গল্পঃ একদিন মিহিরগড়েঃ অদিতি ভট্টাচার্য্য



এই সেই জায়গাটা। এত বছর বাদেও চিনতে পেরে মনটা উৎফুল্ল হয়ে উঠল। ঠিক কত বছর হবে? হিসেব করে দেখলাম খুব কম নয়, চল্লিশ বছর। চার দশক! তখন আমি ছিলাম বছর পঁচিশের নবীন যুবা আর আজ বার্ধক্যের স্পর্শ পাওয়া পঁয়ষট্টি বছরের মানুষ। জায়গাটা চিনতে পাওয়ার আনন্দে চারদিকে ভালো করে তাকালাম। এই গাছটা তখনও এরকম মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল, এখনও আছে। শুধু আমারই মতো আর একটু বুড়ো হয়েছে বোধহয়। তখনও এখান থেকে দুর্গটার দারুণ ভিউ পাওয়া যেত, এখনও যায়। কিছুই পালটায়নি।
পিকুরা ততক্ষণে এগিয়ে গেছে। পেছন ফিরে আমাকে বলল, “দাঁড়িয়ে পড়লে কেন, বাবা? চলো।”
এখানে একটু থাকতে পারলে ভালোই হত, কিন্তু ছেলে দেবে কি না সন্দেহ, তাই বাধ্য হয়ে এগিয়ে চললাম।
এ দুর্গ আমার আগেও দেখা, অবশ্য বারবার দেখেও পুরনো হয় না। তবে আমি কতটা দেখছি সন্দেহ আছে, আমি বারবারই পেছনে ফিরে যাচ্ছি। চল্লিশ বছর আগের সেদিনকার ঘটনাটার কথা ভাবছি আর প্রতিবারের মতো আবার অবাক হচ্ছি।
সেবার জয়পুরের কাজটা শেষ হয়ে যাবার পরও হাতে দিন তিনেক সময় ছিল। এরকম যে হতে পারে তার একটা আন্দাজ আগেই পেয়েছিলাম। তাই ভেবেই রেখেছিলাম যে আশেপাশে একটু ঘুরে বেড়াব। তা সে যতই বাইরে মে মাসের চাঁদি ফাটা রোদ হোক না কেন আর জায়গাটা রাজস্থান। আসলে রাজস্থানের প্রতি ছোটোবেলা থেকেই এক অমোঘ আকর্ষণ আছে আমার। সেই যবে প্রথম রাজকাহিনি পড়েছিলাম, তবে থেকেই বোধহয়। রাজস্থান বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রাজপুত রাজাদের শৌর্য-বীর্যের কাহিনি, পদ্মিনীর জওহর ব্রত – এরকম কত কিছু! কাজ শেষ হয়ে যেতেই তাই রাতের যোধপুরের ট্রেন ধরলাম। না, জয়পুরের আশেপাশে ঘুরিনি, সোজা যোধপুরের দিকেই গেছিলাম। মেহরানগড় দুর্গ এর আগেও একবার দেখেছি, কিন্তু তখন আঁকাআঁকি আমার নেশা আর পেশা দুইই হয়ে ওঠেনি, তাই দুর্গর স্কেচ করার কথা চিন্তাও করিনি। এবার তাই মনে মনে ইচ্ছে ছিল ভেতরে ঢুকে ফুলমহল, রঙমহল দেখার আগে বাইরে একটা যুতসই জায়গায় বসে একটা স্কেচ করব। এর যে একটা আলাদা আনন্দ আছে তা আর্টিস্টমাত্রই স্বীকার করবেন।
যোধপুরে পৌঁছে পছন্দমাফিক একটা হোটেল খুঁজে নিতে অসুবিধে হল না। খাওয়াদাওয়া সেরে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে চলে গেলাম মেহরানগড় দুর্গে। হোটেল থেকে দুর্গটা খুব একটা দূরে নয়। কাছাকাছি একটা নিরিবিলি ছায়া ছায়া জায়গা দেখে আঁকার জিনিসপত্র সব বার করে গুছিয়ে বসলাম। ফোর্টটার চমৎকার ভিউ পাওয়া যাচ্ছে এখান থেকে।
একমনে কতক্ষণ কাজ করেছি তার খেয়ালও নেই। খেয়াল যখন হল তখন স্কেচ প্রায় শেষ, পেটে ছুঁচোর ডনবৈঠক শুরু হয়েছে। কেক, বিস্কুট জাতীয় শুকনো খাবার আর জল আমার সঙ্গে সব সময়েই থাকে, তাই দিয়েই ক্ষুৎপিপাসা শান্ত করলাম। তারপর আবার আঁকায় মন দিলাম, দুয়েকটা জায়গায় একটু আধটু কাজ বাকি আছে। এমন সময় কানের কাছে কে যেন বলল, “ইঁহা ক্যায়া কর রহে হো?”
চমকে মুখ তুলে দেখি একটা লোক। মাথার পাগড়ি, গায়ের জামা দেখে মনে হল যোধপুরের স্থানীয় অধিবাসী। মে মাস বলে এমনিতেই টুরিস্ট খুব কম, তার ওপর এ জায়গাটায় এখন লোকজনের আনাগোনা প্রায় নেই বললেই চলে। ইনি উদয় হলেন কখন?
তার সর্বাঙ্গে চোখ বুলিয়ে বেশ গম্ভীরগলায় বললাম, “দেখতে পাচ্ছ না, কাজ করছি আমি?”
হিন্দিতেই বললাম। এর সঙ্গে এখন বকবক করার মোটেও ইচ্ছে নেই আমার। লোকটার কিন্তু চলে যাওয়ার কোনও লক্ষণ দেখলাম না, বরং বেশ গুছিয়ে বসল আমার পাশে।
“কিলা দেখা নহি?” পরের প্রশ্ন তার।
দুর্গ যে এর আগে আমি দেখেছি এবং খুব ভালো করেই দেখেছি তা একেবারে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলাম।
“কী দেখেছ? খালি ওই সোনা-রুপোর জিনিসপত্র, কামান – এই তো?” লোকটা বেশ তাচ্ছিল্যভরেই জিজ্ঞেস করল, “কেল্লা কে তৈরি করেছিল, কী করে তৈরি হল জানো এসব?”
আচ্ছা লোক তো! কথা নেই, বার্তা নেই কোত্থেকে উদয় হয়ে আমাকেই প্রশ্নর পর প্রশ্ন করে যাচ্ছে! গাইড-টাইড নাকি? দু’পয়সা রোজগারের মতলবে এসেছে?
সরাসরি অভদ্রতা না করে যতটা সম্ভব বিরক্তি প্রকাশ করে বললাম, “রাও যোধা যে এই ফোর্ট তৈরি করেছিলেন তা সবাই জানে। যোধপুর শহরের নামও তো ওঁর নাম থেকেই।”
“সির্ফ ইয়ে হি? অউর কুছ পতা নহি? এ কিলা তো তৈরিই হত না, শাপ ছিল যে,” লোকটা বলল চোখেমুখে সেইরকমই তাচ্ছিল্য ফুটিয়ে।
শাপ ছিল! মানে অভিশাপ? এ তো কখনও শুনিনি। ভরদুপুরে এ আবার কী গপ্পো ফেঁদে বসল রে বাবা।
লোকটার কিন্তু কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। সেইরকম বাবু হয়ে বসে বলে যেতে লাগল। আমি শুনছি কি শুনছি না সে খেয়াল না করেই। তবে লোকটার বলার মধ্যে এমন অদ্ভুত এক আকর্ষণ ছিল যে একসময় আমি হাতের কাজ থামিয়ে শুনতে লাগলাম। চুপ করেই।
“মাণ্ডোর ছিল তখন রাঠোর রাজা রাও যোধার রাজধানী। কিন্তু মাণ্ডোরের কিলা অনেক পুরনো হয়ে গেছিল। শত্রুর আক্রমণ আর সামলাতে পারছিল না। তখন এদিক ওদিক থেকে আক্রমণ লেগেই থাকত। বাধ্য হয়ে রাও যোধা অন্য কোনও সুরক্ষিত জায়গায় নিজের রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন। রাওয়ের বিশ্বস্ত কর্মচারীরা উপযুক্ত জায়গার সন্ধান করতে লাগল। এদের মধ্যে প্রধান ছিলেন দিওয়ান রাও নারা। রাও নারাকে দিওয়ান খেতাব রাও যোধাই দিয়েছেন। রাজকার্যে রাও নারা ছিলেন রাঠোর রাজের ডানহাত।
“জায়গা খোঁজা শুরু তো হল, কিন্তু পাওয়া যাচ্ছিল কই? কেল্লা তো আর যত্রতত্র বানানাও যায় না। তাছাড়া রাও যোধার পছন্দ অপছন্দ নিয়ে অনেক খুঁতখুঁতুনি ছিল। মাণ্ডোরের কাছাকাছি হতে হবে, আবার উঁচু পাহাড়ের ওপরও হতে হবে। কেল্লাকে তাহলে দুর্গম এবং সুরক্ষিত করা সম্ভব হবে, আবার মাণ্ডোর থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত করতে বেশি অসুবিধেও হবে না। কিন্তু এরকম জায়গা কই? এদিকে রাও যোধার আদেশ, দ্রুত কাজ শুরু করতে হবে। মাণ্ডোরের দুর্গর অবস্থা ভালো নয়, হঠাৎ করে শত্রুর আক্রমণ হলে বিপদ হবে। রাঠোর-রাজের পছন্দমতো জায়গা কিন্তু মাণ্ডোরের কাছেই ছিল। কিন্তু তার কথা কর্মচারীদের কারুর মনেই আসেনি বা মনে এলেও সেখানে যে দুর্গ তৈরি করা যাতে পারে একথা তারা কল্পনা করতেও সাহস পায়নি। ভৌরচিড়িয়া।”
“ভৌরচিড়িয়া!” আমি বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
লোকটা এতক্ষণ সামনের দিকে তাকিয়ে শূন্যদৃষ্টিতে গল্প বলে যাচ্ছিল। এখন আমার দিকে এক ঝলক দেখল। তারপর বলল, “অবাক হচ্ছ? এ জায়গাটার নাম তখন ভৌরচিড়িয়াই ছিল। তখন এরকম ছিল না ভৌরচিড়িয়া। সে-সময় ঘন জঙ্গলে ভরা ছিল ভৌরচিড়িয়া। সেখানে বাস ছিল হাজার হাজার পাখির। কত দূর থেকে যে শোনা যেত পাখির ডাক! পাখির জন্যেই পাহাড়টার এরকম নাম হয়েছিল। বলতে গেলে প্রায় জনশূন্যই ছিল ভৌরচিড়িয়া। ঘন বনের জন্যে দিনের বেলায়ও কেউ আসত না এখানে। শুধু একজন মানুষ এই ভৌরচিড়িয়ার এক গুহায় দীর্ঘদিন ধরে বাস করতেন। এক সন্ন্যাসী। এখানকার মানুষ তাঁকে খুব মান্য করত, ভক্তি করত। সন্ন্যাসীর মুখের কথা ছিল অবর্থ্য, যা বলতেন তাইই ফলে যেত। এমনই ক্ষমতা ছিল তাঁর। ভৌরচিড়িয়ার পাখিরা ছিল তাঁর অতি প্রিয়। মাণ্ডোরের মানুষ তাঁর নাম দিয়েছিল চিড়িয়ানাথজী। মনে হয় এই চিড়িয়ানাথজীর জন্যেই রাও যোধার কোনও কর্মচারীর এখানে কেল্লা তৈরি করার কথা মনেও আসেনি।
“মনে হল দিওয়ান রাও নারার। তিনি দেখলেন নতুন দুর্গ তৈরি করার পক্ষে ভৌরচিড়িয়ার মতো ভালো জায়গা আর কোথাও পাওয়া যাবে না। জায়গাটার অবস্থান মাণ্ডোরের দক্ষিণে, অল্পই দূরে। দুর্গ তৈরির সময়ে তদারকি করতেও কোনও অসুবিধে হবে না, রাজধানী স্থানান্তরিত করতেও নয়। তিনি অবিলম্বে রাজাকে নিজের পছন্দর কথা জানালেন। দু’জনে একদিন ঘোড়ায় চড়ে ভৌরচিড়িয়া পরিদর্শনেও এলেন। প্রথম দর্শনেই স্থানটি রাও যোধার অত্যন্ত পছন্দ হয়ে গেল। মনশ্চক্ষে যেন দেখতেও পেলেন পাহাড়ের ওপর সুউচ্চ এক কেল্লাকে। সে কেল্লা গড়ে উঠতেই যা দেরি, তারপর আর শত্রুর আক্রমণের কোনও ভয় থাকবে না। রাও নারাকে সাধুবাদ জানিয়ে দুর্গের কাজ অবিলম্বে শুরু করার আদেশ দিলেন রাও যোধা। এদিকে ভৌরচিড়িয়ার ওপরে ঘন বনের ভেতরে চিড়িয়ানাথজী এসব কিছুই জানতে পারলেন না। তিনি তিখন নিজের গুহায় ধ্যানমগ্ন।
“মাণ্ডোরে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। স্থপতিদের সংবাদ পাঠানো হয়েছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ শুরু করতে হবে। শয়ে শয়ে ভারবাহী উট প্রস্তুত রাখা রয়েছে প্রয়োজনীয় জিনিস ভৌরচিড়িয়ায় পৌঁছোনোর জন্যে। কিছু লোককে পাঠানো হয়েছে ভৌরচিড়িয়ার বনজঙ্গল কেটে পরিষ্কার করার জন্যে। রাঠোর-রাজ দুর্গ নির্মাণের সমস্ত দায়িত্ব রাও নারার ওপরেই দিয়েছেন। রাও নারার তাই নিঃশ্বাস ফেলার ফুরসত নেই। কাজ তো আর কম নয়!
“ভৌরচিড়িয়ার বড়ো বড়ো গাছ কাটা শুরু হল। কত যে পাখির বাসা ভাঙল, কত যে ডিম নষ্ট হল, কত যে পাখির ছানা মারা পড়ল তার ঠিক নেই। পাখিদের আর্তরবে পাহাড় ভরে গেল। চিড়িয়ানাথজী গুহার বাইরে এলেন। দেখলেন ধ্বংসলীলা। একজন দু’জন নয়, বেশ কিছু মানুষ ব্যস্ত পাহাড়ের সবুজ বিনষ্ট করতে। চিড়িয়ানাথজী জানতে পারলেন, তারা মাণ্ডোরের রাজা রাও যোধার আদেশেই এ-কাজ করছে। চিড়িয়ানাথজী তাদের বহু অনুরোধ করলেন এভাবে নির্বিচারে গাছ না কাটতে। কিন্তু কোনও ফল হল না। তারা কাজ তো বন্ধ করলই না, উপরন্তু তাঁকে শাসাল যে রাজকার্যে বাধা দিলে তিনি দণ্ডিত হবেন। পাখিদের দুরবস্থা চিড়িয়ানাথজীকে দুঃখিত করেছিল, তার ওপর কাজকর্মচারীদের এই ঔদ্ধত্য। চিড়িয়ানাথজী অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। কিন্তু এদের আর কিছু বললেন না। কর্মচারীদের ওপর রাগ করে কী হবে? তারাও তো রাজার আদেশ পালন করছে মাত্র। তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন রাও যোধার সঙ্গে সাক্ষাতের। সে সুযোগ এল একদিন।”
“এসেই বা লাভ কী হল? দুর্গ তৈরি যে বন্ধ করা যায়নি তা তো বোঝাই যাচ্ছে।” আমি আর থাকতে না পেরে বললাম।
লোকটা আবার আমার দিকে দেখল। আমার প্রশ্ন করায় যেন বিরক্ত হয়েছে বলে মনে হল।
“কী হয়েছিল তা না শুনলে বুঝবে কী করে?” গলার স্বরে আবার সেই তাচ্ছিল্য।
লোকটা যখন গল্প বলে, মনে হয় যেন চোখের সামনে সব দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু কোনও প্রশ্ন করলেই বিরক্ত হয়, সেই তাচ্ছিল্য ভরা দৃষ্টি, কন্ঠস্বর ফিরে আসে।
এদিকে গল্প শোনার আগ্রহ যে আমারও নেই তা নয়। তাই ভাবলাম, যাক গে আর ঘাঁটিয়ে কাজ নেই। যেরকম বলে যাচ্ছে বলে যাক।
“কিছুদিনের মধ্যেই ভৌরচিড়িয়ার মাথায় কিছুটা জায়গা একেবারে পরিষ্কার হয়ে গেল।” লোকটা আবার বলতে শুরু করেছে, “স্বয়ং রাও যোধা আসবেন এখানে। মাটি খোঁড়ার আগে পুজো করবেন, দেবদেবীকে সন্তুষ্ট করবেন। আজ অতি শুভ দিন। ভৌরচিড়িয়ায় তাই ব্যস্ততার শেষ নেই। চিড়িয়ানাথজী নিজের গুহা থেকে সবই দেখলেন।
“রাও যোধা এলেন যথাসময়ে। সঙ্গে রাও নারা এবং রাজপরিবারের অন্য সদস্যরা। রাজপুরোহিত পুজো শুরু করলেন। তাঁর মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে রাও যোধার জয়ধ্বনিও উঠতে লাগল। এরই মধ্যে হঠাৎ রাও যোধার নজরে পড়ল একটা গুহা, আর গুহার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চিড়িয়ানাথজী। তিনি সেদিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে বললেন, কে ও?
“এক রক্ষী জানাল চিড়িয়ানাথজীর পরিচয়। এখানকার পাখিদের প্রতি ওঁর ভালোবাসার কথাও বলল। রাও যোধা অবজ্ঞাভরে হাসলেন। আদেশ দিলেন, এক্ষুনি ওকে ওই গুহা থেকে বার করে দাও। এখানে দুর্গ তৈরি হবে, সেখানে রাজপরিবারের সদস্য, কর্মচারী, রক্ষী, দাসদাসী ছাড়া অন্য কেউ বাস করতে পারবে না। সন্ন্যাসীকে এক্ষুনি এ-পাহাড় ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেতে বলো।
“সেপাইরা ছুটল রাজ-আদেশ পালন করতে। গুহার সামনে দাঁড়য়ে থাকা চিড়িয়ানাথজীকে ধাক্কা দিয়ে গুহার ভেতরে প্রবেশ করল। সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীর সামান্য দুয়েকটা যা জিনিসপত্র ছিল তা ছুড়ে ফেলল গুহার বাইরে। রাজার আদেশ শোনাল তাঁকে।
“এবার আর আত্মসংবরণ করতে পারলেন না চিড়িয়ানাথজী। অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে উচ্চারণ করলেন অভিশাপবাণী - রাও যোধা, তোমার এত ঔদ্ধত্য যে একজন সন্ন্যাসীকে তার গুহা থেকে চলে যাওয়ার আদেশ দিচ্ছ! দুর্গ তৈরি করবে এই পাহাড়ে, এই জন্যে? তোমার এই দুর্গ তৈরির জন্যে কত নিরীহ প্রাণ নষ্ট হয়েছে তা জানো? রাজা তুমি, তোমার আয়োজনে ত্রুটি নেই, দুর্গও একদিন তৈরি করে ফেলবে এও জানি আমি। কিন্তু যে কারণে এই দুর্গ তৈরি করছ তা সফল হবে না। বাসযোগ্য থাকবে না দুর্গ। এত জলকষ্ট দেখা দেবে যে দুর্গ পরিত্যাগ করতে বাধ্য হবে তুমি।
“ভৌরচিড়িয়ার দিকে দিকে যেন প্রতিধ্বনিত হল সন্ন্যাসীর অভিশাপবাণী। রাও যোধা শুনলেন, শুনলেন উপস্থিত অন্য সকলেও। মরুরাজ্যের বাসিদা তাঁরা, জলকষ্টের কথা তাঁদের অজানা নয়। সে ভয়াবহতার কথা কল্পনা করেই তাঁদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। রাও যোধাও নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। তাড়াতাড়ি তিনি চিড়িয়ানাথজীর কাছে গেলেন, করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। বললেন, আমার অন্যায় হয়েছে। আপনি এখানেই বাস করুন। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, দুর্গ সম্পূর্ণ হলে সেখানে আপনার জন্যে একটি আলাদা কক্ষ এবং মন্দির থাকবে। আপনি আজীবন সেখানে বসবাস করতে পারবেন। নির্মাণ কাজের প্রয়োজন ছাড়া অকারণ বনাঞ্চল ধ্বংস না করার প্রতিশ্রুতিও দিলাম আমি। আপনি প্রসন্ন হোন, আপনার অভিশাপ ফিরিয়ে নিন।
“তা হয় না, যোধা। আমার কথা সম্পূর্ণ ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। বললেন চিড়িয়ানাথজী। তুমি দুর্গ তৈরি করো। জলাভাবে হয়তো তা বসবাসের সম্পূর্ণ অযোগ্য হবে না, কিন্তু খরার প্রকোপ এ অঞ্চলে থাকবেই। আমার অভিশাপ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবে না।
“রাও যোধার মনের অস্বস্তি কিন্তু দূর হল না। হাজার হোক সন্ন্যাসীর অভিশাপ, তা কি আর বিফলে যায়! দুর্গের কাজ থেমে গেল। রাও যোধার মনে শান্তি নেই। কী লাভ কাজ শুরু করে যদি দুর্গে বাস করাই সম্ভব না হয়? দুর্গর ওপর থেকে অশুভ ছায়া কাটাতে, চিড়িয়ানাথজীর অভিশাপ ব্যর্থ করতে রাঠোর-রাজ পুরোহিতদের পরামর্শ চাইলেন। অনেক আলোচনার পর উপায় বেরোল। কিন্তু তা শুনে রাও যোধা হতবাক হলেন। এ কী করে সম্ভব? কে স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসবে এ-কাজে? তিনি পুরোহিতদের এর বিকল্পের সন্ধান দিতে বললেন।
“কিন্তু তাঁরা পরিষ্কার বললেন, আর কোনও উপায় নেই, মহারাজ। এইই একমাত্র উপায়। যদি কোনও ব্যক্তি স্বেচ্ছায় দুর্গের নিচে জীবন্ত সমাধি লাভে আগ্রহী হয় তবেই এই দুর্গ সবদিক দিয়ে সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত হবে।
“আবার রাও নারাই সহায় হলেন। অনেক সন্ধান করে তিনি এক ব্যক্তিকে নিয়ে এলেন রাও যোধার সামনে। তার নাম রাজারাম মেঘওয়াল। দুর্গের সুরক্ষার জন্যে নিজের প্রাণ বলি দিতে তার কোনও আপত্তি নেই, কিন্তু একটি শর্ত আছে। শর্তটি হল, তার মৃত্যুর পর তার পরিবারের সদস্যদের জীবনধারণে যেন কোনও অসুবিধে না হয়।
“এই সামান্য শর্ত? রাও যোধার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। তিনি একটি জায়গির দান করলেন রাজারাম মেঘওয়ালের পরিবারকে। অর্থও দিলেন যথেষ্ট। তারপর শুভদিনে, শুভক্ষণে মাটির নিচে জীবন্ত সমাধি দেওয়া হল রাজারামকে। তার ওপর গড়ে উঠল রাও যোধার বহু আকাঙ্ক্ষিত দুর্গ। রাঠোর-রাজাদের কুলদেবতা ছিলেন সূর্যদেব। নতুন কেল্লার নাম তাই তাঁর নামানুসারে হল মিহিরগড়। রাও যোধা বসবাস করতে শুরু করলেন মিহিরগড়ে। দেখতে দেখতে মিহিরগড়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠল এক জনবসতি। রাও যোধার নাম থেকে তার নাম হল যোধপুর আর মিহিরগড়ও কখন যেন লোকের মুখে মুখে হয়ে গেল মেহরানগড়।’”
মিহিরগড়... মিহিরগড়... মেহরানগড়! ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম। এ কী, কখন ঘুমিয়ে পড়েছি আমি! হাতের কাজ শেষ না করেই! তার মানে গল্প শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে পড়েছি? হতে পারে অবশ্য। রাতে ট্রেনে ভালো ঘুম হয়নি, ক্লান্ত ছিলাম, তাই। এ তো দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে, রোদের তেজও আর আগের মতো নেই। আশেপাশে কয়েকজন ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা অবাক দৃষ্টিতে আমাকে দেখছে। কিন্তু ওই লোকটা কোথায় যে এখানে বসে গল্প বলছিল? গেল কোথায় সে? আশেপাশে অনেক খুঁজেও আমি তাকে আর দেখতে পেলাম না। যেমন হুট করে এসেছিল তেমন হুট করে চলেও গেছে!
চল্লিশ বছর বাদেও আমার তার বলা প্রতিটা শব্দ মনে আছে। দুর্গের নিচে জীবন্ত সমাধি দেওয়ার কথা শুনে সেদিন যেমন শিউরে উঠেছিলাম, আজও উঠলাম। সত্যিই কি রাজারাম মেঘওয়াল স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসেছিল? ওই সামান্য শর্তের বিনিময়ে? যত সহজে কথাগুলো লোকটা উচ্চারণ করেছিল রাজারামের পক্ষে কি ব্যাপারটা আদৌ এত সহজ ছিল? তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে যেতে সে কি কখনও মুক্তির কামনা করেনি? ইচ্ছে হয়নি আবার নিজের পরিবার পরিজনদের সঙ্গে মিলিত হতে? তার আত্মা কি আজও রয়েছে এখানে? এসব প্রশ্নর কোনও উত্তর যে আর পাওয়া যাবে না সে তো বলা বাহুল্য। ক’জনই বা জানে এই রাজারামের কথা? একটা কথা লোকটা ঠিক বলেছিল - সবাই আসে ওই সোনার রুপোর জিনিস দেখতে, ইতিহাস জানতে আর ক’জন চায়!
দুর্গ দেখতে দেখতে এসবই ভাবছিলাম আমি। হঠাৎ চোখ গেল সামনের জটলাটার দিকে। আরে, ওই লোকটা না? হাত-টাত নেড়ে কী বলছে কয়েকজনকে। তার মানে ও গাইডেরই কাজ করে! আমি শশব্যস্তে তার দিকে চললাম। ততক্ষণে দলটা সামনে এগিয়ে গেছে। লোকটা একেবারে সামনে। আমি পড়ি কি মরি করে তার কাছে গিয়ে তার পিঠে হাত দিয়ে ডাকলাম। লোকটা পেছন ফিরে তাকাল। আর এবার আমার লজ্জিত হওয়ার পালা। এ তো অন্য লোক! শুধু পাগড়িটা ছাড়া আর কোনও মিল নেই। দুঃখ প্রকাশ করে চলে এলাম। ভাবলাম আমারও মাথা খারাপ হয়ে গেছে। চল্লিশ বছর পেরিয়ে গেছে, সেও কি আর সেইরকমই আছে?
“তোমার কী হয়েছে বলো তো?” পিকু জিজ্ঞেস করল, “ফোর্টে আসা থেকে দেখছি অন্যমনস্ক। কাকে দেখে দৌড়তে দৌড়তে চলে গেলে? কী হয়েছে? কাউকে খুঁজছ?”
মুখে বললাম, “নাহ্‌, কিচ্ছু হয়নি।” মনে মনে বললাম, সবাইকে কি আর খুঁজে পাওয়া যায়? সেদিনও কি আর পেয়েছিলাম? আজ এত বছর পরেই বা কী করে পাব? সে গল্প শোনাতে এসেছিল, গল্প শুনিয়ে চলে গেছে।
_____



9 comments:

  1. অপূর্ব, এ তো নতুন রাজকাহিনী লিখে ফেলছো, অদিতি। ভীষণ ভালো লাগল।

    ReplyDelete
    Replies
    1. Aditi BhattacharyyaOctober 27, 2018 at 12:30 PM

      ধন্যবাদ কিশোরদা।

      Delete
  2. Replies
    1. Aditi BhattacharyyaOctober 27, 2018 at 12:33 PM

      ধন্যবাদ।

      Delete
  3. অসামান্য লেখা । মেহরানগড়ের দূর্গ আমি দেখেছি ।আফসোস তার আগে এই ইতিহাস জানা থাকলে আমার দেখাটা সম্পূর্ণ হতো ।
    অজস্র ধন্যবাদ এই অজানা ইতিহাস জানানোর জন্য ।

    ReplyDelete
    Replies
    1. অনেক ধন্যবাদ। সত্যিই তাই, যে জায়গায় যাচ্ছি তার সম্পর্কে আগে থেকে কিছু জানা থাকলে ঘোরাটা যেন বেশী ভালো হয়।

      Delete
    2. Aditi BhattacharyyaNovember 10, 2018 at 8:32 PM

      অনেক ধন্যবাদ। সত্যিই তাই, যে জায়গায় যাচ্ছি তার সম্পর্কে আগে থেকে কিছু জানা থাকলে ঘোরাটা যেন বেশী ভালো হয়।

      Delete