গল্পঃ কিন্নরের নীলাঃ অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

কিন্নরের নীলা

অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়



বুবাইমামা আমার মায়ের মামাতো ভাই। তার যেমন কসরত করা পেটানো চেহারা, তেমনি সম্ভ্রম জাগানো সাহস। সাধারণত পরেন নীল জিন্সের প্যান্ট আর হাফ হাতা পাঞ্জাবী, পায়ে স্পোর্টস শু। চৌকো নিখুঁত কামানো মুখ আর উন্নত নাকের পাটা দেখলে তার আত্মপ্রত্যয় নিয়ে কোনও সংশয় থাকে না। বুবাইমামা বাড়িতে এলে হৈ হৈ পড়ে যায়। আমারা তিন ভাইবোন গোল হয়ে তাঁকে ঘিরে বসে পড়ি গল্প শোনার আশায়। বাড়ির বড়োরাও তাকে নিয়ে কাড়াকাড়ি ফেলে দেয়।
বুবাইমামা বিয়ে করেননি। পেশায় ভূতাত্ত্বিক। পাহাড়-জঙ্গল নিয়েই তাঁকে ব্যস্ত থাকতে হয়। সেসব অভিজ্ঞতার কথা গল্পের মতো বলে যান একটানা। সেবার কিন্নর থেকে ফেরার পর মা বললেন, “কী রে বুবাই, এবার কী আছে তোর ঝুলিতে চটপট বার করে ফেল দেখি।”
কথা বলতে বলতে মা বিরাট একবাটি পেঁয়াজ-কাঁচালঙ্কা দিয়ে মাখা মুড়ি আর একটা প্লেটে তেলেভাজা রেখে দিতেই মামার মুখে হাসি আর ধরে না।
“এইজন্যই তোমাকে ভালো লাগে, দিদি। মুড়ি আর তেলেভাজা না হলে গল্প জমে? দু’কাপ চা কিন্তু চাই এরপর।”
“হবে, হবে। তুই শুরু কর দেখি।” বলে মা আমাদের তিন ভাইবোনের সাথে জমিয়ে বসে পড়লেন।
“এবার গিয়েছিলাম কিন্নর, বুঝলে। সেখানে এক মস্ত বাঁধ তৈরি হবে। সতলুজ, মানে সংস্কৃত আর বাংলায় যাকে বলে শতদ্রু নদী, সেই বিশাল স্রোতস্বিনীর উপর বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ তৈরি হবে। সিমলা থেকে প্রায় তিনশো কিলোমিটার দূরে সেই বাঁধ তৈরি হচ্ছে। আমরা গিয়েছিলাম তার ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ করতে। অর্থাৎ, সেই জায়গার পাথরের বিশ্লেষণ করে তার উপর বাঁধ তৈরির উপযুক্ততা পরীক্ষা করতে। সিমলা থেকে আমাদের গাড়ি চলল পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে। একপাশে নিশ্ছিদ্র পাথরের দেওয়াল, আর একদিকে গহিন খাদ। কোথাও পাহাড়ি ঝরনা উপর থকে লাফিয়ে পড়ে নেবে গেছে গভীর গিরিখাদে, কোথাও গভীর জঙ্গলে। পথে রাস্তা কোথাও বিপজ্জনকভাবে তীব্র বাঁক নিয়েছে।”
বুবাইমামা তেলেভাজাতে কামড় বসানোর জন্য থামতেই আমি প্রশ্ন করে ফেললাম, “নদীটা কোথায় গেল, মামা?”
“ঠিক ধরেছিস। নদীটার কথা বলতেই ভুলে গেছি। নদীটা রাস্তার পাশ দিয়ে আনেক নিচে বয়ে চলেছে প্রচণ্ড গর্জন করে। তার অপর পারেও অনেক উঁচু পাহাড়ের দেওয়াল। সবুজে ঢাকা পাহাড়। নানারকম লতাপাতা আর গাছগাছালিতে ভরা। এত নিচে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকার জন্য বুকে পাটা থাকা দরকার। আমাদের অভ্যেস আছে। তাও সেই বুনো সৌন্দর্য দেখে অবাক হয়ে চেয়ে আছি দু’চোখ ভরে। পাহাড়ি গ্রাম বলে রাস্তার দু’পাশে কিছু চোখে পড়ে না। পাহাড়ের মাথায় মাথায় বিক্ষিপ্তভাবে দুয়েকটা ঘরবাড়ি নজরে আসে। রাস্তার পাশে দশ-বিশ কিলোমিটার চলার পর ছোটো ছোটো জনপদ চোখে পড়ে। খুব গরিব সেখানকার মানুষজন। সভ্যতার আলো এখনও সেসব জায়গায় পুরোপুরি ঢোকেনি। যাই হোক, পাহাড়ে সন্ধ্যা নেবে এল। দিনের আলো চলে যেতেই জাঁকিয়ে শীত করতে লাগল। পাহাড়ের মাথায় মাথায় সূর্যের লাল আলো একসময় নিভে এল। জঙ্গল যেন ঢুকে পড়ল আমাদের গাড়ির ভিতরেও।”
ভাই জিজ্ঞেস করল, “মামা, বাঘ দেখা যায় না ওখানে?”
বুবাইমামা হেসে ফেলে বললেন, “বাঘ অত উপরে থাকতে পারে না। ওখানে চিতা-টিতা দেখা যায়। তবে আমি দেখতে পাইনি। সেটা নিয়ে আজকের গল্প নয়। এখনও সে-কথায় আসিনি। এবার যা একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে, সারাজীবন মনে থেকে যাবে।”
দিদি বলল, “সেটাই বলো না। আর ধৈর্য রাখতে পারছি না।”
“গল্পের ভণিতা না থাকলে জমবে না। আর একটু অপেক্ষা কর। সবটা বলব।” বলে চায়ের কাপে লম্বা চুমুক দিয়ে আবার শুরু করল মামা।
অন্ধকারে গাড়ি এসে পাকদণ্ডী রাস্তা দিয়ে একটু উপরে থামল একটা ফাঁকা জায়গায়। চারদিকে তার পাহাড় ঘেরা। নদী দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তার গর্জন শোনা যাচ্ছে। গাছের মাথা ছাড়িয়ে চাঁদ উঁকি দিচ্ছে পরিষ্কার আকাশে। নাক জমে ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। সামনে গেস্ট হাউসের আলো। গাড়ি থেকে নামতেই মাফলারে কান-মাথা ঢাকা চৌকিদার গাড়ির পিছনের বনেট থেকে আমার ব্যাগ নামিয়ে নিয়ে গেল। ঠাণ্ডার জায়গায় সাধারণত কাঠের মেঝে হয়। এখানেও তাই। কাঠের মেঝেতে নিজের পায়ের আওয়াজে নিস্তব্ধ গেস্ট হাউসটা যেন জেগে উঠেছে।
পুরো গেস্ট হাউসে আমি আর চৌকিদার ছাড়া আর কেউ নেই। যে লোকটি আমাকে নিতে কালকা স্টেশনে এসেছিল, সে অনেক আগেই বিদায় নিয়ে চলে গেছে। রাতের খাবার বেড়ে দিয়ে চৌকিদার একটু দূরে উবু হয়ে বসে আমার খাওয়াদাওয়ার তদারকি করছে। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, গেস্ট হাউসের রাঁধুনি এখান থেকে সাত মাইল দূরে গ্রামে থাকে। সন্ধে সন্ধে রান্নার পাট চুকিয়ে সে বাড়ি চলে যায়।
খাওয়াদাওয়া করে গেস্ট হাউসের বাইরে পায়চারি করছি। বাইরে বেজায় ঠাণ্ডা। কিন্তু ঘুরতে ভালো লাগছে। অন্ধকারে বিশাল বিশাল গাছগুলো যেন ঝুঁকে পড়ে আমাকে দেখছে। নতুন অতিথি বলে হয়তো। এমন সময় দেখি চৌকিদার হাত জড়ো করে আমার সামনে দাঁড়িয়ে। জিজ্ঞেস করলাম, কিছু বলবে? সে হঠাৎ শব্দ করে কেঁদে উঠল। আমি হকচকিয়ে তাকে আশ্বস্ত করবার চেষ্টা করলাম। কান্না থামিয়ে জানতে চাইলাম সে এমন ভেঙে পড়েছে কেন। সে জানাল, তার ছেলেকে ক’দিন ধরে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার ছেলে এখানকার বাঁধ তৈরির কাজের বরাত পাওয়া ঠিকেদারের কাছে শ্রমিকের কাজ করে। পুলিশ থানায় রিপোর্ট করেও লাভ হয়নি। ইঞ্জিনিয়ার সাহেবরা বলেছে, এটা ঠিকেদারের সমস্যা। তারা নাক গলাবে না। কলকাতা থেকে আসা আমার মতো সাহেব দেখে চৌকিদারের অনেক ভরসা হয়েছে। নিশ্চয়ই তার ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যাবে। ভরসা দিয়ে শুয়ে পড়লাম। ক্লান্তিতে চোখ ভেঙে এল ঘুমে।
সকালে ঘুম ভাঙতে দেখি বেজায় শোরগোল। কাজের দিন, তাই ব্যস্ততা। গেস্ট হাউস লাগোয়া বাঁধ কর্তৃপক্ষের চিফ ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের অফিস। তার সাথে মিটিং করে কাজকর্ম বুঝে নিয়ে গাড়িতে উঠতে যাব, চৌকিদার শুকনো মুখে সামনে এসে দাঁড়াতে ওর হারিয়ে যাওয়া ছেলের কথা মনে পড়ে গেল। বেচারা চোখের কোল মুছছে। মনখারাপ নিয়ে কর্মস্থলে এলাম। আমার সাথে অল্পবয়সী সদ্য কাজে যোগ দেওয়া এক ইঞ্জিনিয়ার। মধ্যপ্রদেশে বাড়ি। তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারলাম না বিশেষ কিছু। জানতে পারলাম, হারিয়ে যাওয়া ছেলেটার নাম বুধিয়া। ঠিকেদারের কাছে তদ্বির করে চৌকিদার বুধিয়াকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছিল। পড়াশুনো না করে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াত ছেলেটা। কাজকর্ম বিশেষ কিছু না জানাতে ঠিকেদার তাকে আনস্কিল্ড লেবারের কাজে লাগিয়ে দেয়। বুধিয়া মুখচোরা ছেলে। মুখবুজে একটানা কাজ করে যেত বলে কোনও অভিযোগ ছিল না ওর বিরুদ্ধে। তাই হঠাৎ বুধিয়ার হারিয়ে যাওয়ার খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। লোকাল পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠছে শ্রমিকদের মধ্যে।
গাড়ি থেকে নামলাম কর্মস্থলে। এখানে বাঁধ তৈরি হবে বলে খুব কাজের ব্যস্ততা। পাকা রাস্তা থেকে বাঁদিকে নেমে গেছে অনেক সিঁড়ি, নদীর দিকে। প্রায় হাজার খানেক সিঁড়ি সোজা নেবে গিয়ে শেষ হয়েছে একটা নির্মাণরত টানেলের মুখে। শতদ্রু নদীতে বালি প্রচুর। বাঁধ দিয়ে যে জল টারবাইনে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বিদ্যুৎ তৈরির জন্য, তাতে বালি থাকলে চলবে না। নদীর জলকে টানেলের ভিতর পাঠিয়ে দেওয়া হবে বালি পরিস্রুত করবার জন্য একটা প্রকাণ্ড চেম্বারে।
কথা বলতে বলতে নিচে নাবছি। ঠাণ্ডা বাতাস তীক্ষ্ণ হয়ে আমার মোটা জ্যাকেটের মধ্যে দিয়ে ঢুকে পড়ছে। গর্জন করে প্রায় তিন-চারশো মিটার নিচে দিয়ে বয়ে চলেছে শতদ্রু নদী। টানেলের মুখটাতে চাতলের মতো একটা জায়গা। টানেল বানানোর কাজ পুরো দমে চলছে। মানুষের ভিড় জটলা পাকিয়ে আছে। টানেলের ভিতরে ঢুকে আমাকে পাথরের গুণাগুণ পরীক্ষা করতে হবে। কাজেই ইঞ্জিনিয়ার সাথীকে নিয়ে ঢুকে পড়লাম। টানেলের ভিতরে গরম। বাইরে যেখানে মাইনাস পাঁচ ডিগ্রি ঠাণ্ডা, টানেলের ভিতরে তাপমাত্রা প্রায় চল্লিশ ডিগ্রি। তার মানে, এখানে পাথর ফাটিয়ে উষ্ণ প্রস্রবণ বয়ে চলেছে কোথাও কোথাও। একশো মিটার টানেলের ভিতরে হেঁটে গিয়ে তারপর একজায়গায় জামাকাপড় খুলে রাখতে হল। হাফ প্যান্ট আর টি-শার্ট পরে হাঁটতে শুরু করলাম।
এখানে পাথরের রঙ সাদা দুধের মতো। এই পাথরকে বলা হয় কোয়ার্জাইট। এই পাথর খুব শক্ত হয়। পাহাড়ের ভিতর ড্রিল করে ফুটো তৈরি করা হয়। তারপর সেই গর্তগুলোতে জিলেটিন ভরে দেওয়া হয়।  ডেটনেটরের সাথে তার জুড়ে দিয়ে ইলেকট্রিক কারেন্ট পাঠালে বিস্ফোরণ হয় আর পাথর টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যায়। এইভাবে পাহাড়ের গায়ে টানেল তৈরি করা হয়। আমি যে টানেলে কাজ করতে ঢুকেছি, সেটা লম্বায় প্রায় সাতশো মিটার পর্যন্ত তৈরি হয়ে গেছে। টানেলের ভিতরে রেললাইন পাতা। পাথর ভাঙা হয়ে গেলে পাথরের চাঁই ট্রলিতে চাপিয়ে বাইরে নিয়ে এসে নিচে নদীতে ফেলে দেওয়া হচ্ছিল তখন।
যা ভেবেছিলাম, ঠিক তাই। টানেলের ভিতর পাথরের ফাটল দিয়ে গরম জল এসে বয়ে চলেছে। এই জলের বাষ্প চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় প্রচণ্ড ঘাম হচ্ছে শরীরে। কে বলবে বাইরে হাড় হিম করা ঠাণ্ডায় মানুষ কুঁকড়ে যাচ্ছে!
সাবধানে হেঁটে চলেছি আমরা। পাথরের ঠোকরের হাত থেকে মাথা বাঁচাতে হচ্ছে। কোয়ার্জাইট পাথরের ছুঁচালো মুখ বেরিয়ে আছে সর্বত্র। গুমগুম শব্দ করে পাথরভর্তি ট্রলি এল। সরে দাঁড়ালাম। তিনটে কুলি ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। আমার সঙ্গে থাকা ইঞ্জিনিয়ার বলে উঠল, “বুধিয়াকে কুলির কাজ দেওয়া হয়েছিল এখানে।”
আমি কিছু না বলে আমার কাজ করতে লাগলাম। বুধিয়াকে খোঁজার জন্য তো আমাকে পাঠানো হয়নি এখানে। তাই মনে মনে ঠিক করলাম, বুধিয়ার কথা মাথা থেকে তাড়িয়ে দেওয়াই ভালো। জিওলজিক্যাল কম্পাস আর অন্যান্য যন্ত্র নিয়ে কাজ করতে থাকলাম। একসময় টানেলের শেষপ্রান্তে এসে পৌঁছলাম। পাথরের দেওয়ালে জ্যাক হ্যামার লাগিয়ে ড্রিলিং চলছে। জিলেটিন ভরে খুব সম্ভব আজই ব্লাস্টিং করা হবে। কাজ থামিয়ে শ্রমিকেরা আমাকে নমস্কার করে সরে দাঁড়াল। ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটি ম্যাপ বার করে আমার সামনে খুলে ধরল। আমি কাজে ডুবে গেলাম।
আমার ব্যাগ এতক্ষণ বয়ে নিয়ে আসছিল যে ছেলেটি, সে আমার সামনে চায়ের কাপ এগিয়ে দিল। উজ্জ্বল আলোয় তার মুখ দেখতে পেলাম। বড়ো কমনীয় মুখ। বয়স আঠারো-উনিশের দরজায়। চা খেতে খেতে কাজের কথা বলছি। ব্যাগের মধ্যে থেকে জিওলজিক্যাল কম্পাস বার করে টানেলের দিকনির্ণয় করে ম্যাপ দেখে মিলিয়ে নিচ্ছি তার গতিমুখ ঠিক আছে কি না। হঠাৎ মাথার উপরে আলোর বালবটা শব্দ করে ফেটে গেল। চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। টানেলের মধ্যে এমন মাঝে মধ্যে হয়ে থাকে। পাথরের ফাটল দিয়ে চুইয়ে পড়া জল গরম হয়ে ওঠা ইলেকট্রিক বালবের উপর পড়লে শব্দ করে বালব ফেটে যায়। সেটা নতুন নয়। অন্ধকারে কিছু দেখতে পাচ্ছি না। ব্যাগ থেকে টর্চ বার করে জ্বালাতে যাব, আমার কনুইতে টান পড়ল। তাড়াতাড়ি টর্চ জ্বালিয়ে দেখি, আমার ব্যাগ বয়ে নিয়ে আসা ছেলেটি আমার মুখের দিকে নির্নিমেষ নয়নে তাকিয়ে। জিজ্ঞাসা করলাম, “ক্যায়া হুয়া, কুছ বাত করনি হ্যায়?”
সে মুখের উপর আঙুল তুলে আমাকে চুপ করতে বলে এদিক ওদিক তাকিয়ে আবার আমার কনুয়ের কাছ ধরে টান দিয়ে কিছু ইশারা করতে চাইল। আমার অন্য সঙ্গীরা তখন নতুন বালব লাগানোর জন্য শ্রমিকদের ধমক-ধামক দিতে ব্যস্ত। ছেলেটি আমাকে টানেলের অন্যদিকে টেনে নিয়ে গেল। তারপর পাথরের দেওয়ালের দিকে ইশারা করল। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম উদ্দেশ্যটা। পাথরের দেওয়ালের গায়ে বিশাল এক গর্তের দিকে ইশারা করল। সাদা কোয়ার্জাইট পাথরের উপর টর্চের আলো পড়ে ঝকঝক করে চমকে উঠল। এখানে দেওয়ালের উপর থেকে কেউ যেন খাবলে খানিকটা পাথর সরিয়ে নিয়েছে মনে হল। জায়গাটাকে কোনও বিশাল শক্তি দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছে। পাথরের দেওয়ালে ঘূর্ণির সৃষ্টি হয়েছে। একেই ভূতত্ত্বের ভাষায় বলা হয় ‘শিয়ার জোন’। চারপাশের পাথরের স্তরের চাপে একরকম ঘূর্ণির মতো সৃষ্টি হয়। বইতে পড়েছিলাম। আজ চোখের দেখা দেখে মিলিয়ে নিলাম। খালি হাতেই পাথরের দেওয়াল থেকে পাথরের অনেক টুকরো অনায়াসে সরিয়ে দেওয়া গেল। টর্চ দিয়ে চারপাশ আরও ভালো করে পর্যবেক্ষণ করছি। ইঞ্জিনিয়ার আর ওভারসীয়ার এসে হাজির হওয়ায় সেই ছেলেটি উধাও। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, আমার ব্যাগ বহন করে টানেলের বাইরের দিকে সে রওনা দিয়েছে। কিছু একটা না বলা রহস্য ছেড়ে রেখে গেছে আমার জন্য।
এই পর্যন্ত বলে বুবাইমামা থামল। আমরা ভাইবোনেরা চেঁচিয়ে উঠলাম, “তারপর, তারপর!”
বুবাইমামা হাত তুলে আমাদের আশ্বস্ত করে বলল, “বলছি দাঁড়া, আগে আরেক কাপ চা খেয়ে গলা ভিজিয়ে নিই। শুকনো গলায় গল্প বলা যায় নাকি!”
মা দৌড়ে গেল চা করতে। আমি বললাম, “আচ্ছা, এই ফাঁকে শিয়ার জোন না কী বললে, ওই ব্যাপারে কিছু বলো না!”
বুবাইমামা বলল, “পাথরের স্তরের ভিতর ফাটল বা জোড়কে বলা হয় ফল্ট। এই ফাঁকা জায়গাটা থাকলে সেখানে চাপ সৃষ্টি করে আশেপাশের ভূস্তর। ফলে পাথরের স্তর চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যায়। পাথরের স্তরের ঘূর্ণন আর চাপে প্রবল তাপের সৃষ্টি হয়ে রাসায়নিক বিক্রিয়া হয়। তবে একদিন দু’দিন নয়, হাজার হাজার বা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে।”
মা চায়ের কাপ নিয়ে ঢুকতেই বুবাইমামা আবার শুরু করল।
গেস্ট হাউসে ফিরে আসতে রাত হয়ে গেল। জাঁকিয়ে বাইরে ঠাণ্ডা থাবা গেড়ে বসেছে। নিচে কুলিবস্তিতে ঢোল বাজিয়ে গান চলছে জোর। বাতাসের ঝাপটায় কখনও সেই গানবাজনা পাহাড়ের গায়ে গায়ে আছড়ে বেড়াচ্ছে, কখনও ক্ষীণ হয়ে আসছে। হাজার খানেক সিঁড়ি ভাঙা পরিশ্রমে ক্লান্ত শরীর। গেস্ট হাউসের লবিতে বসে চায়ের অর্ডার করে বসে আছি। আমার ব্যাগ ঘাড়ে বয়ে সেই ছেলেটা আমাকে নমস্কার করে ব্যাগটা টেবিলে নাবিয়ে রেখে দাঁড়িয়ে রইল। জিজ্ঞাসা করলাম, “ক্যায়া দিখা রহে থে উস সময়?”
ছেলেটা বেজায় ভয় পেয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগল। ওর ঠোঁট কাঁপতে লাগল।  কাঁধে হাত দিয়ে বসতে বললাম। আমার পায়ের সামনে মাটিতে বসে পড়ল। চৌকিদার চায়ের কাপ আমার সামনে রাখতে ওকে ইশারায় চলে যেতে বললাম। চৌকিদার সন্দেহের চোখে ছেলেটিকে দেখতে দেখতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
ছেলেটার নিজের নাম জানাল সুনীল। চৌকিদারের হারিয়ে যাওয়া ছেলে বুধিয়ার সাথে একসাথে ঠিকাদারের কাছে কাজ করে। অন্যদিনের মতো সেদিনও বুধিয়া আর সুনীল টানেলের ভিতর পাথর সরাবার কাজ করছিল। ট্রলিতে পাথর ভরবার দায়িত্ব ছিল ওদের। একটু পুরনো যারা তারা পাথরভর্তি ট্রলি বাইরে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল। টানেলের ভিতর যে জায়গাটায় সুনীল আমাকে টেনে নিয়ে যায়, অর্থাৎ শিয়ার জোনের কাছে, সেখানেই দু’জনে কাজ করছিল। ভাঙা পাথরের টুকরোর ভিতর বুধিয়া নীল রঙের পাথর দেখতে পেয়ে অবাক হয়ে সুনীলকে দেখায়। সুনীলের মনে হয়েছিল সেই পাথরের দুয়েক জায়গা থেকে যেন আলো ঠিকরে পড়ছিল। বুধিয়ার হাত থেকে নিয়ে দেখেও ছিল। সাদা পাথরের ভিতর নীল রঙের পাথরের টুকরোটা ছিল একদম আলাদা ধরনের। পাথরটা হাতে নিয়ে বুধিয়া বলেছিল, ওটার দাম অনেক। সুনীলেরও তাই ধারণা। ঠিকেদার তখন টানেলের বাইরে কোনও কাজ পড়ে যাওয়ায় অকুস্থলে ছিল না। পাথরটা প্রায় আধহাত খানেক লম্বা হওয়ায় বুধিয়া পকেটে না রেখে হাতেই রেখে দেয়। বলেছিল, ঠিকেদার সাহেবকে জানাতে হবে। নাহলে বুধিয়াকে সবাই চোর ভাববে। তারপর থেকে বুধিয়া নিখোঁজ হয়। ঠিকেদারের গোচরে ঘটনাটা না আসায়, সুনীলের কথা বিশ্বাস না করে ওকে চুপ থাকতে উপদেশ দেয় ঠিকেদার।
সুনীলের কথায় গোটা ব্যাপারটা এক লহমায় জানা হয়ে গেল আমার। আসলে শিয়ার জোনের ভিতরে তৈরি হয় নীলা। বাইরের বাজারে ওই আকৃতির নীলার দাম লক্ষাধিক। কাজেই বোঝা গেল, কোনও বদমায়েশের পাল্লায় পড়েছে বুধিয়া। সুনীলকে পরের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলে আশ্বস্ত করলাম এই বলে যে বুধিয়াকে খুঁজতে যথাসাধ্য করব আমি। তবে অনেক ভোরে আমার সাথে যেতে হবে টানেলের ভিতর।
পরদিন খুব সকালে তখনও আলো ফোটেনি, সুনীল আমার জানালায় টোকা দিতে বেরিয়ে পড়লাম। সাথে সরকারি গাড়ি নিইনি। তাহলে আমার এই গোপন অভিযান জানাজানি হয়ে যেত। ভূতাত্ত্বিকদের সুবিধা হচ্ছে সবসময় পিঠে ঝোলানো ব্যাগে একটা হাতুড়ি থাকে। ভেবে দেখলাম, বিপদে পড়লে আত্মরক্ষার্থে ব্যবহার করা যাবে। বাইরে শীতের থাবা গালের মাংস খুবলে নিচ্ছে মনে হল। আন্দাজে, অভিজ্ঞতায় বুঝলাম মাইনাস ছয় বা সাত ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি হবে তাপমাত্রা। আমার গায়ে ওভার কোট, মাথা বাঁচাতে মাঙ্কি ক্যাপ। সে সময়ে আমাকে খুব কিম্ভূত লাগছিল বুঝেও কিছু করার ছিল না। সুনীলের পেটের কাছটা ফোলা দেখে বুঝতে পারছি, ওর ফিরনের নিচে কাংরি ঝোলানো। কাংরি একটা মাটির তৈরি পাত্র, যার মধ্যে জ্বলন্ত কাঠকয়লা রাখা থাকে। কাংরির উত্তাপ শরীর গরম রাখে।
গেস্ট হাউসের পাক খেয়ে নামা রাস্তায় বরফ জমে পিছল হয়ে আছে। রাতের দিকে বরফ পড়েছে। সদ্য বরফ হলে পেঁজা তুলোর মতো জমে থাকত। আমার পায়ের চাপে বরফ গুঁড়ো হয়ে ভেঙে যাবার শব্দে চমকে উঠছি নিজেই। সুনীল দৌড়ে নিচে নেমে গিয়ে বড়ো রাস্তায় পৌঁছে গেছে। পা পিছলানোর ভয়ে আমাকে ধীরে নামতে হচ্ছে।
নিচে বড়ো রাস্তায় নেমে হাঁটতে শুরু করলাম যেদিকে বাঁধের কাজ হচ্ছে। কনকনে হাওয়ায় কান ব্যথা করতে শুরু করল। পাহাড়ি ছেলেটা এত জোরে জোরে হাঁটছে, ওর সাথে তাল মেলানো মুশকিল। বরফ শীতল হাওয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হাঁটতে হবে, তাও এই অন্ধকারে।
আমার ভাবনার চমক ভাঙল সামনে জোরালো গাড়ির হেড লাইটের আলো পড়াতে। প্রাণপণে দু’হাত তুলে গাড়িটা দাঁড় করাবার চেষ্টা করলাম। আমার দেখাদেখি সুনীলও হাত তুলল। আমার পোশাক দেখেই হয়তো গাড়ির চালক ব্রেক কষে গাড়ি থামাল। দেখি একটা মালবাহী ট্রাক। জানালা দিয়ে মুণ্ডু বাড়িয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করল কোথায় যাব। বাঁধের ইঞ্জিনিয়ার পরিচয় দিতে গাড়ির দরজা খুলে দিল। ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে পড়লাম।  সুনীলকে উঠে পড়ল ট্রাকের উপর। অনেক সুক্রিয়া জানিয়ে নেমে পড়বার সময় হাতে একশো টাকা বাড়িয়ে দিতে লোকটা হাতজোড় করে বারণ করল। জোর করে পকেটে ঢুকিয়ে দিলাম।
হাজার সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামছি। এবার পেঁজা তুলোর মতো বরফ পড়তে লাগল। তার সাথে তীব্র বেগে হাওয়ার ঝাপটা। ভাগ্যিস বুদ্ধি করে গামবুট পরে এসেছিলাম। নামতে নামতে দেখলাম, একটা লোক উপরে উঠে আসছে। আমাদের দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল। সুনীল আমার পিছনে ছিল। মাফলারে মাথা ঢেকে ফেলল। অর্থাৎ সুনীল তাকে চেনে এবং নিজেকে লুকোতে চাইছে। আমিও দাঁড়িয়ে পড়লাম। লোকটার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। মুখে কিছু না বলে চোখ নামিয়ে উপরের দিকে হাঁটতে লাগল। আমি নিচে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে সুনীলকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, লোকটা কনট্রাক্টরের কাছে কাজ করে। বদমাইশ টাইপের। নাম সরদারা।
টানেলের মুখে এত সকালে কোনও লোক দেখা যাচ্ছে না। এত শীতে কে বা আসবে। ভুল ভাঙল ভিতরে ঢুকে। জামাকাপড় ছাড়ার জায়গাটাতে বেশ নরক গুলজার। বাঁধের কাজ চলে শিফটে। কাজ বন্ধ হয় না। শ্রমিকরা কাজে ফাঁকি দিয়ে গল্প করছে। আমাকে দেখে ওদের কথা বন্ধ হয়ে গেল। সবাই উঠে দাঁড়াল। আমি কথা না বলে নিজের শীতের পোশাক খুলে হ্যাঙ্গারে টাঙিয়ে দিলাম। গায়ে ঘাম হতে শুরু করেছে ভিতরের উষ্ণতায়। আমি নতুন লোক, কিন্তু চেনা ইঞ্জিনিয়ার নই। কাজেই মুহূর্তে ওরা স্বাভাবিক হয়ে গেল। আমি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। সবচাইতে বয়সে বড়ো মানুষটিকে বললাম আমাকে অনুসরণ করতে। বাকিরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সুনীলকে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে একটা কথাও জানাতে বারণ করেছিলাম। সে আমার সামনে টর্চ হাতে চলেছে। আচমকা লোকটাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “বুধিয়াকো জানতে হো?”
“জি।” বলে চুপ।
“বুধিয়া জিস দিন লাপতা হো গয়া থা, উস দিন আপ ডিউটিপে থে?”
“জি সাব।”
“ক্যায়া হুয়া থা?”
লোকটা নিরুত্তর। বুঝলাম মুখ খুলবে না। তাই বললাম বাইরে গিয়ে বসতে।
সুনীলের সাথে টানেলের শেষ মাথায় এসে শিয়ার জোনের কাছে এসে দাঁড়ালাম। পকেট থেকে জিওলজিক্যাল হ্যামার বার করে ঠুকতে পাথর ঝুর ঝুর করে খসে পড়ল। এখানে পাথর দুমড়ে-চুমরে এমনভাবে ভেঙে যাচ্ছে, যে সহজেই আরও বড়ো গর্ত হয়ে গেল। কিছু পেলাম না। আশাও করিনি। কারণ, আরও নীলা থাকলে অন্য কেউ এসে নিয়ে যায়নি সেটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আরও নীলা পাওয়ার আশা করা বৃথা।
নীলা যদি অন্য কারও হাতে আসত তাহলে এতদিনে বুধিয়ার ফিরে আসা উচিত ছিল। আশঙ্কা হল, কেউ ছেলেটাকে মেরে ফেলেনি তো! টানেলের ভিতর পায়চারি করে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছি। হঠাৎ মাথায় প্রচণ্ড গুঁতো খেলাম নিচু হয়ে বেরিয়ে থাকা পাথরে। মাথার উপর তাকিয়ে দেখলাম কোথাও কোথাও পাথরের খোঁদল তৈরি হয়ে আছে। সুনীলের কাছ থেকে টর্চ নিয়ে উপরে পাথরের খোঁদলগুলো ভালো করে দেখতে লাগলাম। মন বলছে বুধিয়ে নিজেই বিপদের আঁচ পেয়ে লুকিয়ে রেখেছে নীলার খণ্ডটাকে। কিন্তু প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা টানেলের ভিতর এভাবে নীলা খোঁজা আর খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজা একই ব্যাপার।
ঠিক সেই সময় টানেলের মেঝেতে জমে থাকা জলের ভিতর দিয়ে ছপ ছপ করে কারও হেঁটে আসার শব্দ পেলাম। সে আবার গান গায়, ‘এ ভাই, যারা দেখকে চলো, আগে হি নহি পিছে ভি…’ আমার সামনে এসেও গান থামল না। বুঝলাম লোকটা একটু ছিটিয়াল গোছের। কিন্তু এ-জাতীয় লোকেদের মনটা বেশ উদার হয় বলে জানা আছে। জিজ্ঞাসা করলাম, “নাম কেয়া হ্যায় ভাই?”
সে উত্তর দিল, “নাম নেহি, কাম নেহি, কোই নেহি...”
বেজায় হাসি পেলেও মুখটা গম্ভীর করে ধমকে উঠলাম, “নাম বতাও। নেহি তো কমপ্লেন কর দুঙ্গা।”
এবার ভয় পেয়ে লোকটা বলল, “বচন সিং, সাহাব। মেরা ক্যায়া গলতি?”
“বুধিয়াকো জানতে থে?”
“জানতা হুঁ সাহাব। বুধিয়া সহি সলামত হ্যায়।”
“তুমহে ক্যায়সে পতা?” বিস্ময়ে আমার বাক রুদ্ধ। লোকটা জেনেও চুপ করে ছিল।
ও আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই বোধহয় প্রায় ফিসফিস করে বলল, ‘শামকো আনা সাহাব, উপর হমারা বস্তিমে। অভি চলে যাও।”
বচন সিংয়ের না বলা রহস্যটা কিছুটা হলেও ধরতে পারলাম। সুনীলকে নিয়ে টানেলের বাইরে চলে এসে দেখি সূর্যদেব তার হাসি হাসি মুখ নিয়ে উদয় হয়েছেন নদীর ওপারে, পাহাড়ের ফাঁকে। হাওয়ার গতিও স্তিমিত। পাহাড়ের এই এক খেলা, কখনও হাসি, কখনও কান্না। তাই বোধহয় পাহাড়ি মানুষেরা একটু বেশি ইমোশনাল।
দিনের বেলা প্রজেক্ট অফিসে কাজকর্ম মিটে গেল। পরদিন আমাকে কালকা ফিরে যেতে হবে। ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে বৈকালিক চা খাওয়ার পর্ব সারলাম গেস্ট হাউসের লবিতে বসে। সামনে সুবিশাল পাহাড়। তার মাথায় পুঞ্জীভূত তুষারে শেষবেলার পড়ন্ত সূর্যের আলো। এত সুন্দর পৃথিবীতে নিষ্পাপ এক কিশোর হারিয়ে যাওয়া মেনে নেওয়া কঠিন। চৌকিদারকে ডেকে আমার সান্ধ্য অভিযান সম্পর্কিত কিছু নির্দেশ দিলাম। তারপর সুনীলকে ডেকে পাঠালাম। ও দৌড়ে গেল কুলিবস্তিতে বচন সিংকে ডেকে আনতে।
অন্ধকার নেমে এলে আমি কুলিবস্তির উপরে পায়ে চলার রাস্তায় এসে পৌঁছতেই দেখি সুনীল আর বচন দাঁড়িয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। বচনের সাথে কথা বলে যা জানতে পারলাম, তা হল, সরদারা সিং নামের একটা লোক লোকাল গুণ্ডা টাইপের। সে ঠিকেদারের উপরেও হম্বিতম্বি করতে ছাড়ে না। বুধিয়ার হারিয়ে যাওয়ার পিছনে সরদারার হাত আছে এ-বিষয়ে বচন নিশ্চিত। সকালবেলা তাকে দেখেই সুনীল আমার পিছনে লুকিয়ে পড়েছিল।
সরদারা থাকে বড়ো রাস্তার পাশে পাহাড়ের মাথায়। ওদের আমাকে অনুসরণ করতে বলে আমি পাহাড় চড়া শুরু করলাম। সুঁড়িপথ বেয়ে উঠছি। দু’পাশে জঙ্গল। গলে যাওয়া বরফে কর্দমাক্ত রাস্তায় পা পিছলে যায়। তবে আমি হান্টার শু পরে এসেছি, তাই প্রায় দৌড়ে উঠছি। সরদারা বা তার দলবলদের সুযোগ দেওয়া যাবে না। পকেটে হাতিয়ার বলতে সেই জিওলজিক্যাল হ্যামার। আকাশ পরিষ্কার বলে অন্ধকার কম, তাই আবছা আলোয় পথ চলতে অসুবিধা হচ্ছে না।
বচনের কথামতো পাহাড়ের প্রায় মাথায় উঠে এসে একটা ফাঁকা জমিতে একচালা বাড়িটা চোখে পড়ল। জানালা দরজার ফাঁক দিয়ে আলো আসছে বাইরে। অন্ধকারে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হল, কারণ চৌকিদারকে বলে রেখেছি বাড়ির পিছনে চলে আসতে। একচালা বাড়িটার দিকে ঠায় দাঁড়িয়ে আছি পথের দিকে তাকিয়ে। ছায়ামূর্তির মতো কে যেন বাড়ির পিছন দিকে গুঁড়ি মেরে চলে গেল। তার হাতে লাঠি। অনুমান করে চিনতে ভুল হল না। এবার সুনীল আর বচন সিং বাড়ির দু’দিকে চলে আসতে আমি দরজার সামনে গিয়ে সরদারার নাম ধরে ডাকতেও সাড়াশব্দ এল না। দরজার ফাঁক দিয়ে ঝাঁঝালো গন্ধ আসছে। এরা দেশি মদ অবৈধভাবে বানায়। পাহাড়ে এটা নতুন নয়। পুলিশ আর প্রশাসন সব জেনেও চোখ বন্ধ করে থাকে।
ক্যাঁচ করে দরজাটা একটু ফাঁক হল। ভিতর থেকে হেঁড়ে গলায় প্রশ্ন এল, “ক্যায়া কাম হ্যায়?”
বললাম, “দারু চাহিয়ে। মিলেগা?”
লোকটা বেশ সতর্ক। জিজ্ঞাসা করল, “কিস নে ভেজা?”
নির্ভেজাল মিথ্যে বললাম। ঠিকেদার পূরণ সিংয়ের নাম বললাম। দরজা খুলে গেল। ভিতরে মদ তৈরি হচ্ছে মাটির হাঁড়িতে। হাঁড়িটা কাঠের জ্বালে বসানো। মুখটা বন্ধ, তার ভিতর থেকে নল বেরিয়ে আছে। লোকটা সন্দেহের চোখে আমার জামাকাপড় দেখতে দেখতে বলে উঠল, “বাবুজি, আপকো দেশি চিজ সে ক্যায়া কাম? আপ শহর কে হো!”
বললাম, “তো ক্যায়া? ইয়াহা আয়ে থে, টেস্ট করনে কি দিল কর রহা থা।”
সরদারা বেজায় চালাক। এত সহজে ছাড়ার পাত্র নয়। বলে, “কিসিকো ভেজ দেতে! খুদ আনে কা তকলিফ কিউ উঠায়া?”
আমি দুই বোতল দেশি মদের অর্ডার করলাম। বুঝলাম, ঠিক সময়ে হানা দিয়েছি। সরদারার সঙ্গীসাথীরা কেউ নেই এখন। লোকটা নজর আমার উপর থেকে সরাতেই চোখ পড়ল ঘরের ভিতর আরেকটা দরজা। ঘরের সাইজ দেখে মনে হচ্ছে পিছনে আরেক ঘর আছে। ঠিক সেই সময় আমার পূর্ব নির্দেশ অনুযায়ী বচন ঘরের সদর দরজায় টোকা দিল। সরদারা দরজার বাইরে যেতেই আমি এক লাফে ধাক্কা দিয়ে পাশের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলাম। ঘরের কুপির আলোতে দেখি ঘাড় গোঁজ করে এক কিশোর মাটিতে বসে। পা দড়ি দিয়ে বাঁধা। অনুমানে বুঝলাম এ বুধিয়াই। দরজা বন্ধ করে দিলাম আর পিছনের দরজা দিয়ে বুধিয়াকে পাঁজাকোলা করে বাইরে নিয়ে এলাম। বাইরে সরদারার পিছনে তখন চৌকিদার। এক লাঠির বাড়িতে দুষ্ট লোকটা ‘হাঁই’ শব্দ করে পড়ে গেল। সুনীল মুখের ভিতর আঙুল পুরে সিটি বাজিয়ে দিতে বাঁধের শ্রমিকদের তিন-চারজনের দলটা ছুটে এল। বুধিয়াকে দেখে ওদের খুশির সীমা নেই। সরদারাকে ওরা দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল পুলিশ না আসা পর্যন্ত। বুধিয়াকে জড়িয়ে ধরে চৌকিদার শব্দ করে কাঁদতে কাঁদতে আমাকে অনেক কৃতজ্ঞতা জানাল।
“গল্প শেষ হল না, বুবাইমামা।” আমি চেঁচিয়ে উঠতে বুবাইমামা হেসে ফেলল।
“বলছি, বলছি। শেষটা না বললে কি গল্প করার মজা থাকে?”
বুবাইমামার মুখে যা শুনলাম তা বেশ চমকপ্রদ।
“সরদারা ধরা পড়ার পর ওখানকার ডি.এম. স্বয়ং অকুস্থলে এসে তাকে চালান করে দেন কালকায়। তার বিরুদ্ধে হিউম্যান ট্রাফিকিং, কিডন্যাপিং এবং  বেআইনি মদ বানানো ও বেচার অভিযোগ জানানো হয় আদালতে। বুধিয়া নীলা লুকিয়ে রেখেছিল টানেলের আরেক শিয়ার জোনের ভিতর পাথর সরিয়ে গর্ত তৈরি করে। কারণ, সরদারা ওকে নীলাটা দিয়ে দেবার জন্য ধমক দিতে থাকে। ঠিক সেই সময়ে বাঁধের ইঞ্জিনিয়াররা আসেন কাজের পরিদর্শনে। সেই সুযোগে পাথর সরিয়ে ফেলে বুধিয়া। আমার অনুমান সত্য হয়। নীলা পাথরটা বুধিয়া টানেলের মাথার উপর বেরিয়ে আসা পাথরের খাঁজে আটকে রাখে সবার নজরের আড়ালে। নীলা খুঁজে পাওয়ার কথাটা ঠিকেদারকে বলার সময় পায়নি বুধিয়া। কুলিবস্তির কাছে বুধিয়া ঘরে ফেরার সময় সরদারা তার দুই সঙ্গীকে সাথে নিয়ে ওকে নিজের বাড়িতে ধরে নিয়ে যায়। বুধিয়া জানায়, খুঁজে পাওয়া নীলা বাঁধের কর্তৃপক্ষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াই কর্তব্য। নীলার হদিস পেতে ওরা বুধিয়াকে মারধোর করে। কিন্তু বুধিয়া অনাহারে থেকেও মুখ খুলতে রাজি হয় না। নীলাটা ডি.এম. সরকারি খাজানায় জমা করে দেন। বুধিয়াকে পুরস্কার দেওয়া হয় পাঁচ হাজার টাকা। ডি.এম.-এর অফিসে কাজ পায় বুধিয়া। তাঁর শর্তানুযায়ী বুধিয়া নাইট স্কুলে ভর্তি হয় পড়াশুনো শেষ করবার জন্য।”
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ মৈনাক দাশ

2 comments:

  1. দারুণ লাগলো। কত কিছু যে জানার আছে! জানতে পারলাম সেসব!

    ReplyDelete
  2. এত্তা বড়া নীলা? Nice reading

    ReplyDelete