অতীতের আয়নাঃ বালকরাজার অভিশাপঃ রাখী আঢ‍্য




ইতিহাস শব্দটা আপাতদৃষ্টিতে শুনতে অত‍্যন্ত গুরুগম্ভীর বলে মনে হলেও আদপে কিন্তু ব্যাপারটা মোটেও গুরুগম্ভীর বা ভয়ংকর কিছু নয়। আমরা ছোটোবেলায় যেমন ঠাকুরমা বা ঠাকুরদার কাছ থেকে রাজা-রানি তথা রূপকথার গল্প শুনতাম, ইতিহাসও অনেকটা তাই। আমাদের অতীত অর্থাৎ যা ঘটে গেছে তাই তো ইতিহাস। আর ইতিহাস মানেই গল্প। তবে পার্থক্য শুধু এই যে এই গল্প শুধু রূপকথা বা কল্পনাশ্রয়ী নয়, এ হল সত্যি ঘটনা যা রূপকথারই সামিল।
আজ আমরা জানব মধ্যপ্রাচ্যের এক অতি প্রাচীন সভ্যতা মিশরের কিছু কথা। মিশর - রহস্য, রূপকথা, গল্প আর বাস্তবের মেলবন্ধনে আজ থেকে প্রায় ৫ হাজার বছর আগে নীলনদের তীরে গড়ে ওঠা এক দেশ যার কথা শুনলে প্রথমেই মনে আসে মরুভূমি, বালি, পিরামিড আর ফারাওদের কাহিনি। হ্যাঁ, প্রাচীন মিশরের রাজাদের ফারাও বলা হত। এটা মনে করা হয়, মিশরের প্রথম ফারাও হন রাজা মেনেস। সেটা ছিল খ্রিস্ট-জন্মের প্রায় ৩১০০ বছর আগেকার কথা। এরপর একাধিকক্রমে ৩১টি বংশের শাসন ইতিহাস ঘিরে রয়েছে প্রাচীন মিশরকে। এই দীর্ঘ সময়ে গড়ে ওঠা প্রাচীন সভ্যতার সাক্ষ্য ছড়িয়ে আছে মিশরের প্রতিটি ধূলিকণায়।
প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করত যে আত্মা অবিনশ্বর। আর মৃত্যু হল দেহ এবং আত্মার সম্পর্কের মধ্যে ক্ষণিক বিরাম মাত্র। বিরাম কাল শেষ হলে আর তা আবার ফিরে আসবে আর তখন তার পুরনো দেহটি লাভ করবে পুনর্জন্ম। সুতরাং এই মাঝের সময়টুকুতে পার্থিব শরীরটির প্রয়োজন একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণের যাতে না সেটি পচে গলে নষ্ট হয়ে যায়। আর এই বিশেষ প্রক্রিয়াটির নামই হল মমিকরণ, মিশরের ইতিহাসে যা আর এক অজানা রহস্যময় অধ্যায়।
মমি রাখা হত পাথর কেটে ভূগর্ভে তৈরি করা একটি বিশেষ কক্ষে আর তার উপর বানানো হত আকাশচুম্বী সুদৃশ্য পাথরের পিরামিড। মমির সাথে দেওয়া হত তার নিত‍্যজাগতিক প্রয়োজনের সমস্ত জিনিসপত্র, খাবার, পোশাকআশাক, অস্ত্রশস্ত্র, ধনসম্পদ মায় সহকারি চাকরবাকর পর্যন্ত।
পরবর্তীকালে এই সমাধিস্থল বিস্তৃত হয় আরও দক্ষিণে নীলনদের পশ্চিম তীরে রাজধানী থিবিসের উলটোদিকে অনুচ্চ পাহাড়ের উপত্যকায় যা ইতিহাসে ‘ভ্যালি অফ দি কিংস’ নামে পরিচিত। এর  পূর্ব উপত্যকা হল ফারাওদের সমাধিক্ষেত্র। আর পশ্চিম উপত্যকায় দুয়েকজন ফারাওয়ের পিরামিড বাদে বাকি সবাই উচ্চপদস্থ কর্মচারী, পুরোহিত বা প্রজাদের। ভ্যালি অফ দি কিংস-এ এ-যাবত পাওয়া গেছে প্রায় কয়েকশ সমাধি বা পিরামিড। এগুলির সাথে যত না জড়িয়ে আছে ইতিহাস, হয়তো তার থেকে বেশি ঘিরে আছে রহস্য। আর এমনই এক রহস্যময় পিরামিড হল ফারাও তুতেনখামেনের, মিশরের ইতিহাসে যাকে আমরা বালকরাজা বলেই জানি।
তুতেনখামেনের জীবনের মতো তার জন্মবৃত্তান্তও কুয়াশাচ্ছন্ন। সর্বাধিক প্রচলিত মতে তুতেনখামেনের বাবা ছিলেন ফারাও আখেনাটেন এবং মা ছিলেন রানি কিয়া। মাত্র নয় বছর বয়সে মিশরের ইতিহাসের সবথেকে কমবয়সী ফারাও তুতেনখামেনের রাজত্বকালও কিন্তু মাত্র নয় বছরের। তুতেনখামেন মাত্র আঠারো বছর বেঁচে ছিলেন। এই অল্প সময়ের শাসনকাল বিশেষ ঘটনাবহুল না হলেও  তাঁর রাজত্বকাল ছিল সুশৃঙ্খল এবং শান্তিময়। এই সামান্য জীবৎকালে কোনও বিশেষ যুদ্ধবিগ্রহের ঘটনা আমরা ইতিহাসে পাই না। কিন্তু প্রশ্ন এটাই যে বালক ফারাও যখন সাবালক হচ্ছেন, যখন আনুষ্ঠানিকভাবে অভিভাবকদের হাত থেকে তাঁর রাজদণ্ড নেবার সময় আসছে, তখন তাঁকে কেন অস্বাভাবিক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হল? তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কারের পরেও কিন্তু তাঁর মৃত্যুর রহস্য আজও খুব একটা পরিষ্কার নয়। অনেকে মনে করেন, তাঁকে খুন করা হয়েছিল। তুতেনখামেনের মমি পরীক্ষা করে তাঁর দেহের বিভিন্ন অংশের হাড় ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যাওয়ায় অনেকের ধারণা হয়, তাঁর হাড় ভাঙা স্থানে সংক্রমণ হয়ে মারা যান তুতেনখামেন। সাম্প্রতিক কালের ডি.এন.এ পরীক্ষায় তাঁর দেহে ম্যালেরিয়ার জীবাণুর ডি.এন.এ পাওয়ায় ম্যালেরিয়াকেও তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে চিন্তা করা হয়ে থাকে। তবে যাই হোক, তাঁর মৃত্যু যে অস্বাভাবিক ছিল, গবেষকরা একাধিক প্রমাণ দিয়েছেনঃ-
১) তুতেনখামেনের মমি প্রস্তুতিতে বিশৃঙ্খলার চিহ্ন স্পষ্ট।
২) চুনাপাথরের তৈরি কফিনটিও সেকেন্ড হ্যান্ড।
৩) তুতেনখামেনের মমির পাশে পাওয়া যায় ছয় ও নয় মাসের কন্যা ভ্রূণের মমি। ঐতিহাসিকদের মতে ভ্রূণদের এই অকালমৃত্যুর পিছনে ছিল ভয়ংকর নিষ্ঠুর চক্রান্ত। কারণ, মিশরীয় আইনানুযায়ী তুতেনখামেনের কন্যাদ্বয় বেঁচে থাকলে মিশর রাজবংশের মহান উত্তরসূরি রূপে গণ্য হতেন।

ফারাও তুতেনখামেনের সমাধিসৌধ আবিষ্কারের কৃতিত্ব বৃটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ হাওয়ার্ড কার্টার, লর্ড কারনারভন এবং তাদের সঙ্গীদের। প্রায় তিন হাজার বছর পর তুতেনখামেনের সমাধির প্রকোষ্ঠের সিলমোহর ও দেওয়াল ভাঙেন কার্টার ও কারনারভন। চোখ ঝলসানো সোনা ও হিরে-জহরত অসামান্য সম্পদরাশি বিস্ময়ে মন্ত্রমুগ্ধ করে দেয় কার্টারকে। আর তখনই তিনি লক্ষ করেন, কারনারভন নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন মমির কফিনের মাথার কাছে হায়রোগ্লিফিক লিপিতে লেখা সাবধানবাণীর দিকে - ‘ফারাওদের শান্তিপূর্ণ নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটাবে যারা তাদের মৃত্যু সুনিশ্চিত’।
তুতেনখামেন ১৩২৩ খ্রিস্টপূর্বে মারা যান আর তার সমাধি আবিষ্কৃত হয় ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে, অর্থাৎ মৃত্যুর প্রায় ৩০০০ বছর পরে। আশ্চর্যের বিষয় হল, সেটাই ছিল একমাত্র সমাধি যা আবিষ্কারকালেও ছিল সম্পূর্ণ অক্ষত। আর এই আবিষ্কারের সাথে সাথেই শুরু হয় মিশরের ইতিহাসের আরেক রহস্যজনক অধ্যায়।

গোপনতম প্রকোষ্ঠে খননকারীদের পদচিহ্ন পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই নাকি শুরু হয়ে যায় ফারাওর অভিশাপের কুপ্রভাব। সমাধি আবিষ্কারের কিছুদিনের মধ্যেই সংক্রামক রোগবাহী মশার কামড়ে কায়রোতে মারা যান লর্ড কারনারভন। আর তাঁর মৃত্যুর সময় দুটো আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছিলঃ
১) কায়রো শহরের সমস্ত আলো হঠাৎ নিভে গেছিল। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়াররা কোথাও কোনও কারিগরি ত্রুটি খুঁজে পাননি।
২) কারনারভনের মৃত্যুর ঠিক পরেই একই মুহূর্তে সেদিন ইংল্যান্ডে তাঁর দুগর্প্রাসাদে তাঁর সবসময়ের সাথী পোষা প্রিয় কুকুরটিও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
‘ফারাওর অভিশাপ’ কথাটি হালকাভাবে নেওয়া যেত, যদি না কারনারভনের মৃত্যুর পরবর্তী পর্যায়ে একের পর এক ব্যাখ্যাহীন ও যুক্তিহীন মৃত্যু ঘটত।
সময়টা ১৯৭২ সাল। সেই বছর তুতেনখামেনের ঐশ্বর্যের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলির প্রদর্শনীর ব্যবস্থা হয় ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ডঃ গামাল মেহরেজ মমির অভিশাপকে কাকতালীয় বলে বিবৃতি দেন। মমি এবং তাঁর সম্পদ প্লেনে তুলে দেবার ঠিক পরের রাতে তিনি মারা যান।
রহস্য থেকেই যায়। এসব মৃত্যু আর অস্বাভাবিক ঘটনা তবে কি সেই প্রাচীন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার ফল? কার্টার ও কারনারভন কি তুতেনখামেনের সমাধির গভীর শান্তি ভঙ্গ করেছিলেন? ফিরিয়ে এনেছিলেন তাঁকে মৃত্যুর শীতল অন্ধকার থেকে কোলাহলের জগতে? তাই কি মমির অভিশাপে তাঁদের এই শাস্তি পেতে হল?

একবিংশ শতাব্দীর উন্নত বিজ্ঞান প্রযুক্তিও হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেছিল এই বিতর্কের সামনে।
২০০৫ সালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো মলমলের ব্যান্ডেজ খুলে তুতেনখামেনের দেহকে সিটি স্ক্যান মেশিনের তলায় রাখার সাথে সাথে প্রায় একঘন্টার জন্য সমগ্র মিশরে আলো নিভে  যায় এবং আজ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি তার কারণ।
তবে রূপকথা হোক বা গল্প, ঘটনা হোক বা দুর্ঘটনা অথবা মমির অভিশাপ, তুতেনখামেন ও তাঁর সমাধি এবং সমাধিতে পাওয়া অতুল ঐশ্বর্য আজও সারা পৃথিবীর কাছে অপার বিস্ময়। মূল সমাধিকক্ষে কাজ হয়েছে প্রায় আড়াই বছর। আর এই অভিযানে পাওয়া প্রায় ৫০০০টি দ্রব্যসামগ্রী আজও সযত্নে রাখা আছে মিশরের প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে।

_____

ছবিঃ আন্তর্জাল

2 comments:

  1. A very informative post. Thanks for sharing such interesting facts.

    ReplyDelete
  2. মিশর মানেই রহস্য । অনেক অজানা তথ্য জানতে পারলাম । অনেক ধন্যবাদ ।

    ReplyDelete