জীবনের গল্পঃ মেঘনার জলেঃ দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী


মেঘনার জলে

দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী


ইংরেজি ১৯৩৯ সালের অক্টোবর মাসের প্রথমদিকে কালিহাতি থানা থেকে আমার বদলি হয়ে গেল ভৈরব থানায়। সাধারণত কোনও থানা থেকে কেউ তিন বছরের আগে বদলি হয় না। এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয় তখনই যখন কোনও কর্মচারী সেখানে থাকার অযোগ্য বলে বিবেচিত হয় বা যদি সে উচ্চপদে উন্নীত হয় এবং সেখানে কোনও জায়গা খালি না থাকে। আমার বেলায় কিন্তু এ-দুটোর একটিও ঘটেনি। বরঞ্চ কালিহাতিতে আমার কাজকর্ম বেশ ভালোই চলছিল। তাহলে কেন এমন হল সেকথাই বলি।
কালিহাতি থানায় যোগ দেবার কিছুদিন পরই আমি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হই। প্রত্যেক মাসের অমাবস্যা বা পূর্ণিমা তিথিতে তিন-চারদিনের জন্য এই অবাঞ্ছিত অতিথি আমার হাড়মজ্জা কাঁপিয়ে দিয়ে বিদায় নিত। আমার কাজের যেমন কোনও সময় ছিল না, তেমনই তার আমার সাথে ভাব করারও কোনও জায়গাবাসার বিচার ছিল না। হাসপাতালে বা ছুটিতে যাওয়া আমার কখনও মনঃপূত হত না। তাই শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করেও কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলাম। ১৯৩৯ সালের অগাস্ট মাসের মাঝামাঝি অতিরিক্ত পুলিশ সাহেব মিঃ আর.সি পোলার্ড এলেন থানা পরিদর্শনে। তিনি আমাকে ও আমার অসুস্থতার রিপোর্ট দেখে আমি কেন সদর হাসপাতালে যাইনি তার জন্য ভর্ৎসনা করলেন। বড়ো সাহেবও অসুস্থতা সত্ত্বেও আমার কাজের সপ্রশংস বর্ণনা দিলেন। পুলিশ সাহেবের কিন্তু মোটেই ইচ্ছা হল না যে আমি আর কালিহাতি থাকি। তাই তিনি কোনও স্বাস্থ্যকর থানায় আমার বদলির সুপারিশ করলেন হেড কোয়ার্টারের অতিরিক্ত পুলিশ সাহেবের কাছে। একমাসের ভেতর আমার বদলির হুকুম এসে গেল।
ভৈরব। ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত এই জায়গা। পূর্ববঙ্গের (অধুনা বাংলাদেশের) একটি বিখ্যাত নদী-বন্দর। মেঘনা নদীর তীরে, জেলার শেষপ্রান্তে। নদীর অপর তীরে কুমিল্লা ও টিপারা জেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার আরম্ভ। আর এদিকে ঢাকা জেলা। খুবই স্বাস্থ্যকর ও মনোরম স্থান। এ-বন্দরে দেখেছি পাঁচশ মন, হাজার মন মালবোঝাই বড়ো বড়ো নৌকা, যাত্রীবাহী স্টিমার-লঞ্চের যাতায়াত। মালবাহী এই নৌকাগুলো ছিল একেকখানি ছোটোখাটো বাড়ির মতন। পশ্চিমের বাণিজ্য-প্রধান জায়গা দানাপুর, পাটনা, মুঙ্গের, আড়া, বালিয়া জেলা থেকে বোঝাই করে নিয়ে আসত নানারকমের ডাল, মশলা, লঙ্কা, তামাক, পাথরের থালাবাসন, আরও কত কী। বিশেষ করে বর্ষাকালে কত বড়ো বড়ো নদী পেরিয়ে এসে ঢুকে পড়ত মেঘনায়। তারপর ভৈরবের বিশাল খাঁড়িতে নোঙর ফেলে মাল খালাস করত। ভরে যেত বড়ো বড়ো ব্যবসায়ীর গুদাম। নাখোদা আর.বি.এম দাসের নাম আমার মনে আছে এদের নিঃস্বার্থ দানের জন্য। এরা যে শুধু মাল খালাস করত তা নয়, বোঝাই করে দিত কত রকমারি জিনিস। চলে যেত ফিরে যে যার যায়গায়। গোটা আসাম প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে সিলেট, সুনামগঞ্জ, শিলচর, ধুবড়ি, তেজপুরে চালান হত তামাক, মশলা ইত্যাদি। বোঝাই করে নিয়ে আসত কমলা, আনারস। সেগুলো ওয়াগন বোঝাই করে রেলযোগে পাঠান হত কলকাতায়। রেলপথে ও নদীপথে দু’দিক থেকেই যোগ ছিল ঢাকা, নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে। চালানি ব্যাবসায়ে ভৈরবের উল্লেখযোগ্য প্রাধান্য ছিল।
বাণিজ্য-প্রধান জায়গায় যা সাধারণত হয়ে থাকে, এখানেও তার কোনও ব্যতিক্রম ছিল না। রেলপথে, স্থলপথে ও জলপথে সর্বত্র ছিল চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি ও আরও কতরকমের অপরাধের প্রাদুর্ভাব। তাই ভৈরব থানায় পুলিশের সংখ্যা ছিল অন্যান্য থানা থেকে অনেক বেশি। রেলপথ দেখত রেলপুলিশ। জলপুলিশ সংস্থা উঠে যাবার পর থেকে নদীপথে পাহারার বন্দোবস্ত করতে হত ভৈরব থানা থেকে। এর জন্য থাকত বড়ো হাউস-বোট। এতে থাকত কয়েকজন কনস্টেবল, বন্দুক, গুলি, লাঠি ইত্যাদি। একে বলা হত ‘ফ্লোটিং আউট পোস্ট’ (এফ.ও.পি) অর্থাৎ ভাসমান পুলিশ ফাঁড়ি। এটা থাকত কোনও নিরাপদ জায়গায় নোঙর করা। বড়ো নৌকা থাকত নদীতে পেট্রল দেবার জন্য। রেল এলাকার মতন নদীর এলাকা ছিল পনের-ষোল মাইলের মতো দীর্ঘ। থাকার জন্য কোনও ফ্যামিলি কোয়ার্টার ছিল না। তাই এখানকার চার্জে থাকত একজন ব্যাচেলার অফিসার। কাজকর্মের মধ্যে হল শুধু নৌকা নিয়ে চার্ট অনুসারে চলা ও নদীর তীরের উভয় ধারে যেসব দাগী চোর-ডাকাত থাকত তাদের গতিবিধি দেখা। উদ্দেশ্য, মালবাহী ও যাত্রীবাহী নৌকার নিরাপত্তা।
ভৈরব থানায় জয়েন করে আমাকে নিতে হল এই এফ.ও.পি-র চার্জের দায়িত্ব। এই ষোল মাইল নদীপথ কিন্তু চলে গেছে ময়মনসিংহ ও টিপারা জেলার কয়েকটি থানা এলাকার ভেতর দিয়ে। এই থানাগুলির মধ্যে ছিল ময়মনসিংহ জেলার ভৈরব, বাজিতপুর, কুলিয়ার চর, অষ্টগ্রাম আর টিপারা জেলার নবীগঞ্জ, সরাইল ও নাসির নগর থানা ইত্যাদি। এর প্রত্যেকটিতেই নদীর ধারে থাকত দুর্ধর্ষ সব ডাকাতের দল। এদের বলা হত জলদস্যু বা রিভার ড্যাকয়েটস। বেশিরভাগ ছিল জাতে মুচি বা ঋষি। এই ঋষি গ্যাংয়ের দল দিনের বেলায় করত নিজেদের জাত ব্যাবসা। রাত্রে কিন্তু জেগে উঠত এদের নিষ্ঠুর অপরাধ প্রবৃত্তি। দশ-বারো জন মিলে মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছিপ নৌকা বা তীব্র গতিতে চলতে পারে এরূপ ধরনের নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়ত। প্রত্যেকের হাতে থাকত নৌকা চালানোর জন্য বৈঠা। নদীর কোনও খাঁড়িতে অন্ধকারে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকত সুযোগের অপেক্ষায়। তারপর কোনও যাত্রীবাহী বা মালবাহী নৌকা একা পেলে তীব্র বেগে ছুটে গিয়ে অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ত নৌকার ওপর। মারধর করে আর বাধা দিলে খুন পর্যন্ত করে মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে তেমনই তড়িৎগতিতে মিলিয়ে যেত ঘন অন্ধকারে। খবর পেয়ে পুলিশ আসতে আসতে এরা লুঠ করা মালপত্র কোথায় যে লুকিয়ে ফেলত তার হদিশ করতে পুলিশকে হিমসিম খেয়ে যেতে হত। তাই নদী-বন্দরে জানিয়ে দেওয়া হত নৌকা চালাতে হলে, বিশেষ করে রাত্রে, সব নৌকা একসঙ্গে যেতে হবে কনভয় বা বহর করে। এইসব ডাকাতদের রাত্রে গতিবিধি লক্ষ করা, একা চলতে শুরু করেছে এরূপ কোনও নৌকাকে বন্দরে আটকে দেওয়া এসব এফ.ও.পি বা জলপুলিশের কাজ।
মেঘনা নদীর ওপর দিয়ে ভৈরব ও আশুগঞ্জকে যোগ করে ভৈরব রেল ব্রিজ বা সেতু নির্মাণের কাজ কয়েক বছর আগেই শেষ হয়েছে। সবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি তখন খুবই খারাপ চলছিল। তাই এই রেল-সেতুরও খুব গুরুত্ব ছিল বলে সশস্ত্র একটি পুলিশের দল সবসময়েই এই রেল-সেতু পাহারা দিত। এদের ডিউটির তত্ত্বাবধান করার দায়িত্ব ছিল এফ.ও.পি ইন-চার্জ হিসাবে আমার ওপর।
আমি যখন ভৈরব থানায় এলাম তখন ঢাকায় হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলছিল। তার তিক্ত প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রামে গ্রামেও। কিছদিন আগে ভৈরব স্টেশনের কাছে এক বিস্তীর্ণ মাঠে তদানীন্তন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হক এসে এক বিরাট জনসভায় বক্তৃতা দিলেন যার বিষয়বস্তু ছিল যে হিন্দুরা মুসলমানদের দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। তারা ভারতবর্ষের মুসলমান প্রধান জায়গাগুলো নিয়ে এক মুসলমান রাষ্ট্র স্থাপন করবে। হিন্দুর সঙ্গে একত্র হয়ে কংগ্রেসের ভেতর দিয়ে স্বাধীনতা এলে তাদের কোনও সুবিধা হবে না ইত্যাদি। তিনি বক্তৃতার ভেতর দিয়ে যে সাম্প্রদায়িক বীজ বপন করে গেলেন, কর্তব্যরত অবস্থায় আমি তা শুনে অত্যন্ত মর্মাহত হয়ে গেলাম।
দাঙ্গা এতদিন শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। অচিরেই যে এখন গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়বে, সে বিষয় চিন্তা করে আমার হৃৎকম্প উপস্থিত হল। আরও বেশি চিন্তা হল লক্ষ করে যে থানায় পুলিশ কর্মচারীদের মধ্যে যে এতকালের একটা সুন্দর ভ্রাতৃত্বের সম্বন্ধ ছিল, তাতে ফাটল ধরেছে। একটা চাপা হিংসা, রেষারেষি চলতে লাগল। সামাজিক দিক থেকে পুলিশ না ছিল হিন্দু, না মুসলমান, না খ্রিস্টান। এরা ছিল একটা ভিন্ন জাত - সেটা হল ‘পুলিশ জাত’। ইউনিফর্মের ভেতর দিয়ে এদের ইউনিটি ছিল সুদৃঢ়। কিন্তু তা আর থাকল না। বাংলায় মুসলিম লীগের শাসন। মুসলমান যুবক পুলিশ কর্মচারীরা প্রকাশ্যভাবে মুসলিম লীগের প্রচার কার্য চালাত। কিন্তু কোনও হিন্দু পুলিশ কর্মচারীর পক্ষে কংগ্রেস বা হিন্দু মহাসভা বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের হয়ে কিছু কাজ করা বা বলা ছিল নিষিদ্ধ। তাদের চাকরির পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। আমি এমন অনেক দৃষ্টান্ত জানি যে হিন্দু পুলিশ অফিসাররা পরম উৎসাহে পুলিশ কর্তব্যের বহির্ভূত কার্যকে উপেক্ষা করে সরকারের কাছে অসাম্প্রদায়িক প্রমাণ করে নিজেদের উন্নতির ফিকির দেখত। হকসাহেবের বক্তৃতায় যে সাম্প্রদায়িক বীজ বপন হল তাতে জলসেচন করতে লাগল এই সরকারী কর্মচারীরা।
অচিরেই বীজ অঙ্কুরিত হল। টঙ্গী, ভৈরবের আশেপাশের গ্রামগুলিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। হিন্দুরা দলে দলে বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে লাগল আগরতলার দিকে। প্রায় দশজন বন্দুকধারী পুলিশ কনস্টেবল নিয়ে ভৈরব রেল স্টেশনে নিযুক্ত আছি দিনের পর দিন। ইউনিফর্ম খুলে বিশ্রামের সময় নেই। স্নান নেই, আহার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যা জুটছে। বেশি গুলি চালালে চাকরির দিক থেকে ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই মাঝে মাঝে দাঙ্গাকারী জনতা প্রয়োজনমতো গুলি চালিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে হচ্ছে। গুর্খা সিপাই সঙ্গে। থামিয়ে রাখা যাচ্ছে না। হাজার হাজার হিন্দু নরনারী শিশুসন্তান সহ চলেছে বাড়িঘর ছেড়ে ট্রেনে অজানা ভবিষ্যতের দিকে। জল ও খাবারের জন্য মর্মভেদী হাহাকার। এগিয়ে এলেন ভৈরবের ধনী ব্যবসায়ী বি.এম.দাস ব্রাদার্স-এর অন্যতম মালিক সমীর দাস আর ‘নাখোদা’র মালিকের ছেলে কামাল। দু’জনেই যুবক। অল্প সময়ের মধ্যে তাঁদের সঙ্গে আলাপ এবং পরস্পরের ব্যবহারে মুগ্ধ তিন বন্ধু। আমার অনুরোধে খুলে দিল দানছত্র। জল সরবরাহ করা, মুড়ি, বিস্কুট, চিঁড়া, গুড় ইত্যাদি খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন নিরাশ্রয়দের। জীবনের ভয়ে সবাই পালিয়ে চলেছে আগরতলা এক অনিশ্চিতের মধ্যে। বাড়িঘরে জ্বলছে আগুন। কত পুরুষের পৈতৃক ভিটে, কত মন্দির দেউল সব পড়ে রইল পেছনে। কী মর্মভেদী করুণ কান্না! স্বাধীনতার স্বপ্নের অগণিত বলি। ব্রিটিশ চক্রান্তের বীভৎস পরিণাম।
দশদিনের মধ্যে দাঙ্গা কমে গেল। বুট খুলে দেখলাম, শরীরের অন্য অংশ থেকে অসম্ভব রকম সাদা হয়ে গেছে পাদুটো। শারীরিক যন্ত্রণা ভুলে দুই বন্ধুকে জানালাম আমার নীরব শ্রদ্ধা। আশ্চর্য হয়ে গেছি ভেবে যে মুসলমানের ভয়ে পালিয়ে চলেছে হাজার হাজার উদ্বাস্তু, তাদেরই প্রাণরক্ষার জন্য জল-খাবার এগিয়ে দিচ্ছেন যারা তাঁদের মধ্যে রয়েছেন একজন মুসলমান যুবক।
অষ্টগ্রাম থানার বাঘাইয়ার চর এবং নাসিরনগর থানার চাতলপারের চরগুলিতে ছিল দুর্দান্ত প্রকৃতির মুসলমান চাষিদের বাস। এদের বেশিরভাগ ছিল অবস্থাপন্ন গৃহস্থ। চরের উর্বরা জমিতে চাষ করে ধান, পাট ও বিভিন্ন রবিশস্য যা পেত তার অধিকাংশ বিক্রি করে প্রচুর টাকা হত। ধান-পাট উঠে গেলে এদের যুবকদের হত ‘কাজিয়া’র মহড়া। টিকারা বাজিয়ে লাঠিখেলা চলত। তারপর পুরনো বিবাদের সূত্র ধরে দুই গ্রামের দুই দলে লেগে যেত লাঠি, হলঙ্গা, বর্শা নিয়ে তোড়জোড়।
এফ.ও.পি-র চার্জ নিয়ে একবার নৌকোযোগে এ-সমস্ত জায়গা ঘুরে গেছি। চাতলপার, পতৈর, বাঘাইয়া গ্রামে ভালো ভালো লোকের সঙ্গে দেখাসাক্ষাত করে জেনেছি স্থানীয় চোর-ডাকাতের গতিবিধির সংবাদ। দুর্গাপুজোর সময়ে এই অঞ্চলে যাত্রীবাহী ও মালবাহী নৌকোর চলাচল বেড়ে যায়। থানা রেকর্ডে দেখা যায়, এই সময়ে ডাকাতরা নদীর ওপর নৌকো আক্রমণ কোরে মালপত্র লুঠ করে নিয়ে পালিয়ে যায়। তাই পেট্রোল চার্ট করার সময় ঠিক করা হল নদীপথে চলতে চলতে এই সময়ে দুই-তিনদিন চাতলপারের আশেপাশে থাকা।
এই চার্ট অনুসারে অনেক জায়গা ঘুরে সপ্তমী পুজোর দিন সকালে নৌকো লাগল পতৈরের ঘাটে। নৌকোর সামনে সবসময়ে গুলিভরা বন্দুক নিয়ে একজন সিপাই পাহারায় থাকত। আমি একজন সিপাই নিয়ে পতৈর গ্রাম ঘুরে এলাম। সেখানে অনেকের সঙ্গে আমার আলাপ-পরিচয় হল। খুব আনন্দ হল আমার দুই বন্ধুকে সেখানে দেখে। এই পতৈর গ্রামেই তাদের বাড়ি। একজন অন্নদাশঙ্কর রায়, আর একজন গিরীন্দ্রকুমার চক্রবর্তী। দুইজনেই আমার সাথে ঢাকা জগন্নাথ কলেজে পড়ত। অন্নদার আর্থিক অবস্থা খুব ভালো। তাই ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে আর পড়েনি। সম্পত্তি দেখাশোনায় ব্যস্ত। গিরীন কলেজের ফাংশনে গান করত। ক্রমে ভাটিয়ালি গানে খুব নাম করেছিল।
অন্নদা আর গিরীন দু’জনেই আমাকে বলল, “দেখো দিগেন, শুনছি আগামীকাল অষ্টগ্রাম থানার বাঘাইয়া ও নাসিরনগর থানার চাতলপার গ্রামের দুই দল মুসলমানের এক ভয়ানক দাঙ্গা বাধবে। গতকাল বাঘাইয়ার কিছু লোক পাট বিক্রি করতে চাতলপার হাটে আসে। তাদের নাকি চাতলপার গ্রামের কয়েকজন মুসলমান খুব অপমান করে। বাঘাইয়ার লোকেরা দলে কম বলে খুবই রাগান্বিত অবস্থায় চলে যায়। চাতলপারের লোকেরা বুঝতে পেরে লাঠিসোটা নিয়ে তৈরি হয় ও মহড়া দিতে থাকে। বাঘাইয়ার ওরাও বসে নেই। কত যে খুন-জখম হবে তার কোনও ঠিক নেই। তুমি এর মধ্যে থেক না।”
আমি বললাম, “এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে এরকম কাণ্ড হবে ভাবা যায় না। আপোস-মীমাংসা করে দিলে হয় না?”
অন্নদা বলল, “শোনো, এরা ফসল বিক্রি করে টাকা পেয়েছে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে এরা রোজগার করে ঠিকই, কিন্তু রাখতে জানে না। কারোর কথা এখন শুনবে না। তবে বাঘাইয়া গিয়ে একবার চেষ্টা করে দেখতে পার।”
আমি বললাম, “আমার যে এখানে দু-তিনদিনের প্রোগ্রাম রয়েছে। অনেকেই তো জানতে পেরেছে যে আমি এখানে এসেছি। এই অবস্থায় এখান থেকে চলে যাওয়াটা মোটেই যুক্তিসঙ্গত নয়। তাছাড়া কোনওরকম শান্তিভঙ্গ যাতে না হয় তা দেখাও তো পুলিশের একটি কর্তব্য। আমি যে জেনেছি এ-কথা অস্বীকার করব কী করে? কর্তব্যভ্রষ্ট কোনওমতেই হব না।”
আমি একজন চৌকিদার দিয়ে নাসিরনগর থানায় একটা চিঠি পাঠিয়ে দিলাম সব লিখে, আর কিছু পুলিশ পাঠিয়ে দিতে বললাম। একজন চৌকিদার দিয়ে বলে পাঠালাম যে চাতলপার গ্রামে তারা যেন কোনওরূপ দাঙ্গা না করে। চাতলপার বাজারে বন্দুক নিয়ে পুলিশ মোতায়েন আছে। নিজে চলে এলাম বাঘাইয়া গ্রাম হয়ে অষ্টগ্রাম থানায়। উদ্দেশ্য, লোকে দেখুক পুলিশ এসে গেছে। থানায় লিখে কিছু পুলিশ বন্দোবস্ত করে এলাম।
পরদিন সকালে দুই থানা থেকে এসে হাজির হল দু’জন সহকারী দারোগা আর ছয়জন কনস্টেবল। আমাদের তিনটি নৌকোই পতৈর ঘাটে বাঁধা আছে। আমার নৌকোয় মুজিবর নামে একজন সাহসী যুবক মাঝি ছিল। নৌকোর ছইয়ের ওপর থেকে হঠাৎ সে দেখতে পেল বাঘাইয়ার দিক থেকে বহু লোক নৌকো করে লাঠি, হলঙ্গা, বড়ো দা ইত্যাদি মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চাতলপারের দিকে যাচ্ছে। আমি নৌকো খুলে দিয়ে চাতলপারের দিকে এগোতে বললাম। নদীর বাঁক ঘুরতেই দেখা গেল চাতলপারের বাজারের ঘাটেও বহু লোক লাঠি, বল্লম, বড়ো দা ইত্যাদি নিয়ে লম্ফঝম্প করছে। দুই দলই পরস্পরকে উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ করছে। ভাটার দিক থাকায় আমাদের নৌকো অল্পক্ষণের মধ্যেই দুই দলের মাঝখানে এসে গেল। ততক্ষণের মধ্যে দুই দলে পরস্পরকে বল্লম ও বাঁশের তৈরি একদিক চোখা সড়কি ছুড়ে মেরে সাংঘাতিকভাবে জখম করতে লাগল। কেউ কেউ নৌকো থেকে আহত অবস্থায় জলে পড়ে গেল।
আমি দেখলাম, আমাদের নৌকোগুলি স্রোতের টানে ঘটনাস্থল ছেড়ে দূরে সরে যাচ্ছে। আমার হুকুমে সব নৌকো ঘুরিয়ে এনে চাতলপারের ঘাটে লাগান হল। দুই পক্ষকে সাবধান করা হল থেমে যেতে, নয়তো গুলি করা হবে। আমি নৌকোর সামনে দাঁড়ানো। সাবধানবাণীতে কোনও কাজ হল না। হঠাৎ ঘটনার মোড় ঘুরে গেল। নাসিরনগরের সহকারী দারোগা নৌকো থেকে লাফিয়ে নেমে দাঙ্গাকারীর দু’জনকে অস্ত্রসহ ধরে ফেলে নৌকোর দিকে নিয়ে আসতে লাগল। অবস্থা দেখে বাঘাইয়ার লোকগুলো ওদের নৌকো নিয়ে পিছিয়ে যেতে লাগল। চাতলপারের লোকরা তাদের দু’জনকে ধরা হয়েছে দেখে ভীষণভাবে উত্তেজিত হয়ে লাঠি, বর্শা, দা নিয়ে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। পর পর দুটো বর্শা আমার দিকে ছুড়ে মারল। প্রথমটা আমার মাথার টুপি গেঁথে জলে পড়ে গেল। দ্বিতীয়টি আমার মাথায় সাংঘাতিক জখম করে নৌকার ছইয়ে গেঁথে গেল। আত্মরক্ষার জন্য আমি গুলি করার হুকুম দিলাম। কারণ, ততক্ষণে দু’জন সিপাই বন্দুকে গুলি ভরে তৈরি হয়ে গেছে। আমার মাথা থেকে প্রচুর রক্ত বের হয়ে ইউনিফর্ম ভিজে যাচ্ছে। গুলি খেয়ে সব পিছিয়ে যেতে লাগল। কতক্ষণ গুলি চলেছিল আমি জানি না। কারণ, পড়ে যাওয়ার সাথে সাথেই আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম।
যখন জ্ঞান ফিরে এল তখন আমি নাসিরনগর থানায়। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হল, কিন্তু রক্ত পড়া থামল না। নাসিরনগর থানার অফিসার-ইন-চার্জ আমার কাছ থেকে শুনে ঘটনার বিবরণ লিখে নিয়ে আমাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলেন। কারণ, আমার বয়ান লেখার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছতে একদিন লেগে গেল।
হাসপাতালে আমার জ্ঞান ফিরে এল। ততক্ষণে মাথায় গভীর ক্ষতস্থান সেলাই করে ব্যান্ডেজ বাঁধা হয়ে গেছে। সর্বাঙ্গে অসম্ভব ব্যথা, উঠে বসার ক্ষমতা নেই। জ্ঞান হবার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম দেখলাম, আমার কাছে একজন ইংরেজ রাজপুরুষ চেয়ারে বসে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি কিছু বলতে চেষ্টা করলে উনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “Don’t get up, boy. Your gallant work has saved the prestige of police force and lives of so many though at the cost of grave danger to your life. You are out of danger now.” (উঠো না, বাছা। তোমার বীরত্বের কাজ পুলিশ বাহিনীর সম্মান এবং বহুজনের জীবন রক্ষা করেছে যদিও তা তোমার জীবনের গভীর বিপদের মূল্যে। তুমি এখন বিপদমুক্ত।)
এই কথা বলে উনি উঠে দাঁড়ালেন ও উপস্থিত থাকা ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে আলাপ করে আবার আসবেন বলে চলে গেলেন। জানলাম, ইনিই মিঃ ড্রুকার আই.সি.এস – ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্ত রাখার জন্য একটি ইনজেকশন দেওয়া হল। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
বিকেলের দিকে ঘুম ভাঙলে দেখলাম, মিঃ ড্রুকার বসে আছেন। অনেক সুস্থ বোধ করলাম। উনি আমার সঙ্গে কথা বলে ঘটনা জেনে নিলেন। তারপর একে একে এলেন ঢাকা রেঞ্জের ডি.আই.জি মিঃ এইচ.বি জোনস আই.পি, বাখরগঞ্জ রেঞ্জের ডি.আই.জি মিঃ এইচ.জি হান্ট আই.পি এবং আরও অনেকে। জিজ্ঞাসা করে জানলেন যে গুলি ছোড়ার যথেষ্ট যুক্তি ছিল কি না। কারণ শুনলাম, গুলিতে যেমন মারা গেছে কয়েকজন, তেমনই আহত অবস্থায় হাসপাতালে রয়েছে প্রচুর। আহতের সংখ্যা প্রায় চল্লিশের ওপর। হাসপাতালে সশস্ত্র পুলিশ পাহারা। আশ্চর্য হলাম শুনে যে এই ঘটনার পরদিনের খবরের কাগজে আমার মৃত্যুসংবাদ ছাপা হয়েছে ঘটনার বিশদ বিবরণ দিয়ে।
শাসন বিভাগীয় ও বিচার বিভাগীয় তদন্তের পর উক্ত তদন্তকারী ঊর্ধ্বতন কর্মচারীগণ একবাক্যে আমার অসীম সাহসিকতা ও কর্তব্যনিষ্ঠার কথা লিখে জানিয়ে দিলেন যে গুলি করা খুবই যুক্তিসঙ্গত হয়েছে। সেখানকার নিরপেক্ষ হিন্দু-মুসলমানগণ আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া কোর্ট লোকে লোকারণ্য। স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে বিচার হচ্ছে প্রায় পঞ্চাশজন মুসলমান দাঙ্গাকারীর। সরকার পক্ষে উকিল ছিলেন খান বাহাদুর আব্দুল গনি। আর আসামী পক্ষ প্রচুর টাকা দিয়ে দাঁড় করালেন তদানীন্তন নামকরা এক হিন্দু উকিল - কামিনী দত্ত। ব্যাবসার খাতিরে আসামীদের পক্ষে তিনি কত যে মিথ্যার অবতারণা করে সওয়াল করলেন মুসলমান বিচারপতির আদালতে নির্লজ্জভাবে, তা শুনে আমার এই ব্যাবসার প্রতি একটা ঘৃণা জন্মে গেল। আজও তা আছে। আমার আজও মনে আছে, অনেক মিথ্যা ভাষণের পর তিনি কোর্টে বলেছিলেন, “Your Honour! This young officer wanted to earn credit by boiling the riot, instead of quelling the same.” (মহামান্য আদালত! এই তরুণ অফিসার নিজের কৃতিত্ব অর্জনের জন্য দাঙ্গাকে দমন করার পরিবর্তে আরও উসকে দিয়েছিল।)
একজন শিক্ষিত নামকরা উকিলের কতগুলি টাকার জন্য এরূপ বিকৃত ভাষণ শুনে আমার চোখ জলে ভরে গেল। আব্দুল গনি সাহেব কিন্তু খুব সুন্দরভাবে বিপক্ষ উকিলের মিথ্যা সওয়ালগুলো একটি একটি খণ্ডন করে দিলেন। পনের দিনের মতন একনাগাড়ে চলল বিচার।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো ছোটো শহরে পঞ্চাশ জন দাঙ্গাকারী আসামী ঘোরাফেরা করছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া হাসপাতাল আমার পক্ষে নিরাপদ নয় বলে আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল ময়মনসিংহ পুলিশ হাসপাতালে। প্রচুর রক্তপাতে শরীর ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তার ওপর পিঠের নিচের দিক থেকে কোমর পর্যন্ত একটা যন্ত্রণা হত মাঝে মাঝে। এই চোট যে কখন কীভাবে লেগেছিল বুঝতে পারিনি। এমনও হতে পারে যে মাথায় আঘাত লেগে পড়ে যাবার সময়ে বা পরে কোনও লাঠি বা বল্লম আমার পিঠে এসে পড়েছিল। যা হোক, একমাস পুলিশ হাসপাতালে থাকার পর সিভিল সার্জন আমাকে তিন মাসের ছুটির সুপারিশ করে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিলেন।
ছুটি শেষ হলে আমার বদলি হল ময়মনসিংহ জেলার মোহনগঞ্জ থানায়। ট্রাইব্যুনালের বিচারের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া এসেছি। আমি পুলিশ ক্লাবে একা থাকি। পরিচিত কোনও লোক নেই। ভৈরব থেকে এসেছে সেই সাহসী যুবক মাঝি মুজিবর। বিচারের সময় সমস্ত ঘটনা বলে গেল। কীভাবে আসামীদের আক্রমণ থেকে আমার ওপর পড়ে থেকে কীভাবে নিজে আহত হয়েছিল। বেশিরভাগ আসামীকে সে সনাক্ত করেছিল। আর এসেছিল সেই দুইজন সিপাই যারা গুলি চালিয়েছিল। এদের একজনের হাত ভীষণ জখম হয়।
বিচারে প্রায় চল্লিশজন লোকের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড হয়। বিচারপতি সাহসের সাথে কর্তব্য সম্পাদনের জন্য আমার কথা তাঁর রায়ে লিখলেন। কিন্তু একটা কথা আমাকে বড়োই দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, সেই দাঙ্গার দিন থেকে বিচারের শেষদিন পর্যন্ত আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্মচারী দ্বারা কত তিরস্কৃত হয়েছি। বলেছিল, এসব কাজ যত এড়িয়ে যাওয়া যায় তত ভালো। এরা দুই পক্ষে খুন জখম হয়ে আপনিই থেমে যেত। তারপর গেলেই তো সুবিধা। এটাই বোধহয় এই বিভাগের অভিজ্ঞ লোকের কথা। তাই আজও সংবাদপত্রে দেখি দুই রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালীন পুলিশের নীরব দর্শকের ভূমিকা। সেদিন আমার বিবেক সেকথা মানতে পারেনি এবং আজও পারে না। তাই বোধ করি ভগবান সে-যাত্রা আমাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এই বিবেকের তাড়নায় আমাকে আরও দু’বার ডাকাতের সাথে লড়তে গিয়ে গুলি চালাতে হয়েছিল। পুলিশের পক্ষে গুলি চালানো যে কত দুর্ভোগ, কতরকম তদন্তের সম্মুখীন হতে হয় প্রমাণ করতে যে গুলি করার প্রয়োজন ছিল, সেকথা একমাত্র ভুক্তভোগী পুলিশমাত্রই জানেন।
তদন্তকারী অফিসারগণ তাঁদের রিপোর্টে আমার সাহসিকতার জন্য তদানীন্তন সরকার প্রদত্ত “Gallantry Medal” অর্থাৎ “King’s Police and Fire service Medal” (সাহসিকতার জন্য প্রদত্ত) আমাকে দেওয়ার জন্য সুপারিশ করে পাঠালেন। মুসলিম লীগের শাসনাধীন অবিভক্ত বাংলার হোম মিনিস্টার তখন মাননীয় খাজা নাজিমুদ্দিন। চাতলপার থেকে মুসলিম লিগের স্থানীয় নেতা ভীষণ রেগে গেলেন কেন এত মুসলমান হত ও আহত করা হল? তার করে দিল নাজিমুদ্দিন সাহেবের নামে – ‘চাতলপারের মুসলমানরা মিলাত শরিফে একত্র হয়েছিল। হিন্দু দারোগা চাতলপার এসে ডেকে পাঠায় চাতলপার ও আশেপাশের মুসলমানদের তদন্তের অজুহাতে। তারা মিলাত শরিফ ছেড়ে না আসায় হিন্দু দারোগা ক্রুদ্ধ হয়ে তাদের ওপর গুলি চালায়। কত যে মুসলমান মরে গেছে তার কোনও হিসাব নেই। বহু আহত হয়ে পড়ে আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হাসপাতালে।’
ততক্ষণে অবশ্য বিভাগীয় তদন্তের রিপোর্ট চলে গেছে রাইটার্স বিল্ডিং-এ নাজিমুদ্দিন সাহেবের কাছে। ঢাকায় হিন্দু-মুসলিমের দাঙ্গা চলছিল। আবহাওয়া সব জায়গাতেই বেশ গরম। বিদেশি শাসকের কূটনৈতিক চাল, স্বাধীনতা আন্দোলনের তীব্র প্রভাবকে প্রশমিত করার অপপ্রচেষ্টা। যদিও তিনজন ব্রিটিশ রাজপুরুষ ও একজন মুসলমান পুলিশ সাহেব তদন্তের পর আমার স্বপক্ষে তো রিপোর্ট দিলেনই, উপরন্তু করলেন এত বড়ো একটা সম্মানের সুপারিশ। তথাপি নাজিমুদ্দিন সাহেব দেখলেন সেটা রাজনৈতিক কূটদৃষ্টি দিয়ে। রাইটার্স বিল্ডিং-এর গৃহমন্ত্রীর ঘরে অগুনতি ফাইলের তলায় চাপা পড়ে গেল সেই সুপারিশপত্র। না পাওয়া সেই বিরল সম্মানের ব্যথা অবশ্য ভুলতে পেরেছিলাম প্রায় পঁচিশ বছর পরে ‘রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক’ ও তার আরও দশ বছর পরে ‘স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী পদক’ লাভ করে। কিন্তু সেদিনের একজন তেইশ বছরের যুবকের সাহসিকতা ও জীবন বিপন্ন করে কর্তব্যনিষ্ঠার কাহিনি তার অশ্রু ও রক্তে লেখা রইল শুধু মেঘনার জলে।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী

2 comments:

  1. মুগ্ধ হলাম। লেখককে আমার প্রণাম‌

    ReplyDelete
  2. Bhisan bhalo laglo erokom ekta ghatana eto sohoj saral bhave upasthapona korar jonyo.

    ReplyDelete