বুদ্ধি ওনার! তারপর মাধবকাকা পরাণকে দেখে ভয় খেয়ে পটল তুললে? জেনেশুনে ও-কাজ করতে পারব না।”
রাখাল অভয় দেয় মহীনকে, “আরে না কত্তা, দেখবে কী করে? আমার আপনার মতো গোটা মানুষকেই মাধবদাদা ঝাপসা দেখে। অদ্ধেক ঝাপসা মানুষকে, থুড়ি ভূতকে সে দেখতেই পাবে না। মিটে গ্যালো।”
অনেক আলোচনার পর বাড়ি যাওয়াই মনস্থ করেন সবাই। কথা ছিল খিড়কি দরজা দিয়ে ঢুকে চুপিচুপি পরাণকে নিয়ে সোজা ওপরে চলে যাবে রাখাল। কিন্তু সে গুড়ে বালি পড়ে গেল। খিড়কি দরজা আটকে বিনোদিনী দাঁড়িয়ে। মহীনবাবু হাল পুরোপুরিভাবে ছেড়ে দিয়ে অজ্ঞান হতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু হতে হল না। তার আগেই পরাণের মুখপানে চেয়ে ‘অ মা গো’ বলে বিনোদিনী মূর্চ্ছা গেল।

জ্ঞান ফিরে পেয়ে বিনোদিনী আর গলা তোলেনি। সিঁড়িতে বসা বিনোদের ইনিয়ে-বিনিয়ে কান্না শোনা যাচ্ছে অনেকক্ষণ। একটু নির্লজ্জের মতো আড়ি পাতেন বাড়ির সবাই, এমনকি কানে একশোভাগ কালা মাধবও। আর কে কী শোনে মহীন জানেন না, কিন্তু তিনি শোনেন - “তুমি? তা’লে তুমি বাবুর ঘরে বসে শুঁটকি খেয়েচ? আর আমি যে বেধবা হয়ে থেকে আজ বিশবচ্ছর শুঁটকি কেন, কোনওরকম মাছ মুখে করি না তুমি ভালো খেতে বলে? সাধে বলে, পুরুষমানুষ নেমকহারামের জাত! মরে গিয়েও নোলা যায় না! আর আমি বেঁচে থেকেও মরার মতো খাই!”
পরাণ মিনমিন করে বলে, “কী যে বলো বিনোদ, এ তো বাবুর কাছে এসে থেকে হালে খাচ্চি। নাইলে এ-গাছ সে-গাছ করে ওঝাদের তাড়া খেয়েই তো কাটচিল। বাবু দেবতুল্য মানুষ। মাঝেসাঝে কাঁচকলা বাদে কিচু ভালো রান্না করে দিও গো। আহা কাঁদে না, কাঁদে না!” বিনোদেরই আঁচলখানা তুলে তার চোখ মোছাতে যায় পরাণ। শেষ অবধি পৌঁছয় না আঁচল, ঝাপসা হাত ফসকে ভাঁড়ারের চাবি সমেত ঝনাৎ করে নিচে পড়ে। তারপর কী হয় তা মহীনবাবু জানেন না। স্বামী-স্ত্রীর ঝামেলার মধ্যে পড়তে আছে, বলুন তো?
তবে আমি এটুকু জানি, মহীনবাবু এখন দিব্যি আছেন। পরাণ-বিনোদিনীও দিব্যি আছে। বিনোদ এখন মাছ খায়, বাড়িতে শুঁটকি ঢোকাতেও মহীন আপত্তি তোলেন না কোনও। পরাণ মাছ খায়, শুঁটকি খায়, বিনোদিনীর মুখ ঝামটা খায় সিংহভাগই। যদিও বিনোদের চিৎকার আর সেরকমভাবে শুনতে পাওয়া যায় না। মেজাজখানা অনেকটাই নরম হয়ে এসেছে। মহীনের কপালে হালকার ওপরে ভালোমন্দ খাবারদাবার জোটে। কাঁচকলার কালো ছায়া তাঁর সাধের জীবনকে একটু কম কলুষিত করে আজকাল। রাখাল, হরেন, ভজ আর মাধব পরাণকে মাথায় করে রাখে। তাদের বরাদ্দে সুখাদ্য বেড়েছে, কমেছে নিত্যি বিনোদের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা। মহীনবাবুর বাড়ির ছাদে এখন কাক চিলেরা ভিড় জমায়। মোটের ওপর ভালোই আছেন মহীনবাবু। দিনু গাঁয়ে ফেরেনি এখনও। কিন্তু ফিরলেই তাকে জানাবেন মহীন, পুষ্যিটি নিয়ে ভারি ভালো আছেন তিনি।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ রাখি পুরকায়স্থ

No comments:

Post a Comment