অতীতের আয়নাঃ চাকার আজব জুতোঃ সুজিতকুমার নাহা




পায়ের যেমন জুতো, চাকার তেমনি টায়ার। উপযোগিতার দিক দিয়ে বিচার করলে উভয়ের মধ্যে রয়েছে অনেক মিল। তাই টায়ারকে ‘চাকার জুতো’ বলে মনে করা যেতে পারে, তাই না?
চাকার আবিষ্কার হয়েছিল প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে। পরবর্তীতে শুরু হয়েছিল কাঠের চাকার ব্যবহার। আসিরীয়দের রথের চাকা ছিল টায়ারবিহীন, তবে পরিসীমার কাঠ হত বেশ পুরু। এই ব্যবস্থায় ঘন ঘন চাকা পালটানোর হ্যাপা এড়ানো যেত। আসিরীয়দের এবম্বিধ কর্মকাণ্ডের সময়কাল মোটামুটিভাবে ৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।


চামড়ার টায়ার
চাকার ওপর আলাদা কোনও কিছুর বেড় লাগানোর সূচনা হয়েছিল ফারাও টুটেনখামেনের কালে। টুটেনখামেনের রাজত্বকাল ১৩৩২ থেকে ১৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। যখন ফারাও হন তখন তিনি খুবই ছোটো, বয়স দশ বছরও পূর্ণ হয়নি। তাঁর রথের চাকায় চামড়ার টায়ার পরানো হয়েছিল। বালক ফারাও-এর ভ্রমণকে আরামদায়ক করার বাসনায় তখনকার ইঞ্জিনিয়ারেরা অনেক মাথা ঘামিয়ে কায়দাটা বের করেছিলেন।

লোহার টায়ার
টায়ারের উপকরণ হিসেবে চামড়া মোটেই উপযুক্ত নয়। যানের ভার বহন এবং ঘর্ষণের কারণে চামড়ার টায়ার নষ্ট হত খুব তাড়াতাড়ি। ঘন ঘন টায়ার পালটানো রাজারাজরাদের বেলায় সম্ভব হলেও সাধারণের পক্ষে ব্যাপারটা মোটেই সহজ নয়।
তাই এবার এল লোহার বেড়ের টায়ার। দক্ষিণ ও পশ্চিম ইউরোপের আদিম অধিবাসীদের অন্যতম ছিল সেল্ট জাতি। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে সেল্টদের রথে ও মালবাহী শকটের চাকায় লোহার টায়ারের সর্বপ্রথম ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। আমাদের দেশের গ্রামে-গঞ্জে গরুর গাড়ির চাকায় আজও এই প্রকারের টায়ারের দেখা পাওয়া যায়।
লোহার টায়ারের ভালোমন্দ বিচার করলে দেখা যাবে, মন্দের পাল্লাই বেশি ভারী। চাকার ক্ষয় রোধ করার ব্যাপারে লোহার টায়ার উপযোগী হলেও এধরনের টায়ার রাস্তাঘাটের ক্ষতি করে। চলবার সময় হয় প্রচুর ঝাঁকুনি এবং বিকট আওয়াজ। কিন্তু ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের আগে পর্যন্ত টায়ারের উপকরণ হিসেবে কোনও বিকল্প জিনিসের অপ্রাপ্যতা টায়ারের অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল।

রবারের টায়ার
উনিশ শতকের মধ্যভাগে টায়ারের উপকরণ হিসেবে এল রবার। বলে রাখা দরকার, রবারগাছের তরুক্ষীর (ল্যাটেক্স) থেকে পাওয়া কাঁচা রবারকে অনেক চেষ্টা-চরিত্তির করে গড়ে-পিটে নিয়ে তবেই এই কাজে নামানো সম্ভব হয়েছিল। আসলে কাঁচা রবারকে সরাসরি প্রায় কোনও কম্মেই লাগানো যায় না। বস্তুটা ঠাণ্ডায় জমে খুব শক্ত হয়ে যায়, আবার গরমে নরম চটচটে অবস্থাপ্রাপ্ত হয়। এরকম গোলমেলে জিনিস দিয়ে ভারবাহী টায়ার তো দূরের কথা, কোনও সাধারণ বস্তুও যায় না বানানো।
উষ্ণতার সাথে রবারের অবস্থার পরিবর্তন রোধ করার লক্ষ্যে রবারের সাথে বিবিধ দ্রব্য মিশিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়েছিলেন অনেকেই। কিন্তু সাফল্য না পেয়ে অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন সবাই।
চার্লস গুডইয়ার
ব্যতিক্রম ছিলেন একজন, আমেরিকার চার্লস গুডইয়ার। আর্থিক অনটন, সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতা, ভগ্ন স্বাস্থ্য, কোনও কিছুকেই পরোয়া না করে প্রায় সারাজীবন নিয়োজিত করেছিলেন এই কাজে। তাঁর উদ্যোগ সাফল্য পেয়েছিল। আঠারোশো উনচল্লিশ সালে ‘ভালকানাইজেশন’ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন গুডইয়ার। কাঁচা রবারের সাথে গন্ধক মিশিয়ে উত্তপ্ত করে ‘ভালকানাইজড’ রবার নামের উন্নতমানের মজবুত রবার বানাতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।

উপযুক্ত গুণসম্পন্ন রবার উদ্ভাবনের পর টায়ারের অগ্রগতি দ্রুত হতে থাকে। ভালকানাইজড রবার আবিষ্কারের স্বল্পকালের মধ্যেই নিরেট (সলিড) রবারের টায়ারের প্রচলন হল। এই টায়ারের গঠন মজবুত, ক্ষয় কম। নিরেট রবাবের টায়ারের আবির্ভাব প্রযুক্তিগত বিচারে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হলেও এই ধরনের টায়ারের কিছু অসুবিধেও ছিল। এগুলি হত বেশ ভারী, ঝাঁকুনি কমানোর ব্যাপারেও তেমন কার্যকর ছিল না।
রবার্ট উইলিয়াম থমসন
টায়ার প্রযুক্তির পরবর্তী অগ্রগতি বায়ুস্ফীত (নিউম্যাটিক) টায়ারের উদ্ভাবন - প্রকৃত অর্থেই ছিল বৈপ্লবিক। রবার্ট উইলিয়াম থমসন ১৮৪৫ সালে বায়ুস্ফীত টায়ার উদ্ভাবন করেন। থমসন তাঁর টায়ারের নাম দিলেন ‘আকাশ চাকা’ (এরিয়াল হুইল)। বাইরে পুরু চামড়ার টায়ার ও ভেতরে রবারের প্রলেপযুক্ত ক্যানভাসের টিউব, এই দুটি অংশ নিয়ে গঠিত ছিল আকাশ চাকা। চামড়ার টায়ারটা নাট-বল্টু দিয়ে চাকার সাথে আটকে দেওয়া হত। টিউবের মধ্যে পাম্পের সাহায্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হত বাতাস। চাকা ও রাস্তার মাঝে থাকত ঠাসা বায়ুর একটা স্তর। তাই ঝাঁকুনি কমানোর ব্যাপারে আকাশ চাকা ছিল খুবই পারঙ্গম।
সময়ের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে ছিল থমসনের নিউম্যাটিক টায়ার। তখন রাস্তায় চলত ঘোড়ায় টানা গাড়ি আর বাষ্পচালিত শ্লথগতির যান। নিরেট রবারের টায়ার দিয়েই এই যানগুলোর প্রয়োজন দিব্যি মিটে যেত। তাই নিউম্যাটিক টায়ার জনমানসে কোনও সাড়া ফেলতে পারল না। কিছুকালের মধ্যেই বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে গেল আকাশ চাকা।

জন বয়েড ডানলপ
কেটে গেল ৪৩ বছর। নতুন করে ১৮৮৮ সালে উদ্ভাবিত হল বায়ুস্ফীত টায়ার। নব্য উদ্ভাবক বেলফাস্টের জনৈক পশুচিকিৎসক, নাম জন বয়েড ডানলপ। পশুচিকিৎসক হিসেবে রবার-নির্মিত সামগ্রীর সাথে ডানলপ সম্যক পরিচিত ছিলেন। বায়ুপূর্ণ টায়ার বানাতে সেই জ্ঞান কাজে লাগালেন ডানলপ। সাইকেল নামক দ্বিচক্রযানটি তখন বেশ জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। সাইকেলে ব্যবহারের জন্য বায়ুস্ফীত টায়ার বানিয়ে ফেললেন ডানলপ। টায়ারের দুটি অংশ - একটি রবারের টিউব, আর একটি রবার প্রলেপিত কাপড়ের লম্বা ফিতে। চাকার রিমে রবার টিউব পরিয়ে পাম্প করে বাতাস ঢুকিয়ে দেওয়া হত। তারপর চাকার স্পোকের মধ্যে দিয়ে গলিয়ে নিয়ে ফিতেটির সাহায্যে টিউবটাকে রিমের সাথে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বাঁধা হত। এই অদ্ভুত গঠনের জন্য টায়ারগুলোকে লোকেরা নাম দিয়েছিল ‘মমি টায়ার’!
পরবর্তীতে মমি টায়ারের জটিলতা বর্জন করে রবারের টিউব ও তার ওপরে একটা আলাদা রবারের আচ্ছাদন দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়। টাকার রিমের দু’পাশে দুটি খাঁজ সন্নিবেশিত করে এমন বন্দোবস্ত করা হয় যাতে টিউবটিতে হাওয়া ঢোকালে টিউবটি ফুলে উঠে আচ্ছাদনের দু’ধারের ওপর আঁট হয়ে চেপে বসে। আজকের নিউম্যাটিক টায়ারেও মূলত এই ব্যবস্থাই বলবত রয়েছে।
_____

ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a Comment