গল্পঃ হাসির মাজনঃ সঞ্জীবকুমার দে

ফিরে দেখা গল্প



হাসির মাজন

সঞ্জীবকুমার দে



“হেসে মাজুন, মেজে হাসুন, দাদা-দিদি ছুটে আসুন। নিয়ে যান হাসির মাজন।”
শীতের সকালে সূর্য তখনও ভালো করে উঠেছে কি ওঠেনি, ঠিক সেই সময় পাড়া কাঁপিয়ে সকলকে সচকিত করে তুলল কার এক সুরেলা কণ্ঠস্বর। এ-গলিতে, সে-গলিতে, এ-বাড়ির দরজায়, ও-বাড়ির দরজায় ঘুরে ঘুরে ফিরতে লাগল সেই আশ্চর্য ডাকাডাকি, “জলদি আসুন, দৌড়ে আসুন, ঘুম ভেঙে মুখ ধোওয়ার আগে নিয়ে যান হাসির মাজন। পরখ করুন আজব মাজন।”
অদম্য কৌতূহলে গায়ের কম্বল সরিয়ে বিছানায় উঠে বসতেই দরজা ঠেলে ঘরে এসে ঢুকল টুকটুকি। “ও কাকু, অদ্ভুত এক ফেরিওয়ালা এসেছে গো! হাসির মাজন নিয়ে এসেছে। দেখবে?”
“গেট খুলেছিস?”
“হ্যাঁ! খুলেই তো দেখলাম। তাই তোমাকে ডাকতে এলাম।”
“চল তো, দেখি।”
গায়ে কিছু জড়াবার তর সইল না। কোনওমতে চটিজোড়া পায়ে গলিয়ে গেটের বাইরে এসে দাঁড়ালাম। বছর কুড়ি-বাইশের এক সৌম্য যুবক। কাঁধে ঝোলানো একটা কাপড়ের সাইড ব্যাগ। দু’হাতে অনেকগুলো মাজনের টিউব। খুব বড়ো নয়, দৈর্ঘ্যে তা প্রায় ইঞ্চি চারেক। আমাদের গেট ছাড়িয়ে আরও কয়েকটা বাড়ি পার করে এগিয়ে গিয়েছিল সে। ডাকলাম, “কী বিক্রি করছ, ভাই?”
উৎসাহভরে এগিয়ে এল কাছে। “নিন না, স্যার! দাঁতের মাজন। চমৎকার মাজন। হাসির মাজন!”
“হাসির মাজন! তাজ্জব!” কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন আমার স্ত্রী, লক্ষ করিনি। হাতে টুথব্রাশ, চোখেমুখে জলের ছিটে। বুঝলাম, বাথরুমে ছিলেন। সেখান থেকে সটান এখানে।
হাতে টুথব্রাশ লক্ষ করে আরও টগবগে ছেলেটি, “নিন না, বৌদি! মেজে দেখুন। দারুণ মাজন!”
“দাম কত?” প্রশ্ন করলাম।
“মাত্র দশ টাকা টিউব! তিরিশ গ্রাম। একটাই ফাইল। সবেমাত্র বাজারে এসেছে। ফলাফল যাচাই করে কোম্পানি পরিমাণ বাড়াবে।”
“বেশ, দাও একটা।”
“তুমি তো সদাই হাসিখুশি, বৌমা! তোমার হাসির মাজনে দরকার কী?”
গলা শুনে দেখি আমাদের উলটোদিকের বাড়ির শেলীমাসিমা দাঁড়িয়ে দোতলার বারান্দায়। এসে দাঁড়িয়েছেন তিনিও - “দরকার তোমাদের মেসোমশাইয়ের। গোমড়ামুখো বুড়ো। জীবনে হাসে না!”
শেষের বাক্যে জোর দিলেন একটু ঝাঁঝ মিশিয়ে। তারপরই চেঁচালেন ছেলেটির উদ্দেশে, “আমাকেও একটা দিও। অ্যাই খোকা!”
এভাবেই একটা, দুটো, তিনটে করে ক্রমশই বাড়তে থাকল মাজনের বিক্রি। এ-বাড়ি, সে-বাড়ি থেকে ফরমায়েশ নেমে এল রাস্তায়। নানা প্রশ্ন, নানা জিজ্ঞাসা। আর ছেলেটির চটজলদি উত্তর। মুহূর্তে তাকে ঘিরে ঘন হল জটলা। ভালোই বিক্রি হতে লাগল তার হাসির মাজন।
আমরা ততক্ষণে ঢুকে পড়েছি বাড়িতে। আমার স্ত্রীর ব্রাশেই প্রথম পরখ হল আশ্চর্য মাজন। টুকটুকির দাঁত মাজা হয়ে গিয়েছিল আগেই। তবুও সে মাজতে শুরু করল আরও একবার। মাজবার পর সে কী হাসাহাসি! আমার স্ত্রী টুকটুকির দিকে চেয়ে হেসে উঠল - হি হি! টুকটুকি মুখে জল দেওয়ার আগেই হেসে উঠল - হো হো! তারপর দু’জনে একই সঙ্গে - হো হো আর হি হি। থামানোই মুশকিল হয়ে পড়ল আমার পক্ষে। এ কী রে বাবা! এমনও সম্ভব!
শেষে বিষম খেয়ে, হেঁচকি তুলে থামতে বাধ্য হল টুকটুকি। তার কাকিমা ব্রেক কষলেন কাশতে কাশতে।
এবার আমার পালা। সত্যি বলতে কী, ঘাবড়ে গেলাম একটু। সাহস যোগাল দু’জনেই।
মাজলাম। মুখও ধুলাম। হাসি পেল না বটে, তবে মনটা প্রসন্ন হয়ে উঠল। “মাজনটা তো মন্দ নয়!”
উক্তিটা শোনামাত্রই টুকটুকির কাকিমা প্রস্তাব পেশ করলেন, “তবে আরও একটা টিউব এনে রাখলে হয়! দোকানে কবে আসবে, বা আদৌ পাওয়া যাবে কি না - ঠিক তো নেই!”
আমার সম্মতি পাওয়ামাত্রই আবার একটা দশ টাকার নোট হাতে রাস্তায় দৌড়ল টুকটুকি।
ফিরে এল বেশ কিছুটা সময় পরে, খালি হাতে।
“কী ব্যাপার রে!”
“ও কাকু, মাজনওয়ালাকে নিয়ে খুব ঝামেলা হচ্ছে! খুব হই-হট্টগোল। আমি অনেক চেষ্টা করলাম, কাছেই যেতে পারলাম না মোটে!”
“ঝামেলা হচ্ছে! কোথায়!”
“আমাদের গলি ছেড়ে বেরিয়ে, বড়ো রাস্তায়। পার্কটার কাছে। অনেক লোক মিলে তাকে ঘিরে ধরেছে!”
“কই, চল তো দেখি।”
ছুটলাম, সঙ্গে টুকটুকি।
জটলা ঠেলে কাছে গিয়ে ব্যাপারটা বোঝা গেল। ততক্ষণে জটলার মধ্যে দুটি পক্ষ তৈরি হয়ে গেছে। একটি পক্ষ ছেলেটির সমর্থনে। অন্যপক্ষ বিরুদ্ধে। বিরুদ্ধ-পক্ষ একযোগে চেপে ধরেছে ছেলেটিকে - হাসির মাজন বলে আসলে নাকি সে ধাপ্পা দিচ্ছে মানুষকে। কয়েকদিন আগেই নাকি দূরে এক পাড়ায় মাজন বেচে এসেছে এই ছোকরা। এই মাজনে মেজে কারও নাকি হাসি পায় না। হাসির মাজন বলে আসলে কিছু হয় না।
“না হলে লোক এমনি কিনছে?” ছেলেটি অকুতোভয়। এর মধ্যেও একটি, দুটি করে মাজন বিক্রি করে যাচ্ছে সে কাউকে গ্রাহ্য না করে। আর তার মুখও চলছে সমানে।
তিরিক্ষি মেজাজের একজন রেগে গেল এবার - “এই ধাপ্পাবাজ! এই তো মেজেছি তোর মাজনে। কোথায় হেসেছি? হাসি পাচ্ছে?”
“পাবে কী করে? অত রেগে থাকলে কারও হাসি পায়?”
থতমত খেয়ে দমে গেল বক্তা।
কিন্তু অন্য একজন তেড়ে এল হাতা গুটিয়ে - “হেসে মাজুন, মেজে হাসুন, এসব কথার মানে কী?”
“ও তো মিথ্যে কিছু বলেনি!” মুখ খুললেন ছেলেটির সমর্থক-পক্ষের একজন - “মাজন মাজতে হয় দন্তবিস্তার করে। সেটা একধরনের হাসি। আর দাঁত মাজার পর দাঁত কতটা ঝকঝকে হল তা আয়নার সামনে দাঁত বের করে চাক্ষুষ করা, সেটাও একধরনের হাসি। ভুল নেই কোত্থাও।”
অনেকেই তারিফ করল কথাটার।
ফুঁসে উঠল বিরুদ্ধ-পক্ষ, “আপনারা আশকারা দিচ্ছেন।”
রুখে উঠল সমর্থক-পক্ষ, “পছন্দ না হলে কিনবেন না! আপনারা বাধা দেওয়ার কে?”
তর্কাতর্কি একসময় হাতাহাতির পর্যায়ে।
কাছেই পুলিশ-ফাঁড়ি। বচসা এমন অবস্থায় গিয়ে পৌঁছল যে সেখান থেকে ছুটে এলেন জনাকয়েক সিপাইসহ ভারপ্রাপ্ত অফিসার। দু’পক্ষই সালিশি চাইল তাঁর।
অফিসার বিচক্ষণ। সমস্ত ব্যাপারটা বুঝে নিলেন দু’মিনিটে। বুঝে নিয়েই সতর্ক করলেন মাজন বিক্রেতা ছেলেটিকে, “তুমি মাজন বিক্রি করছ, করো। তোমার মাজন ভালো না মন্দ, সে-প্রশ্নও আলাদা। কিন্তু তোমার হাসির মাজন কথাটিতে এদের আপত্তি। তুমি ব্র্যান্ড নেম বলে ফেরি করো! কিন্তু এই কথাটি তুমি ব্যবহার করবে না।”
ছেলেটি অবাক হল, “এ কী বলছেন আপনি! এই নাম রেজিস্ট্রি করা আছে। রেজিস্ট্রি নম্বরও রয়েছে। এই দেখুন, প্যাকেটের গায়ে সমস্ত তথ্য রয়েছে।”
অফিসার প্যাকেটটি হাতে নিলেন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়তে লাগলেন, “তা হোক। বিক্রি করতে গিয়ে কোনও মিথ্যে বলে তুমি মানুষ ঠকাতে পার না!”
“আমি মিথ্যে বলিনি, স্যার! আর কাউকে ঠকাইওনি। আমার মাজনের প্রপাইটরের নামটি দেখুন, মোড়কেই ছাপা আছে।”
ভ্রূ কুঁচকে পড়ার চেষ্টা করলেন ভদ্রলোক। উচ্চারণ করলেন, “শ্রীমতী হাসি চক্রবর্তী!”
“এবার বলুন! আমি মিথ্যে বলছি? হল কি না, হাসির মাজন?”
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ নচিকেতা মাহাত

5 comments:

  1. খুব হেসেছি। খুব খুব মজার!

    ReplyDelete
  2. যারা বেশি হাসে তাদের জন্য কিছু নেই?

    ReplyDelete
  3. দারুন লাগলো। আরও হাসতে চাই।

    ReplyDelete