আমার স্কুলঃ আমাদের স্কুলের সবুজায়নঃ ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়



ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়


আজ অরণ্যমেধ যজ্ঞের সামিল হয়ে মানুষ যখন পরিবেশ সচেতনতার বাণী আওড়ায় তখন মনে হয় বাইশে শ্রাবণের কথা। মরণশীল রবিঠাকুরের মৃত্যুদিন বাইশে শ্রাবণকে তার আশ্রমের বৃক্ষরোপণের দিন হিসেবে ধার্য করেছে বিশ্বভারতী। যেন তিনি ঐ উত্সবের মধ্যে দিয়ে নবজীবন লাভ করেন প্রতিবছর। ১৯৪২ সাল থেকে এমনটি হয়ে আসছে।
বৃষ্টির গন্ধে মন যখন কানায় কানায় ভরপুর হয়ে ওঠে তখন মনে পড়ে যায় স্কুলের বনমহোত্সবের কথা।
নামকরা মেয়েদের স্কুল। বরানগর রাজকুমারী মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুল। মফস্বলের স্কুল, কিন্তু পুরনো কলকাতার মেয়েদের স্কুলগুলোর মধ্যে অন্যতম। মেয়েদের স্কুলে এখানেই প্রথম চালু হয়েছিল বিজ্ঞান শাখা। আর ছিল কেতাদুরস্ত ল্যাবরেটরি। লাইব্রেরিতেও ছিল বিশাল ব‌ইয়ের সম্ভার। ছিল খেলার প্রকাণ্ড একটা মাঠ। একটা বিশাল চেরিগাছ, আর ছিল ডালিম, জামরুল আর আতাগাছ। বড়দির ঘরের পেছনে ছিল লিলিপুল। মাঠের একদিকে ছিল গ্রিন হাউস। অনামা সব ফুলেল ক্যাকটাস থাকত সেই গ্রিন হাউসে। স্কুলের দুটো গেট। একটা কেবল সকালে খুলত প্রাথমিক সেকশনের জন্য আর দুপুরে খুলত দুটোই। দুই গেটের মাথায় জুঁইফুল গাছের আর্চ আর গেট পেরিয়ে স্কুল অফিসে ঢোকার মুখে দু’পাশে গোলাপের কেয়ারি। কী সুন্দর পরিবেশ!
স্কুলের দুটো বিল্ডিং। একটা পুরনো, আর একটা নতুন। পুরনো বিল্ডিংয়ে সকালবেলায় প্রাইমারির ক্লাস হয় আর দুপুরে সেকেন্ডারির। নতুন বিল্ডিংয়ে হায়ার সেকেন্ডারির ক্লাস হয় আর সেই সঙ্গে ল্যাব, অফিস সব চলতে থাকে। দুই বিল্ডিংয়ের মাঝে বেশ কিছুটা জমি আছে স্কুলের। সেখানটা বন্ধ থাকত আমাদের সময়। ছোট্ট একটা গেটও আছে এ-বাড়ি থেকে ও-বাড়ি যাবার। টিফিনের সময় ফুচকা-আলুকাবলিওয়ালারা ঐ গেটের কাছটাতেই হেলান দিয়ে বিক্রি করে সব। কিন্তু সেই গেটটা সচারচর খোলা থাকে না। ছুটির দিনে বোধহয় মালি গিয়ে সেই জমির আগাছা সাফ করে আসে।
ঐ জায়গাটায় একটা ফ্যামিলি সেমেটরি। স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা বাঙালি খ্রিস্টান ছিলেন। রাজকুমারী দেবীর স্মৃতিরক্ষায় ঐ স্কুল। ওঁদের পরিবারের সকলের কবরখানা ঐটে। ওঁর ভাইবোনেদেরও কত ছোটো ছোটো সব ক্রস দেওয়া সিমেন্টের বেদী করা রয়েছে। ভালো করে দেখলে ওঁদের পুরো ফ্যামিলি ট্রিটা লক্ষ করা যায়। কত ধূপের কাঠি, ফুল আর মোমবাতির টুকরো পড়ে থাকত। কেউ বলত, ভূত আছে ওখানে। যাস না। আমরা পরোয়া করতাম না। আমরা প্রায়শই নির্ভয়ে টিফিন খেতাম সেখানে। আবার মাঝেমাঝে ধুপধাপ আওয়াজ হলেই ভয়ে ছমছম করে উঠত সেই একফালি পরিত্যক্ত পরিবেশটি। ওঁদের নাকি খুব গাছপলার শখ ছিল। আর তাই তো প্রতিবছর বর্ষার সময় আমাদের স্কুলে বনমহোত্সব বা বৃক্ষরোপণ হত ঘটা করে। গ্রীষ্মের ছুটির পরেই বৃক্ষরোপণ উত্সবের তোড়জোড় চলত রমরমিয়ে।
দস্তুর মতো রিহার্সাল চলত কমন রুমে। দিদিমণিদের পরিচালনায় বনমহোত্সবের একটা স্ক্রিপ্ট বছর বছর হয়ে আসত। একটু রদবদল করে কয়েকটা গান এদিক ওদিক করে নৃত্যনাট্য দাঁড় করানো হত প্রতিবার। রবিঠাকুরের বর্ষার গান দিয়ে নৃত্যনাট্য। এ যেন আমাদের স্কুলের সম্বচ্ছরি বর্ষামঙ্গল। সবুজ গাছ লাগানোর চেষ্টা।
খুব উত্সাহে মেয়েরা নাচ গান প্র্যাকটিস করত প্রতিবছর। অনুষ্ঠান শুরু হত রবীন্দ্রনাথের গান ‘আয় আমাদের অঙ্গনে, অতিথিবালক তরুদল’ দিয়ে আর শেষ হত ‘মরুবিজয়ের কেতন ওড়াও, এ শূন্যে ওড়াও ওড়াও হে প্রবল প্রাণ’ দিয়ে। প্রথম দৃশ্যে একদল মেয়ে নেচে নেচে মঞ্চে এসে প্রবেশ করে আর শেষ দৃশ্যে তারাই আবার প্রত্যেকে হাতে একটা করে সবুজ চারাগাছ নিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে এসে খোলা স্কুল মাঠের ধার দিয়ে নেচে নেচে চলে যেত। বাকি সকলে গান গাইতে থাকত। নাচের মেয়েদের মেঘ রংয়ের শাড়ি আর সবুজ উড়নি মাথায়। গানের মেয়েরা কচিকলাপাতা রঙের শাড়ি আর মেঘ নীল ব্লাউজে। আগে থেকে স্কুলের মালি যেখানে যেখানে নতুন গাছ পোঁতা হবে তার জন্য মাটি খুঁড়ে নির্দ্দিষ্ট ব্যবধানে গর্ত করে রাখে। নাচের মেয়েরা নাচ করতে করতে একে একে গাছগুলি সেইখানে রেখে দেয় আর গানের মেয়েরা জলঝারি দিয়ে জল দান করে সেই নতুন গাছের চারায়। এভাবেই হয়ে আসত বছরের পর বছর। প্রকৃতিকে দূষণমুক্ত করে সবুজায়নের ক্ষুদ্র, সম্মিলিত  প্রচেষ্টা।
যেসব ছাত্রীরা নাচ গান পারে না তাদের ওপর ভার পড়ত আবৃত্তির অথবা মিষ্টির দোকানে গিয়ে বাক্স অর্ডার দিয়ে নির্দিষ্ট দিনে সেগুলি স্কুলে নিয়ে আসা। প্রোগ্রামের পর আমাদের হাতে দেওয়া হত। কিছু মেয়ে মাটির হাঁড়িতে রঙ লাগিয়ে মঞ্চের সামনে রজনীগন্ধা সাজাত। আর যারা পরিচ্ছন্ন হাতের লেখার অধিকারী তারা চার্ট পেপারে পোস্টার বানাত। পরিবেশের সবুজায়ন নিয়ে দু-চার কথা লিখত।

আমার রবীন্দ্রনাথের গানের চর্চা স্কুল দিয়েই শুরু। ধরণীর গগনের মিলনের ছন্দে, এক আকাশের তলায় গীতবিতানের ছন্দে গন্ধে মুখর হয়ে উঠত তিনটে মাস। কিশোরী হৃদয়ে মেঘের ডমরু, আসন্ন শরতের জন্য উশখুশানি আর পড়াশুনোর ভার তো ছিল‌ই। এখনও বর্ষায় রবীন্দ্রনাথকে আমার মতো করে ফিরে পাই সেই বনমহোত্সবের গানে, কবিতায়। নিজের মনে আবৃত্তি করে উঠি, ত্রস্তপায়ে চুপিচুপি চলে যাওয়া রাইকিশোরীর বনে-উপবনে অভিসার যাত্রার সাক্ষী হয়ে। আমার ভাবনাগুলো বর্ষার হাওয়ায় এখনও মেতে ওঠে মুকুলিত গাছের মতো, কেঁপে ওঠে কচি কিশলয়গুলো, জলভেজা জুঁইয়ের গন্ধ, শ্রাবণের ধারার সঙ্গে চুঁইয়ে পড়ে মনের কার্নিশে।
শ্রাবণের ধারায় সিক্ত মাটিতে উদ্ভিদ তার সঞ্জীবনী শক্তি পায় ও ধীরে ধীরে মহীরুহে রূপান্তরিত হয়। তাই তার নবীন জীবন বরণের এই উত্সবে কবির গত জীবন স্মরণ-মননের এবং বৃক্ষের নবজীবন বরণের। শান্তিনিকেতনে বিগত এই এতগুলি বছর ধরে কত নামী মানুষের হাতে পোঁতা বৃক্ষের তালিকাসূচি পাওয়া যায়। শ্রাবণ যেন দিনের শেষে যেতে গিয়েও যেতে পারে না। বাইশেও তাকে নতুন করে ফিরে পাওয়া আমাদের। প্রকৃতিপ্রেমিক রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন। তাঁর ছিন্নপত্রে তার উল্লেখ পাই আমরা।
আর তাঁকে স্মরণ করে তাঁর প্রয়াণের দিন বাইশে শ্রাবণ শান্তিনিকেতনে পালিত হয় বনমহোৎসব।
_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a Comment