গল্পঃ ঝিমলির ফার্স্ট প্রাইজঃ বনশ্রী মিত্র




“এ গল্প আমার ম্যাগাজিনে ছাপতে পারব না, দাদা। মাফ করবেন।” রমিত সেন কিন্তু কিন্তু করে বললেন।
“কেন?” চোখে আগুন জ্বলে ওঠে শুভঙ্কর মজুমদারের।
“আপনি তো জানেন, আমার ম্যাগাজিন শিশুকিশোরদের জন্য। সেখানে এরকম একটা বিষয় নিয়ে লেখা! না দাদা, আমায় মাফ করবেন।” হাতজোড় করেন রমিত।
“কিন্তু এখন আমাদের সমাজে এটা একটা মস্ত বড়ো সমস্যা, রমিত! সেটা তুমিও জানো। রোজ কাগজ খুললে, টেলিভিশন খুললে এই একটাই খবর। আর সেই বিষয়টা তুমি ছাপতে চাইছ না?” শুভঙ্কর মজুমদার প্রায় চিৎকার করে ওঠেন।
“আমি জানি, দাদা। আমি জানি। কিন্তু ম্যাগাজিনকে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। বিশেষ করে সেটা শিশুকিশোর ম্যাগাজিন হলে।”
“আরে রাখো তো তোমার শিশুকিশোর ম্যাগাজিন! এই জেনারেশনকে চাঁদ, ফুল, পাখি এসব দিয়ে ভুলিয়ে রাখতে পারবে? আর এই যে দিনরাত ভূতের গল্প, খুন, গোয়েন্দা - এসব ছাপছ? ওসব পড়লেই বুঝি ছোটোদের মেন্টাল ডেভেলপমেন্ট ঠিকঠাক হয়? জীবনের কঠিন সত্যিটা ওদের জানতে দাও, রমিত। না হলে ওরা নিজেদের সামলাবে কী করে?” রাগে টেবিল চাপড়ে ওঠেন খ্যাতনামা লেখক শুভঙ্কর মজুমদার।
চুপ করে থাকেন ‘কিশোরবেলা’ পত্রিকার মুখ্য সম্পাদক রমিত সেন। কী বলবেন বুঝতে পারেন না।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান শুভঙ্কর। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তায় পা রাখেন শুভঙ্কর। গলির মোড়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কতগুলো ছোটো ছেলে ক্রিকেট খেলছে। শুভঙ্করের গায়ে বল এসে লাগে।
“কাকু, বলটা দেবেন?”
বলটা ছেলেগুলোর দিকে ছুড়ে দিয়ে হাঁটতে থাকেন শুভঙ্কর। তার কানে ঝিমলির কথাগুলো ভাসতে থাকে আবার, “অফেন আই গেট ব্যাড টাচ, বাবা। আই ডোন্ট নো হোয়াট টু ডু।” ঝিমলি জ্বরের ঘোরে কাঁপতে কাঁপতে কথাগুলো বলেছিল। বেশ কয়েকদিন ওকে স্কুলে পাঠানো যায়নি। জ্বর, বমি।
শুভঙ্করের বন্ধু ডাক্তার সুদীপ দত্ত বলেছিলেন, “কোনও কারণে ভয় পেয়ে আছে। একটু স্কুলে খোঁজ নে। ঝিমলির বন্ধুদের সাথে কথা বল। অন্য যাদের যাদের সাথে ঝিমলির ইন্টার‍্যাকশান হয়, তাদের দিকেও নজর রাখাটা দরকার। বুঝতেই তো পারছিস, দিনকাল ভালো নয়।”
এ-ঘটনা মাস ছয়েক আগের। নন্দিনী তখন অফিস ট্রিপে মুম্বাই গেছেন। ফোনে সব বলতেই ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন নন্দিনী। “আমি কালই ফিরে আসছি।”
পরের দিনই নন্দিনী চলে আসেন কলকাতায়।
হসপিটালে বড়ো ডাক্তার দেখানো হল ঝিমলিকে। রিপোর্ট সব ঠিক থাকলেও সেখানেও ডাক্তার একই কথা বললেন, “ভয় পেয়ে আছে। হয়তো পরিচিত কেউ ওকে ডিস্টার্ব করে। আপনারা চোখ খোলা রাখুন।”
স্কুলে সব জানানো হয়েছিল। একদিনের নোটিশে ওদের ড্রাইভারও পালটে ফেলেছিল শুভঙ্কর। ঝিমলির শরীর একটু ঠিক হতে দার্জিলিং ঘুরে এসেছিলেন ওঁরা ঝিমলিকে নিয়ে। নন্দিনী অনেকবার জিজ্ঞেস করেও কিছু জানতে পারেননি। শুভঙ্কর আর নন্দিনীও আর বেশি ঘাঁটাননি ওকে। দার্জিলিং থেকে ফিরে আস্তে আস্তে আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল ঝিমলি।
*****

সম্পাদকের অফিস থেকে বাড়ি ফিরতেই ঝিমলি ঝাঁপিয়ে পড়ে শুভঙ্করের ওপর। “দেখো বাবা! ইন্টার স্কুল শর্ট স্টোরি কম্পিটিশনে আমি ফার্স্ট হয়েছি। পরের সপ্তাহে প্রাইজ দেবে। তোমাদেরও যেতে বলেছে।” ঝিমলি লাফাচ্ছে আনন্দে।
“দারুণ খবর তো মা! লেখাটা তো একবারও পড়ালি না!”
“ইশ! তুমি একদম ভিজে গেছ। চেঞ্জ করে নাও। আমি রাত্রে শোনাব। তোমরা দু’জনেই যখন ফ্রি হবে।” ঝিমলি লাফাতে লাফাতে ওর কাগজের নৌকোগুলো বারান্দায় জমে থাকা জলে ভাসাতে থাকে। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শুভঙ্করের বুক খুশিতে ভরে যায়।
রাতে খাওয়াদাওয়া শেষ করে শুভঙ্কর আর নন্দিনী তখন সোফায় আরাম করে বসেছেন। ঝিমলি মায়ের গায়ে হেলান দিয়ে বসে ওর গল্পটা পড়তে শুরু করে।

‘রিয়া আর সেই পাখিটা’

বাবা-মায়ের সাথে রিয়া দূরে পাহাড়ে বেড়াতে গেছে। এর আগে রিয়া বরফ দেখেনি। পাহাড়ের মাথার ওপর সাদা বরফের মুকুট। গোলাপের বাগান। হলুদ, সাদা, গোলাপি। আরও কতরকমের পাহাড়ি ফুল। বিকেলবেলা রিয়া ফুল গাছগুলোর সাথে গল্প করে। প্রজাপতিরাও যোগ দেয় তাদের গল্পে। একটা কালো রঙের পাখি, তার ঠোঁটটা লাল আর হলুদ মেশানো। গাছের ডালে বসে কুটকুট করে হাসে। পাখিটার দিকে তাকালেই রিয়ার মনে হয়, পাখিটা তাকে কী যেন বলতে চায়। সন্ধে হয়ে এলেই মা রিয়াকে হোটেলের ঘরে ফেরত নিয়ে যায়। বাইরে হিম পড়ছে। রিয়ার ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে। সন্ধেবেলা হোটেলের ঘরে রিয়ার মন বসে না। মনে হয় বাইরে অত ঠাণ্ডায় না জানি ফুলগাছগুলো কী করছে! পাখিটা হয়তো গাছের ওপর ওর বাসায় ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু পরেরদিন সকালে যদি রিয়া আর ঐ পাখিটাকে দেখতে না পায় তাহলে কোথায় খুঁজবে তাকে সে? ভাবতে ভাবতে রিয়ার ঘুম পেয়ে যায়।
একদিন বিকেলে আপনমনে রিয়া বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। হঠাৎ সামনে এসে  দাঁড়াল একটা রাক্ষস। তাকে যেমন কুৎসিত দেখতে, তেমনই কর্কশ তার গলার আওয়াজ। রাক্ষসটা জোর করে রিয়াকে ধরে নিয়ে গেল পাহাড়ের ওপর। কেউ জানতে পারল না। কেউ রিয়াকে বাঁচাতে এল না। পাহাড়ের ওপর অন্ধকার গুহার মধ্যে রিয়াকে বেঁধে রেখে দিল রাক্ষস আর বলে গেল পরেরদিন সে রিয়াকে মেরে তার মাংস খাবে। সারারাত রিয়া কাঁদল। বাঁচাও, বাঁচাও বলে চিৎকার করল। কিন্তু কেউ এল না রিয়াকে বাঁচাতে।
ওদিকে চিন্তায় চিন্তায় রিয়ার বাবা-মা পাগল হয়ে উঠল। অনেক খুঁজেও তারা রিয়াকে কোথাও পেল না।
ভোরবেলা গুহার মধ্যে একটু আলো ঢুকেছে। অল্প আলোয় রিয়া দেখল, বাগানের সেই পাখিটা গুহার মধ্যে তার কাছে এসে বসেছে। ফিসফিস করে পাখিটা রিয়ার কানে কানে বলল, “ভয় পেলে জয় নেই। মনে মনে সাহস আনো আর প্রার্থনা করো, আলো দাও! আলো দাও!”
রিয়া একমনে চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করল - আলো দাও! আলো দাও!
খানিক বাদে গুহার বাঁদিকে একটা দরজা খুলে গেল। আর সেই দরজা দিয়ে অনেকটা সূর্যের আলো গুহার ভেতর পাখিটার গায়ে এসে পড়তেই সেটা অনেক বড়ো হয়ে গেল, প্রায় রাক্ষসটার মতো বড়ো। তার এই বড়ো বড়ো ডানা, মস্ত তার বাঁকানো ঠোঁট। রিয়াকে পাখিটা তার পিঠে বসিয়ে বাইরে নিয়ে এল। রাক্ষস তখন বাইরে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোচ্ছে। সে কিছু টের পাওয়ার আগেই রিয়াকে নিয়ে পাখিটা আকাশে উড়ে গেল। রিয়ার গায়ে সাদা সাদা মেঘ এসে পড়ল। নরম নরম মেঘ গায়ে মেখে রিয়া উড়ে চলল পাখির সাথে।
হোটেলের বাগানে রিয়াকে নামিয়ে দিয়েই সেই পাখিটা উড়ে চলে গেল। আর তাকে দেখতে পেল না রিয়া।
তার দু’দিন পরে রিয়া যখন বাবা-মায়ের সাথে কলকাতা ফিরবে বলে ট্রেনে বসে আছে, তখন রিয়ার কানে কানে কে যেন বলল, “ভয় পেলে জয় নেই।”

“কী ভালো লিখেছিস, ঝিমলি!”
শুভঙ্কর আর নন্দিনী মেয়েকে জড়িয়ে ধরতেই ঝিমলি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি ভয় পাইনি। আমি মনে মনে প্রার্থনা করেছিলাম আর তাই তো তোমরা ড্রাইভারটাকে তাড়িয়ে দিলে।”
“তুমি আমাদের সাহসী মেয়ে। এবার থেকে আমাদের সব বলবে। কেমন?” নন্দিনী মেয়ের মাথায় হাত রাখেন।

পরের সপ্তাহে স্কুলের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে যখন ঝিমলি স্টেজে ফার্স্ট প্রাইজ নিতে উঠল, তখন গর্বে শুভঙ্করের বুক ভরে উঠল। বড়োরা যা পারে না, ছোটোরা তা পারে। হ্যাঁ, এই জেনারেশন পারবে। তারা পারবে শেকল ভাঙতে। তারা পারবে সমাজের সব অন্যায়ের মোকাবিলা করতে। তাঁর আদরের ঝিমলি, তাঁর দশ বছরের মেয়ে ঝিমলি যে ভয়কে জয় করেছে, তাই তাঁর পরম প্রাপ্তি।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ জয়ন্ত বিশ্বাস

7 comments:

  1. সাবলীল ভাষায় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি বিষয়কে তুলে ধরেছেন লেখিকা। খুব ভালো লাগলো।

    ReplyDelete
  2. ভীষণ ভালো লাগলো গল্পটা। গল্প হলেও গল্প নয়, প্রতিটি কন্যার বুকের ভিতর যে কথা পাথর চাপা থাকে, সেই কথাকেই আলো দিলেন এই গল্পের লেখিকা শ্রীমতী বনশ্রী মিত্র। ঠিক গল্পের ওই পাখিটির মত।
    গল্পের সাথে জয়ন্ত রায়ের আঁকা ছবিটা এক অপূর্ব প্রাপ্তি।

    ReplyDelete
  3. ভীষণ ভালো লাগলো গল্পটা। গল্প হলেও গল্প নয়, প্রতিটি কন্যার বুকের ভিতর যে কথা পাথর চাপা থাকে, সেই কথাকেই আলো দিলেন এই গল্পের লেখিকা শ্রীমতী বনশ্রী মিত্র। ঠিক গল্পের ওই পাখিটির মত।
    গল্পের সাথে জয়ন্ত রায়ের আঁকা ছবিটা এক অপূর্ব প্রাপ্তি।

    ReplyDelete
  4. অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
    আঁকাটি সত্যি খুব সুন্দর। শিল্পী জয়ন্ত বিশ্বাস।

    ReplyDelete
  5. সুন্দর সমাধান, ভয়কে জয় করতে হবে। ছোটদের জন‍্য ভালো মেসেজ। এমন আরো চাই

    ReplyDelete