লোককাহিনিঃ নিরানব্বইয়ের জাদুঃ রাখি পুরকায়স্থ



অতীতে কোনও এক সময় কেরালার এক নাম না জানা গ্রামে থাকত রামু আর দামু নামে দুই বন্ধু। পাশাপাশি বাড়িতে বাস করত তারা। রামু ব্যাবসা করত। ব্যাবসা থেকে তার খুব ভালো আয় হত। একখানা বড়সড় পাকাবাড়িতে থাকত সে। দামু ছিল দিনমজুর। দিনশেষের সামান্য আয়ে টেনেটুনে সংসার চলত তার। মাথা গোঁজার ঠাঁই বলতে তার ছিল একটিমাত্র ছোট্ট কুঁড়েঘর।
ধনী রামুর মোটেই টাকাকড়ির অভাব ছিল না, অথচ সে মন খুলে কক্ষনও খরচ করতে পারত না। খরচ করবার ব্যাপারে সে ছিল অতি সাবধান। বহু হিসেবনিকেশ করে সংসার চালাত সে। তারা স্বামী-স্ত্রীতে মিলে ভাতের সাথে একটি মাত্র তরকারি রান্না করে খেত। ভুলেও আত্মীয়-বন্ধুদের ভাত খাওয়ার নেমন্তন্ন করত না।
গরিব দামু কিন্তু মনের আনন্দে দিন কাটাত। রোজগার সামান্য হলে কী হবে, তারা স্বামী-স্ত্রীতে মিলে জমিয়ে মাছ-মাংস রান্না করে খেত আর মনের সুখে পছন্দসই জামাকাপড় কিনত। প্রায়শই তাদের ছোট্ট কুঁড়েঘরটি আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবদের ভিড়ে গমগম করত। লোকজনকে পেট পুরে খাইয়ে তারা যে কী আনন্দ পেত তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। রাতে তারা দুটিতে মিলে ঢোল বাজিয়ে আর পল্লীগীতি গেয়ে সময় কাটাত। এভাবেই বড়ো সুখে-শান্তিতে কেটে যাচ্ছিল তাদের দিনগুলি।
এদিকে ধনী রামুর স্ত্রী শোভা এই গরিব অথচ সুখী পরিবারটিকে রোজ লক্ষ করত আর ভীষণ অবাক হত। সে ভেবে ভেবে কূলকিনারা পেত না, যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয় তাদের জীবনে এত আনন্দ আসে কোথা থেকে! কীভাবেই বা গরিব দামু ও তার স্ত্রী চিরু দু’হাতে এত টাকাপয়সা খরচ করতে পারে! শোভা ভালো করেই জানে, দামুর তুলনায় তার স্বামীর আয় অনেক বেশি। তবে টাকাপয়সা জমানোটা মোটেই চাট্টিখানি কথা নয়। দোকানে-বাজারে কত জিনিসই তো পছন্দ হয় তাদের, কিন্তু দামের বহর দেখে আর কেনা হয়ে ওঠে না। তাই দামু ও চিরুর এমন আশ্চর্য সুখের গোপন রহস্য জানতে সে উঠেপড়ে লাগল।
রামুর পাকাবাড়ি ও দামুর কুঁড়েঘরের মাঝে ছিল একটি কাঁচা বাঁশের বেড়া। প্রায়শই দুপুরবেলায় ঘরকন্নার কাজকর্ম সেরে শোভা ও চিরু সেই বাঁশের বেড়ার দু’পাশে দাঁড়িয়ে সুখদুঃখের গল্পগাছা করত। এমনই একদিন দুপুরে গল্পগুজব করবার ফাঁকে শোভা প্রতিবেশিনী চিরুর কাছে জানতে চাইল, “অবাক মানছি ভাই! এত অভাব অনটনের মাঝেও এমন নিশ্চিন্ত হয়ে হাসিমুখে থাকো কী করে? খরচ করবার মতো এত টাকাপয়সাই বা তোমাদের হাতে থাকে কী করে?”
শুনে চিরু সামান্য হাসল। আসলে এই প্রশ্নের উত্তরটাই তো তার জানা নেই। তারপর কয়েক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে সে বলল, “আমি ঠিক জানি না ভাই! মনে হয় আমার কত্তার কাছেও এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে না। সত্যিই তো! এই বিষয়টা নিয়ে আমরা তো আগে কক্ষনও ভেবে দেখিনি!”
উত্তর শুনে শোভা যেন বেশ খানিকটা হতাশ হল। শোভার মনের কথা বুঝতে পেরে চিরু তাকে আশ্বস্ত করে বলল, “আমরা না জানলে কী আর ক্ষতি হবে ভাই? আমরা বেজায় মুখ্যুসুখ্যু মানুষ। কীই বা বুঝি! তবে আমরা সবাই জানি, তোমার কত্তা খুব বুদ্ধিমান মানুষ। তিনি নিশ্চয়ই এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারবেন।”
চিরুর কথাবার্তা শুনে শোভার মাথা কেমন যেন গুলিয়ে গেল। তাই সন্ধে নাগাদ রামু যেই না বাড়ি ফিরেছে, অমনি শোভা তড়িঘড়ি সেই প্রশ্নটি পেশ করল তার সামনে। আসল ব্যাপারটা হল, চিরুর বলা সবকথার অর্থ স্পষ্ট করে না বুঝলেও, শোভা এ-কথাটা বেশ আন্দাজ করতে পেরেছে, তার স্বামী একজন অত্যন্ত বুদ্ধিমান মানুষ। নাহলে কি আর চিরু এমনি এমনি তার স্বামীর বুদ্ধির এত তারিফ করবে?
স্ত্রীর প্রশ্ন শুনে রামু হো হো করে হেসে উঠল। “শোনো গিন্নি, দামু আর তার স্ত্রীর এমন আনন্দের জীবন দেখে তোমার এত আশ্চর্য হবার কিচ্ছু নেই।” এই বলে আবার আরেক চোট হেসে নিল রামু। তারপর হাসি সামলে নিয়ে বলল, “আরে! এত ভাবনা কীসের তোমার? দামুভায়া আজ অবধি নিরানব্বইয়ের জাদু দেখেনি যে! আসল রহস্য তো সেখানেই লুকিয়ে।”
“নিরানব্বইয়ের জাদু! এ আবার কী?” অবাক হয়ে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল শোভা। “আমি কিন্তু এসবের কিছুই বুঝতে পারছি না। হেঁয়ালি বাদ দিয়ে আমাকে এবার একটু ভালো করে বুঝিয়ে বলবে তুমি?” শোভার মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।
“আমি তোমাকে হাজারবার বুঝিয়ে বললেও তুমি কিচ্ছু বুঝতে পারবে না। তার চেয়ে বরং বোঝবার চেষ্টাই কোরো না।” এই কথা বলে আবার হেসে উঠল রামু। “আসলে কী জানো গিন্নি, জীবনে এমন অনেক কিছুই আছে যা বুঝবার আগে ধৈর্য্য ধরে দেখা ভালো।”
ততক্ষণে শোভার মাথা আরও খানিকটা গুলিয়ে গেছে। এবার তাই আর কথা না বাড়িয়ে সে চুপ করে গেল। তাছাড়া এত বছর রামুর সাথে ঘর করে সে বেশ বুঝে গিয়েছে, নিজে থেকে বলতে না চাইলে তার স্বামীর পেট থেকে কোনও কথা বের করা প্রায় অসম্ভব। এদিকে স্ত্রীকে হঠাৎ চুপ করে যেতে দেখে রামু নরম গলায় বলল, “মনখারাপ করবার মতো কিছুই হয়নি, গিন্নি। কিছুদিন পরই তুমি সব নিজে থেকেই জানতে-বুঝতে পারবে। একটুখানি সবুর করো। জানোই তো, সবুরে মেওয়া ফলে।”
খুশি না হলেও এই কথাগুলি শুনে শোভা যেন খানিকটা স্বস্তি পেল।
কিছুদিন পরই শোভা টের পেল, পাশের বাড়িতে কী একটা বড়ো পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। দামু আর চিরুর রোজকার জীবন যেন ঠিক আর আগের মতন নেই। ইদানীং তাদের রান্নাঘর থেকে জিভে জল আনা মাছভাজা কিংবা কষা মাংসের সুস্বাদু গন্ধ ভেসে আসে না। সে আরও খেয়াল করল, অল্প কিছু সংখ্যক আত্মীয়-বন্ধুর দল তাদের বাড়িতে মাঝেমধ্যে এলেও দামু কিন্তু এখন আর আগের মতো তাদের ভাত খাওয়ার কথা বলে না! এমনকি রাতেরবেলায় তাদের কুঁড়েঘর থেকে পল্লীগানের মিঠে সুর কিংবা ঢোলের আওয়াজ আর ভেসে আসে না। সূর্য ডুবলেই দামুদের কুঁড়েঘরটাকে যেন নিঝুম অন্ধকার ঘিরে থাকে। তাছাড়া, আজকাল চিরু দিনরাত পরিশ্রম করে। সকাল থেকে নারকেলগাছের পাতা দিয়ে সে একটার পর একটা মাদুর বোনে, আর সন্ধেবেলা গ্রামের হাটে সেই মাদুরগুলি বেচতে যায়। রাতে স্বামী-স্ত্রী দু’জনে মিলে আবার নারকেল পাতার মাদুর বুনতে বসে।
‘অদ্ভুত ব্যাপার তো!’ নিজের মনে বিড়বিড় করে বলে শোভা। ‘পাশের বাড়িতে কী যে ঘটেছে বুঝতেই পারছি না! দামু আর চিরু এখন আর তেমন হাসিখুশি থাকে না কেন কে জানে! কেমন যেন মুখ ভার করে থাকে সবসময়। সারাটা দিন ওদের শুধু কাজ আর কাজ। হাবভাব দেখে মনে হয়, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকাপয়সা রোজগার করাটাই এখন ওদের বেঁচে থাকবার একমাত্র লক্ষ্য!’
প্রতিবেশীর এমন আশ্চর্য পরিবর্তনের কথা শোভা একদিন তার স্বামীকে জানাল।
“আচ্ছা, চিরুরা আর আগের মতো টাকাপয়সা ওড়ায় না কেন বলো তো?” কৌতূহল দমন করতে না পেরে রামুর কাছে জানতে চাইল শোভা। “হাটে বেচবে বলে মাদুর বুনছে, ভালো কথা। কিন্তু তাই বলে দিনরাত এক করে এত এত মাদুর!”
নানান কাজেকর্মে ব্যস্ত রামু বিরক্ত হয়ে বলল, “কী মুশকিলে পড়েছি রে বাবা! আমি কি সবকিছু জেনে বসে আছি নাকি? আমাকে এসব অবান্তর প্রশ্ন না করে তোমার সেই সইকে জিজ্ঞেস করলেই তো পার।”
শোভা এবার তাই ঠিক করল চিরুকে সরাসরি সবকথা জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু সে সুযোগ কোথায়? চিরু তো এখন মহা ব্যস্ত। আগেকার মতো বাঁশের বেড়ার ওপারে দাঁড়িয়ে গল্পগুজব করবার মতো সময় এখন তার হাতে কই? চিরুর সাথে এখন তো আর দেখাই হয় না শোভার!
তবে কাঁহাতক আর এইভাবে কৌতূহলকে মনের মধ্যে দমিয়ে রাখা যায়? একদিন তাই শোভার ধৈর্যের বাঁধ গেল ভেঙে। সে স্থির করল, চিরুর জন্য আর অপেক্ষা করা চলবে না। উত্তরের খোঁজে এবার তাকেই যেতে হবে চিরুর কাছে।
যেমন ভাবা ঠিক তেমনটা কাজ। একদিন শোভা সত্যি সত্যি হাজির হল চিরুর ছোট্ট কুঁড়েঘরে। চিরু তখন মাদুর বুনতে ব্যস্ত। শোভাকে দেখে সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। তারপর শোভার বসবার জন্য নিজের হাতে বোনা একখানা মাদুর ঘরের একধারে পেতে দিয়ে আবার ফিরে গেল নিজের কাজে। মাদুর বুনতে বুনতে শোভার সাথে দিব্যি গল্পগুজব চালিয়ে যেতে লাগল সে।
শোভা ও চিরু সংসারের নানান খুঁটিনাটি বিষয়ে আলাপ আলোচনা করতে শুরু করল। তারপর বন্ধুদের কথা, আত্মীয়স্বজনদের কথা, গ্রামের রোজকার জীবন ইত্যাদি নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ গল্পগুজব হল তাদের মধ্যে। অবশেষে সুযোগ বুঝে শোভা সেই আসল প্রশ্নটি পেশ করল চিরুর সামনে, যার উত্তরের খোঁজে চিরুর কুঁড়েঘরে আসতে বাধ্য হয়েছে শোভা।
“তোমাদের কী হয়েছে বলো তো ভাই?” আস্তে আস্তে প্রশ্ন করল শোভা। “তোমার কত্তা কি আজকাল তেমন কাজকর্ম পাচ্ছেন না?”
“না না, তেমন কিছুই নয়।” মাথা নিচু করে মাদুর বুনতে বুনতে উত্তর দিল চিরু। “ভগবানের আশীর্বাদে আজকাল ওর কাজের কোনও অভাব হচ্ছে না।”
“তবে তোমরা এতখানি পালটে গেলে কেন ভাই?” অবাক হয়ে জানতে চাইল শোভা। “তোমরা মাছ-মাংস রান্না করা বন্ধ করে দিলে কেন? আজকাল গানবাজনাও তো এক্কেবারে ছেড়ে দিয়েছ! সারাদিন ঘরে বসে এত মাদুর বোনো কেন তুমি? তোমাদের দু’জনকে এত চিন্তিতই বা দেখায় কেন? কী হয়েছে?” উত্তেজনার বশে এক শ্বাসে অনেকগুলি প্রশ্ন চিরুর দিকে ছুড়ে দিল শোভা।
“কিছু হয়নি তো! আসলে বলবার মতো তেমন কোনও কারণ নেই।” শান্তভাবে উত্তর দিল চারু। “আমরা একটু অন্যভাবে বাঁচতে চাইছি, এই যা।”
“না না, এড়িয়ে গেলে তো চলবে না ভাই। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনও গুরুতর কারণ রয়েছে।” সাথে সাথে বলে উঠল শোভা। “ঠিক আছে। আমাকে সত্যি কথা বলতে না চাইলে বোলো না। তবে আমার কিন্তু কোনও অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না। আমি সরল মনে তোমাকে সাহায্য করতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, হয়তো তোমাদের খুব টাকাপয়সার প্রয়োজন। তেমন হলে আমি নাহয় আমার কত্তাকে বলে…”
কথা শেষ হবার আগেই চিরু হুড়মুড় করে বলে উঠল, “না না, তুমি ভুল বুঝেছ।”
চিরুর গলার স্বর শুনে বেশ বোঝা গেল, শোভার কথায় তার মানে বড়ো লেগেছে। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সে আবার ধীরে ধীরে বলল, “আচ্ছা, ঠিক আছে। যা যা ঘটেছে সব সত্যি কথা বলব তোমায়। কিন্তু দয়া করে তুমি এসব কথা পাঁচকান কোরো না, কেমন? এমনকি তোমার কত্তাকেও বলতে পারবে না। কথা দাও আমায়। যদি কোনওভাবে আমার কত্তা জানতে পারেন আমি তোমাকে সব সত্যি কথা বলে দিয়েছি, তিনি কিন্তু খুব রাগ করবেন।”
“আহা, চিরু! এভাবে বোলো না। আমাদের পরিচয় কতদিনের বলো তো? তুমি তো আমাকে ভালো করেই চেনো। আমাকে নিশ্চিন্তে সবকথা বলতে পার, কোনও ভয় নেই। কাকপক্ষীও জানতে পারবে না।”
“ঠিক আছে। আমি গোটা ঘটনাটা তোমাকে বিশ্বাস করে বলছি।” নিশ্চিন্ত হয়ে গল্প বলতে শুরু করল চিরু। “দু-তিন সপ্তাহ আগে এক সন্ধেবেলায় আমার কত্তা কাজ সেরে বাড়ি ফিরছিলেন। সারাদিনের কাজের শেষে পাওয়া দেড় টাকা মজুরি তার কোঁচড়ে গোঁজা ছিল, যেমনটা রোজই থাকে। কিন্তু যেই না তিনি বাড়ির সিঁড়ির সামনে এসে পৌঁছেছেন অমনি তাঁর নজরে এল সিঁড়ির নিচে মাটিতে পড়ে রয়েছে একখানা সাদা থলে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে থলেটি হাতে তুলে নিলেন। থলেটি ছিল যথেষ্ট ভারী। ভেতরে ঝনঝন শব্দ শুনে বেশ বোঝা যাচ্ছিল, ওতে অনেক মোহর রয়েছে!”
এটুকু শুনে শোভা উত্তেজনায় চিৎকার করে বলে উঠল, “কী বলছ তুমি! এ তো কল্পনারও বাইরে! এক থলে মোহর!”
“আহা, শোনোই না চুপ করে!” এই বলে চিরু আবার গল্প বলা শুরু করল। “এক ফোঁটাও সময় নষ্ট না করে আমার কত্তা চটপট বাড়িতে ঢুকে গেলেন। আশেপাশের কেউ হঠাৎ দেখে ফেললে আবার মহাবিপদ, তাই না? তারপর সোজা শোয়ার ঘরে ঢুকে দরজায় খিল দিয়ে দিলেন তিনি। আমি তখন রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিলাম। এত কাণ্ড যে ঘটে গেছে একটুও বুঝতে পারিনি। তবে সদর দরজার আওয়াজ শুনে ঠিক বুঝেছিলাম, তিনি বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু গিয়ে দেখি শোয়ার ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। তাঁর এমন অদ্ভুত ব্যবহার দেখে আমি যারপরনাই অবাক হলাম। দরজা ধাক্কাতেই তিনি দারজা খুলে আমাকে একটানে ভেতরে ঢুকিয়ে তড়িঘড়ি আবার দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। কিন্তু ঘরের ভেতরে ঢুকেই কত্তার এমন অস্বাভাবিক আচরণের পেছনে থাকা আসল কারণটিকে আমি খালি চোখে দেখতে পেলাম। বিছানার ওপর পড়ে আছে একরাশ সোনার মোহর!”
“এত্তগুলো সোনার মোহর!” উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠল শোভা। “কয়টা মোহর ছিল সেখানে? গুনেছিলে?”
“গুনেছিলাম বৈকি। ওখানে নিরানব্বইটা মোহর ছিল।” বলল চিরু।
“ও মা, সে কি! নিরানব্বইটা?” অবাক গলায় বলল শোভা। “থলেটাতে একশোখানা মোহর ছিল না বলছ? তোমাদের গোনায় কোনও ভুল হয়নি তো? আমার বিশ্বাস, সেখানে একশোখানা মোহরই ছিল।”
“না গো, আমাদের কোনও ভুল হয়নি। আমরা খুব সাবধানে বার বার করে গুনেছি। সেখানে নিরানব্বইটা মোহরই ছিল।”
“ও, আচ্ছা। ঠিক আছে তবে।” মেনে নিল শোভা।
“বুঝতেই তো পারছ, ব্যাপারটা আমাদের জন্য কী দুর্ভাগ্যের!” দুঃখ করে বলতে লাগল চিরু। “আমার কত্তা বাধ্য হয়ে সেদিনকার মজুরি থেকে একটাকা নিয়ে সেই নিরানব্বইটা মোহরের সাথে যোগ করল। পরেরদিন এক আধুলিতেই কোনও মতে সংসার চালাতে হল আমায়। কী আর করি বলো, থলেটা যে একশোখানা সোনার মোহর দিয়ে পূর্ণ করতেই হবে।”
“ওহো! তাই বলো!” শোভার চোখেমুখে এবার যেন নির্মল প্রশান্তি ছায়া। “এতদিনে বুঝতে পারলাম কেন তুমি আর মাছ-মাংস রান্না করো না, কেন আর তোমাদের গলায় গান শুনতে পাই না, কেনই বা তোমাদের সবসময় এত দুশ্চিন্তাগ্রস্থ দেখায়! এখন বেশ বুঝতে পারছি ভাই, কেন তুমি সারাদিন নাওয়া-খাওয়া ভুলে এত মাদুর বোনো।” তারপর নিজের মনে হাসতে হাসতে সে বলল, “নিরানব্বইয়ের জাদুতেই এমন আশ্চর্য পরিবর্তন সম্ভব! সেখানেই তো লুকিয়ে আছে সুখ-দুঃখের আসল চাবিকাঠি। সত্যিই, আমার কত্তার তারিফ না করে উপায় নেই!”

মালয়ালী লোককথা, উৎসঃ কথাসরিৎসাগর
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ রাখি পুরকায়স্থ

1 comment: