চলো যাইঃ লেপার্ডের ডাকঃ অরিন্দম দেবনাথ





৭০০০ ফুট উচ্চতায় মসৃণ পিচঢালা পাহাড়ি রাস্তার খাদ বেয়ে নিচের ছায়া-ঢাকা নিঝুম ঘন অন্ধকার ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে জঙ্গল থেকে গম্ভীর গাঁক গাঁক আওয়াজটা ভেসে এল। একবার নয়, পরপর বেশ কয়েকবার। অবিকল চিড়িয়াখানায় বাঘের খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে শোনা ডাক। আশেপাশে কোনও মানুষজন নেই যাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করা যায় শব্দটা কীসের। জঙ্গল এত ঘন যে রোদ্দুর পৌঁছয় না গাছের গোড়ায়। পাথরের ওপর হালকা মাটির আস্তরণ ঢেকে আছে পুরু শ্যাওলা ও ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদে। হিমালয়ান পাইন আর ওকগাছের জঙ্গল রাস্তার দু’পাশে। নিচের জঙ্গল শেষ হতে চা-বাগানের শুরু। ভালুক আর লেপার্ডের আস্তানা এই জঙ্গল।
পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার কার্শিয়ং থেকে ডাওহিল হয়ে বাগোরা যাবার রাস্তায় আমাদের গাড়িটা পাহাড়ের কিনারা ঘেঁষে রংচঙে সুন্দর করে ফুলগাছ দিয়ে সাজানো বাড়িঘরের পাশ দিয়ে সোজা উঠে চলেছিল পাকা রাস্তার পাকদণ্ডী বেয়ে। স্কুল ছুটির সময়, আমাদের আগে স্কুলের খুদে পড়ুয়া বোঝাই একটা গাড়ি পাহাড়ি ঢালের ঝকঝকে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বাচ্চা নামাতে নামাতে চলেছে।
পাহাড়ের এক বাঁকে বহুদূর সমতলে তিস্তা নদীর শুকনো বালুতট একটা আঁকাবাঁকা ফিতের মতো নজরে এল। জঙ্গলের মাঝের রাস্তাটা প্রায় যানবাহন-শূন্য হলেও যত্ন নিয়ে রক্ষিত। হবে নাই বা কেন? রাস্তাটা গিয়েছে সোজা কার্শিয়ং এয়ার ফোর্স স্টেশন পর্যন্ত। রাস্তার একপাশে গাছে ঢাকা খাড়া পাহাড় আর একপাশে সবুজ খাদ নেমে গেছে ওক আর পাইনের জঙ্গল বেয়ে।
কার্শিয়ং শহর থেকে কার্শিয়ং এয়ার ফোর্স স্টেশন (বাগোরা) পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার রাস্তায় উল্লেখযোগ্য মাত্র দুটো গ্রাম পড়ে। একটা চিমনি আর একটা বাগোরা। চিমনি গ্রামে মেরেকেটে ২৫০টা পরিবার আর ৭১৫০ ফুট উঁচু বাগোরা গ্রামে ৮০টা-মতো পরিবারের বাস।
বাগোরার পথে
মে মাস। হু হু করে আচমকা একরাশ মেঘ এসে চারপাশ ধোঁয়ার মতো ঢেকে দিয়ে খানিক পরেই উধাও হয়ে গেল। কাছের সমতল শিলিগুড়িতে গা জ্বালানো গরম। আর আমরা চলেছি মেঘের মধ্যে দিয়ে।
একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। পিচঢালা রাস্তাটা আরও কালো হয়ে উঠল। চিমনি গ্রাম পার হতে ড্রাইভার সুমন বলল, আর পাঁচ কিলোমিটার বাকি বাগোরা গ্রাম আসতে। ড্রাইভারকে বললাম, “আমাকে নামিয়ে দাও ভাই, এইটুকু রাস্তা হেঁটে যাই। তুমি বাকিদের নিয়ে বাগোরা চলে যাও।”
মানিক আমার হাঁটার সঙ্গী হল।
পথের ধারে ফুটে থাকা অর্কিড
পথের দু’পাশের পাথরের গায়ে গায়ে ফুটে আছে অসংখ্য অর্কিড। গাছের ডালে ডালে ঝুলে আছে ফার্ন। ইলেকট্রিক তার ঢেকে আছে জঙ্গল থেকে উড়ে আসা পাইন পাতার সবুজ শুকনো গুঁড়োর পুরু আচ্ছাদনে। ছোটো ছোটো রং-বেরঙের পাখি ডাকতে ডাকতে উড়ে বেড়াচ্ছে গাছের এক ডাল থেকে আরেক ডালে। আমরা দু’জন ছাড়া কোনও লোকের দেখা নেই। দু’পাশের জঙ্গলটা আশ্চর্যরকম নিঃশব্দ।
হাঁটতে হাঁটতে প্রায় বাগোরা গ্রামের দোরগোড়ায় পৌঁছেছি আর তখনই আচমকা জঙ্গলের নিস্তব্ধতা ভেঙে আওয়াজটা কানে এল। বৃষ্টিও নামল ঝুপ করে।
বাগোরা গ্রাম
বাগোরাতে আমাদের থাকার জায়গা ডিকি ভুটিয়ার হোম-স্টেতে। যখন পৌঁছলাম তখন দলের বাকি সবাই দুপুরের খাবার খেতে বসে গেছে। খাওয়ার পাট শেষ হতে না হতেই একরাশ ঘন মেঘ এসে ঢেকে দিল চারদিক। সাড়ে তিনটেতেই সন্ধের অন্ধকার। ঘরের লাগোয়া বারান্দায় বসে কী করব ভাবছি, অমনি কানে এল ‘টি টি’ শব্দটা। দেখি, ঘরের কাছে ইলেকট্রিক তারের ওপর বসে আছে ছোট্ট একটা নিলরঙা পাখি - ভারডিটের। তার খানিক দূরে হলুদরঙা আরেকটা পিপিট। দুটোই চড়াই পাখির আকারের।
টিপটিপে বৃষ্টিতেই ছাতা মাথায় সব চললাম বাগোরা গ্রাম চিনতে। গোটা কয়েক দোকান আর খানিক দূরে এয়ার ফোর্স স্টেশন। আর আছে একটা ছোটো হেলথ সেন্টার, একটি প্রাইমারি স্কুল ও বন দফতরের একটা বনবাংলো।
বাগোরা বাজার
বাগোরা বাজার থেকে একটা রাস্তা চলে গেছে দেড় কিলোমিটার দূর এয়ার ফোর্স স্টেশন, একটা রাস্তা ৯.৫ কিলোমিটার দূরে মানা গ্রামে, আর একটা রাস্তা গেছে ১৭ কিলোমিটার দূরে লাতপাঞ্চোরে। গ্রামে ঢোকার ঠিক আগে হেলথ সেন্টারের কাছ থেকে দুটো রাস্তা চলে গেছে একটা দু’কিলোমিটার দূরে বালিরাম গ্রামে আর একটা আট কিলোমিটার দূরে চটকপুর গ্রামে।
আমরা এয়ার ফোর্স স্টেশন যাবার রাস্তা ধরলাম। এই রাস্তার শেষে আছে একটা ভিউ পয়েন্ট। তারপরই এয়ার ফোর্স স্টেশনে ঢোকার গেট।
বাজার চত্বরের গুটি কয়েক বাড়ি পার হবার পরই প্রকৃতির ক্যানভাসটা বদলে গেল। রাস্তার ডানদিকে এল খাড়া পাহাড়। এই পাহাড়ের মাথায় এয়ার ফোর্স স্টেশন। পাহাড়ের পাথরের গা ভরে ফুটে আছে অসংখ্য অর্কিড, আর আছে বাহারি ফার্ন ও ছোটো ছোটো পাইনগাছের সারি। আর বাঁদিকে গাছে ঢাকা সবুজ পাহাড়ি খাদ গিয়ে মিশেছে বহু নিচের উপত্যকায়। সেখান থেকে আবার ঢাল নেমে গেছে তিস্তার চরে। পাখির তীক্ষ্ণ ডাক লক্ষ্য করে গাছের পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে ছোটো ছোটো রং-বেরঙের পাখিগুলোকে দেখা গেল। ম্যাগপাই, বুলবুল, ফ্লাই ক্যাচার, ভারডিটার, পিপিট, প্রিনিয়া, লম্বা লেজওয়ালা সিরকি। অধিকাংশ পাখিই ডাকছে নিচের খাড়াই খাদের দুর্গম জঙ্গল থেকে। সেটা পাখিদেরই সাম্রাজ্য, মানুষের প্রবেশ নিষেধ।
ভিউ পয়েন্ট
ভিউ পয়েন্টে একটা গোল উলটানো লাট্টুর মতো আচ্ছাদনহীন কাঠের বেঞ্চে খানিক বসে ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ফেরার পথে একটা সুন্দর সাজানো বাড়ির সামনে দেখা হয়ে গেল দুই শিশুর সাথে। আমাদের দলের চার খুদের সাথে বেজায় ভাব হয়ে গেল কার্শিয়ংয়ের এক ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়া প্রথম শ্রেণির দুই পাহাড়ি পড়ুয়ার। রীতিমতো রাইম কম্পিটিশন চলল খানিক। তারপর হাঁটতে হাঁটতে এসে বসলাম বাগোরা বাজারের এক চায়ের দোকানে। তার আগে এক দোকানে বাচ্চাদের নিয়ে চকোলেট কিনতে গিয়ে বাচ্চারা পেয়ে গেল বৃদ্ধা লেপচা দোকানি ঠাকুমাকে। বাচ্চাদের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ভালো করে লেখাপড়া করতে বলে দোকানি ঠাকুমা বলল, “শীতকালে এসো, তোমাদের কমলালেবু খাওয়াব। তখন এখানে আরও কত পাখি দেখতে পাবে। বরফে ঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘা পাহাড় দেখতে পাবে। এখন তো বর্ষাকাল, মেঘের মধ্যে ডুবে থাকার সময়। তাই সব দূরের বরফ-পাহাড়গুলো মেঘের চাদর ঢাকা দিয়ে বসে আছে।”
চা দোকানের দোকানি বলল, “কাল সকালে ফরেস্ট রেস্ট হাউসের নিচের জঙ্গলে চলে যাও বাচ্চাদের নিয়ে। ওদের খুব ভালো লাগবে। প্রতিবছর এখানে বেশ কয়েকটা সামার ক্যাম্প হয় স্কুলের বাচ্চাদের নিয়ে। অনেক দল আসে সমতল থেকে। এই তো বহরমপুর শহরের পঞ্চাশটা বাচ্চার দল চারদিন জঙ্গলে কাটিয়ে গতকাল ফিরে গেল। আমাদের এখানে কম্যুনিটি হলে এসে সবাই থাকে। কিন্তু জঙ্গলে সাবধানে থাকবে। অনেক ভালুক, লেপার্ড আর সাপ আছে জঙ্গলে। আর এই বর্ষায় আছে জোঁক। মোজার ভেতর প্যান্ট গুঁজে সঙ্গে নুন নিয়ে যেও। এখানকার আমরা সবাই এই সময় হাঁটু পর্যন্ত উঁচু গামবুট পরে ঘুরে বেড়াই। অনেক লোক একসঙ্গে থাকলে লেপার্ড কাছে আসে না। কিন্তু ভালুকের ভরসা নেই। কোন কারণে ওদের সামনে পড়লে আঁচড়ে কামড়ে গায়ের মাংস তুলে দেয়। আমাদের গ্রামে ও আশেপাশে অনেক ভালুকের আঁচড় খাওয়া লোক দেখতে পাবে।”
তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। সাথে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া। এখানে দোকানপাট সন্ধে নামতে না নামতে বন্ধ হয়ে যায়। বাচ্চাদের নিয়ে ছাতা মাথায় পাকদণ্ডী বেয়ে ছুট লাগালাম ডিকির বাড়ি। ডিকির বাড়িটা বাগোরা গ্রামের সবচাইতে উঁচুতে। আচমকা ঠাণ্ডা কাঁপিয়ে দিচ্ছে সবাইকে।
রাতে খাবার পর বৃষ্টিটা খানিক ধরতে দেখি, একদিকের আকাশ পুরো লাল হয়ে আছে এয়ার ফোর্স স্টেশনের জোরালো আলোতে।

খুব ভোরে ঘুম ভাঙল দরজায় খটখটানি শুনে।
“কে?”
শুনতে পেলাম ইন্দ্রাণীর গলা। “ভোরবেলা ছবি তুলতে যাবেন বলেছিলেন না? আমিও যাব আপনার সাথে?”
কম্বলের তলা থেকে বেরিয়ে দরজা খুলে দেখি চারপাশ মেঘে ঢাকা, সাথে টিপটিপে বৃষ্টি। ভোর পৌনে পাঁচটা। বললাম, “এই আলোতে আর টিপটিপে বৃষ্টিতে ছবি তোলা মুশকিল। যাও, শুয়ে পড়ো।”
কোয়েল
দরজাটা বন্ধ করতে যাব, অমনি কানে এল একটা পাখির আওয়াজ। দেখি, নীল রঙের ছোটো একটা ভারডিটার পাখি ইলেকট্রিক তারে এসে বসল। আমিও আলস্য ঝেড়ে সোয়েটার চাপিয়ে ছাতা মাথায় ক্যামেরা কাঁধে একাকী বেরিয়ে পড়লাম। হাঁটা দিলাম এয়ার ফোর্স স্টেশনের দিকে। সব বাড়ির দরজা-জানালা বন্ধ। একাকী আমি হেঁটে চলেছি। আলো বাড়ার সাথে সাথে মেঘটা ক্রমেই হালকা হচ্ছে। কোয়েলের মতো একটা পাখি আমার আগে আগে রাস্তা দিয়ে লাফাতে লাফাতে চলেছে সম্ভবত কোনও পোকার পিছু পিছু। একটা লাল রঙের ম্যাগপাই পাখি এক থোকা ফুলের ভেতর ঠুকরে চলেছে। দূরে এক লম্বা পাইনগাছের মাথার শুকনো পাতাহীন ডালে একটা নীল ফ্ল্যাই ক্যাচার পাখি বসে আছে।
বাগোরার শ্মশান
কয়েকজন এয়ার ফোর্সের জওয়ান ট্রাক-স্যুট পরে দৌড়ে আমাকে পাশ কাটিয়ে গেল মুচকি হেসে। রাস্তার শেষে পৌঁছে এয়ার ফোর্স স্টেশনে ঢোকার গেটের আগে দেখি, একটা পায়ে চলা রাস্তা চলে গেছে জঙ্গলের ভেতরে। খানকতক প্রেয়ার ফ্ল্যাগ দড়িতে ঝুলছে। খানিক এগোতে নজরে এল, জঙ্গলের মাঝে একটা মন্দির। কোনও লোকজন নেই। খুব পরিষ্কার। কয়েকটা সিমেন্টের বেঞ্চ আছে বসার জন্যে। মন্দির থেকে একটু দূরে পাহাড়ের খাদ ঘেঁষে একটা টিনের শেড দেওয়া পাথর বাঁধানো চাতাল। চাতালের ঠিক মাঝখানটা দু’ফুট গভীর করে কাটা আর তার ওপর উনুনের মতো লোহার শিক লাগান। বুঝলাম, এটা হল বাগোরার শ্মশান। নিঝুম শ্মশানে থেকে থেকে একটা ঝিঁঝিঁ পোকা ডেকে চলেছে। আমাকে চমকে দিয়ে একটা বিশাল আকৃতির কালো কুচকুচে দাঁড়কাক ককর্শ স্বরে ডেকে গাছের ওপর থেকে আমার সামনের ঘাসে এসে বসল। তারপর খানিক এদিক ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে উড়ে হারিয়ে গেল সামনের পাহাড়ি খাদে।
চা বাগানের শ্রমিক
ফিরতি পথে আমাকে পাশ কাটিয়ে ঝুড়ি কাঁধে এগিয়ে যাওয়া এক পুরুষ ও দুই মহিলা চা-বাগান শ্রমিকের টুকরো কথা কানে এল। কয়েকদিন ধরে নিচের চা-বাগানে উৎপাত করতে থাকা লেপার্ডটা গতকাল দুপুরে ফাঁদে ধরা পড়তেই চা শ্রমিকরা… শিউরে উঠলাম। গতকাল দুপুরেই তো জঙ্গল-পথে হাঁটতে হাঁটতে আওয়াজটা শুনেছিলাম! তবে কি সেই আওয়াজটাই এই লেপার্ডটার মরণ চিৎকার ছিল?
_____
ছবিঃ লেখক

1 comment:

  1. 😞😞😞 শেষে মন খারাপের প্যারাগ্রাফ

    ReplyDelete