আমার স্কুলঃ গড়ে ওঠার দিনগুলোঃ শঙ্খ করভৌমিক




আমাদের বাড়িতে একটা পুরনো অ্যালবামে হলদেটে হয়ে আসা একটা পুরনো ছবি আছে। ছবিটার পেছনে আমার মায়ের হাতের লেখায় লেখা আছে ‘স্কুলে প্রথমদিন’। আমার ছোটোবেলার ছবি, পিঠে স্কুল ব্যাগ-ট্যাগ সহ। ছবিটা দেখলে প্রথমেই যেটা মনে হবে সেটা হল ‘হাফপ্যান্টটা আর শার্টটা এত ছোটো কেন?’ হবেই তো। ওটা যে আসলে স্কুলে প্রথমদিনের ছবি নয়। যে জামাকাপড় পরে প্রথমদিন স্কুলে গিয়েছিলাম সেগুলো পরেই একবছর পরে তোলা ছবি কিনা। আর কে না জানে, ওই বয়েসের বাচ্চা তাড়াতাড়ি লম্বা হয়। তখনকার দিনে তো ডিজিটাল ক্যামেরা ছিল না এখনকার মতো, প্রথমদিন স্কুলে যাওয়া আর ক্যামেরায় ফিল্ম ভরার মধ্যেকার একবছরের ব্যবধানে একটু লম্বা হয়ে গিয়েছিলাম।
জ্ঞান হবার পর থেকে স্কুলের সেই প্রথমদিনটির আগেরদিন পর্যন্ত ‘বড়ো হলে স্কুল যাব’ ভেবে বেশ উত্তেজনায় কেটেছে। আমার চেয়ে কয়েক বছরের ছোটো যারা, তাদের নার্সারি, প্রি-প্রাইমারি, কিন্ডারগার্টেন ইত্যাদি নানা অভিজ্ঞতা থাকলেও আমাদের ছোটো শহরে আমাদের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ক্লাস ওয়ান থেকেই স্কুলজীবন শুরু করত। আমিও ব্যতিক্রম নই।
স্কুলে ভর্তি হবার আগে পর্যন্ত গৃহশিক্ষিকা নিভা দিদিমণি পড়াতেন। পড়াটা হত বাড়ির মূল অংশ থেকে আলাদা একটা ছোটো ঘরে। আমার ধারণা ছিল ওটাই আমার স্কুল। আরেকটু বড়ো হবার পর ধারণাটা পালটাল এবং সত্যিকারের স্কুলে যাবার জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠলাম। আর কিছুদিন যেতে না যেতেই শুনলাম, আমাকে স্কুলে ভর্তির পরীক্ষা দিতে যেতে হবে। আজকাল যেমন বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তির পরীক্ষার প্রস্তুতির ঘটা দেখলে অশ্বমেধ যজ্ঞের কথা মনে পড়ে, তখন সেরকম ছিল না। পরীক্ষার জন্য আমাকে পড়াশোনা করতে বলেওনি।
মায়ের সঙ্গে গেলাম পরীক্ষা দিতে। একটা ক্লাস-ঘরে জনাকুড়ি বাচ্চাকে বসানো হল। প্রশ্নপত্র কিছু নেই। ঢং করে একটা ঘন্টা বাজল আর তৎক্ষনাৎ একজন স্যর ঘরে এসে বোর্ডে বড়ো বড়ো করে লিখলেনঃ
‘তোমার নাম লিখ
পিতার নাম লিখ
১-১০ লিখ
একটি ছোটো ছড়া লিখ’

প্রথম তিনটি প্রশ্নের উত্তর তো লেখা হয়ে গেল। ছোটো ছড়া সেই মুহূর্তে মনে পড়ছিল না। তাই নিম্নলিখিত বড়ো ছড়াটি লিখতে শুরু করলাম।
“ওই দেখা যায় আটচালা
ওই আমাদের পাঠশালা।
ওই ঘরেরই ঠিক তলে
রোজ আমাদের পাঠ চলে।
আমরা পোড়ো একশ জন
পড়াশোনায় বেজায় মন।
নামতা পড়ি একসাথে
তাল রেখে যাই দুই হাতে।
পড়াশোনায় মোদের সুখ
করব আলো দেশের মুখ।”
কবির নাম মনে নেই। ছড়াটা বেশ বড়োই বেছেছিলাম, কেন কে জানে। শেষ দু’লাইন লেখার আগেই ঘণ্টা পড়ে গেল। স্যর এসে খানিকটা জোর করেই খাতাটা নিয়ে গেলেন। আমার ধারণা হল পুরো ছড়াটা যখন লিখে উঠতে পারিনি, আমাকে নিশ্চয়ই স্কুলে নেবে না।
কিন্তু ভর্তি-পরীক্ষার ফল বেরোলে দেখা গেল, আমার নাম তালিকায় রয়েছে। সুতরাং স্কুলের পোশাক বানানো হল (কমলা রঙের জামা আর সাদা প্যান্ট। এরকম পোশাক আমি আর কোনও স্কুলের কখনও দেখিনি), বইখাতা, ব্যাগ ইত্যাদি কেনা হল, আর আমি বাবার সাইকেলের সামনের রডে বসে স্কুলে চললাম।
একই স্কুলবাড়িতে দুটো স্কুল - সকালের দিকে ছোটো ছেলেমেয়েদের স্কুল বসে, তার নাম ‘মডেল স্কুল’। বেলার দিকে আবার বড়ো মেয়েদের স্কুল - তার নাম ‘গার্লস স্কুল’, সেখানে আবার আমার মা একজন শিক্ষিকা।
প্রথমদিন স্কুল। একেকটা বেঞ্চে তিনজন করে বসে। আমি বসেছি ফার্স্ট বেঞ্চে, কারণ ফার্স্ট বেঞ্চ তখনও পর্যন্ত ফাঁকা এবং সবাই কেন ওই বেঞ্চটাকে ছেড়ে বসেছে আমার বোধগম্য নয়। একটু পরে আরও দু’জন এসে আমার পাশে বসল। আলাপ-পরিচয় হল। জয়ন্ত রায় আর মানস চৌধুরী। স্কুলের প্রথম বন্ধু। জানি না এখন কোথায় আছে।

আস্তে আস্তে স্কুলের জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম। ওই স্কুলের সহপাঠীদের মধ্যে যাদের কখনও ভুলতে পারব না তাদের একজন হল মরণ। বছরের মাঝখানে ভর্তি হয়েছিল। প্রথমে দেখতে পাইনি। ছিল হয়তো, খেয়াল করিনি। টিফিনের সময় চোখে পড়ল।
বছরের মধ্যিখানে নতুন ছেলেপুলে ভর্তি হওয়া পাড়াগাঁয়ের স্কুলে এমন কিছু বিরল ঘটনা নয়। তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেইও। প্রথমদিন গোবেচারার মতো পেছনের বেঞ্চিতে বসে থাকবে, কেউ লক্ষ করবে না। দিদিমণি নাম জিজ্ঞেস করবেন, জানতে চাইবেন আগে কোন স্কুলে পড়ত। শহরের স্কুল থেকে এসে থাকলে নরম হেসে বসতে বলবেন। আর আরও বেশি পাড়াগাঁয়ের স্কুল থেকে যদি এসে থাকে তাহলে বাঁকা হেসে দুয়েকটা কঠিন প্রশ্ন করবেন। সঠিক উত্তর না পেয়ে ফার্স্ট বয় মানসের দিকে তাকাবেন। মানস গড়গড় করে ঠিক উত্তর বলে দিয়ে নিজের জায়গায় বসবে। দিদিমণিও নতুন ছেলেকে বসতে বলতে ভুলে গিয়ে পড়ানো শুরু করবেন। টিফিনের সময় দুয়েকজন আলগোছে দুয়েকটা প্রশ্ন করবে। তারপর কেউ হয়তো তার পাশের জনকে বলবে, “জানিস, নতুন ছেলেটা না...।” তারপর মাস তিনেকের মাথায় তাকে হেডস্যরের ঘরের সামনে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাবে। বোঝা যাবে, নতুন ছেলে আর নতুন নেই।
কিন্তু এই নতুন ছেলেটা আমাকে বেশ অবাক করল। কারণ, আমার হ্রস্ব ছাত্রজীবনে আমি কোনও ছেলেকে কখনও খালি গায়ে স্কুলে আসতে দেখিনি। গুটি গুটি গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “অ্যাই, তোর নাম কী রে?”
ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে টেনে টেনে উত্তর দিল, “মর-অ-অ-ণ।”
আরও দুয়েকটা কথা বলার চেষ্টা করতে গিয়ে বুঝলাম, আমার কোনও প্রশ্নের উত্তর দেবার ইচ্ছাই ওর নেই। বা প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে হয় এই বোধটাই নেই। একটু গুটিয়ে গেলাম।
টিফিনের পরেই বাংলা ক্লাস। কিছুক্ষণ ক্লাস চলার পর দেখলাম শিবানীমাসি (রোজ সকালে যাকে কলসি করে জল এনে স্কুলের ঢাউস ফিল্টার ভরতে দেখি) এসে ক্লাসে ঢুকল। দিদিমণিকে একটা প্রণাম ঠুকে কেঁদে কেঁদে বলতে লাগল, “জন্মের আগেই বাপ মরল, তাই নাম মরণ। রেখে গেলাম, যদি মানুষের মতো মানুষ হয়…”
দিদিমণি অস্বস্তিতে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন, “ঠিক আছে, ঠিক আছে।”
ছুটির পর বাড়ি ফিরে জানালাম, “আমাদের স্কুলে একটা নতুন ছেলে এসেছে।”
আর তার পরদিন থেকে মরণকে (বা শিবানীমাসিকে) আর কখনও দেখতে পাইনি।

তারপর অনেক বছর হল। সেই স্কুলে কয়েক বছর পড়েছিলাম। সেই স্কুলের কিছু কিছু বন্ধুর সঙ্গে পরেও কয়েক বছর যোগাযোগ ছিল। একজন তো কলেজ পর্যন্ত সঙ্গে ছিল। কিন্তু তিরিশ-বত্রিশ বছর পর, যখন মনে করার চেষ্টা করছি ক্লাস ওয়ানে আমি কাদের সঙ্গে পড়তাম, দুটোমাত্র নাম মনে পড়ছে - ফার্স্ট বয় মানস, আর ওই মরণ।
অনেক বছর পর ছোটোবেলার পুরনো শহরে গিয়েছিলাম। সেই স্কুলটাই আর নেই। ভাতের হোটেলের খোঁজে দুপুরের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। ব্যস্ত রাস্তায় অনেক গলার আওয়াজ। কে যেন বলল, “রতনদা, দুটো চা-কে চারটে করে।”
স্কুল ফেরত ছাত্র তার বন্ধুকে বলল, “শুভাশিস, কাল যাচ্ছিস তো? স্যরের বাড়ি?”
এমনকি ‘মানস’ নামটাও শুনলাম একজনের মুখে। কিন্তু ‘মরণ’ বলে ডাকতে শুনলাম না কাউকেই। তিরিশ বছর আগেও খুব বেশি লোকের মরণ নাম হত না। এখন তো আরওই হয় না। এক হিসেবে ভালোই হল। যদি মরণ নামে কারও সঙ্গে দেখা হতও, ‘আপনি কি অমুক সালে একদিনের জন্য অমুক স্কুলে পড়েছিলেন’ প্রশ্নটা খুব বোকা বোকা শোনাত না কী?
যাই হোক, সেই স্কুলে পড়েছিলাম দু’বছর - ওয়ান আর টু। তার মধ্যে ক্লাস টুতে জ্বরে ভুগে অনেকদিন স্কুলে যাইনি মনে আছে।
ক্লাস থ্রিতে স্কুলবদল। এর আগে স্কুলে যেতাম বাবার সঙ্গে। এবার একই রাস্তায় স্কুলে যাবার কিছু সঙ্গীসাথী জুটল। দল বেঁধে স্কুলে যাবার সুযোগ পেয়ে নিজেকে বেশ বড়ো হয়ে গেছি মনে হল। এখন বোধহয় ওই বয়েসের বাচ্চাদের একা হেঁটে স্কুলে যেতে দেওয়া হয় না, তারা পুল কারে যায়।
ধানক্ষেতের পাশে পিচ বাঁধানো উঁচু রাস্তা ধরে ভোরবেলা স্কুলে যাওয়া। টুকরোটাকরা দৃশ্য দেখতে দেখতে। অড়হর গাছের ডাল থেকে টিয়াপাখির ঝাঁক উড়াল দেয়। বিলের জলে এক ঠেঙে বকের অধ্যবসায়। ছোটো শ্মশান। ইটের তৈরি মন্দির। সাইকেলে চড়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়া লোকজন। ফণীমনসার গাছে সাপের ছেড়ে যাওয়া খোলস। আনারস গাছ। তুলসীমঞ্চ আর টিউবওয়েল। দীনহীন মুদি দোকান পেরিয়ে যাচ্ছে। পানের বরজ, পানাপুকুর। ডালে ডালে মানতের ঢেলা বাঁধা ঝুরি নামানো বটগাছ। আঁটি বাঁধা খড়ের সামনে উবু হয়ে বসে গ্রাম্য নারীপুরুষ। বাজপড়া তালগাছ। একটা গরু আর একটা বাছুরের পেছন পেছন যায় ছোট্ট মেয়ে, নাকে সিকনি, হাতে কঞ্চি। সবচেয়ে দূরের গাছগুলো নীলচে ঝাপসা।
সেই সময়টা আর সেই রাস্তাটার জন্য বোধহয় সবকিছু দিয়ে দেওয়া যায়।
এই স্কুলের দু’জন স্যরের সঙ্গে পঁয়ত্রিশ বছর পর আবার যোগাযোগ হয়েছিল। তাঁরা যখন ফোন করেন তখন মনে হয়, ‘নাহ্‌। জীবনটা পুরোপুরি বৃথা যায়নি।’

ক্লাস ফোরে বাবার অন্য শহরে বদলির ফলে স্কুল পালটাতে হল। নতুন শহরে নতুন স্কুল রামকৃষ্ণ মিশনের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত। এখানে সহপাঠী হিসেবে পেলাম আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের একজনকে - আমার খুড়তুতো ভাই শিবাজী। আমাকে আর পায় কে। তারপর থেকে স্কুলজীবনের শেষদিন পর্যন্ত দুই ভাই সহপাঠী ছিলাম।
এই স্কুলটা খুব ভালো লাগত। কিন্তু এখানে ক্লাস এইটের বেশি ছিল না। বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীই ক্লাস সিক্স থেকে অন্য স্কুলে চলে যেত। আমরা দু’ভাইও পঞ্চম শ্রেণীর পর ভর্তি হলাম আমাদের শহরের সবচেয়ে নামকরা স্কুলে, যেখানে আমাদের স্কুলজীবনের বাকিটা কাটবে।
এই স্কুলে সবচেয়ে বেশিদিন ছিলাম। ছ’বছর, ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণী। শৃঙ্খলার কড়াকড়ি ছিল। যেন ‘রামগরুড়ের বাসা, ধমক দিয়ে ঠাসা।’ সেই কড়াকড়ির ফলেই বিশৃঙ্খলার বাড়বাড়ন্তও ছিল।
স্কুলজীবনের দীর্ঘতম অংশ এটাই। ফলত ঘটনাবহুল। সব লিখতে গেলে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটবে। লেখকও সম্ভবত জীবদ্দশায় লেখা শেষ করতে পারবে না। তাই এই স্কুলে পড়ার সময়কার একটা মন খারাপ করা অভিজ্ঞতা আর কিছু হাসির গল্পগাছা দিয়ে শেষ করব।
যে স্কুলের কথা এখানে বলছি, সেই স্কুলে আমার মাসতুতো মামা-মাসীরা পড়েছে, আমার শ্বশুরমশাই পড়েছেন, খুড়শ্বশুর পড়েছেন। এমনকি আমার বাবাও অল্প কিছুদিন পড়েছেন।
বলরাম আমার সঙ্গে পড়ত। আবার আমার খুড়শ্বশুরের সঙ্গেও পড়ত। আমাদের সময় ফুটবল খেলায় পারদর্শী কিছু ছেলে বছর বছর একই ক্লাসে থেকে স্কুল টিমকে বিভিন্ন খেলায় জেতাত। কিন্তু বলরাম আদৌ ফুটবল খেলতে জানত না।
আবার বছর বছর একই ক্লাসে থাকা ছেলেদের বেশিরভাগ বিচ্ছু ধরনের, ফলত শিক্ষকদের কাছে অপ্রিয় হয়ে থাকে। অথবা এত বেশি চুপচাপ থাকে যে তাদের অস্তিত্বই বোঝা যায় না। বলরাম এর কোনওটাই ছিল না। বলরাম নিরীহ শান্তিপ্রিয় মানুষ। আবার সদালাপী মিশুকে। আমি থেকে শুরু করে চার বছরের পুরনো প্রাক্তন সহপাঠী, সবার সঙ্গে হেসে কথা বলে।
তাছাড়া বলরাম স্যরদের মধ্যে, বিশেষ করে অঙ্কের স্যরদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় ছিল। কারণ, আর সবকিছুতে পাশ করুক আর নাই করুক, অঙ্কে বলরামের একশোতে একশো পাওয়া বাঁধা। ওকে জিজ্ঞেস করলে বলত, “কী করে যেন অঙ্কগুলো মিলে যায়। এমনিতে আমি পড়শোনা খুব একটা বুঝতে-টুঝতে পারি না।”
এহেন বলরাম ক্লাস টেনের মাঝামাঝি একদিন স্কুলে এল না। তার পরদিন এল না। তার পরদিনও না। বলরাম সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চললেও ঘনিষ্ঠতা কারও সঙ্গে ছিল না। সুতরাং আমরা আস্তে আস্তে ভুলে গেলাম ওকে।

তারপর অনেক বছর কেটেছে। স্কুলের পর কলেজ শেষ হয়েছে। পেটের ধান্ধায় অর্ধেক ভারতবর্ষ ঘোরা হয়ে গেছে। সেবার ভাবলাম পুরনো শহরে একবার যাওয়া যাক।
গেলাম। রাস্তাঘাট চওড়া হয়েছে, লোডশেডিং কমেছে। শপিং মল পর্যন্ত গজিয়েছে। সবচেয়ে বড়ো কথা রেল লাইন এসে গেছে। তৈরি হয়েছে নতুন রেল স্টেশন।
এই পর্যন্ত গল্পটা একইরকম। সবার সঙ্গে এরকমই হয়। পুরনো স্কুলে যাওয়া। পুরনো স্যরদের মধ্যে যারা জীবিত তাঁদের প্রণাম করে পরিচয় দেওয়া। কারও কারও চিনতে পারা বা চক্ষুলজ্জায় চিনতে পারার ভান করা। সম্প্রতি বুড়ো হয়ে যাওয়া পুরনো দারওয়ানকে বকশিস দেওয়া ইত্যাদি।
স্কুল থেকে বেরিয়ে এলোমেলো ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। শহরের মোটামুটি মাঝখানে একটা ব্যস্ত চৌরাস্তা আছে। আমাদের ছোটোবেলাতেও ছিল। ফলের দোকান, ফুটপাথে ছিটকাপড়ের দোকান সব মিলিয়ে আগের মতোই জমজমাট।
কেউ নাম ধরে ডাকল। দেখি, ফুটপাথে গামছা আর রুমাল নিয়ে বসে থাকা হকার। একমুখ দাড়িগোঁফের মাঝখানে সেদিনের মতোই একজোড়া পিটপিটে চোখ নিয়ে আমাদের সেই বলরাম।
দু’জনেই দু’জনকে দেখে খুশি। অনেক গল্প হল, আমার গল্পই বেশি। অজকাল আমার বাড়ি গাড়ি হয়েছে, বিলেত ঘুরে এসেছি শুনে বলরাম আন্তরিকভাবে খুশি। ওর খোঁজখবর, এতদিন কোথায় ছিল, বিয়ে করেছে কি না এসব জানার আগেই সময় ফুরিয়ে গেল। ফোনে যোগাযোগ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেদিনের মতো বিদায় নিলাম।
কলকাতায় এসে খেয়াল হল ওর কোনও ফোন নাম্বার আছে কি না জিজ্ঞেস করা হয়নি, আমার নম্বরও ওকে দেওয়া হয়নি।
আর তারপর আরও অনেক বছর হয়ে গেছে, আমারও আর পুরনো শহরে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। উত্তর-পূর্ব ভারতের কোনও বাঙালি-প্রধান ছোটো শহরে বলরাম নামে কোনও দাড়িগোঁফওয়ালা গামছা বিক্রেতার সঙ্গে কারও যদি দেখা হয়, আমাকে একটু জানালে উপকৃত হব।

এবার আমাদের স্কুলের কিছু মজার গল্প। সত্যি ঘটনা অবলম্বনে। তবে পাঠকের বিনোদনার্থ কিছু জল মেশানো হয়েছে। কোনও চরিত্র কাল্পনিক নয়। তবে পিঠ বাঁচানোর সুবিধার্থে কোনও কোনও চরিত্রের নাম ঈষৎ পরিবর্তিত।

গল্প ১

কুণাল (কাঁদো কাঁদো মুখে): স্যর, শঙ্খ আমাকে মেরেছে।
সমর স্যর (সিরিয়াস মুখ): অ্যাঁ! মেরেছে? অন্যায়! ভারি অন্যায়! এর বিচার হবে। নিশ্চয় হবে।
গৌতম তালুকদার (জনান্তিকে): শোলে…
কুণাল (আশান্বিত): খুব মেরেছে, স্যর। আর গৌতম এইমাত্র ‘শোলে’ বলল।
স্যর (নির্বিকার মুখে): গৌতম, একটা উপকার করবি?
গৌতম তালুকদার (উৎসাহিত): স্যর, হেডস্যরের ঘর থেকে বেত নিয়ে আসতে হবে, তাই তো?
স্যর (অমায়িকভাবে): না না, কষ্ট করে একটু ক্লাসের বাইরে গিয়ে কান ধরে নিল ডাউন হতে হবে।
কুণাল (উশখুশ করে): উফ্‌, কী ব্যথা!
স্যর: বিচার প্রক্রিয়ায় এই অনিচ্ছাকৃত বিলম্বের জন্য আমি দুঃখিত, কুণাল। জানো তো বিচারের পথ বড়ো কঠিন। তা অপরাধ কবে ঘটেচে, বাবা কুণাল?
কুণাল: স্যর, কাল মেরেছে।
স্যর (প্রবল হতাশায়): হায়, হায়! ন্যায়ের পথে এ কী বিষম বাধা!
কুণাল (ঘাবড়ে): কী হল, স্যর?
স্যর: এই আদালতের নিয়ম অনুযায়ী অপরাধ সংঘটিত হবার পর অন্তত চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে অভিযোগ দায়ের করা না হলে দেওয়ানি বা ফৌজদারি কোনও অপরাধেরই বিচার হয় না। বসো, কুণাল। বসো, শঙ্খ।

গল্প ২

আমাদের ছিলেন সুধাংশু স্যর। চেয়ারে বসে লাস্ট বেঞ্চ অবধি নাগাল পেতেন না। তাই লাস্ট বেঞ্চের বাপির অপরাধের শাস্তি হিসেবে ফার্স্ট বেঞ্চের রাণাকে প্রবল চপেটাঘাত করতেন, আর মুখে বলতেন, “অ্যাই বাপি!” সজ্ঞানে ঘোষণাও করেছিলেন যে, নাগাল পান না বলেই উনি এরকম করেন, আর কোনও কারণ নেই। আর কৈফিয়তও দিয়েছিলেন, “নামটা তো বাপিরই বলেছি!”

গল্প ৩

আরেকবার সুধাংশু স্যরের ক্লাস থেকে, ‘স্যর, জল খেয়ে আসছি।’ বলে বারবার বেরিয়ে যাচ্ছি, আর এদিক ওদিক দু-তিন মিনিট আড্ডা মেরে, ‘আসব, স্যর?’ বলে আবার ঢুকছি। স্যর বোর্ডে লেখায় ব্যস্ত থাকায় তাকাচ্ছেন না, আর ভাবছেন আলাদা আলাদা ছেলে ঘন ঘন ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
চতুর্থবার যেই বলেছি, ‘আসব, স্যর?’, অমনি, ‘তুই তাহলে একটাই!’ বলে যে ঘটনা ঘটালেন সেটা ব্যাসদেব পরবর্তীকালে ‘কীচক বধ’ নাম দিয়ে মহাভারতে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন।

গল্প ৪

তারপর মণিময়বাবুঃ তরা আজকালকার পোলাপান ত পড়াশুনাই করস না। শুন তবে। জেইবার আমি বি.এ পরীক্ষা দিলাম, হেইবারের কথা। পরীক্ষার আর এক সপ্তাহ বাকি। একদিন সকালে বই লইয়া বইলাম। পড়তে পড়তে জখন হুঁশ ফিরল তখন দেখি চাইরদিকে অন্ধকার আর তুলসীতলায় শঙ্খধ্বনি শুনা জায়। ভাবলাম, আজকে সারাদিন সলিড পড়া হইল। আমার মায়ে দেখি আমারে কয়, “বাবুসোনা, তুমি তিনদিন ধইরা পড়তাসো।”
আমার পাশ থেকে অমিতাভঃ স্যর, সারা বছর না পড়লে এই হয়।

গল্প ৫

জীবনবিজ্ঞানের সুশীলবাবু ক্লাসে শান্তিভঙ্গকারী ছাত্রদের ডেকে এনে সামনে দাঁড় করিয়ে অভিনয় করাতেন। কীসের অভিনয়? না, অপরাধ সংঘটিত হবার মুহূর্তে স্যর যে প্রাণী বা উদ্ভিদ সম্পর্কে পড়াচ্ছিলেন সেই প্রাণী বা উদ্ভিদের ভূমিকায়। উদাহরণ, ‘মাকড়সা’ চ্যাপ্টার পড়ানোর সময় নির্মলকান্তি পাল যদি লাস্ট বেঞ্চে ফিসফিস করে কথা বলতে গিয়ে ধরা পড়ে, তাহলে পরের দৃশ্য হবে - ডায়াসের সামনে নির্মলকান্তি পাল অদ্ভুত অষ্টাবক্র ভঙ্গিতে হামাগুড়ি দিচ্ছে আর সুশীলবাবু পড়িয়ে চলেছেন, ‘এঁইটা এঁকটা মাকড়সাঁ। এইঁটা কঁথা বঁলতে পাঁরে নাঁ’ ইত্যাদি।

গোটা স্কুলজীবনটাকে একটা লেখায় ধরার যোগ্যতা আমার নেই। কিছু বাছাই করা সময় তুলে এনে তোড়া বাঁধার সাধ্যমতো চেষ্টা করলাম শুধু।
_____

No comments:

Post a Comment