না-মানুষের পাঁচালিঃ আদুর বাদুড় কথাঃ অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়





নিপা ভাইরাসের সংক্রমণের পিছনে যে বাদুড় নামক এক নিরীহ প্রাণীর হাত আছে, সে খবর খবরের কাগজ, টেলিভিশন আর সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে কারও আর জানতে বাকি নেই। আসলে বাদুড় নামক প্রাণীটি না পাখি, না পশু - দুইয়ের মাঝামাঝি। স্তন্যপায়ী প্রাণী বাদুড়ের মুখ অনেকটা যেন দাঁত খিঁচানো শিয়াল। তাই এদের ‘উড়ন্ত শিয়াল’ও বলা হয়। জোড়া লাগানো ডানায় ভর করে সাঁ করে এরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় উড়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। যেকোনও পাখির চাইতে বেশি দ্রুতবেগে উড়ে বেড়ানোর ক্ষমতার কারণ এদের এই জোড়া লাগানো ডানা, খুলে গেলে যা অনেকটা দেখতে লাগে ছাতার মতো। এদের আরও একটি বৈশিষ্ট্য হল, এরা উলটো হয়ে ঝুলে থেকে খাওয়া বা ঘুমোনোর মতো নিত্যকর্ম করে থাকে।

সাধারণত বাদুড়দের বাসস্থান হয় গুহায়, খুব উঁচু গাছের মগডালে, ভাঙা পোড়ো বাড়ির দেওয়ালে বা গভীর কুয়োয়। সচরাচর মানুষের সংস্পর্শে আসতে তারা নারাজ। তাই বুঝি মানুষ রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ার হিসাবে বাদুড়কেই কল্পনা করেছে। আবার ব্যাটম্যান চরিত্র, সিনেমা, টিভি বা কম্পিউটার গেমের জগতে দশকের পর দশক মানুষের মনোরঞ্জন করে চলেছে।
বাদুড় কি সত্যিই অতটা ভীতিকারক? আচ্ছা, এমনভাবে যদি ভাবা যায়, মানুষের চাইতে ভয়াল প্রাণী এই পৃথিবী গ্রহে একটাও নেই, তাহলে কি ভুল বলা হয়ে যাবে?
ভয় হোক বা ভালোবাসা, জানলে অবাক হতে হয়, পৃথিবীর অনেক জায়গায়, এমনকি আমাদের দেশেও বাদুড়কে কোথাও কোথাও পুজো করা হয়ে থাকে। অসমের নওগাঁ জেলায় বামুনি পাহাড়ে বাদুড়দের পুজো করা হয় দেবতা-জ্ঞানে। এখানকার পাহাড়ের গুহায় বাস করা বাদুড়েরা ফল আর পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে। স্থানীয় লোকেরা মনে করে, বাদুড় তাদের জ্বালানী কাঠ আর গুহাপথে বয়ে আসা মিষ্টি জলের জোগান দেয়। লোককথায় বলা হয়, এক গ্রামের মানুষ নাকি যথেচ্ছ প্রাকৃতিক সম্পদ বিনষ্ট করায় দেবতা সবাইকে অভিশাপ দিয়ে বাদুড় বানিয়ে দেন।
ভগবানের ভয় দেখিয়ে এই গল্প ফেঁদে হয়তো প্রাকৃতিক সম্পদের ভারসাম্য বজায় রাখার উপদেশ দেওয়া ছিল আসল উদ্দেশ্য। বামুনি পাহাড়ের যে গুহায় বাদুড়েরা বাস করে, স্থানীয় ভাষায় তাকে বলা হয় – ‘বাদুলি কুরুং’। এখানে বৎসরান্তে বাদুলিথানের মেলা বসে। বাদুড় উপাসকেরা বলে, দেবতা মানুষের উপকারার্থে বাদুড়দের পাঠিয়েছিল। বাদুলিথানের মেলায় আসা মানুষকে খালি পায়ে বাদুড়ের গুহায় ঢুকতে হয়। সেই সময়ে শব্দ করে বা আলো জ্বালিয়ে বাদুড়দের বিরক্ত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিশ্বাসীদের দৃঢ় বিশ্বাস, বাদুড়ের কোনও উপকারে আসে না মানুষ, কিন্তু মানুষের উপকারে আসে বাদুড়।
বিহারের বৈশালী জেলার কল্যাণপুর গ্রামেও বাদুড়কে দেবতা-জ্ঞানে পুজো করা হয়। দীর্ঘায়ু কামনা করে বাদুড়ের কাছে প্রার্থনা করে গ্রামের মানুষ। বাদুড়দের যাতে কেউ কোনও ক্ষতি করতে না পারে, স্থানীয় লোকেরা সেই বিষয়ে সদা জাগ্রত।
তামিলনাড়ুর তুতিকোরিন আর মাদুরাইতেও একইভাবে বাদুড়দের ভক্তি করে স্থানীয় মানুষ। মাদুরাইয়ের কাছে পুলিয়াঙ্গুলাম গ্রামে একটা বিশাল বটগাছে প্রায় পাঁচশো বাদুড় বাস করে। এখানকার অধিবাসীদের বিশ্বাস, দেবতা মুনিয়ান্দি এই গাছেই বাস করেন এবং বাদুড়দের রক্ষা করেন। তারা আরও মনে করে, বাদুড়দের রক্ষা করতে না পারলে দেবতা মুনিয়ান্দি অসন্তুষ্ট হয়ে অভিশাপ দেন। ফলে কারও ব্যাবসা লাটে ওঠে কিম্বা কেউ মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হয় বা কারও মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে। আশ্চর্যের বিষয়, কোনও বাদুড় মারা গিয়ে গাছ থেকে নিচে পড়ে গেলে কিন্তু স্থানীয় মানুষ পরমানন্দে তার মাংস রেঁধে খায়।
প্রাণী বিজ্ঞানীদের দাবি, ফল খাওয়া বাদুড়ের শরীরে নিপা ভাইরাস দিব্যি বেঁচে থাকে, কিন্তু তাদের কোনও ক্ষতি করতে পারে না। অথচ যেই বাদুড়ের লালা কোনও কারণে যদি মানুষ বা শুয়োরের শরীরে ঢুকে পড়ে, অমনি নিপা ভাইরাস সক্রিয় হয়ে সেই শরীরে মারাত্মক ক্ষতি করে দেয়। যদিও নিপা ভাইরাসের সাথে বাদুড়ের লালার সংযোগ নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও একমত নন। পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে। বিশেষজ্ঞদের মত, পাহাড়-জঙ্গল কেটে শহর বানানোর কারণেই বাদুড়েরা পাহাড়ের গুহা আর উঁচু গাছের অভাবে অনেক নিচে লোকালয়ে নেমে আসায় মানব দেহে নিপা ভাইরাসের সংক্রমণের সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে গেছে।
সম্প্রতি কেরলের কোঝিকোডে নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত বহু মানুষের মৃত্যু হয়ে মহামারী সৃষ্টি হওয়ার পর বিজ্ঞানীরা বাদুড়ের সন্ধানে নেমে পড়েন। কিন্তু বিরাট বিরাট কুয়োয় যে বাদুড়দের ধরা হয়, দেখা গেল, তারা পতঙ্গভুক। আর পতঙ্গভুক বাদুড়দের শরীরে নিপা ভাইরাস পাওয়া যায় না বলেই ধারণা প্রাণী বিজ্ঞানীদের। তাই আবার সেখানে ফল খাওয়া বাদুড় খুঁজতে নেমে পড়েছেন অনুসন্ধানরত বিজ্ঞানীরা।
নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ এর আগে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই বিষয়ে উপলব্ধ তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, সবধরনের বাদুড়ের শরীরে ভাইরাসেরা বহাল তবিয়তে বাস করতে পারে, যাদের মধ্যে কিছু ভাইরাস মারণাত্মক। চিনে সার্‌স (SARS - Severe Acute Respiratory Syndrome) সংক্রমণের পর গুহাবাসী পতঙ্গভুক বাদুড়ের শরীরে থেকে রোগ ছড়ানো ভাইরাসের প্রতিষেধক পর্যন্ত বার করা গেছে। ইবোলা ভাইরাসের প্রতিষেধক পাওয়া গেছে হাতুড়ি-মাথা, ফল ভোগী বাদুড়ের শরীর থেকে।
বাদুড়েরা ফসলের পক্ষে ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ খেয়ে মানুষের উপকারও করে থাকে। বাদুড় অধ্যুষিত এলাকায় ফসলের জন্য কীটনাশক কম ব্যবহার করলেও চলে।
প্রায় ১৩০০ বিভিন্ন প্রজাতির বাদুড় পৃথিবীতে পাওয়া যায়, যাদের মধ্যে মাত্র তিন ধরনের বাদুড় রক্তচোষা। বাকি বাদুড়েরা হয় ফল খেয়ে বা কীটপতঙ্গ খেয়ে বেঁচে থাকে। রক্তচোষা বাদুড় খুব কম জায়গায় দেখতে পাওয়া যায়। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে সাধারণত এইধরনের বাদুড় দেখতে পাওয়া যায়। এদের বৈশিষ্ট্য হল, মুখের দু’পাশে ধারালো দুটি দাঁতের অবস্থান। রাতের অন্ধকারে পশুদের শরীরে চুপিসারে বসে এরা দুটো দাঁত ফুটিয়ে দিয়ে রক্ত চুষে খায়। ভ্যাম্পায়ারের কল্পনাও এদের দেখেই শুরু হয়। এই জাতীয় বাদুড়ের দাঁতের ধার স্টিলের ব্লেডের সাথে তুলনা করা যায়। আক্রান্ত পশুর দেহে লোম থাকলে এই দাঁতের সাহায্যে তারা প্রথমে লোম ছেঁটে ফেলে, তারপর তাদের মাংসে দাঁত ফুটিয়ে রক্ত পান করতে শুরু করে। এদের মুখের লালায় এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থ আছে যার প্রভাবে রক্ত তঞ্চন ক্রিয়া ধীরগতিতে হয়। রক্তচোষা বাদুড়ের লালার এই ধর্মকে কাজে লাগিয়ে মানব শরীরে রক্ত জমাট বেঁধে স্ট্রোক প্রতিরোধী ওষুধ তৈরি করা হয় বাদুড়ের লালা থেকে। ভ্যাম্পায়ারের কল্পনায় মনে হতে পারে রক্তচোষা বাদুড়েরা মানুষের ক্ষতি করে। কিন্তু এই ধারণা একেবারে সত্য নয়, বরং বিপরীত। মানুষের শরীরে এরা সাধারণত আক্রমণ করে না, গবাদি পশুরাই এদের পছন্দের শিকার। বাদুড়ের অন্যান্য প্রজাতির তুলনায় রক্তচোষা বাদুড় নিজেদের মধ্যে বেশি মিলেমিশে থাকে; জায়গা দখলের লড়াই করে না; এমনকি পরস্পরকে নানাভাবে সাহায্য করে থাকে।
বাদুড়েরা দৃষ্টিহীন বলে এক ভ্রান্ত ধারণা আছে। কিছুক্ষেত্রে মানুষের চাইতে জোরালো তাদের দৃষ্টি। ভোরের আলো ও গোধূলি আলোয় বাদুড়ের চোখ বেশি সংবেদনশীল। সেই কারণে এরা দিনের আলোয় বাইরে আসে না, কিন্তু রাতের বেলায় বা কম আলোতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এক অদ্ভুত উপায়ে বাদুড়েরা নেভিগেট করে খাদ্যের সন্ধানে ও উড়ে বেড়ানোর জন্য। নিজেদের শরীর থেকে আলট্রা সাউন্ড পাঠিয়ে শব্দের প্রতিফলনের মাধ্যমে তারা দিকনির্ণয় ও খাদ্যের হদিশ পায়। সাউন্ড নেভিগেশন ও রেঞ্জিং (SONAR) করার এই ক্ষমতা খুব স্বল্প সংখ্যক স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়, যার মধ্যে আছে বাদুড়। অবশ্য মাত্র ৯০০ প্রজাতির বাদুড়ের মধ্যে এই বিশেষ ক্ষমতা দেখতে পাওয়া গেছে। মুখ বা নাক থেকে প্রতি সেকেন্ডে ২০০০০ কম্পাঙ্কের বেশি কম্পাঙ্কের শব্দ প্রক্ষেপ করে প্রতিধ্বনি শুনে বাদুড় দূরের বস্তুর দূরত্ব আন্দাজ করে যাতায়াত ও খাদ্যবস্তুর সন্ধান করে। প্রক্ষিপ্ত শব্দ গ্রহণ করবার জন্য তাদের কান বিশেষভাবে তৈরি।

বাংলায় যাদের ‘কলা বাদুড়’ বলা হয়, তারা আসলে ফলখেকো বাদুড়। চামচিকেরা হচ্ছে বাদুড় পরিবারের এক প্রজাতি, যারা কীটপতঙ্গ খেয়ে থাকে। গ্রামবাংলায় বাদুড় দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু শহরাঞ্চলে বাদুড় দেখতে পাওয়া যায় না। কারণ, ওরা খুব একটা মানুষের হট্টগোল পছন্দ করে না। সুকুমার রায় বাদুড় দেখে ছড়া লিখে ফেলেছিলেন, যা পড়ে জানা যায়, চামচিকেরা শুধু পতঙ্গই নয়, ইঁদুর খেতেও ভালোবাসে।
“বাদুড় বলে ওরে ও ভাই সজারু,
আজকে রাতে দেখবে একটা মজারু।
আজকে হেথায় চামচিকে আর পেঁচারা
আসবে হেথায়, মরবে ইঁদুর বেচারা।”

জঙ্গল কেটে নগরায়ন ও পরিবেশ দূষণের ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কীভাবে ব্যাহত হচ্ছে, নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ এর এক জ্বলন্ত উদাহরণ। মানুষের মতো অন্যসব প্রাণীরও পৃথিবীতে বসবাসের সমান অধিকার, একথা আরও বেশি করে বোধহয় বোঝার প্রয়োজন এসেছে।
_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

1 comment:

  1. কলকাতার চিড়িয়াখানায় প্রচুর বাদুড় আছে, সেখান থেকে শেষ বিকেলে তারা শহরের নানা দিকে উড়ে বেড়ায় খাদ্যের সন্ধানে। ছোটবেলায় একটা ছড়া শুনতাম "আদুড়বাদুড় চালতাবাদুড় কলাবাদুড়ের বে'/ টোপর মাথায় দে..."।
    খুব ভালো লাগল, অনেক অজানা তথ্য জানতে পারলাম।

    ReplyDelete