গল্পঃ দস্যি ছেলেঃ কিশোর ঘোষাল



।।এক।।

নাম তার শঙ্কু। কী দস্যি বাবা, কী দস্যি! বাপ নেই, মা আছে। আর আছে একফালি উঠোনওলা খড়ের ঘর। উঠোনের মাঝখানে তুলসীমন্দির। ওপাশে লঙ্কা, লাউ, উচ্ছে আর বেগুনের ঝোপ। এ-পাশে থাকে ননী আর তার ছোট্ট মেয়ে মিনি। মিনির সঙ্গে খুব ভাব শঙ্কুর। কাছে গেলেই গায়ে গা ঘষবে, আর ছোট্ট জিভ দিয়ে হাত চেটে দেবে। আর কাছে যদি না যাও? যদি না যাও, কালো কালো ডাগর চোখে এমন তাকাবে, কাছে না গিয়ে পারবেই না।
সামনে পুজো বলে শঙ্কুর ইস্কুল এখন ছুটি। আর ছুটি মানেই তো ছুটোছুটি। মা দুগ্গার মূর্তি বানানো দেখার ছুটি। শুধু কি মা দুগ্গা? তাঁর সঙ্গে আছেন দু’ছেলে, দু’মেয়ে, আরও আছে সিংহ, হাঁস, ময়ূর, পেঁচা আর ইঁদুর। তার ওপরে আছে ঘ্যাচাং হয়ে পড়ে থাকা কাটা মোষ আর মোষের কাটা পেট থেকে বেরিয়ে আসা সবুজ রঙের অসুর। ইয়াব্বড়ো-বড়ো তার হাতের গুলি। ইয়া পুরুষ্টু তার গোঁফ। আর দু’চোখে কী রাগ, বাপ রে!
ছোট্ট ছোট্ট মালসায় নানান রঙ গুলে রাখেন বিধুদাদু। আর মোটা সরু কত্তরকমের তুলি দিয়ে এঁকে ফেলেন ঠাকুরের নাক, চোখ, গাল, গলার ভাঁজ। দাদু যতক্ষণ না ঠাকুরের চোখ আঁকেন, ততক্ষণ শঙ্কু নিশ্চিন্ত মনে দস্যিপনা করে বেড়ায়। চোখ আঁকা হয়ে গেলেই ব্যস, আর নয়। কারণ বিধুদাদু তাকে বলেছেন, ঠাকুরের চোখ আঁকা হলেই তিনি সবার সব দুষ্টুমি দেখে ফেলেন। ঠিকই তো, চোখ না হলে আর ঠাকুর দেখবেন কী করে?
সেদিন সকালে ঠাকুরের আঙুলে দুধে আলতার রঙ লাগাচ্ছিলেন দাদু। সে কাছে গিয়ে বসতেই বললেন, “আজ থেকে আর ইস্কুল নেই, না শঙ্কু?”
“না, আজ থেকে ছুটি। আবার ইস্কুল খুলবে সেই একমাস পরে। কী মজা না, দাদু?”
“মজা বলে মজা! এ একেবারে শরতের সোনা রোদ্দুরের মতোই জমজমাটি মজা। তা, মা কি অফিস চলে গেছেন?”
“সে তো কোন সকালে। মায়ের অফিসটা খুব বাজে, জানো দাদু? পুজোয় মোটে চারদিন ছুটি, ব্যস।”
“খুব বাজে, মানে একদম অখাদ্য। কী জানো শঙ্কু, অফিসগুলো খুব বাজেই হয়। তাদের শরীরে যেন একটুও মায়াদয়া থাকতে নেই! শুধু কাজ আর কাজ। অফিসের গোমড়ামুখো, হোমরাচোমরা বড়োবাবুগুলো কি আর ছুটির মর্ম বোঝে? আর কী করেই বা বুঝবে বলো, তারা কি আর দৌড়ে দৌড়ে প্রজাপতি ধরে? তারা কি শিলাবৃষ্টির পর শিল কুড়োতে উঠোনে নামে? তাই না, শঙ্কুবাবু? তা সকালে একটু বই-টই নিয়ে বসেছিলে, নাকি মা অফিস বেরোতেই বই-টই ফেলে টই টই করে পাড়ায় বেড়াতে নেমে পড়েছ?”
“হুঁ। তা বৈকি। মা ওঠে সেই কোন ভোরে। আমার জন্যে, নিজের জন্যে রান্না করে। টিফিনে আমাকে দুধ রুটি দেয়। তারপর চান করে ভাত-টাত খেয়ে অফিসে যায়। সঙ্গে নিয়ে যায় দুপুরের টিফিন। মা সেই ভোরেই আমাকে ডেকে দেয়, আমি মুখ-টুখ ধুয়ে পড়তে বসি। পড়তে না বসলে মা কথাই বলে না! সারাক্ষণ খুব রাগ রাগ মুখ করে সব কাজ সারে। আমাকে তখন আর ‘তুই’ বলে না, বলে ‘তুমি’। ‘টেবিলে খাবার ঢাকা দেওয়া রইল, দুপুরে ঠিক সময়মতো খেয়ে নিও।’ ‘টিফিনটা খেয়ে নাও, দুধ নষ্ট করবে না একদম,’ ‘সারাদিন টই টই করে পাড়া না বেড়িয়ে দুপুরে একটু ঘুমোবে।’
“ও বাবা, তুমি দুধও নষ্ট করো নাকি, শঙ্কু? দুধ খেতে ভালো লাগে না?”
“একদম না, খুব বিচ্ছিরি। মা চান করতে গেলে আমি অনেকটা দুধ মিনিকে দিয়ে দিই যে!”
“মিনি, মানে বেড়াল?” মা লক্ষ্মীর নখে হালকা গোলাপি রঙ করতে করতে বিধুদাদু জিজ্ঞেস করলেন।
“না না, ধ্যুত, মিনি বেড়াল হতে যাবে কেন? মিনি তো ননীর মেয়ে। স্বপ্নামাসি রোজ সকালে আর বিকেলে ননীর সব দুধ দুয়ে নেয়। রাতে সেই দুধেই আমাদের পায়েস হয়, ক্ষীর হয়। কিন্তু সকালে এমনি এমনি দুধ একদম ভাল্লাগে না।”
“ও, ননী তোমাদের গাইয়ের নাম, আর মিনি তার বাছুর?”
“হুঁ। মিনির কী দোষ, বলো দাদু! স্বপ্নামাসি সব দুধ দুয়ে নিলে ও-বেচারি খাবে কী? তাই মা চান করতে ঢুকলে আমি চুপিচুপি রোজ মিনিকে আমার দুধটা খাইয়ে দিই।”
“ঠিকই বলেছ, শঙ্কু। ননীর সব দুধ দুয়ে নিলে মিনি বেচারি খাবে কী? ছোট্ট ওই মেয়েটার কথা আমরা বড়োরা কেউ ভাবিই না। তবে কিনা সবটা দিও না, তুমিও একটু খেও। তা নইলে তোমার মাও তো...”
বিধুদাদু আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, সেই সময় হাঁফাতে হাঁফাতে দৌড়ে এল কানাই। সে এই গ্রামের রাখাল। সকাল সকাল গ্রামের গরুবাছুরকে মাঠে চরাতে নিয়ে যায়, সারাটা দিন তাদের দেখভাল করে, আবার বিকেলে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। বয়সে ক’বছরের বড়ো হলেও তার সঙ্গে খুব ভাব শঙ্কুর। কানাইদাদা ক্লাস এইট অবধি পড়ে লেখাপড়া ছেড়ে দিল। কী করবে, বেচারা কানাইদাদার বাবা সেই সময়েই হঠাৎ মারা গেলেন যে! আর কানাইদাদার মা তো অনেকদিন ধরেই অসুস্থ। নিজেদের জমিজিরেত যেটুকু আছে চাষবাস করে আর গ্রামের সকলের গরুবাছুর চরিয়ে কানাইদার মা ও ছেলের সংসার কষ্টেসৃষ্টে চলে যায়। ইস্কুলের মাষ্টারমশাইদের অনেকে আজও কানাইদাদার কথা উঠলে দুঃখ করেন। বলেন, কানাইয়ের কপালটাই খারাপ। ছেলেটা স্রেফ অভাবের তাড়নায় লেখাপড়া ছাড়তে বাধ্য হল! বেচারার যেমন বুদ্ধিশুদ্ধি ছিল, তেমনি ছিল লেখাপড়ায় খুব আগ্রহ।
পুজোতলায় শঙ্কুকে দেখতে পেয়ে কানাইদাদা বলল, “এই দ্যাখ, তুই এখানে? সেই থেকে তোকে খুঁজতে খুঁজতে আমি হয়রান। তোর মিনি কোথায় হারিয়ে গেছে, খুঁজে পাচ্ছি না। ওদিকে তার মা ননী কেঁদে কেঁদে মাঠময় দৌড়ে বেড়াচ্ছে। শিগগির চ।”
কানাইদাদার মুখে এই কথা শুনে শঙ্কু আর দাঁড়াল না। কানাইদাকে নিয়ে দৌড়তে লাগল মাঠের দিকে। বিধুদাদু ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, “অ্যাই দ্যাখো দ্যাখো দ্যাখো, একা একা যাচ্ছ কোথায়? গাঁয়ে বড়োদের খবর দাও। তারাও যাক সঙ্গে।”
ততক্ষণে কানাই আর শঙ্কু মন্দিরতলা পেরিয়ে, হারুদের মুদিখানা ছাড়িয়ে মেটে রাস্তার বাঁকের আড়ালে চলে গেছে।

মাঠে পৌঁছে শঙ্কু দেখল, কানাইদা যা বলেছিল তাই হয়েছে। ননী কেঁদে কেঁদে সারা। কালো কালো চোখের কোলে জল। ডাকতে ডাকতে গলা বসে গেছে। আওয়াজ করছে, “হাম্বা, হায় মা, আম্বা, আয় মা।” শঙ্কু গিয়ে তার মাথায় গলায় হাত বুলিয়ে একটু শান্ত করল। তারপর কানাইকে বলল, “কানুদা, আমার মনে হয় মিনি ওদিকের জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। বাচ্চা তো, ভেবেছে অনেক বেশি ঘাসপাতা পাবে। তারপর ভেতরে ঢুকে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে। এক কাজ কর, তুই ওদিকটা দেখ আর আমি এদিকটাতে দেখি।”
তারা দু’জনে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়তে ননী ওইদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার দু’চোখ থেকে জল পড়ছে টপটপ করে। একবার শুধু ডাকল, “হাম্বান, সাবধান!”

।।দুই।।

এর আগে শঙ্কু কানাইদাদার সঙ্গে দু-তিনবার এসেছে এই জঙ্গলে। নামেই জঙ্গল, জন্তুজানোয়ার তেমন কিছু নেই। রাতের দিকে শেয়ালের ডাক শোনা যায় আর খুব গরমের সময় নাকি সাপেরও দেখা মেলে। তবে গাছপালা, ঝোপঝাড় আছে বিস্তর। অনেকটা ভেতরে একটা মস্ত পুকুর আছে, তার পাড়ে আছে একটা ভাঙাচোরা মন্দির। সেই মন্দিরের দেওয়াল ফাটিয়ে উঠেছে বট আর অশ্বত্থগাছ। মোটা মোটা সাপের মতো শেকড় মন্দিরের দেওয়াল বেয়ে নেমে এসেছে মাটিতে। আর চারদিক থেকে ঝুড়ি নেমে ঘিরে ধরেছে পুরো জায়গাটা। এই জায়গাটা এড়িয়ে ডানদিক দিয়ে একটু ঘুরে গেলেই সেই পুকুরটা। চলার রাস্তা ছিল হয়তো কোনওদিন, আজ আর নেই। এখন যেতে গেলে ঝোপঝাড় ভেঙেই যেতে হবে। পুকুরের পাড়ে বেশ কিছুটা জায়গা নিয়ে ঘাট বাঁধানো ছিল। সেসব এখন ফেটে-ফুটে ভেঙেচুরে কঙ্কাল।
গতবার এই পর্যন্ত এসে তার আর কানাইদাদার গা ছমছম করছিল খুব। একটানা ঝিঁঝিঁর শব্দ। দূরে কোথাও ঘুঘু ডাকছিল, ‘ঘুঘু ঘুঃ, ভূভূ ভূঃ’। দু’জনে হাত ধরাধরি করে যখন ভাবছিল আর এগোবে কি না, এমন সময় কী একটা ডেকে উঠেছিল, “ওকে, ওকে, ওকে...” আর তার উত্তরে অন্যদিক থেকে একসঙ্গে অনেকে বলে উঠেছিল, “কেকে কেকে কেকে কেকে”। সেই শুনে আর তারা দাঁড়ায়নি, পিছন ফিরে দৌড়েছিল তাদের গোচারণ মাঠের দিকে।
এদিকটা তন্নতন্ন করে খুঁজেও মিনিকে কোথাও পেল না শঙ্কু। শঙ্কুর খুব কষ্ট হচ্ছে এখন। গেল কোথায় বাচ্চা মেয়েটা? আশ্বিনের এই দুপুরেও তার জামা ঘামে ভিজে জবজব করছে। কাঁটার খোঁচায় পায়ের তিন-চার জায়গা কেটে গেছে, জামাটাও দু’জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। মা জানতে পারলে... জানতে তো পারবেই। কেউ না কেউ বলে দেবে। কেউ না বললেও মায়ের চোখ এড়ানো যাবে না। ঠিক ধরে ফেলবে। মিনিকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে না পারলে কী জবাব দেবে মাকে? মা হয়তো খাবেই না রাগ করে। শঙ্কুর ওপর খুব রাগ হলে মা নিজেই খাওয়া বন্ধ করে দেয়। আর সেদিনই দারুণ দারুণ রান্না করে শঙ্কুর জন্যে। এইসব ভাবতে ভাবতে শঙ্কু চলে এসেছে সেই ভাঙা মন্দিরটার কাছে, যার চারদিক ঘিরে আছে বট-অশথের ঝুড়ি।
জায়গাটা দেখে শঙ্কু থমকে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। ওদিকটায় যাবে কি যাবে না, ভাবতে লাগল। ওদিকে কি মিনি যেতে পারে? এতটা জঙ্গল ঘুরে দেখাই যখন হল, ওটুকুই বা বাকি থাকে কেন? একবার ভাবল শঙ্কু। কিন্তু একা একা ওই জায়গায় ঢুকতে তার ভরসাও হচ্ছে না। একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্যে বড়ো একটা গাছতলায় বসল শঙ্কু। বসে ভাবতে ভাবতে তার মনে হল, এই সময় কানাইদাদাও যদি সঙ্গে থাকত, দু’জনে মিলে ঢুকে দেখে আসা যেত জায়গাটা।
সত্যদাদা বারবার বলে, দুনিয়ায় ভূত-টুত বলে কিস্যু নেই। সবই নাকি মনের ভুল আর যে মানুষ যত বেশি ভয় পায়, সে নাকি তত বেশি ভূত দেখে। সত্যদাদার অনেক পড়াশোনা। কলকাতার কলেজ থেকে অনেক অনেক লেখাপড়া করে এসে এখন কিচ্ছুই করে না। নিজের বাড়িতে বসে সারাদিন নানান বই পড়ে আর নিজের বানানো ‘সৃষ্টিঘর’-এ অদ্ভুত যত কাচের বাসনপত্র নিয়ে কীসব জিনিস বানায়। সেসব নিয়ে সত্যদাদাকে জিজ্ঞেস করলে বলে, “তোর মা, আমার মা যেমন রান্না করেন, আমিও তেমনই রান্না করি। মায়েরা খাবার বানান আর আমি নতুন নতুন জিনিস বানাতে চেষ্টা করি। একটা কথা মন দিয়ে শুনে রাখ শঙ্কু, এই চেষ্টা করাটাও একটা মস্ত কাজ। চেষ্টা করেছিলেন বলেই বিজ্ঞানীরা কত কী আবিষ্কার করে ফেলেছেন!”
গতবার এই জঙ্গল থেকে পালিয়ে গিয়ে সত্যদাদাকে সব বলেছিল শঙ্কু। কারা যেন ‘ও কে, ও কে’ বলল, আর একদল আবার ‘কে কে কে কে’ বলল। সত্যদাদা শুনে জিজ্ঞেস করেছিল, “মানুষের গলা বলে মনে হয়নি? এমনও তো হতে পারে, কিছু দুষ্টু লোক ওখানে লুকিয়ে থাকে তোদেরকে দেখে ভয় পাওয়ানোর জন্যে অমন বলেছে!”
শঙ্কু খুব জোর দিয়ে বলেছিল, “না না, মোটেও ওটা মানুষের গলা নয়।”
তার দিকে একদৃষ্টে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে কী যেন ভাবল সত্যদাদা। তারপর নিজের ল্যাপটপ খুলে কিছুক্ষণ কীসব করল। তারপর বলল, “শঙ্কু, তুই ওই চেয়ারটায় গিয়ে বোস তো, তোকে আমি এখন অনেকগুলো শব্দ শোনাব। দেখ তো, তুই যা শুনেছিস তার সঙ্গে মেলে কি না।”
সত্যদাদার ল্যাপটপে ভূতের আওয়াজও শোনা যায়! বাপ রে। অবাক হয়ে শঙ্কু চেয়ারটায় বসতেই পাখির ডাক শুনতে পেল। আওয়াজটা আসছে সত্যদাদার ল্যাপটপ থেকে।
সত্যদাদা জিজ্ঞেস করল, “এরকম?”
শঙ্কু ঘাড় নাড়ল। “নাহ্‌, এগুলো তো পাখির ডাক!”
তারপরে আরেকটা। এটাও না। চার নম্বর আওয়াজটা শুনে শঙ্কু উত্তেজিত হয়ে বলল, “এই তো, এই তো, অনেকটা এইরকম।”
সত্যদা ভুরু নাচিয়ে হেসে বলল, “দাঁড়া দাঁড়া, এবার ‘ও কে’টাও শোনাব।”
আবার অনেকগুলো শোনার পর সাত নম্বরটা শুনেই শঙ্কু বলল, “এটাই এটাই! প্রায় এরকমই শুনতে।”
চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে সত্যদার পাশে দাঁড়াল শঙ্কু। সত্যদা হাত দিয়ে তার মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে হেসে বলল, “দাঁড়া, আরেকবার চালাই, তাহলেই তোর ভূতগুলোকে চিনতে অসুবিধে হবে না।”
সত্যদা দুটো ডাকই আবার শোনাল। শঙ্কু লজ্জাও পেল, আবার অবাকও হল। বলল, “এ বাবা, এগুলো তো পাখি!”
“পাখিই তো! তোরা যেটা ‘ও কে, ও কে’ শুনেছিস, সেটা হাঁড়িচাচার ডাক। ইংরিজিতে বলে Rufous Treepie। আর একদল যারা কর্কশ গলায় ‘কে কে কে কে’ বলেছিল, তাদের নাম ছাতারে। ইংরিজিতে বলে Jungle Babbler। এরা প্রায় সবসময় ছ’ থেকে সাতজনের দল বেঁধে থাকে, আর যখন ডাকে একসঙ্গেই ডাকে। তাই এদেরকে Seven Sisters বা Seven Brothers-ও বলে অনেকে। এবার বুঝলি? তোর মনের ভূত আসলে পাখি! আমরা যখন খুব ভয় পাই, আমাদের মনটাও ভয় পাওয়ার জন্যে মুখিয়ে থাকে। যেকোনও শব্দ, যেকোনও আলোছায়ার থেকে আমাদের ভীতু মনটা ভয় তৈরি করে আমাদের মাথায় পাঠিয়ে দেয়। আর তখন ভয়ে আমাদের মগজও স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা ভুলে থম মেরে থাকে। তখন অচেনা পাখির ডাকেও আমরা বাংলা ভাষার ধমক শুনতে পাই। হে হে হে, বুঝলি রে বুদ্ধু!”

।।তিন।।

সত্যদার সঙ্গে সেবার নিজের বোকামিতে খুব হেসেছিল শঙ্কু। কিন্তু ভূত নেই জেনেও তার ওই মন্দিরের দিকে একা একা যাবার সাহসও হচ্ছে না। কিছু একটা করা দরকার ভেবে শঙ্কু এবার উঠে দাঁড়াল। আর উঠে দাঁড়াতেই দুটো ব্যাপার তার নজরে এল। এক, তার পিছনের জঙ্গলের ভেতর থেকে হেঁটে আসছে কানাইদাদা। আর দুই, তার নাকে একটা গন্ধ আসছে, যেটা তার খুব চেনা। কিন্তু এই জঙ্গলে এই গন্ধটা কোথা থেকে আসছে? গন্ধটা বিড়ির ধোঁয়ার গন্ধ। তাদের পাড়ায় দুয়েকজন বয়স্ক মানুষ বিড়ি খান। এই গন্ধ সে চেনে।
কানাই কাছে এসে খুব মনমরা হয়ে ঠোঁট ওলটালো। তার মানে মিনিকে পাওয়া যায়নি। শঙ্কু বলল, “সারা জঙ্গল দেখা হয়ে গেছে, বাকি আছে ঐ মন্দিরটা।”
কানাইদাদা বলল, “ওদিকে যাবি?”
সত্যদার মতো গম্ভীর মুখ করে শঙ্কু বলল, “ভূত বলে কিস্যু নেই। কিন্তু এখন একটা গন্ধ পাচ্ছিস?”
কানাইদাদা লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে বলল, “হুঁ, পাচ্ছি। শুকনো পাতা পোড়ার গন্ধ।”
ঠিক, তাও হতে পারে। শান্তিদিদি তাদের উঠোন ঝাঁট দিয়ে শুকনো ঝরাপাতা জমা করে শীতকালে আগুন ধরিয়ে দেয়। সে গন্ধটাও এইরকমই। শঙ্কুর মনে পড়ল। শঙ্কু বলল, “আমার মনে হচ্ছিল কেউ বিড়ি খাচ্ছে। কিন্তু যাই হোক, এই জঙ্গলের মধ্যে কে পাতা পোড়ায় বা বিড়ি খায়, বল তো? ভূত নিশ্চয়ই নয়। কানাইদা, চল, ওই মন্দিরের দিকেই আমরা যাবো। খুব সাবধানে, কেউ যেন দেখতে না পায়।”
আগে শঙ্কু আর পিছনে কানাই নিচু হয়ে ঝোপের ভিতর দিয়ে এগোতে লাগল ভাঙা মন্দিরের দিকে। চারদিকে বটের ঝুড়ি নেমে গোটা জায়গাটাই যেন মস্ত একটা খাঁচা। আর তার মধ্যে ঝোপঝাড় লতাপাতা জড়িয়ে লুকিয়ে থাকার পক্ষে দারুণ জায়গা।
ওরা যখন মন্দিরের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে, তখন একদল মানুষের গলা শুনতে পেল। “জয় মা কালীর জয়! জয়!”
সামনে তো দুগ্গাপুজো, কালীপুজো আসতে তো অনেক দেরি। শঙ্কু ঠোঁটে আঙুল দেখাল কানাইদাকে; তারপর সেই ঘন ঝোপের আড়ালে আড়ালে মন্দিরের সামনের দিকে এগিয়ে গেল। এখান থেকে তারা দেখতে পেল, মন্দিরের সামনে অনেকটা জায়গা ঝাঁট দিয়ে একধারে শুকনো পাতা জড়ো করে কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। তার মানে এই পোড়া গন্ধই তারা পেয়েছিল। মন্দিরের সামনে মাটিতে বাবু হয়ে আটজন, আর মন্দিরের দাওয়ায় পা ঝুলিয়ে দু’জন বসে আছে। দাওয়ায় বসা একজন কথা বলছে, বাকিরা সব শুনছে।
“আমাদের দলে কোনও নেতা নেই, কোনও সর্দার নেই, কোনও গুরু নেই, কোনও চেলাও নেই। আমরা যেন একই পরিবারের ভাই, আমরা সবাই যেন একই মায়ের ছেলে। ভাইদের মধ্যে বড়দা-মেজদা থাকে, আমাদেরও থাকবে। কিন্তু সবার উপরে থাকবেন আমাদের মা। আমরা এই মন্দিরে মায়ের প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করব। মায়ের নিত্য পুজো করব। এই ভাঙা মন্দিরকেই আমরা রাঙা করে তুলব আমাদের শত্রুদের রক্ত দিয়ে। কালীপুজোর দিন সামনের অমাবস্যার মাঝরাতে আমরা মাকে প্রতিষ্ঠা করে পুজো করব এবং সেইদিনই শুরু হবে আমাদের কাজ, যে কাজের জন্যে আমরা এখানে জড়ো হয়েছি। ভাইসব, আজ আর বেশি কথা নয়। কাল থেকে আমরা আর একসঙ্গে আসব না। একসঙ্গে এলে শত্রুরা আমাদের কথা জেনে যাবে। রোজ দু-তিনজন করে এসে আমরা মায়ের জন্যে এই মন্দিরকে সারিয়ে তুলব। আজ আমাদের সভা এখানেই শেষ হোক। আরেকবার সবাই মিলে বলো, জয় মা কালীর জয়।”
“জয়।” সবাই মুঠো করা হাত একসঙ্গে আকাশের দিকে তুলে বলল, “জয় শ্যামা মায়ের জয়।”
“জয়।”
লোকগুলোর রকমসকম দেখে শঙ্কুর বুক ঢিব ঢিব করছিল। গাঁট্টাগোট্টা শক্তপোক্ত শরীর। ছোটো করে ছাঁটা চুল, আর ইয়া ইয়া পুরুষ্টু গোঁফ। দেখলেই বোঝা যায় ওদের গায়ে খুব জোর। চেহারা দেখলে বিধুদাদুর অসুরের কথা মনে পড়ে যায়। এতগুলো অসুর, বাপ রে! তবে দাওয়াতে আরেকজন যে বসেছিল, সে কিন্তু এরকম দেখতে নয়। অনেকটা বরং সত্যদাদার মতো দেখতে। রোগা রোগা চেহারা, চোখে চশমা। মাথায় এলোমেলো চুল আর গালভর্তি দাড়িগোঁফ।

সবাই চলে যাবার বেশ কিছুক্ষণ পরে শঙ্কু আর কানাই এসে দাঁড়াল মন্দিরের সামনে পরিষ্কার চাতালে। ওরা যেদিক দিয়ে চলে গেল সেদিকে একটু এগিয়ে চোখে পড়ল সেই ভাঙাচোরা শান বাঁধানো  পুকুরের ঘাট। আর এই ঘাটের পাশ দিয়েই সরু পায়ে চলা পথ চলে গেছে পুকুরের ধারে ধারে।
কানাই বলল, “কী ব্যাপার বল তো শঙ্কু, লোকগুলো কারা?”
শঙ্কু বলল, “কে জানে? মিনিকে তো এদিকেও পাওয়া গেল না। কোথায় যে গেল মেয়েটা। চল, তাড়াতাড়ি কেটে পড়ি, কেউ আবার যদি ফিরে আসে?”
তারা এসেছিল মন্দিরের বাঁদিক ধরে, এখন ডানদিকের ঝোপের মধ্যে দিয়ে ফেরার পথ ধরল। আর সেদিক দিয়ে যেতে গিয়েই তারা দেখতে পেল মিনিকে। চারদিকে ঝোপের আড়ালে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গায় মনমরা মিনি শুয়ে আছে মাটিতে মুখ রেখে। আনন্দে শঙ্কু লাফ দিয়ে জড়িয়ে ধরল মিনিকে। “এই মিনি, এখানে কী করছিস তুই? এখানে এলি কী করে?”
মিনি জঙ্গলের মধ্যে রাস্তা ভুলে এদিক সেদিক অনেক ঘোরাঘুরি করে মনের দুঃখে আর কোথায় যাবে? এখানেই শুয়ে পড়েছিল। এত হাঁটাহাঁটিতে, তার ওপর ভয়ে তার ছোট্ট ছোট্ট চারপায়ে দাঁড়িয়ে থাকার আর ক্ষমতা ছিল না। এখন শঙ্কুদাদা আর কানাইদাদার গলা পেয়ে, আর তাদের ছোঁয়ায় তার আনন্দ আর ধরে না। জোর পেয়ে উঠে দাঁড়াল ধড়ফড় করে; তারপর শঙ্কুদাদার গা-হাত চেটে খুব খানিক আদর করল। শঙ্কুও আদর করে তার গলায় হাত রেখে বলল, “চল চল, ঘরে চল।”

ভাঙা মন্দিরের সেই ভয়ংকর জায়গাটা ছেড়ে এসে তারা চেনা জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে অনেকটা নিশ্চিন্ত হল। মাঝখানে মিনিকে নিয়ে তারা দু’জনে হাঁটছিল। কানাই বলল, “গাঁয়ে ফিরে বলবি, মন্দিরের ঐ লোকগুলোর কথা?”
“অনেকেই বিশ্বাস করবে না। একজনকে বললেই বরং কাজ হবে, তাকে তো বলবই।”
“কাকে?”
“সত্যদাদা। সত্যদাদাকে বললে কিছু একটা করবেই। ঠিক বের করে ফেলবে কী ঘটতে চলেছে কালীপুজোর রাতে। আর কাউকে এখনই কিছু বলিস না।”

।।চার।।

শঙ্কু সেদিন যখন বাড়ি ফিরল, বেলা গড়িয়ে গেছে বিকেলের দিকে। কোনওরকমে ঝপাঝপ চান করে যখন দুপুরের খাওয়া সারল, ততক্ষণে কানাইদা ননী আর মিনিকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, মায়ের বাড়ি ফিরতে আর ঘন্টা খানেকও বাকি নেই। বড়ো আয়নার সামনে নিজেকে দেখল। তাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে কি, যে সে সারা দুপুর জঙ্গলে আর মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়িয়েছে? আয়নায় মুখটা ডানদিক বাঁদিক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখেও অন্যদিনের থেকে তফাত কিছু বুঝতে পারল না শঙ্কু। কিছুটা নিশ্চিন্ত হওয়ার পর শঙ্কুর খুব ঘুম পাচ্ছিল। সারা দুপুরের ছুটোছুটির ক্লান্তি, তারপরে চান করে আর অবেলায় ভাত খেয়ে তার দু’চোখে ঝেঁপে ঘুম নেমে এল। শঙ্কু দরজাটা চেপে দিয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায় এবং শোওয়ামাত্র ঘুমিয়ে পড়ল।

“কী রে শঙ্কু, ঘরের লাইট জ্বালাসনি? তিন সন্ধেবেলায় এমন ঘুমোচ্ছিস, শরীর খারাপ নাকি রে?” মায়ের ডাকে শঙ্কুর ঘুম ভাঙল। মা ঘরের আলো জ্বেলে শঙ্কুর কপালে আর গলায় হাত দিয়ে জ্বর আছে কি না দেখল। জ্বরটর নেই দেখে কিছুটা স্বস্তি পেয়ে মা জিজ্ঞেস করল, “সারা দুপুর কোথায় গিয়েছিলি?”
মিথ্যে কথা একদম বলতে পারে না শঙ্কু। আর মিথ্যে বললে মা কি ধরতে পারবে না? খুব ভয়ে ভয়ে সমস্ত ঘটনাটা মাকে বলেই ফেলল। শুধু বাদ রাখল মন্দিরের সেই অসুরের মতো লোকগুলোর কথা। মা বড়ো বড়ো চোখ করে তাকাল, তারপর শঙ্কুর বাঁ কানটা মুলে দিয়ে বলল, “তোকে কতদিন বলেছি দুপুরে মাঠে মাঠে ঘুরবি না?”
শঙ্কু কানে হাত ডলতে ডলতে নাকি সুরে বলল, “রোজ রোজ বাঁ কান মুলে দাও কেন? তোমাকে বলেছি না, ডানদিকের কানটাও মাঝে মাঝে মুলবে?”
শঙ্কুর এই কথায় মা ফিক করে হেসে ফেলল। বলল, “ও, তোর বুঝি মনে হয়, রোজ বাঁ কান টানলে ওটা ডানদিকের কানের থেকে বড়ো হয়ে যাবে?”
“হবেই তো। নিতাই রজকের গাধার মতো একটা কান লম্বা হলে ভালো লাগবে? আমার কী? লোকে তোমাকেই বলবে, শঙ্কুর মায়ের ছেলেটা একদম গাধা।”
শঙ্কুর কথায় হাসতে হাসতে মায়ের চোখে জল চলে এল। শঙ্কুকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আচ্ছা আচ্ছা, আর কোনও কানই টানব না। তুই দুষ্টুমি করিস বলেই তো টানি। আমার রাগ হয়ে যায়।”
শঙ্কু রাগ-টাগ ভুলে বলল, “বা রে, কোওনদিন যাই নাকি? আজও তো ঠাকুরের রং করা দেখছিলাম। কানাইদা এসে বলল, মিনি হারিয়ে গেছে, তাই গেলাম। ওইটুকুনি মেয়ে হারিয়ে গেলে খুঁজতে হবে না?”
“সেই ভালো। লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে কাল থেকে তুইও কানাইয়ের সঙ্গে মাঠেই যাবি গরু চরাতে।” মা আবার রেগে গেল। আর রাগে গনগনে মুখ করে ও-ঘরে চলে গেল অফিসের জামাকাপড় পালটাতে।

পরদিন মা অফিস বেরিয়ে যাওয়ার পর শঙ্কু দৌড়ল সত্যদাদার বাড়ি।
সত্যদাদা তার সৃষ্টিঘরে কাচের পাত্রের মধ্যে সবুজ রঙের একটা ঘন জিনিসের মধ্যে ফোঁটা ফোঁটা গোলাপি তরল ফেলছিল। কাচের পাত্রটা ছোট্ট কলসির মতো। সত্যদাদা এটার নাম বলেছিল ফ্লোরেন্স ফ্লাস্ক। আর যেটা দিয়ে গোলাপি তরল ঢালছে তার নাম পিপেট। আশ্চর্য ব্যাপার হল, সবুজের সঙ্গে গোলাপি মিশে ঘন জিনিসটা ফিকে হতে হতে স্বচ্ছ জলের মতো তরল হয়ে গেল ধীরে ধীরে। এখন দেখে মনে হচ্ছে, ফ্লাস্কের মধ্যে এক কাপ খাবার জলই যেন রাখা আছে।
“কী দেখছিস?” সত্যদা হাসি হাসি মুখে জিজ্ঞেস করল। “এটা হচ্ছে আমার প্রথম সৃষ্টি, নাম রেখেছি, শুদ্ধিকরণ।”
“শুদ্ধিকরণ? সে আবার কী? এটা দিয়ে কী হবে, সত্যদা?”
“দারুণ ব্যাপার হবে এটা দিয়ে। তোর পেটে যত শয়তানি বুদ্ধি আছে, সব নষ্ট করে দেবে আর মনটাকে সরল করে তুলবে। সেইজন্যে এর নাম দিয়েছি শুদ্ধিকরণ, ইংরিজিতে পিউরিফায়ার বলতে পারিস।”
সত্যদাদার কথায় শঙ্কুর খুব রাগ হল। বলল, “আমার পেটে শয়তানি বুদ্ধির কী দেখলে, শুনি?”
“ধুর বোকা, তোকে বলতে কি আর তোকেই বলেছি? তোকে, আমাকে, সবাইকে বলেছি। কথা সেটা নয়। কথাটা হচ্ছে, এটা কারুর ওপর প্রয়োগ করে দেখতে হবে এটা কীরকম কাজ করে। ফর্মুলা অনুযায়ী বানিয়েছি ঠিকই, কিন্তু কাজ যদি না করে, তাহলে আবার ভাবতে হবে, এই আর কী। আমি তো বলব, তোর পেটে এখন কিছু শয়তানি বুদ্ধি থাকলে আমার সুবিধেই হত।”
ফ্লাস্কটার মুখটা বড়ো একটা রাবারের ছিপি দিয়ে টাইট করে বন্ধ করে সত্যদাদা আবার বলল, “কাল কী হয়েছিল, সারাদিন এ-মুখো হলি না যে বড়ো? মনে হচ্ছে কোনও ঝামেলায় ব্যস্ত ছিলি? আর সেই কথা বলার জন্যেই সকাল সকাল দৌড়ে দৌড়ে চলে এলি আমার কাছে?”
সত্যদার ওপর একটু রাগ রাগ হচ্ছিল, কিন্তু এই কথায় সেই রাগ একদম জল হয়ে গেল শঙ্কুর। সত্যদা কী করে যে এইসব ব্যাপারগুলো বুঝে ফেলে!
শঙ্কু বলল, “কী করে বুঝলে?”
“না বোঝার কী আছে? কাকিমা অফিস বেরিয়েছেন সাড়ে ন’টা নাগাদ, আর তুই আমার কাছে এসেছিস ন’টা চৌত্রিশে। কাকিমার বেরোনোর পর একমিনিটও দেরি করিসনি। তোদের বাড়ি থেকে আমাদের বাড়ি হেঁটে এলে মিনিট পাঁচেক লাগে, তুই এসেছিস ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে।” সত্যদাদা হাসিমুখে ভুরু নাচাল। তারপর আবার বলল, “আরও আছে। ঠাকুরের রং ধরানোর কাজ চলছে। এই সময় ঠাকুরতলা ছেড়ে তুই সোজা আমার কাছে এসেছিস, মানে ব্যাপারটা বেশ গুরুতর। কী, ঠিক কি না? কী বলবি চটপট বলে ফেল।”

শঙ্কুর মুখে গতদিনের সব ঘটনার কথা শুনে সত্যদাদা বলল, “তুই বা কানাই আর কাউকে একথা বলেছিস? কাকিমাকে?”
“আমি তো কাউকেই বলিনি, মাকেও না। কানাইদা কাউকে বলেছে কি না বলতে পারব না। তবে ওকে আমি বারণ করেছিলাম। কাউকেই যেন না বলে।”
“হুম। এসব কথা পাঁচকান না করাই ভালো। এবার কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করি, ভালো করে মনে করে বল। অতগুলো লোক যে দেখলি, তাদের সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র কিছু চোখে পড়েছিল?”
“অস্ত্রশস্ত্র মানে, মা দুগ্গার দশ হাতে যেমন থাকে?”
“ওসব অস্ত্র আজকাল আর কেউ ব্যবহার করে না। হিন্দি সিনেমায় দেখিসনি? ভিলেন আর তার চেলাদের হাতে যেমন থাকে, সেরকম অস্ত্রশস্ত্র, ছোরাছুরি-বন্দুক-পিস্তল এইসব আর কী।”
“না না, সেরকম কিছু ছিল না, মানে দেখিনি।”
“তাহলে তোর মনে হল কেন ওরা দুষ্টু লোক?”
“বা রে, ওই যে বলল না, শত্রুর রক্ত দিয়ে ভাঙা মন্দির রাঙিয়ে তুলবে?”
“সে তো আমরাও মা দুর্গাকে বলি, অসুরদের বিনাশ করার জন্যে আমাদের শক্তি দাও, জয় দাও, খ্যাতি দাও। তাহলে আমরাও কি দুষ্টু লোক?”
হতাশ হয়ে শঙ্কু বলল, “ওরা তাহলে দুষ্টু লোক নয় বলছ?”
“কোথায় বললাম? আমি বলছি হতেও পারে, নাও হতে পারে। জঙ্গলের ভেতরে বহু পুরনো ভাঙা মন্দির সারিয়ে মায়ের পুজো চালু করবে, এ তো ভালোই কথা। আবার এটাও মনে হচ্ছে, আজকাল তো বড়ো রাস্তার ধারে যেখানে সেখানে মন্দির তৈরি করে ফেলা কোনও ব্যাপারই নয়। সেখানে কাঠখড় পুড়িয়ে ঐ পোড়ো জমিতে মন্দির প্রতিষ্ঠার ঝামেলায় লোকগুলো জড়াচ্ছে কেন? ভাবছি কাল একবার যাব। ওখানে গিয়ে কিছু হদিশ করতে পারা যায় কি না দেখি।”
“তুমি যাবে? আজই চলো না তাহলে।”
“যাব। এমন একটা ঘটনাকে তুচ্ছ ভেবে এড়িয়ে যাওয়ার মানে হয় না। কিন্তু আজ নয়, যাওয়ার আগে একটু ভাবনা চিন্তা করে, কিছু যোগাড়যন্তর করে যাব। যদি দেখি একেবারেই নিরীহ, নিরামিষ ব্যাপার, তাহলে তোর এই টেনশনটা মাঠে মারা যাবে। আর যদি সত্যিই সন্দেহজনক কিছু মনে হয়, তার জন্যেও কিছু ব্যবস্থা করে আসতে চাই। তুই এক কাজ কর, কাল দশটার আগে চলে আয়, একসঙ্গে বেরোব।”
“কানাইদাকে সঙ্গে নেবে?”
“হ্যাঁ, ভালোই হবে, ছেলেটা বেশ চটপটে। তবে ওকে বলে দিস কথাটা পাঁচকান না করতে।”

।।পাঁচ।।

সত্যদাদা, শঙ্কু আর কানাই ঝোপের আড়ালে আড়ালে সেই মন্দিরের কাছে যখন পৌঁছল, তখন সত্যদার হাতঘড়িতে এগারোটা সাতাশ বাজে। এই জায়গাটা থেকে মন্দিরের সামনের চাতালটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। বেশ কিছুক্ষণ চুপটি করে বসে থেকেও কোনও লোকজনের দেখা পাওয়া গেল না। তারপর সত্যদাদা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “সেদিন ওরা কোন রাস্তা দিয়ে গিয়েছিল?”
শঙ্কু আর কানাই হাত দিয়ে সেদিকটা দেখাল।
সত্যদা বলল, “কানাই, ঐ বকুলগাছটায় উঠতে পারবি? তোর কাজ হবে ওপর থেকে দেখা কোনও উটকো লোক এদিকে আসছে কি না। আসতে দেখলেই পাখির ডাক ডেকে উঠবি। পারিস? কোন পাখির ডাক ডাকবি?”
একগাল হেসে কানাই বলল, “কোকিলের ডাক।”
“এই আশ্বিনে কোকিল ডাকছে শুনলে সবাই চমকে যাবে। এখানে যারা জমায়েত হচ্ছে তাদের অত বোকা না ভাবাই ভালো।”
সত্যদা সঙ্গের ছোট্ট ব্যাগ থেকে দেশলাই বাক্সের মতো একটা যন্ত্র বের করে বলল, “এইটা রাখ। চার নম্বর সুইচটা টিপলেই একটা ঘুঘু, আরেকটা কাক ডেকে উঠবে। তিনবার ডাকার পরে সুইচটা আবার টিপলেই বন্ধ হয়ে যাবে। মনে থাকবে তো? সাবধানে যাবি। দেখিস, গাছে উঠতে আবার হাত-পা ভাঙিস না যেন। আর আমার এদিকের কাজ হয়ে গেলে এদিক থেকে একটা ঘুঘু ঠিক চারবার ডেকে উঠবে। আস্তে আস্তে নেমে চলে আসবি। ঠিক আছে?”
কানাই যাবার পর সত্যদাদা শঙ্কুকে কাছাকাছি একটা ছোট্ট ঘন পাতাওয়ালা গাছের উপর তুলে বসিয়ে দিল। তারপর শঙ্কুর হাতে দুটো টিনের পাতওয়ালা ছোট্ট একটা খেলনা দিয়ে বলল, “টিনের পাতের এই উঁচু জায়গাটা চাপলেই কটকট আওয়াজ হয়, মনে হবে ব্যাঙ ডাকছে। চুপটি করে এখানে বসে থাক। এখান থেকে আমরা যেদিক দিয়ে এসেছি আর মন্দিরের সামনের পুরোটাই দেখা যাচ্ছে। কাউকে আসতে দেখলেই একবার এই কটকটিটা বাজিয়ে দিবি। বুঝেছিস?”
শঙ্কু ঘাড় নেড়ে বলল, বুঝেছে।
শঙ্কুকে বসিয়ে রেখে সত্যদা দৌড়ে ঢুকে পড়ল ভাঙা মন্দিরের ভেতরে। মন্দিরের ভেতরের অবস্থা মোটেই সুবিধের নয়। চারটে দেয়ালেই বিরাট বিরাট ফাটল, আর সেই ফাটলের মধ্যে দিয়ে গাছের মোটা শিকড় মাটিতে গিয়ে ঢুকেছে। মন্দিরের দরজাটা পশ্চিমমুখী। পিছনের দিকে দেয়াল থেকে হাত তিনেক জায়গা ছেড়ে একটা মস্ত বড়ো সিমেন্টের বেদি। মন্দিরের সঙ্গে এই বেদিটা একদমই মানাচ্ছে না। কারণ এই বেদিটা একদম নতুন, শক্তপোক্ত। বেদিটা নতুন সে ঠিক আছে, কিন্তু এত বড়োই বা কেন? কত বড়ো প্রতিমা বসবে এই বেদিতে? সত্যর মনে হল, কিছু একটা ব্যাপার নিশ্চয়ই আছে। মন্দিরের ভেতর বাইরে না সারিয়ে হঠাৎ প্রতিমার এত্ত বড়ো বেদি বানাতে গেল কেন লোকগুলো? পলেস্তারা খসে যাওয়া ইটে পা রেখে যতদূর হাত যায় উঁচুতে, বটের শিকড়ের আড়ালে একটা টিকটিকি সে আটকে দিল। ঘরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় বসে টিকটিকির চোখদুটো ঘরের সবকিছু লক্ষ করুক। প্লাস্টিকের মেটে রঙের টিকটিকিটা সত্যদা ব্যাগে নিয়ে এসেছিল।
ভেতরের কাজ সেরে সত্যদা মন্দিরের পিছনের দিকে চলে গেল। এদিকেও ঝোপঝাড় আছে, কিন্তু তার মধ্যে বেশ কিছুটা জায়গা পরিষ্কার। গত পরশু এইখানেই শঙ্কু তার মিনিকে খুঁজে পেয়েছিল। দেখেই বোঝা যায়, এদিকে লোকের যাওয়া আসা আছে। মন্দিরের পিছনে আশেপাশের দিকেই তার নজর ছিল, মাটির দিকে তাকায়নি। আর ঠিক সেই ভুলের জন্যেই হুড়মুড় করে একটা গর্তের মধ্যে পড়ে গেল সত্যদা। গর্তের মুখটা ডালপালা দিয়ে এমন আড়ালে ছিল, সত্যদা বুঝতেই পারেনি। ধপাস করে সত্যদা যেখানে পড়ল সেখানেও মাটি, তবে মারাত্মক গভীর নয়। পড়ে যাবার ধাক্কাটা সামলে নিয়ে সত্যদা উঠে বসার পর বুঝল তার কপাল ভালো, তেমন কিছু চোট পায়নি। বসে বসেই গর্ত থেকে বেরোবার কী উপায় দেখতে গিয়েই তার চোখে পড়ল, তার সামনেই একটা দরজা, খুব উঁচু নয়, ফুট পাঁচেক হবে। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, দরজাটা নতুন, বেশ ভারী লোহার দরজা আর তাতে চকচক করছে ভারী তালা! মন্দিরের সামনের দরজা কোনও কালে নিশ্চয়ই ছিল, আজ আর তার চিহ্নমাত্র নেই। সেই দরজা না সারিয়ে এই দরজা কীসের দরজা? ঐ বন্ধ দরজার ওপাশে কীসের ঘর? তার মানে মন্দির সারানো বা পুজো শুরু করাটা লোকের চোখে ধুলো দেওয়া? আসল উদ্দেশ্য অন্যকিছু? সেটা কী? এই ঘরের ছাদটাই কি মন্দিরের সেই নতুন বানানো বেদি, যার জন্যে ওটা বেশ বেমানান সাইজের বড়ো?
গর্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে সত্যদার এখন একটাই চিন্তা, এখান থেকে বাইরে বেরোনো। শঙ্কু এবং কানাই দু-দু’জন বাচ্চা ছেলে বাইরে তার অপেক্ষায় গাছে বসে আছে। আর সে এখানে আটকে থাকলে যেকোনও মুহূর্তে বিপদ ঘটে যাবার সম্ভাবনা। ব্যাগ থেকে ভাঁজ করা একটা ছুরি বের করে মিনিট দশেকের মধ্যে পা রাখার মতো পাঁচটা ছোট্ট গর্ত বানিয়ে ফেলল মাটির দেওয়ালে। ফুট চারেকমতো উঠতে পারলেই ওপরের মাটি ছুঁয়ে ফেলা যাবে। তারপর যদি কোনও ঝোপঝাড়ের ডাল ধরে ফেলতে পারে, তাহলে আর চিন্তা নেই। স্যান্ডেলদুটো ব্যাগে নিয়ে সত্যদা ওঠবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই দেখল বাঁশের একটা মই নিচে নেমে আসছে, আর ওপর থেকে লোকের গলা শোনা যাচ্ছে। এই গলা যে শঙ্কু বা কানাইয়ের নয়, সত্যদা নিশ্চিত।
এখন এই গর্ত থেকে আর বেরোনোর উপায় নেই। যদি লোকদুটো জেনে গিয়ে থাকে সে এখানে, তাহলে ধরা পড়া ছাড়া আর কিছু করার নেই। আর যদি না জানে, তাহলে যেচে ধরা দেওয়ার কোনও মানে হয় না। দরজাওয়ালা নতুন দেওয়াল আর পাশে মন্দিরের ভিতের পুরনো দেওয়ালের মধ্যে কিছুটা জায়গা দেখেছিল সত্যদা। আজে বাজে ভাঙা জিনিসপত্র আর রাবিশে বোঝাই। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সত্যদা সেই ফাঁকটুকুতে ঢুকে গিয়ে পিছনের অন্ধকারে মিশে গেল।
মিনিট তিনেকের মধ্যে দুটো লোক এসে লোহার দরজাটা খুলে নিচু হয়ে ঢুকে পড়ল ঘরে। দরজার পাল্লাদুটো হাট করে খোলাই রইল। সত্যদা দেখল, দরজার পাল্লার আড়ালে এপাশ দিয়ে সে অনায়াসে বাইরে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে কেটে পড়তে পারে। নিঃশব্দে দ্রুতপায়ে সে বেরিয়ে এসে দেখল, সামনেই সেই মুক্তির সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল মাটির ওপরে।
ঝোপের আড়ালে আড়ালে সে প্রথমে গেল শঙ্কুর কাছে। শঙ্কুকে ইশারায় কথা বলতে মানা করে সে শঙ্কুকে নামিয়ে নিল গাছ থেকে। তারপর শঙ্কু যেখানে বসেছিল, সেই গাছের ডালে পাতার ফাঁকে বসিয়ে দিল সবুজ রংয়ের ছোট্ট একটা পাখি। তার চোখদুটো লক্ষ রাখবে মন্দিরের সামনের চাতাল আর দরজাটা।
শঙ্কুকে নিয়ে সত্য এবার ঝোপের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে চলল কানাইয়ের বকুলগাছের দিকে। কিন্তু বকুলগাছের কাছে যাবার আগেই ডেকে উঠল ঘুঘু আর কাক। তিনবার ডেকেই থেমে গেল। সত্য শঙ্কুকে নিয়ে একটা ঝোপের ভিতরে শুয়ে পড়ল প্রায়। কেউ আসছে। মন্দিরের দিক থেকে, নাকি বাইরের দিক থেকে? ইস, এটা তখন মাথায় আসেনি, কানাইকে বলে দিলে হত ব্যাপারটা। এদিক থেকে গেলে দু’বার আর ওদিক থেকে এলে তিনবার। যদি মন্দিরের দিক থেকে আসে, তার মানে যে দু’জন মন্দিরের পিছনের গোপন কুঠুরিতে ঢুকেছিল তারা বেরিয়ে যাচ্ছে। আর যদি ওদিক থেকে আসে তার মানে ওরা দু’জন ছাড়াও আরও কেউ আসছে মন্দিরের দিকে।
মিনিট পাঁচেক অপেক্ষার পর শঙ্কু অধৈর্য হয়ে উঠল। ফিসফিস করে বলল, “এখনও যায়নি, সত্যদা? মনে হয় চলে গেছে।”
সত্যদা ঠোঁটে আঙুল রেখে বলল, চুপ।
আরও প্রায় সাড়ে সাত মিনিট পর দুটো লোকের গলা শুনতে পেল ওরা। মন্দিরের দিক থেকে দুটো লোক কথা বলতে বলতে চলে গেল পুকুরধারের রাস্তার দিকে।
লোকদুটো চলে যাবার মিনিট পাঁচেক পরে সত্যদা সন্তর্পণে উঠে দাঁড়িয়ে চারদিক লক্ষ করে বলল, “উঠে আয়, শঙ্কু।”
তারপর দু’জনে মিলে ঝোপের আড়ালে আড়ালে দৌড়ে চলে গেল বকুলগাছের নিচে, যেখানে কানাই রয়েছে। বকুলগাছের নিচে দাঁড়িয়ে সত্যদা উপরের দিকে তাকাতেই কানাইয়ের সঙ্গে চোখাচোখি হল ওদের। ইশারা করতে কানাই দ্রুত নেমে এল গাছ থেকে। সত্যদা বলল, “আজকের মতো অনেক হয়েছে। আর কেউ আসার আগেই আমরা এবার কেটে পড়ি, চল। কিন্তু খুব সাবধানে।”
ঝোপের আড়ালে আড়ালে ওরা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ল জায়গাটা থেকে। বাইরের জঙ্গলে এসে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সত্যদা বলল, “কানাই, তুই লোকদুটোকে যাওয়ার সময় দেখতে পেলি, আসার সময় দেখতে পাসনি?”
“কেন? তোমার কথামতো চার নম্বর সুইচ টিপেছিলাম, পাখিও তো ডাকল, তুমি শুনতে পাওনি?” কানাই অবাক হয়ে বলল।
শঙ্কুও কানাইকে সমর্থন করে বলল, “আমিও কিন্তু শুনেছি ঘুঘু আর কাকের ডাক। তুমি তখন কোথায় ছিলে, সত্যদা?”
সত্যদা বলল, “হুঁ। তার মানে আমি যখন গর্তের মধ্যে পড়ে গেছিলাম, সেই সময়েই তোর পাখির ডাক বেজেছে। তাই শুনতে পাইনি।”
“গর্ত? কীসের গর্ত, সত্যদা?” কানাই অবাক হয়ে জিগ্যেস করল।
জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ফেরার পথে সত্যদার মুখে সবকথা শুনল কানাই আর শঙ্কু। আতঙ্কে আর বিস্ময়ে ওরা দু’জন বলে উঠল, “ওরা যদি তোমাকে দেখে ফেলত সত্যদা, কী হত?”
সত্যদা বলল, “আমাদের খেলা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু তা হয়নি। তার মানে ভাগ্য আমাদের সঙ্গে আছে। আর এই ঘটনার জন্যে আমরাও জেনে গেলাম, ওখানে যারা যাওয়া আসা করছে, তাদের মতলব মোটেই ভালো নয়। মন্দিরের পিছনে ওই চোরাঘর বানিয়ে নিশ্চয়ই কোনও গোপন জিনিস রাখার ষড়যন্ত্র করছে।”
শঙ্কু বলল, “কী মতলব হতে পারে বলো তো, সত্যদা?”
একটু চিন্তা করে সত্যদা বলল, “অনেক কিছু হতে পারে। ডাকাতি করে এনে টাকাপয়সা, সোনাদানা লুকিয়ে রাখতে পারে। আবার কোনও সন্ত্রাসবাদী জঙ্গীদল তাদের অস্ত্রশস্ত্র, বিস্ফোরক জিনিস লুকিয়ে রাখতে পারে। দরকার মতো এখান থেকে নিয়ে বাইরে পাচার করে দেবে।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সত্যদা আবার বলল, “ব্যাপার খুব ভয়ংকর আর সিরিয়াস এ-ব্যাপারে আমার কোনও সন্দেহ নেই। প্রথমদিনের ব্যাপারটা তোদের চোখে পড়ে যাওয়ার পর তোরা যে আমাকে বলেছিলি, তাতে শুধু আমাদের নয়, এই অঞ্চলের কিংবা কে জানে হয়তো গোটা রাজ্যের পক্ষেই এটা খুব অমঙ্গলের ব্যাপার হয়ে উঠতে পারে। তবে কানাই এবং শঙ্কু, তোদের দু’জনকেই বলছি, এখনই এইসব কথা পাঁচকান করার দরকার নেই।”

।।ছয়।।

আজকে শঙ্কু যখন ঘরে ফিরল, তখন দুটো বাজতে আর মিনিট আটেক বাকি। চটপট চান-টান আর দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে শঙ্কু শুয়ে পড়ল বিছানায়। রোজ রোজ মায়ের কাছে ধরা পড়ে মাকে রাগিয়ে দিলে ফল ভালো হবে না। ওই রহস্যওয়ালা ভাঙা মন্দিরের ব্যাপারটা সত্যদা যে ঠিক সমাধান করে ফেলবে, সে বিশ্বাস তার ছিল। আর সেই ব্যাপারে সে সত্যদার সহকারী হিসেবে সঙ্গে থাকতে চায়। অতএব বাড়াবাড়ি করে মাকে খুব রাগিয়ে দিলে মা হয়তো আর বেরোতেই দেবে না।

পরেরদিন মা অফিস বেরিয়ে যাবার পর সত্যদার বাড়ি হাজির হল শঙ্কু। সত্যদা বুনসেন বার্নারে একটা ফ্লাস্ক চাপিয়ে একটু জলের মধ্যে সবুজ পাতা সেদ্ধ করছিল। এতে শঙ্কু খুব একটা অবাক হল না। কিন্তু অবাক হল টেবিলের একধারে রাখা ল্যাপটপের পর্দার দিকে তাকিয়ে। ল্যাপটপের পর্দায় দুটো ভাগ। একভাগে সেই ভাঙা মন্দিরের সামনের চাতাল আর দরজাটা দেখা যাচ্ছে, আরেকটা ভাগে ভাঙাচোরা একটা ঘর। তার মানে কালকের সেই সবুজ পাখিটার চোখ দিয়ে তারা এটা দেখছে?
“সত্যদা, তোমার সেই পাখিটা তার মানে সিসি টিভির ক্যামেরা?”
সত্যদা হেসে বলল, “গুড। ঠিকই ধরেছিস। পাখিটা তোর সামনেই ওই গাছের ডালে বসিয়েছিলাম। আরেকটা বসিয়ে এসেছি মন্দিরের ভেতরে - একটা টিকটিকি। খুব জোরালো ট্রান্সমিটার, সোলার আর ফটো ব্যাটারিতে চলবে। আমরা এখান থেকে ইচ্ছে করলে সারাদিন ওদের ওপর নজর রাখতে পারব।”
সত্যদার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে শঙ্কু জিগ্যেস করল, “দুটোই তোমার বানানো?”
“না রে, পুরোপুরি আমার বানানো নয়। তবে ঐ টুকটাক যন্ত্রপাতি জোগাড় করে জিনিসদুটোকে আমিই গড়ে তুলেছি। কাজের জিনিস সে তো বুঝতেই পারছিস। এই প্রথম কাজে লাগালাম, কতদিন চলে এখন সেটাই দেখার।”
“বিশেষ কিছু দেখতে পেলে?”
সত্যদা শঙ্কুর আগ্রহে খুশি হয়ে বলল, “কাল তো ফিরে এসে খাওয়াদাওয়া করে আমার ল্যাপটপের সঙ্গে ও-দুটোকে সেট করতেই সন্ধে হয়ে গেল। রাত্রে ওখানে তো আর লাইট নেই, অন্ধকারে কিছুই দেখা যায়নি। আজ সকালে চালু করেছি। সকাল আটটা পনের-কুড়ি নাগাদ চারটে লোক একটা সাইকেল ভ্যান নিয়ে বেশ কিছু মালপত্র নিয়ে এসেছে। খুব স্পষ্ট বোঝা না গেলেও মনে হচ্ছে সিমেন্ট আর বালির বস্তা। মন্দিরের চাতালে ওই দ্যাখ বাঁদিকে বস্তার থাক লাগিয়েছে। তারপর খালি ভ্যান নিয়ে সবাই চলে গেল। ব্যস, তারপর আর কেউ আসেনি এখনও পর্যন্ত।”
কথা শেষ করে সেদ্ধ হতে থাকা সবুজ পাতার মধ্যে পিপেট থেকে তিন ফোঁটা গোলাপি তরল ঢালল সত্যদা। ঘড়ি দেখে ত্রিশ সেকেণ্ড পর পর। তরলটা দেওয়ার মিনিট পাঁচেক পরে সবুজ পাতাগুলো জলের সঙ্গে মিশে গেল, আর ফ্লাস্কের জিনিসটা বেগুনি হয়ে অল্প অল্প ফুটতে লাগল।
ল্যাপটপের পর্দার দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে বসেই রইল শঙ্কু। তার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি অনেক লোকজন হাতে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হা-রে-রে-রে করে হাজির হয়ে দাঁড়াবে ঐ চাতালে। প্রায় ঘন্টা খানেক একভাবে তাকিয়ে বসে থেকেও সেরকম কিছু ঘটল না দেখে শঙ্কু বলল, “ও সত্যদা, এ তো কিছুই হচ্ছে না।”
সত্যদা হা হা করে হেসে উঠে বলল, “ধুর পাগল, তুই কী ভেবেছিস, এটা সিনেমার মতো হবে? লোকগুলো কখন আসবে, কী করবে কোনও ঠিক আছে? তুই বাড়ি যা, ঘটনা কিছু হলে আমার ল্যাপটপে সেভ হয়ে যাবে। দুপুরের পরে আসিস, তার আগে কেউ আসবে বলে মনে হয় না।”
শঙ্কু সত্যিই খুব বোর হচ্ছিল। তাই ব্যাজার মুখে সত্যদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে ঠাকুরতলায় গেল বিধুদাদুর ঠাকুর রঙ করা দেখতে। আজ বোধহয় দুগ্গাঠাকুরের গায়ে রঙ করবেন বিধুদাদু।

শঙ্কুর এবারে পুজোর থেকেও ভাঙা মন্দিরের রহস্য নিয়ে উত্তেজনা অনেকগুণ বেশি। ভাঙা মন্দিরের সারাইয়ের কাজ তো চলছেই, রোজই পাঁচ-সাতজন লোক আসা যাওয়া করছে। মালপত্রও আসছে বিস্তর। পুজোর আগে দু’দিন ওখানে আবার মিটিং হয়েছিল। প্রথমদিন শঙ্কু যেমন দেখেছিল, সেরকমই সব লোকজন। কিন্তু এবারে সংখ্যায় অনেক বেশি। তার মানে দলে লোক অনেকে বেড়ে গেছে। এই লোকগুলো কি আশেপাশের গ্রাম থেকে আসছে, নাকি বাইরে থেকেও এসেছে কেউ কেউ? পুজোর চারদিন মন্দিরের সামনে আরও বড়ো জমায়েত। সকাল থেকেই রান্নাবান্না চলছে, দুপুরে খাওয়াদাওয়া। রাত্রেও অনেক লোক মন্দিরেই থাকছে। কারণ সত্যদার ক্যামেরায় মন্দিরের ভিতরে এবং বাইরে যে হ্যাজাকের আলো জ্বলছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু আর তেমন কিছু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। রাত্রে লোকজন থাকে বলেই না হ্যাজাক জ্বালাচ্ছে, তা না হলে আর কে জ্বালাবে?
দ্বাদশীর দিন দুগ্গাপ্রতিমা বিসর্জনের পর সত্যদা শঙ্কু আর কানাইকে সন্ধেবেলা ডেকে পাঠাল। ওরা যাওয়ার পর সত্যদা তার সৃষ্টিঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলল, ‘শঙ্কু, গবেষণা মানে জানিস?”
“গবেষণা মানে এই বিজ্ঞান-টিজ্ঞান খুব ভালো করে লেখাপড়া আর চর্চা করা, এ আবার না জানার কী আছে?” শঙ্কু উত্তর দিল।
“আরেকটা মানে আছে, গরু খোঁজা।” পাশ থেকে কানাই উত্তর দিল।
“ভেরি গুড। কানাই একদম ঠিক বলেছিস। গবেষণার মধ্যে দুটো শব্দ লুকিয়ে আছে, গো আর এষণা। গো মানে গরু, আর এষণা মানে খোঁজ করা বা সন্ধান করা। আমাদের গরু হারিয়ে গেলে আমরা যেমন তন্ন তন্ন করে তাকে খুঁজি, ঠিক তেমনি কোনও বিষয়ের গভীরে ঢুকে তার সবকিছু জানার চেষ্টাকেও গবেষণা বলে। সেটা বিজ্ঞানও হতে পারে, অথবা যেকোনও বিষয়ই হতে পারে। তার মানে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে, শঙ্কুর হারিয়ে যাওয়া বাছুর খুঁজতে গিয়ে আমরা একদল লোকের সন্ধান পেয়েছি, যাদের উদ্দেশ্য খুব একটা সুবিধের নয়। আর আমরা সেটা নিয়েই গবেষণা করে চলেছি।”
সত্যদা একটু থামল। শঙ্কু আর কানাই চুপ করে সত্যদার কথা শুনছিল। তারা দু’জনেই সত্যদার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সত্যদা আবার বলল, “আমাদের গবেষণা মোটামুটি শেষ হয়ে এসেছে। এবার কাজে নামার সময়। আমরা কালকে একবার ঐ মন্দিরে আবার যাব। আমাদের গবেষণায় আমরা যা অনুমান করছি, তা সত্যি কি না দেখতে হবে। ঐ মন্দিরের ভিতরে এবং ঐ মন্দিরের নিচেয় যে গোপন কুঠুরি আছে দুটোতেই আমি ঢোকার চেষ্টা করব। তার জন্যে তোদের সাহায্য ভীষণভাবে দরকার। বুঝতেই পারছিস, ধরা পড়লে কী সাংঘাতিক কাণ্ড হতে পারে। কাজেই আমাদের খুব সাবধান হতে হবে। যদি কালকের অভিযান সফল হয়, আর যদি আমাদের ধারণা সত্যি হয়, তাহলে আমাদের পুলিশকে জানাতে হবে। কাজেই কালকের পুরো ব্যাপারটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।”
এরপর সত্যদার সঙ্গে শঙ্কু আর কানাইয়ের কালকের অভিযান সম্পর্কে আরও অনেকক্ষণ কথাবার্তা হল।

।।সাত।।

সত্যদা, শঙ্কু আর কানাই মন্দিরের সামনে ঝোপের আড়াল থেকে দেখে যা বুঝল, মন্দিরের ভিতরে বা পিছনের সেই চোরা কুঠুরিতে ঢোকার কোনও উপায়ই নেই। কারণ, সাত-আটজন মিস্ত্রি মন্দিরের ভিতরে-বাইরে কাজ করতে ব্যস্ত। তাদের চোখ এড়িয়ে ভেতরে ঢোকা অসম্ভব। তবে সত্যদার মনে হল, কাজের মিস্ত্রিরা ওই দলের কেউ নাও হতে পারে। দলের নেতারা এদেরকে হয়তো লাগিয়েছে কাজগুলো করে দেবার জন্যে। কাজ হয়ে গেলে নিশ্চয়ই টাকাকড়ি মিটিয়ে দিয়ে ছেড়ে দেবে। এরা হয়তো জানেও না এই মন্দির কেন সারানো হচ্ছে আর গোপন কুঠুরি কীসের জন্যে বানানো হচ্ছে।
সত্যদা আজ দলের সেই নেতা লোকটার মতোই সেজে এসেছে। চোখে চশমা, গালভর্তি দাড়িগোঁফ, এলোমেলো চুল, ব্রাউন পাঞ্জাবি আর জিনস। প্রায় মিনিট কুড়ি ঝোপের মধ্যেই তারা অপেক্ষা করল আর কেউ আসছে কি না দেখার জন্যে। কেউ এল না দেখে সত্যদা ফিসফিস করে বলল, “শোন, আমাকে ঝুঁকি নিতেই হবে। আমি যাচ্ছি। তোরা দু’জনে রাস্তার দিকে লক্ষ রাখবি, কাউকে আসতে দেখলেই যেমন বলেছিলাম সংকেত দিবি। মনে রাখিস, তোদের দু’জনের উপরেই সবকিছু নির্ভর করছে।”
ওরা তিনজনেই ঝোপের আড়ালে আড়ালে রাস্তার দিকে গেল। তারপর সত্যদা রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে গেল মন্দিরের দিকে, আর ওরা রাস্তার দু’ধারে ঝোপের আড়ালে বসে রইল রাস্তার দিকে চেয়ে। রাস্তার অনেকটা দূর অবধি দেখা যাচ্ছিল এখান থেকে। কেউ এলে দেখা যাবেই।
মন্দিরের সামনে কাজ করছিল যে মিস্ত্রিগুলো, তারা মুখ তুলে সত্যদাকে দেখল, কিছু বলল না। একজন মিস্ত্রি, সে বোধহয় হেডমিস্ত্রি, হাত তুলে নমস্কার করে বলল, “কীসে এলেন বাবু, হেঁটে? বাইক আনেননি?”
সত্যদা কথা না বলে ঘাড় নেড়ে ‘না’ বলল। কথা বললে ধরা পড়ে যাবার সম্ভাবনা। সত্যদা বলে, ছদ্মবেশে চেহারা পালটানো যায়, কিন্তু গলার স্বর পালটানো মুশকিল। আর সত্যদা দলের সেই নেতার কথাও শোনেনি। কাজেই গলা আর নকল করবে কী করে? তারপর চারদিক লক্ষ করতে করতে ঢুকে পড়ল মন্দিরের মধ্যে। গতদিনের চেয়ে মন্দিরের অবস্থা অনেকটাই ভালো। চারদিকের দেওয়াল সিমেণ্ট-বালি দিয়ে ভালোই সারাই করে নিয়েছে এই ক’দিনে। মেঝে আর বিশাল সেই বেদিটাও লাল সিমেন্ট দিয়ে মেজে-ঘষে ছিমছাম, পরিষ্কার। মন্দিরের ভেতরটাও চারদিক দেখে নিয়ে সত্যদা চটপট চলে এল বাইরে। তারপর মন্দিরটা ঘুরে পিছনের দিকে এগিয়ে গেল। সেই হেডমিস্ত্রিটাও আসতে লাগল সঙ্গে। বলল, “কালীপুজোর অনেক আগেই কাজ শেষ করে দেব, দেখবেন। আপনি কিন্তু বলেছিলেন বাবু, ঠিক সময় কাজ শেষ করতে পারলে বোনাস দেবেন। হেঁ হেঁ, সেই বোনাসের ব্যাপারটা ভুলবেন না যেন।”
সত্যদা কোনও কথা বলবে না। তাই গম্ভীরভাবে বলল, “হুঁ।”
মন্দিরের পিছনের সেই গর্তটা আজ আর চিনতে ভুল করেনি সত্যদা। গর্তের মুখটা ডালপালা, আর লতাপাতা দিয়ে ঢাকা। গর্তটার সামনে দাঁড়াতেই হেডমিস্ত্রি দৌড়ে গিয়ে ঝোপের আড়াল থেকে মইটা নিয়ে এসে গর্তের মধ্যে নামিয়ে দিল। সত্যদা মই ধরে নিচে নামবার সময় বাঁহাত তুলে মানা করল হেডমিস্ত্রিকে। সত্যদা চায় না তার সঙ্গে হেডমিস্ত্রি নিচেয় যাক। নিচেয় নেমে একবার পিছন ফিরে দেখে নিল সত্যদা, হেডমিস্ত্রি এসেছে কি না। না, আসেনি।
সত্যদা একটা তার আর দুটো সরু লোহার কাঠি দিয়ে সেই তালাবন্ধ দরজাটা চট করে খুলে ফেলল। ঘরের ভেতরটা অন্ধকার। প্রথমে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। একটু বাদে চোখটা সয়ে যেতে সত্যদা যতটুকু দেখতে পেল, তাতেই চোখ কপালে ওঠার যোগাড়। দরজাটা বন্ধ করে তালাটা আবার লাগিয়ে দিল। গতবারে বাঁদিকের যে জায়গায় সত্যদা লুকিয়ে ছিল, সে জায়গাটাও সারিয়ে নিয়ে এবার একটা ছোট্ট ঘরের মতো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।
সত্যদা আর সময় নষ্ট না করে মই বেয়ে উপরে উঠে এল। তার যা দেখার দেখা হয়ে গেছে, যা জানার জেনে ফেলেছে। এখন সবাই মিলে নিরাপদে ফিরতে হবে। হেডমিস্ত্রি মইটা টেনে তুলে আবার সেই ঝোপের আড়ালে রাখতে গেল যখন, সত্যদা দ্রুতপায়ে চলে গেল রাস্তার দিকে। রাস্তা ধরে কিছুটা গিয়ে ঢুকে পড়ল ডানদিকের ঝোপের মধ্যে। তারপর পকেটের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে বাজিয়ে দিল তার সংকেত, কিরররর, কিট কিট কিট, কিরররর। যেভাবে তক্ষক হঠাৎ হঠাৎ ডেকে ওঠে। মিনিট দুয়ের মধ্যে শঙ্কু আর মিনিট চারেকের মাথায় কানাই এসে জড়ো হতে সত্যদা ফিসফিস করে বলল, “অভিযান সফল। খুব সাবধানে চটপট কেটে পড়তে হবে।”

।।আট।।

পুলিশে খবর দেওয়ার ব্যাপারটা শঙ্কু আর কানাইয়ের মোটেও মনঃপূত হচ্ছিল না। ওদের মত, সত্যদা একাই একশো, তার আবার পুলিশের হেল্প নেওয়ার কী দরকার? কই, ফেলুদা কোনওদিন পুলিশের সাহায্য নিয়েছেন? উলটে পুলিশই ফেলুদার অনেকবার সাহায্য চেয়েছে।
শঙ্কুর মাথায় হাত বুলিয়ে সত্যদা বলল, “দূর পাগল, উনি স্বনামধন্য নমস্য মানুষ। ওঁর কথার অবাধ্য হওয়ার জো ছিল পুলিশের? আর এত বড়ো দলকে জব্দ করতে আমাদেরও শক্তিশালী ট্রেনিং পাওয়া দক্ষ লোকের দরকার। আর সেই লোকগুলিই হলেন পুলিশ।”

লক্ষ্মীপুজোর তিনদিন পরে ললিতকাকুর বাড়ি গেল সত্যদা আর শঙ্কু। লক্ষ্মীপুজোর দিন সকলেরই নেমন্তন্ন ছিল ললিতকাকুর বাড়ি। সেদিনই সত্যদা ললিতকাকুকে ব্যাপারটা সংক্ষেপে কিছুটা বলেছিল। সেটাই পুরোটা শোনার জন্যে ললিতকাকু আজ ডেকেছিলেন। প্রথমদিনের শঙ্কুর বাছুর হারানো থেকে শেষদিনের চোরা কুঠুরি পর্যন্ত সমস্ত ঘটনা ললিতকাকু খুব মন দিয়ে শুনলেন। কোথাও কিছু সন্দেহ হলেই সত্যদাকে থামিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অনেক প্রশ্ন করছিলেন। প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে পুরো ব্যাপারটা শুনে বললেন, “লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে এখন এইসব করে বেড়াচ্ছিস, শঙ্কু? তোর মা জানেন? সত্যকে কিছু বলার নেই, অমন ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট, কেমিস্ট্রিতে ডক্টরেট করে কোথায় কলেজে পড়াবে, বিদেশে যাবে - তা নয়, ঘরে বসে মশা তাড়াচ্ছে। কিন্তু তুই এসবের মধ্যে কেন?”
মা জানতে পারলে শঙ্কুর কপালে যে কী দুঃখ আছে, সে ভালোভাবেই জানে। কিন্তু জেনেশুনেও চুপ করে বসে থাকে কী করে?
শঙ্কু বলল, “মা জানলে কিন্তু রক্ষে থাকবে না, কাকু।”
“হুম। ঠিক আছে, শোন। তোরা এই নিয়ে কারও সঙ্গে আর কোনও কথা বলিস না। কেউ যেন একথা জানতে না পারে। তোদের খবর অনুযায়ী কাল সকাল থেকেই আমি তদন্ত চালু করে দিচ্ছি। তারপর কী করা যায় দেখছি।”
ললিতকাকু পুলিশে চাকরি করেন। কিন্তু থানার পুলিশ নয়। ললিতকাকু আসলে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের অফিসার। পুলিশের পোশাক না পরলেও বড়ো পুলিশ। ললিতকাকুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে সত্যদা আর শঙ্কু যে যার বাড়ি চলে গেল।

শঙ্কুর বুকের ভেতর এখন সবসময় ঢিপ ঢিপ করে, ললিতকাকু শয়তান লোকগুলোকে ধরতে পারল কি? আর ধরা পড়ার পর মা যদি জানতে পারে এর পিছনে শঙ্কুরও হাত আছে, তাহলে মা কী করবে? রোজই সকালে মা অফিস বেরিয়ে যাবার পর আর বিকেলে ফেরার আগে সে সত্যদার বাড়ি থেকে ঘুরে আসে। ললিতকাকুর কাছ থেকে কোনও খবর এসেছে কি না, আর সত্যদার ক্যামেরায় নতুন কিছু ঘটনার ছবি আর ধরা পড়ল কি না জানতে।
শঙ্কু এখন খুব মন দিয়ে লেখাপড়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কালীপুজোর আগে স্কুলের সমস্ত হোমটাস্ক শেষ করতেই হবে। কালীপুজোয় তাদের বাড়ি আসছে ঝিমলিদিদি, মাসিমা আর মেসোমশাই। ভাইফোঁটায় শঙ্কুর কপালে ফোঁটা দিয়ে তারপর ঝিমলিদিদিরা ফিরে যাবে। সেইসময় মা পড়ার জন্যে কোনও চাপ যেন না দিতে পারে। ঝিমলিদিদিদের সামনেও যদি বই নিয়ে বসতে হয়, তার চেয়ে দুঃখের আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু ভাঙা মন্দিরের রহস্যের কথা মনে পড়লেই তার পড়ায় আর মন বসে না। কী করছেন ললিতকাকু? ধরতে পারলেন কি লোকগুলোকে? কোনওদিক থেকেই কোনও খবর না পেয়ে শঙ্কু ধরেই নিল, লোকগুলোকে আর ধরা যাবে না। আগেভাগে খবর পেয়ে হয়তো পালিয়ে গিয়েছে সব্বাই।

কালীপুজোর দিন সকালে মা খুব খুশি। আগের দিন অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে শঙ্কুর স্কুলের খাতাপত্র দেখে খুব আদর করল। শঙ্কু সব হোমটাস্ক সেরে সুন্দর করে গুছিয়ে রেখেছিল। পড়াশুনোও মন্দ করেনি। সকাল থেকে শঙ্কু ঘরের জানালা দিয়ে বারবার বাইরে তাকাচ্ছিল ঝিমলিদিদিরা আসছে কি না দেখতে। মাও রান্না করতে করতে শঙ্কুর পাশে এসে দাঁড়াচ্ছিল বারবার। সাড়ে ন’টা নাগাদ ঝিমলিদিদিদের দেখা মিলল তাদের বাড়ি আসার গলির মোড়ে।
“মা মা, ঝিমলিদিদিরা এসে গেছে!” বলে শঙ্কু দৌড় লাগাল ওদের দিকে। মাও বাইরে এসে সদর দরজায় এসে দাঁড়াল, তার মুখে উজ্জ্বল হাসি।
ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই মেসোমশাই হৈ হৈ করে বলে উঠলেন, “হ্যাঁ রে শঙ্কু, তোদের গ্রামে এমন একটা ঘটনা হয়ে গেল, তোরা কেউ জানিস না?”
“কী হয়েছে গো, সন্দীপদা?” উদ্বিগ্ন মুখে শঙ্কুর মা জিগ্যেস করলেন।
“তোমাদের গ্রামে জঙ্গলের মধ্যে কোথায় একটা পোড়ো মন্দির আছে, সেখান থেকে কাল রাত্রে সতেরজনকে অ্যারেস্ট করেছে পুলিশ। আর মন্দিরের নিচে একটা চোরা কুঠুরি থেকে উদ্ধার করেছে প্রচুর বিস্ফোরক, বন্দুক, কার্তুজ। পুলিশ বলছে, ওই কুঠুরি থেকে যা বিস্ফোরক বেরিয়েছে, তা দিয়ে গোটা একটা শহরকে উড়িয়ে দিতে পারত লোকগুলো। খুব তাক মাফিক ধরা পড়েছে, তা না হলে কী যে হত কে জানে? এই দেখো না, খবরের কাগজে আজকে এটাই সবচে’ বড়ো খবর।” এই বলে খবরের কাগজটা মেলে ধরলেন মেসোমশাই।
শঙ্কু কাগজটা নিয়ে পড়তে বসল। আর মা বলল, “একটু দাঁড়াও, আমি তোমাদের জন্যে জলখাবারটা আনি, অনেকদূর থেকে তেতেপুড়ে এসেছ। খেতে খেতে সব খবর শুনব।”
জলখাবার খেতে খেতে ঐ খবরটা নিয়েই আলোচনা চলছিল। কাগজে খবরটা পড়ে শঙ্কুর খুব আনন্দ হচ্ছিল। যাক, তাদের কষ্টের অভিযান তাহলে ব্যর্থ হয়নি। ললিতকাকু যেমন বলেছিলেন, সেরকমই সবাইকে ধরে ফেলেছেন। কাগজে লিখেছে, আরও অনেক লোকের নাকি খোঁজ পাওয়া গেছে, তাদেরও সন্ধান করছে পুলিশ। তার মানে পুলিশও এখন সত্যদার মতো গবেষণা শুরু করে দিয়েছে! ইস, এ-সময় একবার সত্যদার সঙ্গে দেখা করে এলে ভালো হত। সত্যদা নিশ্চয়ই খবরটা পেয়ে গেছে।
এ-ঘরে শঙ্কু ঝিমলিদিদিকে পুজোয় ক’টা জামাপ্যান্ট হয়েছে দেখাচ্ছিল। ওদিকে খাবার ঘরে মাসিমা, মেসোমশাই আর মা জলখাবারের পর চা খাচ্ছিলেন। সেই সময় বসার ঘরে ঢুকলেন ললিতকাকু, আর তাঁর সঙ্গে সত্যদা। তাঁদের দু’জনকে মা খাবার ঘরে ডেকে এনে বসাল। মাসিমা-মেসোমশাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার পর মা দু’জনকেই চা দিল, সঙ্গে মিষ্টি আর চানাচুর। চা খেতে খেতে ললিতকাকু বললেন, “কালকের ঘটনার কথা শুনেছেন, নিশ্চয়ই?”
মা বলল, “হ্যাঁ, এইমাত্র শুনলাম সন্দীপদার কাছে। কী ভয়ংকর কাণ্ড! ঠিক সময় ধরা না পড়লে কী হত, ভাবতেই হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে।”
“ঠিকই বলেছেন। ওই পোড়ো মন্দিরের মধ্যে যে এত কাণ্ড হচ্ছে, কেউ জানতেই পারেনি! পুলিশও প্রথমে জানতে পারেনি!”
“বলেন কী? তাহলে কী করে ধরা পড়ল?” মেসোমশাই জিগ্যেস করলেন।
“এই গাঁয়েরই তিনজন রয়েছে ওদের ধরার পিছনে।” ললিতকাকু চায়ের কাপ খালি করে টেবিলে রাখতে রাখতে বললেন। “তিনটেই একনম্বরের ডানপিটে, শয়তান আর খুব দস্যি ছেলে। কিন্তু তাদের জন্যে কত যে নিরীহ মানুষ বেঁচে গেল...”
“দস্যি ছেলে বলছেন কী মশাই? এমন ছেলে তো বাহাদুর ছেলে! শুধু এই গ্রামের নয়, গোটা দেশের গর্ব।” মেসোমশাই বললেন।
উত্তরে ললিতকাকু বললেন, “হক কথা বলেছেন, সন্দীপবাবু। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে এই তিনজনকে বিশেষ পুরস্কার আর প্রশংসাপত্র দেব বলে ঠিক করেছি।”
“দেওয়াই তো উচিত। দেশে এমন বাহাদুর ছেলে অনেক আছে, দেশের জন্যে এমন কিছু করার জন্যে তারা সবাই উৎসাহ পাবে।”
ললিতকাকু হাসলেন। বললেন, “আপনার কথায় আমি পুলিশের লোক হয়েও উৎসাহ পাচ্ছি, বাহাদুর ছেলেরা তো পাবেই। তাহলে বলে রাখি, এই তিনজন হল আমাদের এই সত্য, আপনাদের শঙ্কু আর কানাই।”
মা প্রচণ্ড ভয়ে উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, “শঙ্কু! তুই! কতবার তোকে বারণ করেছি দুপুরে দুপুরে আদাড়ে বাদাড়ে ঘুরিস না। সন্দীপদা দেখো, আমার কী সর্বনাশ আর কী বিপদ হতে পারত! ডানপিটে, দস্যি ছেলে, আজ আমি তোর পিঠ ফাটাবো, দাঁড়া।”
ঝিমলিদিদির সামনেই মা মারবে শুনে শঙ্কুর মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। কী করেছে শঙ্কু? সব জেনেশুনেও লক্ষ্মীছেলের মতো ভাত খেয়ে দুপুরে ঘুমোয়নি, তাই? শঙ্কুর চোখে জল আসছিল। ঝিমলিদিদির সামনে সে একটুও কাঁদতে চাইছিল না, কিন্তু তাও!
ললিতকাকু বললেন, “ওই দেখুন, যতই ওরা বাহাদুরি দেখাক না কেন, ওরা কিন্তু আমাদের কাছে ডানপিটে আর দস্যি। আর ওদের পুরস্কার হল পিঠের ওপর লাঠির বাড়ি। কী বুঝছেন, সন্দীপবাবু? এটাই আপনাকে তখন বলছিলাম না?”
ললিতকাকুর এই কথায় সকলেই একটু থমকে গেলেন, এমনকি মাও। তারপর মা বুকে জড়িয়ে ধরল শঙ্কুকে। মায়ের দু’চোখ জলে ভরে উঠল। আর মায়ের বুকের আড়াল থেকে শঙ্কু দেখতে পেল ললিতকাকু মুচকি মুচকি হাসছেন, আর তার দিকেই তাকিয়ে আছেন। মায়ের শাড়ির আঁচলে শঙ্কু চট করে চোখের জল মুছে ফেলে ফিক করে হাসল। ঝিমলিদিদি যদি দেখে ফেলে শংকু কেঁদে দিয়েছে! না না, সে ভারি লজ্জার হবে।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ রুমেলা দাস

4 comments:

  1. বেশ..অফিসগুলো খুব বাজেই হয়..এইটা পিরিয়ড :-)

    ReplyDelete
    Replies
    1. অফিসগুলো বাজে - মনের মধ্যে সর্বদাই তার ঘন্টা বাজে!

      Delete
  2. আগেই পড়েছিলাম। খুব ভালো লেগেছে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. তুমি তো শুধু পড়োনি...গল্পটা চোখেও দেখেছো!

      Delete