গল্পঃ টুয়ার উপহারঃ রুমেলা দাস

টুয়ার উপহার

রুমেলা দাস


স্যার এককাড়ি বকে আমার মনের মধ্যে পুঁটলি ভরে তেতো ঢুকিয়ে দিয়েছে। তারপর থেকে দু’পায়ের মধ্যের যে জায়গাটা হাঁটু ভাঁজ করলে ঢিবির মতো হয়ে যায়, সেখানে মাথা গুঁজে টুপটাপ জল ফেলছি চোখের। আর খসখসে ফ্রকের উপর সেসব পড়ে ভোঁতা আওয়াজ হচ্ছে। কিন্তু একটানা আমি যেন কোনও কিছুই করতে পারি না। মা বলে, আমার সবেতেই ব্যস্ততা। তাই তো অঙ্কের সিঁড়ি ভাঙায় অমন সব ভুল হয়ে যায়। উত্তরটা ভাবি ছয় লিখব, লেখার সময় মনেই থাকে না। চেয়ে চেয়ে দেখি, দেবারতি সুন্দর গোলাপি খাঁজওয়ালা জ্যামিতি-বক্স এনেছে। উত্তরটাও হয়ে যায় আট। বাড়ি আসতেই সেসব নিয়েই বকছিল মা, বাপী, তারপর অঙ্কস্যার। দূর ছাই, এসব ভাবতে আর ভালো লাগছে না।
সন্ধে হয় হয়। এখনই আসবে ওই লোকটা, টং টং আওয়াজ করবে চাটুতে। আর কী একটা সাদামতো গুলে কালো চাটুতে ফেলে প্রথমে হাতা দিয়ে ভালো করে পাতবে। আর এপিঠ ওপিঠ করে ভেজে গুটিয়ে সুন্দর লম্বা মতন খাবার বানাবে। একনাগাড়ে করে যাবে যতক্ষণ না রাত হচ্ছে, আর মা ডাকছে ‘টুয়া’। ছাদের কোণ থেকে আমিও দৌড়ে নেমে আসি বাঁকানো সিঁড়ি দিয়ে। দুমদাম পা ফেলে। একটা সিঁড়ি ঢুপ আবার অন্যটা ঢাপ আওয়াজ করে আমার তালে তাল মেলায়।
ঠিক উঠব উঠব মনে করছি, তখনই ছোটকা আচমকা আমার গায়ের কাছে গরম, নরম তুলো ঠেকাল। ওরকম ভয় কত দেখায় আমাকে! ভয় পাই না একটুও। ভেংচি কেটে পালিয়ে যাই। আজও নিশ্চয়ই একটা কিছু করতে এসেছে। বিরক্ত লাগল। একদম মাথাই তুললাম না। নরম তুলোটা তো সরে না! উফ্‌, কী গরম! কীসের যেন শব্দ হচ্ছে? কুঁই-ইইইইইই, কুঁই-ইইইইইই। ছোটকা পাজি তো! কোনও কথাই বলছে না।
আমি আর থাকতে পারলাম না। মাথা তুলতে যাব কী! চমকে গেলাম। আমার হাঁ করা মুখটা দিয়ে বেরিয়ে এল, “ওমা!”
ছোট্ট একটা ছানা। কুকুরের ছানা। নোটানো সাদার মধ্যে লালচে কান। গোটা গা-টা ঐরকমই। লেজটাও। ছোটকা আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। দু’হাতের তালুতে ধরে আছে তুলোটা। ওটা তুলো নয়। লাল লাল চামড়ার উপর সাদা সাদা লোম। থাবাগুলো স্পঞ্জের মতো নরম, লাল। আমার গা ঘেঁষে জুলজুল করে তাকাচ্ছে। চোখদুটোয় জল জল। আমি একমুখ খুশি নিয়ে ছোটকাকে দেখতেই ও বলল,  “এটা তোর।”
আমার সব মনখারাপ ভ্যানিশ হয়ে গেল। ওকে নিতে পারছিলাম না। ছোটকা ভালো করে ধরে ফ্রকের মাঝে রেখে দিল। হাঁটু উঁচু করা কোলের মাঝখানটায় কেমন দোলনার মতো হয়ে ছিল। তাতেই দুলে উঠল ওটা। সমানে ডেকে চলেছে, ‘কুঁই-ইইইইই, কুঁই-ইইইইইই।’
“ওকে কোথা থেকে পেলে?”
“আমাদের হাসপাতালেই!”
“বাড়ি কোথায়? বাবা-মা কোথায়!”
“কেউ নেই ওর। মা ছিল, এখন আর নেই। গলায় ঘা হয়েছিল, তাই এক সপ্তাহ আগেই মারা গেছে। কারুর বাড়ির ছিল। রোগ হতেই বাইরে ছেড়ে দিয়েছে। আমাদের টিম ওর মাকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনে।”
“তারপর?”
“তারপর আর কী! তিনদিন হল ও হয়েছে।”
“আমার কাছে থাকবে?”
“হ্যাঁ, কোথায় আর যাবে? ওর তো বাড়ি নেই!”
আমি জানি, ছোটকা পারলে ছোটকার হাসপাতালেই ওকে রাখতে পারত। আমি তো দেখে এসেছি, এমন আরও কতো ছোটো আছে। যেদিন গিয়েছিলাম, কত বায়নাই না করেছিলাম। তখন ছোটকা বলেছিল, বড়ো হলে দেবে। তাহলে কি আমি বড়ো হয়ে গেলাম! তবে যে সবাই আমায় গেঁড়ি বলে! খুব রাগ হয়! আমি কি গেঁড়ি নাকি? ওটার মানে তো পুঁচকে। এই পাপিটা তো আরও পুঁচকে। আমার থেকেও!
এসব ভাবছিলাম। আর ও দেখি কাঁপতে কাঁপতে মাথাসমেত ঘাড়টা তুলে মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আমি ওর খাড়া তুলোর মতো লোমে হাতের আঙুলগুলো গুঁজে দিলাম। ও চোখ বুজল।
“তোমার মনের মতো জিনিস এনে দিলাম। এবার মন দিয়ে পড়াশুনা করবে। আর বায়না নয়।” ছোটকা বলল।
“ঠাকুরপো, তুমি তো ফাঁকি দেবার জিনিস এনে দিলে!”
মা যে কখন এসে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করিনি। বয়েই গেল। আমার এখন থেকে কাউকে লাগবে না। ভালো করে পাদুটোকে গুটিয়ে ওকে জড়ো করে নিয়ে এলাম কোলের কাছে। চারদিকে সন্ধের ফুঁ পড়ছে। তার মানে সাতটা বাজে। ঐ টং টং কাকুটা আসবে। সাদা গোলা পাতবে। লম্বা খাবার বানাবে। আমি এখন আর ছাদে যাব না। আজ না। কাল না। নাহলে ওকে দেখবে কে? আমি ছাড়া যে ওর কেউ নেই। এখন আমার অনেক কাজ। এত্ত এত্ত! ওর খাওয়াদাওয়া, ঘুম, সবকিছু আমাকেই দেখতে হবে।
“ওকে কী বলে ডাকব, ছোটকা?”
“নাম?”
“নাহলে ও সাড়া দেবে কী করে?”
“সে হবে’খন, ভেবেচিন্তে একটা দেওয়া যাবে।”
“না, এক্ষুনি!”
“কেন! টুয়ার ভাই টিটো!” মা দেখি ফটাং করে একটা নাম বলে দিল। আর তখনই টিক টিক টিক। ক্যালেন্ডারের পিছন দিক থেকে ঘোলাটে গোল্লা গোল্লা চোখ বার করে চ্যাপটা মাথার হলুদ টিকটিকিটা একবার নয়, তিন-তিনবার বলল। তার মানে ঠিক ঠিক ঠিক! ওকে বিছানার একপাশে সাবধানে নামিয়ে লাফিয়ে উঠে মাকে জড়িয়ে ধরলাম।

নাম ধরে ডাকতেই থপ থপ করে দৌড়ে দৌড়ে চলে আসে কাছে। একপ্রস্থ চেটে নেয় পায়ের পাতা। যত আঙুল সরিয়ে নিই, ততই ঘেঁষে এসে দাঁড়ায়। আমার যে কাতুকুতু লাগে টিটো বোঝে না। কোলে উঠতে চায়। বায়না করে। মুখ নিচু করে গোল হয়ে হয়ে ঘোরে আর নাচে। কোলে নিলেই হাতেও চেটে-চুটে একশা করে, আমি কাতুকুতুতে পাগল হয়ে যাই। ও তাও ছাড়ে না। পাঁচ মাস বয়স হল। হিসেব রাখি না। রাখতেই পারি না। ছোটকা রাখে। ছোটকা যে ওদের ডাক্তার। আমাদের ফাগুপুরে যে পশু হাসপাতাল আছে, সেখানেই তো ছোটকা যায়। হাসপাতালটা খুব বড়ো। অনেক ঘরেই এমন ছোটো ছোটো পাপি, ম্যাঁও আছে। কোথা থেকে যে ওদের পায়! তারপর কিছুদিন রেখে বড়ো করে কোথায় যেন দিয়ে আসে। টিটোকেও যত্ন করে ছোটকা। মাঝেমধ্যে লম্বা সূঁচ ফুটিয়ে দেয় চেপেচুপে। সেদিনই ও একটু বেশি কাঁদে। আর কুটি কুটি চোখে ভরে যায় পুকুরের মতো জল। আমার খারাপ লাগে। ছোটকাকে বারণ করেছি। ছোটকা বলে, এগুলো নাকি ওর ভালোর জন্য। বাইরের রোগ আক্রমণ করতে সাহস পাবে না। আমাকেও ছোটোবেলায় এমন সব ইঞ্জেকশন দিয়েছিল ডাক্তার। মা বলেছিল। এসব শুনে কষ্ট লাগলেও চুপ করে থাকতাম। টিটোর বিছানা আছে। পরিষ্কার জলের বাটি, দুধের বাটিও আছে তবে ছোটকা কখনও কখনও চামচে করে দুধও খাইয়ে দেয়। শান্ত আর ভালো টিটো। খালি দরজা যখন বন্ধ আর খোলা হয়, তখনই একটু কানখাড়া করে। বাকিটা সময় চুপ।
তবে সেদিন একটা কাণ্ড হয়েছে। রবিবার ছিল। আমিও পেট ভরে মাংস-ভাত খেয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছি, টিটো দেখি পিঠের দিকে লোমগুলো আস্তে আস্তে খাড়া করে উঠে দাঁড়াচ্ছে। ফুলঝাড়ুর মতো লেজটাও। কানদুটো সটান খাড়া হয়ে আছে। আমি পিঠে হাত দিয়ে আদর করতেই আমার দিকে এমন করে তাকাল, মনে হল ভারি রাগ হয়েছে ওর! জুলজুলে ভাবটা একেবারেই নেই চোখে। গেটের গ্রিলে মুখ লাগিয়ে দেখলাম। কই, না তো! কিছু তো নেই! তবে কেন টিটো এমন করছে? ছোটকা বলে, ওরা খারাপ কিছুর গন্ধ পেয়ে যায় নাকি আগে থেকেই। তাই তো পুলিশেরা চোর ধরতে গেলে ওদের নিয়ে যায়। কিন্তু টিটো দেখল কাকে? কিছুই বুঝতে পারছি না। উপরদিকে ছাদে যাওয়ার ঘোরালো সিঁড়িতেও তো কই কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। তাহলে কি এমন কেউ এসেছিল যে পালিয়ে গেছে! টিটোর ভয়ে? গেট খুলে বেরোতেও পারব না। সবাই বারণ করে। টিটো সেই একইভাবে গা ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এবার আমি ভালো করে ওর চোখের দিকে খেয়াল করলাম। ও উপরদিকে তাকিয়ে চিৎকার করছে। উপরদিকে কী আছে? আমিও তাকালাম। এমা! এ তো আমাদের দেওয়াল! টিটো মুখ দিয়ে অদ্ভূত একটা গরওঁওঁওঁ গ্রোওঁওঁওঁ করে শব্দ করছে। ও কি রেগে গেছে? আমার চোখ পড়ল মাইতিদাদুর পাঁচিলের উপর। ওখানে বসে সেই হলুদ কালো মেনিটা। মাইতিদাদু রোজ ওই মেনিটাকে কাঁটা খেতে দ্যায়। এক পা পাঁচিলের উপর রেখে আরেকটা পা মুখের সামনে এনে চোখ বুজিয়ে একবার থাবাটা মুখের সামনে আনছে, আবার ঐ থাবাটাই ঘোমটার মতো মাথার উপর বোলাচ্ছে। স্পষ্ট দেখলাম, টিটো একদৃষ্টে ওটার দিকে তাকিয়ে আছে। রেগেমেগে একশা হয়ে লোম খাড়া করেছে। আমি প্রথমে একচোট হেসে নিলাম। ওকে শান্ত করতে ওর গায়ে হাত দিতেই ‘ভগভৌ’ ডেকে উঠে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। কোনওমতে টেনেই ওকে ঘরের ভিতরে আনতে পারছি না।
“টিটো, চল শিগগিরি। উফ্‌, বাবা রে বাবা, কী রাগ! ও তোর কী করেছে যে তুই এত রাগ দেখাচ্ছিস?”
“কী রে টুয়া, হলটা কী?”
আমার চেঁচামেচিতে ছোটকাও খাবার ছেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
“দ্যাখো না, ওই মেনিটাকে দেখে টিটোর কী রাগ! আমার কাছেও আসছে না!”
“ছেড়ে দে, ও নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে। আমেরিকান এস্কিমো তো, তাই চটে যায় একটু বেশি। আবার কিছুক্ষণ বাদেই ঠিক হয়ে যাবে। বেশিক্ষণ মাথা গরম থাকে না।”
“আমেরিকান এস্কিমো?”
“হুম, এই জাতের কুকুরগুলো একটু খিটখিটে হয়। আবার বেজায় আদুরে। তাছাড়া কুকুরেরা বিড়াল দেখলেই রেগে যায়, এ তো ওদের নেচার!”
আমার বেশ অবাক লাগল। এতটুকু টিটো! ওর আবার রাগ? সেই চার-পাঁচদিন বয়স থেকে ও আমার কোলে, এখন আমার কাছেই আসছে না? আর হ্যাঁ, ছোটকা কী যেন বলল? আমেরিকান এস্কিমো! বইতে পড়েছি, এস্কিমো মানে ঠাণ্ডার দেশ। তাহলে কি টিটোর খুব গরম লাগছে? তাই ও রেগে যাচ্ছে? চটপট আমার প্লাস্টিকের হাতপাখাটা নিয়ে এলাম। সবাই তো হেসে কুটোপাটি, বাপিও। হাসুক গে! আগে তো টিটোর মাথা ঠাণ্ডা করি।
পাখা দিয়ে সবে হাওয়া শুরু করেছি, দেখলাম ও আমার গা ঘেঁষে এসে দাঁড়াল। জানালা দিয়ে দেখলাম, মেনিটাও আর নেই! বাঁচা গেল। কাল থেকে এদিকের জানালাটা বন্ধ করে রাখব। কিন্তু একটা প্রশ্ন - সেই বরফের দেশ থেকে এখানে টিটোর মা-বাবা বর্ধমানে এল কী করে? ছোটকাকে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম।
“ধুর পাগলি! ওর বাবা-মা বরফের দেশ থেকে আসতে যাবে কেন? টিটোর বাবার বাবা কি তারও অনেক আগে ওরা হয়তো ভারতে এসেছে। আমেরিকান এস্কিমো হলেও এই স্পিৎজ প্রজাতির জার্মানি থেকেই মূলত উৎপত্তি হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এদের নাম আমেরিকান এস্কিমো রাখা হয়। খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে পোষ্য হিসাবে। তবে অচেনা কিছু দেখলে বাড়ি মাথায় করবে, মালিকের ক্ষতি করতে পারে এমন।”
“তাহলে কি বিড়ালটা আমাদের ক্ষতি করবে, ছোটকা?”
“ওরে টুয়া, তুমি একেবারে কোশ্চেন ব্যাঙ্ক। এত উত্তর দিতে পারব না আমি! ওকে নিয়ে ঘরে যাও।”
আজকের দিনটাই নষ্ট। সেই কখন থেকে ভাবছি। বাপির দেওয়া অঙ্ক ক’টা সেরে নিয়েই প্যান্ডেলের কাজটা দেখব, তা নয়! মহা ফাঁপরে ফেলে দিল টিটোটা। এই সময়টা এমনিতেই আমার ভয় ভয় করে। সামনে হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা। তার উপর সারাদিন, সারারাত এই ঠুকঠাক,  ঠকঠক করে কাকুরা কাজ করেই চলেছে। কিছুতে পড়তেই ইচ্ছে করে না। আমি শুধু গুনি আর কতদিন বাকি পুজো আসতে। আর কতদিন বাকি পরীক্ষা শেষ হতে! ওদিকে তরতর করে বেড়ে ওঠে প্যান্ডেল। একধাপ। দু’ধাপ। তিনধাপ। কাকুগুলো বাঁশ বেয়ে উঠে মোটা মোটা দড়ি দিয়ে জোরে জোরে বাঁধে বাঁশগুলোকে, একটার পিঠে আরেকটা। ওদের পোঁতা বাঁশগুলোয় প্রত্যেকবার দড়ি ঝুলিয়ে দোলনা করে লক্ষ্মীকাকিমাদের বাড়ির ছেলেমেয়েগুলো দোল খায়। কেউ বকে না ওদের। ওরা স্কুলেও যায় না। আমার ঘর থেকে সব দেখা যায়। আমি যে দু’দণ্ড এসব দেখতে পাব তার কি উপায় আছে! শুধু পড়া আর পড়া। সেই যে উল্টোরথের দিন খুঁটি পুজো হল, পাড়ার সবাই গেল, সেদিনও আমি যেতে পারিনি। ইতিহাস মুখস্থ করতে হয়েছিল। রুটিনটাও দিয়ে দিয়েছে। ওটাকে মা সামনে দেওয়ালে টাঙিয়ে রেখেছে। বলেছে, “রোজ এটাকে দেখবি আর পড়া তৈরি করবি!” খেলার ছাড় ওই একটু আধটু টিটোর সাথে। তাও বেশি না।
আমি আর একটুও সময় নষ্ট করব না। তাড়াতাড়ি খাতা খুলে বসে গেলাম। অঙ্ক সেরে ফেলি। টিটোও দেখি পিছন পিছন এসে আমার পিঠে হেলান দিয়ে বসেছে। এইমাত্র যে এতটা রেগে গেছিল একটুও বুঝবে না কেউ। ম্যাঁও দেখে এত রাগ? আচ্ছা, ও আর মেনিটা যদি খুব বন্ধু হয়? বেস্ট ফ্রেন্ড যেমন হয়, তেমন। তবে?

উপায় তো একটা বের করতেই হবে। নাহলে টিটোকে নিয়ে মুশকিলে পড়তে হবে। মাইতিদাদু নালিশ করেছে বাবাকে। টিটো এত চিৎকার করে! উনি ঘুমোতেই পারেন না। বাবাও খুব বকছিল ছোটকাকে। আমি সব শুনেছি। ছোটকা বলছে, টিটোকে নিয়ে চলে যাবে। কী হবে ওর? আমি থাকব কী করে? কেউ আমার কথা তো ভাবছেই না! বুকের মধ্যে খারাপ লাগছে। পরীক্ষায় নম্বর কাটা দেখলে যেমন হয়।
ওদের পাঁচিলে সবসময় মেনিটা ঘুরে বেড়ায়। তাই তো টিটো চিৎকার করে। টিটোকে আমরা যেমন ঘরে রাখি, ওরা রাখতে পারে না? তাই বলে নালিশ করবে? আজ টিটোও খুব চুপচাপ। ওর হয়তো দুঃখ হয়েছে। তাই একদম আমার কাছছাড়া হচ্ছে না। স্কুল থেকে আসার পর হাতমুখ ধুয়ে পোশাকও বদলাতে দিচ্ছিল না। অনেক বুঝিয়ে তারপর ঘুম পাড়ালাম।
অঙ্ক পরীক্ষা ছিল। মোটামুটি হয়েছে। স্যার এসেছিল। বলল, খুব একটা ভালো নয়। সবগুলো কষে দেখালাম। মুখটা কেমন ফুলিয়ে ছিল। ইশ, অতটাও খারাপ নয়। কঠিন কয়েকটা কেসি নাগের অঙ্কই যা পারিনি। নাহলে উদাহরণের সব অঙ্কগুলোই তো পারলাম। কী জানি! স্যার বলে, তুমি মুখস্থ করো অঙ্ক। অভ্যাস করো না।
দিনটাই বাজে। কাল তো ছুটি। তারপরের দিনই শেষ। ইংরেজি। বেশ ঘুমিয়ে পড়েছে টিটো। হাত বোলালাম মাথায় ওর অনেক। ছোটকা বলেছে, পুজোর পরই। কিন্তু তার আগেই আমি উপায় করব। টিটোকে আমি ছাড়ব না। কিছুতেই না।

কত আলো! আমি চোখ মেলে চাইতেই পারছি না। টিটো কোলে কুঁই কুঁই করে সমানে আওয়াজ করে চলেছে। আলোটা দু’হাতে আড়াল করে এগিয়ে যাচ্ছি। জায়গাটা নতুন। খুব মিষ্টি গন্ধ চারদিকে। আমার বেশ ভাল্লাগছে। টিটো যে কেন এমন করছে বুঝতে পারছি না। ও কি মেনিটাকে দেখেছে? কই আমি তো কিছু দেখতে পাচ্ছি না!
খুব বড়ো একটা বাগান। তাতে কত লম্বা সরু সরু গাছ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে। ওই সমস্ত পাতার ফাঁক দিয়েই টর্চের মতো জোর আলো পড়ছে বাগানটায়। আমি সেই ঘাসে পা রাখতেই পাতাদুটো ভিজে গেল। তবে কি শিশির! পা যেন ডুবে গেল ঘাসের মধ্যে। আমার পা খালি। চটি পরতে ভুলে গেছি। এদিকে টিটো তো কিছুতেই নামবে না কোল থেকে। একটা গাছের তলায় দেখলাম বসবার জায়গা। বসলাম। ভেজা হাওয়া ভালো লাগছিল। আমার নাক, চোখও অল্প অল্প ভিজে গেছে মনে হচ্ছে। এই বাগানটায় কেউ নেই কেন? আমাদের বর্ধমানের ফাগুপুরে এমন বড়ো বাগান আমি আগে দেখিনি। এটা কার বাগান? তাহলে তো রোজ আসব আমি! মাকেও বলব। ভাবতে ভাবতে টিটোকে কোল থেকে নামাতে যাব, অমনি দেখি একটা মেয়ে। পাশে বসে। কোথা থেকে এল? এতক্ষণ তো দেখিনি! কখন এল? আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি দেখে হাসছে।
“তোমার নাম কী?”
“আমার!”
“হ্যাঁ!”
“চিত্রা।”
“আর তোমার?”
“আমার নাম টুয়া। কোথায় থাকো তুমি? আগে তো দেখিনি কোনওদিন তোমায়!”
“নতুন এসেছি তো তাই হয়তো দেখনি। একটা জিনিস নেবে?”
“কী?”
মেয়েটাকে সত্যি কোনওদিন দেখিনি। স্কুল থেকে আসার পথেও না। ছাদ থেকেও না। তবে খুব চেনা লাগছে। যেন দেখেছি। কিছুই মনে করতে পারছি না। চারদিকের ফুল-ফুল গন্ধটাও যেন ওরই গা থেকে আসছে। আমার হাত-পা অবশ হয়ে আসছিল। ওকে দেখছিলাম। কী মিষ্টি আর বড়ো বড়ো চোখ ওর! ও দেখি একহাত ভর্তি সাদা ফুল আমার দিকে এগিয়ে দিল। এগুলো শিউলি ফুল! একটা, দুটো, তিনটে আরও অনেকগুলো হাতভর্তি। আমার খুব লোভ হচ্ছে ফুলগুলো নেবার জন্য। টিটো আমার ফ্রক ধরে সমানে টেনে চলেছে। কিছুতেই বসে থাকতে দেবে না। টিটোকে বকলাম। অনেকবার। তাও শুনল না। আমি হাত বাড়ালাম ফুলগুলোর দিকে। “বাহ্, খুব সুন্দর তো ফুলগুলো! কোথায় পেলে?”
“ওই তো ঐ গাছগুলোর তলায়! রোজ সকালে পড়ে থাকে, আমি কুড়াই। এই এত্ত!” মেয়েটা দু’হাত মেলে দেখাল। “তুমি তুলবে?”
আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে মেয়েটি আবারও বলল, “কী হল, যাবে না? যতগুলো ফুল কুড়াতে পারবে, ততগুলো নম্বর পাবে পরীক্ষায়!”
আমি মেয়েটার কথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। সত্যিই তাই! কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, “সত্যি?”
“সত্যি, সত্যি, সত্যি।” মেয়েটা তিন সত্যি বলল।
“কিন্তু…”
“কিন্তু কী?”
আমি ফুল কুড়ানোর লোভটা ছাড়তে পারছিলাম না। আরও একটু এগিয়ে গেলাম মেয়েটার দিকে।
“থাক, তুমি তো আগে কুড়াও ফুল, তারপর বলব না হয়! সে আর এমন কী?”
ছুট্টে গেলাম গাছটার দিকে। একটা, দুটো, তিনটে করে গুনে গুনে অনেকগুলো ফুল কুড়ালাম। খেয়ালই ছিল না কিছু। একটু পরেই গরম লাগতে শুরু করল বেশ। বুঝতেই পারিনি দুপুর হয়েছে কখন!
“চিত্রা, এই দ্যাখো আমি…” বলে ফ্রক গুটিয়ে ফুলগুলো পিছন ফিরে চিত্রাকে দ্যাখাতে গিয়েই দেখি ও নেই! কোত্থাও নেই। আর টিটো? টিটো কোথায় গেল? খুঁজলাম এদিক ওদিক, গাছের পিছনে। কোত্থাও নেই। কত নাম ধরে ডাকলাম। কষ্ট হচ্ছে। তবে কি চিত্রা ওকে নিয়ে গেল? কেন?
“টুয়া, অ্যাই কী করছিস কী?”
খুব জোরে জোরে ধাক্কা দিচ্ছে কেউ!
“মা তুমি?”
“এত বড়ো হয়ে গেছিস, হাত-পা ছুড়ছিস কেন? এই দ্যাখ, টিটোকেও লাথি মেরে সরিয়ে দিয়েছিস! যা যা, তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুয়ে আয়।”
আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। চিত্রা? টিটো? স্বপ্ন? সত্যি টিটো আছে? আমি খুব করে চুমো খেলাম ওকে। ও ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। কুঁইইইইইই, কুঁইইইইইইই আওয়াজ করে জিভ দিয়ে গোটা হাত ভিজিয়ে দিচ্ছে। যেন কতদিন পর আমাকে দেখছে। মনটা ভালো হয়ে গেল। তবে সেই গন্ধটা! সেই মিষ্টি ফুলের গন্ধটা তখনও আমার নাকে লেগে।
নাকে গন্ধটা লেগেই ছিল। মনে হচ্ছিল যেন চিত্রা আশেপাশেই আছে। এখুনি হয়তো টিটোকে আমার কাছ থেকে নিয়ে চলে যাবে। ভয় হচ্ছিল।

লেখা পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। শুধু ফিজিক্যাল এডুকেশন আর হাতের কাজ পরীক্ষা বাকি। ওগুলোয় পড়তে হয় না। প্যান্ডেলও মোটা খয়েরি কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। মহালয়া হয়ে গেছে। ঠাকুরও এসে গেছে। অনেকবার গেছি। কিন্তু দুগ্গা মায়ের মুখ ঢাকা আছে, দেখতে পাইনি। স্কুল বন্ধ হবে পঞ্চমীর দিন। চিত্রার কথা মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। বলেছে, সারাদিন উলটোপালটা ভেবে আমি এসব বলি। কিছুতেই বোঝাতে পারিনি মাকে। চিত্রাকে খুঁজেছি। পাইনি।
একদিন দেখলাম, নন্দুর সাথে একটা মেয়ে খেলছে। ভালো করে ছাদ থেকে দেখতে পাইনি। পরে লক্ষ্মীকাকিমা আমাদের বাড়ি কাজ করতে এলে শুনি, নন্দুদের বাড়ি নতুন ভাড়াটে এসেছে। ওখানেই থাকে মেয়েটা। কী নাম ওর? জানতে পারিনি। চিত্রা নয় তো? ওর মুখটা দেখব কী করে? নন্দুর বাড়ি যাব? মাইতিদাদুর বাড়ি আমি কখনও যাইনি। নন্দুর জন্মদিনে একবার গেছিলাম মায়ের সাথে। দাদু খুব খিটখিট করে। তাই যাই না আর। আচ্ছা, নন্দু যখন খেলে তখন তো আমি কথা বলতে পারি! তাহলে মেয়েটাও ছাদের দিকে তাকাবে। আর অমনি আমিও চিনতে পারব!
আজ বিকেলে ঢাকিরা এসে গেছে। কুরুর কুরুর তাক আওয়াজটা শুনলেই কেমন আনচান করে মনের ভিতর। মনে হয়, আমার টিটোকে ছোটকা কোথাও নিয়ে যাবে না। ও থাকবে আমার কাছে। এবারে বারোটা জামা হয়েছে। বড়োমাসির জামাটা ভালো লাগেনি। মাকে বলেছি, শীতের সময় টিটোর জামা করে দেব। মা বলেছে, ধ্যাত! পাগল! আমি পাগল? সত্যি না! মিথ্যা বলেছে।
তিনদিন পরেই ষষ্ঠী। ঠাকুর দেখতে যাব। ঐদিন হলুদ-লাল বেলুন ফ্রক পরব। টিটোকে নিয়ে প্যান্ডেলের চেয়ারে বসব।

ছাদে ঘুরছি। আমাদের ছাদটা ঘেরা। খুব সুন্দর। চারদিকে রেলিং দেওয়া। টিটো আমার পায়ে পায়ে বেশ লাফিয়ে লাফিয়ে ঘুরছে। মনটা খারাপ ছিল বটে। ঢাকের আওয়াজ ভুলিয়ে দিল। শুনছিলাম। আর ঘুরছিলাম।
“টিটো, অ্যাই এদিকে আয়, ওদিকে যায় না!”
মুখ বাড়িয়ে গরওঁওঁওঁওঁওঁওঁ, গরওঁওঁওঁওঁওঁওঁ করে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে চিৎকার করছে। নিশ্চয়ই মেনি দেখেছে। আর পারি না। এক্ষুনি মাইতিদাদু বেরিয়ে আসবে। মাও!
“চলে আয় বলছি, চলে আয়!”
দৌড়ে গিয়ে রেলিংয়ে মুখ বাড়ানো টিটোকে সরাতে গিয়ে দেখি সেই মেয়েটা! রোজ দেখি। কিন্তু মুখটা নয়। আজ দেখলাম পরিষ্কার। জিভ বার করে মুখ ভ্যাঙাচ্ছে টিটোকে। আমাকে দেখে চুপ। ওর কোলে মেনিটা গুটিসুটি মেরে পিটপিট করে দেখছে। কিন্তু না, একদম না। ওকে তো চিত্রার মতো দেখতে নয়। মুখটা থ্যাবড়ামতো। চোখদুটো হাতির মতো খুদে। তবে চিত্রা কোথায়? আমি টিটোকে ছাদের দিকে টেনে আনতে চাইছি। খুব রেগে গেছে। কিছুতেই আসতে চাইছে না। আমারও খুব রাগ হল। জিভ বার করে ভেংচি কেটে টিটোকে কোলে নিয়ে সরে এলাম। টিটো তখনও ফুঁসছে। মনে হয় ওকে স্নান করাতে হবে। বিড়াল দেখে এত রেগে যায়, তার উপর মেয়েটা অমন করল! দাঁড়াও, আমিও বলব বাপিকে ওর নামে। উফ্‌, টিটো তোর গা-টা গরম পুরো! কী করে শান্ত করি? এই তো পেয়েছি। দুটো কিটক্যাট ছিল পকেটে। দেখি টিটো খায় কি না। খচমচ খচমচ আওয়াজ হতেই টিটো আমার দিকে লোভী লোভী চোখ করে তাকাল। কালো ফুটোওয়ালা নাকটাও ভিজে উঠেছে। একটা, দুটো, তিনটে চৌকো খোপগুলো ভেঙে দিলাম ওকে। আর ও কপাকপ মুখে পুরে আরও, আরও চাইছিল। টিটো যে ক্যাডবেরি খেতে ভালোবাসে আমি জানতামই না! বেশ লাগছিল। চিত্রা তাহলে সত্যিই নেই! স্বপ্নই ছিল। ওই মেয়েটা তো নয়। ভুল ভেবেছিলাম। চিনব কী করে? ওরকম মেয়ে তো আমার স্কুলে নেই! তবুও কেন চেনা লাগছে?
‘ভগ ভৌ ঊঊঊঊঊ...’
“আবার চাই তোর?”
একটা শেষ হতে না হতে আরেকটা! খেয়েই চলেছে। যাক, ও ঠাণ্ডা হল। প্যান্ডেলে ঢাক বেজেই চলেছে। কুরুর কুরুর তাক। কুরুর কুরুর তাক। আমি আর এমন স্বপ্ন দেখবই না। খুব মজা করে কাটাব এই ক’টা দিন। খুব মজা!
“টুয়া, নিচে আয়!”
“এই রে, মা ডাকছে! চল টিটো, নিচে চল।”

টিটো বমি করেই চলেছে। থামছে না। ওর গায়ে হাত দিতে দিল না মা। ছোটকা অনেকগুলো ওষুধ দিচ্ছে। জলে গুলে ওষুধগুলো। বাপি বলছে, “কাছে যাস না, কামড়ে দেবে।” কামড়াবে কেন? কিছু ভালো লাগছে না। কী করে যাব আজ প্যান্ডেলে? যাব না আর! দুগ্গা মাকে আর দেখা হবে না। টিটো সেরে উঠবে তো! ঠাকুরকে বলছি। ভালো নম্বর চাই না। শুধু টিটো এক্ষুনি ভালো হয়ে উঠুক।
সবাই প্যান্ডেলে মজা করছে। মাইকে গানও চলছে। ছোটকা মাকে জিজ্ঞেস করছে, “টিটো কী খেয়েছিল?”
মা বলল, “কিছু তো নয়! পেডিগ্রী খেয়েছিল, আর দুধ।”
ছোটকা বলছিল, “ওর বমির সাথে কীসব বেরিয়েছে। তাহলে কি ও অন্যকিছু খেয়েছে?”
সবাই এই নিয়ে ভাবছে, নিজেদের মধ্যে কথা বলছে।
“মামণি, টিটো তো তোমার সাথেই থাকে। ওকে কি কিছু খেতে দেখেছ?” ছোটকা জিজ্ঞেস করে।
“আমি তো কিছু দেখিনি ছোটকা!”
“একটু ভালো করে মনে করো তো। বমির সাথে কীসব খয়েরি খয়েরি বেরিয়েছে, স্টমাক আপসেট হয়ে গেছে।”
সেদিন ঐ মেয়েটাকে দেখে ছাদ থেকে নেমে আসার পর থেকে রাতেও কিছু খায়নি টিটো। তারপরই বমি হচ্ছে। খুব পাজি মেয়ে! আমার প্রিয় টিটোকে নজর দিল? একবার টিটো ঠিক হোক।
“কী হল, কিছু মনে পড়ল?”
“না ছোটকা, ওকে তো আমি সবসময় কাছে রাখি!”
আমি পরপর ভাবতে থাকলাম কী কী হয়েছিল সেদিন। মেনিকে দেখে টিটো রেগে গেল। আমিও টিটোকে আনতে গিয়ে দেখলাম একটা অন্য মেয়ে। আর ওকে শান্ত করতে চকলেট, হ্যাঁ চকলেট খাইয়েছিলাম!
“ছোটকা, আমি ওকে কিটক্যাট দিয়েছিলাম!”
“সেকি, সর্বনাশ! কতটা?”
ভয় পেয়ে গেলাম। ছোটকা দেখি মাথায় হাত দিয়ে আছে। হঠাৎ টিটোর কাছে দৌড়ে গেল। আমি পিছন পিছন গেলাম।
“আমি তো দুটো দিয়েছি কিটক্যাট।”
“দুটো গোটা?”
“হ্যাঁ!”
ছোটকা বাপি-মাকে কীসব বলল। বুঝতে পারলাম, খুব খারাপ একটা কিছু হয়ে গেছে হয়তো। আমি ছোটো বলে ওরা কেউ আমাকে জানায় না। খুব গম্ভীর মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিল ওরা। ছোটকা একটা তোয়ালে জড়িয়ে টিটোকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। আমি আটকাতে পারার আগেই। টিটোকে নিয়ে গেল কেন? মাকে বললাম, বাপিকেও। মা বলল, “সূঁচ ভরে তারে করে ওষুধ দিতে হবে। দেরি করা যাবে না। এখানে ওরকম মেশিন নেই তাই।”
টিটো কখন ফিরবে কেউ বলতে পারল না। বাপি বলল, আমি কেন টিটোকে চকলেট খাওয়ালাম। চকলেট খেলে খুব খারাপ হয় কুকুরের। ওরা নাকি সহ্য করতে পারে না। টিটো তো ছোটো। আমার কান্না পেল। আমি তো টিটোকে ভালোবাসি। ওরা কেউ আমাকে বকেনি। আমি জানি, আমি খুব বড়ো অন্যায় করেছি। আমি টিটোর কাছে যেতে চাইলাম। কেউ নিয়ে গেল না। মোবাইলে ফোন এল। বাপি ফোন ধরার পরেই বেরিয়ে গেল। বাপি কোথায় গেল? মাকে জিজ্ঞেস করলেও চুপ ছিল মা। আমার মাথায় হাত বোলাল।
আবারও কান্নাটা পাচ্ছে। আজ তো পুজো। মা কাঁদতে নেই বলল। প্যান্ডেলে যাবে বলল। আমি যেতে চাইনি। তাও বলল। চুল বেঁধে দিল মা। আমি কী অন্যায় করেছি? টিটো কবে ফিরবে?
কত কত লোক লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখতে এসেছে। প্যান্ডেলের দু’পাশে আইসক্রিম আর ঐ টংটং লোকটা দাঁড়িয়েছে। ঘুরে ঘুরে ঢাক বাজাচ্ছে ঢাকি। খুব ভিড়। আমাকে, মাকে লাইন দিতে হল না। আমরা তো এখানেই থাকি। তাই বাড়ির দরজার সামনে প্যান্ডেলের একটা ছোটো গেট আছে, সেখান দিয়েই ঢুকলাম। তবুও কত লোক! ঠাকুরমশাই এসেছেন। ভিড়ে চেপটে যাচ্ছি। দেখলাম নিন্দু, মাইতিদাদু, ওই মেয়েটাও এসেছে। ওদের হাতে গোলাপি, হলুদ বুড়ির মাথা। আমার বুড়ির মাথা ভালো লাগে না। আইসক্রিম ভালো লাগে। মা আমার হাত চেপে ধরে বলল, “এদিক ওদিক চেয়ো না। ঠাকুর প্রণাম করো।”
আমিও ঠাকুরের দিকে তাকিয়ে প্রণাম করতে গিয়ে... অবাক হয়ে গেলাম! তাকিয়ে থাকলাম। খুব চেনা। গোল মুখ। একমাথা চুল। কান অবধি বড়ো বড়ো চোখ। আমি চিনি। চিত্রা! আর আমাদের ঠাকুরঘরের ছবিটাও একইরকম। মনে পড়ে গেছে সব! নাকে ফুল-ফুল গন্ধটা আসছে।
“মা, চিত্রা, মা মা, দ্যাখো…”

ঘুম পাচ্ছে না আর। টিটোর কথা কেউ বলছে না। আজ চারদিন হয়ে গেল। দশমী। পুজোর শেষ। বাপি সেদিন অনেক রাতে এসেছিল। ছোটকাও। কেউ কিছু বলছে না। চুপ করে সবাই। সকাল থেকে খুব জোরেই কুরুর কুরুর তাক বাজছে। আমার এসব একদম বাজে লাগছে। ছাদে উঠেছিলাম তাই। আজ টিটো ফিরলে একসাথে বিসর্জন দেখতে যাব। একটা লরিতে দুগ্গা মা চার ছেলেমেয়েকে তোলে স্টেজ বানিয়ে। বাপিকে বলে রেখেছি। ধুর, কখন যে টিটোকে আনবে! কেউ আমার দুঃখ বুঝতে পারছে না! ভেজা ভেজা হাওয়া দিচ্ছে। চিত্রাকে দুগ্গার মতো দেখতে কেন? সেদিন মাকে বললাম। মা শুনল না। একটা কীসের খররর খররর আওয়াজ হচ্ছে। টিটো এল? পিছন ফিরে দেখি টিটোর খেলার পিচবোর্ড। ওটাতে ঢুকেই তো খেলে! ওটার মধ্যে ওর সব সম্পত্তি। কী মজা, কী মজা, টিটো এসে গেছে! আমি বাক্সটার কাছে গেলাম। টিটো নেই তো! তাহলে পুরো বাক্সটা এমন করে আঁচড়াল কে? পুরো ছিঁড়ে গেছে। কাগজগুলো উঠে উঠে গেছে। টিটো? আমার সাথে লুকোচুরি খেলা হচ্ছে, তাই না?
“মা, ও মা, টিটো এসেছে!” তাড়াতাড়ি নেমে দেখলাম বসবার ঘরে মা। বললাম, “টিটো খুব দুষ্টু। আমার সাথে কেমন লুকোচুরি করছে জানো। বাক্স ছিঁড়ে নিচে এসেছে। কোথায় ও?”
মা আমাকে কাছে টেনে নিল। ইশ, পিঠটাও ভিজিয়ে দিয়েছে। কী যে করে না! আমি নিজেকে ছাড়িয়ে পড়ার টেবিল, আলনা, খাটের তলা সব দেখলাম। কিন্তু কোথায়? নিশ্চয়ই আবার ছাদে গেছে। বড়োমাসির দেওয়া জামাটা বানিয়ে রেখেছি। ওটা নিয়ে ছাদে আবার ছুট লাগালাম। পিছন থেকে মা যে কেন ডাকছে! বিকেলে প্যান্ডেলে যাব, ওকে তৈরি করব না! আমার পুরো পুজোটা মাটি করেছে। পচা! দেরি করলে হবে না। ঢাকিদাদা কানের পর্দা ফাটিয়ে দিল। টিটো, কোথায় গেলি?
বাক্সর কাছে দাঁড়াতেই টিটোর গায়ের চাদরটা নড়ে উঠল মনে হল। আর একটা সরু আওয়াজ হচ্ছে। এটা কী? চাদর সরাতেই দেখি, ভীষণ ছোটো একটা বাচ্চা কিলবিল করে নড়ছে। মুখ দিয়ে পিউউউউ, পিঊঊঊ করছে। টিটো দেখলে যে রেগে যাবে সাংঘাতিক! এটা আবার কোথা থেকে এল? মাকে দেখাতেই হবে। কোনওমতে বাক্স হাতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ঘরে ঢুকতে যাব, দেখি এই মেনিটা দাঁড়িয়ে! ও কী করে এল? এত বড়ো সাহস! এক্ষুনি মারামারি বাধল বলে। এই যাহ্‌! যাহ্‌! ভয় ডর নেই?
“মা, ও মা, দ্যাখো টিটোর বাক্সে এটা কীসের বাচ্চা!”
“এটা তো বিড়ালের বাচ্চা!” মা বলল।
“টিটো তো কামড়ে দেবে, কী করি এটাকে নিয়ে!”
আমি হাত দিয়ে ওটাকে লুকাবার জন্য তুলতেই বাচ্চাটা চোখ বুজেই খুদে জিভটা দিয়ে তরাম করে আমার হাতের তালুটা চেটে দিল। কী গরম! কাতুকুতু লাগল আমার। হেসে উঠলাম। বোজা চোখটা দিয়েই ঘাড় কেঁপে কেঁপে মাথা উঁচু করে কী যেন দেখবার চেষ্টা করছে। শুঁকছে। পিছনে দাঁড়িয়ে ওর মাটাও ম্যাঁও ম্যাওঁ করছে।
“তোর চিত্রা তোকে একটা সুন্দর উপহার দিয়ে যাচ্ছে। ওকে আজকের দিনে আর বাইরে রাখিস না।”
মা কী বলল আমি একটুও বুঝলাম না। শুধু শুনলাম, ক্যালেন্ডারের পিছন থেকে সেই টিকটিকিটা বলে উঠল - টিক টিক টিক। আর জানালা দিয়ে দমকা একটা হাওয়া এসে ঘরময় ফুলের গন্ধে ভরিয়ে দিল।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ রুমেলা দাস

8 comments:

  1. চিত্রার্পিত! বাচ্চাদের মনোপযোগী সুন্দর গল্প!

    ReplyDelete
  2. বেশ ভাল ... Illustration টা খুব সুন্দর

    ReplyDelete
  3. Ageo bolechilam... Eta Tua r Upohar noy... E amader Rumelar dewa misti shundor upohar!!

    ReplyDelete
    Replies
    1. অনেক ভালোবাসা দাদা

      Delete