প্রথমাঃ বিভা চৌধুরীঃ গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়



বিভা চৌধুরী

জন্মঃ ১৯১৩, কলকাতা
মৃত্যুঃ ২ জুন ১৯৯১, কলকাতা

প্রথম ভারতীয় মহিলা পদার্থবিজ্ঞানী

আলোকপাতঃ গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


আজ তোমাদের এক মহিলা বিজ্ঞানীর গল্প শোনাব। তিনি আমাদের বাংলার কলকাতার মেয়ে, কলকাতাতেই গবেষণা শুরু করেছিলেন। তাঁর নাম বিভা চৌধুরী। আমরা বড়োরাও অনেকে তাঁর নাম শুনিনি, কিন্তু যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাদ না সাধত, তাহলে হয়তো সারা পৃথিবীর লোকই তাঁর নাম জানতে পারত।
বিভার জন্ম ১৯১৩ সালে কলকাতায়। তাঁর বাবা বঙ্কুবিহারী চৌধুরী ছিলেন ডাক্তার। মায়ের নাম ঊর্মিলা। মা ঊর্মিলার দিদি নির্মলা ছিলেন বিখ্যাত ডাক্তার নীলরতন সরকারের স্ত্রী।
বঙ্কুবিহারী ছিলেন হুগলি জেলার ভাণ্ডারহাটি গ্রামের জমিদার পরিবারের সন্তান। তিনি মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি পড়ার সময় ঊর্মিলাকে বিয়ে করার জন্য ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তোমরা হয়তো জানো, সে সময় গোঁড়া হিন্দুরা ব্রাহ্মদের পছন্দ করত না। তাই তিনি গ্রামের বাড়িতে থাকতে পারেননি, পৈতৃক সম্পত্তি থেকেও তাঁকে বঞ্চিত হতে হয়। নবদম্পতি কলকাতায় ব্রড স্ট্রিটে বসবাস শুরু করেন।
বিভা ছিলেন পাঁচ বোন এবং এক ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয়। এক বোন ছোটোবেলায় মারা যায়, বাকিরা সবাই পড়াশোনায় বিশেষ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। বিভা কলকাতার বেথুন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে স্কটিশ চার্চ কলেজে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স নিয়ে পড়াশোনা করেন, এরপর ১৯৩৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স কলেজে জন্য ভর্তি হন। ১৯৩৬ সালে সেখান থেকে পদার্থবিজ্ঞানে এম.এস.সি পাস করলেন। তাঁর আগে মাত্র দু’জন মহিলা এই কৃতিত্বের অধিকারী।
ডি.এম.বোস
এম.এস.সি পাস করার পরে ইচ্ছা গবেষণা করবেন। সেজন্য একটা সকালের স্কুলে চাকরি নিলেন যাতে গবেষণার জন্য সময় দিতে পারেন। সে সময় কলকাতায় কেন, আমাদের দেশেই প্রায় কোনও মহিলা বিজ্ঞান গবেষণা করতেন না। গেলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান দেবেন্দ্রমোহন বোসের কাছে। তিনিও বেশ নামকরা বিজ্ঞানী, তাঁকে দেশবিদেশে সবাই ডি.এম. বোস বলেই চেনে। তিনি ছিলেন বিভার আত্মীয়, তাঁর মাসি নির্মলার বড়ো মেয়ে নলিনী ছিলেন ডি.এম. বোসের স্ত্রী। তিনি পদার্থবিদ্যা বিভাগের সবচেয়ে সম্মানজনক পদ স্যার তারকনাথ পালিত অধ্যাপক হয়েছেন তিনবছর আগে। তাঁর আগে সেই পদে ছিলেন যিনি তাঁর নাম তোমরা সবাই জানো, চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রমন। ডি.এম. বোস প্রথমে রাজি হলেন না, বললেন, কোনও মহিলাকে দেওয়ার মতো কাজ তাঁর কাছে নেই। হাল ছাড়লেন না বিভা। শেষপর্যন্ত তাঁর আগ্রহে মাস্টারমশাই নরম হলেন, বিভা শুরু করলেন তাঁর অধীনে মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে গবেষণার কাজ। তাঁর আগে কোনও বাঙালি মহিলা আধুনিক বিজ্ঞানে গবেষণা শুরু করেননি।
এইখানে মহাজাগতিক রশ্মি বা কসমিক-রে কাকে বলে তোমাদের একটু বলে দিই। মহাবিশ্বে নানা ঘটনায় অনেক প্রোটন-নিউট্রন বা অন্য মৌলিক কণা ও পরমাণুর নিউক্লিয়াস তৈরি হয় এবং চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আমরা এখনও মহাজাগতিক রশ্মি কোথায় তৈরি হয় সে সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত নই। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মহাকাশে সুপারনোভা বিস্ফোরণ হয়তো একটা উৎস। এই মহাজাগতিক রশ্মির কণাদের গতিশক্তি খুব বেশি, তারা প্রায় আলোর বেগে চলাফেরা করে। আমাদের পৃথিবীতে প্রতিমুহূর্তে এইরকম অসংখ্য কণা ধাক্কা মারছে, কিন্তু বায়ুমণ্ডল থাকার জন্য তারা সরাসরি মাটিতে নেমে আসতে পারে না। বায়ুমণ্ডলের অণু-পরমাণুদের সঙ্গে এই কণাদের সংঘর্ষে অনেক নতুন মৌলিক কণা তৈরি হয়।
মৌলিক কণার সৃষ্টি বিজ্ঞানের একটা মূল লক্ষ্য। তোমরা সবাই নিশ্চয় আইনস্টাইনের E=mc2 সমীকরণটার কথা জানো। যদি সংঘর্ষরত কণাগুলোর গতিশক্তি (E) বেশি হয়, তাহলে তারা অনেক নতুন কণা তৈরির ভর (m) যোগান দিতে পারবে। যেমন সার্নে এল.এইচ.সি কণাত্বরক বা পার্টিকল অ্যাকসিলারেটরে মৌলিক কণাদের শক্তি এত বাড়ানো হয়েছে যে তাতে নতুন হিগস বোসন কণার জন্ম হয়েছে। কিন্তু ১৯৪০ সাল পর্যন্ত আমাদের কণাত্বরক দিয়ে কণাদের গতিশক্তি খুব একটা বাড়ানো যেত না। তাই নতুন মৌলিক কণার জন্য বিজ্ঞানীরা মহাজাগতিক রশ্মি পর্যবেক্ষণ করতেন।
এই নতুন মৌলিক কণাগুলো প্রায় সবই খুব ক্ষণস্থায়ী। তাদের দেখার উপায় কী? পরমাণুর চেয়েও অনেক ছোটো কণাদের চোখে তো আর দেখা যাবে না, তাদের অস্তিত্বের অন্য প্রমাণ খুঁজতে হয়। তার একটা উপায় ছিল ক্লাউড চেম্বার বা মেঘকক্ষ। তার বিস্তারিত বিবরণে আমরা যাচ্ছি না। সংক্ষেপে বলা যায় যে মহাজাগতিক রশ্মি বায়ুকে আয়নিত করে। মেঘকক্ষের মধ্যে থাকে জলীয় বাষ্প, বায়ুর আয়ন তাকে আকর্ষণ করে। ফলে রশ্মির পথ বরাবর বাষ্প জমে বিন্দু বিন্দু জলকণার জন্ম দেয়। আলো ফেলে ওই জলকণাগুলো দেখে রশ্মির গতিপথ বোঝা যায়, ছবি তুলে রাখা যায়। জলের পরিবর্তে অন্য তরলও ব্যবহার হয়।
মেঘকক্ষ বানানোর জন্য ব্রিটিশ বিজ্ঞানী সি.টি উইলসন ১৯২৭ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। ডি.এম বোস প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানিতে ছিলেন। সেখানে তিনি হাতেকলমে মেঘকক্ষ বানানোর কায়দা শিখেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসে তিনি মেঘকক্ষ বানিয়েছিলেন। কিন্তু মেঘকক্ষের একটা সমস্যা হল যে সেটা খুব অল্প সময় চালু থাকে, তারপর তাকে কিছুক্ষণ বিশ্রাম দিতে হয়। মহাজাগতিক রশ্মি তো আর বলে কয়ে আসবে না, তাই যে সময় যন্ত্রটা চালু নেই, সেই সময় তাদের ধরার কোনও উপায় নেই। বিজ্ঞানীরা তাই পর্যবেক্ষণের অন্য পদ্ধতি খুঁজছিলেন।
১৯১৪ সালে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মত বিনিময়ের জন্য  কলকাতায় শুরু হয়েছিল ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেস। ১৯৩৮ সালের কংগ্রেসে এসেছিলেন দুই বিদেশি বিজ্ঞানী, জিওফ্রে টেলর ও ভবিষ্যতের নোবেলজয়ী ওয়াল্টার বোথে। তাঁরা দু’জন পরপর ফটোগ্রাফিক প্লেট সাজিয়ে কেমন করে মহাজাগতিক রশ্মি ধরা যায় তা আলোচনা করেছিলেন। সেখানে ডি.এম বোসও উপস্থিত ছিলেন। তিনি তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছেন। তাঁর মামার নাম তোমরা জানো, আচার্য জগদীশচন্দ্র। মামা মারা যাওয়ার পরে ডি.এম বোস তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’-এর ডিরেক্টরের দায়িত্ব নিয়েছেন। বিভাও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে বসু বিজ্ঞান মন্দিরেই কাজ শুরু করেছেন।
এখন ডিজিটাল ক্যামেরার যুগ। তোমরা ফটোগ্রাফির ফিল্ম যদি দেখেও থাক, প্লেট হয়তো কেউই দেখনি। একটা পাতলা কাচের প্লেটের উপরে রুপোর যৌগ সিলভার আয়োডাইডের (বা ব্রোমাইডের) ইমালশন বা অবদ্রব লাগানো থাকে। আলো এসে পড়লে সিলভার আয়োডাইড সিলভার অর্থাৎ রুপো এবং আয়োডিনে ভেঙে যায়। রুপো প্লেটের গায়ে এঁটে যায়। আলোর পরিবর্তে যদি কোনও কণা প্লেটের মধ্যে দিয়ে যায়, তাহলে সেও সিলভার আয়োডাইডকে ভাঙতে ভাঙতে যায়। পরে তাহলে প্লেটের গায়ে বিন্দু বিন্দু রুপো জমা পড়বে। এই বিন্দুগুলো দেখে বোঝা যায় যে মৌলিক কণা কোন পথ দিয়ে গেছে। সে যদি নতুন কোনও কণার জন্ম দেয়, তাও দেখা যাবে।
ডি.এম বোসের কাছে বিষয়টা খুব আকর্ষণীয় মনে হল। এখানে সবচেয়ে বড়ো সুবিধা হল যে ফটোগ্রাফিক প্লেটকে যতক্ষণ খুশি রেখে দেয়া যায়, সারাক্ষণই সে সক্রিয় থাকবে। কোনও কণা যদি তার মধ্যে দিয়ে যায়, তাহলে সে-পথের একটা চিহ্ন রেখে দেবে। প্লেটের কোনও নিউক্লিয়াসের সঙ্গে যদি  কণার ধাক্কা লাগে, তাহলে তার পথটা বেঁকে যায়। বিভারা দেখালেন যে কতটা পথ বাঁকল তা মেপে তার থেকে কণার ভরটা নির্ণয় করা যায়। আবার ভারী কণারা একসঙ্গে বেশ কয়েকটা সিলভার আয়োডাইড অণুকে ভেঙে দেয় বলে বেশি রুপো মুক্ত করে। তাই রুপোর বিন্দুগুলো বেশি ঘন ঘন হয়। এভাবে বিন্দুর ঘনত্ব আর পথ কতটা বেঁকে গেছে তা দেখে কণাটার ভর নির্ণয় করা যায়। ১৯৪১ সালে বিভা চৌধুরী ও ডি.এম বোস ভর নির্ণয় বিষয়ে তাঁদের গবেষণাপত্র ইংল্যান্ডের বিখ্যাত নেচার পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলেন।

ছবিঃ বিভাদের দেখা মৌলিক কণার পথ। মহাজাগতিক রশ্মি ইমালশনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে তিনটি কণা তৈরি করেছে। মাঝের কণাটির পথ একটা নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে বেঁকে গেছে।

মৌলিক কণা বিষয়ে একটা সমস্যা সেই সময়ে বিজ্ঞানীরা সমাধান করার চেষ্টা করছিলেন। তোমরা সবাই ফোটন কণার নাম শুনেছ। এই কণাটা হল তড়িৎচৌম্বক বলের বাহক। বল মোট চাররকম, তড়িৎচৌম্বক বল, পীন বল বা স্ট্রং ফোর্স, ক্ষীণ বল বা উইক ফোর্স ও মাধ্যাকর্ষণ বল। নিউক্লিয় বল হল পীন বলের একটা উদাহরণ।
১৯৩৫ সালে জাপানি বিজ্ঞানী হিদেকি ইউকাওয়া নিউক্লিয় বলের বাহক হিসাবে নতুন এক কণার প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি অঙ্ক কষে দেখিয়েছিলেন এই কণার ভর হবে ইলেকট্রনের ভরের দু’শো থেকে তিনশো গুণের মধ্যে। প্রোটনের ভর ইলেকট্রনের ভরের আঠারোশো চল্লিশ গুণের কাছাকাছি। প্রোটন আর ইলেকট্রনের মাঝামাঝি ভরের কোনও কণার কথা জানা ছিল না। বিজ্ঞানীরা তাই মহাজাগতিক রশ্মির মধ্যে এই কণাকে খোঁজা শুরু করলেন। এইধরনের মাঝারি ভরের কণাদের কী নাম হবে তা নিয়ে অনেক বছর ধরে তর্কাতর্কি হয়েছিল। শেষপর্যন্ত নাম ঠিক হয় মেসন। ইউকাওয়ার প্রস্তাবিত কণাকে আগে বলা হত পাই মেসন, এখন আমরা বলি পায়ন (π)।
পরের বছরই মেঘকক্ষের সাহায্যে মহাজাগতিক রশ্মির মধ্যে মাঝারি ভরের এক কণার সন্ধান পাওয়া গেল, যদিও ভরটা ঠিকঠাক জানা তখনও যায়নি। সবাই নিশ্চিত হলেন, ইউকাওয়ার তত্ত্ব ঠিক। পরে মেপে দেখা গেল ভর ইলেকট্রনের ভরের দুশো গুণের কাছাকাছি।
তার পরে পরেই কিন্তু বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেল এই নতুন কণাটা পাই মেসন হতে পারে না। শুধু ভর মিললে তো চলবে না, অন্য অনেক কিছুই মিলতে হবে। দেখা গেল নতুন কণাটার সঙ্গে পদার্থের নিউক্লিয়াসের বিক্রিয়ার হার খুব কম। পাই মেসন পদার্থের নিউক্লিয়াসের সঙ্গে পীন বলের মাধ্যমে ক্রিয়া করবে, সেই বিক্রিয়ার হার কম হবে কেন? যাঁরা এই পরীক্ষাগুলো করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হোমি জাহাঙ্গির ভাবা। তার মানে পাই মেসনকে তখনও পাওয়া যায়নি। এই সময়েই বিভারা কাজ শুরু করলেন।
কেমন করে বিভারা কাজ করেছিলেন দেখা যাক। আগেই বলেছি, মাটির কাছে মহাজাগতিক রশ্মি আসে কম, বায়ুমণ্ডল তাদের বাধা দেয়। তাই সাধারণত ফটোগ্রাফিক প্লেটগুলো পাহাড়ের উপরে বা বেলুনে রাখা হত। বিভারা দার্জিলিং, সন্দকফু এবং ভুটান সীমান্তের কাছে ফারি জং, এই তিন জায়গায় প্লেটগুলো রেখেছিলেন। এই জায়গাগুলো ২২০০ মিটার থেকে ৪৪০০ মিটার উঁচু। এখন অনেকেই নিশ্চয়ই সন্দকফু বেড়াতে গেছ। কিন্তু আশি বছর আগে তা ছিল খুব দুর্গম জায়গা, ফারি জংতো আরও দূরে। এমন দুর্গম জায়গায় এক বাঙালি মহিলা তখন গবেষণার জন্য গিয়েছিলেন! কোথাও তাঁরা প্লেটগুলো রাখলেন বায়ুতে, কোথাও জলের তলায়, কোথাও বা কাদা আর কাঠ দিয়ে তৈরি কাঠামোর নিচে। কয়েকমাস পরে প্লেটগুলো নিয়ে এসে পরীক্ষা করা হল।
বিভা ও দেবেন্দ্রমোহন দুই ধরনের ভর পেলেন। একটা মান হল ইলেকট্রনের ভরের দুশো গুণের কাছাকাছি, অন্য একটা মান তিনশো গুণের কাছাকাছি। এখন আমরা বুঝেছি যে তাঁরা দুই ধরনের কণা দেখেছেন। কিন্তু তাদের পুরোপুরি আলাদা করতে তাঁরা পারেননি, ভর নির্ণয়েও অনেকটা ত্রুটি ছিল। সে কথায় আমরা পরে আসছি। তাঁদের পরীক্ষা থেকে আমরা দেখতে পাই যে বেশি ভরের কণাগুলো পদার্থের সঙ্গে বিক্রিয়া করে বেশি। পর পর কয়েকটি গবেষণাপত্র তাঁরা প্রকাশ করলেন। কয়েক বছর পরে ১৯৪৭ সালে ব্রিটেনে সিসিল পাওয়েল ফটোগ্রাফিক প্লেট ব্যবহার করে দুই ধরনের মেসন আলাদা করে পান। ভর মাপার জন্য তিনি বিভাদের আবিষ্কৃত পদ্ধতিই ব্যবহার করেন, তবে পদ্ধতিটা তিনি নিজেই বার করেছিলেন। আধুনিক যুগের ভাষায় আমরা বলি বিভাদের ফটোগ্রাফিক প্লেটেই প্রথম ধরা দিয়েছিল পায়ন ও মিউয়ন (μ), এই দুই ধরনের কণা। পায়নের ভর ইলেকট্রনের ভরের ২৭৩ গুণের কাছাকাছি, অন্যদিকে মিউয়নের ভর হল ইলেকট্রনের ভরের ২০৭ গুণ। পায়ন হল ইউকাওয়ার প্রস্তাবিত কণা, সে নিউক্লিয়াসের সঙ্গে পীন বলের মাধ্যমে ক্রিয়া করে। মিউয়নরা পীন বলে অংশগ্রহণ করে না। পাওয়েল এও দেখালেন যে পায়ন ভেঙে মিউয়নের জন্ম হয়। ১৯৫০ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। ফটোগ্রাফিক প্লেটের সাহায্যে নিউক্লিয় বিক্রিয়া বিষয়ে গবেষণার পদ্ধতির উন্নতি ঘটানো ও তার সাহায্যে বিভিন্ন ধরনের মেসন আবিষ্কারে জন্য তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ইউকাওয়া নোবেল পেয়েছিলেন তার আগের বছর।
সিসিল পাওয়েল
পাওয়েল ফটোগ্রাফিক প্লেট ব্যবহার শুরু করেছিলেন ১৯৩৯ সালে, বিভাদেরই সঙ্গে একই সময়ে। তিনি জানতেন যে বিভারা একই ধরনের কাজ করেছেন। তাঁর এক বইতে তিনি লিখেছিলেন যে ১৯৪১ সালেই বোস ও চৌধুরী তাঁদের প্লেটে ইলেকট্রনের থেকে ২০০ গুণ বেশি ভরের কণাদের খুঁজে পেয়েছিলেন। তাহলে কেন বিভারা পিছিয়ে পড়েছিলেন? বিভারা যে ফটোগ্রাফিক প্লেট নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন, তা হল ইলফোর্ড কোম্পানির হাফটোন প্লেট। হাফটোন প্লেটের একদিকে ইমালশন লাগানো থাকে, ফুলটোন প্লেটের থাকে দু’দিকে। স্বাভাবিকভাবেই ফুলটোন প্লেট অনেক ভালো, কিন্তু তার দাম অনেক বেশি। নিচের ছবিদুটো দেখলেই ফুলটোন প্লেট কত ভালো বুঝতে পারবে।


বিভারা কাজ শুরু করার অল্পদিন পরেই ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, তখন সমস্ত ফুলটোন প্লেট সৈন্যবাহিনীর কাজে নিয়ে নেওয়া হয়। ফলে বিভাদের হাফটোন প্লেট দিয়েই কাজ চালাতে হয়। তাই তাঁদের ভর মাপাটা ত্রুটিমুক্ত হয়নি। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে কোডাক ও ইলফোর্ড কোম্পানি থেকে আবার ফুলটোন প্লেট গবেষণার জন্য পাওয়া যায়, তাদের মানও ইতিমধ্যে অনেক উন্নত হয়েছে। পাওয়েলরা সরাসরি কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে প্লেটের আরও উন্নতি ঘটান। বিভারা ১৯৪৪ সালেই এই বিষয়ে কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন, পাওয়েলরা ব্রিস্টলে উন্নত প্লেট নিয়ে কাজ শুরু করে পরপর অনেক নতুন কণা খুঁজে পেলেন।
আমি এমন বলি না যে পাওয়েলকে নোবেল দেওয়া উচিত হয়নি। মহাজাগতিক রশ্মি ধরার জন্য ফটোগ্রাফিক প্লেটের অনেক উন্নতি তাঁর ল্যাবরেটরি থেকে হয়েছিল। বিভারা বলেননি যে তাঁরা দুটো আলাদা কণা পেয়েছিলেন। পাওয়েল নিশ্চিতভাবে কণাগুলোকে চিনতে পেরেছিলেন। ১৯৫১ সালে ডি.এম বোসও এক বক্তৃতায় বলেছিলেন যে পাওয়েলের গবেষণা নোবেল পুরস্কারের যোগ্য। নোবেল কমিটি বিভাদের নাম বিবেচনাতেই আনেনি, সম্ভবত তারা ভেবেছিল যে বিভারা শুধু মিউয়ন দেখেছেন। তার কারণ আগেই বলেছি, হাফটোন প্লেট ব্যবহার করে ভর মাপাতে কিছুটা ত্রুটি ছিল, ফলে দুই ধরনের কণার ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ না বাধলে বিভারা হয়তো ফুলটোন প্লেট ব্যবহার করতে পারতেন। তাহলে পাই মেসনের আবিষ্কর্তা হিসাবে বিভা চৌধুরী ও দেবেন্দ্রমোহন বোসের নাম বিজ্ঞানের ইতিহাসে লেখা থাকত।
বিভা গবেষণার জন্য ১৯৪৫ সালে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৪৯ সালে তিনি ম্যানচেস্টার থেকে পি.এম.এস ব্ল্যাকেটের অধীনে কাজ করে থিসিস জমা দিলেন। বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে মহাজাগতিক রশ্মির সংঘর্ষের ফলাফল নিয়ে তিনি কাজ করেছিলেন। ব্ল্যাকেট তার আগের বছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। ১৯৫২ সালে বিভা ডক্টরেট ডিগ্রি পান। ব্রিটেনে তাঁর কাজ সাধারণের মধ্যেও ঔৎসুক্য জাগিয়েছিল, ম্যানচেস্টার হেরাল্ড পত্রিকাতে তাঁর সাক্ষাৎকার বেরিয়েছিল।
১৯৪৯ সালে বিভা বম্বের টাটা ইন্সটিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে প্রথম মহিলা বৈজ্ঞানিক হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন। ইন্সটিটিউটের প্রধান ভাবা নিজে উৎসাহ করে তাঁকে নিয়ে আসেন। মহাজাগতিক রশ্মি বিষয়ে ভাবার গবেষণা পৃথিবী বিখ্যাত।
১৯৫৫ সালে ইতালিতে এক আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন; এছাড়া আমেরিকার মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে অল্প দিন পড়িয়েছিলেন। বম্বেতে তিনি ছিলেন আট বছর। এরপর একবছর বিদেশে কাটিয়ে আমেদাবাদে ফিজিক্স রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে যোগ দেন। বিখ্যাত মহাকাশবিজ্ঞানী বিক্রম সরাভাই তখন সেখানকার প্রধান। কোলার সোনার খনির ভিতরে নেমেও মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে তিনি কাজ করেছিলেন।
আমেদাবাদ থেকে তিনি স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, সাহা ইন্সটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স ও ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট ফর কাল্টিভেশন অফ সায়েন্সের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে মিলে গবেষণা তিনি চালিয়ে গিয়েছিলেন।
১৯৯১ সালের ২ জুন তাঁর মৃত্যু হয়।
বিভার পরিচিত সকলেই একমত যে তিনি ছিলেন চুপচাপ, শান্ত প্রকৃতির। দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে তিনি এত গুরুত্বপূর্ণ একটা গবেষণা করেছেন। আমেদাবাদে তাঁর কাছে গবেষণা করে ডক্টরেট করেছিলেন যোগেশ চন্দ্র সাক্সেনা। তিনি বিভার পড়ানো ও বিজ্ঞানে দখলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। বিভার কাছে তিনি ফরাসি ভাষাও শিখেছিলেন। বিভা মনে করতেন আরও বেশি সংখ্যক মেয়ের বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণায় আসা উচিত। বিভা চৌধুরী, অসীমা চ্যাটার্জির পথ দেখিয়েছেন। সেই পথ অনুসরণ করতে হবে।

রণতোষ চক্রবর্তী ভান্ডারহাটি গ্রামে অনুসন্ধান করে ও বিভা চৌধুরীর বোন উমা চৌধুরীর থেকে তাঁদের পরিবার ও বিভার সম্পর্কে কিছু তথ্য জোগাড় করে জ্ঞান ও বিজ্ঞান পত্রিকার ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রবন্ধ লিখেছিলেন। রাজিন্দর সিং বিভা চৌধুরী সম্পর্কে একটি বই লিখেছেন, সেটি এখন প্রকাশের অপেক্ষায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক অসীম কুমার গাঙ্গুলী ১৯৮০র দশকে বিভার সঙ্গে গবেষণা করেছিলেন। তাঁর থেকে তথ্য নিয়ে বেথুন কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপিকা নন্দিনী রাহা ২০১০ সালে কলেজ পত্রিকাতে বিভা সম্পর্কে লিখেছেন। টাটা ইন্সটিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের অধ্যাপক শ্রীরূপ রায়চৌধুরী ২০১৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের শতবার্ষিকী গ্রন্থে ভারতে কণা পদার্থবিদ্যা বিষয়ে গবেষণা নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। বিজ্ঞান সম্পর্কে অনেক তথ্য এবং হাফটোন ও ফুলটোন ছবিগুলি সেই প্রবন্ধ থেকে নেয়া।
_____

6 comments:

  1. খুব ভাল লেখা। আমি অধ্যাপক বিভা চৌধুরী সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। ধন্যবাদ অধ্যাপক গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়কে।

    ReplyDelete
  2. "প্রোটনের ভর ইলেকট্রনের ভরের ন’শো চল্লিশ গুণের কাছাকাছি।" লাইনটি তে টাইপিং ভুল আছে.... প্রোটনের ভর ইলেকট্রনের ভরের ১৮৪০ গুণের কাছাকাছি।

    ReplyDelete
    Replies
    1. ঠিক, সংশোধন করে নিচ্ছি। ধন্যবাদ।

      Delete
  3. এ কে জি আমাদের ক্লাস নিতেন। উনি যে বিভা চৌধুরীর সাথে গবেষণা করেছিলেন, জানতাম না। খুব সহজ ভাষায় ক্লাউড চেম্বার বুঝিয়েছেন।

    ReplyDelete
    Replies
    1. আমিও তখন জানতাম না।

      Delete