গল্পঃ অচল পাথরঃ রাখী নাথ কর্মকার



টেবিলের ওপর ব্যাগটা উপুড় করতেই বইখাতার বদলে ঝুপঝাপ ঝরে পড়ল ছোটোবড়ো নানা সাইজের একগাদা পাথর! সেদিকে চোখ পাকিয়ে বিজনস্যার বেশ কষেই মুলে দিলেন ‘পাথর’-এর থুড়ি পার্থর কানটা। তারপর? তারপর আর কী - হেডস্যারের গর্জন, আর গার্জেন কল! আর তারও পর মামার সাথে বাইরে কোথায় যেন চলে গেল ছেলেটা। শুনেছিলাম ওর একমাত্র অভিভাবক মামা তার ভাগ্নের ভগ্ন স্কুল রেকর্ডে জেরবার হয়ে ওকে শেষপর্যন্ত দূরের কোনও এক হস্টেলে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিয়েছিলেন।
এই পাথরপাগল পার্থকে পাথরে রূপান্তরিত করেছিলাম আমিই। মাঝে মাঝেই স্কুলের টিফিন টাইমে কোথায় যেন উধাও হয়ে যেত ছেলেটা। একেকদিন ছুটির সময় ছুটতে ছুটতে এসে হাজির হত স্কুলের পিছনের জঙ্গল থেকে। হাতভর্তি পাথর, পকেট উপচে পড়া পাথর! লাজুক মুখে বলত, “পথের ধারের প্রতিটি পাথরের নিজস্ব গল্প আছে রে! ওরা আমাকে গল্প বলে, পৃথিবীর অতীতের গল্প। ওরা আসলে অতীত পৃথিবীর বাস্তব নিদর্শন।”
পাথরের স্কুল ছেড়ে চলে যাওয়ার পিছনে আমিও কম দায়ী ছিলাম না। বিজনস্যারকে আমরাই নালিশ করেছিলাম, পাথরের ব্যাগে বইয়ের বদলে সেদিন কী আছে! ওর বাঁদরামি থুড়ি পাথরামিতে আমাদের কোনও বাড়া ভাতে ছাই না পড়লেও ওর এইসব ছাইভস্ম কাজকম্ম নিয়ে আমরা কম হাসাহাসি করিনি।
“কী হল, বাবা? দেখো না, এঁকে চেনা চেনা লাগছে না? তোমার পুরনো স্কুল অ্যালবামের ক্লাস নাইনের গ্রুপ ফটোটাতে দেখা সেই পাথরপাগল ছেলেটির সঙ্গে এর মিল আছে না? যার গল্প তুমি আমায় প্রায়ই বলতে?”
মেয়ের কথায় আমার সম্বিৎ ফিরল। পার্থটা হারিয়ে গেলেও আমাদের বন্ধুদের মাঝে গল্পের খোরাক হয়ে রয়ে গিয়েছিল বহুদিন। পাগলামি শব্দটা আমাদের মাঝে মূর্ত হয়ে উঠত পাথরপাগল একটা ছেলের উল্লেখে।
আজ একটা খবর-কাগজের কাটিং আমার সকালের রঙটাই বদলে দিল। কাটিংটা চোখের সামনে নাচাতে নাচাতে মেয়ে বলছিল, “আগামী সপ্তাহে স্কুল ফাংশনে প্রধান অতিথি হয়ে ইনিই আসবেন গো আমাদের স্কুলে! স্বনামধন্য ভূতত্ত্ববিদ! জানো বাবা, অনেক কষ্টে নাকি ওঁকে রাজি করানো গেছে। আচ্ছা বাবা, তুমি যাবে তো আমার সঙ্গে সেদিন?”
পেপার-কাটিংটা আড়চোখে চেয়ে দেখলাম, ‘বাঙালি বিজ্ঞানী রকস’! পাথরপাগল ডঃ পার্থ বসু ও আরও কয়েকজন বিদেশি বিজ্ঞানী মিলে রিসার্চ করছিলেন ‘রক নাইট্রোজেন ওয়েদারিং’ নিয়ে। তাতে নাকি এক অজানা তথ্য সামনে এসেছে। আমরা এতদিন জানতাম পরিবেশে নাইট্রোজেনের উৎস বায়ুমণ্ডল, কিন্তু এখন জানা গেছে, আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী হলেও সত্যিটা হল, এক চতুর্থাংশের কাছাকাছি নাইট্রোজেন পরিবেশে মুক্ত হয় পৃথিবীর বেডরক থেকে। সত্যি বলে কী, নাইট্রোজেনের গল্প লেখা আছে পৃথিবীর পাথরে পাথরে! আমাদের হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলের পাললিক শিলা নাকি নাইট্রোজেনের উল্লেখযোগ্য উৎস! হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে হাতুড়ি আর কম্পাস নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন পার্থবাবু। তাঁর মতে, কার্বন-ডাই-অক্সাইড দূষণ বিলীন করতে ইকোসিস্টেমের নাইট্রোজেন এবং অন্যান্য নিউট্রিয়েন্টসের প্রয়োজন। তাই নাইট্রোজেনের চাহিদা ও যোগানের উপর প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণের গল্পও আমাদের জানতে হবে বৈকি!
বইয়ের ব্যাগ গোছাতে গোছাতে অবুঝ মেয়ে মিয়া আমায় কৌতূহলী প্রশ্ন করল, “বাবা, তোমার কাছে ওঁর ফোন নাম্বার আছে?”
হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল, একবার অসুস্থতার জন্যে স্কুলে আসতে পারেনি পার্থ। আমায় ফোন করলেও সেদিন আমি ফোন ধরিনি। ইচ্ছে করেই।
“কেন রে, মিয়া?”
“না এমনিই, আমার বন্ধুরা বিশ্বাসই করতে চাইছিল না যে ইনি তোমার বন্ধু!”
সত্যিই আজ আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল কোনওভাবে পার্থর ফোন নাম্বারটা জোগাড় করে ওকে একটা ফোন করতে। ‘পার্থ, সরি রে! তোর পাথরের গল্পগুলো মিথ্যে ছিল না। শুধু আমরাই সেগুলোতে বিশ্বাস করতে পারিনি। আর কে না জানে, যারা বিশ্বাস করে, তাঁদের কাছে কোনও কিছুই অসম্ভব নয়।’
_____

ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a Comment