গল্পঃ সুখের সন্ধানেঃ রণিত ভৌমিক



হরতুকি রাজ্যে রাজা থেকে শুরু করে মন্ত্রী, এমনকি খুব নিচু শ্রেণির প্রজার কাছেও যা ধনসম্পদ মজুত রয়েছে, তা হলপ করে বলা যায় যে এমন ধনী রাজ্য হয়তো খুঁজলেও পাওয়া মুশকিল। কিন্তু এই রাজ্যে সকলের একটাই সমস্যা, কারোর মনে সুখ নেই। গোটা রাজ্য যেন দুঃখের চাদরে মোড়া। রাজা বরুণচন্দ্র অনেক কিছু চেষ্টা করেও কোনও সুফল পাননি। এদিকে সময়ের সঙ্গে রাজামশাইয়ের বয়সও বাড়ছে, সুতরাং ওঁর এই দুশ্চিন্তা ওঁকে ক্রমশই গ্রাস করতে লাগল। সারাদিন রাজসভা সামলে উনি যখন অন্দরমহলে প্রবেশ করেন, তখন প্রায়ই ওঁকে খুব বিধ্বস্ত লাগে।
এরকমই ঠিক এক সন্ধেবেলায় রাজামশাই ক্লান্ত পায়ে অন্দরমহলে ফিরে আরামকেদারায় গা এলিয়ে নিজের মনে বলতে লাগলেন, “উফ্‌, আর পারি না! সারা রাজ্যে খালি অশান্তি লেগে রয়েছে। মনে হয় সুখের দেবী আর মুখ তুলে তাকাবেন না। কবে যে রাজধর্ম থেকে মুক্তি পাব, কে জানে!”
রানিমা এগিয়ে এসে শরবতের গ্লাস রাজামশাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে ওঁকে বললেন, “আবার নতুন করে কীসের ঝামেলা বাধল? প্রজারা কি আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল নাকি?”
রাজামশাই উত্তরে বললেন, “আরে বিদ্রোহ করলে তাও নয় বুঝতাম। কিন্তু এত বছর হয়ে গেল, কারোর মুখে একটু হাসি দেখলাম না! রাজ্যে কী যে ঘটছে আর কেনই বা ঘটছে, তা কেউই ঠিকভাবে জানে না। এদিকে সবার ঘরেই পরিমাণে চেয়ে অত্যধিক ধনসম্পত্তি মজুদ রয়েছে। আমার রাজ্যে কেউই গরিব নয় রানি, তবুও কেন এই দুর্দশা বলতে পার?”
রানিমা রাজামশাইকে প্রস্তাব দিলেন, “আপনি এই বিষয়টা নিয়ে কারোর সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। আমার মনে হয়, এই রাজ্যের বিরুদ্ধে কেউ ষড়যন্ত্র করেছে আর মন্ত্রতন্ত্রের দ্বারা সুখশান্তি সব লুপ্ত করেছে।”
রাজামশাই ঘাড় নাড়তে নাড়তে বললেন, “না, রানি না। এই সমস্যা এমন নয় যে কিছু বছর আগেই দেখা দিয়েছে। এটা আমার জন্মেরও আগের সমস্যা। এখন দেখছি আমার মতো আমার সন্তানকেও এই একই সমস্যায় দৈনদিন জ্বলে পুড়ে মরতে হবে।”
সেই রাতে শুতে যাওয়ার আগে রানিমা রাজামশাইকে এক বিশেষ প্রস্তাব দিলেন। সেই প্রস্তাব শোনামাত্রই রাজা বরুণচন্দ্র তৎক্ষণাৎ সেনাপাতিসহ সকল মন্ত্রীগণকে রাজভবনে ডেকে পাঠালেন এবং সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “আগামীকাল কাক ডাকার আগেই দূরদূরান্তে, বিভিন্ন রাজ্যে খবর পাঠিয়ে দিও যে রাজা বরুণচন্দ্র বলেছেন, যদি কেউ এমন থেকে থাকে যে এই রাজ্যে এসে এখানকার সুখশান্তি সব ফিরিয়ে আনতে পারবে তাকে আমি পুরস্কৃত করব, আর ব্যর্থ হলে চরম শাস্তি দেব।”
রাজামশাইয়ের আজ্ঞামতো ওঁর ওই শমন বিভিন্ন রাজ্যে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হল এবং তারপর শুরু হল সেই উপযুক্ত ব্যক্তির অপেক্ষায় প্রহর গোনা।
কিছুদিনের মধ্যে এক ব্যক্তির আগমন ঘটল এবং তাকে রাজসভায় দেখামাত্রই রাজামশাই বলে উঠলেন, “আপনি কে তা আমি জানি না। কিন্তু এই পরিস্থিতি থেকে এই রাজ্যকে বের করে আনতে পারলে আমি স্বয়ং আপনার কাছে চিরঋণী হয়ে থাকব।”
রাজামশাইয়ের কথা শুনে ওই ব্যক্তি বড়োই গর্বের সঙ্গে বলল, “আপনার দুঃখ দূর করতেই তো এসেছি, মহারাজ! তবে আমার কথা মেনে কাজ করতে গেলে আপনার একটু খরচাপাতি হতে পারে।”
রাজামশাই নিজের সিংহাসন থেকে নেমে এসে বললেন, “খরচাপাতি যাই হোক হবে। সুখ ফিরিয়ে আনুন, এইটুকুই চাই। এই রাজ্যের স্বার্থে যা দরকার আমি তাই করব।”
সেই শুনে ওই ব্যক্তি বলল, “হিমালায় থেকে তপস্যা করে এসেছে এমন অনেক মুনিঋষিদের ডেকে এক অশ্বমেধের যজ্ঞ আয়োজন করতে হবে, মহারাজ। আমার মনে হয় কোনও প্রেত-ট্রেত এই রাজ্যকে বশ করে রেখেছে।”
মহারাজ সেই শুনে বললেন, “কিন্তু অশ্বমেধের যজ্ঞ শুনেছি আয়োজন করা খুব কঠিন।”
ওই ব্যক্তি মাথা নেড়ে বলল, “আপনি কিছুদিনের সময় দিন, আমি সব ব্যবস্থা করে ফেলছি।”
এরপর রাজামশাইয়ের থেকে ওই যজ্ঞ আয়োজনের নাম করে ওই ব্যক্তি অনেক সোনার মোহর হাতিয়ে ফিরে গেল নিজের রাজ্যে এবং তারপর আর এই রাজ্যমুখো হল না। এদিকে রাজামশাই ওই ব্যক্তির অপেক্ষায় প্রহর গুনতে লাগলেন। কিন্তু যখন আর সে ফিরছে না দেখলেন, তখন উনি প্রতারিত হওয়ার শোকে আরও হতাশায় ভেঙে পড়লেন।
ঠিক এইরকম সময় এক বিদূষকের আবির্ভাব ঘটল। রাজামশাই তাকে দেখে মনে মনে ভাবতে লাগলেন, আমার রাজসভায় একাধিক বিদূষক থাকতেও তারা কোনদিনও রাজ্যের মানুষকে প্রাণভরে হাসতে পারল না, আর এ কিনা আমাদের সুখ-হাসি সব ফিরিয়ে দেবে ভাবছে!
রাজামশাই তাই সবদিক চিন্তা করেই তাকে আগেভাগে জানিয়ে দিলেন যে উনি কোনওভাবেই আর কোনও প্রতারণার শিকার হতে চান না। সুতরাং উনি এক মোহরও আর খরচা করবেন না, যতক্ষণ না সেই বিদূষক ওই সমস্যার সমাধান করতে সফল হয়। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ওই বিদূষক সেই অর্থে রাজামশাইয়ের থেকে কোনও কিছুই চাইল না, শুধু ওঁকে সেই উপহার প্রস্তুত রাখার জন্য বলল। রাজামশাই ওই বিদূষকের আত্মবিশ্বাস থেকে প্রসন্ন হলেন ঠিকই, তবে একই সঙ্গে বিষয়টা ওঁর খুবই অদ্ভুত ঠেকল। উনি তাই সেনাপতিকে ওই বিদূষকের উপর নজর রাখার নির্দেশ দিলেন।
দু’দিন পর সেই বিদূষক আবারও রাজসভায় হাজির হল এবং সেখানে উপস্থিত সকলের মুখে নানাভাবে হাসি ফোটাবার চেষ্টা করতে লাগল। বিভিন্ন হাসির ছড়া, ধাঁধা এমনকি গল্পের প্রয়োগ করেও সে কোনও সুবিধা করতে পারল না। ফলে এখন তার কপালে শাস্তির খাঁড়া ঝুলছে। অতএব ওই বিদূষক নিজেকে প্রমাণ করার জন্য রাজামশাইয়ের কাছে আরেকটা সুযোগ চেয়ে নিল এবং রাজামশাইও রাজি হয়ে তাকে আরেকটা সুযোগ দিলেন। কিন্তু এবারও সে ব্যর্থ হওয়ায় রাজামশাই তার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস কারণে রেগে গিয়ে শেষমেশ তাকে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করলেন।
সেই ঘটনার পর প্রায় বছর দুয়েক কেটে গেল, কিন্তু হরতুকি রাজ্যে আর কোনও ব্যক্তিরই আগামন ঘটল না। এদিকে রাজামশাই আর ধৈর্য ধরে রাখতে না পেরে বড্ড ভেঙে পড়লেন। উনি ভাবতে লাগলেন যে ওঁর এই শেষ আশাটুকুও হয়তো বিলীন হয়ে গেল। সুতরাং অনেক চিন্তাভাবনার পর উনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন যে রাজ্যপাঠ এবং সংসারধর্ম ত্যাগ করে উনি সস্ত্রীক এই রাজ্য ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাবেন। তারপর ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঠিক হল, সামনের পূর্ণিমার তিথিতে রাজকুমার অরুণচন্দ্রের রাজ্যাভিষেক হবে এবং তার পরদিনই রাজামশাই এবং রানিমা দু’জনেই চিরদিনের জন্য এই রাজ্য ছেড়ে চলে যাবেন।
কিন্তু এর মাঝেই ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। রাজ্যাভিষেকের দু’দিন আগে এক মাঝবয়সী ব্রাহ্মণ এসে হাজির হল রাজসভায়। সেই ব্রাহ্মণ পরিচয়সহ বললেন, “রাজামশাই, আপনার শমনে সাড়া দিতেই আমার তথা বৈদূর্য চাটুজ্যের আগমন।”
রাজামশাই আগেভাগেই তাঁকে জানিয়ে দিলেন যে এর আগে যে দু’জন এই সমস্যার কিনারা কারতে এসেছিল তাদের মধ্যে প্রথম জন প্রতারণা করে পলায়ন করেছে আর দ্বিতীয় জন উপহারের লোভে এখন কারাগারে বসে নিজের শাস্তি ভোগ করছে। ফলে নিজের কাজ সম্বন্ধে তিনি যদি দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন, তাহলে তিনি তখনই নিজের রাজ্যে ফিরে যেতে পারেন।
রাজামশাইয়ের থেকে সতর্কবাণী শোনার পর ওই ব্রাহ্মণ হাসতে হাসতে বললেন, “রাজামশাই, আমি এখানে আপনাকে সাহায্য করতেই এসেছি, কোনও পুরস্কারের লোভে নয়। সুতরাং নিজের দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হলে আপনার দেওয়া যেকোনও তিরস্কারই আমি সসম্মানে মাথা পেতে নেব।”
ব্রাহ্মণের কথা শুনে রাজা মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বললেন, “এতদিন কোথায় ছিলেন আপনি? বছর দুয়েক আগে শমন পাঠিয়েছিলাম, আর আপনি আজ আসছেন?”
উত্তরে সেই ব্রাহ্মণ বললেন, “আজ্ঞে রাজামশাই, আমি ভেবেছিলাম এতদিনে হয়তো আপনি এই সমস্যার সুরাহা করে ফেলেছেন। কিন্তু এই রাজ্যে পা দেওয়ামাত্রই বুঝতে পারছি, অসুখটা আসলে গোটা রাজ্যের মানুষের রক্তেই মিশে গেছে।” তারপর তিনি রাজামশাইকে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, আপনি একটু ভেবে বলুন তো রাজামশাই, আপনার রাজ্যে সকলেই কি দুঃখী?”
রাজামশাই একটু বিরক্তিসহ উত্তর দিলেন, “না হলে আপনার থেকে সহযোগিতা চাইছি কেন?”
আবারও ওই ব্রাহ্মণ রাজামশাইকে প্রশ্ন করলেন, “তার মানে আপনার রাজ্যে নিশ্চয়ই সকলে ধনী?”
এবার রাজা বরুণচন্দ্র বেশ গর্ব সহকারে বললেন, “হ্যাঁ! আমার রাজ্যে সবাই ধনী। এই রাজ্যে কাউকেই পরিশ্রম করে রোজগার করতে হয় না। সবার ঘরেই অত্যধিক মোহর মজুত রয়েছে। এখানে খাবারের জন্য কাউকেই কষ্ট করতে হয় না।”
এই শুনে ব্রাহ্মণ রাজামশাইকে পরামর্শ দিলেন, “রাজামশাই, আপনি আগামীকাল সকালে এক কাজ করবেন। আপনার রাজ্যের সীমান্ত অনুযায়ী সারা রাজ্য ঘুরে ঘুরে সবার বাড়ি থেকে সামান্য হলেও কিছু খাবার নিয়ে এসে আমার হাতে তুলে দেবেন এবং তারপর দেখবেন এই রাজ্যে সুখ ফিরবেই।”
রাজা বরুণচন্দ্রের মনে জাগল প্রশ্ন, কিন্তু কীভাবে?
ব্রাহ্মণ রাজামশাইয়ের মুখ দেখে তখন ওঁর মনের সেই প্রশ্নের বিষয় ঠিক বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি রাজামশাইকে বললেন, “আমি মন্ত্রের দ্বারা ওই খাবারের মাধ্যমে এই রাজ্যে সুখশান্তি ফিরিয়ে আনব। তবে আপনাকেও আমার কথা মেনে কাজ করতে হবে, রাজামশাই। একটা ঘরও যেন বাদ না যায়।”
রাজা বরুণচন্দ্র রাজ্যে সুখ ফেরাতে ওই ব্রাহ্মণের কথায় রাজি হয়ে গেলেন এবং ঠিক হল আগামীকাল সূর্যোদয়ের সঙ্গেই উনি বেরিয়ে পড়বেন এই কাজ সফলভাবে সম্পূর্ণ করতে।
পরদিন কথামতো তাই রাজা বরুণচন্দ্র রথে চড়ে সারা রাজ্য ঘুরে ঘুরে মণ্ডা-মিঠাই জোগাড় করতে লাগলেন এবং দিনের শেষে উনি যখন ফিরে এলেন তখন ব্রাহ্মণ সেই সংগ্রহ করা খাবার দেখে মুচকি হাসলেন।
রাজামশাই ওই হাসি দেখে বড্ড রেগে গেলেন এবং বললেন, “আমি এত কষ্ট করে এই খাবার সংগ্রহ করে আনলাম আর আপনি তাচ্ছিল্য করার মতো হাসছেন? ব্রাহ্মণদেব, আপনি কি আপনার কাজ ভুলে গেলেন?”
আবার সেই একইভাবে হাসতে হাসতে ওই ব্রাহ্মণ রাজামশাইকে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা রাজামশাই, আপনি কি সত্যি সবার ঘরে গেছিলেন?”
উত্তরে রাজা বরুণচন্দ্র বললেন, “হ্যাঁ, ব্রাহ্মণদেব। আমি সব ঘরেই একবার করে গেছিলাম।”
এবার ব্রাহ্মণ বৈদূর্য মাথা নেড়ে বললেন, “না রাজামশাই, আপনি অবশ্যই একটা ঘর উপেক্ষা করে গেছেন।”
রাজা বরুণচন্দ্র তো শুনেই হতবাক। উনি বলে উঠলেন, “উপেক্ষা, আর আমি?”
তখন ব্রাহ্মণ বললেন, “আপনাকে আমি ধন্দে ফেলতে আসিনি, রাজামশাই। মিথ্যে বলে আমার কোনও লাভ নেই। আর তাই আপনাকে আমি আগামীকাল সকালেই এই সমস্যার সঠিক সমাধান সূত্র ধরিয়ে দেব।”
পরদিন সকাল হতেই ব্রাহ্মণের সঙ্গে রাজা বরুণচন্দ্র ছদ্মবেশে আবারও রাজ্য পরিক্রমায় বেরিয়ে পড়লেন এবং হাঁটতে হাঁটতে তারা দু’জনে এক মাটির কুটিরের সামনে এসে পৌঁছালেন। সামনে যেতেই ওঁরা লক্ষ করলেন, এক দরিদ্র পরিবার সেখানে বসবাস করছে এবং সেই কুটিরের সামনের খালি জমিতে তারা ফসল ফলিয়ে দিব্যি তা থেকে নিজেদের খাবার জোটাচ্ছে।
সেই দেখে রাজা বরুণচন্দ্রের মনে আবারও প্রশ্ন জাগল, আমার রাজ্যে সবাই ধনী হলে এরা এল কীভাবে?
এই প্রশ্ন উনি ব্রাহ্মণকে করতেই তিনি বললেন, “আজ্ঞে রাজামশাই, এই পৃথিবীতে হাজারো বৃহৎ জিনিসের মাঝে ক্ষুদ্র থেকে অতি ক্ষুদ্রতম জিনিসও যেমন উপস্থিত রয়েছে ঠিক সেই একইভাবে এই দরিদ্র পরিবারও আপনার এই রাজ্যে হাজারো ধনীর মাঝে থেকে দিনের পর দিন এইভাবেই বসবাস করে আসছে। কিন্তু এই সামান্য পরিবার চিরকালই আপনার ধনী রাজ্যে উপেক্ষিত হয়ে এসেছে।”
ব্রাহ্মণ নিজের কথা শেষ করেই রাজা বরুণচন্দ্রেকে পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, “আচ্ছা রাজামশাই, আপনি কি গতকাল এই কুটির থেকে খাবার সংগ্রহ করেছিলেন?”
উত্তরে রাজামশাই বললেন, “না না! এরা নিজেরাই ঠিকমতো খেতে পায় কি না সন্দেহ আছে, এরা আবার আমাকে কী দেবে?”
এর উত্তর না দিয়ে ব্রাহ্মণ রাজা বরুণচন্দ্রকে বরং পরামর্শ দিলেন যাতে উনি সেই পরিবারের সকলের কার্যকলাপের উপর ভালোভাবে নজর রাখেন। রাজা বরুণচন্দ্রও ব্রাহ্মণের কথামতো ওই কুটিরের সামনে গিয়ে তাদের উপর লক্ষ রাখলেন এবং অবাক হলেন দেখে যে ওই পরিবারের সকলের মধ্যেই সুখ ভারি সুন্দরভাবে বিচারণ করছে। গরিব হলেও তারা নিজেরা নিজেদের মতো করে সকলেই খুশি।
ওই দৃশ্য দেখে রাজা বরুণচন্দ্রের মনে ঈর্ষা জন্মাল এবং উনি ফিরে এসে ব্রাহ্মণকে বেশ বিরক্তিসহ জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা ব্রাহ্মাণদেব, আমাদের এত সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও আমরা সুখী নই। আর এরা এত গরিব হয়েও কীভাবে এত হাসিখুশি থাকতে পারছে?”
মুচকি হেসে ব্রাহ্মণ বললেন, “রাজামশাই, আপনি সুখ বলতে শুধুমাত্র ধনসম্পত্তি বোঝেন। তাই সুখের দেবী আপনাদের উপেক্ষা করছে। আসল সুখ সেখানেই বিরাজমান যেখানে পরিশ্রমের দ্বারা কোনও প্রাপ্তি ঘটে।”
এই শুনে রাজা বরুণচন্দ্র রেগে গিয়ে বললেন, “কী যা তা বলছেন আপনি? গতকাল আমি এত পরিশ্রম করে সবার বাড়ি বাড়ি ঘুরে খাবার জোগাড় করলাম আর আপনি বলছেন আমি পরিশ্রম করিনি?”
এবার ব্রাহ্মণ রাজা বরুণচন্দ্রকে বুঝিয়ে বললেন, “রাজামশাই, আপনাকে সেদিন আমি সবার ঘর থেকে খাবার জোগাড় করতে বলেছিলাম, তার এর মানে এই নয় যে আপনি লোকের বানানো খাওয়ারই নিয়ে আসবেন। আপনি গতকাল যে ধরনের পরিশ্রম করেছিলেন তার বিনিময়ে কখনওই সুখ পাওয়া সম্ভব নয়।”
রাজা বরুণচন্দ্র বিমর্ষ হয়ে তখন ব্রাহ্মণকে বললেন, “কিন্তু ব্রাহ্মণদেব, আমার রাজ্যে সবাই এইভাবেই খাবার জোগাড় করে। কে আর এই রাজ্যে ফসল ফলিয়ে খাবার জোটায় বলতে পারেন?”
উত্তরে ব্রাহ্মণ বললেন, “কেন? এই দরিদ্র পরিবারই তো ফসল ফলিয়ে নিজেদের খাবার জোগাড় করে নেয়, রাজামশাই। ওরা গরিব হতে পারে, কিন্তু সততার সঙ্গে পরিশ্রম করে বলেই ওদের মধ্যে সুখ বিরাজমান। সঠিক পরিশ্রম না করলে জীবনেও সুখ মিলবে না। চিরকালই সুখের দেবী মুখ ফিরিয়ে থাকবে।”
রাজা বরুণচন্দ্র তারপর নিজের ভুল বুঝতে পেরে ব্রাহ্মণকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে গেলেন রাজভবনে এবং পরদিন উনি সকল রাজ্যবাসীর উদ্দেশ্যে ওঁর রাজসভা থেকে আদেশ জারি করলেন যাতে সেই মুহূর্ত থেকে সবাই কোনও শ্রেণিবিশেষ ভেদাভেদ না করে প্রত্যেকেই যেন যে যার মতো করে নিজেদের খাবার জোগাড় করতে দৈহিক পরিশ্রম করে। ফরমান জারি করলেন যে ভিনরাজ্য থেকে খাদ্যের সামগ্রী আর কোনওভাবেই কেনা হবে না। সুতরাং রাজ্যে আর কাউকেই বিনা পরিশ্রমে খাবার উপহার দেওয়া হবে না।
এর ফলে যা ঘটল তা বড়োই চমকে দেওয়ার মতো ঘটনা। কারণ, তিন-চারমাস পর দেখা গেল রাজামশাইয়ের সেই আদেশ অনুযায়ী সকলে ওই কাজ সততার সঙ্গে পালন করে তাদের কঠিন পরিশ্রমের দ্বারা যখন ফসল ফলিয়ে সেই দিয়ে তাদের নিজেদের খাবার জোগাড় করতে সক্ষম হল, তখন তাদের সকলের মুখেই ফুটে উঠল এক তৃপ্তির হাসি। হ্যাঁ, এই হাসি বা সুখই হল কঠিন পরিশ্রমের ফসল, যা এতদিন ধরে অধরাই ছিল হরতুকি রাজ্যে।
অবশেষে রাজা বরুণচন্দ্রসহ গোটা রাজ্যবাসী যেন এক কালো মেঘের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হল আর এর জন্য অবশ্যই ব্রাহ্মণ বৈদূর্যকে কৃতিত্ব দিতে হবে। ওই ব্রাহ্মণ হরতুকি রাজ্যে এসে সকলের চোখে আঙুল দিয়ে তাদের ভুল না দেখিয়ে দিলে হয়তো আজও সুখ অধরাই থেকে যেত।
এদিকে রাজা বরুণচন্দ্র ওঁর কথামতো সেই ব্রাহ্মণকে এক ঘড়া মোহর দিয়ে পুরস্কৃত করলেন এবং সসম্মানে তাঁকে বিদায় জানালেন।
ব্রাহ্মণ নিজের বাড়ি ফিরে গেলেন ঠিকই, তবে তার শিখিয়ে দিয়ে যাওয়া নীতি রাজা বরুণচন্দ্রসহ গোটা রাজ্যবাসীকে অবশ্যই শিক্ষা দিয়ে গেল যে পরিশ্রমের বিকল্প কিছুই হতে পারে না। মানুষ সহজে কিছু পেয়ে গেলে তার কদর করতে ভুলে যায় এবং তার কাছে তখন সুখ হয়ে ওঠে দুয়োরানি।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ পুষ্পেন মণ্ডল

No comments:

Post a Comment