চলো যাইঃ বুধিল নদীর হাত ধরে হাডসার থেকে দারোলঃ অরুণাভ দাস





রূপকথার গল্পের বই থেকে যেন উঠে এসেছে হাডসার গ্রাম। হিমাচল প্রদেশের পশ্চিম প্রান্তে বুধিল নদীর নিরালায় কী আশ্চর্য সুন্দর নিসর্গ, চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। তেমনই চমৎকার রাস্তা চাম্বা রাজ্যের পুরনো রাজধানী ভারমৌর থেকে ১৩ কিমি। হিমালয়ের গহনপুরে অপূর্ব এক সূর্যাস্তের দৃশ্য দু’চোখে মেখে এক বিকেলে এ-পথে পাড়ি দিয়ে ভারমৌর থেকে হাডসার গেলাম। গুটিকয় হোটেল আর ছোটো একটা বাজার নিয়ে বর্ধিষ্ণু গ্রাম ২৩১৭ মিটার উচ্চতায়। একদা শুধুমাত্র মেষপালক গদ্দি সম্প্রদায়ের মানুষের বাস ছিল। এখন পাহাড়িদের নানা সম্প্রদায়ের লোক আসছে। বাইরের দুনিয়ার কাছে হাডসারের পরিচিতি মণিমহেশ লেক ট্রেক-পথের সূচনাবিন্দু হিসেবে, যদিও গত কয়েক বছরে গাড়ির রাস্তা এগিয়ে গিয়েছে পরের গ্রাম ধানচো পর্যন্ত। গরমকালে ট্রেকারদের ভালোই ভিড় হয়। অন্য একটি ট্রেক-রুট গিয়েছে মণিমহেশের বিপরীত দিকে কুগতি গিরিবর্ত্ম পর্যন্ত।
হাডসার
এখন অক্টোবর। পদযাত্রীর ভিড় নেই। তাই আমাদের বিনা বুকিংয়ে হোম স্টে-তে জায়গা পেতে অসুবিধা হয়নি। কনকনে শীতের রাত ফুরিয়ে ঝকঝকে আলোর সকাল আসতে ঘর ছেড়ে পথে। আজ বুধিল নদীর হাত ধরে হারিয়ে যাওয়ার হাতছানি এড়ানো কঠিন।
হাডসার বাজারের পিছনে খাদের ভেতর দিয়ে রাভি বা ইরাবতীর সখা বুধিল বা বুরঢাল নদী বয়ে চলেছে। নদীর ওপারে রুক্ষ পাহাড়শ্রেণী। শীতকালে বরফে ঢেকে যায় বলে গাছপালা জন্মাতে পারে না। কালির দোয়াত ওলটানো ঘন নীল আকাশের তলায় খয়েরি ও সোনা-হলুদ রঙের পাথরের প্রাচীর প্রকৃতির ক্যানভাসে এক অনবদ্য কন্ট্রাস্ট তৈরি করেছে।
বুধিল ও রাভি নদীর সঙ্গমস্থল (খাড়ামুখ জনপদ)
বাজার ছাড়িয়ে একটু এগিয়ে দেখা গেল ধানচো হয়ে মণিমহেশ যাবার রাস্তা ডানদিকে বেঁকে পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে গিয়েছে। আমাদের খুব ইচ্ছা, শিবের আবাস কৈলাস হিসেবে খ্যাত মণিমহেশ শৃঙ্গ দেখা। কিন্তু হাডসারের কোথাও থেকে দেখতে পেলাম না। হতাশ হয়ে একটা চায়ের দোকানে বসেছিলাম। দোকানিকে মনের ইচ্ছা ব্যক্ত করতে তিনি জানিয়ে দিলেন, বাঁদিকে সেতু পেরিয়ে বুধিল নদীর ধার ধরে কুগতি পাসের রাস্তায় প্রায় ২ কিমি গেলে এক জায়গায় পবিত্র মণিমহেশ চুড়ার তুষারাবৃত শরীর দেখা যাবে। গাড়িতেই যাওয়া যাবে। কিন্তু এক ঝলকে নদীর ওপারের রাস্তার দিকে চেয়ে মনে হল, ওই অপার্থিব সৌন্দর্যের পথে গাড়ি চড়ে গেলে ঘোরার মজা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাছাড়া, আজ কোনও তাড়া নেই, প্রকৃতির রূপ দেখে বেড়ানোর জন্য পুরো দিন হাতে। লোহার পুলের ওপর দিয়ে বুধিল নদী অতিক্রম করে ধুলোয় ভরা পাহাড়ি পথে হাঁটা শুরু করলাম আমরা ছয়জন।
দারোল গাঁয়ের পথে
হাডসার গ্রামটি বাঁকের আড়ালে হারিয়ে যেতে মনে হচ্ছে, এই রাস্তা নদীর হাত ধরে পৃথিবীর কোনও নির্জনতম প্রান্তে নিয়ে যাবে। এক জায়গায় সামনে চেয়ে দেখি, দুটি পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে বরফরাজ্য নজরে পড়ছে। আকাশ আজ অসম্ভব রকমের নীল বলে সাদা বরফের আলপনা স্বমহিমায় ঝলমল করছে। চোখ ঝলসানো নিসর্গ। ডানদিকে প্রায় দুশ ফুট নিচে দিয়ে বিপরীত দিকে বয়ে চলেছে বুধিল। ওপারে ঘন জঙ্গল পাহাড়ের গায়ে। ভুবন আলো করা সবুজের অনেক শেড। তার মধ্যে আবার কয়েকটি গাছের পাতার রঙ লাল, কমলা বা হলুদ। যেন চির বসন্তের দেশ।
বুধিল নদী
হালকা চড়াই রাস্তা ধরে ২ কিমি যেতে বেশি সময় লাগল না। পৌঁছে গেলাম হাডসারের চা-দোকানির বাতলে দেওয়া ভিউ পয়েন্টে। পাহাড়ের একটা মনোরম বাঁকে পিছন ফিরে বনের ওপারে আকাশের দিকে চাইতে ছ’জোড়া চোখ যেন একসঙ্গে ঝলসে গেল। আকাশের গায়ে মণিমহেশে শৃঙ্গের একাংশ দেখা যাচ্ছে এবং তার ঠিক মাথার ওপরে অবস্থান করছে বেলা এগারোটার সূর্য। সূর্য মাথায় নিয়ে পবিত্র পর্বতচূড়ার এই ছবি আমাদে হোম স্টের দেয়ালে টাঙানো দেখেছি। নিজের চোখে দেখে বিস্ময়মিশ্রিত ভালোলাগায় হতবাক হয়ে গেলাম।
ওখানেই দাঁড়িয়ে সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, রাস্তা যখন কঠিন নয়, আরও সামনে এগিয়ে যাওয়া যাক। নিশ্চয়ই কয়েক কিমির মধ্যে কোনও একটা গ্রাম পাওয়া যাবে। বিকেলের মধ্যে হাডসার ফিরলেই চলবে।
সেইমতো আবার হাঁটা বুধিল নদীর হাত ধরে। ছোটো পাহাড়ি নদীটা পরিবেশের গুণে সত্যি মনোমুগ্ধকর। ডানদিকে খাদের ভেতর দিয়ে নীল জলরাশি ফেনা ছড়িয়ে কুলকুল করে বয়ে চলেছে। আগেরদিন গাড়ি চড়ে আসার সময় দেখেছি চাম্বা ও ভারমৌরের মধ্যবর্তী খাড়ামুখ নামে এক জনপদে রাস্তার পাশেই বুধিল ও রাভী বা ইরাবতী নদীর সঙ্গম। দুই নদীর জলের রঙ আলাদা, ভারি আকর্ষণীয় তাদের মিলনবিন্দুর দৃশ্য। এখানে বুধিলের অন্য রূপ। অনেক বেশী সংকীর্ণ, কিন্তু মহা চঞ্চল। জনমানবহীন পার্বত্য ভূমিকে মুখর করে রেখেছে বয়ে চলার শব্দে। কোথাও পাহাড়ের দেয়াল বেয়ে অরণ্য ভেদ করে ঝর্ণাধারা নেমেছে। নিজেকে অর্পণ করেছে বুধিলের বুকে। আবার কোথাও ওপারের পাহাড় থেকে বুধিলের গায়ের কাছে ঝুঁকে পড়েছে প্রকৃতির আপন হাতে ফোটানো নাম না জানা রংবাহারি ফুলের গুচ্ছ। এমন রমণীয় দৃশ্যের ভেতরে কল্পনা বল্গাহীন ছুটবে, এটাই স্বাভাবিক। মন চায় প্রকৃতির ভাষা বুঝে নিতে। এভাবেই জীবনের দুয়েকটা দিন রূপকথার মতো হয়ে যায়।
প্রাকৃতিক প্রস্তরচিত্র
এক জায়গায় দেখি ঘন নীল আকাশের নিচে আলগা পাথর সাজিয়ে একটা স্তূপ বানানো হয়েছে। তার জায়গায় লাল চেলি কাপড়ে জড়ানো ত্রিশূল, শিবভূমির দেবস্থান। পিছনে একটু দূরে বরফের পাহাড়। নিচে নদীটা আকাশের রঙ মেখে আরও মোহময়। ছবি তুলে আর আশ মেটে না। এর পর হালকা চড়াই রাস্তাটা ধরে যত এগোতে থাকি ততই যেন প্রবেশ করি ঈশ্বরের আর্ট গ্যালারির অন্দরমহলে। জায়গাটির সৌন্দর্য বর্ণনা করার মতো ভাষা পাওয়া ভার। অবাক বিস্ময়ে দেখতে থাকি, রাস্তার বাঁদিকে পাহাড়ের খাড়া দেয়াল যেন ভগবানের ছবি আঁকার ক্যানভাস। কোথাও পেইন্টিং, আবার কোথাও চমকপ্রদ রিলিফের কাজ - সবই জল, আলো ও হাওয়া মিলে যুগ যুগ ধরে রচনা করেছে। কোনও ছবি অ্যাবস্ট্রাক্ট, কোনওটা জটিল জ্যামিতিক নকশা, আবার কোথাও মানুষ বা জীবজন্তুর অবয়ব। প্রকৃতি যে নিজেই কত বড়ো শিল্পী, তা আজ এ-রাস্তায় হাঁটতে না এলে জানা যেত না। ছবির মিছিল পথের ধার ধরে চলেছে তো চলেছেই। স্বাভাবিক কারণে সকলের চলার গতি ধীর হয়ে আসে। বিস্ময়ের রঙ ছড়ায় চোখ থেকে মনের গহনে।
দেবভূমির প্রাকৃতিক আর্ট গ্যালারি ছাড়িয়ে পথের চড়াই ক্রমশ বাড়তে থাকে। গাড়ি চলাচলের রাস্তা হলেও প্রায় দু’ঘণ্টায় একটাও গাড়ি দেখা যায়নি। কোনও লোকের দেখাও মেলেনি। তাই চিন্তা হচ্ছিল, কাছের গ্রামটি আরও কত দূরে হবে। কিন্তু প্রকৃতি সব চিন্তা ভুলিয়ে দেবার রসদ বুকে করে দাঁড়িয়ে আছে যে রাস্তায়, সেখানে সামনে না এগিয়ে পারা যায় না। অপূর্ব দৃশ্যমালা চারদিকে। রুক্ষ পাহাড়ের দেয়াল দেখে সহজে অনুমান করা যায়, এই এলাকায় শীতকালে ভালোরকম বরফ পড়ে। সেই জন্য জনবসতি বেশ পাতলা। আগের দিন চাম্বা শহর পার হবার পর থেকে প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সাজবদল দেখে চলেছি। কিন্তু প্রাকৃতিক আর্ট গ্যালারিটা সবদিক থেকে অভিনব। এই পথে ফেরার সময় আরেকবার ভালো করে দেখতে হবে।
একসময় অনেক দূরে বাঁকের ওপারে একটি কাঠের তৈরি বাড়ি দেখা গেল। গ্রাম তাহলে সামনেই। চলার গতি গেল বেড়ে। কিন্তু চড়াই ভেঙে চলতে হাঁপ ধরে। ক্রমশ একটা ছাউনিবিহীন জীপগাড়ি নজরে পড়ে। মালপত্র নামানো হচ্ছে কাঠের বাড়িটার সামনে। সেখানে পৌঁছে ৪-৫ জন লোকের দেখা পেলাম। কেউ মালপত্র খালাসের কাজে ব্যস্ত, আবার কেউ অপেক্ষা করছেন গাড়ির ফিরতি যাত্রায় হাডসার যাবার জন্য। এটাই এই ছোটো পার্বত্য গ্রামের বারোমাস্যা। জিজ্ঞেস করে জানা গেল, গ্রামের নাম দারোল। হাডসার থেকে ৬ কিমি। এতটা হেঁটে ফেলেছি জেনে বেশ মজা লাগল। কাঠের দোতলা বাড়িটার একতলায় চা ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দোকান। গ্রামে নাকি মাত্র দুটি দোকান। লোকবসতি খুবই হালকা। গাছপালা কম। কাছে-দূরে নানা রঙের রুক্ষ পাহাড়শ্রেণী। ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাসে দারোল বরফের তলায় ঢাকা থাকে। তার জন্য আগে থেকে জীবনধারণের রসদ জোগাড় করে রাখতে হয়। চা দোকানে বসে চা পানের ফাঁকে স্থানীয় লোকের সঙ্গে গল্প চলতে থাকে। জানা গেল, গাড়ির রাস্তা দারোলে শেষ। এরপর পরিবহণের একমাত্র ভরসা ঘোড়া।
দারোল গাঁ
কুগতি গিরিবর্ত্মের পথে পরের গ্রামটির নাম কেলং। এখানকার শিবমন্দির বিখ্যাত। হিমাচল প্রদেশে কেলং শহর হল লাহুল ও স্পিতি জেলার সদর। কিন্তু পশ্চিম হিমাচলের কেলং গ্রাম আলাদা। মজা হল, তুষারপাতের কারণে শীতকালে কেলং বাইরের জগত থেকে কয়েক মাসের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
দারোল থেকে কেলং
ইতিমধ্যে জীপগাড়ি থেকে মালপত্র খালাস হয়ে গিয়েছে। হাডসার যাবার লোকজন গাড়িতে চড়ে বসেছেন। শুধু এক মা ও শিশুপুত্র রাস্তার ধারে পোঁটলাপুটলি নিয়ে তখনও বসে। জিজ্ঞেস করে জানতে পারি, ঘোড়ার পিঠে কেলং যাবেন। আমাদেরও মন নেচে ওঠে দেশ আবিষ্কারের নেশায়। কিন্তু সে গ্রাম নাকি দারোল থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার রাস্তা। দুপুরের পর এই উচ্চতায় নিয়মিত আবহাওয়া খারাপ হয়। তাই কেলং ঘুরে সন্ধের আগে হাডসার ফেরা সমস্যা হয়ে যাবে। কুগতি পাসের ট্রেকাররা একরাত কেলং গ্রামে তাঁবু ফেলে থাকেন। সেরকম প্রস্তুতি নিয়ে আসিনি। তাই দারোলে আরও আধ ঘণ্টা কাটিয়ে হাডসার ফেরার পথ ধরি। মহা বিস্ময়ে দেখি, দারোল গ্রামের আকাশ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে মণিমহেশ পর্বতশৃঙ্গ।
_____
ছবিঃ অরুণাভ দাস (হেডপিস ব্যতীত)

2 comments: