গল্পঃ নিশানা নির্বাচনঃ কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়




বছরের প্রথমদিন। সকালের রোদটা বড়ো মিষ্টি। সেই সঙ্গে হালকা একটা শিরশিরে হাওয়া। স্কুল তো ছুটি, তাই সানু সকালেই বেরিয়ে পড়েছিল তীর্থদার কাছে যাবে বলে। এইসব দিনগুলোয় সকালে একবার তীর্থদর্শন না করলে হয় না।
বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকলে ছোট্ট একটা লন। সেই লন পেরিয়ে তিনটে স্টেপ সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই বারান্দা আর সদর দরজা। ঠিক পাশেই বাড়ির লাগোয়া যে গ্যারেজটা আছে, তার ওপরে মেজানাইন ফ্লোরেই তীর্থদার নিজস্ব ঘরটা, যা তীর্থদার ভাষায় তার সাম্রাজ্য।
সানু সেই ঘরে ঢুকেই বুঝল, তীর্থদা আজ দারুণ মুডে আছে। কারণ, ও ঘরে ঢুকতেই তীর্থদা চোখ তুলে তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে মুচকি হেসে বলল, “আয়। তোর কথাই ভাবছিলাম। কাল খুব কপালজোরে বইটা পেয়ে গেছি, বুঝলি? সেই যে রে, চ্যাপলিনের “My Autobiography”, তোকে পড়াব বলেছিলাম না?”
কথাটা বলতে বলতেই তীর্থদার ভুরু কুঁচকে যায়। গম্ভীর হয়ে বলে, “দ্যাখ সানু, তোর জানা আছে যে, ফালতু হুজুগ আমার সহ্য হয় না, তবুও তুই কী বলে ওখানে আমায় খুঁজতে গেলি?”
সানু থ। তীর্থদা জানল কী করে? এখান থেকে তো রাস্তার মোড়টা দেখা যায় না! জিজ্ঞাসু চোখে তীর্থদার দিকে তাকাতেই তীর্থদা নির্বিকার মুখে বলল, “তোর পায়ে সুরকির গুঁড়ো লেগে আছে। মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে দেখলাম, যেখানে অনুষ্ঠান হবে তার চারপাশে কিছুটা জায়গা জুড়ে ওরা সুরকি ফেলেছে।”
সানু চমকে নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, “আরে!”
আসলে আসবার পথেই ঘটনাটা ঘটেছে। বড়ো রাস্তা থেকে যে গলিতে ঢুকলে তীর্থদার বাড়ি, সেই গলির মোড়ে এসে সানু দেখেছিল, একসঙ্গে বেশ কিছু লোক ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। কাঠের পাটা দিয়ে একটা উঁচু মঞ্চ তৈরি হচ্ছে। মনে হয় নববর্ষ পালন গোছের কিছু হবে। উদ্যোক্তা বোধহয় লোকাল ক্লাব।
সানু চলেই আসছিল, তবে তীর্থদা এখানে যদি এসে থাকে, এই ভেবে ভিড়ের মধ্যে একবার উঁকি দিল। না, তীর্থদা ওখানে নেই। তাই অ্যাবাউট টার্ন করে সোজা তীর্থদার বাড়ি। কিন্তু তার এই একবারের ঢুঁ মারাটাই তীর্থদার অব্যর্থ অবজারভেশনে ধরা পড়ে যাবে কে জানত!
সানু মনে মনে একটা সেলাম ঠুকে তীর্থদাকে বলল, “মাঝে মাঝে তুমি এমন চমকে দাও না!”
তীর্থদা হেসে বলল, “শোন, আসলে আমরা মানুষরা খুব কুঁড়ে। সহজ জিনিসগুলো চোখে পড়লেও তার সঙ্গে চিন্তাশক্তিটাকে ব্যবহার করি না। তাই দুয়ে দুয়ে চার করে সহজ অঙ্ক মিলিয়ে দিলেই চমকে উঠতে হয়।”
এই হল তীর্থদা। মানে সুতীর্থ সান্যাল। ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেও বাঁধাধরা চাকরি করল না। শুরু করল কম্পিউটার নিয়ে পড়াশোনা। তারপর সফটওয়্যার ডেভেলপিং নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে এখন নামকরা কন্সালট্যান্ট। ওর আইডিয়া এখন ভালো ভালো দামে বিক্রি হয়। তাই এরকম সুন্দর একটা কাজের পাশাপাশি ও মনের সুখে নিজের পড়াশোনা আর শখ নিয়ে কাটাতে পারে। আর যেহেতু ওর সব কাজের পেছনেই লুকিয়ে থাকে একটা যুক্তিশীল অনুসন্ধানী মন, তাই যুক্তি দিয়ে যেকোনও ধরনের রহস্যের উত্তর খোঁজা ওর একটা প্রিয় খেলা।
তীর্থদার কথার উত্তরে সানু কী যেন বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তে হঠাৎ দূর থেকে একটা প্রবল হৈ হৈ চিৎকার শোনা গেল। বহু লোক হঠাৎ একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলে যেমন শব্দ হয়, সেইরকম। ছিটকে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়িতে পা রাখল সানু। পরমুহূর্তে তীর্থদা, গায়ে একটা আধা গলানো টি-শার্ট। চিৎকারটা তখনও শোনা যাচ্ছে। ব্যাপারটা বোধহয় বড়ো রাস্তায়।
গলির মোড়ে এসেই ওরা দেখল, জায়গাটা ফাঁকা। মঞ্চটা তখনও পুরো তৈরি হয়নি। শুধু চারদিকের খুঁটি পুঁতে কাঠের পাটাতন লাগানো হয়েছে। কাপড় দিয়ে সাজানোর কাজ চলছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে কেউ কোথাও নেই। শুধু একটা বেঁটেমতো লোক একপাশে উবু হয়ে বসে কী যেন করছে। সানুর মনে হল, ওদের দেখেই লোকটা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে তার বাঁহাতটা বাড়িয়ে দূরের দিকে কী যেন দেখাল। ওরা তাকিয়ে দেখে, সেদিকে প্রচুর লোকের ভিড়। তার মানে ওদিকেই কিছু একটা হয়েছে মনে হয়।
তীর্থদা সানুর পিঠে একটা হাত রেখে বলল, “চল।”
মনে হল, তীর্থদার কন্ঠে যেন একটা ঠান্ডা ধাতব শব্দ বেজে উঠল। সানু মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল। তার মানে তীর্থদা কি কোনও অসঙ্গতি খুঁজে পেল? ভাবার সময় পেল না সানু। ততক্ষণে ওরা পৌঁছে গেছে ঘটনাস্থলে। কিন্তু তার মধ্যেই দুটো জিনিস সানু লক্ষ করে ফেলেছে। লোকটার ডানহাতে একটা ভারী কালোমতো থলে, আর যে হাতটা সে তুলে ধরেছিল, সেই বাঁহাতের কড়ে আঙুলটা নেই।
ঘটনাটা সামান্য। একটা অ্যাক্সিডেন্ট। একটা মারুতি গাড়ি পথচলতি একজন লোককে ধাক্কা মেরে পালিয়েছে। খুব গুরুতর কিছু হয়নি। তবে লোকটা বেশ আহত হয়েছে। সময়টা সকাল, রাস্তাটাও মোটামুটি ফাঁকা, তাই সহজেই গাড়িটা পালাতে পেরেছে।
আহত লোকটিকে ঘিরে ছিল সবাই। কেউ কেউ তার ঘাড়ে মাথায় জল দিচ্ছিল। লোকাল হাসপাতালে নিয়ে যাবার তোড়জোড়ও করছিল কেউ কেউ। সকলেই উত্তেজিত। তারই মধ্যে একজনের কথা কানে আসতে চমকে উঠল সানু। রোগা চেহারার ভদ্রলোকটি বেশ হাত-ফাত নেড়ে বলছিলেন, “আরে, আমি তো তখন রাস্তার ও-ফুটে! মনে হল, গাড়িটা প্রায় ইচ্ছে করেই লোকটাকে ধাক্কা মারল। সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটার নাম্বার টুকে নেব বলে তাকিয়ে দেখি, গাড়িটার কোনও নাম্বার-প্লেটই নেই! আর ধাক্কা মারার সঙ্গে সঙ্গেই যেন চোখের পলকে গাড়িটা মিলিয়ে গেল!”
কথাটা শুনেই সানু তীর্থদার দিকে তাকিয়ে দেখে, তার চোখ কুঁচকে গেছে, কপালে দুটো খাঁজ। তার মানে কথাটা তারও কানে গেছে, আর সে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছে। সেই মুহূর্তে সানু আর ঘাঁটাতে সাহস পেল না তীর্থদাকে।
ফেরার সময় দেখা গেল, স্টেজটার কাছে ক্লাবের ছেলেগুলো আবার ফিরে এসেছে। তবে সেই বেঁটে লোকটাকে এখন আর কোথাও দেখা গেল না। কথাটা তীর্থদার কানে তুলতেই তীর্থদা বললো, “বলিস কী রে? তাহলে তো…” বলে সে তাড়াতাড়ি ভিড়ের মধ্যে চোখ চালিয়ে বোধহয় লোকটাকে খোঁজার চেষ্টা করল।
কিন্তু লোকটা উধাও। তবুও তীর্থদা কী দেখে যেন একবার নিজের অজান্তেই ভ্রূদুটো কুঁচকে ফেলল। তারপর গম্ভীর হয়ে পা চালাল বাড়ির দিকে। সানুও বাধ্য হয়ে তীর্থদার পেছন পেছন চলল।
নিজের ঘরে ঢুকেও তীর্থদা তেমনই গম্ভীর। সানু কিছুক্ষণ চুপ করে ঘরের এ-ধার ও-ধার ঘুরে বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করল। তারপর আজ আর জমবে না বুঝে বলল, “তীর্থদা, বাড়ি যাই, বুঝলে? কই, বইটা দাও।”
তীর্থদা কোনও কথা না বলে চ্যাপলিনের বইটা বার করে সানুর হাতে তুলে দিল। তারপর হঠাৎ কী মনে হতে বলল, “আজ সন্ধেবেলা এখানে আসিস। একটা ফাংশানমতো হবে। শুনছি দু’জন ভালো আর্টিস্ট আসছেন গান গাইতে। গ্যালাক্সি বলে ব্যান্ডটাও আসছে। সঙ্গে লোকাল শিল্পীরা তো থাকছেই। ও হ্যাঁ, সিরিয়ালের হিরোইন মোহনা মিত্র বিশেষ অতিথি হয়ে আসবেন, আর প্রধান অতিথি নাকি চঞ্চল মজুম…”
বলতে বলতে তীর্থদা থেমে গেল। সানু তাকিয়ে দেখে, তীর্থদার দু’চোখ বিস্ফারিত, ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ছে। “মাই গড!” বলেই তীর্থদা এক লাফে ওয়ারড্রবের কাছে চলে গেল। এক মিনিটের মধ্যে প্যান্ট-শার্ট পরে রেডি। দরকারি কয়েকটা জিনিস পকেটে ঢুকিয়ে নিল। তারপরেই সানুর দিকে তাকিয়ে বলল, “এখন তুই বাড়ি চলে যা। ঠিক সাড়ে চারটের সময় ঐ স্টেজের কাছে দেখা করিস। মনে থাকে যেন, সাড়ে চারটে।”
এই বলে সানুকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সোজা বেরিয়ে গেল বাইরে।
সানু তখনকার মতো বাড়ি চলে এল বটে, কিন্তু কিছুতেই স্থির হতে পারছিল না। কীসের একটা রহস্যের যেন আভাস পাচ্ছিল সে। তীর্থদা ওরকম হঠাৎ কোথায় চলে গেল, কেনই বা গেল, এসব প্রশ্নের কোনও সদুত্তর না পাওয়া পর্যন্ত মনটায় যেন শান্তি নেই। যদিও সে জানে, তীর্থদা নিজে থেকে মুখ না খুললে এর কোনও উত্তর সানুর পক্ষে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।

দুপুরে খেয়েদেয়ে তীর্থদার কাছ থেকে আনা বইটা নিয়ে বিছানায় পিঠ ঠেকাল সানু। কিন্তু বইতে মন বসাবে ওর সাধ্য কী? নানারকমের প্রশ্ন আর কৌতূহলে মন তো আচ্ছন্ন হয়ে আছে। তাই গোড়া থেকে আবার গোটা ব্যাপারটা ভাবতে বসল সানু। ওর মন বলছিল, একটা রহস্য নিশ্চয়ই কোথাও লুকিয়ে আছে, তীর্থদা যার কিছুটা আভাস অন্তত পেয়েছে। সমস্ত ঘটনা ভাবতে ভাবতে ওর দুটো জায়গায় খটকা লাগল। প্রথমত, ঐ বেঁটে লোকটা কে? ও কি ওই ক্লাবেরই কেউ? নাকি বাইরের কোনও লোক? কিন্তু বাইরে থেকে কেউ এসে ওখানে কিছু করতে যাবে কেন? আর লোকটা করছিলই বা কী?
দ্বিতীয় খটকা এই যে, হঠাৎ একটা গাড়ি এসে ইচ্ছে করে একটা লোককে ধাক্কা মেরে পালিয়ে যাবে কেন? নিশ্চয়ই সেই লোকটির ওপর গাড়ির চালকের ব্যক্তিগত কোনও আক্রোশ ছিল, তাই ধরা পড়ার ভয়ে গাড়ির নাম্বার-প্লেট খুলে নিয়ে এসে ধাক্কা মেরে চলে গেছে। এছাড়া তো আর কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে তীর্থদাই বা এমন উদভ্রান্তের মতো হঠাৎ কোথায় চলে গেল? কেনই বা গেল?
ভাবতে ভাবতে কখন ওর দু’চোখ জড়িয়ে এসেছে সানু জানে না। হঠাৎ ঘুমের চটকা ভাঙতেই ধড়মড় করে উঠে বসল বিছানায়। ঘড়ির দিকে চোখ গেল। পৌনে চারটে। আর দেরি সইছিল না, চটপট উঠে গায়ে জামা গলাল সানু।
মোড়ে পৌঁছে দেখে এলাহি কাণ্ড। স্টেজ কমপ্লিট। মাইক, আলো সব ফিট করা হয়ে গেছে। স্টেজের ওপর বড়ো বড়ো সাউন্ড বক্স, ডিজে এইসব সাজানো। ক্লাবের ছেলেরা ব্যস্ত পায়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। কেউ একজন মাইকে ওয়ান-টু-থ্রি এইসব বলে মাইক টেস্টিং করছে। সাড়ে চারটে বাজতে এখনও দেরি আছে দেখে সানু পায়ে পায়ে আশেপাশে ঘুরতে লাগল।
আনমনে ঘুরতে ঘুরতে কখন স্টেজের পিছনদিকটায় চলে গিয়েছিল সানু। এদিকটা একেবারে ফাঁকা। ক্লাবের ছেলেরা সবাই স্টেজের সামনের দিকেই হৈ-হল্লা করছে, এখানে কেউ নেই। আর ঠিক সেই সময় একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখে ওর পাদুটো গেঁথে গেল মাটিতে। স্টেজের পিছনদিকের কাপড় সরিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে স্টেজের পিছন থেকে বেরিয়ে আসছে একটা লোক। এ কে? খুব চেনা মনে হচ্ছে যেন! পরমুহূর্তেই সানু চিনে ফেলল তাকে। এ তো সেই সকালের বেঁটেমতো লোকটা! যদিও তার মুখে এখন একগাদা দাড়িগোঁফের জঙ্গল, কিন্তু ওকে চিনিয়ে দিল ওর সেই বাঁহাতের কাটা কড়ে আঙুল।
লোকটা বোধহয় ভাবতে পারেনি এখানে কাউকে দেখবে, তাই সানুকে দেখেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে প্রাণপণে দৌড় দিল পেছনের সরু গলিটা বেয়ে। সানুও ঘটনার আকস্মিকতায় এমনই হকচকিয়ে গিয়েছিল যে কিছুক্ষণ থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপরেই ছুট দিল লোকটার পেছন পেছন। কিন্তু কোথায় কে? সরু গলিটা গিয়ে একটা জলামতো জায়গায় পড়েছে। তারপরেই গাছপালা-ঘেরা মাঠ। তার ভেতর লোকটা এরমধ্যেই কোথায় হাওয়া হয়ে গেল কে জানে।
অগত্যা সানু আবার ফিরে এল সেই জায়গায়। আর তারপরেই ওকে চমকে দিয়ে স্টেজের তলা থেকে এবার বেরিয়ে এল তীর্থদা! সানু হতবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। তীর্থদা কবজি উলটে ঘড়ি দেখে বলল, “চারটে আঠাশ। টাইমিংটা একবার ভাব।”
সানু হাঁ করেই ছিল। কোনওরকমে বলল, “তুমি স্টেজের তলায় কী করছিলে? ঐ লোকটাই বা কে, যে তোমার আগেই ওখান থেকে বেরিয়ে পালিয়ে গেল?”
তীর্থদা কোনও জবাব দিল না। শুধু বিড়বিড় করে বলল, “ব্যাপারটা এত ঘোরালো, অথচ ওরা এত ক্যাজুয়াল হবে এটা…” পরের কথাগুলো এত আস্তে যে সানু কিছু শুনতেই পেল না। প্রশ্ন করেও কোনও লাভ নেই, সানু জানে। তীর্থদা এবার গম্ভীর গলায় ওকে বলল, “সানু, মন দিয়ে শোন। মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট একটা কাজের ভার দিচ্ছি তোকে। ঠিকমতো না করতে পারলে সব গুবলেট হয়ে যাবে কিন্তু।” বলে খুব সংক্ষেপে তীর্থদা সানুকে বুঝিয়ে দিতে লাগল কী করতে হবে না হবে।

দেখতে দেখতে কেটে গেল উৎকন্ঠাময় দুটি ঘন্টা। সাড়ে ছ’টায় ফাংশন শুরু হবার কথা। ছ’টা চল্লিশে পর্দা উঠল। লোকসমাগম ভালোই হয়েছে। পাড়াভর্তি লোক তো আছেই, সিরিয়ালের নায়িকাকে দেখার লোভে কিছু বাইরের লোকও এসে ভিড় জমিয়েছে।
পর্দা খুলতেই একটি অল্পবয়সী ছেলে মঞ্চে উঠে ঘোষণা শুরু করল, “নমস্কার। উপস্থিত সকলকে জানাই শুভ নববর্ষের প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ আমাদের এই বর্ষবরণ উৎসবে আপনাদের সকলকে সঙ্গে পেয়ে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। আপনারা জেনে খুশি হবেন, কলকাতার দুই বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী এবং জনপ্রিয় ব্যান্ড গ্যালাক্সি আজ এখানে এসে উপস্থিত হয়েছেন আপনাদের গান শোনাবার জন্য। আর তার সঙ্গেই অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথিরূপে যাঁকে আমরা আজ পেয়েছি, তিনি হলেন বাংলা টিভি সিরিয়ালের জনপ্রিয় নায়িকা মোহনা মিত্র।”
উচ্ছ্বসিত কলরব আর সমবেত হাততালির মধ্যে ছেলেটির কথা ডুবে গেল। একটু পরে হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে আবার সে বলতে শুরু করে, “এছাড়াও আরেকটা আনন্দের খবর এই যে, আজকের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে আমাদের মধ্যে এসে উপস্থিত হয়েছেন এলাকার বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা মাননীয় চঞ্চল মজুমদার, আমাদের সবার প্রিয় চঞ্চলদা। তাঁর সঙ্গে উপস্থিত আছেন সংঘ-সভাপতি শ্রী জগন্নাথ সাহা, যিনি আজকের অনুষ্ঠানেও সভাপতিত্ব করবেন। আমি সভাপতিকে অনুরোধ করব অতিথিদের নিয়ে মঞ্চে এসে আসন গ্রহণ করার জন্য।”
আবার হাততালি। আর তার সঙ্গেই একে একে সভাপতি ও দুই অতিথি এসে স্টেজের ওপর পাতা চেয়ারগুলো দখল করলেন। ফুলের মালা ও ব্যাজ দিয়ে একে একে অতিথিবরণ হল। তারপর ছেলেটি আবার বলতে শুরু করল, “আপনারা দেখলেন, মাননীয় অতিথিদের আমরা বরণ করে নিলাম। এবার শুরু হবে আমাদের মূল অনুষ্ঠান। প্রথমে উদ্বোধনী সঙ্গীত। গাইবে ‘সুর ও লয়’-এর ছাত্রীবৃন্দ। তারপর…”
সানু অধীর আগ্রহে ঘড়ি দেখল। ছ’টা পঞ্চান্ন। ওর কাজ শুরু করার সময় হয়েছে। আস্তে আস্তে চেয়ার ছেড়ে উঠে সকলের অলক্ষ্যে হাঁটতে লাগল ও।
স্টেজে তখন উদ্বোধনী সঙ্গীত শুরু করেছে একদল কিশোরী। একসময় শেষও হয়ে গেল তা। একে একে তারা মঞ্চ থেকে নেমে যেতেই আবার ঘোষক ছেলেটি এসে দাঁড়াল মাইকের সামনে। “এবার আপনাদের সেই বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। যাঁকে নিয়মিত আপনারা টিভির পর্দায় দেখতে পান, আজ তিনি এসেছেন আপনাদের চোখের সামনে। আজকের বিশেষ অতিথি, আপনাদের সেই প্রিয় শিল্পী মোহনা মিত্রকে এবার আমি কিছু বলার জন্য অনুরোধ করছি।”
মোহনা মিত্র চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। চারদিকে গুঞ্জন আর পটাপট হাততালির শব্দ। তার মধ্যেই হঠাৎ শোনা গেল একটা চিৎকার — “ডাকাত, ডাকাত!” কে যেন তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। আর তারপরেই একটা তীব্র টানা হুইসলের শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে স্টেজের সামনে একগাদা মানুষের বিশৃঙ্খলা। কোত্থেকে কতকগুলো পুলিশ এসে ছুটে গেল স্টেজের পিছনদিকে।
সেখানে তখন এক অদ্ভুত দৃশ্য। গলির ধারে একটা ডাস্টবিনের পাশে হাতে একটা অদ্ভুত যন্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই বেঁটে লোকটা। তার থেকে একটু দূরেই আর একটা সিড়িঙ্গেপানা লোক, যে একটু আগেই চিৎকার করছিল ডাকাত ডাকাত বলে। কিন্তু এখন সে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কারণ, তার চিৎকার করে ওঠার পরেই কেউ হঠাৎ একটা বাড়ির আড়াল থেকে রিভলভার হাতে বেরিয়ে আসবে, এটা বোধহয় সে আশা করেনি। সানু নিজেও তো পুরো ব্যাপারটা বোঝেনি। শুধু তীর্থদা যা যা বলে দিয়েছিল, সেইভাবেই কাজ করে গেছে সে। আচমকা চিৎকার শুনেই বেরিয়ে এসেছিল রিভলভার উঁচিয়ে। এমনকি সময়মতো হুইসলটাও বাজিয়েছিল সে-ই।
কিন্তু সে অবাক হল একটা ব্যাপার দেখে। বেঁটে লোকটা যেন কেমন বেপরোয়া হয়ে নিশ্চিন্তে পুলিশের হাতে ধরা দিল। কিন্তু কেন? বেঁটে লোকটার অপরাধ কী? কেন তাকে ধরল পুলিশ? তারা হঠাৎ হাজিরই বা হল কীভাবে?
ওদিকে অনুষ্ঠান প্রায় পণ্ড হতে বসেছে। উপস্থিত জনতার মনে হাজার ব্যগ্র প্রশ্ন। ক্লাবের ছেলেরা উগ্রমূর্তি। সানু অসহায়ভাবে এদিক ওদিক দেখে। এসব প্রশ্নের উত্তর তো ওর কাছে নেই। একমাত্র তীর্থদা ছাড়া এর উত্তর কেউ দিতেও পারবে না। কিন্তু সে নিজে গেল কোথায়?
মোবাইলে তীর্থদাকে ধরবে কি না ভাবছে, এমন সময় সবাইকে অবাক করে সেই স্টেজের তলা থেকেই আবার বেরিয়ে এল তীর্থদা। আর বেরিয়েই পুলিশকে নির্দেশ দিল সিড়িঙ্গে লোকটিকেও অ্যারেস্ট করতে। আর তখনই বোঝা গেল, লোকটা পায়ে পায়ে সরে পড়ার মতলবে ছিল। পুলিশ তাকে যখন হাতকড়া পরাচ্ছে, তখন তীর্থদা অফিসারকে বলল, “কিচ্ছু করতে হবে না, শুধু আপনাদের ওষুধ একটু খাওয়ান, দেখবেন বাপ বাপ বলে স্বীকার করবে যে সকালের অ্যাক্সিডেন্টটা ও-ই ঘটিয়েছে। তবে হ্যাঁ, কার কথায় সেটা ঘটাল, সেটা জানতে একটু বেগ পেতে হবে। যাই হোক, দেখুন চেষ্টা করে।”
এতক্ষণ চারপাশের লোকজন একটু চুপ করে ছিল, কিন্তু এবার আর তাদের ধৈর্য রইল না। একসঙ্গে হইহই করে উঠেছে সবাই। যদিও পাড়ায় তীর্থদার বিরাট র‍্যাপো। সে যে অনর্থক কিছুই করবে না, এ বিশ্বাস পাড়ার সবার। তবুও কৌতূহলে ফেটে পড়ছে সবাই।
তীর্থদা মৃদু হেসে বলল, “চলুন, বরং স্টেজে উঠে ব্যাপারটা খুলে বলি। তাহলে সবাই বুঝতে পারবেন কী ভয়ংকর একটা পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যাতে একসঙ্গে বহু মানুষের ক্ষতি হয়ে যেত।”
সবাই প্রায় ঘিরে ধরে তীর্থদাকে নিয়ে আসে আর তুলে দেয় স্টেজের ওপর। ইতিমধ্যে পুলিশের একটা গাড়ি ঐ দু’জনকে নিয়ে চলে গেছে থানার দিকে। শুধু এস.আই. সুধীর চ্যাটার্জী এখনও আছেন। হয়তো তীর্থদাই তাঁকে থাকতে বলেছে। আর আছে জনা দুই কনস্টেবল। সিরিয়ালের নায়িকার উপস্থিতির জন্য দুয়েকটা সংবাদমাধ্যমও আজ হাজির এখানে। তাদের সাংবাদিকরাও এই নতুন স্টোরির সম্ভাবনায় বেশ উত্তেজিত। ইতিমধ্যেই রীতিমতো ছবি তোলা শুরু হয়ে গেছে।
একটি ছেলে একটা কর্ডলেস মাইক এনে ধরিয়ে দেয় তীর্থদার হাতে। তীর্থদা বলতে থাকে, “প্রথমেই আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আপনাদের ফাংশনের দেরি করিয়ে দেবার জন্য। তাছাড়া এখানে উপস্থিত বিশিষ্ট মানুষদেরও বহু মূল্যবান সময়…”
সমবেত প্রতিবাদের শব্দে তীর্থদার কথা ডুবে গেল। এসব ছেঁদো কথা ছেড়ে সবাই রহস্যটা শুনতে চায়। তীর্থদা একটু হেসে আবার তার কথার তুবড়ি ছোটাল, “আসলে পুরো ব্যাপারটা শুনলে আপনারা অবাক হয়ে যাবেন আর শিউরে উঠে ভাববেন, কী ভয়ংকর চক্রান্ত এটা, যার ফলে সবার চোখের সামনে আজ একটা মর্মান্তিক কাণ্ড ঘটতে যাচ্ছিল। সে-কথায় আমি আসছি। তবে তার আগে আমাদের যাওয়া দরকার সকালের ঘটনায়। আজ সকালে এই কাছেই একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল আমরা সবাই জানি। আর তখনই হৈ চৈ শুনে ওদিকে যাওয়ার সময় আমি আর সানু প্রথম ঐ বেঁটে লোকটার দেখা পাই এখানে, এই স্টেজের কাছে। চিৎকার-চেঁচামেচি শুনেও ওদিকে না গিয়ে এখানে বসে কী যেন করছিল সে। তখন মনের মধ্যে একটা খটকা লাগলেও সেই নিয়ে বিশেষ কিছু ভাবিনি। কিন্তু যখন শোনা গেল যে, অ্যাক্সিডেন্টটা প্রায় ইচ্ছাকৃত, আর গাড়িটায় কোনও নাম্বার-প্লেট ছিল না, তখন থেকেই মনের মধ্যে একটা সন্দেহ উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করে। তবে কি অ্যাক্সিডেন্টের ছলে সবাইকে সরিয়ে দিয়ে এখানে কোনও গোপন কাজ করানোর দরকার ছিল লোকটাকে দিয়ে? কী সেই কাজ? আর কে করাবে, কেনই বা?”
একসঙ্গে এতটা বলে দম নেবার জন্য একবার চুপ করে তীর্থদা। সমস্ত দর্শক বোবার মতো নিশ্চুপ। স্টেজের ওপর অতিথিরাও স্তব্ধ হয়ে তীর্থদার কথা শুনছে। তীর্থদা আবার বলতে শুরু করে, “সেই মুহূর্তে কিছু ভেবে পাইনি। কিন্তু তার কিছুক্ষণের মধ্যেই কথাপ্রসঙ্গে আজকের এই অনুষ্ঠানের কথা উঠতে আমি চমকে উঠি। আর তখনই একটা বেপরোয়া সন্দেহ আমার কাছে ছবিটা পরিষ্কার করে দেয় যে, পুরো ব্যাপারটাই আসলে একটা গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। আর এর মূল লক্ষ্য কে? ইয়েস, চঞ্চল মজুমদার, আপনাদের প্রিয় নেতা চঞ্চলদাই আজকের এই ঘটনার চাঁদমারি। আপনারা সবাই জানেন, উনি এবারের ভোটে দাঁড়াতে চলেছেন। ওঁর বিপক্ষে যিনি দাঁড়াচ্ছেন, তিনি যদিও এই এলাকার লোক নন, তবুও তাঁকে আপনারা ভালোভাবেই চেনেন। কিন্তু এটা কী জানেন, তিনি শুধু দলগতভাবে চঞ্চলদার বিরুদ্ধপক্ষ নন, তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক শত্রু?”
দর্শকরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তীর্থদার কথা কিন্তু চলছে। “কথাটা আমারও জানা ছিল না। আজ সকালেই সেটা আমি জানতে পারি স্বয়ং চঞ্চলবাবুর কাছ থেকে। আর তারপর হাসপাতালে গিয়ে অ্যাক্সিডেন্টে আহত লোকটির সঙ্গে কথা বলে যখন জানতে পারি যে, তার প্রতি কারও কোনও ব্যক্তিগত আক্রোশ ছিল না, থাকার প্রশ্নই নেই, তখনই দুয়ে দুয়ে চার হিসেবে অঙ্কটা জলের মতো মিলে যায়। স্পষ্ট বুঝতে পারি, চঞ্চলদার প্রাণনাশের একটা চক্রান্ত চলছে। কিন্তু কীভাবে?”
তীর্থদা চুপ করে। দর্শকরা নীরব। শুধু উসুখুসু করছেন এস.আই. সুধীর চ্যাটার্জী। এত সাসপেন্স ওঁর সহ্য হচ্ছে না বোধহয়। তীর্থদা স্থির কিন্তু তীব্র কন্ঠে যোগ করে, “বোমা। এক্সপ্লোসিভ। হ্যাঁ, ঐ বেঁটে লোকটাকে দিয়ে স্টেজের নিচে এক্সপ্লোসিভ প্ল্যান্ট করানো হয়েছিল। সকালে অ্যাক্সিডেন্টের ছলে সবাইকে সরিয়ে দিয়ে ঐ বোমার কালো থলেটাই স্টেজের তলায় ঢুকিয়ে রাখতে এসেছিল শয়তানটা, যাতে পরে সময়মতো এসে বোমাটা ফিট করে যেতে পারে।”
পিনড্রপ সাইলেন্স চারদিকে। সানুর মনে পড়ে, ঠিক ঠিক, লোকটার হাতে সকালে তো একটা কালো রঙের থলে ছিলই। আচ্ছা, তার ভেতর তাহলে বোমা রাখা ছিল!
তীর্থদা বলে চলে, “সকালে এই দু-তিন জায়গা ঘোরার পর আমি এই প্ল্যানিং সম্পর্কে প্রায় নিশ্চিত হতেই নজর রাখতে শুরু করি এই স্টেজ আর তার চারপাশের এলাকায়। সন্দেহজনক একটা লোককে মাঝেমাঝে ঘোরাফেরা করতেও দেখি। আর তখনই অনুমান করি যে, সে-ই সকালের অ্যাক্সিডেন্টটা ঘটানোর নায়ক। কিন্তু বেঁটে লোকটাকে আর দেখতে পাইনি। থলেটা স্টেজের তলায় ঢুকিয়ে রাখার পর থেকেই সে একেবারে গায়েব। সুতরাং তার জন্যে ফাঁদ পাততে হল। দুপুর থেকেই স্টেজের তলায় বড়ো একটা ত্রিপল চাপা দিয়ে ঘাপটি মেরে বসে রইলাম। পাখি ফাঁদেও পড়ল। আমার চোখের সামনেই বেঁটে লোকটা স্টেজের তলায় ঢুকে কাঠের পাটায় বোমা ফিট করে বেরিয়ে গেল। ব্যস, আর কী? সানুর হাতে রিভলভার ধরিয়ে ইন্সট্রাকশন দিয়ে দিলাম। আর তারপর কী ঘটেছে সে তো আপনারা নিজের চোখেই দেখেছেন। সুতরাং এবার তাহলে আপনারাই বলুন, এই গোটা ঘটনার জন্য দায়ী কে?”
সবাই হৈ হৈ করে ওঠে। এলাকার প্রিয় চঞ্চলদার প্রতি এই অন্যায় চক্রান্তের বিরুদ্ধে সবাই ক্ষুব্ধ। এস.আই. চ্যাটার্জীর উদ্দেশে চিৎকার করে দাবি জানানো হয় অবিলম্বে আসল দোষীকে গ্রেপ্তারের জন্য।
গোলমালের মধ্যেই চঞ্চল মজুমদার তাঁর চেয়ার থেকে উঠে এগিয়ে এলেন মঞ্চের সামনে। হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে করমর্দন করলেন তীর্থদার সঙ্গে। তারপর দু’হাত তুলে সকলকে শান্ত হতে বলে তীর্থদার হাত থেকে মাইকটা নিয়ে বলতে শুরু করলেন, “দেখুন, কী বলব বুঝতে পারছি না। এরকম একটা ঘটনা অত্যন্ত নিন্দার ও লজ্জার, সেটা মানছি। তবুও বলব, আপনারা দয়া করে উত্তেজিত হবেন না। পুরো ব্যাপারটা প্রশাসনের হাতে ছেড়ে দিন। তাঁরাই আসল দোষীকে খুঁজে বার করবেন। তারপর তার যথাযোগ্য শাস্তির ব্যবস্থাও করবেন তাঁরাই। আপনারা শুধু তাঁদের সঙ্গে একটু সহযোগিতা…”
চঞ্চলবাবুকে কথাটা শেষ করতে দিল না তীর্থদা। হঠাৎ কেন কে জানে, অভদ্রের মতো তাঁর হাতের মাইকটা টেনে নিল। ভদ্রলোক হতভম্ব। কিন্তু তাতে তীর্থদার কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। মাইকটা মুখের সামনে ধরে বলে উঠল, “ঠিক ঠিক। আপনি একদম ঠিক বলেছেন, চঞ্চলবাবু। আমাদের সকলেরই উচিত প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করা। আর সেই সহযোগিতার জন্যেই আমি প্রশাসনের হয়ে আপনাকে দুয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই। খুব সহজ প্রশ্ন। আশা করি তার উত্তর দিয়ে আপনি বাধিত করবেন।”
কথাটা বলতে বলতেই তীর্থদা কী একটা চোখের ইশারা করল সুধীর চ্যাটার্জীকে। উনি এগিয়ে এসে চঞ্চল মজুমদারের পাশে দাঁড়ালেন। কেউই বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে।
তীর্থদা বলল, “মিঃ মজুমদার, আমার গল্পের মধ্যে যে দুয়েকটা অসঙ্গতি ছিল, সেটা কি আপনি লক্ষ করেছেন? আসলে আমি নিজেও কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাইনি। আপনি কি সেই উত্তরগুলো দিতে পারেন?”
চঞ্চলবাবু প্রথম অবস্থায় একটু হকচকিয়ে গেলেও এতক্ষণে খানিকটা সে-ভাব কাটিয়ে উঠেছেন মনে হয়। তাই এবার রীতিমতো ফুঁসে উঠে বললেন, “কী, ব্যাপার কী বলুন তো? কী বলতে চাইছেন আপনি?”
তীর্থদা তার নিজস্ব হাসিটা হেসে বলল, “সেরকম কিছুই না। শুধু জানতে চাইছি, ঐ লোকদুটোকে কত টাকা দিয়েছেন আপনি?”
চঞ্চলবাবু বললেন, “মানে?”
“মানে এই পুরো ব্যাপারটা সাজাতে, অর্থাৎ সকালের অ্যাক্সিডেন্ট, স্টেজের তলায় বোমা ফিট করানো, আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের নাটক, এসবের পেছনে মোট কত টাকা খরচ করেছেন আপনি?”
স্টেজের জোরালো আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, চঞ্চলবাবুর মুখে ফ্যাকাশে ভাব। তবুও জোর করে তেরিয়া ভাব মুখে এনে তিনি বললেন, “কী যা তা বলছেন, বলুন তো? আপনি সবার সামনে এইভাবে আমায় অপমান করছেন, জানেন এর ফল কী হতে পারে?”
“জানি মিঃ মজুমদার, জানি।” কাটা কাটা গলায় তীর্থদা বলে চলে, “কিন্তু আপনি কি জানেন যে, আপনি চালাকি করে এমন একটা ঘটনা সাজিয়ে আপনার চিরকালীন শত্রুকে ফাঁসাতে চাইলেও সেটা সফল হয়নি? আগামী ভোটে নিরঙ্কুশভাবে জিতে যাবার জন্য পুরো ব্যাপারটাই যে আপনার প্ল্যান, সেটাও সাক্ষীপ্রমাণ সমেত ধরা পড়ে গেছে।”
ভদ্রলোক মরীয়া । ভাঙবেন, তবুও মচকাবেন না। “কী বলছেন, মিঃ সান্যাল? আমার প্ল্যান? আশ্চর্য! আপনি নিজেই তো সবার সামনে প্রমাণ করে দিলেন যে এটা আমাকে মারার জন্য একটা জঘন্য চক্রান্ত। আবার এখন নিজেই উলটো কথা বলছেন! দেখুন, আপনারা সবাই দেখুন কীভাবে আমাকে সবার সামনে হেনস্থা করা হচ্ছে।”
এবার তীর্থদার মুখের চেহারা পালটে গেল। সানু জানে, তীর্থদার এই মুহূর্তগুলোই হল সবচেয়ে সাংঘাতিক। বুনো বাঘের মতোই মারাত্মক হয়ে ওঠে তীর্থদা এইসব সময়ে। আর হলও ঠিক তাই। এবার তীর্থদা যে গলায় কথা বলল, তাতে চঞ্চল মজুমদারও হঠাৎ কেঁপে উঠলেন।
“তাই নাকি, মিঃ মজুমদার? তাহলে বলুন তো, স্টেজের তলায় বোমাটা ফিট করার সময় কেন তার ডিটোনেটরটা বোমার ঠিক মুখের কাছে খুলে রাখা হল? কোনও অবস্থাতেই বোমাটা যাতে ফাটতে না পারে, তাই তো? আর এই ব্যাপারটা শুধু আমি নই, স্টেজের তলায় বসে এস.আই. মিঃ চ্যাটার্জীও দেখলেন আর নোট করলেন। আর সকালে অ্যাক্সিডেন্ট ঘটানো ঐ রোগা সিড়িঙ্গেপানা লোকটা, সে কেন অযথা হাঁকডাক করে বেঁটে লোকটাকে ধরিয়ে দেবার চেষ্টা করল? ওরা তো একই দলের লোক! আসলে বোমা রেখে আপনাকে মারার একটা ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে, এমন একটা নাটক সব লোকের চোখে পড়ার দরকার ছিল। কিন্তু কারুর নজরেই তা পড়ল না দেখে অগত্যা নিজেদের মধ্যেই চিৎকার-চেঁচামেচি করে বেঁটে লোকটাকে ধরিয়ে দেবার চেষ্টা করতে হল। কিন্তু জানেন কি, যাদের আপনি টাকা খাইয়ে হাত করেছিলেন এইসব কাণ্ড ঘটাতে, তাদের মধ্যেই একজন সবকথা ফাঁস করে দিয়েছে!”
সানু লক্ষ করছিল, এইসব কথা শুনতে শুনতে চঞ্চল মজুমদারের মুখটা ক্রমশই ভয়ংকরভাবে বদলে যাচ্ছে। বিরক্তি, ক্রোধ আর হিংস্রতায় কেমন যেন ক্রূর হয়ে উঠছে ঐ সৌম্য মুখটা। এবার তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। বিস্ফোরণে ফেটে পড়লেন।
“দেখে নেব। সব্বাইকে দেখে নেব আমি। আমার টাকা খেয়ে এখন আমারই সঙ্গে বেইমানি! কাউকে ছাড়ব না। সবকিছুর শেষ দেখে ছাড়ব আমি। কেউ পার পাবে না। কেউ না।” বলতে বলতে প্রবল হতাশায় কেমন যেন কুঁকড়ে ওঠেন চঞ্চলবাবু।
সুধীর চ্যাটার্জী ওঁর একটা হাত ধরে একটা চেয়ারে বসিয়ে দেন। তীর্থদা শান্ত গলায় তাঁকে বলে, “বেশ তো ভালো জীবন কাটাচ্ছিলেন, মিঃ মজুমদার। সামনে উজ্জ্বল কেরিয়ার ছিল। তবুও একটা নির্দোষ লোককে শুধু শুধু ফাঁসানোর চেষ্টা করলেন! কেন করলেন বলুন তো এমন কাজ?”
নিমেষের মধ্যে ঝাঁকুনি দিয়ে মাথাটা তুলে বলে ওঠেন চঞ্চলবাবু, “করব না? ও লোকটা তো আমার সারাজীবনের শত্রু! এমনিতেই ওকে আমি সহ্য করতে পারি না। তার ওপর এই ভোটের ব্যাপারেও ও আমার সঙ্গে লড়াই করতে নামবে? তাই এক ঢিলে দু’পাখি মেরে ওর লড়াইয়ের শখ চিরদিনের মতো মিটিয়ে দিতে চেয়েছিলাম।”
“ধন্যবাদ। অশেষ ধন্যবাদ, মিঃ মজুমদার। আপনার এই স্বীকারোক্তিটাই আমি চাইছিলাম। এটা ধরা রইল আমার এই মাইক্রো টেপ রেকর্ডারে, আর এত লোকের কানে। এটাই কোর্টে আপনার দোষ প্রমাণের পক্ষে যথেষ্ট, তাই না? আরেকটা কথা শুনে রাখুন, বিকেলে স্টেজের তলায় মিঃ সুধীর চ্যাটার্জী ছিলেন না। ওটা আমারও একটা নাটক বলতে পারেন। আসলে আপনার এই স্বীকারোক্তি আদায় করার জন্যেই ওটা বলা। কারণ, শুধু অনুমান আর যুক্তির অঙ্ক তো কোর্ট মেনে নেবে না, তাই না?”
চঞ্চল মজুমদার ফ্যাল ফ্যাল করে তাকালেন তীর্থদার দিকে। সুধীর চ্যাটার্জী তীর্থদার সঙ্গে একবার করমর্দন করে নিয়ে চঞ্চল মজুমদারের দিকে দৃষ্টি ফেরালেন। দূরে দাঁড়ানো পুলিশের জীপটা স্টেজের পাশে এগিয়ে এল।
_____

গ্রাফিক্সঃ পুণ্ডরীক গুপ্ত

No comments:

Post a Comment