গল্পঃ আমার বাড়িঃ চুমকি চট্টোপাধ্যায়


আমার বাড়ি


চুমকি চট্টোপাধ্যায়



“ওষুধের বাক্সটা নিয়েছিস, বাবু?”
“হ্যাঁ মা, ওটা আগেই ঢুকিয়ে নিয়েছি। কে জানে কেমন জায়গা। নাম শুনে তো অজ পাড়াগাঁ বলেই মনে হচ্ছে। কাছেপিঠে দোকান বাজার না থাকার সম্ভাবনাই বেশি।”
“ও বাবা! তাহলে তুই বেশি করে শুকনো খাবার সঙ্গে নিয়ে যা যতদিন না আমি যাই।”
“হ্যাঁ মা, তাও নিয়েছি। এই দেখো না ইনস্ট্যান্ট নুডল, মুড়ি, চানাচুর, বাদাম, চিঁড়েভাজা, বিস্কুট। তোমাকে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত দিব্যি চলে যাবে। আলুসেদ্ধ-ভাত ফুটিয়ে দেবার মতো কেউ একজন নিশ্চয়ই থাকবে। সেটুকু ব্যবস্থা অফিস করবে।”
“রোজ ফোন করবি কিন্তু বলে দিলাম বাবু। আমি নাহলে ভয়ানক চিন্তা করব।”
মাকে জড়িয়ে ধরে চিরন্তন বলে, “যথা আজ্ঞা, মাতৃদেবী। আমি রোজ রাতে তোমাকে ফোন করব। তুমি চিন্তা করাটা একটু কমাও। চিন্তা করে কোনও সমস্যার সমাধান হয় না, বুঝলে মাদার?”
ক্ষুদ্র সঞ্চয় প্রকল্পে কাজ করে চিরন্তন। এতদিন তাও মায়ের অসুস্থতার দোহাই দিয়ে চুঁচুড়াতে নিজেদের বাড়িতে ছিল। কিন্তু এইসব চাকরিতে মফস্বল বা গ্রামেই কাজ বেশি হয়। এবার আর বদলি আটকানো গেল না। চিরন্তনের বদলি হল কুচবিহার জেলার দিনহাটা থেকে বারো কিলোমিটার ভেতরে কিসামত দশগ্রাম নামে এক গ্রামে। আর জায়গা পেল না! নাম শুনে এমনটাই মনে হয়েছিল চিরন্তনের। করার কিছু নেই, চাকরি বাঁচাতে যেতেই হবে।
ঠিক হয়েছে, ওখানে পৌঁছে মোটামুটি গুছিয়ে মাকে নিয়ে যাবে চিরন্তন। এখানে মা একা থাকবে এটা একটা দুশ্চিন্তা ছেলের।

চিরন্তন পৌঁছে গেছে ওর কাজের জায়গায়। অফিসে গিয়ে সিনিয়রের সঙ্গে দেখা করতেই তিনি খুব ভালোভাবে অভিনন্দন জানালেন চিরন্তনকে। নাম সত্যেন্দ্র পাঠক। দিনহাটা প্রপারে ফ্যামিলি নিয়ে থাকেন। বাচ্চাদের স্কুলের জন্যে কিসামতে থাকতে পারেন না।
কাজকর্ম বুঝিয়ে দেবার পর চারু বলে কাউকে ডাকলেন। চারু এল। মধ্য পঞ্চাশে বয়েস হবে দেখে যা মনে হয়। এসে হাতজোড় করে দাঁড়াল।
“চারু, ইনি আমাদের নতুন অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার, চিরন্তন দত্ত। এখনও ফ্যামিলি হয়নি। আপাতত একাই থাকবেন। তোমার জিম্মায় দিয়ে দিলাম। সব দেখাশোনা তুমি করবে। যা কিছু বলার, বোঝাবার, বুঝিয়ে দিও। যাও, ওঁর মালপত্র বাড়িতে নিয়ে যাও।
“যান ভাই চিরন্তন। চারু আপনাকে সব বুঝিয়ে দেবে। রান্নাবান্না, ঘর ঝাড়পোছ, বাসন সাফ, সব ওই করবে। কাল থেকে অফিস ডিউটি শুরু। আজ বিশ্রাম নিন।”
বাইরে বেরিয়ে চিরন্তন দেখল একটা ফ্ল্যাট ভ্যান-রিক্সায় ওর মালপত্র রেখে অপেক্ষা করছে চারু। ওকে দেখতে পেয়েই বলল, “ছোটোসাহেব, আপনিও উঠে পড়ুন ভ্যানে। এখান থেকে দেড় কিলোমিটার গেলেই আপনার বাসা। আমি পেছন পেছন যাচ্ছি।”
“আরে তুমি হেঁটে কেন যাবে? ভ্যানে যথেষ্ট জায়গা আছে। তুমিও উঠে পড়ো, চারুদা।”

একতলা একটা বাড়ির সামনে এসে থামে ভ্যান। নিচু একটা লোহার গেট ভেজানো। আটকাবার হুকটা নেই। গেটের পাশের শ্যাওলা ধরা দেওয়ালে একটা ফলকে কিছু একটা লেখা। কাছে গিয়ে চোখ কুঁচকে মলিন হয়ে যাওয়া ফলকটা দেখতে পায় চিরন্তন। লেখা, ‘আমার বাড়ি’।
লাফিয়ে ভ্যান থেকে নামে চারু। ভ্যানওয়ালাকে সাহায্য করতে বলে চিরন্তনকে ডাকে, “আসুন ছোটোসাহেব।”
ভাড়া ট্যাঁকে গুঁজতে গুঁজতে ভ্যানওয়ালা জিগ্যেস করে, “এই বাড়িটা থেকে একটা বাবু হারিয়ে গেছিল না? সে বাবুকে পাওয়া গেছিল?”
চারু কোনও উত্তর না দিয়ে চটপট ঢুকে যায় ভেতরে। চিরন্তন কিছু বুঝতে না পেরে চারুর পেছন পেছন ঢুকে পড়ে বাড়িতে। পরে শোনা যাবে কী হয়েছিল।
বেশ পুরনো বাড়ি। দেওয়ালগুলো নোনা ধরা। দুটো ঘর পাশাপাশি। একটা ছোটো ডাইনিং স্পেস। তার একদিকে রান্নাঘর আর উলটোদিকে বাথরুম। বাড়ির পেছনদিকে একচিলতে বারান্দাও আছে জামাকাপড় মেলার জন্যে। অযত্নের ছাপ সব জায়গায়।
“আচ্ছা চারুদা, আমার আগে যিনি ছিলেন, তিনি এখানেই থাকতেন?”
“না, সাহেব। ওঁর ফেমিলি ছিল। তাই উনি দিনহাটা শহর থেকেই যাওয়া আসা করতেন।”
“তাহলে এখানে অনেকদিন কেউ থাকেনি, তাই তো?”
“আগের সাহেবের আগে যিনি ছিলেন, ও-বাবু এখানে থাকতেন।”
ভ্যানওয়ালা কী যেন বলছিল, চারু দ্রুত ঢুকে যায় বাথরুমে। কল-টল খুলে দেখে নিতে থাকে সব ঠিকঠাক আছে কি না।

সন্ধে নেমেছে। চারু বাজার করে এনেছে। এবার রান্না বসাবে। আলুসেদ্ধ, ডিমসেদ্ধ আর ভাত করে দিতে বলেছে চিরন্তন। সরষের তেল আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে মেখে খেতে, আহা, অমৃত! মার কথা মনে পড়ল চিরন্তনের। ফোন তুলে মার নম্বরে আঙুল ছোঁয়ায়।
“খাবার হয়ে গেছে, ছোটোসাহেব। টেবিলে দিয়ে দেব?”
মাথা নেড়ে সায় দিয়ে রান্নাঘরের বেসিনে হাত ধুতে ঢোকে চিরন্তন। ডাইনিং রুমটায় একটা অসুবিধে হচ্ছে, এখানে কোনও বেসিন নেই। হাত ধুতে হলে হয় বাথরুমে, নয় রান্নাঘরে যেতে হবে।
হাত ধুয়ে চলে আসার সময় তাকের আড়ালে একদলা আলু-ডিম দিয়ে মাখা ভাত দেখতে পায় চিরন্তন। নিশ্চয়ই পোষা বেড়াল আছে চারুদার, ভেবে বেরিয়ে আসে।
সব গুছিয়ে দিয়ে এমনকি বিছানা পেতে, পাশে জল রেখে চারু এসে বলে, “ছোটোসাহেব, আমি তাহলে আসি। সকাল সাতটার মধ্যে চলে আসব। রাতে আপনার যা যা লাগতে পারে সবই আমি বিছানার পাশে রেখে গেলাম। আপনাকে আর উঠে খুঁজতে হবে না।”

চারুর যত্নে দিব্যি দিন কাটতে লাগল চিরন্তনের। মাকে নিয়ে আসারও সময় হয়ে আসছে। এখানে তো টিভি নেই। সন্ধের পর মার সময় কাটানোটা একটু মুশকিল হবে। গল্পের বইয়ের জোগান দিতে হবে ভালোমতো।
আজ সকালে চিরন্তন দেখেছে চারুর শরীরটা বিশেষ ভালো নেই। গায়ে জ্বর আছে। তাও এসে ওর সব কাজ করে দিচ্ছে। শুকনো মুখটা দেখে চিরন্তন বলল, “চারুদা, রান্না হয়ে গেলে তুমি চলে যাও বাড়ি। বিশ্রাম করো। রাতে আমি নুডল বানিয়ে খেয়ে নেব। অনেক আছে আমার কাছে। তুমি ভেবো না।”
অনেক বলার পর রাজি হল চারু৷ যাবার সময় বলল, “ছোটোসাহেব, একটা কথা বলব, রাগ করবেন না তো?”
“আরে, রাগ কেন করব? বলো না কী বলবে।”
“আপনি যা বানাবেন তার থেকে এক হাতামতো ওই তাকের পাশে যদি রেখে দেন তো খুব ভালো হয়।”
“ও আচ্ছা, এই কথা! হ্যাঁ, আমি লক্ষ করেছি তুমি রোজই যা রান্না করো তার কিছুটা ওখানে রেখে দাও। পোষা বেড়াল আছে নাকি তোমার? কিন্তু আওয়াজ তো পাইনি একদিনও! বেড়াল ডাকবে না তা কি হয়?”
চারু অদ্ভুত হেসে বলে, “আছে আমার পোষা একজন। খুব মাথা যন্ত্রণা করছে, সাহেব। আমি তাহলে আসি। ও, আরেকটা কথা সাহেব। যদি কখনও কোনও খাবার রান্নাঘরের মেঝেতে পড়ে যায়, তুলবেন না।”
চিরন্তন ধরে নেয় আরশোলা, টিকটিকি বা অন্যান্য পোকামাকড় ঘোরাঘুরি করে বলে চারুদা এই কথা বলছে। চারু চলে যায়।
ইনস্ট্যান্ট নুডলের দুটো প্যাকেট নিয়ে রান্নাঘরে ঢোকে চিরন্তন। অনভ্যস্ত হাতে নুডল বানাতে গিয়ে খানিক খানিক মেঝেতে পড়ে। আফসোস হলেও তোলে না সেগুলো। একে তো পোকামাকড় ঘোরে, তার ওপর চারুদা বলে গেছে পড়া খাবার না তুলতে।
একটা ডিম পোচ করে সবসুদ্ধু শোবার ঘরে নিয়ে এসে আরাম করে খাটে হেলান দিয়ে বসে খেতে শুরু করে চিরন্তন। দু’চামচে মুখে তুলতেই মনে পড়ে যায়, তাকের পাশে নুডল রাখা হয়নি। উঠে রান্নাঘরে গিয়ে খানিকটা নুডল রেখে আসে চিরন্তন। বেরিয়ে আসার সময় চোখে পড়ে যে দু-চারটে স্ট্র্যান্ড মেঝেতে পড়েছিল, সেগুলো নেই। পোকামাকড়গুলো তো হেভি ফাস্ট! পড়তে না পড়তেই খেয়ে সাফ! মনে মনে ভাবে চিরন্তন।

উমাদেবীকে নিয়ে চলে এসেছে চিরন্তন। মা এসে যাওয়াতে একটা আলাদা সুখের অনুভূতি বোধ করে ও। চারুদার যত্ন সত্ত্বেও কোথাও যেন একটা খামতি থেকেই যাচ্ছিল। এখন নিশ্চিন্ত। চারুদার কাজও একটু হালকা হয়েছে কারণ, উমাদেবী রান্নাঘরের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছেন।
সেদিন রান্না করছিলেন উমাদেবী। ছেলের পছন্দের আলুপোস্ত। কড়াই থেকে গামলায় ঢালতে গিয়ে বেশ খানিকটা পড়ে যায় মেঝেতে। তাড়াতাড়ি করে তুলে নিয়ে ফেলে দিতে যান কিন্তু তুলতে গিয়ে মনে হয় মেঝে যেন শুষে নিচ্ছে ধীরে ধীরে আলুপোস্ত। উমাদেবীর খটকা লাগে। ভাবেন, অদ্ভুত তো! কী দিয়ে তৈরি মেঝে, যে ঘন জিনিসও শুষে নিচ্ছে! যদিও চারুর কথা অনুযায়ী উমাদেবীও কিছুটা খাবার রেখে দেন তাকের পাশে। সকালে উঠে দেখেন সেই খাবার থাকে না।
“মা, তোমার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো এখানে? টিভি নেই, সন্ধে থেকে সময় কাটানো মুশকিল, তাই না?”
“না রে বাবু। আমার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না। দিব্যি গল্পের বই পড়ছি আর নতুন নতুন রান্নার প্ল্যান করছি। আচ্ছা বাবু, একটা কথা বল তো। এই যে তাকের পাশে খাবার রাখা হয় দু’বেলা, সেটা খায় কে? কোনও পশুপাখি তো ঢুকতে দেখি না।”
“জানি না, মা। তবে ওইটুকু খাবার রাখলে যদি কোনও ঝামেলা না হয় তো ওই নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই।”
উমাদেবী মুখে কিছু না বললেও মনে মনে ঠিক করে নিলেন, আজ রাতে তাকের পাশে কিছু রাখবেন না। দেখা যাক কী হয়। কিছু একটা গণ্ডগোল আছে যেটা চারু জানে কিন্তু বলছে না।
উমাদেবী আর চিরন্তন রাতের খাবার খেয়ে, গল্পগাছা করে শুয়ে পড়ল। রাতে উমাদেবী স্বপ্ন দেখলেন, রান্নাঘরে তাকের পাশে যেখানে খাবার দেওয়া হয় সেখানে একটা সাদাটে শীর্ণ হাত যেন মেঝে ফুঁড়ে বেরিয়ে কিছু খুঁজছে। ঘুম ভেঙে ধড়মড় করে  উঠে বসলেন তিনি। ঘেমে গেছেন। উঠে জল খেলেন। স্থির হয়ে খানিক বসে ভাবলেন, খাবার রাখিনি বলে অবচেতনে নিশ্চয়ই দ্বিধা ছিল। তাই এমন উলটোপালটা স্বপ্ন দেখেছি। বাবুকে এসব কথা বলব না।

আজ চিরন্তনের শরীরটা বিশেষ ভালো নেই। মাথা-যন্ত্রণা আর গা ম্যাজম্যাজ করছে। উমাদেবী আজ খিচুড়ি করেছেন ছেলের জন্যে। আজও দু’বেলাই তাকের পাশে খাবার রাখলেন না উমাদেবী।
মাঝরাত্রে আঁ আঁ আঁ চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল চিরন্তনের। মা! মার কী হল? ছুট্টে পাশের ঘরে গিয়ে দেখে, উমাদেবী খাটের ওপর বসে হাঁপাচ্ছেন। তাড়াতাড়ি মায়ের পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় চিরন্তন।
“কী হয়েছে, মা? শরীর খারাপ লাগছে?”
দু’পাশে মাথা নাড়েন উমাদেবী।
“তাহলে? ভয়ের স্বপ্ন দেখেছ কোনও?”
চিরন্তনকে প্রাণপণ জাপটে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন উমাদেবী।
“আরে, কী হয়েছে বলো! কাঁদছ কেন?”
“ও তোকে খেয়ে নেবে বলল।”
“আমাকে? কে খেয়ে নেবে!”
“একটা সাত-আট বছরের ছেলে। ফ্যাকাশে চেহারা, এসে বলল, “খেতে দিচ্ছ না তো? আমার খিদে পাচ্ছে খুব। খেতে না দিলে তোমার ছেলেকে খেয়ে নেব যেমন আগের লোকটাকে খেয়েছি। এটা আমার বাড়ি। বাবু-উ-উ, আমার ভয় করছে। এখানে অশুভ কিছু আছে। তুই বদলি নিয়ে নে।” কাঁদতে কাঁদতে বলেন উমাদেবী।
পরের দিন চারু আসতেই উমাদেবী চেপে ধরলেন। “চারু, আমি তোমার মায়ের মতো। সত্যি করে বলো তো, এখানে কী ঘটেছিল। কার জন্য খাবার রাখা হয়? বলতেই হবে তোমাকে। আমি বুঝেছি, কিছু একটা ব্যাপার আছে।”
চিরন্তনও এসে দাঁড়িয়েছে সেখানে।
বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে চারু বলে, “মা, আমি নিজের চোখে কিছু দেখিনি। সবটাই শোনা। যেটুকু জানি, বলছি।
“এই বাড়িটা জলাজমি বুজিয়ে তৈরি হয়েছিল। বাড়ি যে করেছিল সে পরিবার নিয়ে থাকত। সেবার বন্যা হয়। এই বাড়ির রান্নাঘরের মেঝে বসে যায়। হয়তো ভিতে কোনও গোলমাল ছিল। রান্নাঘরে বসে তখন সেই বাড়ির ছোটো ছেলে খাচ্ছিল। বছর সাত-আটেকের ছেলে। সে ঢুকে যায় মাটির তলায়। অনেক চেষ্টা করেও তাকে উদ্ধার করা যায়নি।
“তারপর অনেককাল এই বাসায় থাকত না কেউ। কিন্তু অফিসবাবুদের অসুবিধে হচ্ছিল বলে সারাই-সুরাই করিয়ে ঠিক করা হল। কিন্তু দেখা যেত, রান্নাঘরের মেঝেতে খাবার পড়লে তা উধাও হয়ে যেত। পড়া খাবার তুলে নিলে নানান অঘটন ঘটত। তারপর থেকে কোন এক সাহেবগিন্নি খাবার রাখার নিয়ম চালু করেছিল। তারপর থেকে যারাই আসে, আমি হোক কি অন্য কেউ, নিয়মটা বলে দিই। তাতে সব ঠিক থাকে। কেন মা, কিছু হয়েছে?”
“না, কিছু হয়নি। কৌতূহল হল, তাই জিগ্যেস করলাম।
এরপর থেকে চারবেলা খাবার রাখেন উমাদেবী। খাবার রেখে মনে মনে বলেন, ‘আয় বাছা, খেয়ে যা।’ একটু হাতও বুলিয়ে দেন মেঝেতে। তারপর সরে আসেন। উনি থাকলে যদি না খেতে আসে বাচ্চাটা।

এক রাতে স্বপ্ন দেখলেন উমাদেবী। বাচ্চাটা এসেছে। হাসিহাসি উজ্জ্বল মুখচোখ। বলছে, “তুমি খুব ভালো। কত ভালো খেতে খাবারগুলো। তুমি কিন্তু এখান থেকে চলে যেও না। তাহলে আমি আর ভালো খেতে পাব না। তোমাকে একটা হামি দিলাম।”
ঠান্ডা একটা স্পর্শ যেন অনুভব করলেন গালে।
পরদিন ঘুম থেকে উঠে উমাদেবী চিরন্তনকে বললেন, “এখানেই থেকে যা, বুঝলি বাবু। জায়গাটা খুব স্বাস্থ্যকর। আমার তো মন বসে গেছে।”
অবাক হয় না চিরন্তন। কারণটা ওর জানা। আপাতত বছর তিনেক তো আছেই এখানে। তারপর দেখা যাবে।
দিনগুলো নির্বিঘ্নে, নিরুপদ্রবে কাটতে লাগল মা-ছেলের। উমাদেবী যেন একটু বেশিই রান্নাবান্নায় মনোযোগী হয়ে পড়েছেন আজকাল। অচেনা দুনিয়ার অতিথির স্বপ্নে আসার অপেক্ষায় থাকেন।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ জুরান নাথ

4 comments:

  1. মন ছুঁয়ে যাওয়া একটা গল্প ...

    ReplyDelete
  2. আবার আরেকটা ভালো গল্প।

    ReplyDelete
  3. Didibhai, ekei bole jadur chonwa. Abar porbo. Ekbare pora holo, Mon bhorlo na. Onek Bhalobasha!!

    ReplyDelete
  4. দারুণ গল্প তো! অদ্ভূত ভালো লাগল।

    ReplyDelete