চলো যাইঃ চলো যাই রাজধানীঃ মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী

চলো যাই রাজধানী

মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী


অ্যামেরিকার রাজধানী হল ওয়াশিংটন ডিসি দেশের পূর্বদিকে অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের ধারের একটি রাজ্য নিউ জার্সি সেখান থেকে রাজধানী ডিসির দূরত্ব মোটামুটি ১৯৩ মাইলের মতো গাড়িতে গেলে তিন-সাড়ে তিন ঘন্টাতেই পৌঁছে যাওয়া যায় অল্প কদিন  ছুটি পেলেও আরামসে ডিসি ঘুরে আসা যায় নিউ জার্সি থেকে তাই বেশ কয়েকবারই ঘোরা হয়ে গেল ডিসি
অ্যামেরিকার রেভলিউশনের পর ১৭৯১ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ডিস্ট্রিক্ট অফ কলোম্বিয়া সংক্ষেপে হয়েছে ডিসি; প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের নাম জুড়ে হয়েছে ওয়াশিংটন ডিসি পাশের দুটি রাজ্য, মেরিল্যান্ড ও ভার্জিনিয়া কিছু কিছু জমি দান করায় প্রায় ৬৮.৩৪ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে পোটোম্যাক নদীর অববাহিকায় তৈরি হয় নতুন রাজধানী এখানে বিভিন্ন সরকারি কার্যালয়ের পাশাপাশি প্রচুর মিউজিয়াম রয়েছে, স্মৃতিসৌধ রয়েছে সব ঘুরে দেখতে গেলে বেশ কয়েকদিন লেগে যায় বা বারে বারে যেতে হয় বিশেষ করে বসন্তের ফুল দেখতে বহু মানুষ যান
১৯১২ সালে জাপান-ইউনাইটেড স্টেটস মৈত্রীর প্রতীক হিসাবে জাপান থেকে কয়েক হাজার চেরিগাছ উপহার দেওয়া হয়, যার একটা বড়ো অংশ ওয়াশিংটন ডিসিতে পোটোম্যাক নদীর টাইডাল বেসিনে লাগান হয় সেসব গাছের কিছু নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অবশ্য পরে আবার লাগানো হয়েছে বসন্ত কালে পুরো এলাকা জুড়ে এত গাছে ফুল ফোটে একসাথে, খুবই মনোরম হয় সেই দৃশ্য
পায়ে হেঁটে, সাইকেল ভাড়া করে, বাসে - বিভিন্নভাবে ঘোরা যায় ডিসিতে গাড়িতে করে ঘোরা একটু অসুবিধের, কার, পার্কিং তো যেখানে সেখানে করা যাবে না, না? সাধারণত প্রথম দ্রষ্টব্য হয় ওয়াশিংটন মনুমেন্ট এই মনুমেন্টটি জর্জ ওয়াশিংটনের নামানুসারে নামকরণ করা হয়েছিল ১৮৪৮ সালে এটি তৈরির কাজ শুরু হলেও ১৮৫৪ থেকে ১৮৭৭ সাল পর্যন্ত ফান্ড কম থাকায় এর কাজ সাময়িক বন্ধ হয়ে যায় মনুমেন্টটি মার্বেল পাথর, গ্রানাইট এবং ব্লু স্টোন জেনেসিস দিয়ে তৈরি তবে লক্ষ করলে পাথরের রং আলাদা চোখে পড়বে কাজ বন্ধ হবার নির্দশন স্বরূপ ১৮৮৪ সালে বাইরের কাজ সম্পূর্ণ হলেও ভিতরের কাজ এবং ফিনিশিং টাচ দিতে দিতে ১৮৮৮ সাল হয়ে যায় মনুমেন্টটি একটি অবলিস্ক এবং পৃথিবীর উচ্চতম অবলিস্ক স্ট্রাকচার অবলিস্ক মানে লম্বা চারটি সাইডওয়ালা মাথার দিকটা সরু হয়ে পিরামিডের আকার নিয়েছে এমন স্ট্রাকচার পাঁচশো পঞ্চান্ন ফিটেরও কিছু লম্বা এই মনুমেন্ট ভিতর দিয়ে মনুমেন্টের মাথায় উঠবার ব্যবস্থা আছে যেখান থেকে পুরো ওয়াশিংটন ডিসি শহরটা, মেরিল্যান্ড ভার্জিনিয়াও দেখতে পাওয়া যায়
পরের দ্রষ্টব্য লিঙ্কন মেমোরিয়াল লিঙ্কন মেমোরিয়াল - নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে এটি ১৬তম প্রেসিডেন্ট অ্যাব্রাহাম লিঙ্কনের স্মৃতিসৌধ গ্রীক ডরিক টেম্পলের ধাঁচে তৈরি এই মেমোরিয়ালটি ১৯২২ সালে সর্বসাধারণের উদ্দেশ্যে খুলে দেওয়া হয় ভেতরে ষাট ফুট উঁচু, ষাট ফুট চওড়া, চুয়াত্তর ফুট লম্বা অ্যাব্রাহাম লিঙ্কনের একটি বসা মূর্তি দেখতে পাওয়া যাবে মূর্তিটির পিছনে ‘IN THIS TEMPLE AS IN THE HEARTS OF THE PEOPLE FOR WHOM HE SAVED THE UNION THE MEMORY OF ABRAHAM LINCOLN IS ENSHRINED FOREVER’ খোদাই করা আছে এই মেমোরিয়ালটির এখানেই ১৯৬৩ সালের ২৮শে আগস্ট মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র তাঁর প্রখ্যাতআই হ্যাভ আ ড্রিমস্পিচটি দিয়েছিলেন যেখানে দাঁড়িয়ে উনি স্পিচ দেন সেখানে একটি ফলক লাগানো আছে এই ওয়াশিংটন মনুমেন্ট ও লিঙ্কন মেমোরিয়ালের মধ্যবর্তী অংশে ভিয়েতনাম ওয়ার মেমোরিয়াল, কোরিয়ান ওয়ার মেমোরিয়াল এবং ওয়ার্ল্ড ওয়ার টু মেমোরিয়াল দেখতে পাওয়া যায় লিঙ্কন মেমোরিয়ালের ঠিক সামনে একটি রিফ্লেক্টিং পুল রয়েছে যাতে আমরা ওয়াশিংটন মনুমেন্টের ছায়া দেখতে পাই আর লিঙ্কন মেমোরিয়ালের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ওয়াশিংটন মনুমেন্ট এবং তার পিছনে ক্যাপিটল হিলকে এক লাইনে দেখতে পাওয়া যায় পুরো এলাকাটিকে ন্যাশনাল মল বলা হয় এইসব সৌধগুলি এবং স্মিথসোনিয়ান গ্রুপের তত্ত্বাবধানে অনেকগুলি মিউজিয়াম মলের অন্তর্গত ন্যাশনাল পার্কগুলি দেখভালকারী সংস্থা এই ন্যাশনাল মল এরও দায়িত্বে রয়েছে
কোরিয়ান ওয়ার মেমোরিয়ালে গ্রানাইট পাথরের দেওয়ালে FREEDOM IS NOT FREE কথাটি বড়ো বড়ো হরফে লেখা ও তার নিচে যোদ্ধাদের নাম খোদাই করা তার পাশেই ইউ.এস. আর্মির মেরিন কর্পস, নেভি কর্পস, এয়ার ফোর্সের যোদ্ধাদের মতো করে কিছু মূর্তি বানানো আছে এবং সেগুলিকে একটু গাছপালা জঙ্গলে বসানো, কোরিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রের এফেক্ট আনার জন্য এর পাশেই ভিয়েতনাম ওয়ার মেমোরিয়াল যেখানে কর্ণাটকের গ্যাব্রো পাথরের দেওয়ালে যোদ্ধাদের নাম খোদাই করা আছে তার আশেপাশে তিনজন সৈনিকের মূর্তি এবং একজন আহত সৈনিকের সেবায় রত এক মহিলার মূর্তি ভিয়েতনাম ওয়ারের যোদ্ধাদের ও যেসব মহিলারা ওই সময়ে সাহায্য করেছিলেন তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে রাখা আছে
এরপরেই ফোয়ারা ঘেরা ওয়ার্ল্ড ওয়ার টু মেমোরিরাল পোটোম্যাক নদীর টাইডাল বেসিনে রয়েছে টমাস জেফারসন মেমোরিয়াল মার্বেলের সৌধটি প্রায় লিঙ্কন মেমোরিয়ালের মতোই লম্বা লম্বা থামওয়ালা চেহারা মাথাটা অবশ্য গোল ভেতরে তৃতীয় প্রেসিডেন্ট এবং অ্যামেরিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা টমাস জেফারসনের একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি দেখতে পাওয়া যায়
২০১১ সালের আগস্টে ন্যাশনাল মলের ধারে আরও একটি সৌধ তৈরি হয় সেটি অ্যামেরিকার প্রখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ বিপ্লবী নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের স্মৃতিসৌধ সাদা গ্রানাইট পাথরের তিরিশ ফুট উচ্চতার মূর্তিটি তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতাআই হ্যাভ আ ড্রিম’-এর ৪৮ বছর পূর্তি উপলক্ষে উৎসর্গ করা হয় এর খানিকটা দূরেই রয়েছে ৩২তম প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডেলানো রুসভেল্টের স্মৃতিসৌধ পাথরে খোদাই করা আছে তাঁর বিখ্যাত উক্তিআই হেট ওয়ার একটি কৃত্রিম ঝরনাও দেখতে পাওয়া যায় এর চৌহদ্দিতে
এরপর হোয়াইট হাউস লিঙ্কন মেমোরিয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে ডানহাতের দিকে বেশ অনেকটা দূরত্ব গেলে দেখতে পাওয়া যাবে লম্বা লম্বা শিকওয়ালা বেড়ার বাইরে থেকে দেখতে হয় ভেতরে ঢুকতে গেলে অনুমতিপত্রের জন্য আলাদা করে আবেদন করতে হয় ১৮০০ সালে দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামস-এর সময় থেকে এই বাড়িটি প্রেসিডেন্টদের অফিসিয়াল রেসিডেন্স এবং প্রিন্সিপল ওয়ার্ক প্লেস হিসাবে ব্যবহৃত হয় তবে ১৮১৪ সালে বৃটিশ সৈন্যদের দ্বারা চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাড়িটি ভিতরের বাইরের বেশিরভাগটাই পুড়ে খাক হয়ে যায় যদিও তক্ষুনি সারাইয়ের কাজ শুরু হয় পঞ্চম প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ১৮১৭ সালে অর্ধ সারানো বাড়িতেই থাকতে শুরু করেন এইরকম সময় থেকেই বাড়িটির নাম হোয়াইট হাউস হয় সাদা রং দিয়ে পোড়া দাগ ঢাকা হয় বলে এই নাম চালু হয় এর আগে প্রেসিডেন্টস হাউস, প্রেসিডেন্টস প্যালেস, প্রেসিডেন্টস ম্যানসন এমন বিভিন্ন নামে ডাকা হত এরপর থেকে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নানান প্রেসিডেন্টের দ্বারা বাড়িটির এক্সটেনশন হয় তাতে সুবিধাজনক ব্যবস্থা নেওয়া হয় যেমন প্রেসিডেন্ট রুসভেল্ট-এর সময় থেকে হুইল চেয়ার নিয়ে চলার সুবিধা হয় এমন বন্দোবস্ত করা হয় বর্তমানে বাড়িটিতে রয়েছে ছতলা সমান প্রায় ৫৫০০০ স্কোয়ার ফিট ফ্লোর স্পেস, ১৩২টি ঘর, ৩৫টি বাথরুম, ৪১২টি দরজা, ১৪৭টি জানালা, আঠাশটি ফায়ার প্লেস, আটটি সিঁড়ি, তিনটি এলিভেটর, পাঁচজন ফুলটাইম শেফ, একটি টেনিস কোর্ট, একটি সিঙ্গল লেনের বোলিং অ্যালি, একটি মুভি থিয়েটার যেটিকে হোয়াইট হাউস ফ্যামিলি থিয়েটার নামেই বলা হয় এছাড়াও জগিং ট্র্যাক, সুইমিং পুল, পাটিং গ্রীন বা গল্ফ কোর্ট পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, প্রতি সপ্তাহে অন্তত তেত্রিশ হাজার মানুষ হোয়াইট হাউস দেখতে যান

বাসে গেলে হোয়াইট হাউস থেকে ক্যাপিটল বিল্ডিংয়ের দূরত্ব তেমন নয় ক্যাপিটল হিল হিস্টরিক ডিস্ট্রিক্টে অবস্থিত এই বাড়িটি ১৮০০ সাল থেকে ক্যাপিটল বিল্ডিং নামে পরিচিত এটি ইউনাইটেড স্টেটসের কংগ্রেসের বাড়ি এবং ক্যাপিটল হিল ও আশেপাশে বসবাসকারীদের কাজের জায়গা হিসাবে ব্যবহৃত হয় তৃতীয় প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন এই বাড়িটির নামকরণ করেন বিখ্যাত টেম্পল অফ জুপিটার অপ্টিমাস ম্যাক্সিমাস-এর সাথে সামঞ্জস্য পেয়ে উনি এই নাম দেন ল্যাটিন ভাষায় জুপিটারের মন্দিরকে Aedes lovis Optimi Maximi Capitolini বলা হয় সেই থেকেই এই নাম কংগ্রেসের অধিবেশন হয় এখানে তবে প্রায় প্রথমদিকে চার্চের কাজও হত এখান থেকে বিভিন্ন প্রেসিডেন্টের সৌজন্যে বাড়িটির এক্সটেনশন হয় বাড়িটির মূল আকর্ষণ এর রোটান্ডা এবং তাতে বিখ্যাত সব চিত্রশিল্পী ও ভাস্করদের কাজের নমুনা রোটান্ডা থেকে নর্থের দিকের ঘরগুলোকে S অর্থাৎ সেনেট আর সাউথের দিকের ঘরগুলো H অর্থাৎ হাউস হিসাবে নামকরণ করা হয় মূল অধিবেশন কক্ষটিকেও দেখা যায় ভেতরে গেলে ভেতরে ঢুকতে আলাদা করে অনুমতিপত্র নিয়ে লাইন দিয়ে ঢুকতে হয় যা বিনামূল্যেই পাওয়া যায় তবে সকাল সকাল লাইন দিতে পারলে ভালো বাইরে থেকে কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমরিয়ালের সঙ্গে প্রচুর মিল পাওয়া যায় ক্যাপিটলের
এই এলাকায় মিউজিয়ামের মধ্যে ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি আর ন্যাশনাল এয়ার এন্ড স্পেস মিউজিয়াম দুটি সবথেকে জনপ্রিয় ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে মমি, ডাইনোসরের কঙ্কালের পাশাপাশি পৃথিবীর বড়ো বড়ো বড়ো হীরাগুলির একটিকে দেখতে পাওয়া যায় এছাড়া আছে স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউট, ন্যশনাল মিউজিয়াম অফ আফ্রিকান অ্যামেরিকান হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার, ন্যাশনাল জুলজিকাল পার্ক, ন্যাশনাল গ্যালারি অফ আর্ট, ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ অ্যামেরিকান হিস্ট্রি, ইউনাইটেড স্টেটস হলোকাস্ট মিউজিয়াম, ইন্টার ন্যাশনাল স্পাই মিউজিয়াম, ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ অ্যামেরিকান ইন্ডিয়ান, নিউজিয়াম (নিউজের মিউজিয়াম), বোটানিকাল গার্ডেন ও আরও অনেক অনেক মিউজিয়াম

ক্যাপিটলের পাশে বা ওয়াশিংটন মনুমেন্টের পাশে বিশাল বিশাল মাঠ রয়েছে সেই মাঠের সবুজ ঘাস চোখ জুড়িয়ে দেয় এরই চারদিকে বেশিরভাগ মিউজিয়ামগুলো এছাড়াও ক্যাপিটলের ডানদিকে বেশ খানিকটা গেলে ইন্ডিয়ান অ্যাম্বাসির সামনে গান্ধীজীর আর ইন্দোনেশিয়ান অ্যাম্বাসির সামনে গেলে বিশ্বের সবথেকে বড়ো সরস্বতীর মূর্তি দেখা যাবে
ঘুরতে ঘুরতে খিদে পাবেই গলি রাস্তায় ধারে ধারে গাড়ি দাঁড় করিয়ে বিভিন্ন খাবার বিক্রি হয়, আবার একটু খোঁজ করলে বেশ জনপ্রিয় কিছু খাবারের দোকানও দেখা যাবে কাজেই খেয়ে একটু সময় বিশ্রাম করে আবার চলা যেতে পারে বা পরে কোনও সময় এসে বাকিটুকু দেখার পরিকল্পনায় বাড়ি অভিমুখে রওনা হওয়াও চলে
_____
ছবিঃ লেখিকা

No comments:

Post a Comment