গল্পঃ প্রতিকৃতিঃ দৃপ্ত বর্মন রায়




আমাদের পাড়ার ‘জাগরণী সঙ্ঘ’-এর উলটোদিকে সুবলদার চায়ের দোকানে আমরা রোজ সন্ধেবেলা হাজির হই আড্ডা মারার জন্যে। বয়সের কোনও বাছবিচার থাকে না, পাড়ার কাকা-জ্যাঠারাও সমান তালে আড্ডা দেন আমাদের মতো কলেজ পড়ুয়াদের সাথে। আড্ডার বিষয়বস্তু হিসেবে মালপোয়া থেকে মালয়েশিয়া, অ্যাভোগাড্রো থেকে অ্যাঁভ্যা-গার্দ, আইসিস থেকে আইসিসি কিছুই বাদ যায় না। প্রায় প্রতিদিনই দু-তিনঘণ্টা আমরা সুবলদার দোকানের চা আর তার সাথে টা হিসেবে গরম গরম চপ, শিঙাড়া, তেলেভাজা ইত্যাদির সদ্ব্যবহার করতে করতে মুখে মুখেই রাজা-উজির মেরে পরের চব্বিশ ঘণ্টার জন্যে অক্সিজেন সংগ্রহ করে ফ্রেশ মাইন্ডে বাড়ি ফিরি।
সেদিন কথাটা শুরু হয়েছিল চিত্রশিল্প নিয়ে। কিছুক্ষণ যামিনী রায়, অবন ঠাকুরের কাঁটাছেঁড়া করে আমরা পাড়ি দিলাম বিদেশে। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি আর পাবলো পিকাসোকে নিয়ে তর্কটা বেশ জমে উঠেছে এমন সময় বিমলজেঠু ঘোষণা করলেন, “সে বাপু, তোমরা যাই বল না কেন, আমার কিন্তু মনে হয় ফ্রেঞ্চ আর্টিস্ট রেমব্র্যান্ডের সামনে ভিঞ্চি বা পিকাসো একেবারেই নস্যি। আহা! কী অসাধারণ আঁকা রেমব্র্যান্ডের। দেখলে মনে হয় আঁকা নয়, যেন জীবন্ত কিছু দেখছি।”
বিমলজেঠুর এই এক দোষ। যা কিছু নিয়েই আলোচনা হোক না কেন, তিনি সবসময়ই দুম করে এমন একটা এক্সপার্ট ওপিনিয়ন ছাড়েন যে সবাই কিছুক্ষণের জন্যে চুপ করে যায়। অবশ্য বেশিরভাগ সময়ই সেটা একেবারেই না জেনে ভুলভাল কোনও মন্তব্য হয়। কিন্তু যেহেতু তিনি বয়সে বড়ো, তাই সবাই তর্ক না করে চুপচাপ মেনে নেয় ব্যাপারটা।
কিন্তু এবার হঠাৎ আমার পাশ থেকে বুম্বা ফিসফিস করে বলে উঠল, “উঁউঁহ্‌! বুড়োর কথা শুনে মনে হচ্ছে ভিঞ্চি, পিকাসোরা যেন ওর বাড়ির উঠোনে বসে ছবি আঁকত। দেখিস, আমি বাজি রেখে বলছি, কী নাম বলল রেমব্র্যান্ড না কী, বুড়ো জন্মেও ওঁর আঁকা ছবি দেখেনি। নির্ঘাত কোথাও নামটা পড়ে এখানে এসে বাতেলা মারছে।”
পাছে বিমলজেঠু শুনে ফেলে, আমি তড়িঘড়ি ওকে চুপ করাতে যাচ্ছি, কিন্তু তার আগেই পাশ থেকে ঘোষালজেঠু বললেন, “দ্যাখো বিমল, রেমব্রাঁর আঁকা যে খুবই সুন্দর সেটা নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। তবে তাঁর সামনে ভিঞ্চি বা পিকাসো নস্যি, এটা বলাটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল বোধহয়।”
ঘোষালজেঠুর পুরো নাম প্রলয়েন্দু ঘোষাল। বয়স সত্তরের আশেপাশে। শুনেছি উনি নাকি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে কিছু একটা চাকরি করতেন এবং চাকরির প্রয়োজনে ওঁকে বিভিন্ন সময় ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হয়েছে। এমনিতে চুপচাপ অন্যের কথা শুনতেই বেশি পছন্দ করেন, তবে মাঝে মাঝে যখন মুখ খোলেন তখন তাঁর বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতার ঝুলিটা যে বেশ পরিপুষ্ট সেটা বোঝা যায়।
“আচ্ছা সে না হয় আমি একটু বাড়িয়েই বলে ফেলেছি।” উত্তেজিত গলায় বললেন বিমলজেঠু, “কিন্তু এটা তো ঠিক যে রেমব্র্যান্ড, ভিঞ্চি বা পিকাসোর থেকে বেটার আঁকতেন। ঠিক কিনা বলো?”
“দ্যাখো বিমল, এই যে ভিঞ্চি, পিকাসো বা রেমব্রাঁ, এঁদের মধ্যে কে বেটার সেটা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয় কারণ এঁরা প্রত্যেকেই নিজের নিজের জায়গায় সেরা। এঁদের মধ্যে তুলনা করার ধৃষ্টতা আমি করতে পারব না।” সুবলদার বানানো ওঁর জন্যে স্পেশাল দুধ-চিনি ছাড়া আদা দেওয়া মশলা চায়ে একটা চুমুক দিয়ে উত্তর দিলেন ঘোষালজেঠু, “তবে এটা ঠিকই যে রেমব্রাঁ ওঁর ছবিতে রঙের সুন্দর ব্যবহারে লাইট অ্যান্ড শেডসের এমন একটা এফেক্ট তৈরি করতেন যে সত্যি সত্যিই ওঁর আঁকা ছবিগুলো দেখে মনে হয় যেন আঁকা নয়, ক্যামেরায় তোলা ফটো। এটাই ছিল ওঁর ইউ.এস.পি। গুগলে সার্চ করে দেখো, ওঁর বেশ কয়েকটা ভালো ভালো ছবি পাবে। বিশেষ করে ‘দ্য রিটার্ন অফ দ্য প্রডিগ্যাল সন’, ‘ফিলসফার ইন মেডিটেশন’ বা ‘দ্য নাইট ওয়াচ’ তো ভীষণই বিখ্যাত।”
“দ্যাখ! শোন ঘোষাল কী বলছে।” ঘোষালজেঠুর সাপোর্ট পেয়ে বিমলজেঠু উচ্ছ্বাস আর চেপে রাখতে পারছিলেন না, “তোরা তো সবসময় ভাবিস আমি না জেনে বকবক করি। হুঁ হুঁ বাবা! এই শর্মা না জেনে ভুলভাল কথা বলে না, মনে রাখিস।”
“তবে বিমল, ওঁর নাম কিন্তু রেমব্র্যান্ড নয়, রেমব্রাঁ।” এতক্ষণে ঘোষালজেঠু আস্তিনে লুকিয়ে রাখা টেক্কাটা ছাড়লেন, “আর উনি কিন্তু ফ্রেঞ্চ ছিলেন না। রাদার, হি ওয়াজ আ ডাচ।”
ফুস করে চুপসে গেলেন বিমলজেঠু। বুম্বা এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার মওকা পেয়ে কিছু একটা বলে উঠতে যাচ্ছিল। কিন্তু সেটা টের পেয়েই তাড়াতাড়ি মুখ খুললেন ঘোষালজেঠু, “তবে বিমলের কথা শুনে আমার একটা গল্প মনে পড়ে গেল। গল্প বলা ঠিক নয়, আসলে খুব ইন্টারেস্টিং একটা সত্যি ঘটনা। তোমরা যদি রাজি থাক তাহলে সেটা বলতে পারি।”
ঘোষালজেঠু গল্প বলবেন আর আমরা রাজি হব না! চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে ইউজ অ্যান্ড থ্রো কাপটাকে নিখুঁত টিপে হাত পাঁচেক দূরে রাখা টিনের বাক্সটাতে ছুড়ে ফেলে ধীরেসুস্থে একটা মার্লবরো হার্ড ধরিয়ে ঘোষালজেঠু শুরু করলেন তাঁর গল্প।

এই যে ঘটনাটা তোমাদের এখন আমি বলব সেটা আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নয়। মানে ঘটনাটার সাথে আমার সরাসরি যোগাযোগ নেই। এটা আমি শুনেছিলাম আরেকজনের কাছ থেকে। তাই এর সত্যি-মিথ্যে আমি বলতে পারব না। তবে যার কাছে শুনেছিলাম সে যে ফালতু কথা বলার লোক নয় সে ব্যাপারে আমার কোনও সন্দেহ তখনও ছিল না, এখনও নেই।
সত্তরের দশকের শেষদিককার কথা। তখন আমি সবে চাকরিতে ঢুকেছি। ধর্মতলায় অফিস। আমার অফিসের এক কলিগ ছিল, নাম অশোক। বয়স আমারই মতো। এক-আধ বছরের এদিক ওদিক হতে পারে। হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল একটা ছেলে। মুখে সবসময় হাসি লেগেই আছে। ভীষণ আড্ডাবাজ। অফিসে কোনও সময়ই তাকে তার নিজের জায়গায় দেখতে পাওয়া যেত না, সবসময়ই কারোর না কারোর সিটে গিয়ে আড্ডা মারত। তবে তাই বলে কাজকর্মে ফাঁকি কিন্তু সে মোটেও দিত না। কাজের ব্যাপারে ছিল ভীষণ সিনসিয়ার। কোনও কাজে কখনও না বলত না, সে অফিসের কাজই হোক বা অফিসের বাইরের অন্য কোনও কাজ। যেকোনও ব্যাপারে তার কাছে হেল্প চাইলে একবাক্যে সে হাজির হয়ে যেত, সেটা দিনের বা রাতের যে সময়ই হোক না কেন।
বয়সটা কাছাকাছি হওয়ায় ওর সাথে আমার বন্ধুত্বটা বাকিদের থেকে একটু বেশি ক্লোজ ছিল। আমরা বেশিরভাগ সময় একসাথেই কাটাতাম। একসাথেই লাঞ্চ করতাম বা ব্রেকে চা-সিগারেট খেতে যেতাম। অফিস ছুটির পরেও মাঝে মাঝেই হয় আমার বাড়িতে বা ওর বাড়িতে আড্ডা মারতাম। কোনও কোনও দিন আবার বেশি রাত হয়ে গেলে ও আমার বাড়িতে বা আমি ওর বাড়িতে থেকে গিয়ে পরের দিন সকালে একসাথে অফিস যেতাম। কখনও কখনও এক-দু’দিনের ছুটি পেলে বেরিয়ে পড়তাম কলকাতার আশেপাশের কোনও জায়গায়। অফিস কামাই করে ময়দানে বড়ো ম্যাচ, মানে আজকাল তোমরা যেটাকে ডার্বি বলো, সেটা বা অমিতাভ বচ্চনের সিনেমার ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো দেখতে যেতাম। মোদ্দা কথা, ওই যাকে বলে না হরিহর আত্মা, আমরা ছিলাম একেবারে সেইরকমই।
তো এক সোমবার অফিসে এসে দেখি অশোক একদম চুপচাপ। যে ছেলের মুখে সারাক্ষণই হাসি লেগে থাকে, সে কেন জানি মুখ গোমড়া করে বসে আছে। পারতপক্ষে কারোর সাথে কথা বলছে না। কেমন একটা অন্যমনস্ক ভাব। তিনবার ডাকলে একবার সাড়া দিচ্ছে। অবাক হলাম বেশ। মনে হল নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে যার জন্যে ও বেশ আপসেট হয়ে রয়েছে।
লাঞ্চ ব্রেকে পাকড়াও করলাম ওকে। জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে। প্রথমে তো এড়িয়ে যেতে চাইল। বলল, কিছুই নাকি হয়নি। আমিই নাকি ভুলভাল ভাবছি। কিন্তু আমিও ছাড়লাম না। ওকে খুব ভালোভাবে চিনতাম। যা খুশি তাই বলে অন্যদের বোঝানো গেলেও আমাকে পট্টি পরানো অত সহজ নয়। শেষপর্যন্ত স্বীকার করল যে সত্যি সত্যিই ও একটা ব্যাপারে একটু ডিস্টার্বড। ঠিক হল অফিসের পর ও আমাকে সবকথা খুলে বলবে।
কথামতো অফিস ছুটি হবার পর আমরা গেলাম ময়দানে। দু’জনে দুটো সিগারেট ধরিয়ে ভিক্টোরিয়ার দিকে মুখ করে বসলাম। পুরো সিগারেট শেষ করা অবধি একটা কথাও বলল না অশোক। আমি বুঝতে পারছিলাম যে ওর মনে কোনও কারণে একটা ঝড় বয়ে চলেছে। আমি তাই ওকে সময় দিলাম যাতে ও নিজের মনকে প্রস্তুত করে নিতে পারে।
শেষপর্যন্ত নীরবতা ভাঙল অশোকই। বলল, “আমি কালকে চুঁচুড়া গিয়েছিলাম, বুঝলি।”
আমি এতে খুব একটা অবাক হলাম না। অশোক ছিল বড়ো বংশের ছেলে। ওর পূর্বপুরুষরা মস্ত বড়ো জমিদার ছিলেন। শুনেছিলাম ওর ঠাকুরদার বাবা নাকি ইংরেজ আমলে রায়সাহেব উপাধিও পেয়েছিলেন। চুঁচুড়ায় গঙ্গার ধারে ওদের যে একটা পৈতৃক বাড়ি আছে সেটা আমি জানতাম। প্রায় কুড়ি বিঘা জমির ওপর বানানো মস্ত একটা দোতলা বাগানবাড়ি। ওর ঠাকুরদা শখ করে বানিয়েছিলেন বাড়িটা। যদিও এখন সেই বাড়িটাতে কয়েকজন কাজের লোক, মালি আর দারোয়ানদের পরিবার ছাড়া আর কেউই থাকে না। অশোকের কাছে শুনেছিলাম, এত বড়ো বাড়ি মেনটেন করাটাও একটা মস্ত খরচের ব্যাপার। তাই ওরা বাড়িটা বিক্রি করে দেবার কথা ভাবছে। সেই সংক্রান্ত কাজে মাঝে মাঝেই অশোককে ওই বাড়িতে যেতে হত। হয়তো এরকম কোনও কাজেই অশোক গেছিল চুঁচুড়ায়।
একটু থেমে থেকে আবার মুখ খুলল অশোক, “জানিস পুলু, গতকাল চুঁচুড়ায় গিয়ে আমার এমন একটা অভিজ্ঞতা হল, যেটা আমি না পারছি মন থেকে মেনে নিতে, না পারছি কারোর সাথে শেয়ার করতে।”
আমি ওর পিঠে আলতো করে হাত রাখলাম। “তুই আমাকে বল কী হয়েছে। মনের কথা খুলে বললে তোরই মনটা হালকা হবে।”
“না রে, এই কথাটা বললে তুই আমাকে বিশ্বাস করবি না।” অশোক মাথা নাড়ল। “শুধু তুই কেন, কেউই আমায় বিশ্বাস করবে না। আরে আমি নিজেই নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছি না।”
“তুই ভাবিস না। আমি তোকে বিশ্বাস করব। তুই আমাকে সবটা খুলে বল।” আমি আশ্বাস দিলাম।
আবার কয়েক মিনিট চুপ করে থাকল অশোক। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল, “পুলু, আমার এক জ্যাঠামশাই ছিলেন। তুই হয়তো কোনওদিন তাঁর কথা শুনিসনি, তাই না?”
এই তথ্যটা আমার কাছে নতুন ছিল। আমি তাই মাথা নাড়লাম। সেটা লক্ষ করে অশোক বলল, “আমার বাবারা দুই ভাই ছিল। বাবা ছিল ছোটো। আমার জ্যাঠামশাই বাবার থেকে বেশ অনেকটাই বড়ো ছিলেন। তাছাড়া উনি মারাও গেছেন প্রায় বছর পনের হয়ে গেল।”
আমি বললাম, “ও সেজন্যেই হয়তো ওঁর কথা কোনওদিন শুনিনি।”
অশোক আমার কথাটা যেন খেয়ালই করল না। অন্যমনস্কভাবে বলে চলল, “আমার জ্যাঠামশাই একটু অন্যধরনের মানুষ ছিলেন, বুঝলি। মানে টিপিক্যাল জমিদারবংশের সন্তান আর কী। জমিজমা না থাকলে কী হল, মেজাজটা রয়ে গেছিল জমিদারদের মতোই। খামখেয়ালি, শৌখিন টাইপের লোক। সংসারের প্রতি ভীষণ উদাসীন। টাকাপয়সার কোনও অভাব তো ছিল না কোনওকালেই, তাই উপার্জনের কথা চিন্তা না করে নিজের শখ-আহ্লাদ পূরণ করতে করতেই সারাটা জীবন কাটিয়ে দেন।”
খানিক থেমে আবার বলল অশোক, “ওঁর প্রথম নেশা ছিল ছবি আঁকা। অসাধারণ ছবি আঁকতেন, বুঝলি। সত্যি কথা বলতে কী, আমি অন্তত এত ভালো ছবি আঁকতে আর কাউকে কোনওদিন দেখিনি। মূলত সিন-সিনারির ছবিই আঁকতে পছন্দ করতেন জ্যাঠামশাই। ওঁর আঁকার সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য কী ছিল জানিস? ওঁর আঁকা ছবিগুলো দেখলে মনে হত যেন সত্যি, আঁকা নয়। যেমন ওঁর আঁকা একটা ছবি রাখা ছিল আমাদের বৈঠকখানায়। একটা মাঠের মাঝখানে একটা বুড়ো বটগাছ। একপাশ দিয়ে একটা মরা নদী বয়ে চলেছে। নদীর পাড়ে কাশফুলের ঝাড়। ছবিটা এত ন্যাচারাল যে দেখলে মনে হত কাশফুলগুলো যেন হাওয়ায় নড়ছে।”
আমি মনে মনে ভাবলাম, সত্যিই আমাদের দেশে এরকম কত ট্যালেন্টেড আর্টিস্ট ছিল বা এখনও আছে যারা শুধুমাত্র প্রচারের আলো না পাওয়ার জন্যে হারিয়ে গেছে অন্ধকারে। হয়তো অশোকের জ্যাঠামশাইও ছিলেন এঁদেরই মতো একজন।
অশোক বলে চলল, “জানিস, এই ছবি আঁকার নেশায় প্রায়ই তিনি রং, তুলি, ইজেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন বাড়ি থেকে। শহরের বাইরে দূরদূরান্তে গ্রামেগঞ্জে গিয়ে অপরিচিত লোকেদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে দু-তিন মাস কাটিয়ে যখন বাড়ি ফিরতেন তখন তাঁর সাথে থাকত বেশ কয়েকটা মাস্টার পিস ল্যান্ডস্কেপ।”
“কী করতেন সেই ছবিগুলো নিয়ে?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।
“কী আবার করতেন? কয়েকটা ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখা হত আমাদের বাড়িতে। যেমন ওই বুড়ো বটগাছের ছবিটা।” অশোক উত্তর দিল। “আর কিছু কিছু ছবি বিলিয়ে দিতেন আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে।”
আমার খুব ইন্টারেস্টিং লাগছিল অশোকের জ্যাঠামশাইয়ের কথা শুনে। মনে মনে ভাবছিলাম, উনি বেঁচে থাকলে ওঁর সাথে পরিচয় করতে পারলে খুব ভালো হত।
“ছবি আঁকা ছাড়াও ওঁর দ্বিতীয় আরেকটা নেশা ছিল। বল তো সেটা কী?” কেমন একটা রহস্যময় হাসি হেসে জিজ্ঞেস করল অশোক।
“যাচ্চলে! আমি জানব কী করে?” আকাশ থেকে পড়লাম আমি।
“ওঁর দ্বিতীয় নেশাটা ছিল তন্ত্রবিদ্যা।” আমার রি-অ্যাকশন দেখার জন্যে আমার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে উত্তর দিল অশোক।
“তন্ত্রবিদ্যা!” আমার গলা শুনেই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল যে এটার জন্যে আমি প্রস্তুত ছিলাম না।
“হ্যাঁ, তন্ত্রবিদ্যা।” মৃদু হাসল অশোক, “খুব অবাক হচ্ছিস, তাই না? না হওয়াটাই অবশ্য আশ্চর্যের। কিন্তু অদ্ভুত লাগলেও কথাটা সত্যি। এই তন্ত্রবিদ্যা বা তন্ত্রশাস্ত্রর প্রতি ওঁর একটা প্রচণ্ড আকর্ষণ ছিল। আমাদের চুঁচুড়ার বাড়িতে ঠাকুরদার তৈরি করা একটা বিশাল লাইব্রেরি ছিল। দেশবিদেশের নানা বিষয়ের নানাধরনের বই ছিল সেই লাইব্রেরিতে। আমার জ্যাঠামশাই তাতে যোগ করেছিলেন তন্ত্রশাস্ত্রের ওপর নানা দুষ্প্রাপ্য বই। কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের ‘বৃহৎ তন্ত্রসার’ থেকে শুরু করে বিভূতিভূষণের ‘তারানাথ তান্ত্রিক’ সবই ছিল ওঁর কালেকশনে।”
এটা অশোক ঠিকই ধরেছিল। ছবি আঁকার সাথে তন্ত্রবিদ্যার এই উদ্ভট কম্বিনেশনটা আমি এক্সপেক্ট করিনি। তাই আমার হতভম্বভাবটা কাটানোর জন্যে ও আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, “তন্ত্রবিদ্যার প্রতি ওঁর যে এই কৌতূহলটা ছিল তার জন্যে উনি মাঝে মাঝেই বিভিন্ন তান্ত্রিককে খুঁজে বের করে বাড়িতে ডেকে আনতেন। তাঁদের থাকতে দিতেন। তন্ত্রবিদ্যার ব্যাপারে তাঁদের সাথে আলোচনা করতেন। মাঝে মাঝে আবার নিজেই ওঁদের সাথে শ্মশানে গিয়ে রাতের পর রাত তন্ত্রসাধনা করতেন।”
ভদ্রলোক সম্বন্ধে যতই শুনছিলাম, আমার বিস্ময় ততই বাড়ছিল। বললাম, “উনি নিশ্চয়ই বিয়ে করেননি, তাই না?”
অশোক হেসে বলল, “আরে না না! উনি বিয়ে করেছিলেন রে। মানে কম বয়সে ওঁর বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল।”
আরও অবাক হলাম। “তাহলে ওঁর স্ত্রী মানে তোর জ্যাঠাইমা কিছু বলতেন না? মানে ওঁর এরকম বোহেমিয়ান জীবনযাপন...”
“আমার জ্যাঠাইমা ছিলেন একদম অন্য মেরুর মানুষ, বুঝলি? মানুষ না বলে বরং সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা বললেই ঠিক বলা হয়।” আবেগে গাঢ় হয়ে গেল অশোকের গলা, “দেখতে ছিলেন একদম দেবী দুর্গার মতো। অল্প বয়সে বিয়ে করে আসেন আমাদের বাড়িতে। জ্যাঠামশাই তো ছোটোবেলা থেকেই এরকম ছন্নছাড়া ছিলেন। তাই ঠাকুরদা ভেবেছিলেন, বিয়ে দিয়ে দিলে ছেলের সংসারের প্রতি মতি ফিরবে। কিন্তু হল উলটোটা। সে জ্যাঠামশাই কখনও জ্যাঠাইমাকে অসম্মান করেননি। আসলে উনি থাকতেন নিজের এক জগতে। এদিকে জ্যাঠাইমা জ্যাঠামশাইয়ের এরকম উদাসীনতা সত্ত্বেও মনপ্রাণ দিয়ে সংসার করে গেছেন। বাবা বা মা ছিল ওঁর নিজের ভাই বা বোনের মতো। আর আমি আর আমার দুই দিদির প্রতি ওঁর অধিকারবোধটা ছিল যেন আমার মা-বাবার থেকেও বেশি। আমি ওঁর কাছ থেকে যতটা স্নেহ বা শাসন পেয়েছি, আমার নিজের মার কাছ থেকেও বোধহয় ততটা পাইনি। আসলে ওঁর নিজের কোনও সন্তান ছিল না তো, তাই বুঝতেই পারছিস, আমরাই ছিলাম ওঁর ছেলেমেয়ের মতো।”
আমি ওপরে নিচে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলাম যে আমি বুঝেছি। যদিও আমার মাথায় এটা ঢুকছিল না যে ও কী কারণে এতটা আপসেট সেটা জিজ্ঞেস করায় ও এতসব কথা আমাকে কেন বলছে। অশোকও বোধহয় বুঝতে পেরেছিল সেটা। তাই আমাকে বলল, “তুই হয়তো মনে মনে ভাবছিস, আমি কেন এত ভণিতা করছি। আসলে আমি এখন যে কথাটা তোকে বলব সেটা বলার আগে এই কয়েকটা কথা না বললে তুই ঠিক বুঝবি না। যাই হোক, এবার আসল কথায় ফিরছি। অধৈর্য হোস না, প্লিজ।”
“আরে না না! আমি অধৈর্য হচ্ছি না। তুই ধীরেসুস্থে সবকথা খুলেই বল।” আমি তাড়াতাড়ি ড্যামেজ কন্ট্রোল করলাম।
একটু দম নিয়ে অশোক শুরু করল, “আমার তখন বোধহয় বারো-তেরো বছর বয়স। একবার জ্যাঠামশাই বাইরে কোথাও গিয়েছিলেন ছবি-টবি আঁকতে। তো একরাতে তিনি মৃতপ্রায় অবস্থায় বাড়ি ফিরলেন। সারা গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। উলটোপালটা প্রলাপ বকে চলেছেন সারাক্ষণ। বাড়ির সবাই তো ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। ডাক্তার ডাকা হলে তিনিও শেষকথা বলে দিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রায় সাত-আটদিন অক্লান্ত সেবা করে জ্যাঠাইমা সে-যাত্রা জ্যাঠামশাইকে প্রায় যমের দুয়ার থেকে ছিনিয়ে আনলেন।”
একটু থামল অশোক। তারপর আবার বলল, “পরে বাবার কাছে শুনেছি, সেরে ওঠার পর জ্যাঠামশাই বলেছিলেন যে উনি নাকি ছবি আঁকার জন্যে কোনও গ্রামে গিয়ে প্রচণ্ড ক্ষমতাশালী পিশাচসিদ্ধ এক তান্ত্রিক মহাপুরুষের সংস্পর্শে আসেন এবং তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তারপর জ্যাঠামশাই সেই তান্ত্রিকের সাথে শ্মশানে কঠোর তন্ত্রসাধনা শুরু করেন। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধিলাভ করার আগেই শেষমুহূর্তে তিনি শ্মশানের মতো অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে রাতের পর রাত জেগে কাটানোর জন্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তন্ত্রসাধনা অসম্পূর্ণ রেখেই ফিরে আসতে বাধ্য হন।”
ময়দানে অন্ধকার নেমে আসছিল। কিন্তু সেই ম্লান আলোতেও দেখলাম, এতক্ষণে অশোকের মুখে যেন একচিলতে হাসি ফুটে উঠল। ও বলে চলল, “তো সেবার সুস্থ হয়ে ওঠার পর জ্যাঠামশাইয়ের মধ্যে একটা দারুণ পরিবর্তন দেখা দিল, বুঝলি। যে মানুষটা জ্যাঠাইমার প্রতি ছিলেন চরম উদাসীন, সবসময়ই নিজের জগতে মগ্ন হয়ে থাকতেন, তিনিই হঠাৎ করে ভীষণ স্ত্রী-অন্তপ্রাণ হয়ে উঠলেন। একটা মুহূর্তও তাঁর জ্যাঠাইমাকে ছাড়া আর চলত না। জ্যাঠাইমার সাথে সারাক্ষণই গল্পগুজবে ব্যস্ত থাকতেন। জ্যাঠাইমা রান্নাঘরে থাকলে উনি সেখানেও এসে উঁকিঝুকি মারতে শুরু করলেন। এমনকি জ্যাঠামশাই বাড়িতে থাকাকালীন রোজ বিকেলে গঙ্গার ধারে হাঁটতে যেতেন। ওঁর জোরাজুরিতে জ্যাঠাইমাকেও মাঝেমাঝেই ওঁর সাথে বেরোতে হত।”
আমিও হাসলাম। “তাহলে তো একদিক থেকে ভালোই হল বলতে হবে। তাই না?”
“তা তো বটেই।” অশোকও হাসতে হাসতে জবাব দিল, “সবথেকে মজার ব্যাপারটা হল, জ্যাঠামশাই যেখানে ল্যান্ডস্কেপ ছাড়া কোনওদিন কিছু আঁকতেন না, তিনি হঠাৎ বায়না ধরে বসলেন, উনি জ্যাঠাইমার একটা পোর্ট্রেট আঁকবেন।”
“বাহ্‌! এ তো দারুণ ব্যাপার।” বললাম আমি, “তো জ্যাঠাইমা রাজি হলেন?”
“পাগল! জ্যাঠাইমা তো প্রথমে শুনেই একবাক্যে না করে দিলেন। বললেন যে বুড়ো বয়সে প্রাণ গেলেও উনি এরকম সং সেজে ছবি আঁকাবেন না। কিন্তু আমরা ছোটোরা হই হই করে জ্যাঠামশাইয়ের পক্ষ নিলাম। বাবা আর মা মুখে কিছু না বললেও ওঁদেরও প্রচ্ছন্ন মত ছিল জ্যাঠামশাইয়ের প্রস্তাবে। শেষপর্যন্ত আমাদের সবার পীড়াপীড়িতে জ্যাঠাইমা নিমরাজি হলেন পোর্ট্রেট আঁকাতে।”
“তারপর?”
“ঠিক হল আমাদের বাড়ির দোতলায় গঙ্গার দিকে মুখ করা দক্ষিণের বারান্দাটা হবে লোকেশন। বাড়িতে একটা সেগুনকাঠের কারুকাজ করা হাতলওয়ালা চেয়ার ছিল। সেটাতে গঙ্গার দিকে পিছন ফিরে জ্যাঠাইমা বসবেন। সামনে থাকবে একটা শ্বেতপাথরের গোল টেবিল আর জ্যাঠাইমার পাশে একটা দাঁড়ে রাখা থাকবে আমাদের পোষা টিয়াপাখিটা।”
একটু থেমে বলতে থাকল অশোক, “সবকিছু ঠিকঠাক হবার পর একটা চার ফুট বাই ছয় ফুট মাপের আর্ট পেপারে আঁকতে শুরু করলেন জ্যাঠামশাই। প্রথমে কয়েকদিন জ্যাঠাইমাকে বসিয়ে জ্যাঠামশাই আউট-লাইনটা এঁকে নিলেন। তারপর কিছুদিনের জন্যে জ্যাঠাইমা ছুটি পেলেন। সেইসময় জ্যাঠামশাই আঁকলেন পারিপার্শ্বিকটা। ফাউ হিসেবে গঙ্গার বুকে একটা ছোটো ডিঙিনৌকাও আঁকা হল। স্বাভাবিকভাবেই এত নিখুঁতভাবে আঁকলেন সেগুলো, দেখে মনে হচ্ছিল এই বুঝি টিয়াপাখিটা ডানা ঝাপটে উঠবে।”
বলতে বলতে অশোকের মুখচোখগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল ধীরে ধীরে। আমিও যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম সবটা। ও বলে চলল, “ব্যাকগ্রাউন্ডটা আঁকা শেষ হতেই আবার ডাক পড়ল জ্যাঠাইমার। রোজ দুপুর দুটো থেকে চারটে পর্যন্ত জ্যাঠাইমাকে সিটিং দিতে হত। স্কুল না থাকলে আমি সেই সময়টা সারাক্ষণই বসে থাকতাম জ্যাঠামশাইয়ের সাথে। দু’চোখ ভরে দেখতাম ওঁর আঁকা। জ্যাঠামশাই আমায় মজা করে বলতেন, আমি মনপ্রাণ ঢেলে আঁকছি তোর জ্যাঠাইমার ছবি। দেখিস আঁকার পরে দেখে মনে হবে জলজ্যান্ত তোর জ্যাঠাইমাকেই যেন এনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে ফ্রেমের ভিতরে।”
আমার কৌতূহলও ক্রমশ বাড়ছিল। বললাম, “তারপর?”
“প্রায় একমাস লেগেছিল ছবিটা শেষ করতে। সত্যিই ছবিটা এতই সুন্দর হয়েছিল যে জ্যাঠাইমার সামনে ছবিটা রাখলে মনে হত যেন আয়নায় জ্যাঠাইমাকে দেখছি। প্রত্যেকেই ছবিটা দেখে অবাক হয়ে একবাক্যে মেনে নিয়েছিল যে এটাই জ্যাঠামশাইয়ের আঁকা সেরা ছবি।”
“আর জ্যাঠাইমা? ওঁর রি-অ্যাকশন কী হল ছবিটা দেখে?”
“ছবিটা দেখার সাথে সাথে প্রথমেই ওঁর ফর্সা মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে গেল।” মুচকি হেসে বলল অশোক। “তারপর ঠোঁটটা বাঁকিয়ে বললেন, যাচ্ছেতাই হয়েছে!”
হা হা করে হেসে উঠলাম আমি। “যাক, তাহলে ভালোয় ভালোয় মিটল সব। এরপর থেকে তোর জ্যাঠামশাই নিশ্চয়ই পোর্ট্রেটই আঁকতে শুরু করলেন?”
“না রে! ওটাই ছিল জ্যাঠামশাইয়ের আঁকা প্রথম ও শেষ পোর্ট্রেট।” কেমন জানি হঠাৎ করে বিষণ্ণ হয়ে গেল অশোকের গলাটা, “ঠিক যেদিন ছবিটা আঁকা শেষ হল সেদিন রাত থেকেই জ্যাঠামশাইয়ের প্রচণ্ড জ্বর এল। টানা দু-তিনদিন যমে মানুষে টানাটানির পর হঠাৎ করে দিব্যি সুস্থ মানুষটা হুট করে মারা গেলেন।”
“এ বাবা! সে কি?” অশোকের জ্যাঠামশাইয়ের মারা যাবার দুঃখটা কী করে জানি আমাকেও নাড়িয়ে দিয়ে গেল।
“হ্যাঁ রে! ব্যাপারটা এতটাই আচমকা ছিল, যে আমরা কেউই ভাবতেই পারিনি এমনটা হতে পারে।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অশোক, “জ্যাঠাইমা তো দুঃখে একেবারে পাথরই হয়ে গিয়েছিলেন।”
দু’জনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, “জ্যাঠাইমার পোর্ট্রেটটার কী হল তারপর?”
“জ্যাঠাইমার ইচ্ছায় ছবিটা ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখা হল ওঁদের ঘরে।” জবাব দিল অশোক, “হয়তো শেষ কয়েকটা দিনের আনন্দময় মুহূর্তগুলোর সুখস্মৃতি হিসেবেই জ্যাঠাইমা আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলেন ছবিটা।”
“খুবই স্বাভাবিক।” আমার মনটাও কেমন একটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল।
কিছুক্ষণ আনমনা হয়ে চুপ করে রইল অশোক। তারপর বড়ো করে একটা শ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল, “যাই হোক, তারপর চার-পাঁচ বছর কেটে গেল। বড়দির বিয়ে হয়ে গেল। বড়দির এক খুড়শ্বশুর ছিলেন। অত ভালো না হলেও তিনিও ছবি আঁকতেন। তিনি একদিন এলেন আমাদের বাড়িতে জ্যাঠামশাইয়ের আঁকা ছবিগুলো দেখতে। সবক’টা ছবি দেখেই ভূয়সী প্রশংসা করলেন। তবে সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বসিত হলেন জ্যাঠাইমার পোর্ট্রেটটা দেখে। কী বললেন, জানিস?”
আমি মাথা নাড়লাম। অশোক বলে চলল, “উনি বললেন যে ছবিটা দেখে মনেই হচ্ছে না যে ওটা পাঁচ বছর আগে আঁকা। মনে হচ্ছে যেন মাত্র এক-দু’দিন আগে আঁকা। আমরা ভাবলাম, হয়তো নিছক প্রশংসার জন্যে উনি এরকম বলছেন। কিন্তু উনি তখন বললেন যে উনি সঙ্গত কারণেই এমনটা বলছেন। উদাহরণস্বরূপ বললেন, এখন জ্যাঠাইমার চুলে যে একটু একটু পাক ধরেছে বা চোখের তলায় যে একটু কালিমতো পড়েছে বা দুই গালে যে বলিরেখা তৈরি হয়েছে, সে সমস্ত অবিকলভাবে আঁকা আছে পোর্ট্রেটটাতে। আমরা শুনে একটু অবাকই হলাম, কারণ সত্যিই কিছুদিন আগে অবধি তো জ্যাঠাইমার চুল একেবারে কুচকুচে কালো ছিল। কোনও পাকা চুল তো চোখে পড়েনি। অবশ্য যাঁরা ছবি আঁকেন, তাঁদের দৃষ্টি স্বাভাবিক মানুষের থেকে একটু বেশি তীক্ষ্ণ হয়। হয়তো ছবিটা আঁকার সময় জ্যাঠাইমার মুখটা এমনটাই ছিল। আমরা তখন এসব খেয়াল না করলেও নিশ্চয়ই জ্যাঠামশাইয়ের অভিজ্ঞ চোখে এগুলো তখনই ধরা পড়ে গেছিল।”
সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। অশোক একবার নিজের হাতঘড়িতে সময়টা দেখে নিয়ে বলল, “যাই হোক, তারপর আরও এক-আধ বছর কেটে গেছে। আমি ততদিনে কলকাতায় কলেজে ভর্তি হয়ে গেছি। চুঁচুড়া থেকে আসা যাওয়া করতে অসুবিধা হয় বলে এখানেই একটা মেসে থাকি। ছুটিছাটায় বাড়ি যাই। তো এরকমই একবার বাড়িতে এসে জ্যাঠাইমার সাথে দেখা করতে গিয়ে দেখলাম, পোর্ট্রেটটা দেওয়ালে নেই। জিজ্ঞেস করতে গেলাম, দেখলাম বাবা ইশারায় মানা করল। জ্যাঠাইমার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বাবাকে জিজ্ঞেস করে জানলাম যে ছ’-সাতদিন আগে জ্যাঠাইমা কলতলায় পড়ে গিয়ে মাথায় চোট পেয়েছিলেন। কপালটা অল্প কেটেও গিয়েছিল। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নাকি তিনি চিৎকার চেঁচামেচি জুড়ে দেন। বলেন যে সেই রাত্রে নাকি ওঁর স্বপ্নে জ্যাঠামশাই এসেছিলেন। এসে জ্যাঠাইমাকে বলেছেন যে জ্যাঠাইমার ওই পোর্ট্রেটটায় তিনি নাকি প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে দিয়ে গেছেন। এই বিদ্যাটা তিনি শেষবার সেই যে পিশাচসিদ্ধ তান্ত্রিকের সাথে তন্ত্রসাধনা করেছিলেন তখনই অর্জন করেছিলেন। কিন্তু সাধনায় সিদ্ধিলাভ করার আগেই অসুস্থ হয়ে চলে আসতে হয়েছিল বলে বিদ্যাটা পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারেননি। তাই অর্ধপ্রাপ্ত জ্ঞান প্রয়োগ করায় ওঁর মৃত্যু হয়েছে। এর ওপর আবার সকালে উঠে জ্যাঠাইমা ছবিটাতে তাঁর কপালে ঠিক একই জায়গায় একটা কাটা দাগ দেখতে পান। তাই তাঁর মনে হয় যে ছবিটা অলক্ষুণে। এই ছবিটা আঁকার জন্যেই জ্যাঠামশাইয়ের মৃত্যু হয়েছে। তাই তাঁর জোরাজুরিতে বাবা ছবিটা সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে।”
আমি খুব হতাশ হয়ে বললাম, “যাহ্‌! অত সুন্দর ছবিটা সরিয়ে ফেলা হল।”
“হ্যাঁ রে! আমারও খুব খারাপ লেগেছিল তখন। কিন্তু বাবা বলল যে জ্যাঠাইমার নাকি বয়সের কারণেই কথাবার্তায় একটু আধটু অসংলগ্নতা দেখা দিচ্ছে। আর শেষ বয়সে মানুষ শিশুর মতো হয়ে যায়। তখন তাঁদের ছোটোখাটো ইচ্ছেগুলোকে মর্যাদা দেওয়াটাই উচিত। নাহলে তাঁদের মনে আঘাত লাগে। অগত্যা...”
“কিন্তু তুইও একবারও দেখলি না ছবিটা?” প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম আমি, “না দেখেই...”
“কে বলল দেখিনি?” আমার কথাটা শেষ হবার আগেই উত্তর দিল অশোক, “আমি দেখেছি ছবিটা। যদিও আমি কোনও কাটা দাগ-টাগ দেখতে পাইনি।”
“কী হল ছবিটার তাহলে? ফেলে দেওয়া হল?” আমার খুব খারাপ লাগছিল ছবিটার কথা ভেবে।
“না। ফেলে দেওয়া হয়নি।” মাথা নাড়ল অশোক, “ফ্রেমসুদ্ধু কাগজ দিয়ে মুড়ে আমাদের একটা স্টোর রুম ছিল, সেখানে রেখে দেওয়া হয়েছিল।”
“তারপর?”
“তারপর এক-দেড় বছরের মধ্যে জ্যাঠাইমা মারা গেলেন। ছোড়দিরও বিয়ে হয়ে গেল। বাবা-মা চুঁচুড়া ছেড়ে বাড়ি বানিয়ে চলে এল কলকাতায়। আস্তে আস্তে ছবিটার কথা আমরা সবাই ভুলে গেলাম।”
আবার কিছুক্ষণ নীরবতা পালন দু’জনের। হয়তো এত সুন্দর ছবিটার এরকম করুণ পরিণতির জন্যেই। শেষে অশোকই আবার মুখ খুলল, “তুই তো জানিসই আমরা চুঁচুড়ার বাড়িটা বিক্রি করে দেব ভাবছি। তাই মাঝে মাঝেই ওখানে গিয়ে খুঁজে পেতে দেখি যদি কোনও জিনিস পাই যেগুলো দরকার হতে পারে সেগুলো নিয়ে আসি। গতকাল এই উদ্দেশ্যেই গিয়েছিলাম চুঁচুড়ায়, বুঝলি। গিয়ে ভাবলাম স্টোর রুমটা একবার খুঁজে দেখি যদি কোনও দরকারি জিনিস পাই। তো সেখানে খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎই ভাঙা একটা তক্তাপোষের তলায় একটা জং ধরা ট্রাঙ্কের ওপর পেয়ে গেলাম ছবিটা।”
“তাই নাকি?” মনটা আবার খুশি হয়ে উঠল আমার, “আরে, এ তো দারুণ খবর!”
আমি উচ্ছ্বাস দেখালেও অশোকের দেখলাম কোনও ভাবান্তর হল না। ভাবলেশহীনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বলে চলল, “ছবিটা যে কাগজগুলো দিয়ে মোড়া ছিল সেগুলো খুলে ফেলতেই আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো শকটা পেলাম। আমার মাথাটা জাস্ট বনবন করে ঘুরতে শুরু করল। বিশ্বাস কর, আমার পায়ের তলা থেকে মাটিটা যেন স্যাঁট করে সরে গেল। আমি আরেকটু হলে টলে পড়ে যাচ্ছিলাম। কোনওমতে নিজেকে সামলালাম।”
“কেন?” প্রায় আর্তনাদ করে উঠলাম আমি, “ছবিটা কি নষ্ট হয়ে গেছে?”
“না রে! ছবিটা একদম ইনট্যাক্ট রয়েছে।” অশোক অতিকষ্টে একটা হাসি হাসল, “সবকিছু অ্যাজ ইট ইজ রয়েছে। সেগুনকাঠের চেয়ার, শ্বেতপাথরের টেবিল, দাঁড়ে বসা টিয়াপাখিটা, গঙ্গার বুকে ভাসা সেই ডিঙিনৌকো সবকিছু একদম অবিকল রয়েছে। শুধু...”
“শুধু! শুধু কী?”
“শুধু সেগুনকাঠের চেয়ারটা একদম খালি। জ্যাঠাইমার কোনও চিহ্ন পর্যন্ত নেই ছবিটাতে।”
_____

গ্রাফিক্সঃ পুণ্ডরীক গুপ্ত

2 comments: