গল্পঃ ফাঁদে পড়লেন দয়াপ্রকাশঃ দীপক দাস



।।এক।।

“আবার জলে নেমেছিস তুই? উঠে আয় একবার! এই ছড়ি তোর পিঠে ভাঙব।” সন্তুর মায়ের চিৎকার সৃজর কানে তিরের মতো বিঁধছিল।
বাইরের চিৎকার শেষ হল তো শুরু হল ঘরে। দিদি সৃজকে তীক্ষ্ণ গলায় ডাকছে, “ভাই, ভাই, শিগগির দেখে যা।”
সন্তুর মায়ের চিৎকার বা দিদির ডাক, কোনও কিছুকেই পাত্তা দিল না সৃজ। ও দ্রুত হাতের কাজ শেষ করতে চাইছে। না হলে স্যার দয়াপ্রকাশের বাড়ি যেতে দেরি হয়ে যাবে। কিন্তু কাজ আর শেষ করা হল না। দিদি হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে সৃজর কানটা ধরে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে গেল। মুখে তর্জন, “বড়োরা কথা বললে কানে যায় না নাকি!”
আজ রবিবার। সকলেই বাড়িতে। সৃজর কান হস্তগত করা দিদির রণংদেহি মূর্তি দেখে সকলে হাঁ হাঁ করে উঠলেন। জেঠিমা ধমকে উঠলেন, “এই মণি, কী করছিস? কচি কানটা ছিঁড়ে যাবে যে!”
দাদা মানে জেঠুর ছেলে শুভ বলে, “ছিঁড়ুক না। মণির কান কেটে প্রতিস্থাপন করা হবে। তখন মজাটি টের পাবে।”
জেঠু হাসতে হাসতে বললেন, “আর মণির কানে একটা গাধার কান লাগিয়ে দেওয়া হবে। ওর যা বুদ্ধি!”
এত টিপ্পনির চোটে দিদি কানটা ছেড়ে দেয়। আলতো করেই ধরেছিল। কিন্তু সৃজ কানে হাত-টাত বুলিয়ে এমন ভাব করল যেন কত লাগছে। ওর সহানুভূতি কুড়োনোর কৌশলটা দিদি ধরে ফেলে। ঘুষি পাকিয়ে সৃজর দিকে তেড়ে যায়।
সৃজর মা-বাবা এতক্ষণ ছেলেমেয়েদের খুনসুটিতে হাসছিলেন। মণিকে আবার ক্ষেপে যেতে দেখে ওঁরা বললেন, “কী হয়েছে রে, মা?”
দিদি ফোঁস ফোঁস করে ওঠে, “দেখো না কাকিমা, কখন থেকে ডাকছি একটা আজব জিনিস দেখাব বলে! বাবু গ্যাঁট হয়ে চেয়ারে বসে রয়েছেন।”
সকলেই হইহই করে ওঠেন, “আজব জিনিস! তাই নাকি! আমরাও দেখব। চল, চল।”
সৃজদের বাড়ির লোক খুব আমুদে। একজোট হলেই শুরু হয় হাসি-মজা।

দত্তপুকুরে তখন আশ্চর্য দৃশ্য। দুটো হাত পুকুরের মাঝে নমস্কারের ভঙ্গিতে উঁচিয়ে আছে। হাতের মালিক জলের তলায়। তাকে দেখা যাচ্ছে না। ওই জোড় হাতের মালিক সন্তু। মা রেগে গিয়েছে। তাই মাকে হাসানোর চেষ্টা। ওর প্রচুর দম। অনেকক্ষণ পরে দম ফুরিয়ে গেলে একবার ভেসে উঠছে। তারপর আবার জোড়া হাত তুলে ডুব। সন্তুর কাণ্ড দেখতে পুকুরপাড় ভিড়ে ঠাসা। তারা তো হেসে কুটোপাটি। লোকে হাসছে বলে সন্তুর মা আরও রেগে গিয়ে চিৎকার করছে।
সন্তুর এমন কাণ্ডের মূলে ক্রিকেট। পুকুরপাড়ের ছোটো মাঠে পাড়ার ছেলেরা ক্রিকেট খেলে। পুকুরে বল পড়লে খেলা বন্ধ হয়ে যায় বলে ছয় মারা বন্ধ। কিন্তু টি-টোয়েন্টির যুগে কি আর কেউ ক্ল্যাসিক গ্রাউন্ড শট খেলে? নাকি ছয় মারার নিষেধের কথা মনে থাকে? কেউ তুলে মারলেই বল পুকুরের মাঝ বরাবর। গ্রাউন্ড শটেও মাঝে মাঝে জলে বল পড়ে। কিন্তু সেটা পুকুরপাড়ের কাছাকাছি থাকে। একটা আঁকশি রাখা আছে। ছেলেপুলেরা বল টেনে পাড়ে নিয়ে চলে আসে। কিন্তু আঁকশির নাগালের বাইরে পড়লেই মুশকিল। তখন সন্তুকে জলে নামতে হয়। ভালো সাঁতার জানে, দম বেশি বলেই ওকে জলে নামানো হয়। সন্তুরও তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু ওর মায়ের ব্যাপারটা ঠিক পছন্দ নয়। সন্তুই কেন বারবার জলে নামবে? ওর মা পাড়ার অনেককে এই প্রশ্ন করেছে। বন্ধুদের তুলনায় সন্তুদের অবস্থা ভালো নয়। তাই বোধহয় ওর মায়ের মনে হয়, ওরা গরিব বলেই বাবু-সাবু বাড়ির ছেলেরা সন্তুকে জলে নামায়।
পাড়ার বড়োরা কয়েকজন সন্তুর মাকে বোঝানোর চেষ্টা করে। কেউ বলল, “ছেড়ে দাও, বৌমা। ছেলেটাকে জল থেকে উঠতে দাও।” কেউ বলল, “তুমি পুকুরপাড় থেকে চলে যাও। ওর যে ঠাণ্ডা লেগে যাবে!” সন্তুর দলের খেলোয়াড়েরা তখন এক জায়গায় জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে। ওদের ভয়, সন্তুকে জলে নামানোর জন্য ওদের বাড়ির লোকও হয়তো দু-চার ঘা দেবে।
পাড়ার লোকেদের বোঝানোয় কাজ হয়। সন্তুর মা বাড়ি চলে যায়। তারপরে সন্তু যেই দম নিতে উঠেছে, পাড়ের লোকেরা হইহই করে ওঠে, “ওরে ছেলে, মা চলে গেছে, উঠে আয়। জ্বর হয়ে যাবে রে! উঠে আয় রে!”
সন্তু সাঁতার কেটে পাড়ে ওঠে। তারপর তিরবেগে ছুটে পালায়।
মজা শেষ দেখে পুকুরপাড়ের ভিড়ও পাতলা। তখনই সৃজ দেখতে পায়, সন্তুর দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন স্যার দয়াপ্রকাশ। ওদের সঙ্গে কথা বলছেন। সৃজ ধীরে ধীরে ওই দলটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। কী ঘটেছে স্যার খেলোয়াড়দের কাছে সেটা জানার চেষ্টা করছিলেন। সৃজকে দেখতে পেয়ে হাসলেন। তারপর আরও কিছুক্ষণ ছেলেগুলোর সঙ্গে কথা বলে সৃজকে বললেন, “চল, এবার ফেরা যাক।”
সৃজ দয়াপ্রকাশের বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে।
তখন ওরা নবারুণ ক্লাবের মাঠের কাছে চলে এসেছে। দেখা হয় দীনকাকার সঙ্গে। কাকা জমি থেকে ফিরছে। দয়াপ্রকাশকে দেখে কাকা বলে, “স্যার, আপনার যন্তরে ভালো কাছ হয়েছে। শেয়ালদের উৎপাত একদম বন্ধ।”
দয়াপ্রকাশ হাসেন। তারপর ডানহাতটা একবার তুলে এগিয়ে যান।
দয়াপ্রকাশ সৃজর স্যার নন। দীনকাকারও নন। উনি কখনও শিক্ষকতা করেননি। সরকারি বিজ্ঞান বিভাগে বড়ো পদে ছিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতের মিল না হওয়ায় সেসব ছেড়েছুড়ে দেন। বছর দুয়েক হল সৃজদের গ্রাম পাতিহালে বসত করেছেন। কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলেন, অজ্ঞাতবাসে আছি। আপনভোলা মানুষ। নানা মজার আবিষ্কারে মেতে থাকেন।
সৃজ বুঝতে পারে, দীনকাকা শিয়াল তাড়ানোর যন্ত্রের কথা বলছে। এই তো সদ্য ঘটনা। গ্রামে শিয়ালের উৎপাত খুব বেড়েছিল। লোকের শসা, কুমড়ো, বেগুনের ক্ষেত তছনছ করছিল। চাষিরা তো ক্ষেপে আগুন। ফাঁদ পেতে, বিষ দিয়ে শিয়াল মারবে বলে তৈরি। বড়গাছিয়ার মাংসের দোকান থেকে ছাগলের নাড়িভুঁড়িও কিনে আনা হয়েছিল। তাতে বিষ মাখিয়ে চাষিরা ক্ষেতের পাশে রাতে দিয়ে রাখবে। খেলেই মরে যাবে শিয়ালেরা। সেদিন সন্ধেবেলা মাঠ থেকে ফেরার সময়ে সৃজ দেখে দীনকাকা, বুধদা, বসুজেঠুরা জমির আলে বসে জটলা করছে। সৃজ যেতে যেতেই এমনি জিজ্ঞাসা করেছিল, “কী করছ গো তোমরা?”
দীনকাকা উত্তর দেয়, “শিয়াল মারার ব্যবস্থা হচ্ছে, বাবু।”
সৃজ শুনেই দয়াপ্রকাশের বাড়ির দিকে ছুট লাগায়। স্যারকে গিয়ে বলতেই ছুটে আসেন দয়াপ্রকাশ। বসুজেঠুদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ওদের এক কথা, “স্যার, বড্ড ক্ষতি করছে। পুরো মরসুম এরকম করলে একদম মাঠে মারা পড়ব। চাষের খরচই উঠবে না।”
স্যার ওদের কাছে এক সপ্তাহ সময় চেয়ে নেন। তারপর যা খুশি তাই করতে পারে। এলাকার লোক দয়াপ্রকাশের কথা মান্য করে। ওরা রাজি হয়।
দয়াপ্রকাশ এক সপ্তাহের মধ্যেই একধরনের যান্ত্রিক কাকতাড়ুয়া তৈরি করেন। কাকতাড়ুয়াগুলো ফসলের ক্ষেতে বসানো থাকে। শিয়াল ক্ষেতে ঢুকলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারপর খপ করে শিয়াল ধরে খুব কাতুকুতু দেয়। মজার কথা হল, উনি কাকতাড়ুয়া করেছিলেন মাত্র তিনটি। সেগুলো একেকদিন রাতে একেকটা ক্ষেতে বসানো থাকত। সপ্তাহ খানেক পরে উনি ওই যান্ত্রিক কাকতাড়ুয়ার আদলে সাধারণ কাকতাড়ুয়া তৈরি করে যে যার ক্ষেতে বসিয়ে নিতে বলেন। নতুন কাকতাড়ুয়াগুলো শুধু বসেই থাকে। ওদের শিয়াল ধরে কাতুকুতু দেওয়ার ক্ষমতা নেই। কিন্তু তাতেও কাজ হাসিল। শিয়ালেরা এলাকা ছাড়া।
কাকতাড়ুয়ার কথা মনে পড়তে সৃজ ফিক করে হেসে ফেলে। স্যর জিজ্ঞাসা করেন, “হাসছিস কেন রে?”
হাসতে হাসতেই সৃজ বলে, “বিট্টুর কথা মনে পড়ে গেল, স্যার।”
শুনে স্যারও হেসে ফেলেন।
হয়েছিল কী, শসাক্ষেতে কাকতাড়ুয়া বসানোর কথা পাড়ার বিচ্ছু ছেলে বিট্টু জানত না। রাতে শসা চুরি করতে ঢুকতেই কাকতাড়ুয়া ওকে চেপে ধরে কাতুকুতু দিতে শুরু করে। গভীর রাতে শসাক্ষেত থেকে হো হো করে হাসির আওয়াজে পাড়ার লোক ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কাশীজেঠু বলেছিল, “এ যে হায়নার হাসি! গ্রামে হায়নাও আছে নাকি?”
সখি ঠাকুমা বলেছিল, “না রে, হায়না নয়। জলার ভূতটা অনেক শসা পেয়ে আনন্দে হাসছে।”
ঠাকুমার কথা শেষ হতে না হতেই প্রবল আর্তনাদ ভেসে আসে। সঙ্গে ভেউ ভেউ করে কান্না। সেটা শুনে কলেজে পড়া শিবে বলেছিল, “ওই দেখো, তোমাদের হায়না না জলার ভূত এবার কাঁদছে। আরেকটা হায়না শসা কেড়ে নিয়েছে বোধহয়। জলার ভূতেও কেড়ে নিতে পারে।”
ভূত না হায়না সে নিয়ে কিছুক্ষণ তর্ক চলল। পাড়ার প্রবীণেরা বললেন, এ-গ্রামে একসময় অনেক বাঘরোল ছিল। হায়নাও থাকতে পারে। সখি ঠাকুমা বলে, “ভূতও কি কম ছিল, বাবারা! বটতলায় ভূত, নেপেনের বাড়িতে ভূত। পাট কাটার পরে বড়গেছের বাঁধের খালে কত লোকে আলেয়া দেখেছে!”
তর্কাতর্কির মধ্যেই শিবে বলে, “ভূত এতক্ষণ ধরে লোককে জানান দিয়ে হাসতে পারে না। দেখতে যাবে তো চলো। না হলে একাই যাচ্ছি। কেউ বিপদে পড়ল কি না কে জানে!”
পাড়ার উঠতি ছেলেটা ভূতের হাতে জান খোয়াবে? এটা ভেবে লজ্জা পায় পাড়ার বড়োরা। যাদের হায়না মনে হয়েছিল তারা লাঠিসোঁটা হাতে এগোয়। যারা মনে করছিল জলায় ভূত আছে, তারা মুখে রামনাম আর হাতে হারিকেন নিয়ে এগোয়। ভূত নাকি আগুনকে ভয় পায়।
ওরা যখন শসাক্ষেতে পৌঁছেছে তখন হেসে-কেঁদে বেদম হয়ে পড়েছিল বিট্টু। কাকতাড়ুয়া ওকে ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু ভয় আর গায়ে শক্তি না থাকায় ক্ষেতের মধ্যেই শুয়ে পড়েছিল ও। দয়াপ্রকাশ কাকতাড়ুয়াগুলোকে ওইভাবেই তৈরি করেছিলেন। তাতে টাইমার লাগানো আছে। মিনিট দশেক কাতুকুতু দেওয়ার ব্যবস্থা। কিছুক্ষণ দম নিয়ে বিট্টু বলল, “প্রথমে কাকতাড়ুয়ার কাতুকুতুর চোটে হাসছিলুম। তারপরে ভয়ে কেঁদে ফেলি।”
বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে দয়াপ্রকাশ বলেন, “সৃজ, দ্রুত একটা কাজ সারতে হবে।”

।।দুই।।

খেলতে বেরোবে বলে তৈরি হচ্ছিল সৃজ। মনে হল, দয়াপ্রকাশ ডাকছেন। বেরিয়ে এসে স্যারকে দেখতে পায় ও। আজ রবিবার নয়। ফলে ওদের বাড়ি ফাঁকা। স্যার রবিবারেই ওদের বাড়িতে আসেন। একটু অবাকই হল সৃজ। মা আর জেঠিমার সঙ্গে কথা বলছিলেন উনি। সৃজকে দেখে বললেন, “হ্যাঁ রে, ছেলেরা মাঠে খেলছে না কেন?”
সৃজ বলল, “সন্তুর মা রেগে যাওয়ার পর থেকে খেলা বন্ধ।”
দয়াপ্রকাশ হাঁ হাঁ করে উঠলেন, “খেলা কেন বন্ধ হবে রে! শিগগির সন্তুর বাড়িতে নিয়ে চল তো আমাকে। আর জলে নামতে হবে না।”
সৃজ তখনই দেখতে পেল, স্যারের হাতে একগোছা লাঠি।
সন্তুকে বাড়িতে নয়, পাওয়া গেল মাঠের ধারে বটগাছে। ও গাছে উঠে হাওয়া খাচ্ছিল আর গান গাইছিল। সৃজ ডাকতে লাফিয়ে নেমে এল। স্যার বললেন, “খেলোয়াড়দের ডাক। খেলবি চল।”
সন্তু বলে, “না, স্যার। জলে বল পড়লে ঝামেলা হবে।”
স্যার সেই লাঠির গোছাটা দেখিয়ে বললেন, “কিছু হবে না। জলে বল পড়লে এটা দিয়েই তুলে আনা যাবে।”
উনি দেখিয়ে দিলেন। একটা করে লাঠি খুললেই সেটা বাড়তে থাকে। সবক’টা লাঠি খুললে সেটা পুকুরের মাঝ বরাবর পৌঁছবে। শেষ লাঠিতে একটা জাল লাগানো। ওতেই তুলে আনা যাবে বল।
স্যার লাঠির গোছাটা দিতেই সন্তু একগাল হাসল। তারপর, “ওরে ভুটান, শানু, ওরে অভি, দীপ খেলতে খেলতে আয় রে!” বলে চিৎকার করতে করতে ছুট লাগাল। ওর আনন্দ দেখে সৃজর ভারি আনন্দ হল। তারপর দু’জনে মাঠের দিকে এগোতে শুরু করল।
তখন বাগপাড়ার কাছে। থমকে দাঁড়াল দু’জনে। কেতোদের বাড়িতে হট্টগোল হচ্ছে। দু’জনে কান পেতে শোনে। তারপর বাড়িতে ঢুকে পড়ে। সেখানে তখন সাংঘাতিক কাণ্ড। একটা শিয়াল কেতোদের উঠোনে লোম ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে। উলটোদিকে পাড়ার লোক। মাঝে কেতোদের পোষা হাঁসের দল। এত লোক, তবুও ভয় পাচ্ছে না শিয়ালটা। মুখ দিয়ে কেমন একটা আওয়াজ করছে। হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে শিয়ালটা হাঁসের দলে লাফ দিল। তারপর একটা হাঁস নিয়ে দে ছুট। বেপরোয়া শিয়ালটার কীর্তিতে পাড়ার লোক অবাক।
কেতোদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্যার বললেন, “আর মাঠে যাব না রে। আমি বাড়ি চললাম।”
সৃজ মাঠে গেল।

সেদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় সৃজ দেখল, রনিকে ওর বাবা সাইকেলে করে কোথাও একটা নিয়ে যাচ্ছে। আর ও বিকট ডাক ছেড়ে কাঁদছে। সৃজ ভাবল, ওর বাবা হয়তো জোর করে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে। বিকেলে খেলা হবে না ভেবে রনি কান্নাকাটি করছে। ও রনির বাবাকে জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে? রনি কাঁদছে কেন?”
রনির বাবা বলল, “শিয়ালে কামড়ে নিয়েছে। এখন ডাক্তারখানায় নিয়ে যাচ্ছি। ও ইঞ্জেকশনের ভয়ে কাঁদছে।”
সৃজ বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে পুরো ঘটনাটা শুনল। রনি উঠোনে দাঁড়িয়ে মুড়ি খাচ্ছিল। হঠাৎ খিড়কি পুকুরের পাড়ের জঙ্গল থেকে একটা শিয়াল বেরিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওকে ফেলে দিয়ে মুড়ি খেতে শুরু করে। রনির বাবা তখন বাড়িতে নেই। ওর মা লাঠি নিয়ে তেড়ে গেলেও নড়েনি শিয়ালটা। রনিকে জলাতঙ্কের ইঞ্জেকশন নিতে হবে।
আরেকদিন দুপুরে সৃজ সবে খেয়েদেয়ে ‘ভোম্বল সর্দার’ বইটা নিয়ে বসেছে। হঠাৎ পাশের বাড়ি থেকে ‘গেল রে, নিয়ে গেল রে’ প্রবল শোরগোল। সৃজরা ছুটে গেল। গিয়ে দেখে, কৃষ্ণ উঠোনে বসে হাউহাউ করে কাঁদছে। ওর ভাই বলল, “দাদার পোষা দুটো পায়রাকে দুটো শিয়াল নিয়ে পালিয়েছে।”
পল্টুর একদিন মাছ ছিনতাই হয়ে গেল। সকাল দশটার সময়ে। সেদিন রবিবার। সৃজ দয়াপ্রকাশের বাড়িতেই ছিল। ল্যাবে স্যার কাজ করছেন। আর টুকটাক গল্প চলছে। সেই সময়েই ‘স্যার স্যার’ ডাক ছেড়ে হাঁফাতে হাঁফাতে ঢুকল সন্তু। স্যার জিজ্ঞাসা করলেন, “কী হল রে? এত হাঁফাচ্ছিস কেন?”
সন্তু একটু দম নিয়ে বলল, “পল্টুকাকার মাছ ছিনতাই হয়ে গেছে।”
মাছ আবার ছিনতাই করার মতো কিছু? দয়াপ্রকাশ, সৃজ দু’জনেই খুব অবাক হন। স্যার বললেন, “কে ছিনতাই করল রে?”
সন্তু বলল, “শিয়ালে।”
দু’জনে আবার অবাক। শিয়ালে তো মানুষকে ভয় পায়! এমন সকালে মাছ ছিনতাই করতে বেরিয়েছে? দু’জনেই সন্তুকে পুরো ঘটনাটা বলতে বলল।
সন্তু শুরু করল। “বাজার করে হেঁটে ফিরছিল পল্টুকাকা। সাইকেলটা খারাপ তো, তাই। হঠাৎ কোম্পানি পুকুরের পাড় থেকে দুটো শিয়াল পিছু নিল। কাকা হ্যাট হ্যাট করে তাড়ালেও যায়নি। হঠাৎই ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ে ব্যাগের ওপর। কাকা ভয়ে ব্যাগ ছেড়ে ছুট। দূর থেকে দেখেছে, শিয়াল দুটো মাছের ক্যারিব্যাগটা নিয়ে পালিয়ে গেল।”
সন্তুর কথা শুনে স্যার শুধু একটাই কথা বললেন, “লক্ষণ ভাল ঠেকছে না রে। কিছু একটা করতে হবে।” বলতে বলতে স্যার ল্যাবের দিকে পা বাড়ালেন।
সৃজ জিজ্ঞাসা করল, “কী করতে চান, স্যার?”
স্যার বললেন, “যেকোনও ব্যবস্থার একটা পালটা ব্যবস্থা করে রাখা দরকার। যাতে সেই ব্যবস্থাটা গোলমাল করলে তাকে ঠেকানো যায়।” বলতে বলতে স্যার ল্যাবে ঢুকে গেলেন। তার মানে এখন গবেষণার কাজে মগ্ন থাকবেন। স্যার এরকমই। সৃজ স্যারের পড়ার ঘরে বসে বই পড়তে শুরু করল। সন্তু মুখ গোমড়া করে পালাল। শিয়ালের মাছ ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা বলতে এসেও পাত্তা পেল না যে।
এর একদিন পরের ঘটনা। পিন্টু দাসের বছর তিনেকের মেয়েটা দোরে একা খেলছিল। ওর মা রান্নার কাছে ব্যস্ত। বাড়িতে কেউ আর কেউ নেই। হঠাৎ কী একটা আওয়াজে ওর মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দেখে, চার-পাঁচটা শিয়াল গুঁড়ি মেরে এগোচ্ছে মেয়ের দিকে। কান্নাকাটি, চিৎকারে পাড়ার লোক জমে গেল বলে বাঁচোয়া!
পাড়ার লোক মিটিং ডাকল। মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হল, শিয়াল মারতে হবে। না হলে সুযোগ বুঝে বাচ্চাদের তুলে নিয়ে যাবে ওরা। মিটিং শেষ হতেই পাড়ার নওজওয়ানেরা দল বেঁধে বেরিয়ে পড়ল শিয়াল নিধনে। কোম্পানি ট্যাঙ্কের ডাঙায়, বাদার মাঠে, কোলেদের পুরনো পাঁজায় ওদের গর্ত আছে সবাই জানে।
শিয়াল মারার দলটাকে লাঠি, মশাল নিয়ে বেরোতে দেখে সৃজ ছুটে গেল দয়াপ্রকাশের কাছে। স্যার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এলেন। বুঝিয়ে আটকানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু পাড়ার লোকেরা নাছোড়। বসুজেঠু এগিয়ে এসে বললেন, “স্যার, আমরা সবসময় আপনার কথা শুনেছি। এখন ওরা বেপরোয়া হয়ে গেছে। যেকোনও দিন কোনও বাচ্চা ওদের পেটে যাবে।”
স্যার বুঝলেন, বুঝিয়ে কাজ হবে না। উনি বললেন, “আমার সঙ্গে এসো, আমি ব্যবস্থা করছি। আর হামলা করবে না শিয়ালেরা।”
স্যারের পিছু পিছু সবাই জলায় এল। স্যার ক্ষেতে নেমে লাঠি দিয়ে নিজের তৈরি কাকতাড়ুয়াগুলো ভাঙতে শুরু করলেন। চাষিরা হাঁ হাঁ করে উঠল, “স্যার, কী করছেন? ফসল যে তছনছ করে দেবে! আমরা খাব কী?”
স্যার লাঠি চালাতে চালাতেই বললেন, “ওরা খেতে না পেলে, বাচ্চাদের খাওয়াতে না পারলে তোমাদের বাচ্চাদের খাবে।”
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ পুষ্পেন মণ্ডল

No comments:

Post a Comment