পত্রবিচিত্রাঃ দেশে বিদেশে বিচিত্র উৎসবঃ কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়


দেশে বিদেশে বিচিত্র উৎসব

কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়


ছোটোবেলার স্মৃতি আজ খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে সেই আনন্দের দিনগুলি। সেই সমস্ত আনন্দের একটা বড়ো অংশ ছিল পুজো-পার্বণ। নিত্যদিনের একঘেয়েমি কাটাতে এই সমস্ত লোকাচার বা উৎসবের ভূমিকা অপরিসীম। আমরা যতই আধুনিক হই না কেন, প্রযুক্তির জয়ধ্বজা উড়িয়ে এগিয়ে চলি না কেন, উৎসবের দিনগুলিতে আজও আমাদের আধুনিক যুক্তি নির্ভর মন নেচে ওঠে। পৃথিবীর নানাপ্রান্তের মানব সমাজে প্রতিনিয়ত কোনও না কোনও উৎসব পালিত হচ্ছে। সেসব উৎসবের কয়েকটির কথা আজ তোমাদের বলব।
এই প্রসঙ্গে একটা কথা তোমাদের বলে রাখি। উৎসব মানুষের মনে শুভ বোধ, শুভ চৈতন্যের সূচনা করে। তাই সব উৎসবই শুভ তা পৃথিবীর যেকোনও প্রান্তের মানব সমাজের হোক না কেন।

সারমেয় উৎসব

চিন দেশের গুইঝু প্রদেশ। সেখানকার একটি গ্রামের নাম জিয়াওবাং। এই গ্রামেই বাস করে মিয়াও সম্প্রদায়ের মানুষ। এরা প্রতিবছর এক বিচিত্র উৎসবে মেতে ওঠে। এই উৎসব সারমেয় বা কুকুরকে নিয়ে। উৎসবের জন্য যে কুকুরটিকে বাছা হয় তাকে স্নান করিয়ে জামাকাপড়, টুপি পরিয়ে সাজানো হয়। এরপর একটি সুসজ্জিত পালকি চেয়ারে কুকুরটিকে বসিয়ে মিছিল করে নিয়ে যাওয়া হয়। পালকিটি তৈরি করা হয় সাধারণত লম্বাটে কোনও ঝুড়ি বা কাঠের বাক্স দিয়ে। দলের লোকেরাই মিছিল করে পালকি কাঁধে নিয়ে বয়ে নিয়ে যায়। নেতৃত্ব দেয় দলের সর্দার। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের মধ্যে কাঁদা ছোড়াছুড়ি আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠে। স্থানীয় লোকেরা এই উৎসবকে বলে ‘কুকুর বয়ে নেওয়া উৎসব’।
তোমাদের নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে, মিয়াও সম্প্রদায়ের লোকেরা এরকম একটি বিচিত্র উৎসবে মেতে ওঠে কেন? এ নিয়ে এই সম্প্রদায়ের লোকেদের মধ্যে একটা গল্প বা কাহিনির প্রচলন আছে। বহুবছর আগে এদের পূর্বপুরুষেরা নতুন বসতি গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। কিন্তু কোনও জায়গাই তাঁদের পছন্দ হচ্ছিল না। ঘুরতে ঘুরতে একসময় তাঁরা এই এলাকায় এসে উপস্থিত হন। সেসময় তাঁরা খুবই তৃষ্ণার্ত ছিলেন। আশেপাশে কোথাও জলের খোঁজ না পেয়ে জীবনের আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন। এমন সময় একদল কুকুর এসে তাঁদের পথ দেখিয়ে জলের উৎসের কাছে নিয়ে যায় এবং জীবন বাঁচায়। তাই কুকুর এদের কাছে দেবতাস্বরূপ। যদিও অনেকের মতে ফসল বেশি পাওয়ার আশায় এরা এই উৎসব পালন করে। তবে কুকুর পালকিতে বয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা অনেকের না-পসন্দ।

জ্বলন্ত ব্যারেল বা পিপে বহন উৎসব

এটা একধরনের খেলা বলা চলে। এই খেলাই বর্তমানে উৎসবের রূপ নিয়েছে। এটা ইংল্যান্ডের এক প্রাচীন উৎসব। প্রতি বছর ৫ নভেম্বর ডেভন শহরে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। সূর্যাস্তের পর থেকেই রাস্তায় শ’য়ে শ’য়ে লোক জড়ো হতে থাকে। জ্বলন্ত আলকাতরার পিপে তৈরি। ইচ্ছুক ব্যক্তি পিপেটিকে পিঠে নিয়ে রাস্তায় ঘুরতে শুরু করে। যতক্ষণ সহ্য ক্ষমতা থাকে ততক্ষণই সে ঘুরে বেড়ায়। তারপর অন্য কোনও ইচ্ছুক ব্যক্তির পিঠে পিপেটিকে বসিয়ে দেওয়া হয়। এইভাবে সারারাত ধরে চলতে থাকে জ্বলন্ত পিপে বহনের খেলা। যে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে পিঠে জ্বলন্ত পিপে নিয়ে ঘুরতে পারে সেই এই শতাব্দী প্রাচীন খেলার বা উৎসবের শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয়।

মারডি গ্রাস উৎসব

আমেরিকাবাসীরা সারাবছর অপেক্ষা করে থাকে বসন্তকালের এই উৎসবের জন্য। উৎসবের মূল উদ্দেশ্য আদি সত্ত্বার সন্ধান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বহু জাতি-উপজাতির বাস। ফলে এখানকার সংস্কৃতি মিশ্র। গ্রীষ্ম, শরৎ, শীত ও বসন্ত এই এই চারটি ঋতুতেই এখানে নানাধরনের উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এদের মধ্যে মারডি গ্রাস উৎসব অন্যতম।
নিউ অরলিয়ান প্রদেশে প্রতিবছর মারডি গ্রাস কার্নিভালের আসর বসে। এই উৎসব উপলক্ষে বাজনা সহযোগে শোভাযাত্রা বের হয়। আধ্যাত্মিক সুরের সঙ্গে ক্যারিবিয় সুরের মিলিত মূর্ছনায় সকলে তখন আদি সত্ত্বার সন্ধানে ব্যাকুল হয়ে ওঠে—যা এই উৎসবের মূল ভাবনা। আমেরিকাবাসীদের পাশাপাশি ফরাসি কাজুনদের শোভাযাত্রা তাদের লোকসংগীতের তালে তালে এগিয়ে চলে। তাদের কাছে এই উৎসব ‘ফ্যাট টুইস ডে’ নামে পরিচিত। এই বর্ণাঢ্য মিছিল দেখতে রাস্তার দু’ধারে ভিড় জমে যায়।
ধীরগতিতে এগিয়ে চলা সাঁজোয়া গাড়ি বা ট্যাবলোগুলি থেকে ছুড়ে দেওয়া উপহার যারা সংগ্রহ করতে পারে তারা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করে। এই বার্ষিক উৎসবটি ইস্টারের ঠিক চল্লিশ দিন আগে অনুষ্ঠিত হয়। আগেরদিন সারারাত ধরে এর প্রস্তুতি চলে। প্রস্তুতিপর্বে কোনওরকম শব্দ করা নিষেধ। তাই গাড়িগুলি সাজানো এবং অন্যান্য প্রস্তুতির কাজ চলে নিঃশব্দে। এই নৈঃশব্দতাকে বলা হয় ‘লেন্ট’।
উৎসব শুরু হয় সকাল থেকেই। দিন যত এগোয়, রাত যত বাড়ে, ডিজিল্যান্ড জ্যাজের ছন্দ মানুষকে মাতাল করে তোলে। অবিরাম বাজনা এবং নাচ ও গানের তালে তালে হাজার হাজার মানুষ সামিল হয় এই অনিন্দ্যসুন্দর উৎসবে।

শিশু ডিঙানোর উৎসব

প্রায় চারশো বছরের পুরনো উৎসব। এই উৎসবের জন্ম একটি প্রথা থেকে। স্পেনের উত্তরাঞ্চলে বুরগোস শহরের কাছে ক্যাস্ট্রিলো ডি মর্সিয়া গ্রামে বসবাসকারী ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ধারণা, যেসব শিশুদের বয়স একবছরের কম তাদের ঘাড়ে যেকোনও সময়ে শয়তান ভর করতে পারে। এই অশুভ শক্তির হাত থেকে শিশুকে বাঁচাতে এই অদ্ভুত প্রথার প্রচলন যা ধীরে ধীরে উৎসবের রূপ নেয়। উৎসবের দিন রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় বিছানা পেতে শিশুদের বিশেষ করে নবজাতকদের শুইয়ে দেওয়া হয়। আর ওদের চারপাশে লম্ফঝম্প করে ঘুরে বেড়াতে থাকে শয়তানের দল। না, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এরা দর্শকদের বা আগন্তুকদের কোনও ক্ষতি করে না। সত্যি বলতে এরা কারওরই কোনও ক্ষতি করে না। এমনকি শিশুদেরও নয়। এরা তো সত্যি সত্যি শয়তানের দল নয়। শয়তানের সাজে সেজে থাকা কিছু মানুষ। এদের আগমন রাস্তার মাঝখানে শুইয়ে রাখা শিশুদের গায়ের উপর দিয়ে লাফ দেওয়ার জন্য। যে কেউ এই লাফ দেওয়ার অনুমতি পেতে পারে। তবে তাকে শয়তানের সাজে সাজতে হবে। এই অদ্ভুত কাণ্ড ঘটানোর পিছনে স্থানীয় লোকেদের বিশ্বাস, অশুভ কোনও কিছু শিশুটিকে যেমন ছুঁতে পারবে না তেমন ভবিষ্যৎ জীবনে সে হয়ে উঠবে লড়াকু। ১৬২০ সালে চালু হওয়া এই উৎসবের জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

পনির দৌড় উৎসব

পনির আমরা অনেকেই খাই। তবে তার জন্য ঝুঁকি নিতে হবে এবং আহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে, এমন কথা আমরা স্বপ্নেও ভাবি না। ইংল্যান্ডের লোকেরা কিন্তু এমন ঝুঁকি নিতে রাজি। একটুকরো পনিরের জন্য পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়াগড়ি খেতে তাদের কোনও আপত্তি নেই। তার জন্য যদি হাড়গোড় ভাঙে ভাঙবে। তবুও পনিরের প্যাকেটটা হাতছাড়া করা যাবে না।
প্রায় পাঁচশো বছরের পুরনো এই চিজ রোলিং খেলা। হ্যাঁ, একসময় এটা খেলা ছিল, এখন উৎসবে পরিণত হয়েছে। উৎসবের দিনে দলে দলে লোক এসে জড়ো হয় ব্রিটেনের গ্লোসেস্টারের কুপার্স পাহাড়ের ঢালে। কিছু লোক পনির বা চিজ-এর বড়ো বড়ো প্যাকেট নিয়ে পাহেড়ের চুড়োয় উঠে যান। সেখান থেকে একটা একটা করে পনিরের প্যাকেট নিচের দিকে ছুড়ে দেওয়া হয়। যতক্ষণ না পনিরের প্যাকেটটি পাহাড়ের নিচে গড়িয়ে পড়ছে ততক্ষণ পাহাড়ের ঢালে জড়ো হওয়া জনসমুদ্রের মধ্যে চলতে থাকে হুড়োহুড়ি, ধাক্কাধাক্কি, গড়াগড়ি। এরফলে হাত-পা ছড়ে যাওয়া বা ভেঙে যাওয়ার মতো ঘটনা যে ঘটে না তা নয়। তবে তা নিয়ে কারোর মাথা ব্যথা নেই। আফসোস হয় যদি পনিরের প্যাকেটটা হস্তগত করতে না পারে। সারাদিন ধরে উৎসব চলে, তাই প্যাকেট পাওয়ার সুযোগ বারবার ফিরে আসে।
নতুন বছরকে স্বাগত জানাতেই এই উৎসবের সূত্রপাত। শুরুতে অবশ্য চিজ রোলিং ব্যাপারটা ছিল না। ধরিত্রী আরও সুফলা হবে এই বিশ্বাস নিয়েই সে-সময় পাহাড়ের মাথা থেকে ছুড়ে দেওয়া হত জ্বলন্ত শুকনো ঘাসপাতা। সেই সঙ্গে ছড়ানো হত বিস্কুট কিংবা মিষ্টি। পরবর্তীকালে বিস্কুট, মিষ্টি এবং ঘাসপাতাকে সরিয়ে সেই জায়গা দখল করে পনিরের প্যাকেট। যেমন অনুষ্ঠান বাড়িগুলিতে দই-এর জায়গা দখল করে নিয়েছে আইসক্রিম। পনির দৌড়ের সূত্রপাত সম্ভবত এইভাবেই হয়েছিল। কারও কারও মতে, পাহাড়ের পাদদেশে যে বিস্তীর্ণ চারণভূমি আছে সেখানে গবাদি পশু চরানোর অধিকার যাতে সবার সমান থাকে তাই এই পনির দৌড় বা চিজ রোলিং উৎসব। বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দারা ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেকে আসেন এই উৎসবে যোগ দিতে। উৎসব শেষে অনেককেই অবশ্য আহত হয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে অ্যাম্বুলেন্সে চড়তে হয়।
চিজ নিয়ে আরেকটা উৎসব আছে অক্সফোর্ডশায়ারে। এই উৎসবে অবশ্য পনির লোফালুফি করতে হয় না। ধাওয়া করতে হয় একটি গরুর গাড়ির চাকার পিছনে। উপহারস্বরূপ পাওয়া যায় পনিরের একটি বড়ো প্যাকেট।

বানর ভোজের উৎসব

জিভে জল আনা নানাধরনের লোভনীয় খাবার নিয়ে খাদ্য-উৎসব এখন দেশে বিদেশে সর্বত্রই অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়। শীতকাল এলে আমাদের দেশেও জেলায় জেলায়, পাড়ায় পাড়ায় এমন উৎসব শুরু হয়ে যায়। তবে এই উৎসবে অতিথিদের ট্যাঁকের কড়ি গুনে খাবারের স্বাদ গ্রহণ করতে হয়। থাইল্যান্ডের লোপবুরি প্রদেশে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় এক অভিনব খাদ্য উৎসব। এই উৎসবের অতিথি কিন্তু মানুষ নয়, বানর। বিভিন্ন মন্দিরে এবং বিভিন্ন জায়গায় রাস্তার ধারে বানরদের পছন্দের খাবার থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়। খাবারের পরিমাণ কিন্তু খুব একটা কম নয়, ফল ও সবজি মিলিয়ে প্রায় চার হাজার কেজির মতো। বানরেরা আসে এবং তাদের ইচ্ছেমতো পছন্দের খাবার খেয়ে চলে যায়।
বানরদের এই ফেলে ছড়িয়ে খাওয়া দেখতে প্রতিবছর এখানে ভিড় জমায় হাজার হাজার পর্যটক। অনেকেই আসেন বানরের কস্টিউম পরে। নাচে গানে কাটিয়ে দেন সারাটা দিন। অনেকের মতে পর্যটকদের আকর্ষণ করতেই থাইল্যান্ডে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় এমন এক অভিনব উৎসবের।

তথ্যসূত্রঃ
১) শুভ উৎসব, পীতম সেনগুপ্ত, ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ইন্ডিয়া।
২) ভারতের উৎসব, অনুবাদ – অভিজিৎ সরকার, ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ইন্ডিয়া।
ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a Comment