গল্পঃ শ্মশানে এক রাতঃ মধুমিতা ভট্টাচার্য




“বাজি রেখে আমি বলতে পারি তুই আর যা-ই পারিস, কিন্তু ‘সাধুপোড়া শ্মশান’-এ গিয়ে কিছুতেই একরাত কাটাতে পারবি না।” চন্দনের হাঁটুতে বেশ জোরের সঙ্গেই চাপড়টা মারে অঙ্কিত।
সাধুপোড়া শ্মশান। শুনতে অদ্ভুত হলেও এটাই নাম। আশপাশের লোকজন এই শ্মশানের নাম নিলে কপালে জোড়হাত ঠেকিয়ে কারও উদ্দেশ্যে প্রণাম করে। শ্মশান যখন, তখন শবদেহ তো পুড়বেই। তবে সাধুপোড়া নাম সচরাচর শোনা যায় না। এই নামের পেছনে নাকি অনেকদিন আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আছে। তবে তা কতটা সত্যি সেটা কেউই সঠিক জানে না।
“বাজি ধরছিস? ঠিক আছে। কত টাকা? ক্যাশে একবারে দিবি তো? আমার আবার ইন্সটলমেন্ট পোষায় না।” হেসে বলে চন্দন।
“কালই হাতখরচের পাঁচশো টাকা পেয়েছি। সেটাই ক্যাশ এবং হাতে-গরম দেব তোকে। রাজী? কিন্তু ফাঁকি মারলে দুগুণ উশুল করব। বুঝেছ চাঁদু?” অঙ্কিতও পিছু হটে না।
“ওক্কে, রাজী।”
বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনো করে চন্দন। ভূত-টুত মানে না। চ্যালেঞ্জটা নিয়েই নেয়।
চন্দন, অঙ্কিত, শুভ আর বিজিত। স্কুল-জীবনের সহপাঠী। এখন একই কলেজে পড়ে। আপাতত শীতের ছুটির অবসরে পার্কের এককোণে বাঁধানো অশ্বত্থগাছের নিচেই বিকেলের আড্ডা। রাস্তার ওপারে ছোলাওয়ালা গরম গরম ছোলাভাজা বিক্রি করে। সেই ছোলাভাজার সঙ্গে দুয়েক রাউন্ড চা চলে ওদের।
ভূতের আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল অঙ্কিতের মামাবাবুর কথায়। কর্মসূত্রে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ালেও মাঝেমাঝে উনি আসেন ওদের বাড়ি। সেদিনও এসেছিলেন, তাই দেখা হয়েছিল চারবন্ধুর সঙ্গে। গল্পচ্ছলে আচমকাই জিজ্ঞেস করলেন, “প্ল্যানচেট শব্দটা শুনেছিস তোরা? অনেকে অবশ্য প্লাঁশেও বলে।”
“খুব শুনেছি।” চারজনেই সমস্বরে বলে।
“তাহলে সাহস করে একদিন আমার সাথে প্ল্যানচেটে বসে দেখ। অলৌকিক অভিজ্ঞতা হবে। আমি কিন্তু মৃত আত্মাদের সঙ্গে কথা বলি প্রায়ই। রাতবিরেতে কত শ্মশানে যে একা ঘুরে বেড়াই বললেও বিশ্বাস করবি না হয়তো। আর সেখানে যাঁদের দেখা পেয়েছি তাঁরা সবাই পরপারের।” মামার কথায় রহস্যের ছায়া ঘনিয়েছিল। “এরপর সুযোগমতো একবার শবসাধনা করার ইচ্ছে আছে। তবে তার জন্যে আরও সাহসের দরকার। ভয় পেলেই বিপদ। ওপারের না-মানুষরা নিজেদের দল ভারী করার জন্যে মুখিয়ে থাকে।”
এ-কথায় চন্দনের অবিশ্বাসী হাসি দেখে মামা গম্ভীর হয়ে বলেছিলেন, “ওঁদের নিয়ে ঠাট্টা করিস না।”
পরদিনের আড্ডায় চন্দন ভুরু নাচিয়ে বলল, “ধুস, মামা যে কীসব বলেন! পরপারের মানুষ! এই রোবটের যুগে ওসব হয় নাকি? ভূত হচ্ছে মনের ভুল। আমিও যেতে পারি শ্মশানে।”
অঙ্কিত লাফিয়ে উঠে বলে, “তুই? অসম্ভব! তাহলে আগামী অমাবস্যায় রাতভর শ্মশানে কাটিয়ে দেখা তো কেমন বুকের পাটা! বাজি রেখে আমি বলতে পারি...”
এ গল্পের শুরুতেই বলে রাখা এই চ্যালেঞ্জটাই আপাতত নিয়ে বসেছে চাঁদু।
চন্দন আগেও কয়েকবার সাধুপোড়া শ্মশানে গেছে। প্রথমবার বহুদিন আগে, ছোটোবেলায়। মা আর মাসির হাত ধরে শ্মশানকালী মায়ের মন্দিরে পুজো দিতে গেছিল। আর বড়ো হওয়ার পর মড়া পোড়াতে বার দুয়েক। ছোটোবেলায় ভয় পেয়েছিল, এখন আর পায় না।
সাধুপোড়া শ্মশানে পঞ্চবটি আর পাঁচমুন্ডির আসন আছে। দিনের বেলাতেও ছায়া ছায়া, ছমছমে হয়ে থাকে জায়গাটা। শ্মশানকালী মায়ের মন্দিরে শ্বেতপাথরের একটা উঁচু বেদিতে শিবের বুকে দাঁড়ানো দু’হাত লম্বা লাল টকটকে জিভ বের করা কষ্টিপাথরের মূর্তি, মা শ্মশানকালী। ভারি সুন্দর। মা নাকি খুব জাগ্রতা। মানত করলে ফল অবশ্যম্ভাবী। এই মন্দিরটা নতুন। আগের মন্দিরে বাজ পড়ে আগুন ধরেছিল। সে সময়কার খড়-মাটিতে গড়া মায়ের মূর্তি সেই লেলিহান আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছিল। পরে এই কষ্টিপাথরের মূর্তি প্রতিষ্ঠা হয়।
লোকে বলে রাতে মায়ের বন্ধ মন্দিরের ভেতর থেকে নূপুরের ছুমছুম আওয়াজ শোনা যায়; চিতায় জ্বলন্ত মৃতদেহের চিমসে গন্ধ ছাপিয়ে ধূপধুনোর অদ্ভুত মনমাতানো গন্ধ ভেসে আসে; পুজোর ঘণ্টির টুংটাং আর বাসনকোসনের ধাতব শব্দও শুনেছে অনেকে। পূজারিকে জিজ্ঞেস করলে উত্তর না দিয়ে একটু হেসে পাশ কাটিয়ে যান। কেউ জানে না এর রহস্য কী!
শ্মশানের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটার জল প্রায় দুধসাদা রঙের। দাহকাজ শেষে সবাই এই নদীতেই অস্থি বিসর্জন দিয়ে স্নান সেরে নেয়। কত মানুষের অন্তিম মূহূর্তের সাক্ষী এই বহমান নদী, কেউ জানে না। কত লোকের শেষ অস্থি, অদাহ্য নাভি আর করোটি জমিয়ে রেখেছে তার সজল গর্ভে তার হিসেবই বা কে রাখে। সেসব করোটিতে ভাগ্যলিখন বলে কিছু ছিল কি না, অথবা থাকলেও তাদের জীবিতকালে সেসব ফলেছিল কি না তা নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনও অবকাশ আজ আর নেই।
শ্মশানের আশেপাশে দু-তিনটে গ্রাম আর একটা আধা শহর। সেখানকার লোকেরা বলে, রাতবিরেতে নাকি নানানরকম অপার্থিব আওয়াজ ভেসে আসে শ্মশানের দিক থেকে। মরা পোড়ানোর হরিধ্বনি বা শেয়াল-শকুনের কান্না নয়। সে অন্যরকম, হাড়হিম করা। তবুও বিজ্ঞানে বিশ্বাসীরা সেসব মোটেই পাত্তা দেয় না। এই যেমন আজকের চন্দন, অঙ্কিত বা শুভ। কেবল বিজিত বিরস মুখে ছোলাভাজা চিবোতে চিবোতে বলল, “কী দরকার অত রিস্ক নিয়ে, বল তো? ওঁদের নিয়ে এসব ঠাট্টা-মশকরা না করাই ভালো। কে জানে, হয়তো সত্যিই কিছু আছে। নইলে এত লোকে ভূতপ্রেত মানবেই বা কেন! ছাড় তো এসব বাজি ধরার পাগলামি। তার চে’ চল, সবাই মিলে একটা মুভি দেখে আসি নাইট-শোতে।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস। তাই চল।”
বিজিতের কথায় শুভ মাথা নেড়ে সায় দিতেই চন্দন বলে ওঠে, “কক্ষনও নয়। আমাকে কি ভিতুর ডিম ঠাওরেছিস? বাজি ইজ বাজি। একবার যখন ডিসাইড হয়ে গেছে, তখন কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না। এই দেখ, গুগল বলছে আগামীকালই অমাবস্যা। এ-সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। মাঝরাতে সাধুপোড়া শ্মশানে আমি যাচ্ছিই। অঙ্কিত, তুই বাজির টাকাটা ভুলিস না যেন।”
“ডোন্ট ওরি দোস্ত। হাতে-গরম পাবি। তবে, এখনও সময় আছে। ভেবে দেখ আরেকবার। কিছু হলে আমার ঘাড়ে দোষ চাপাস না যেন। এই তোরা কিন্তু সাক্ষী।”
“তোরই বা কী দরকার ছিল চ্যালেঞ্জ করার?” বিজিত ক্ষীণস্বরে বলে।
শুনে চাঁদু হাত নেড়ে মাছি তাড়াবার ভান করে কেবল।

“আমি আজ মাকে নিয়ে মামার বাড়ি যাচ্ছি, বুঝলি?” পরেরদিন সকালে অঙ্কিত চন্দনকে ফোন করে জানাল। “বিকেলের মধ্যেই ফিরব। দিদার শরীরটা বেশি ভালো নয়, তাই মাকে নিয়ে যাচ্ছি। তুই শ্মশানে যাচ্ছিস তো? চাইলে এখনও ক্যান্সেল করতে পারিস।”
“তুই যা, রাতে দেখা হবে।” চন্দন হেসে জবাব দিল।
বিকেলের আড্ডাটা তেমন জমল না। শুভর হালকা জ্বর এসেছে, লেপমুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে বাড়িতে। আজ কেবল বিজিত আর চন্দন। দুটো এগরোল খেয়ে এটা সেটা গল্প করে বাড়ি ফিরল সন্ধের মুখে।

ধোঁয়াশার উড়ুনি ঘেরা ল্যাম্প-পোস্টগুলোর মাথায় টিউব লাইটের নিয়ন-দৃষ্টি তখন বেশ কিছুটা ঝাপসা। আরও রাত বাড়লে ওদের টিমটিমে আলোয় এই চেনা পাড়াটাই অচেনা ঠেকবে। চন্দন ভূতপ্রেত বিশ্বাস করে না। তবুও নিজের ভেতরে একটা চাপা টেনশন টের পাচ্ছে। তার ওপর বাড়িতে আজ ও একা। মা-বাবা ক’দিন হল কেদার-বদ্রী বেড়াতে গেছেন। একাই বসে টিভিতে ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে দেখতে তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া সেরে নিল চন্দন। বাড়িতে কেউ না থাকায় রাতে বেরোতে অসুবিধে নেই আজ। অঙ্কিত আর বিজিত ওকে শ্মশানের গেট অবধি পৌঁছে দেবে।
সাড়ে দশটা বাজে। বাইরে বাইকের হর্ন শুনে বুঝল ওরা এসে গেছে। ঠাণ্ডার মোকাবিলায় টুপি, সোয়েটার, মাফলার পরেছে চন্দন। তাও কী ভেবে একটা গরম চাদর জড়িয়ে দরজায় তালা মেরে বেরিয়ে এল। মফস্বলের শীত-কাঁপানো রাত। সাড়ে দশটাতেই রাস্তা বেশ নিরিবিলি। বাড়িগুলোর জানালা-কপাট বন্ধ।
একটু এদিক ওদিক দেখে বাইক স্টার্ট করল অঙ্কিত। ঠাণ্ডা ধারালো হাওয়া বেরিয়ে যাচ্ছে কান ঘেঁষে। তিনজনের কেউই কথা বলছে না বিশেষ।
আধঘন্টাটাক লাগল শ্মশান পৌঁছতে। বাইক থেকে নেমে চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল তিনজনেই। নিঝুম রাত। ঝাঁপবন্ধ চা-গুমটি কয়েকটা। ফুটপাথে ঘুমন্ত কুকুরগুলো অভ্যেসবশে দুয়েকবার ভুক ভুক করে ডেকে ঘুমিয়ে পড়ল আবার। নতুন মানুষ দেখে ওরা অভ্যস্ত।
“গেটের দারোয়ানকেও দেখছি না তো কোথাও, এই শীতের রাতে দাহকাজেও কেউ আসেনি বোধহয়। ঠাণ্ডায় কি মানুষ মরতেও ভয় পায় নাকি রে?” কথাটা বলে চন্দন হাসল একটু।
“চাঁদু, ছাড় না এই শ্মশানে রাত কাটানোর বাজি ধরা। বাড়ি চল, আমার কিন্তু বেশ ভয় করছে।” বিজিত অনুনয় করে।
এতক্ষণে অঙ্কিতও চন্দনের কাঁধে হাত রেখে বিজিতকে সমর্থন করে মাথা নেড়ে। কিন্তু চন্দনের এক গোঁ। “তোরা ফিরে যা এবার। আমি ঠিক থাকব। কাল সকালে দেখা হবে, টা টা।” বলে হাত নেড়ে আধখোলা গেটের দিকে এগোয়। বিজিত আর অঙ্কিত দ্বিধাগ্রস্থ মনে বাড়ির রাস্তা ধরে।
শ্মশানের ভেতরে পায়ে পায়ে অনেকটা এগিয়ে গেল চন্দন। অদ্ভুতভাবে জনমানবহীন হয়ে আছে চত্বরটা। কুয়াশামাখা টিমটিমে বালবগুলো ল্যাম্প-পোস্টের মাথা থেকে এক অপার্থিব রহস্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। গাছের একটা পাতাও নড়ছে না। হাওয়া-বাতাস, আলো সব যেন পথ হারিয়ে থমকে গেছে এখানে। হঠাৎ কোথা থেকে একরাশ ভয় আর অস্বস্তি ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর ওপর। নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলে, ‘এত বড়ো ঝুঁকি নেওয়াটা বোধহয় ঠিক হয়নি মনে হচ্ছে এখন। ফিরে যাব? ফোন করে অঙ্কিতদের ডেকে নেব?’ পরক্ষণেই ভাবে, ‘নাহ্‌, চ্যালেঞ্জ ইজ চ্যালেঞ্জ। দেখাই যাক না কী হয়!’
হাঁটতে হাঁটতে একটা বাঁধানো বটগাছের নিচে এসে দাঁড়ায় চন্দন। ল্যাম্প-পোস্টের ঢিমে আলোয় দেখা যাচ্ছে একটু দূরেই দুটো দাহস্থান। সেখানে লোহার ফ্রেমের মাঝে উঁচু করে কাঠ দিয়ে চিতা সাজানো হয়। এখনও ইলেকট্রিক চুল্লি আসেনি এখানে। তাই সাবেকী মতেই কাজ চলে।
চন্দন একটা সিগারেট ধরানোর চেষ্টা করে।
‘উফ্‌, আজ কপালটাই খারাপ, একটা কাঠিও জ্বালাতে পারছি না। অথচ হাওয়া নেই একফোঁটাও! তবে কি কেউ ফুঁ দিয়ে আগুনটা নিভিয়ে দিচ্ছে বারবার?
‘ধুত্তোর কী ভাবছি এগুলো! যত্তসব মনের ভুল। দেশলাইটা হিম লেগে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে গেছে নিশ্চয়ই।’ ভয় কাটাতে পকেট থেকে মোবাইল বের করে চন্দন। ‘আহ্‌, সিগন্যালও নেই দেখছি। তাড়াহুড়ো আর টেনশনে মোবাইল চার্জ করতেও ভুলে গেছি। এখন সারারাত সময় কাটাই কী করে?’
বিরক্তির সঙ্গে ফোনটা পকেটে রেখে সামনে তাকিয়েই চমকে ওঠে চন্দন। ‘ও-ওটা কী! দুধসাদা উড়ুনির মতো কী একটা ভাসতে ভাসতে ওদিকে মিলিয়ে গেল না! কোনও পাখি তো এত বড়ো হবে না। চোখের ভুলও নয় মোটেও। তবে?’
আচমকা শিরশিরে ঠাণ্ডা এক ঝলক অকারণ বাতাসে চন্দনের গায়ে কাঁটা দিল আর শুনতে পেল কানের পাশে ফিসফিস করে কে যেন বলছে, “ভয় কী রে বেটা! আমি আছি তো! কিন্তু ভবিষ্যতে আর কখনও রাতে এরকম একলা শ্মশানে আসবি না। আমাদের অসুবিধে হয়। অনেকে রেগেও যায়। তখন কোনও অঘটন ঘটে যেতেই পারে। বুঝলি?”
চন্দন এদিক ওদিক তাকায়। কেউ নেই। হাওয়াটাও নেই আর। কিন্তু স্পষ্ট শুনেছে কথাগুলো। পাদুটো অসাড়, বুকে দ্বিগুণ তেজে দামামা বাজতে থাকে। পেছন ফিরে দৌড়ে পালিয়ে যেতেও ভুলে যায়।
মিনিট পাঁচেক ওভাবেই কাটার পর ক্রমশ একটু একটু করে সাহস ফিরে আসে। ‘ফিসফিসিয়ে বলে যাওয়া কথাটার মধ্যে যেন আশ্বাসবাণী ছিল একটা। তাছাড়া বেটা বলে ডেকেছে যখন, ভয় কী! নিশ্চয়ই ক্ষতি করবে না আমার।’
বটগাছতলায় ধীরে ধীরে বসে ব্যাগ থেকে বোতল বের করে কয়েক ঢোঁক জল খায়। কালীমন্দিরটা সামনেই। আধো অন্ধকারে ভালো করে খেয়াল করে। ‘ওই তো, পাঁচমুন্ডি আর পঞ্চবটিও আছে দেখছি ঢিলছোঁড়া দূরত্বেই। এরপর কী!’ মনে মনে ভাবে। ‘আরে, মন্দিরের ওপাশে একটা কুঁড়েঘর না? এতক্ষণ চোখে পড়েনি তো! একটা হালকা আলোর রেখাও দেখা যাচ্ছে যেন! যাক, তাহলে মানুষ আছে নিশ্চয়ই। হয়তো শ্মশানের ডোম থাকে। যাই, বরং দেখে আসি। গল্পসল্প করা যাবে একটু।’
কুঁড়েঘরটা দেখে চন্দন স্বস্তি পায় খানিক। মানুষের সান্নিধ্য একেক সময় অন্য সব প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হয়ে ওঠে। ওখানেই যাওয়ার জন্যে উঠে দাঁড়ায়। তখনই কোথায় যেন পেঁচা ডেকে ওঠে হুমহুম করে। পঞ্চবটীর কোনও গাছের মাথায় তক্ষক ডাক ছাড়ে ঠক্কক ঠক্কক... হিম হিম কালো শ্মশানে কাদের ছায়া যেন ঘুরপাক খায়। ধূপের গন্ধ ভেসে আসে কুয়াশায় ভর করে। অমানিশার এই অপার্থিব অন্ধকারে কেমন মাথা-ঝিম নেশা ধরে যায় চন্দনের। মনে হয় বাকি জীবনটা বোধহয় এখানেই থাকতে হবে ওকে। বাড়িঘর, মা-বাবা, বন্ধুদের দল সব সবকিছুই যেন অর্থহীন মনে হতে থাকে। এখানেই চরম মোক্ষলাভ হবে আজ - এক অদ্ভুত দৃঢ়বিশ্বাস জাপটে ধরে যেন।
ভাবতে ভাবতেই দেখে কুঁড়েঘরটার সামনেই এসে দাঁড়িয়েছে সে। দরজার ফাঁকফোকর দিয়ে উঁকি মারা আলোটা দিপদিপ করছে। সাড়াশব্দ নেই কারও। হয়তো ঘুমোচ্ছে। সাবধানে বেড়ার দরজাটায় চাপ দেয়।
“যাস না, ভেতরে যাস না!”
আবার কে যেন ফিসফিস করে কানের কাছে। সাবধান করতে চায়? কেন? কী আছে ঘরটায়? চন্দনের রোখ চাপে। দেখতেই হচ্ছে ব্যাপারটা। একটু ঠেলতেই ক্যাঁ-চ করে শব্দ করে খুলে যায় দরজাটা। ভেতরে ঢোকে চন্দন। একপাশে ধুনির আগুন, আর তার সামনে জ্বলছে একটা অদ্ভুত দেখতে পেতলের চকচকে প্রদীপ। তার দু’পাশে আংটা লাগানো। তেল, সলতে দিয়ে কেউ বুঝি সদ্য ধরিয়ে গেছে। একটা নরকরোটিতে রঙিন তরল। মেঝেতে খানিকটা খড় বিছানো। এককোণে একটা কুঁজো আর কলাইয়ের গ্লাস। যেন এক্ষুনি উঠে গেছে কেউ, আবার আসবে। ধুনি জ্বলছে, তবুও বরফ-জমা ঠাণ্ডা হয়ে আছে ঘরটা। চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে খড়ের ওপর বসে কুঁড়েঘরের মালিকের অপেক্ষা করতে থাকে চন্দন।

“চলে যা, চলে যা এক্ষুনি। কেন এসেছিস? এখানে কী চাই?”
ঢুলুনি এসেছিল চন্দনের। হঠাৎ এই ধমক শুনে ধড়মড় করে জেগে দেখে সামনে কে একজন দাঁড়িয়ে। লম্বা সুঠাম দেহ। একটা লালপাড় শাড়ি অর্ধেকটা ধুতির মতো পরা, আর তারই বাকি অংশটুকু গায়ে উড়ুনির মতো জড়ানো। এই শীতে গায়ে আর কোনও কাপড় নেই। এলোমেলো সাদা দাড়ি নেমে এসেছে বুকের ওপর, মাথায় ধূসর জটা। অপ্রসন্ন মুখ, ধুনির আগুনের প্রতিচ্ছটায় দু’চোখ জ্বলছে ধকধক করে। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন ওর দিকে। সেই চোখের দিকে চন্দন বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না। চোখ নামিয়ে পায়ের দিকে তাকাতে দেখে খড়ম পরা পায়ে আলতার রেখা। মাথা কাজ করে না ওর। কেমন যেন অসাড় করে তোলা এক চেতনা জড়িয়ে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে।
“কী দেখতে এসেছিস? অ্যাঁ? কী দেখবি? বাজি ধরেছিস? শ্মশান কি বাজি ধরার জায়গা? নে দেখ আজ কী দেখবি। ভুলবি না আর জীবনেও, হা হা হা...”
অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন সাধু আর তারপর আচমকা প্রদীপের আগুনটা যেন ছড়িয়ে পড়ে সারা ঘরে আর দপ করে জ্বলে ওঠে ওঁর শরীর। অট্টহাসি হাসতে হাসতে সেই গনগনে আগুনে পুড়তে থাকেন সাধু। দু’চোখ জ্বালা করে চন্দনের। অবশেষে আগুনের এক পিণ্ড খোলা দরজা দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে শূন্যে ভাসতে থাকে বাইরে। তারপর কুয়াশা ভেদ করে, পঞ্চবটীর মগডাল ছাড়িয়ে, জ্বলতে জ্বলতে গভীর অন্ধকার আকাশে মিলিয়ে যায়। রক্তজল করা সেই হাসি প্রতিধ্বনিত হতে থাকে শ্মশানের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে। আর পারে না চন্দন। জ্ঞান হারায় অবশেষে।

“চন্দন, ওঠ ওঠ। এই চাঁদু!”
কারা যেন ডাকছে। ক্রমশ গভীর সমুদ্রের তল থেকে যেন ভেসে উঠতে থাকে চন্দন। ধীরে ধীরে চোখ খোলে। খানিকক্ষণ পরে বোঝে অঙ্কিতের মামা ওর দিকে ঝুঁকে আছেন। অঙ্কিত আর বিজিতও আছে সঙ্গে। ওকে চোখ খুলতে দেখে হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে অঙ্কিত। “আর কোনওদিন এরকম বাজি ধরব না আমি। খুব শিক্ষা হয়েছে আমার। মামা না থাকলে আজ কী হত কে জানে!”

কথা হচ্ছিল অঙ্কিতদের বাড়িতে বসে। সকাল হয়ে গেছে। চন্দন এখন অনেকটা সুস্থ। যদিও রাতের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার রেশ এখনও ওকে ছেড়ে যায়নি। অঙ্কিতের বাবা খুব বকাবকি করেছেন ওদের।
“আপনারা কী করে পৌঁছলেন ওখানে?” মামাকে জিজ্ঞেস করল চন্দন।
মামা চন্দনের মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “তোরা হয়তো বিশ্বাস করবি না, কিন্তু কাল সত্যিই আলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। রাতে খাওয়াদাওয়া সেরে মাকে ওষুধ খাইয়ে আমি নিজের ঘরে ঢুকে একটু পড়াশোনা করছিলাম। বেশ রাত হয়েছিল। হঠাৎ কেমন একটা অস্বস্তি হতে লাগল আর ভীষণ পোড়া গন্ধ নাকে এল। ইলেকট্রিকের তারে শর্ট-সার্কিট হয়েছে ভেবে বাইরে বেরোতে যাব, এমন সময় জানালাটা হাট করে খুলে গেল। ভাবলাম হয়তো হাওয়া দিচ্ছে আর আমি ঠিকমতো বন্ধ করিনি জানালাটা। কিন্তু তখনই ভীষণ একটা আগুনের গোলা সেই খোলা জানলার সামনে এসে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকল আর সাথে গা হিম করা অট্টহাসি। এতদিনের অনেক ভূতপ্রেতের অভিজ্ঞতা আমার আছে, কিন্তু কাল আমার নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। দেখলাম সেই আগুনের গোলার ভেতরে এক সাধুর মুখ, শ্মশ্রুগুম্ফজটাধারী, অবিশ্বাস্য রকমের জ্বলজ্বলে চোখ। আগুনের মধ্যেই, অথচ পুড়ছে না। আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম, উনি বলছেন, শ্মশানে যা, নইলে ছেলেটাকে আজ কেউ বাঁচাতে পারবে না। ওরা আসছে। যা, যা শীগগির। হা হা হা... আর শুনে রাখ, ফের যদি কোনওদিন পরপারের আত্মাদের নেহাত মজা করার জন্যে টেনে নামাতে চেয়েছিস, সেদিন তোকেও আমাদের দলে নিয়ে আসব। তখন নিজের চোখেই দেখে নিস কেমন আছি আমরা।
“হাসতে হাসতে মিলিয়ে গেল সেই জ্বলন্ত সাধুর মুখ আর আমি আচমকা দেখলাম জানালাটা বন্ধই আছে। অথচ পোড়া গন্ধটা তখনও ঘরের ভেতর পাক খাচ্ছে। কী মনে হতে ওই রাতেই তড়িঘড়ি ফোন করলাম অঙ্কিতকে। তখনই জানতে পারলাম তোদের বাজি ধরার কথা। দেরি না করে গাড়ি নিয়ে প্রথমে ওকে, তারপর বিজিতকে উঠিয়ে শ্মশানে গিয়ে যখন পৌঁছলাম তখন অনেক রাত। গাঢ় কুয়াশায় সব অস্পষ্ট। টর্চ জ্বেলে খুঁজতে খুঁজতে তোকে পেলাম। হাড়হিম ঠাণ্ডায় খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছিস। চারপাশে পোড়া কাঠ ছড়ানো। যেমন হয় শ্মশানে। তারপর এক মুহূর্ত দেরি না করে তোকে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে আসা হল। জ্ঞান ফেরানো হল অনেক কষ্টে। উহ্‌, খুব ভয় পাইয়েছিলিস।”
একটানা এত কথা বলে একটু দম নিলেন মামা। তারপর বললেন, “তোরা কিন্তু খুব অন্যায় করেছিস এত বড়ো ঝুঁকি নিয়ে। কতবার বলেছি, ওঁদের নিয়ে ইয়ার্কি করিস না। ওঁরা রেগে যান। আমিও আর কোনওদিন প্ল্যানচেট করব না ঠিক করেছি।”
“উনি কে ছিলেন, মামা?” অঙ্কিত জানতে চায়।
“শুনেছিলাম ওই শ্মশানে একটা খড়ের ঘরে থাকতেন একজন সাধু। প্রথম জীবনে আর পাঁচজন লোকের মতোই গৃহী ছিলেন। পরে কোনও এক অমোঘ আধ্যাত্মিক টানে ঘর ছেড়ে শ্মশানে চলে যান। উচ্ছৃঙ্খল, নেশাগ্রস্ত কিছু যুবক কোনও এক শীতের রাতে শবদাহ করতে এসে ওঁর কুঁড়েঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। উনি তখন ধ্যানে বসেছিলেন। ঘরের সঙ্গে উনিও ওই অবস্থাতেই পুড়ে যান। কিন্তু জীবিত বা মৃত ওঁকে পাওয়া যায়নি। কোনও দেহাবশেষও না। তবে একটা উড়ন্ত আগুনের গোলা নাকি অনেকে দেখতে পেয়েছিল। মনের ভুল ভেবে আমল দেয়নি। তখন থেকেই এর নাম সাধুপোড়া শ্মশান। চন্দনের মতো এমন অভিজ্ঞতা বোধহয় আর কারও হয়নি। তবে তোর কপাল ভালো, অল্পের ওপর দিয়ে গেছে। এরপর আর কোনওদিন এসব ছেলেখেলা করিস না। আজও পৃথিবীর অনেক ঘটনাই বুদ্ধি দিয়ে মাপা যায় না, বুঝলি?”

চন্দনের মা-বাবা কেদার-বদ্রী থেকে ফিরে আসার পরদিন চন্দন ওর পড়ার টেবিলে একটা অদ্ভুত জিনিস আবিষ্কার করে। দু’দিকে আংটা লাগানো, তেলচিটে, পোড়া সলতের চিহ্ন মাখা একটা পেতলের প্রদীপ। ধুনির সামনে ঠিক যেমনটা ও দেখেছিল। অথচ অঙ্কিতরা শ্মশানে গিয়ে সে রাতে কোনও কুঁড়েঘরের চিহ্নমাত্র দেখতে পায়নি। ধুনি, প্রদীপ, নরকরোটি, আগুন কিছুই না।
“মা, এটা কোথা থেকে এল এখানে? কে আনল?” জিজ্ঞেস করে চন্দন। “এটা তো...” বলতে গিয়েও চুপ করে যায়।
“আরে সে এক অদ্ভুত কাণ্ড, জানিস তো।” বলেন ওর মা। “কেদারে মন্দিরের সামনে হঠাৎ এক সাধুবাবা এসে এটা আমাদের দিয়ে বললেন, এটা নিয়ে যাও, তোমার বেটাকে দিও, ওর ভালো হবে। তারপর মুহূর্তেই কোথায় চলে গেলেন। টাকাপয়সাও কিছু নিলেন না। কী সুন্দর দেখতে প্রদীপটা, না রে? কিন্তু উনি জানলেন কী করে যে আমার ছেলে আছে? কী জানি বাপু। সাধুসন্তদের অনেক ক্ষমতা থাকে, জানিস তো।”
‘না বাবা, দরকার নেই। এটাকে নদীতে বিসর্জন দিয়ে দেব কাল,’ ভাবল চন্দন। আর তখনই কানের পাশে কে যেন ফিসফিস করে ওঠে, “ফেলিস না, রেখে দে বেটা। ভালো হবে।”
চকচকে পরিষ্কার করা প্রদীপটা তারপর থেকে ওর পড়ার টেবিলেই থাকে। ওপারের না-মানুষদের নিয়ে চারবন্ধু আর ঠাট্টা করে না কোনওদিন। মামা প্ল্যানচেট করা ছেড়ে দিয়েছেন। বাজির টাকাটাও চন্দন আর নেয়নি।
অবিশ্বাসী হলেও চন্দন এসবের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেনি আর। ভেবে দেখেছে, কিছু প্রশ্ন উত্তরহীন থাকাই সবদিক থেকে মঙ্গল।
_____

No comments:

Post a Comment