ধারাবাহিকঃ সপ্তকথাঃ মল্লভূমের সাতকাহনঃ সুমন দাস

সপ্তকথা



দ্বিতীয় পর্ব


সুপ্রিয় বন্ধুরা, কেমন আছ তোমরা? কাশফুলের সমারোহের থেকেও বেশি চোখে পড়ে ‘অমল ধবল পাল’। যখন ছোটো ছিলুম, তখন সুনীল সাগরে সেই পালের তরণী বাওয়া দেখতুম ঘন্টার পর ঘন্টা। পুজোর ছুটি ছিল, আর ছিল বাড়ির ঠিক পিছনে মস্ত বড়ো মাঠ। সেই মাঠের একধারে নারকেলগাছের ছায়ায় শুয়ে শুয়ে এই আকাশে মেঘের পাল দেখতাম, সেই মেঘের ফাঁকে ফাঁকে সূর্যালোকের আনাগোনা, আর রংবেরঙের ঘুড়ির লড়াই, আর মাঠে গরুর পালের ডাক, ছাগলের মিহিতান, ছেলেদের হইহই, আর ঘাসের বনের সড়সড় আওয়াজে মনে হত আমি যেন ২০০০ সালে নেই। আমার মন চলে যেত অনেক দূরদেশে, দূর-কালে। মন ছুটে যেত রাজারাজড়াদের কালে। তখন ইতিহাস বইতে পড়তুম, বাংলার রাজা শশাঙ্কদেবের কথা, গোপাল-ধর্মপালদের কথা, আর মনে হত বাংলা সুবর্ণযুগে মালদা তথা প্রাচীন মল্লভূমের কথা।
তো সেই মল্লভূমা, মানে কিনা বিষ্ণুপুরে যাওয়াই হল এই কিছুদিন আগে, বুড়ো বয়সে। ভাবো একবার! ছোট্টবেলার সেই রোমাঞ্চকর অনুভব এখন তো আর পাই নে তেমন, কিন্তু বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটা করতে লেগেছিল সেই মন্দিরগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে। মনে হয়েছিল, এই তো সেই আমার বহুকালের ছেড়ে আসা স্থান, বহুযুগের ওপার হতে যেন মনে হল, এই তো আমি এই - অয়ম অহম্‌ ভোঃ!
তোমার কি গিয়েছ বিষ্ণুপুরে? দেখেছ সেই স্থাপত্য, ভাস্কর্য? প্রাচীন মায়াময় শহর এখনও দাঁড়িয়ে আছে, দেখেছ কি? যদি না দেখে থাক তাহলে শিগগিরি ঘুরে এস। অনেক স্থানের অবস্থা ভালো নয়। তাড়াতাড়ি সব নষ্ট হয়ে যাওয়ার আগে একবার চাক্ষুষ করে এস আমাদের প্রাচীন পূর্বজরা কীসব অপরূপ সৃষ্টি করে গিয়েছিল সেই সময়। তার আগে তোমাদের বিষ্ণুপুরের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসটা একবার বলি।
আমরা ওখানে যেতেই একটা লোকাল গাইড বুক হাতে পাই। তাতে সংক্ষিপ্তাকারে বিষ্ণুপুরের যা ইতিহাস বর্ণনা করা আছে, তা হল এই -
বাঁকুড়া জেলার মহকুমা শহর বিষ্ণুপুর আদিতে ‘বন বিষ্ণুপুর’ নামে খ্যাত ছিল। এই বন-বিষ্ণুপুর ছিল প্রাচীন মল্লভূম রাজ্যের রাজধানী। রাজ্যটি আজকের বাঁকুড়া, বর্ধমান, মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদের কিছু অংশ এবং বিহারের ছোটনাগপুর অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর প্রথমভাগ পর্যন্ত যারা রাজত্ব করে গেছেন তাঁরা ‘মল্লরাজ’ নামে খ্যাত। মল্ল কথাটির অর্থ বাহুযুদ্ধে নিপুণ এমন ব্যক্তি।
কিংবদন্তী এই যে, খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের শেষের দিকে বৃন্দাবনের নিকটবর্তী জয়নগর রাজ্যের রাজ্যচ্যুত রাজা সস্ত্রীক তীর্থদর্শনের উদ্দেশ্যে পুরীধামের দিকে যাত্রা করেন। পথে কোতুলপুরের কাছাকাছি লাউগ্রামে রাজার সন্তানসম্ভবা স্ত্রী একটি পুত্রসন্তান প্রসব করেন। এই অবস্থায় রাজা তাঁর স্ত্রী ও সদ্যোজাত শিশুকে মনোহর পঞ্চানন নামে এক ব্রাহ্মণের কাছে গচ্ছিত রেখে একাই তীর্থের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এই শিশুপুত্রটি গরিব ব্রাহ্মণের বাড়িতে বড়ো হতে থাকে। একদিন ব্রাহ্মণ এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখেন। গরু চরাতে চরাতে ছেলেটি ক্লান্ত হয়ে মাঠের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে এবং তার মাথার কাছে এক বিরাট সাপ ফণা বিস্তার করে রোদকে আড়াল করে আছে। পঞ্চানন এই দৃশ্যটি দেখে বুঝতে পারলেন যে এই ছেলেটির মধ্যে রাজলক্ষ্মণ রয়েছে। এরপর থেকে তিনি তার গরু চরানো বন্ধ করে অস্ত্রশিক্ষা ও শাস্ত্রচর্চার ব্যবস্থা করলেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই বালক এক দক্ষ মল্লবীর হয়ে উঠল। স্থানীয় রাজা তাকে ‘মল্ল’ উপাধিতে ভূষিত করলেন। একদিন ঐ রাজার অনুরোধে তিনি রাজসিংহাসনে বসলেন। ঐ বালক পুরুষ এরপর ‘আদিমল্ল’ বা ‘রঘুনাথ’ নামে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। আদিমল্লের রাজধানী ছিল প্রদ্যুম্নপুর, যা অধুনা জয়পুরের কাছাকাছি।
মল্লরাজ জগৎমল্ল বিষ্ণুপুরে তার রাজধানীটি স্থানান্তরিত করেন। রাজ্য পরিচালনার সুবিধার জন্য বা মৃন্ময়ী মাতার আকাশবাণী পেয়ে মৃন্ময়ী মন্দির ও রাজদরবার প্রতিষ্ঠা করেন। জগৎমল্লের পর তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেনি রাজপরিবারের মধ্যে।
মল্লরাজ বীরহাম্বিরের রাজত্বকালে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। যুবরাজ বীরহাম্বির পাঠান সর্দার দায়ুদ খাঁকে যুদ্ধে পরাস্ত করেন। মহারাজা বীরহাম্বির পাঠানদের মেরুদণ্ড ভাঙতে মোঘলদের যথেষ্ট সহায়তা করেন। বীরহাম্বির শ্রীনিবাস আচার্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষিত হন। এরপর থেকে বিষ্ণুপুরে শুরু হয় এক নতুন ইতিহাস। মল্লরাজারা বিষ্ণুপুরে গড়ে তোলেন একের পর এক সৌধ। বীরহাম্বিরের পর একেকজন রাজা এক বা একাধিক মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এরপরই খনন করা হয় সাতটি বাঁধ। বাঁধগুলি হল, কৃষ্ণবাঁধ, শ্যামবাঁধ, লালবাঁধ, পোকাবাঁধ, গাঁতাতবাঁধ, কালিন্দীবাঁধ ও যমুনাবাঁধ।
দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহের আমলে দিল্লীর সেনী ঘরানার সিদ্ধ পুরুষ বাহাদুর খাঁর আগমনের ফলেই পরবর্তীকালে ভারতবিখ্যাত ‘বিষ্ণুপুর ঘরানা’র জন্ম হয়েছিল।
দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহের সহোদর গোপাল সিংহের আমলে এ-রাজ্যে প্রজাদের হরিনাম করা বাধ্যতামূলক ছিল। তাঁর সময়ে মারাঠারা বাংলা লুঠ করার সময় বিষ্ণুপুর আক্রমণ করেন। লোকশ্রুতি, এ সময়েই মদনমোহন ঠাকুর দলমাদল কামান দেগেছিলেন মারাঠাদের লক্ষ্য করে। গোপাল সিংহের পুত্র চৈতন্য সিংহ মল্লভূমের উল্লেখযোগ্য রাজা ছিলেন।
এবারে দেখা যাক ঘুরতে গিয়ে কী কী স্থান তোমরা অবশ্যই দেখবে। এমন সাতটি জায়গার কথা আলোচনা করা যাক।

রাসমঞ্চ

মন্দিরটি দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ২৪.৫ মিটার এবং উচ্চতা ১২.৫ মিটার

রাসমঞ্চ ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার অন্তঃপাতী বিষ্ণুপুর শহরের একটি পুরাতাত্ত্বিক স্থাপনা। মল্লরাজা বীরহাম্বির আনুমানিক ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে এই মঞ্চটি নির্মাণ করেন। বৈষ্ণব রাস উৎসবের সময় বিষ্ণুপুর শহরের যাবতীয় রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ এখানে জনসাধারণের দর্শনের জন্য আনা হত। ১৬০০ থেকে ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এখানে রাস উৎসব আয়োজিত হয়েছে। বর্তমানে অবশ্য এখানে আর উৎসব হয় না।
রাসমঞ্চ একটি অভিনব স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। মঞ্চের বেদিটি মাকড়া বা ল্যাটেরাইট পাথরে নির্মিত। বেদিটির উচ্চতা ১.৬ মিটার ও দৈর্ঘ্য ২৪.৬ মিটার। মঞ্চটির মোট উচ্চতা ১০.৭ মিটার। উপরের অংশ ইষ্টকনির্মিত। চূড়ার কাছে একটি স্বল্প পরিসর ছাদে গিয়ে উপরের অংশটি মিলিত হয়েছে।
রাসমঞ্চের চূড়া পিরামিডাকৃতির। চূড়ার মূলে চারটি করে দোচালা ও প্রতি কোণে একটি করে চারচালা রয়েছে।
গর্ভগৃহটি দেওয়াল দ্বারা আবৃত নয়। বরং রাসমঞ্চের গর্ভগৃহটিকে ঘিরে রয়েছে তিন প্রস্থ খিলানযুক্ত দেওয়াল। বাইরের সারিতে খিলানের সংখ্যা ৪০। এই খিলানগুলির গায়ে পোড়ামাটির পদ্ম ও পূর্ব দেওয়ালে বিষ্ণুপুরের গায়ক-বাদকদের স্মৃতি-অলঙ্কৃত কয়েকটি টেরাকোটার প্যানেল রয়েছে। রাসমঞ্চটি বিষ্ণুপুরের প্রচলিত স্থাপত্যরীতি অনুসরণে নির্মিত হয়নি।

শ্যামরায় মন্দির


মন্দিরটি দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ১১.৪ মিটার এবং উচ্চতা ১০.৭ মিটার

টেরাকোটার কাজে সমৃদ্ধ এই পঞ্চরত্ন মন্দিরটি ১৬৪৩ সালে মল্লরাজ রঘুনাথ সিংহ প্রতিষ্ঠা করেন। এই মন্দিরের দক্ষিণদিকের দেওয়ালে নিবদ্ধ প্রাচীন উৎসর্গ লিপি থেকে এই তথ্য জানতে পারা যায়। এই লিপিটি নিম্নরূপঃ
শ্রীরাধিকা কৃষ্ণমুদে শকেঙ্ক 
বেদাঙ্ক যুক্তে নবরত্নরতং
শ্রীবীর হাম্বীর নরেশ সূনূর্দদৌ
নৃপ শ্রীরঘুনাথ সিংহঃ।।
মল্ল সকে ৯৪৯।
এই লিপি থেকে জানা যায়, রাধা ও কৃষ্ণের আনন্দের জন্য রাজা বীরহাম্বিরের পুত্র রাজা রঘুনাথ সিংহ ৯৪৯ মল্লাব্দে বা ১৬৪৩ খৃষ্টাব্দে এই নবরত্ন মন্দিরটি দান করেন।
শ্যামরায় মন্দির বিষ্ণুপুরের প্রসিদ্ধ টেরাকোটা শৈলীতে নির্মিত একটি মন্দির। মন্দিরটি চৌকো, দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে ১১.৪ মিটার। মন্দিরের চারদিকের খিলানগুলি সুন্দর কারুকার্যময় স্তম্ভের ওপর নির্ভর করে নির্মিত হয়ে ফাঁকা দালানের মতো অংশের সৃষ্টি করেছে। এই দালানের ভেতরে মন্দিরের গর্ভগৃহটি অবস্থিত। গর্ভগৃহের দরজা টেরাকোটা শৈলীতে ফুল ও বিভিন্ন প্রকার নকশা দ্বারা সাজানো। মন্দিরের ছাদ চৌকো ও উত্তলাকার। ছাদের চার প্রান্তে চারটি শিখর বা শীর্ষ বর্তমান। উড়িষ্যার স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত এই শিখরগুলি প্রত্যেকটি প্রতিসম। ছাদের ঠিক মাঝে একটি অষ্টভুজাকৃতি শিখর বা গম্বুজ বর্তমান। এই অংশে মন্দিরের উচ্চতা ১০.৭ মিটার। মন্দিরের বাইরের ও ভেতরের দেওয়ালে রাসলীলা, রামায়ণমহাভারতের কাহিনি এবং বিভিন্ন কারুকার্যের দৃশ্য আছে।
গুমঘরের পশ্চিমদিকের সরু রাস্তা দিয়ে এগোলে এটি দেখতে পাওয়া যাবে।

দলমাদল কামান


দলমর্দ্দন থেকে অপভ্রংশ হয়ে দলমাদল। দল শব্দের অর্থ শত্রু, মর্দ্দন শব্দের অর্থ দমন। কথিত আছে, ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দে নগর দেবতা এই কামান থেকে গোলাবর্ষণ করে ভাস্কর রাও-এর নেতৃত্বে আক্রমণকারী বর্গী বাহিনীকে বিতাড়িত করেছিলেন। সেই থেকে এই কামানটির নাম দলমর্দ্দন। বিষ্ণুপুর মল্লরাজাদের অসংখ্য কামান ছিল। গুটি কয়েক ছাড়া প্রায় সব কামানই ব্রিটিশ সরকার অন্যত্র সরিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে বৃটিশ সরকার ট্যুরিস্ট আকর্ষণের জন্য কামানটিকে বেদির উপর স্থাপন করেন। ৬৩টি লোহার আংটা পেটাই করে এটি তৈরি করা হয়। এর দৈর্ঘ্য ৩.৮ মিটার, ব্যাস প্রায় ৩০ সেমি। এর ওজন প্রায় তিন শত মন বা ১১২ কুইন্ট্যাল।
ট্যুরিস্ট লজের পাশ দিয়ে ছিন্নমস্তা যাওয়ার পথে ডানদিকে পড়বে।

জোড়বাংলা মন্দির


এ মন্দিরটি দৈর্ঘ্যে ১১.৮ মিটার, প্রস্থ ১১.৭ মিটার ও উচ্চতা ১০.৭ মিটার

জোড়বাংলা রীতির মন্দির স্থাপত্য এপার বাংলা ও ওপার বাংলায় বেশ কিছু থাকলেও বিষ্ণুপুরের জোড়বাংলা আপন স্থাপত্যরীতির বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। জোড়বাংলা মন্দিরে যে ‘বাংলার ঘরের চাল’-এর আদল তা সমগ্র বঙ্গে প্রচলিত। জোড়বাংলা মন্দিরে প্রাপ্ত লিপি অনুসারেই মন্দিরটি ৯৬১ মল্লাব্দে (১৬৫৫ খ্রিস্টাব্দ) মল্লরাজ রঘুনাথ সিংহ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দু’খানি দু’চালা বাংলার কুটির ঘর পাশাপাশি জুড়ে দিলে যা হয় তাই জোড়বাংলা। বাংলার মন্দির নির্মাণের অপূর্ব নিদর্শন এই জোড়বাংলা। মাটি, ইট দিয়ে এর দেওয়াল তৈরি হয়েছে। ভিতরে ও বাইরে মাটির দেওয়ালের উপর ভাস্কর্য খচিত চিত্র দিয়ে সুসজ্জিত। জোড়বাংলা মন্দিরের গঠনশৈলী বর্ণনা করে Archaeological survey of India রায় দিয়েছে যে এই মন্দিরটি ‘কেষ্টরায়’ মন্দির নামেও পরিচিত। দক্ষিণমুখী মন্দিরটি বর্গাকার ভিতের উপর গড়ে উঠেছে। দুটি ‘দোচালা’ যুক্ত হয়ে চারচালা শিখরের রূপ নিয়েছে। জোড়বাংলা মন্দিরটি বহিঃ ও অভ্যন্তর দেওয়ালে সূক্ষ্ম এবং অলঙ্কৃত টেরাকোটার কাজ লক্ষ করা যায়। এই মন্দিরটির ভেতরের দৈর্ঘ ১১.৮ মিটার, প্রস্থ ১১.৭ মিটার এবং গঠনগত উচ্চতা ১০.৭ মিটার। এই মন্দিরটির সম্মুখদ্বারের চারপাশের তিনটি দেওয়াল চমৎকার টেরাকোটার কাজ দ্বারা সুসজ্জিত। শুধুমাত্র ছয় হাতযুক্ত শ্রীচৈত্যনের প্লাস্টার করা চিত্র এই মন্দিরের ভিতরে পাওয়া যায়, যদিও তিনি পূজ্য নন। বিষ্ণুপুরের জোড়বাংলা মন্দিরের পশ্চিম দেওয়ালে ভীষ্মের শরশয্যা ও বাণ ক্ষেপণরত অর্জুনের অতি উৎকৃষ্ট একটি ভাস্কর্য নিবন্ধ আছে। অর্জুনের লক্ষ্যভেদ প্রভৃতি চির পরিচিত মেটিফগুলির প্রচুর ব্যবহার হয়েছে। জোড়বাংলা মন্দিরে যুদ্ধক্ষেত্রের যে অগণিত ভাস্কর্য সন্নিবিষ্ট হয়েছে সেগুলি সম্ভবত মল্লরাজাদের শৌর্যের পরিচায়ক নয়। কেননা প্রায় সর্বত্র চতুরঙ্গ বাহিনীর যে খণ্ডচিত্রগুলি উৎকীর্ণ হয়েছে তার আকার প্রকার দেখে মনে হয়, সেগুলি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের খণ্ড-বিচ্ছিন্ন চিত্রকল্প। প্রসঙ্গত, বিষ্ণুপুরের জোড়বাংলা মন্দিরে ও অন্য বহুক্ষেত্রে যে চিত্রণ দেখা যায় সেগুলি মল্ল-ক্ষাত্র বিদ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত কি না সন্দেহ। মল্লরাজগণ নৌবলে বলীয়ান ছিলেন এমন কোনও প্রমাণ নেই। এগুলি সম্ভবত অতীত কালের বাঙালির নৌযুদ্ধে নিপুণতার পরিচায়ক। মল্লরাজা যে নিপুণ যোদ্ধা ছিলেন এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। জোড়বাংলা মন্দিরে সেজন্য যথেষ্ট সংখ্যায় শিকারের চিত্রও সন্নিবিষ্ট হয়েছে। শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্দে বর্ণিত কৃষ্ণলীলা এখানে মন্দির টেরাকোটার মূল উপজীব্য। জোড়বাংলা মন্দিরে শ্রীকৃষ্ণের গোষ্ঠলীলা অসুর বধ থেকে মথুরা যাত্রা, কংস বধ চিত্রিত হয়েছে। জোড়বাংলা মন্দিরের দক্ষিণদিকে কৃষ্ণলীলা আর তারই সমান্তরালে পশ্চিমের দেওয়ালে রামকথা। রাম জন্ম থেকে আরম্ভ করে তারকা বধ এবং রামের বিবাহ। এই মন্দিরে বাৎসল্য রসের অভিব্যক্তি লক্ষ করা যায়। একইভাবে রামকথা আর কৃষ্ণকথা ব্যক্ত হয়েছে একই রস পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত করে। বাৎসল্য রসের অভিব্যক্তি পরিস্ফুট করার জন্যে মাতৃক্রোড়ে রাম-লক্ষণ-ভরত-শত্রুঘ্নকে যেমন (পশ্চিম দেওয়ালে) চিত্রিত করা হয়েছে, দক্ষিণের (অগ্রবর্তী দোচালায়) প্রবেশপথের ডানদিকে মাতৃক্রোড়ে কৃষ্ণ-বলরামও উৎকীর্ণ হয়েছেন। এমনকি পশ্চিমের দেওয়ালে ভয়ংকর দেবীযুদ্ধের নিচে গণেশ-জননী, স্কন্দমাতার বাৎসল্য রসাত্মক চিত্রগুলি সন্নিবেশিত হয়েছে। অষ্টমাতৃকা মূর্তিও চিত্রিত হয়েছে। এখানে সমসাময়িক ঘটনা রূপে পর্তুগীজ যুদ্ধ যেমন চিত্রিত হয়েছে, মোঘল সামন্তদের আভিজাত্য ও বিলাসব্যসনও তেমনি চিত্রিত হয়েছে।


মদনমোহন মন্দির


মন্দিরটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ১২.২ মিটার ও উচ্চতা ১০.৭ মিটার

মল্লরাজা দুর্জন সিংহ এই একরত্ন ইষ্টক নির্মিত মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন ১৬৯৪ সালে। এই মন্দিরটির ছাদ চৌকো ও বাঁকানো, কিনারা বাঁকযুক্ত ও মধ্যে গম্বুজাকৃতি শীর্ষ বর্তমান। মন্দিরের দেওয়ালে কৃষ্ণলীলা, দশাবতার ও অন্যান্য পৌরাণিক কাহিনীর বিভিন্ন দৃশ্য ভাস্কর্যের মাধ্যমে রূপায়িত।
এখানে নিচের দিকে পশুপাখি ও উপরের দিকে আছে যুদ্ধদৃশ্য। এ-মন্দিরের ভিতরের দিকে ড্রাগনসদৃশ পৌরাণিক ভাস্কর্যও দেখা যায়। মদনমোহন ঠাকুরের নিত্যসেবা, রাস, দোল ও নামযজ্ঞ এখনও হয়ে চলেছে।
রাসমঞ্চ থেকে উত্তরদিকের রাস্তা ধরে সোজা পোকাবাঁধ রাস্তা ক্রস করে শাঁখারী বাজারের ভিতর দিয়ে প্রায় দেড় কিলোমিটার রাস্তা গেলে এই মন্দিরটি চোখে পড়বে।

রাধাশ্যাম মন্দির


এ মন্দিরটি দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ১২.৫ মিটার এবং উচ্চতা ১০.৭ মিটার

মল্লরাজ চৈতন্য সিংহ মাকড়া পাথরের এই মন্দিরটি ১৭৫৮ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের শিখরটি গম্বুজাকৃতি এবং বিষ্ণুপুরের অন্য একরত্ন মন্দিরের তুলনায় একটু ভিন্ন প্রকৃতির। এখানে ফুলকারি ও জ্যামিতিক ভাস্কর্য, মহাভারত ও পুরাণ কাহিনীর স্থাপত্য লক্ষণীয়। এই মন্দিরে রাধাশ্যাম, নিতাই-গৌর ও জগন্নাথ ঠাকুরের মূর্তি পূজিত হয়। মন্দিরের প্রবেশদ্বারে সুন্দর ইটের নহবতখানা আছে। একসময় এখানে সানাই ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো হত। মন্দিরের পূর্বদিকে সুন্দর তুলসী মঞ্চ (ওড়িষ্যার স্থাপত্য) (নীচের ছবিতে) ও রান্নাঘর এবং দক্ষিণদিকের সামনে নাটমঞ্চ। পঙ্খের কাজের জন্য মন্দিরটি অতুলনীয়।

মৃন্ময়ী মন্দিরের পূর্বদিকে রাস্তার ধারেই মন্দিরটি অবস্থিত।

গুমগড়


এই স্থাপত্যটি তৈরি করেছিলেন মল্লরাজ বীরসিংহ সপ্তদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে। অনেকের মতে এখানে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া হত। আবার কেউ কেউ বলেন, এটি মল্লরাজাদের শস্যাগার ছিল। ঐতিহাসিক মতে, এটি ছিল রাজবাড়ির জলের ট্যাঙ্ক। কারণ, এর কাছাকাছি কিছু জলের পোড়ামটির পাইপও পাওয়া যায়। তবে এই মতটির প্রাধান্যই বেশি।
মিউজিয়ামের পাশ দিয়ে উত্তরদিকে গেলে প্রথম যে চৌমাথা মোড় পড়ে, তার কাছেই এই স্থাপত্য।

তো এই হল মোটামুটি সাতটি দর্শনীয় স্থান। আরও আছে, অনেক আছে। মৃন্ময়ী মন্দির, বড়ো ও ছোটো পাথর দরজা, পাথরের রথ, লালবাঁধ, সর্বমঙ্গলা, ছিন্নমস্তা মন্দির, আচার্য যোগেশচন্দ্র পুরাকৃতি ভবন। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, পোড়া মাটির মূর্তি বানায় যে গ্রামটা, সেই গ্রামে তো অবশ্যই যেও। নিজের চোখে দেখে এস কীভাবে বানানো হয় এই মুর্তি। কিনো দশাবতার তাস, টেরাকোটা শিল্পের কাজ, লন্ঠন শিল্প আর শঙ্খ শিল্পও খুব নামকরা। লালবাঁধে কণিষ্কের একটা বালুচরী তাঁতের কারখানা আছে। পারলে সেখানে ঘুরে এস। দেখো একেকজন মানুষ কীভাবে কী অসীম ধৈর্য্য নিয়ে হস্তচালিত তাঁতে বুনে চলেছে একেকটা শাড়ি। এছাড়া চৈত্র সংক্রান্তিতে শিবের গাজন মেলা, রথ উৎসব, শ্রাবণ সংক্রান্তিতে ঝাঁপান উৎসব, রাস উৎসব আর ৭ - ১১ই পৌষ বিষ্ণুপুর মেলা হয়। সেই সময়ে গিয়ে পৌঁছাতে পারলে তো সোনায় সোহাগা।

_____

ছবিঃ লেখক

No comments:

Post a Comment