গল্পঃ আমাদের বন্ধুরাঃ সাগরিকা রায়




আমাদের বাড়িতে গেস্ট এলেই পিতুমাসি উঁকি দিয়ে দেখবেই দেখবে। মা যতই বলে, “পিতু, গেস্টের সামনে আসবে না যতক্ষণ না আমি ডাকব,” পিতুমাসির মনেই থাকে না মায়ের কড়া নির্দেশ। আমার খুব মজা হয়। আমি প্রতিদিন গেস্ট এলেই পিতুমাসির দিকে লক্ষ রাখি। আজ যেমন সুজাতা-আন্টি এসে বেল বাজাতে মা হাসিমুখে দরজা খুলে দিতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। তারপরে ব্যাক করে কিচেনে পিতুমাসির কাছে গিয়ে বলল, “পিতু, যাও, দরজা খুলে দাও। জিজ্ঞেস করলে বলবে, ম্যাডাম ভেতরে আছে। আপনি আসুন।”
আমি তো অবাক। মা কখনই এমন করে না তো! প্রথমেই দরজা খুলে দিতে বলে মা পিতুমাসিকে দেখিয়ে দিল! তাহলে? আর নিজেকে ম্যাডাম বলে পরিচয় দিল? হ্যাঁ, মা স্কুলে ম্যাডাম। কিন্তু বাড়িতে তো নয়! ইস, মা ঠিক ভুলে গেছে!
সুজাতা-আন্টির বাড়িতে মা অনেকদিন যায়নি সেই বার্থডের ঘটনার পরে। কী একটা গণ্ডগোল হয়েছিল যেন। তারপর থেকে সুজাতা-আন্টিও আসেনি আমাদের বাড়িতে। জানি না বাবা, বড়োদের কী যে গণ্ডগোল হয়! আমাদের বন্ধুরা কখনই এমন করে না। ঝগড়া হল, দু’মিনিট পরেই ভাব, ভাব, ভাব!
পিতুমাসি কাপড়ে হাত মুছতে মুছতে যাচ্ছে দরজা খুলে দিতে। খুলে দিয়ে মুখ বাড়িয়ে মুখটা বাঁদিকে ঘুরিয়ে সুজাতা-আন্টিকে দেখল। আসলে পিতুমাসি বাঁ চোখটাতে দেখতে পায়। ডান চোখে কিচ্ছু দেখে না। আমি উঁকি দিয়ে দেখলাম, সুজাতা-আন্টি অবাক চোখে পিতুমাসিকে দেখে জানতে চাইল মা কোথায়। পিতুমাসি বলল, “ম্যাদা মা বলল আপনাকে ঘরে ঢুকতে।”
ইস! কী যে বলে পিতুমাসি! ম্যাডামকে বলছে ম্যাদামা! আসলে কিন্তু খুব ভুল বলেনি। ম্যাডামকে মাদাম তো বলাই হয়। সুজাতা-আন্টি ঘরে ঢুকতে মা মুখ গোমড়া করে এগিয়ে এল। “আরে, তুমি!”
যেন মা জানেই না সুজাতা-আন্টি এসেছে!
আন্টি হেসে বলল, “আসতে হল। কাল আমার ছেলের বার্থডে। তোমরা সবাই যাবে। রাসেল তো আমার ছেলের ফ্রেন্ড। ও তো যাবেই। তোমরাও যাবে। নিমন্ত্রণ করতে এসেছি।”
বাহ্‌! কী মজা! কাল সঞ্চারের বার্থডে। সেটা আমি জানি আগেই। কাল খুব মজা হবে। শ্রীজাত, বেগম, কোয়েল, সুস্নাত, অলীক সবাই আসবে। সঞ্চারের আঙ্কেল ঋদ্ধি খুব প্রিয় আমাদের। দারুণ সব গেম আছে আঙ্কেলের কাছে। কাল সারাটা দিন হেব্বি হেব্বি যাবে।
বেগম ফোন করেছিল আজ সকালে। ওদের নিমন্ত্রণ করেছে আন্টি। আমি ভাবছিলাম ওদের করেছে। কিন্তু সুজাতা-আন্টির সঙ্গে মার কিছু কথা কাটাকাটি (এটা মা বাবাকে বলেছিল) হওয়াতে কথা বন্ধ আছে। বাবা বলেছিল, “এসব নিয়ে বেশিদিন মনখারাপ রেখ না। মিটিয়ে নাও।”
মা রাজি হয়নি। এখন নিশ্চয়ই সব মিটে যাবে। আমি ছুটে সুজাতা-আন্টির কাছে চলে এলাম। আন্টি সুন্দর করে হাসল। “রাসেল, তুমি একটু তাড়াতাড়ি করে চলে যেও। ঋদ্ধি অনেক গেম নিয়ে এসেছে কিন্তু। আর আমি কাজুবাদাম দিয়ে পায়েস করছি। তুমি ভালোবাসো না?”
“আমি ভালোবাসি। সঞ্চার, বেগম আর অলীক ভালোবাসে।”
“হুম। মানে সবাই ভালোবাসে। বুঝেছি।”
মা হাসছিল। মন ভালো হয়ে গেলে মা এরকম হাসে।
ভাব, ভাব, ভাব! ভাবের গন্ধ বের হচ্ছে ঘর থেকে। মায়ের হাসি থেকে। সুজাতা-আন্টির চোখ থেকে। কাল তাহলে কাজু দেওয়া পায়েস হচ্ছে! আহ্‌!

সঞ্চার আমার খুব ভালো বন্ধু। ও এত ভালো অঙ্ক জানে যে বিশ্বাস করা যায় না। স্যারেরা পর্যন্ত অবাক হয়ে যায় ওর অঙ্ক করার ক্ষমতা দেখে। আমি তো মাঝেমাঝেই সঞ্চারের কাছে চলে যাই অঙ্ক বুঝতে। জলের মতো সহজ করে অঙ্ক বুঝিয়ে দেয়। কিন্তু একটাই কষ্ট ওর। সে কষ্ট আমারও। সঞ্চারকে দেখলে আমার অসম্ভব কষ্ট হয়। সঞ্চার হাঁটতে পারে না। কবে একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল, সেজন্য ও হাঁটতে পারে না। সারাক্ষণ হুইল চেয়ারে বসে থাকে। সেই অ্যাকসিডেন্টের সময় আমিও ছিলাম একই গাড়িতে। আর ছিল বেগম। উফ্‌! ভাবলেও গায়ে কাঁটা দেয়! আচ্ছা, কাঁটা দেয় কী করে? আমরা কি সজারু নাকি? বড়োরা এমন বলে, “গায়ে কাঁটা দিয়েছিল আমার, জানো তো!” বড়োদের দেখাদেখি আমিও বলি। কিন্তু কাঁটাটা খুঁজেই পাই না।
আমরা খেলি ওদের বাগানে, ও বসে বসে দেখে। উৎসাহ দেয়। গেম খেলতে ভালোবাসে সঞ্চার। সেজন্য ভাবছি বার্থডেতে ওকে দুটো দারুণ গেমের সিডি দেব।
বাবা আমার খুব ভালো বন্ধু। বাবা আমাকে বুদ্ধি দিল সঞ্চারকে একটা বেশ চনমনে অ্যাকশন গেম দিতে। ও যেহেতু হাঁটতে পারে না, সেহেতু এইধরনের গেম ওর জন্য ভালো। গেম খেলতে খেলতে ওর মনে হবে ও-ই গেমের হিরো। হিরো দৌড়চ্ছে, মনে হবে সঞ্চারই অ্যাকশনে অংশ নিয়েছে। ওর মন ভালো থাকবে। বাবার কত বুদ্ধি! আমার এই আইডিয়াটা এত্ত ভালো লাগল যে বলার নয়। মাকে গিয়ে বলতেই মা হেসে বলল, “খুবই ভালো হবে। সঞ্চার খুশি হবে দেখে।”
পরেরদিন ঠিক বিকেল হতেই আমরা বেরিয়ে পড়ব সঞ্চারদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। বাবা বলেছে, সঞ্চারদের বাড়ির খানিকটা দূরে মধুদিদির বাড়ি। মধুদিদি বাবার পিসি। কিন্তু অনেকদিন হল মধুদিদির সঙ্গে কিছু কিছু ব্যাপারে বাবার মতানৈক্য হওয়ায় মধুদিদির বাড়ির কাছাকাছিও যাওয়া বাবার মনে মনে নিষেধ। আমার জন্মের আগের ঘটনা। আমি আজও মধুদিদিকে দেখিনি। মধুদিদির মেয়ে কাঞ্চনবর্ণাকেও দেখিনি। শুধু বাবার কাছে একটু একটু গল্প শুনেছি।

আজ বাবার কী হয়েছে কে জানে! সকাল থেকেই মনটা আনমনা। আমি বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়াতে বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি জানি, যখন বাবার মনখারাপ থাকে তখন বাবা এরকম করে আমাকে জড়িয়ে ধরে চুপ করে থাকে। আমি বললাম, “কী হয়েছে, বাবা? মনখারাপ? তুমি কাল মধুদিদির বাড়ির কথা বললে। তোমাদের মতানৈক্য কেটে যায়নি আজও? কেটে গেলে চলো না ওদের বাড়ি।”
“যাব? কী ভাববে! রাশি রাশি কথা শোনাবে। ফের ঝগড়াঝাঁটি।” বাবা মুখ ঘুরিয়ে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকল।
“ধুস! মতানৈক্য হলে হবে। ঝগড়া হলে খুব করে ঝগড়া করবে। এমন আমরা বন্ধুরা করি। আমাদেরও মতানৈক্য হয়, বাবা। বেগম যদি বলে সঞ্চারের থেকে রিপন ভালো অঙ্ক জানে, আমি মানবই না। তখন সেই মতানৈক্য। তবে মতানৈক্য হলেও সে তোমার তখন তখন, কিন্তু তারপরেই দাঁত বের করে আন্টির দেওয়া লুচি আর সুজির হালুয়া খাই। পরেরদিন ফের মতানৈক্য করার জন্য যাই।”
“এমন কি বড়োরা করতে পারে? বড়ো হওয়া খুব খারাপ।” বাবা হুস করে শ্বাস ফেলে। সেই শ্বাসের হাওয়ায় গেমের সিডির রসিদটা উড়ে একটু দূরে গিয়ে পড়ল।
“পারে বাবা, পারে। বড়োরাই তো পারে ইচ্ছে করলে! তুমি তুলনামাসিকে দেখো না, পিতুমাসির বোন তুলনামাসি? সেদিন এসে কী মতানৈক্য লাগিয়ে দিল! আমি ভাবলাম, তোমাদের ফোন করে বাড়িতে আসতে বলি। দু’জনেই তীব্র মতানৈক্য লাগিয়েছে। তুলনামাসি শেষে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে কিনা, পিতুদি, তাড়াতাড়ি ঠাণ্ডা জল দে। গলা শুকিয়ে গেছে। অমনি পিতুমাসি ফ্রিজ খুলে জলের বোতল বের করে কাচের গ্লাসে ঢেলে দিল জল। খেয়ে তুলনামাসি, আহ্‌! শান্তি হল বলাতে পিতুমাসি প্লেটে করে ভ্যানিলা আইসক্রিম বের করে পাশে বসিয়ে খাওয়াল। আমি ওদের থেকেই শিখেছি, মতানৈক্য হলেও খাওয়াদাওয়া করা যায় দু’জনে বসে হেসে হেসে। তুমিও করো, বাবা।”
“আচ্ছা, বেশ। এখন তো চল। সঞ্চাররা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। দেরি হয়ে যাচ্ছে যে!”
বাবা উঠে তৈরি হয়ে এল। মা সিল্কের শাড়ি পরে একট ছাতা নিল সঙ্গে। এখন শীত নামার একটু দেরি আছে। মাঝে মাঝে ঝিপ ঝিপ বৃষ্টি হয়। আমার ভেজা বারণ। ডাক্তার বারণ করেছে। মা খুব নজর রাখে আমার ওপর। তাই ছাতা নিতে হল। আমার আবার এই ছাতা-টাতা নিয়ে বেড়াতে যেতে ভালো লাগে না। কিন্তু মাকে কে বোঝাবে? বাবাও বারণ করবে না মাকে। ভালো লাগে বোঁচকা নিয়ে বেড়াতে!
পিতুমাসিকে বাড়িতে রেখে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। পাহাড়ের রাস্তায় মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো সিঁড়ি পড়ে। পাইনের বনকে রাস্তার দু’পাশে রেখে আমরা একটু একটু ভেজা ভেজা ঝকঝকে পরিষ্কার রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি।
আমাদের বাড়ি পাহাড়ের একটু উঁচুতে। সঞ্চারদের বাড়ি একটু নিচে। পাহাড়ে এমনটাই হয়। সব বাড়িতে গাঁদাফুল ফুটে হলুদ হয়ে আছে। পাহাড়ে নাম না জানা কত ফুল! ছোটো ছোটো সাদা, হলুদ, গোলাপি নানারঙের ফুলে পাহাড় এসময় সেজে থাকে। এরপরে শীত এলে পাহাড়ে পাউডার-ফুল ফুটবে। বেগুনি বেগুনি ফুলের পাতার ভেতরে পাউডার ভরা থাকে। কী সুন্দর গন্ধ!
সঞ্চারদের বাড়ির কাছাকাছি এসে বাবা বাঁদিকের সরু পথটার দিকে তাকিয়ে ফের শ্বাস ফেলল। আমি জানি, ওদিকেই আছে বাবার পিসি মধুদিদির বাড়ি, পিসির মেয়ে কাঞ্চনবর্ণার বাড়ি। বাবার ইচ্ছে করে ওদিকে যেতে। আহা! নিজের জনের জন্য মনকেমন তো করেই! মানুষ তো!
“অ্যাই, আমরা এসে গেছি!” সঞ্চারদের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে বেগম চেঁচিয়ে উঠে হাত নাড়ল।
আমি বাবার হাত ছাড়িয়ে ছুট লাগালাম। কী মজা! আজ আমরা খুব মজা করব। আমাকে দেখতে পেয়ে অলীক, শ্রীজাত, সুস্নাত সবাই বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে চেঁচামেচি শুরু করেছে। সঞ্চারকে দেখতে পাচ্ছি না এখান থেকে। আহা, ও আসতে পারেনি বারান্দায়! না পারুক, আমি গিয়ে ওকে সিডিদুটো দেব। তারপর ও কত যে খুশি হবে সে আমি বুঝতে পারছি।
এরপরে সে যে কী হাসি, মজা, গল্প, আড্ডা! ওদিকে মা-বাবাদের আসর বসেছে। ওরা কফি খাচ্ছে, স্ন্যাকস খাচ্ছে। আমরা প্রাণভরে কাজু দেওয়া পায়েস খাচ্ছি। ক্ষীরের লাড্ডু খাচ্ছি। আর  ডিমের ডেভিল। সঞ্চারদের বাড়িতে আজ সঞ্চারের লতিমাসি এসেছে। এসেই চমৎকার ডিমের ডেভিল বানিয়েছে। আর চারপাশে ময়দার বিনুনি করা মটরশুঁটির কচুরি। লতিমাসিকে দেখতে কী সুন্দর! ধপধপে ফর্সা। ইয়া মোটাসোটা। চুলে বার্গান্ডি কালার। কানে দুটো সবুজ পাথরের দুল। আমাকে পায়েস থেকে কাজু বেছে দিল লতিমাসি। আমার দিকে তাকিয়ে সুন্দর হেসে বলল, “হাই রাসেল, কেমন আছ?”
আমি কাজু খেতে খেতে ঘাড় নাড়লাম, ভালো আছি।
“ঠাণ্ডা লাগিও না কিন্তু।”
“আচ্ছা।” আমি হাসলাম। আর তখনই দেখলাম, বাবা কাচের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বাবার কি মনখারাপ? সকলের থেকে আলাদা হয়ে একা দাঁড়িয়ে কেন বাবা?
সারা বিকেল পার করে ফিরে আসব যখন, সঞ্চার গেম নিয়ে বসল। আমি বলেছি, আগে দেখে নিয়ে তারপর যেন আমাকে ফোন করে জানায় কেমন লাগল গেমটা।
ফিরে আসতে আসতে আমি পেছন ফিরে তাকিয়ে সঞ্চারকে দেখলাম। ও মন দিয়ে গেম খেলতে বসেছে। আমার খুব ভালো লাগল। কেউ যদি খুশিতে থাকে, আমার ভালো লাগে। আমি সবাইকে ভালো থাকতে দেখতে চাই। বাবাও আমাকে এমন করে ভাবতে বলে। আমি যে বাবাকে ভালোবাসি! তাই বাবার কথা আমার খুব মনে থাকে।
এখন বিকেল শেষ হয়ে সন্ধে নামছে। পাহাড়ে তাড়াতাড়ি সন্ধে নামে। দূরে দূরে পাহাড়ের গায়ে আলো জ্বলে উঠেছে। উলটোদিক দিয়ে কারা আসছিল। পাহাড়ি মানুষ। সারাদিনের কাজের শেষে ঘরে ফিরে যাচ্ছে। গল্প করতে করতে যাচ্ছে। এবছর মকাই ভালো হয়েছে বলে ওরা খুশি। বাবাকে দেখে ‘নমস্তে’ করল। বাবাও ‘নমস্তে’ করেছে। আমিও। মাও।
আমরা বাঁদিকের রাস্তায় এসে পৌঁছতেই বাবা দূরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে শ্বাস ফেলল ফের। আমার মনে হল, আজ বাবার মনটা বেশ খারাপ। কেন যে আজ বাবার দুঃখ হয়েছে, আমি বুঝতে পারছি না। কিন্তু বাবা কি দুঃখই পাবে আর শ্বাস ফেলবে?
আমি একছুটে বাঁদিকের সরু রাস্তায় নেমে পড়লাম। হুড়হুড় করে নামছি তো নামছি। পাহাড়ের রাস্তায় নামতে হলে এভাবেই নামতে হয়। ওঠার সময় কষ্ট হয়। আমি নামতেই বাবা-মা দু’জনেই আমার পেছন পেছন নেমে এল। মা চেঁচাচ্ছে, “এই রাসেল, কোথায় যাচ্ছিস?”
আমি জানি, বাবা এবারে আসবে আমার পেছন পেছন। আমি ছুটছি। একটা সময় বাবা আর মা আমাকে ধরে ফেলল। আর ধরে ফেলতেই আমি মজা করলাম, “এবারে মধুদিদির বাড়িতে চলো। যেতেই হবে। আমি মধুদিদিকে দেখব, বাবা।”
মা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাতে বাবা অস্বস্তিতে পড়ে গেল। আমি বললাম, “আমার মধুদিদিকে দেখতে ইচ্ছে করছে। কাঞ্চনবর্ণাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। নিয়ে চলো এখনই।”
তারপর আমরা তিনজন পাহাড়ের উঁচুনিচু পথ বেয়ে চোরবাঁটো দিয়ে একটা সুন্দর ফুলে ভরা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম। ওহো, এখন আবার তোমাদের চোরবাঁটো কী সেটা বলা হয়নি। চোরবাঁটো হল শর্টকাট। তো সেই চকোলেট কালারের দরজায় একটা খুদে আলো জ্বলছিল। আমরা গিয়ে দাঁড়াতে বাবা বেল বাজিয়ে দিল। আর বাড়ির ভেতর থেকে কে যেন আসছে টের পেলাম। সে সিঁড়ি বেয়ে নামছে। দরজার দিকে আসছে। খুট।
দরজা খুলে গেল। একজন ছোট্টখাট্টো তুলতুলে ফর্সা লাল গাল দিদা দাঁড়িয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে। বাবা একটাও কথা বলছিল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। মা একটু থেমে থেমে বলল, “আপনি আমাদের চিনতে পারেননি, পিসি?”
আমি অবাক। এই তাহলে মধুপিসি? ভারি সুন্দর তো!
সেই তুলতুলে দিদা মুখ ভারী করে উত্তর দেন, “চিনব কী করে? বারো বছর হয়ে গেছে দেখা নেই। অথচ এই সামনেই থাকো।”
“আমরা কি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকব?” বাবা শান্ত গলায় কথা বলছে।
“তা কেন? এস।” বলে মধুদিদি দরজা থেকে সরে দাঁড়াল। আমরা ভেতরে ঢুকেই কুকি বিস্কুটের গন্ধ পেলাম। দিদার কুকি বিস্কুটের ব্যাবসা। ম্যালের দোকানদারেরা দিদার থেকে কুকি নিয়ে যায়। বেশ সুন্দর গন্ধ। আমার গালে আলতো হাত দিয়ে মধুদিদি বলল, “এই বুঝি সে?”
“হ্যাঁ। এ-ই তো জোর করে এল। তোমাকে দেখতে মন চাইছিল ওর।”
“আর কাঞ্চনবর্ণাকে।” আমি জানালাম।
বলতেই একটি কুচকুচে কালো মহিলা হাসতে হাসতে সিঁড়ি বেয়ে ওপরতলা থেকে নেমে এল। এই কি কাঞ্চনবর্ণা?
“কত বড়ো হয়ে গেছ, কাঞ্চনবর্ণা!” বাবা খুব খুশি হল কাঞ্চনবর্ণাকে দেখে। শুনলাম, দু’জনেই একবয়সের। বন্ধু।
আমার দাদু নাকি পিসির কালো মেয়ের নাম রেখেছিল কাঞ্চনবর্ণা। দাদুর ভাগনি মানে নিস হয় কাঞ্চনবর্ণা। সেই নাম দেওয়া নিয়ে অপমানে পিসির সঙ্গে তার দাদার মানে আমার দাদুর তীব্র মতানৈক্য। আর তা থেকে এতদিনের ঝগড়া। কালো মেয়ের নাম কাঞ্চনবর্ণা?
“তাহলে নাম পালটে নিলেই হত।” বাবা নিচু গলায় পিসিকে অনুরোধ করে।
“করেছিল তো। আমার স্কুলিংয়ের সময়ে নাম রাখা হল শ্যামা। আমি বলেছি, মামার দেওয়া নামটাই থাক। ওটাই ঢের ভালো শ্যামার চে’। আমি কালো তো কী হয়েছে? কাঞ্চনবর্ণা নামটার মধ্যে তো কালো নেই। পুরোটাই সোনার রঙ। কী ভালো নাম, বল?”
উফ্‌! এরপরে কত যে আনন্দের কান্না, কত যে হাসি, কত কুকি খাওয়া! আর আদর।
বাড়িতে ফিরে আসতে আসতে ফের বৃষ্টি। আমি আগে আগে হাঁটছি বলে ভিজে গেলাম একটু। এতেই মা কেঁদেকেটে একশা। এখন কী হবে? বাবাও দেখলাম বড্ড ভয় পেয়েছে। ওরা তাড়াহুড়ো করে বাড়িতে এসে ঢুকল আমাকে নিয়ে। ডাক্তারকে ফোন করছে মা। আমি হাসছি ওদের কাণ্ড দেখে। আরে, ভয়ের কী আছে? আমার শরীরের দু-চারটে পার্টস হয়তো চেঞ্জ করতে হতে পারে। ভিজে গেলে শরীরের ভেতরের নরম কিছু তন্তুর ক্ষতি হয়। তাতে কী? আজকাল কিডনি, হাত,পা, হৃৎপিন্ড সবই পালটে নিচ্ছে মানুষ। আমি রোবো বলে ভয় কী? পার্টস পালটে দিও।
ঘুম পাচ্ছে। ঘুম-চোখে শুনতে পেলাম, কাল ল্যাবে যেতে হবে। সেই যে পুলকার উলটে একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল, সেদিন সঞ্চারের পাদুটো কেটে বাদ দিতে হয়েছিল কিনা। আর আমি, বেগম, অলীক মরেই গেছিলাম। তাই তো বাবা হুবহু আমাদের নিয়ে এসেছে, যারা হুবহু আসল অলীক, বেগম আর রাসেলের মতো।
কাল আবার যেতে হবে। এখন একটু রেস্ট। যাক বাবা, সব মতানৈক্য কেটে গেছে। খুব শান্তি বোধহয় একেই বলে।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ শুভ্রদীপ চৌধুরী

4 comments:

  1. পড়ে ফেললাম আপনার গল্পটা। শেষে এসে এমন একটা জব্বর ঝাঁকুনি অপেক্ষা কয়াছিল, কে জানত। আপনি জাত লিখিয়ে। সায়ন্সফিসনের এলিমেন্টক এমন মানবিকভাবে কাজে লাগান জাত শিল্পীর লক্ষণ। এর আগেও আপনার গল্প পড়ে ভালো লেগেছিল। আবারো ভালো লাগল। আরো প্রতীক্ষায় রইলাম।

    ReplyDelete
  2. দারুণ লাগলো দিদি। চমক একেই বলে!😊

    ReplyDelete