গল্পঃ সত্যাঃ অরিন্দম দেবনাথ



“হিসসসসসস, ডোন্ট মেক এনি সাউন্ড! ইট ইজ ভেরি নিয়ারবাই। ডোন্ট মুভ।”
আদেশ শিরোধার্য করে খোলা জীপে চুপ করে বসে রইলাম। এবার কী জন্তু দেখাবে কে জানে। হয়তো শেয়াল। জীবনের প্রথম জঙ্গলে আসা। তিনদিন ধরে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছি বাঘ দেখার আশায়। আর দেখা পেয়েছি? কয়েকটা হরিণ, দুটো হাতি, গোটা চারেক মোষ থুড়ি বাইসনের।
জঙ্গলের ভেতর বন-বাংলোতে জায়গা পাওয়া যায়নি। তাই থাকতে হচ্ছে জঙ্গলের বাইরে একটা হোটেলে। প্রতিদিন সকালে জঙ্গলে জীপে চড়ে ঢুকছি আর কয়েক ঘণ্টা পরে বেরিয়ে আসছি কয়েকটা পাখি, না হয় বাঁদর বা হরিণ দেখে। আর ব্যাটা গাইড রোজই বলে বেড়াচ্ছে বাঘ দেখাবে, বাঘ দেখাবে। বেশ কয়েক হাজার টাকা গচ্চা দিয়ে এই জন্তু দেখতে হবে জানলে আসতাম না। দূর দূর, এর থেকে দিঘা গেলেই ভালো হত। কেন যে জঙ্গুলে বন্ধুর পাল্লায় পড়ে জঙ্গলে আসতে গেলাম! কিছু বললেই আমার সো-কল্ড জঙ্গল এক্সপার্ট বন্ধুটি খালি শুনিয়ে যাচ্ছে, ডিসেম্বর মাস নাকি জন্তুজানোয়ার দেখার উপযুক্ত সময় নয়। আমাদের মে-জুন মাসে আসা উচিত ছিল। কেন? বাঘ-ভাল্লুক কি সাপ নাকি যে শীতঘুম দেয়? যতসব বাজে কথা। আসলে বাঘ-ফাঘ কিছু নেই, সব মেরে ফেলেছে। বোরিং। উফ্‌, একদিকে বাঁচোয়া, আজই জঙ্গলে শেষদিন।
খানিক দূরে দুটো হরিণ কান খাড়া করে চুপ করে দাঁড়িয়ে মুখটা উঁচু করে মাঝে মাঝে হাওয়ায় কিছু শুঁকছে। সামনের গাছটার ডালে কতগুলো বাঁদর লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে চিৎকার করেই চলেছে। খানিক আগে বানরগুলো গাছটার নিচু ডালে বসেছিল। এবার ওরা ক্রমশই গাছের উঁচু ডালে উঠে যাচ্ছে। জন্তুজানোয়ারের এই আওয়াজগুলো নাকি ‘কল’। মানে বাঘ-সিংহ কাছে থাকার লক্ষণ। আমাকে বোকা পেয়ে যা খুশি তাই বুঝিয়ে যাচ্ছে।
গাড়িতে বসে বসে পা-টা ধরে গেছে। গাইড আর ড্রাইভার নিশ্চল হয়ে বসে। জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে আধা জংলি হয়ে যাওয়া আমার সঙ্গী বন্ধুও একবারে পাথরের মূর্তি। না, একটু না দাঁড়িয়ে আর পারা যাচ্ছে না। সিট ছেড়ে উঠতে যাব, এমনি সময় হরিণদুটো একসাথে একটা লম্বা লাফ দিয়ে জীপের সামনে দিয়ে ছুটে পালিয়ে গেল। বাঁদরগুলোর হুপহুপানিও তুমুল পর্যায়ে পৌঁছেছে। হরিণদুটো গাড়ির সামনে দিয়ে ছুটে পালিয়ে যেতেই আমার পাদুটো কেমন যেন ভারী হয়ে গেল। সিট ছেড়ে ওঠার কথা ভুলে গেলাম। পাশ থেকে আমার বন্ধু ফিসফিস করে উঠল, “এখুনি কিছু একটা দেখতে পাবি। লেপার্ড হবার সম্ভবনাই বেশি।”
বলা শেষ হয়েছে কি হয়নি, ঝোপ ঠেলে বেরিয়ে এল হলদের ওপর কালো ছোপ ছোপ দাগওয়ালা একটা লেপার্ড। লম্বা লেজটা গুটিয়ে আছে খানিক আকাশের দিকে। এত কাছ থেকে চিড়িয়াখানা আর সার্কাস ছাড়া বাঘ দেখিনি। ভালো করে দেখব বলে উসুখুসু করে উঠতে বন্ধুটা চাপা গলায় বলে উঠল, “একদম নড়িস না।”
আমাদের গাড়িটা দেখে বাঘটা একটা হুঙ্কার দিয়ে মাথাটা দু’বার এদিক ওদিক দুলিয়ে সামনের ডালপালাওয়ালা গাছটার ওপর উঠে একটা মোটা ডালের দু’পাশে চার পা ঝুলিয়ে গাছের ডালে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। যদিও কানদুটো খাড়া হয়ে রয়েছে। আর চোখদুটোও খোলা। বাঁদরগুলো গাছের একদম মগডালে উঠে বসে আছে।
খানিক পর গাইডটা বলে উঠল, “লেটস মুভ, ইট উইল ক্যাচ আ মঙ্কি। ইট মে নট বি আ প্লিজেন্ট সিনারিও।”
ড্রাইভারকে কিছু বলতে হল না। গাড়িটা হুস করে ছেড়ে দিল। আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। ওই হুঙ্কার শোনার পর বাঘ দেখার ইচ্ছে উবে গেছে। যদি খোলা জীপে লাফ দিয়ে পড়ত বাঘ থুড়ি লেপার্ডটা! আমার চিড়িয়াখানাই ভালো।
গাড়িটা মাটি-পাথরের রাস্তা ধরে খানিক এগোতে আমি বন্ধুটিকে বললাম, “ওটা যে লেপার্ড আসছে সেটা কী করে বুঝলি? বাঘও তো হতে পারত!”
“বাঘ হলে বাঁদরগুলো গাছের মগডালে উঠত না। দেখলি না, লেপার্ডটা গাছের ডালে উঠে বসল? বাঘ ভারী শরীর নিয়ে গাছে ওঠে না। আর উঠলেও খুব উঁচুতে চড়তে পারে না। তুইও জঙ্গলে কিছুদিন ঘোর, অনেক কিছু শিখে যাবি।”
তারপরই বন্ধুটি বলল, “চল, জঙ্গল থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বুলু আঙ্কেলের দেখা করে যাই। যদি তোর ভাগ্য ভালো থাকে জঙ্গলের অনেক গল্প শুনতে পারবি।”

দুপুর বারোটার সময় জঙ্গল থেকে বেরিয়ে ঘণ্টা দুয়েক গাড়িতে চেপে পৌঁছলাম এক রাজবাড়ির সামনে। এখানেই নাকি ওই বুলু আঙ্কেল থাকেন। ওঁর পূর্বপুরুষরা নাকি ব্রিটিশ আমলে এখানকার রাজা ছিল। এতক্ষণ বন্ধুটার কথা বিশ্বাস করিনি। অনেক গুল মারে ও। তবে রাজবাড়িটা দেখে বিশ্বাস হল।
এখন দুপুর দুটো। সন্ধে নামতে ঢের দেরি। রাজবাড়ির চারপাশে খালি জঙ্গল আর জঙ্গল। পাকা রাস্তা থেকে একটা পাথর বিছানো রাস্তা চলে গেছে রাজবাড়ির গেট পর্যন্ত। গেটের দু’পাশে উঁচু কাটা তারের বেড়া দু’দিকে ছড়িয়ে। একটা সিসি ক্যামেরা বসানো আছে গেটটার মাথায়।
আমাদের গাড়িটা পৌঁছতেই বিশাল লোহার গেটটা আপনা থেকে খুলে গেল। মৃদু মোটর চলার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। একটা খ্যানখ্যানে গলায় আওয়াজ শোনা গেল। “ওয়েলকাম, ড্রাইভ স্লো অ্যান্ড গো অ্যাহেড।”
চমকে উঠলাম। কোনও মানুষজন তো দেখতে পাচ্ছি না! দেখি, গেটটার একপাশে একটা মোটা থামের গায়ে একটা ছোটো সাউন্ড-বক্স লাগানো। আমাদের গাড়িটা গেট পার করতেই পেছনের দরজাটা আপনা-আপনি বন্ধ হয়ে গেল। গাটা শিরশির করে উঠল।
একে কোনওদিন রাজাগজার বাড়িতে ঢোকার সৌভাগ্য হয়নি। তার ওপর গল্পে পড়া মোটা গোঁফওয়ালা হাতে লম্বা পেতল বাঁধানো লাঠি কাঁধে বন্ধুকধারী দারোয়ানের পরিবর্তে অত্যাধুনিক দূরনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রচালিত দ্বাররক্ষক! হিসেব মিলছে না। রাজরাজাদের সংজ্ঞা কি বদলে গেল? সামনে কোনও রোবট কর্মচারী দেখব না তো? আমার বন্ধুটি কিন্তু অবিচল। এই ভূতুড়ে ব্যাপার-স্যাপার কোনও দাগ কাটছে না ওর  আচরণে।
হঠাৎ মুখ খুলল বন্ধু। “শুনে রাখ, বুলু আঙ্কেল জার্মানিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছিলেন।”
মোরাম বিছানো রাস্তা ধরে গাড়ি এগোচ্ছে। দু’পাশে ধান আর সবজি ফলে রয়েছে। শুধু কোনও মানুষজনের দেখা নেই। এতদিন শুনেছিলাম, রাজার বাড়ি মানেই গিজগিজ করে লোকজনে। এখন মনে হচ্ছে সব বাজে কথা শুনেছিলাম।
প্রায় হাফ কিলোমিটারমতো ড্রাইভ করার পর আবার একটা গেট এল। গেটের পাশে একটা ছোটো কাচের ঘর। ওয়াকিটকি হাতে একটা হাঁটুর ওপর ধুতি পরা গায়ে মোটা চাদর জড়ানো লোক বেরিয়ে এসে ড্রাইভারকে ইশারা করল ডিকিটা খুলতে। তারপর একটা শিস দিল লোকটি। একটা বিশাল আকৃতির কুকুর বেরিয়ে এল কাচের ঘরটা থেকে। খোলা ডিকির ভেতর দু’পা তুলে আমাদের ব্যাগপত্তরগুলো শুঁকে কুকুরটা আবার ঢুকে গেল ঘরটায়। লোকটা গেট খুলে আমাদের এগিয়ে যেতে বলল।
বিশাল রাজবাড়ির চত্বরে আমাদের গাড়ি থামল। পুরো জায়গাটা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। বাঁদিকে লম্বা থাম দেওয়া ‘ইউ’ আকৃতির বাড়ি। বাড়ি না তো, একটা প্রাসাদ! সাদা ধপধপ করছে। বিশাল বিশাল বন্ধ কাঠের দরজা-জানালা। সব গাঢ় সবুজ রঙের। লম্বা টানা বারান্দা বাড়িটাকে জুড়ে রেখেছে। বাড়ির যেকোনও প্রান্ত থেকে বাড়ির প্রতিটি কোণ দেখা যাবে। অবাক লাগছে কোনও মানুষজন না দেখে।
একটা সাদা ধবধবে কাকাতুয়া দাঁড়ে বসে। গাড়িতে বসেই নজরে এল, বারান্দার দেওয়ালে পরপর আটকানো হরিণ, বাঘ, মোষের মাথা। আমরা গাড়ি থেকে নামতেই কাকাতুয়াটা দাঁড়া থেকে উড়ে আমাদের মাথার ওপর দিয়ে এক চক্কর দিয়ে উড়ে ‘ওয়েলকাম, ওয়েলকাম’ বলে আবার দাঁড়ে গিয়ে বসল।
বাড়িটার মাঝখানের সবুজ ঘাসের লনের ওপর একটা কালো কামান দাঁড় করিয়ে রাখা। ঠিক যেন তাক করে আছে আমাদের দিকে। খুব অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হচ্ছে, গাড়ি ছুটিয়ে এখুনি পালিয়ে যাই। আর কাজ নেই জঙ্গলের গল্প শুনে। চারপাশে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উঁচুনিচু পাহাড়ের মাঝে একফালি সমতলে এই বিশাল নির্জন রাজবাড়ি ভূতের আস্তানার মতো লাগছে।
আমরা গাড়ি থেকে নামলেও ড্রাইভার কিছুতেই নামতে রাজী হল না। খুব ভয় পেয়ে আছে বেচারা। আচমকা আমাদের ঠিক পেছন থেকে একজন ফিসফিস করে উঠল। “রাজাসাব আপনাদের জন্য নদীর ধারে অপেক্ষা করছেন, চলুন।”
আঁতকে উঠলাম লোকটাকে দেখে। প্রায় সাত ফুটের কাছাকাছি লম্বা। এত রোগা লোক আমি আগে খুব একটা দেখিনি। মাথায় একটাও চুল নেই। থুতনিতে সামান্য কয়েকটা দাড়ি। চোয়ালটা অস্বাভাবিক ভেতরে ঢুকে আছে। মনে হচ্ছে যেন একটা কঙ্কালের ওপর একটা চামড়ার আস্তরণ চাপানো। এই লোকটার পরনেও একটা খাটো ধুতি ও ফতুয়া। এত ঠাণ্ডাতেও গায়ে কোনও চাদর নেই। কখন যে এল লোকটা টেরই পাইনি। এত নিঃশব্দে কোনও মানুষ চলাফেরা করতে পারে? ভাবতেই গায়ের রোমগুলো খাড়া হয়ে গেল। হাতের চেটো অজানা আতঙ্কে ঘেমে উঠছে। কেন যে মরতে জঙ্গল দেখার শখ হয়েছিল!
খানিক সিমেন্ট বাঁধানো রাস্তা দিয়ে হেঁটে আমরা পড়লাম আবার একটা মোরাম বিছানো সরু পথে। রাস্তাটা ক্রমশই ঢালু হয়ে নেমে যাচ্ছে নিচের দিকে। পথের দু’পাশে বিশাল লম্বা লম্বা ঘাস। ঠিক যেন সবুজ প্রাচীরের মাঝখান দিয়ে হাঁটছি আমরা। খেয়াল করলাম, আমাদের দু’জনের রাবার সোল দেওয়া জুতোয় হালকা আওয়াজ উঠলেও সামনের লোকটার পা থেকে কোনও আওয়াজ হচ্ছে না। অথচ লোকটা একটা রাবারের ফিতে দেওয়া কাঠের খড়ম পরে আছে। লোকটা কে? আর ভাবতে পারছি না। পাদুটো ভারী হয়ে আসছে, মনে হচ্ছে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাব। আমার বন্ধু নিঃশব্দে আমার কয়েক হাত আগে আগে হাঁটছে। জ্ঞান হারানোর ঠিক আগের মুহূর্তে এক লাফে গিয়ে বন্ধুর কাঁধটা আঁকড়ে ধরলাম আর তখনই নাকে এল কড়া কফির গন্ধ। কফির গন্ধে সম্বিৎ ফিরল খানিক।
একটা বাঁক ঘুরতেই দেখতে পেলাম সামনে একটা লাল সিমেন্ট বাঁধানো ঘাট। ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গেছে একটা শুকনো নদীখাতের দিকে। ঘাটের বাঁধানো চাতালে একটা কালচে পালিশ করা কাঠের গোলটেবিল। তাকে ঘিরে একইরকম পালিশ করা তিনটে হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ার। টেবিলের ওপর রাখা তিনটে ধূমায়িত কাপ। কফির গন্ধটা আসছে ওই পাত্রগুলো থেকেই। কিন্তু এখানেও কোনও লোক নেই। সঙ্গের লোকটাও হাওয়ায় মিশিয়ে গেছে। আমার বন্ধুর চোখেও ভয়ের ছাপ দেখতে পাচ্ছি। কানে এল একটা শব্দ - ঠক, ঠক…
কেউ যেন পা টেনে টেনে হাঁটছে।
“ওয়েলকাম! ওয়েলকাম টু বুলু আঙ্কেলস হোম।”
দেখি একটা ওভারকোট পরা বৃদ্ধ সাহেব লাঠি ঠুকে ঠুকে একটু পা টেনে টেনে সামনের সিঁড়ি বেয়ে নদীর দিক থেকে উঠে আসছেন। মাথায় সামান্য ধূসর চুল। চোখের মণিদুটো উজ্জ্বল নীল। টিকালো নাক। গায়ের রং লালচে সাদা। ছিপছিপে গড়ন। প্রায় ছ’ফুটের কাছাকাছি উচ্চতা।
“সিট সিট, কফি ইজ রেডি। ঠাণ্ডাটাও পড়েছে খুব।”
“এ কী আঙ্কেল, আপনি লাঠি নিয়ে হাঁটছেন?” আমার বন্ধুটি বলল।
“আর বোলো না। বয়স তো হয়েছে অনেক। তার ওপর আমার গোড়ালির হাড় বেড়েছে। ওই যে কী বলে - ক্যালকানিয়াল স্পার। সকালে বিছানা ছেড়ে উঠে মেঝেতে পা রাখতে খুব কষ্ট হয়। খানিক বসে থাকলে ঝট করে উঠে দাঁড়তে পারি না। তাই লাঠি নিয়েছি।”
“আঙ্কেল, আমার এই বন্ধুটিকে নিয়ে এসেছি আপনার সাথে আলাপ করিয়ে দেবার জন্য। এই প্রথম ও জঙ্গলে বেড়াতে এসেছিল আমার সাথে। ভাবলাম এই পথ দিয়েই তো ফিরব, আপনার সাথে একবার দেখা করে যাই। বেশ কয়েক বছর আপনার কাছে আসা হয়নি।” বন্ধুটি বলল।
“খুব ভালো করেছ। এই জঙ্গলের মাঝে একা একা থাকি, তোমরা এলে বেশ খানিক গল্প করা যায়। বাড়ির আর সবাই শহরের বাড়িতে থাকে। এখানে কেউ আসতেই চায় না।”
“কিন্তু আঙ্কেল, এবার এত কড়া সিকিউরিটি দেখছি কেন? আপনার সব লোকজনই বা কোথায়?”
“আর বোলো না। মাস চারেক আগে আমাদের সংগ্রহশালা থেকে একটা অতি প্রাচীন ডিমের ফসিল চুরি হয়েছে। আমার মনে হয়েছিল আমার চাকরবাকরদের মধ্যে কেউ জড়িত ছিল এই চুরিতে। পুলিশ-টুলিশে খবর করিনি। এখন আর হৈ-হট্টগোল ভালো লাগে না। তাই প্রায় সবাইকে বিদেয় করে দিলাম। ইলেক্ট্রনিক গেট লাগিয়ে নিয়েছি। সিসি ক্যামেরা বসিয়ে দিয়েছি বেশ কয়েকটা। রেখে দিয়েছি চারটে চাকর আর দুই দারোয়ানকে। আর এনেছি সত্যাকে।”
“সত্যা কে, আঙ্কেল?” এবার মুখ খুললাম আমি।
“আর বোলো না। যে তোমাদের গাড়ি থেকে নামার পর এখানে নিয়ে এল ওই সত্যা।”
বুলু আঙ্কেল সবকথার আগে একটা করে ‘আর বোলো না’ জুড়ে দিচ্ছেন। এটা বোধহয় ওঁর মুদ্রাদোষ।
“লোকটাকে দেখলেই কেমন যেন গা ছমছম করে।” আমি বললাম।
“আমারও প্রথম প্রথম ওকে দেখে অস্বস্তি হত। আমার বয়স এখন পঁচাত্তর, সেই ছোটোবেলা থেকে ওকে এই এখনকার মতোই দেখছি। ও খুব ভালো গুনিন। হারানো জিনিস খুঁজে বের করতে ওর জুড়ি নেই। ওকে এনেছি ওই চুরি যাওয়া ডিম খুঁজে বের করার জন্য। আমার ছোটোবেলা থেকে দেখছি বাড়ির কোনও জিনিস খুঁজে না পাওয়া গেলে ও এসে কাঠের আগুন জ্বালিয়ে মন্ত্রতন্ত্র পড়ে আঁক কেটে সেই জিনিসের সন্ধান করত। আমার বাপ-ঠাকুরদা ওকে খুব মানতেন। আমি মন্ত্রতন্ত্রে বিশ্বাস না করলেও যা চোখে দেখেছি, তাকেই বা অবিশ্বাস করি কী করে, বলো?”
“আঙ্কেল, ওই ডিমটা কীসের ছিল?”
“সেটা নির্দিষ্ট করে বলতে পারব না। ওটা একটা বন্ধ কাচের জারে রাখা ছিল। আর সেই জারটা ছিল একটা মোটা লোহার পাতে তৈরি খাঁচার ভেতর। ওই কাঁচের জারের ভেতরে একটা গাছের ছালে ছক কেটে কিছু লেখা ছিল। আর পাশে একটা মোটা কাগজে আমার কোনও পূর্বপুরুষের সংস্কৃতে লেখা একটা নোটও ছিল। যার অর্থ, খবরদার কেউ এই ডিমটা ওই জার থেকে বের করে বাতাসের সংস্পর্শে এনো না। তাহলে জেগে উঠতে পারে ডিমের আত্মা।”
“আঙ্কেল, ওই ডিমটা কি জারসুদ্ধু নিয়ে গেছে?”
“আর বোলো না। মোটা লোহার পাত কেটে কাচের জার ভেঙে ডিমটা নিয়ে গেছে। রাতে দুটো কুকুর বাড়ির বাইরে ছাড়া থাকে। ওরা একটাও আওয়াজ করেনি। চেনা লোক ছাড়া এটা সম্ভব নয়। ডিমটা মুরগির ডিমের মতো ছোটো নয়। বরং একটা ফুটবলের মতো বড়ো।”
“আঙ্কেল...”
“তোমরা সবাই দাঁড়িয়ে কেন? বসো বসো, কফি খাও।”
ব্ল্যাক-ব্রু কফির কাপে চুমুক দিতেই মনে পড়ল, আমাকে তো জঙ্গলের গল্প শোনাতে নিয়ে এসেছিল আমার বন্ধু, তার কী হবে? বুলু আঙ্কেল তো ডিম নিয়ে পড়েছেন। তবে ডিমের ব্যাপারটা কীরকম রহস্যজনক লাগছে। ফুটবলের সাইজের ডিম আবার হয় নাকি? অবশ্য কলকাতা জাদুঘরে একটা অনেক বড়ো ডিম দেখেছিলাম। ওগুলো ডাইনোসরের ডিমের ফসিল। বড়ো বড়ো করে লেখা আছে। কয়েক কোটি বছর বয়স ওই ডিমগুলোর। এখানে তো আবার বলছে ডিমটা বাতাসের ছোঁয়ায় এনো না, ডিমের আত্মা জেগে উঠতে পারে। কী বুজরুকি কাহিনি! এমনিতেই পাখির ডিম একটু নাড়াচাড়া করলে নষ্ট হয়ে যায়, আর এই ডিম কত শো বছরের পুরনো কে জানে। সেই ডিম ফুটে নাকি বেরিয়ে আসবে ডিমের মালিক। যতসব! তারপর ওই সত্যা না কী যেন নাম লম্বা লোকটার, সেই লোকটা নাকি পঁচাত্তর বছরের বেশি সময় থেকে একইরকম রয়ে গেছে। সামনের চেয়ারে বসে থাকা এই রাজার নাতি চোখের জ্যোতি নির্ঘাত এই জঙ্গলের বাড়িতে বসে দিনরাত গাঁজা খান আর উলটোপালটা স্বপ্ন দ্যাখেন। ওই জন্যই ওঁর পরিবারের কেউ এখানে থাকে না।
“ওই যে দূরে পাহাড়টা দেখছ, ওর নাম ‘ককস-ফুট মাউন্টেন’। কেন জানো? মোরগের পা দেখেছ? ওদের পায়ে তিনটে আঙুল থাকে। ভালো করে দেখো, তিনটে পাহাড়-চূড়া দেখতে পাবে পরপর। ওই তিনটে পাহাড়-চূড়ার জন্যেই ওই পাহাড়শ্রেণীর নাম ককস-ফুট মাউন্টেন।”
কফির কাপ হাতে তুলে নিলেন বুলু আঙ্কেল।
“ওই ককস-ফুট মাউন্টেন থেকে অনেক ছোটো ছোটো ঝোরা নেমে এসে এই মোহানা নদীতে মিশেছে। যদিও বর্ষাকাল ছাড়া ওই ঝোরাগুলোতে জল প্রায় থাকে না। এখান থেকে এক কিলোমিটারমতো দূরে একটা ছোটো ঝরনা আছে। ওই ঝরনাটা আবার বেরিয়েছে একটা পাহাড়ি গুহা থেকে। আমার ছোটোবেলায় আমরা গ্রীষ্মের ছুটিতে বোর্ডিং স্কুল থেকে বাড়িতে এলে ওই ঝরনার কাছে পিকনিক করতে যেতাম। আর মার একটা শিফন শাড়ি দিয়ে ওই ঝরনার বালি-কাদা চেলে কী বের করতাম জানো? সোনার গুঁড়ো!” বুলু আঙ্কেল বললেন।
“ওই ঝরনার কাছে এক গুহায় থাকে সত্যা। একদম একা। ওর গুহার কাছে গেলে সবসময় ধুনো পোড়ার গন্ধ পাবে। আমরা ওই ঝরনার কাছে গেলে আমাদের সত্যা-দর্শনে নিয়ে যাওয়া হত। প্রথমবার কঙ্কালসার বাঁশের মতো লম্বা সত্যাকে দেখে নাকি আমি ভয়ে মার পেছনে লুকিয়ে পড়ে কাশছিলাম। আমাকে ভয় পেতে দেখে সত্যা ওর গুহায় ঢুকে কতগুলো লতাপাতা গায়ে-মাথায় চাপিয়ে এসে আমাকে জঙ্গলের একটা অজানা ফল খেতে দিয়েছিল। সেই সময় আমি খুব সর্দিকাশিতে ভুগতাম। সত্যা মাকে বলেছিল, এই ফল খেলে আমার আর সর্দিকাশি হবে না। সেই ফল খেয়ে কিনা জানি না, আমার জ্ঞান বয়সে কোনওদিন সর্দিকাশি হয়েছে বলে মনে পরে না।”
আমি বললাম, “এখন আর এই নদীতে সোনা পাওয়া যায় না?”
বুলু আঙ্কেল বললেন, “যায় হয়তো। আমি ছোটোবেলায় স্বপ্ন দেখতাম, নদী ধরে এগিয়ে গুহার ভেতর গিয়ে সোনার খনি খুঁজে বের করব। কিন্তু আমাদের ওই ঝরনার আগে আর যেতে দেওয়া হত না। বেশ কয়েকটা গানম্যান আমাদের পিকনিক স্পটের আশপাশটা লোডেড গান নিয়ে পাহারা দিত।”
“কেন আঙ্কেল, ডাকাতের ভয় ছিল? আপনি বড়ো হয়ে আর সোনার খনির খোঁজ করেননি?”
“না হে, ডাকাতের জন্য নয়। গানম্যানরা আমাদের পাহারা দিত বুনো জন্তুর ভয়ে। সোনার খনির আর খোঁজ করিনি, কারণ বড়ো হয়ে বুঝেছি অনেক পাহাড়ি নদীতেই অল্পবিস্তর সোনা পাওয়া যায়। কিন্তু নদীর বালি চেলে সোনা বের করা মোটেই লাভজনক নয়।”
“আচ্ছা আঙ্কেল, ওই ডিমের কথা লোকজন কি জানত?” প্রশ্ন করল আমার বন্ধু।
“আগে খুব বেশি লোক জানত না। কিন্তু সম্প্রতি জেনেছে।”
“কী করে?”
হায় রে, একটা সোনার খনির খোঁজ পেতে চলেছিলাম, সেই সুযোগটা হাতছাড়া হতে চলেছে। বুদ্ধুটা ডিম নিয়ে প্রশ্ন করার আর সময় খুঁজে পেল না?
“খুব বেশি লোক জানত না। কারণ, আমাদের সংগ্রহশালা একান্তই ব্যক্তিগত। এই যে তুমি আমার সাথে এতবার দেখা করতে এসেছ, আমাদের পারিবারিক সংগ্রহশালা দেখছ কি? দেখনি। তুমি শুধু আমাদের লাইব্রেরি দেখেছ।
“কয়েকমাস আগে দিল্লীর এক মহিলা সাংবাদিক এসেছিল আমার ইন্টারভিউ করতে। কী মতিভ্রম হয়েছিল, ওকে আমাদের সংগ্রহশালাটা দেখিয়েছিলাম। মেয়েটা গিয়ে আমার সাক্ষাৎকারটা ছাপল ঠিকই, কিন্তু লেখাটার অধিকাংশটাই জুড়ে ছিল ওই ডিমটার কথা। ডিমের জারে রাখা কাগজটার কথা। মেয়েটার নিজের মন্তব্য ছিল, ওটা ডাইনোসরের ডিম না হয়ে যায় না। বাতাসের ছোঁয়া লাগলে ডিম ফুটে বাচ্চা ডাইনোসর বেরোবে, তারপর দাপিয়ে বেড়াবে এই জঙ্গলে। খোঁজ করলে আমাদের এস্টেটের আশেপাশে আরও ডাইনোসরের ডিম ও ফসিল খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। এ কী, তোমাদের কাপ তো খালি হয়ে গেছে! দাঁড়াও, আগে কফির ব্যবস্থা করি।”
চেয়ার থেকে উঠে খানিক দূরে ঢালাই লোহার বাহারি স্ট্যান্ডে ঝোলা একটা চকচকে পিতলের ঘণ্টার পাশে রাখা ছোটো কাঠের হাতুড়ি দিয়ে ঢং করে আওয়াজ করলেন বুলু আঙ্কেল। তারপর হাঁক ছাড়লেন, “ভীমা, ও ভীমা, কফি লে আও।
“কয়েকদিন আগে উত্তরাখণ্ডের জসপুরে মাটির তলা থেকে একটা ডাইনোসরের মতো প্রাণীর মৃতদেহ পাওয়া গেছে। কাগজে দেখেছ নিশ্চয়ই! সেই প্রাণীটার কঙ্কালের গায়ে আবার নাকি মাংসের টুকরো লেগে ছিল। মেয়েটার মাথায় বোধহয় ওই খবরটা গেঁথে ছিল। এই ডিমটার সাথে ওই ডাইনোসর মিলিয়ে দিব্যি বিশাল গল্প ফেঁদে দিল।
“আর বোলো না। ওই সাক্ষাৎকারটা পরে কত লোক যে যোগাযোগ করেছে ডিমটা দেখতে আর কিনতে চেয়ে! ওহ্‌, পাগল হয়ে গেছিলাম প্রায় ফোন ধরতে ধরতে।
“এক আমেরিকান সাহেবের এজেন্ট তো আবার এখানে এসে উপস্থিত হয়েছিল। পাঁচ কোটি টাকা অফার করেছিল ডিমটা কিনতে। ব্যাটাকে হাঁকিয়ে দিয়েছিলাম গেট থেকে। সে হুমকি দিয়েছিল, ডিমটা সে নেবেই যেকোনও মূল্যে।”
“পাঁচ কোটি টাকা! একটা ডিমের জন্য? তা আপনি দিলেন না, আঙ্কেল?” আমি বললাম।
“আমার কাছে পারিবারিক জিনিসের মূল্যবোধ অনেক বেশি। টাকার আমার দরকার নেই। আমার অনেক আছে। ক’দিনই বা আর বাঁচব।”
“ডিমটা কি ওই আমেরিকান সাহেব ঘুরে যাবার পর থেকেই উধাও?”
“আর বোলো না। তবে ওটা আমেরিকান সাহেব ছিল না, ওর এজেন্ট। নাহ্‌, ডিমটা চুরি হয় ওই লোকটা ঘুরে যাবার মাসখানেক পর। আমার কাজের লোকেরা বহুদিনের পুরনো। কেউ কেউ আবার বংশানুক্রমিক। ওদের চট করে হাত করা অত সহজ ছিল না।”

জঙ্গল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে আসতে আসতে বুলু আঙ্কেলের সাথে ফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে নিয়েছিল আমার বন্ধু। বলেছিল, “এরকম ঝকমকে চরিত্র আর পাবি না। জার্মানিতে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পর লন্ডনের অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করা এই ভদ্রলোক একাধারে ভালো লেখক, অসাধারণ চিত্রকর, শিকারি, পর্যটক  এবং অ্যাডভেঞ্চারার। অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ভদ্রলোকের। তার থেকেও বড়ো কথা লোকটা গল্পের জাদুকর। একদম মেসমারাইজ করে রাখেন। ভদ্রলোক বলেন, আমি বেশি পড়াশুনা করিনি, কিন্তু পড়েছি অনেক। আমি যখনই ওঁর বাড়ি যাই, দেখি লোকটার আঙুলের ফাঁকে কোনও না কোনও বইয়ের পৃষ্ঠা ধরা।”
কোন ভুল নেই যে ভদ্রলোক গল্পের জাদুকর। বেশ বুঝতে পারছি, ওঁর কথা বলার ধরনে আমি সম্মোহিত হয়ে যাচ্ছি।

“ওই মাসচারেক আগে আমাদের সংগ্রহশালা ঝাড়পোঁছ করতে গিয়ে ভীমাই দেখে লোহার পাত কেটে, কাচের জার ভেঙে কেউ ডিম সরিয়ে নিয়েছে।” বুলু আঙ্কেল বললেন।
“ডেটটা ঠিক কী ছিল?” আমার বন্ধু বলল।
“ওহ্‌, তোমার তো আবার গোয়েন্দাগিরির শখ। কিন্তু তোমাকে গোয়েন্দা হতে হবে না। সত্যা যা করার করবে।
“কী হল? মনখারাপ হয়ে গেল? সঠিক ডেট বলা মুশকিল। কারণ, ওই ঘর মাসে একবার করেই খোলা হত ঝাড়পোঁছের জন্য।”
দিনের আলো কমে আসছে। খিদেও পেয়েছে জব্বর। মাঝে মাঝে নদীর বুক থেকে ছিটকে আসা জোরালো হাওয়ায় শরীরে কাঁপুনি ধরছে।
বুলু আঙ্কেল বোধহয় আমার মনের কথা টের পেয়েছেন। লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে পেছনে রাখা ঘণ্টাটায় হাতুড়ি ঠুকে চেয়ারে বসতে না বসতে ভীমা এসে উপস্থিত হল।
“কফি অউর নাস্তা লে আও, অউর সত্যা কো ভেজ দো।
“ও হ্যাঁ, তোমরা তো এসেছিলে জঙ্গলের গল্প করতে, আর আমি দিব্যি ভুলে গেছি। আর বোলো না, সব বয়েসের দোষ। তারপর তোমাদের জঙ্গলভ্রমণ কেমন হল? গাছপালা বেড়েছে কিছু?”
“একটা লেপার্ড দেখেছি, আঙ্কেল!” আমি উত্তেজিত হয়ে বলে ফেললাম।
“বাহ্‌, এবার আমার এক অভিজ্ঞতার কথা শোনো।
“১৯৬২ সাল। তখন শিকার করা অপরাধ ছিল না। আর আমাদের পরিবারে শিকার তো ছিল খেলার অঙ্গ। এই জঙ্গলে শিকারের অভাব তো ছিলই না। আমরা দু-চারটে শিকার করলে বরং জঙ্গলের মানুষ খুশিই হত। আমি নিজেই বেশ কয়েকটা হাতি আর লেপার্ড মেরেছি। হরিণ আর বুনো শুয়োর যে কত মেরেছি নিজেও জানি না। হরিণ আর শুয়োর মেরে তার মাংস বিলিয়ে দিতাম গ্রামে।”
প্রায় ঠাণ্ডা হয়ে আসা কফির কাপে চুমুক দিলেন বুলু আঙ্কেল।
“আমার কলেজ জীবনের এক বন্ধু বব ফিফস এসেছিল শিকাগো থেকে। ববের বাবা আর আমার বাবা দু’জনে ব্যাবসাসূত্রে খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। বব ইন্ডিয়াতে এলে একবার আমাদের এস্টেটে আসত শিকার করার জন্য।
“ববদের পরিবারে সবাই ওস্তাদ শিকারি। ওর বাবা, ওর ঠাকুরদা, ওর মা... ববের সাথে আমি ইন্ডিয়ার অনেক জায়গায় শিকারে গেছি। কিন্নর, লাহুল-স্পিতি, লাদাখ। কুমায়ুনের হাই অল্টিচুডে ব্লু-শিপ শিকার করেছি অনেক। আমাদের এস্টেটে এলে বব সম্বর শিকার করতে চাইত।”
ভীমা কফি নিয়ে এসেছিল। ধোঁয়া ওঠা তিনটে কফির মগ আর বিশাল বড়ো একটা প্লেটভর্তি পকোড়া নামিয়ে রেখে খালি হয়ে যাওয়া কফির কাপ তুলে নিয়ে গেল।
“সত্যা কো আনেকে লিয়ে বোলা?” বুলু আঙ্কেল জানতে চাইলেন।
“হ্যাঁ, রাজাসাব, ওয়হ আ রহা হ্যায়।”
“নাও নাও, কফি-পকোড়া খাও। খুব ঠাণ্ডা পড়েছে আজ।
“সেবার বব আসতেই যথারীতি শুরু হয়ে গেল শিকারের আয়োজন। ককস-ফুট মাউন্টেনের যে ঝরনার কাছে আমরা ছোটোবেলায় পিকনিক করতে যেতাম, ঠিক হল সেবার আমরা ওখানেই শিকারে যাব।” বললেন বুলু আঙ্কেল।
ছোটো একটা চুমুক দিয়ে দু’চোখ বন্ধ করে কফির গরম মগটা দু’হাতের মধ্যে চেপে ধরলাম। ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া হাতটায় সাড় এল খানিক।
কয়েক মুহূর্ত পরে চোখ খুলে দেখি, বুলু আঙ্কেল তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। ভুল ভাঙল অচিরেই। উনি আমাকে দেখছেন না। ওঁর নজর আমার পেছনের দিকে।
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, সত্যা দাঁড়িয়ে আছে ঠিক আমার চেয়ারের পেছনে। এত নিঃশব্দে এসেছে যে টের পাইনি। এই শীতেও লোকটা প্রায় উলঙ্গ হয়ে আছে। কোমরে একফালি হরিণের চামড়া জড়ানো। সমস্ত শরীর সাদা হয়ে আছে। সম্ভবত ছাই মেখেছে শরীরে। চোখদুটো প্রায় বোজা। শরীরের সমস্ত হাড় ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ছাইমাখা শরীরটা ঠিক যেন একটা আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যাওয়া কঙ্কাল।
“সারে ইন্তেজাম হো গয়া?”
“জি, আজ রাত দো বাজে ইয়াহা হি হোগা পূজা।”
“ঠিক হ্যায়। অব যাও।”
বলার প্রায় সাথে সাথে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল লোকটা। আমার গাটা আবার শিরশির করে উঠল।
“আর বোলো না, এই সত্যার সবকিছুই উলটো। অন্যসব গুনিন-তান্ত্রিক তাদের পূজাপাঠ করে অমাবস্যার রাতে। আর সত্যার যত যাগযজ্ঞ হয় পূর্ণিমার রাতে। আমি বলি কী, তোমরা আজ রাতে থেকে যাও এখানে। আমার সাথে দেখো সত্যার ক্রিয়াকলাপ। লাইফ-টাইম এক্সপেরিয়েন্স হবে।”
আমার বন্ধুটি একবার আমার দিকে তাকাল। আমি বললাম, “আমাদের আপত্তি নেই।”
বুলু আঙ্কেল আবার চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। ঘণ্টার কাছে গিয়ে হাতুড়িটা ঘণ্টার গা থেকে তুলে নিয়ে একটা আঘাত হানলেন ঘণ্টার গায়ে। ঢং করে ওঠা আওয়াজের অনুরণন শেষ হবার আগেই ভীমা এসে দাঁড়াল।
“ইয়ে লোগ আজ ইধর রহেঙ্গে, গেস্টরুম তৈয়ার করকে রখখো। অউর ইন কা ড্রাইভার কো দ্বারবান কে সাথ রহনে কা বন্দোবস্ত কর দো। বাই দ্য ওয়ে। তোমরা ভেজ, না ননভেজ?”
“আমরা সবই খাই।” আমি বললাম।
“ঠিক হ্যায়। ভীমা, আজ মুরগি কা রোস্ট বানাও ইন লোগোকে লিয়ে অউর মেরে লিয়ে রোটি-সব্জি – রোজ কি তরহা।
“আর বোলো না, বছর পাঁচেক আগে থেকে আমার স্ত্রী আমার সবরকম ননভেজ খানা বন্ধ করে দিয়েছে। তবুও মাঝে মাঝে একটু আধটু লুকিয়ে চুরিয়ে খাই।”
তারপর হো হো করে হেসে উঠে বললেন “আর বোলো না, আমার স্ত্রী এখানে না থাকলে কী হবে, আমার ননভেজ খাবার খবর চলে যায় স্ত্রীর কাছে। তারপর শুরু হয় টেলিফোনে বকা শোনার পালা।” বুলু আঙ্কেল বললেন।
“চলো, জঙ্গলের গল্পে ফেরা যাক।
“আমরা ভোরবেলা মাটির রাস্তা ধরে জীপে করে স্পটে পৌঁছলাম। জীপটাকে দাঁড় করানো হল নদীর পঞ্চাশ মিটার আগে একটা বড়ো গাছের তলায়। আমরা আমাদের বন্দুক আর গুলি নিয়ে চললাম নদীর ধারে। গাড়িতে ড্রাইভার ছাড়াও রইল ইউসুফ খান। আমাদের এস্টেটের সব শিকারযাত্রায় ইউসুফ খান থাকেই থাকে। ও নিখুঁতভাবে শিকারের গা থেকে চামড়া ছাড়াতে ওস্তাদ। শিকার লেপার্ড হোক কি হাতি।
“খানিক আগেই প্রায় পঞ্চাশ জনের হাঁকা পার্টি জঙ্গলে ঢুকে গেছিল। অনেকদূর থেকেই আমারা ওদের হাঁকডাক শুনতে পাচ্ছিলাম। সময়টা ছিল মে মাস। হাঁটুজল পেরিয়ে আমরা নদীর ওপারে ঝরনার কাছে পৌঁছে গাছের আড়ালে লাইন করে দাঁড়ালাম। প্রথমে আমার দাদু, তারপর আমি, তারপর বব, সবার শেষে আমার বাবা। প্রত্যেকের হাতেই ওয়েস্টলি রিচার্ডস ৪৭০ গান। সবার মাঝে মোটামুটি কুড়ি মিটার করে দূরত্ব। আমরা ঝরনাটা বেছে নিয়েছিলাম কারণ, জঙ্গলের মাঝে নদীর ধারে ওটাই ফাঁকা জায়গা। সাধারণত সম্বরের দল ওখান দিয়েই নদী পারাপার করে।
“হাঁকা পার্টি জঙ্গল পেটাতে পেটাতে প্রায় ঝরনার কাছে চলে এসেছিল। গাছপালার ফাঁক দিয়ে ভালো দেখা না গেলেও, মনে হল একটা জন্তু বেরিয়ে এসে ববের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।”
একটু থামলেন বুলু আঙ্কেল। তারপর কফির মগে একটা চুমুক দিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন। “পরে শুনেছি, প্রায় দশ ফুট লম্বা প্রাণীটাকে দেখে চমকে উঠেছিল বব। কারণ সম্বরের জন্য হাঁকায় ও সম্বরই আসা করেছিল। ওস্তাদ শিকারি ববের এক গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল জন্তুটা।
“আমরা গুলির শব্দ শুনে গুটিগুটি ববের দিকে এগোতে লাগলাম। দূর থেকেই দেখলাম, বব ঝুঁকে মাটিতে পড়ে থাকা শিকারটা দেখছে।”
“কত বড়ো হরিণ ছিল ওটা?” আমি রুদ্ধশ্বাসে জানতে চাইলাম।
“আরে, শোনোই না আগে!” বললেন বুলু কাকা। “ওদিকে হয়েছে কী, গুলির আওয়াজ শুনে ইউসুফ খান জীপ থেকে ছুরি হাতে লাফ মেরে নেমে প্রায় দুশো মিটার দৌড়ে এসে নদী পার হয়ে কোনওদিকে না তাকিয়ে ববের পায়ের কাছে পড়ে থাকা শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারের গলায় ছুরির পোঁচ চালিয়েই ‘আই বাপ’ বলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল শিকারের ওপর।
“ও ভেবেছিল, সম্বরের জন্য হাঁকায় আমরা সম্বরই শিকার করব। গুলি খাওয়ার সাথে সাথেই সব প্রাণী মরে না। সম্বরের প্রাণ থাকতে থাকতে হালাল না করলে ওর মাংস ইউসুফ খেতে পারবে না। তাই সময় নষ্ট না করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সম্বরের ওপর।
“আর অজ্ঞান হয়ে গেছিল কেন জানো? শিকারের গলায় ছুরি চালিয়েই ইউসুফ টের পেল ওটা সম্বর নয়, ওটা একটা বিশাল বাঘিনী!”
গল্পটা শেষ হতে আকাশে আবছা একফালি চাঁদ দেখা দিল। দিনের আলোর রেশ শেষ হয়ে হালকা সাদা আলো ফুটে উঠছে চারদিকে। সবুজ গাছগুলো চাপ চাপ কালচে রূপ ধরছে। ঠাণ্ডা হাওয়া ওই দূর পাহাড়গুলো থেকে শুকনো নদীর বুকের ওপর দিয়ে আমাদের জামাকাপড়ের ফাঁক দিয়ে বরফের টুকরোর মতো জমাট বেঁধে ঢুকে পড়ে কাঁপিয়ে দিচ্ছে সারা শরীর।
বুলু আঙ্কেল বললেন, “চলো, ঘরে গিয়ে বসি। আর বেশিক্ষণ বাইরে থাকলে হাত-পা জমে যাবে।”
চেয়ার থেকে উঠে এক পা এগোতে না এগোতেই টলে পড়ে যাচ্ছিলেন বুলু আঙ্কেল। কোনওরকমে লাঠিটা দিয়ে ব্যালেন্স করে নিজেকে সামলালেন। আমি একটু ইতস্তত করে কয়েক পা এগিয়ে গেলাম ওঁকে ধরব বলে। উনি হাত দেখিয়ে বললেন, “আরে আমার হেল্প লাগবে না। কয়েক পা হাঁটলেই ঠিক হয়ে যাব। ডাক্তার বলেছিল, পায়ের বাড়তি হাড়টা কেটে দেবে। আমি আর কাটাছেঁড়ার ঝামেলাতে যেতে চাইনি। গরম সেঁক নিয়ে ব্যথাটা অনেক কন্ট্রোলে আছে।”
বুলু আঙ্কেল আমাদের আগে আগে লাঠি হাতে খানিক পা টেনে টেনে এগোতে লাগলেন। ব্যাপারটা কীরকম অদ্ভুত। ঘণ্টা কয়েক আগে আমাদের যে লোকটা নিয়ে এল এই নদীর ধারে, তার চলন দেখে আমার কেমন যেন মনে হচ্ছিল লোকটার পা ভূমি স্পর্শ করছে না। আর এখন যে আগে আগে হাঁটছে তার পা যেন মাটি থেকে উঠছে না। ঠিক উলটোটা। ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। কেন যে রাতে থাকতে রাজী হলাম!

রাজবাড়ির চত্বরে পৌঁছে দেখি ভীমা দাঁড়িয়ে। ধুতি আর ফতুয়ার ওপর একটা কম্বল, চাদরের মতো জড়ানো। ভীমার কাঁধে ওপর কাকাতুয়াটা বসে। ভীমার বয়স আন্দাজ করা মুশকিল। হবে সত্তরের কাছাকাছি। ভীমার কুচকুচে কালো রঙের মুখের ওপর রাজবাড়ির চত্বরের একটা আলোর আভা এসে পড়েছে। ভীমার মুখে একটা মমত্বের ছাপ। মনে হয় রাগ অভিমান কী বস্তু লোকটা জানে না। পাখিটা ভীমার একটা আঙুল ঠোঁটের মাঝে ধরে আছে।
আমরা কাছাকাছি যেতেই পাখিটা ভীমার কাঁধ থেকে উড়ে আমাদের মাথার ওপর দিয়ে এক চক্কর মেরে ঠিক আগের মতোই ‘ওয়েলকাম ওয়েলকাম’ বলে ডাক ছেড়ে গিয়ে বসল ওর দাঁড়ে।
বুলু আঙ্কেল বললেন, “তোমরা খানিক রেস্ট নিয়ে নাও, আটটার সময় ডিনার খেতে খেতে আবার আড্ডা দেওয়া যাবে। রাত দুটোর সময় পূজোয় বসবে সত্যা।”

ঠিক দু’ঘণ্টা পর ভেজানো দরজায় ঠকঠক আওয়াজ হল। বিশাল বাথরুমের বাথটাবে গরম জলে অনেকক্ষণ গা ডুবিয়ে শরীরের সব ব্যথা কমিয়ে ফায়ারপ্লেসের আগুনের ধারে সোফায় গা এলিয়ে সবে ক্যামেরার ছবিগুলো দেখতে শুরু করেছি।
দরজা খুলে দেখি ভীমা দাঁড়িয়ে। “খানা তৈয়ার।”
“হাঁ হাঁ, চলিয়ে।”
রাজবাড়ির লম্বা টানা বারান্দা ধরে আমরা ভীমার পিছু পিছু চলেছি। ঠাণ্ডায় শরীরের খোলা অংশ জ্বলে যাচ্ছে। ছাদ থেকে শিকলে বাঁধা একের পর এক ছোটো ছোটো কাচের ঝাড় নেমে এসেছে। তাতে স্বল্প আলোর বালব জ্বলছে। পুরো রাজবাড়িটাই মৃদু আলোয় ভাসছে। আমাদের বাঁদিকে সার সার বন্ধ ঘর। দেওয়ালের গায়ে স্টাফ করা বাঘ, হরিণ, মোষের মাথা। বালবের লালচে আলোয় মৃত চোখগুলো জ্বলছে। যেন প্রবল আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়বে এক্ষুনি। আর ডানদিকে কোমর সমান উঁচু ঢালাই লোহার রেলিং। রেলিং ছাড়িয়ে লম্বা চওড়া সবুজ ঘাসের লন, পূর্ণিমার আলোয় কালচে কার্পেট হয়ে আছে। কার্পেটের ঠিক মাঝখানে তাক করা কামান। চাঁদের আলোয় লোকজনহীন ধপধপে সাদা রঙের নিস্তব্ধ রাজবাড়িটা প্রাণের ছোঁয়া খুঁজছে। একটা টিকটিকি ডেকে উঠল কোথাও। এরাই এখন রাজবাড়ির নিশ্চিন্ত বাসিন্দা।
ইউ আকৃতির বারান্দাটার শেষে যেখানে বারান্দাটা আবার ডানদিকে মোড় নিয়েছে, সেখানে একটা আধখোলা দরজা ঠেলে ভীমা বলল, “আইয়ে।”
টেনিস কোর্টের মতো বিশাল ঘরটার এককোণে একটা ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বলছে। আগুনের লালচে আভা খেলা করছে ঘরের দেওয়ালে। একটা বড়ো ঝাড়লণ্ঠন নেমে এসেছে ঘরের মাঝখানে রাখা বিশাল খাবার টেবিলের ওপর। একসঙ্গে নয় নয় করেও পঞ্চাশ জন খেতে বসতে পারে টেবিলের দু’পাশে। ঘরের দেয়ালে ঝুলছে ফ্রেমবন্দী কয়েকটি আঁকা ছবি।
বুলু আঙ্কেল বসে ছিলেন ফায়ার প্লেসের পাশে একটা দোল খাওয়া চেয়ারে। আমাদের দেখে বললেন, “চলো, খাওয়ার আগে বাঘের গুলি খেয়ে মরার পরের গল্পটা বলি। ভীমা, কফি দো।
“আমরা ইউসুফের জ্ঞান ফেরাতে ব্যস্ত। তখনই হঠাৎ ববের নজরে এল, একটা বাঘের বাচ্চা বেরিয়ে আসছে জঙ্গলের প্রান্ত থেকে। বব দৌড়ে গিয়ে বাচ্চাটা কোলে তুলে নিল। বাচ্চাটা কুই কুই শব্দ করে ওর মাকে খুঁজছিল। বব বাচ্চাটা কোলে তুলে বলল, দিস ইজ আ মেল টাইগার, সি, হি ইজ হ্যাভিং ইনজুরি ইন হিজ লেফট ফ্রন্ট লেগ।
“আমার দাদু হাঁকা সর্দারকে বাঘের বডিটা রাজবাড়িতে আনার ব্যবস্থা করতে বলে বাঘের বাচ্চাটাকে ববের কোল থেকে নিজের কোলে নিয়ে নিলেন। আমার দাদু পশুপাখির চিকিৎসা করতে জানতেন।
“এরমধ্যে হাঁকাদলের লোকজন নদী থেকে জল এনে ইউসুফের চোখেমুখে দিয়ে ওর জ্ঞান ফিরিয়ে এনেছে। ইউসুফ উঠে খানিক থম মেরে দাঁড়িয়ে বাঘটাকে নিয়ে আসার তদারকি করতে লাগল।”
“বাঘের বাচ্চাটাকে নিয়ে কী করলেন? বাড়িতে পুষলেন?” আমি বললাম।
“না, দাদুর অনেক চেষ্টাতেও বাঘের বাচ্চাটা বাঁচেনি। ওই ঘটনার পর বব শিকার করা ছেড়ে দিয়েছিল। আর ও গেম হান্টিংয়ের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রচার শুরু করেছিল।”
“বাঘের চামড়াটা কি বব নিয়ে গেছিলেন?” আমার বন্ধু জিজ্ঞেস করল।
“নাহ্‌, ওই চামড়াটা আছে এখানেই। দরজার ওপরে দেখো।”
ঘাড় ঘোরালাম আমরা। কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। দেওয়ালের ওপর একটা কালো কাপড় ঝোলানো।
“বাঘের ট্যান করা চামড়াটা ববের ইচ্ছেয় কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা আছে। আর ববের কথামতো কেউ শিকারের ইচ্ছে নিয়ে আমাদের এস্টেটে এলে আমরা তাদের এই গল্পটা বলে পর্দা সরিয়ে তাদের ওই বাঘটাকে দেখাই। তোমরা যে জঙ্গল ঘুরে এলে সেটা এই বব ফিবসের নামেই। ফিবস টাইগার রিজার্ভ। ববের উদ্যোগ আর আর্থিক সাহায্যেই এই টাইগার রিজার্ভ তৈরি। ববের টাকা মূলত খরচ করা হয়েছিল এই রিজার্ভের ভেতর বসবাসকারী পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের কাজে। আর ববের এই কাজে সবচাইতে কে বেশি সাহায্য করছিল জানো? ইউসুফ আর হাঁকা পার্টির দল!”
খাবার খাওয়ার পর আর চেয়ার থেকে আর উঠতে পারছিলাম না। রাত দশটা বাজে। এরকম গলা পর্যন্ত খাবার কোনওদিন খাই না, কিন্তু এরকম স্বাদু মুরগির রোস্ট আগে খাইনি।  লোভে পড়ে ঘিয়ে ভাজা পরোটা আর বোধহয় খান দুয়েক মুরগি আমি একাই সাবাড় করেছি। আমার বন্ধুরও প্রায় সেই অবস্থা। বুলু আঙ্কেল কিন্তু ডাল দিয়ে একটামাত্র পরোটা খেলেন।
“তোমরা একটু ঘুমিয়ে নাও, সত্যা রাত দুটোর সময় যজ্ঞে বসবে। ঠিক সময় ভীমা তোমাদের নদীর ধারে নিয়ে যাবে।” বুলু আঙ্কেল বললেন।
“আঙ্কেল, আমরা কি ওই মিউজিয়ামটা এখন একবার দেখতে পারি?” আমার বন্ধু বলল।
“কাল সকালে দেখো, রাতে ওই ঘরে প্রবেশ নিষেধ। শুনেছি, আমার জন্মের আগে এক ইংরেজ কর্নেল আমার দাদুর কথা শুনে জোর করে রাতে ওই ঘরে ছিলেন। পরদিন সকালে তাঁকে অজ্ঞান অবস্থায় মিউজিয়ামে পড়ে থাকতে দেখা যায়। ভদ্রলোক বেঁচে থাকলেও উন্মাদ হয়ে গেছিলেন। কেউ জানে না ওই রাতে কী ঘটেছিল।”

*****

ভীমার পিছু পিছু যখন আবার নদীর ধারে পৌঁছলাম, তখন রাত দুটো বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। ভরা পূর্ণিমার কালচে স্নিগ্ধতা চতুর্দিকে। ঘাসপাতার ওপর জমে প্রায় বরফ হয়ে থাকা শিশিরকণাগুলোর ওপর চাঁদের আলো ঝলকাচ্ছে। উলিকটের ওপর মোটা জামা-প্যান্ট। তার ওপর সোয়েটার ও উইন্ডপ্রুফ জ্যাকেট। মাথায় উলের বাদুড়ে টুপি আর দু’হাত উলের গ্লাভসের অন্তরালে। তারই মাঝে ফাঁকফোঁকর বের করে শীত শরীরের ইতিউতি চিমটি কাটছে।
ধুনোর গন্ধ ভেসে আসছে। মাথার ওপর দিয়ে একটা পাখি গুপ গুপ করতে করতে উড়ে গেল। ভীমা পাখিটাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলে উঠল।
“ক্যায়া হুয়া, ভীমা?”
“সত্যা কা ডায়েন আ গয়া।”
“মতলব?”
“খুদ দেখ লিজিয়ে। কভি সুনা পখশি আগ উঠা কে লে যাতা হ্যায়? ওয়হ হ্যায় সত্যা কা উল্লু।”
আমরা যেখানে আজ বিকেলে বসেছিলাম, ঠিক সেই জায়গায় বাঁধানো চাতালের ওপর  একটা বিশাল হাঁড়ির সামনে বসে আছে সত্যা। হাঁড়ির ভেতর থেকে আগুনের বেগুনি আভা হাঁড়ির খানিক ওপরে একটা লাঠির মাথায় ঝুলতে থাকা লতা দিয়ে বাঁধা আরেকটা ছোটো হাঁড়িকে আলোকিত করে রেখেছে। ছোটো হাঁড়িটার গায়ে কতগুলো ছোটো ছিদ্র। সেখান থেকে হাঁড়ির ভেতর জ্বলন্ত আগুনের আভা দেখা যাচ্ছে।
খানিক দূরে ওভারকোট গায়ে মাথায় টুপি পরে একটা চেয়ারে বসে আছেন বুলু আঙ্কেল। কোনও শব্দ নেই কোথাও। আমরা আঙ্কেলের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মাথার ওপর বাতাসে নিঃশব্দ আলোড়ন তুলে পাখিটা চক্কর দিয়েই চলেছে।
ধুনোর গন্ধে জায়গাটা আচ্ছন্ন হয়ে আছে। আমি দেখেছি, যজ্ঞ মানেই আগুনে একের পর কাঠ গুঁজে ক্রমাগত তাতে ঘি ঢালা হতে থাকে। এখানে সেরকম কিচ্ছু নেই। শুধু চাতালের ওপর রাখা হাঁড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা লালচে আভা আর তার অনেক ওপর ঝুলতে থাকা পুঁচকে হাঁড়িটার গায়ের ছোটো ছোটো ছিদ্র দিয়ে লালচে কয়লার মতো বস্তুটা বুঝিয়ে দিচ্ছে ওতে আগুন আছে। হয়তো কাঠকয়লার। কে জানে?
সত্যার শরীরটা খুব ধীরে ধীরে দু’পাশে দুলছে। চাঁদের আলোতে ঠিক বোঝা না গেলেও আমার কেন জানি না মনে হল, ওর শরীরটা মাটি ছুঁয়ে নেই। কোনও শব্দ নেই কোথাও। কোনও মন্ত্র উচ্চারণ নেই। খানিক পর পর সত্যার মুখ থেকে মৃদু শিসের মতো আওয়াজ হচ্ছে। প্যাঁচাটা ওই শিসের আওয়াজের পর গুপ গুপ করে ডেকে উঠছে। ওরা কি নিজেদের মধ্যে কথা বলছে?
বুলু আঙ্কেল পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে। পাখিটা ক্রমাগত আওয়াজ করতে করতে ওড়ার বৃত্তটা কমিয়ে ছোটো করে আনছে। একবার প্রায় আমার কাঁধ ছুঁয়ে উড়ে গেল পাখিটা। এই ঠাণ্ডাতেই আমার শরীর ঘেমে উঠেছে। জোছনা রাত। তাই আবছা হলেও সব দেখা যাচ্ছে।
পাখিটা হঠাৎ গোল হয়ে ওড়া বন্ধ করে আগুনে-হাঁড়িগুলোর ওপর কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে পাখা ঝাপটাতে ঝাপটাতে ভেসে রইল। তারপর ঠিক যেভাবে ব্যাঙ কিম্বা সাপ পায়ের নখ দিয়ে এক ঝটকায় মাটি থেকে শিকার তুলে নেয়, ঠিক সেইভাবে লম্বা লাঠির মাথায় লতায় জড়িয়ে ঝুলতে থাকা আগুনভরা ছোটো হাঁড়িটা পায়ে করে আকাশে উড়ে গেল। তারাভরা ঝকঝকে আকাশে হাড়িভরা জ্বলন্ত আগুন-ভাণ্ড পায়ে ঝুলিয়ে প্যাঁচটা তীক্ষ্ণ ডাক ছাড়তে ছাড়তে গাছপালার মাথা টপকে চোখের আড়ালে হারিয়ে গেল।
একটা ধপ করে আওজায় হতে পেছনে ঘুরে দেখি, মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে ভীমা। তবে কি ভীমাই চোর?
বুলু আঙ্কেলের কোনও সাড় নেই। জেগে আছেন কি না বোঝা যাচ্ছে না।
সত্যা ক্রমাগত শিস দিয়ে চলেছে। শিসের তীক্ষ্ণতা ক্রমেই বাড়ছে।
আচমকা সত্যা উঠে দাঁড়াল। তারপর হাততালি দিতে দিতে বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলের ওপর ভর করে ডান পাটা আকাশে তুলে একজায়গায় লাট্টুর মতো ঘুরতে লাগল। ঠিক যেন রাশিয়ান ব্যালের কোনও নর্তক!
বুলু আঙ্কেল চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে একটা প্যাকেট থেকে বের করে তার থেকে কিছু একটা বের করে সত্যার সামনের বড়ো হাঁড়িতে ছুড়ে দিলেন। টিমটিমে আগুনটা দপ করে জ্বলে উঠল। আগুনের হলকা জেগে উঠল অনেক উঁচু পর্যন্ত। চেনা গন্ধে ভরে উঠল জায়গাটা। গন্ধটা আমি চিনি। কর্পূর।
খানিক পর আগুনটা আবার ঝিমিয়ে আসতে লাট্টুর মতো ঘুরতে থাকা সত্যা আচমকা লুটিয়ে পড়ল চাতালের ওপর। বুলু আঙ্কেলও আবার বসে পড়লেন ওঁর চেয়ারে।
হঠাৎ টের পেলাম, আমার হাত-পা কেমন আড়ষ্ট হয়ে গেছে। শরীরে নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই। আড়চোখে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে মনে হল, ঠিক আমারই মতো অবস্থা ওর। কিন্তু চিন্তাশক্তি লোপ পায়নি। দেখতেও পারছি সব। বুলু আঙ্কেলকে ডাকতে চাইলাম, কিন্তু গলা দিয়ে কোনও স্বর বেরোচ্ছে না। বসতে চাইছি, কিন্তু পা ভাঁজ করতে পারছি না। ঠিক যেন পাথরের মূর্তি হয়ে গেছি। তবে কি…
সত্যা আবার উঠে বসেছে। আগুনের মধ্যে আবার খানিক কিছু ছুড়ে দিল ও। ধুনোর গন্ধের সাথে এবার একটা ঝাঁঝালো গন্ধ তৈরি হল। গলা আর চোখ জ্বালা করছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে যেন। তীক্ষ্ণ শিস দিয়ে উঠল সত্যা। পরপর বেশ কয়েকবার। মনে হল, ও প্যাঁচাটাকে ডাকছে। চাতাল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে এবার ডান পায়ের বুড়ো আঙুলে ভর দিয়ে বাঁ পা তুলে হাততালি দিতে দিতে আগের ঠিক উলটোদিকে নিজের শরীরটাকে লাট্টুর মতো বনবন করে পাক খাওয়াতে লাগল।
গুপ গুপ করে আওয়াজ উঠল পেছন থেকে। ঘাড় ঘোরাতে না পারলেও বুঝলাম, পাখিটা ফিরে এসেছে। সত্যার শরীর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। পাখিটা সত্যার মাথার ওপর আকাশের এক জায়গায় স্থির ডানা ঝাপটাতে লাগল। ওর পায়ে ধরা আগুনে হাঁড়িটা নেই।
বুলু আঙ্কেল উঠে দাঁড়িয়ে বড়ো আগুনের হাঁড়িটার পাশে রাখা একটা মাটির পাত্র তুলে ধরলেন। তারপর পাত্রটা উপুড় করে দিলেন আগুনের ওপর। পাত্রটা থেকে ছড়ছড় করে খানিক জল বড়ো হাঁড়িটার ভেতর পড়তেই আগুনটা নিভে গেল। কালচে ধোঁয়া উঠতে লাগল হাঁড়িটার ভেতর থেকে। সত্যার শিসের সাথে সাথে প্যাঁচাটাও গুপ গুপ আওয়াজ করে চলেছে।
আগুনটা নিভে যেতেই আমাদের শরীরটা হালকা হয়ে গেল। টের পেলাম, হাত-পায়ে সাড় ফিরে এসেছে। হালকা কোঁকানির আওয়াজ শুনে পেছনে ঘুরে দেখি, ভীমা উঠে বসেছে।
পাখিটা আবার একটা পাক মেরে নদীর দিকে উড়ে গেল। সাথে সাথে সত্যাও টলতে টলতে ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে নদীর দিকে চলতে শুরু করল। লাঠি হাতে খোঁড়াতে খোঁড়াতে সত্যার পিছু নিলেন বুলু আঙ্কেল। আমাদেরও ইশারা করলেন ওঁর পিছু নিতে।
পাখিটা ক্রমাগত মাথার ওপর দিয়ে পাক খাচ্ছে আর উড়ে যাচ্ছে যেন একটা নির্দিষ্ট দিকে। ঠিক যেন ইশারা করছে ওকে অনুসরণ করার। আমরা নদীর শুকনো বালির চরার ওপর দিয়ে হেঁটে চলেছি তো চলেছিই।
আচমকা নদীর বুকে জেগে থাকা কতগুলো পাথরের কাছে হুমড়ি খেয়ে বালির ওপর পরে গেল সত্যা। পাথরগুলোর ঠিক পেছন থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছে।
হাতের ইশারায় আমাদের থামতে বলে পকেট থেকে একটা টর্চ বের কর জ্বালিয়ে ধোঁয়া লক্ষ্য করে এগিয়ে গেলেন বুলু আঙ্কেল। তারপর আর্তনাদ করে উঠলেন, “ওহ্‌ মাই গড!”
আমরা ছুটে গিয়ে টর্চের আলো লক্ষ করে দেখি, পাথরের পেছনে বিশাল বড়ো এক ভাঙা ডিমের খোসা পড়ে আছে। আর বালির ওপর দিয়ে লম্বা হয়ে এগিয়ে গেছে তিন আঙুলের ফুট খানেক লম্বা পায়ের ছাপ।
পুব আকাশ লাল হয়ে উঠেছে।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ মৈনাক দাশ

4 comments:

  1. পড়ে তো ছিলাম আগেই। অসাধারণ

    ReplyDelete
  2. mone holo ghure elam jaygata theke..khub bhalo

    prosenjit

    ReplyDelete
  3. দারুণ, বিশেষত শুরুটা।

    ReplyDelete