গল্পঃ অদ্ভুতুড়ে নিশিজ্যাঠাঃ সায়ন্তনী বসু চৌধুরী


অদ্ভুতুড়ে নিশিজ্যাঠা

সায়ন্তনী বসু চৌধুরী


ঊনত্রিশ বছরের ডাক্তারি জীবনে নিশিকান্ত বাঁড়ুজ্যের মতো বেয়াড়া রোগী আমার কপালে আর একজনও জোটেনি। ডাক্তার হবার স্বপ্ন বুকে নিয়ে আমি গ্রাম ছেড়েছিলাম আঠারো বছর বয়সে। কলকাতার মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করার পর খালি হাতে আমার আর গ্রামে ফিরে যাবার ইচ্ছে হয়নি। মনে মনে পণ করেছিলাম, শহরে থেকে প্র্যাকটিস চালিয়ে বেশ ভালো পুঁজি জমিয়ে নিয়ে তবেই গ্রামে ফিরব। নিজের রোজগারের টাকায় একটা হাসপাতাল বানিয়ে বিনে পয়সায় গরিব-দুঃখীদের চিকিৎসা করব। তা টাকাকড়ি কিছুটা জমতে না জমতেই আমি মাঝবয়সে পৌঁছে গেলাম। বয়সের গুণে আর হাতের অর্থ সদ্ব্যবহারের টানেই দেশের বাড়ির জন্য আমার মনটা উতলা হয়ে উঠল। তল্পিতল্পা গুছিয়ে নিয়ে আমি সিউড়ি রওনা দিলাম। এদিককার পেশেন্টরা অবশ্য বিস্তর আপত্তি জানিয়েছিলেন। আমার ওষুধেই যাঁদের অভ্যেস তাঁরা তো একটা ছোটোখাটো বিদ্রোহ করে চেম্বারের সামনে ভিড়ও জমিয়েছিলেন। কিন্তু আমার কর্তব্য আর স্বপ্নের কথা জানাতে কেউই আর বাধা দিতে পারেননি। ওঁদের সকলকেই আমি ছাত্রবেলার বন্ধু ডাক্তার পরেশের ঠিকানা দিয়ে তবেই মুক্তি পেয়েছি।
আমার বাপ-কাকারা কেউই আর বেঁচে নেই। মা মারা গিয়েছেন আমার কৈশোরেই। খুড়তুতো বোনেরা নিজেদের সংসারধর্ম সামলে গাঁয়ের বাড়িতে আসার সময় পায় না। বহু পুরনো এক চাকর আমাদের ঘরবাড়ি, জমিজমা আজও যক্ষের মতো আগলে বসে আছে। সে চোখ বুজলে যে কী হবে জানা নেই। স্টেশন থেকে ভ্যান-রিকশায় চেপে বসে বাড়ির জন্য আমার আবেগ আরও ঘন হয়ে উঠল। ছোটোবেলার কথাগুলো বড্ড বেশি করে মনে পড়তে লাগল। স্মৃতিগুলো হাত-পা নাড়িয়ে চোখের সামনে নির্বাক চলচ্চিত্রের মতো পরিবেশিত হতে থাকল।
খামারবাড়িতে পৌঁছেই দেখি, ষষ্ঠীকাকা একটা লম্প হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বয়সের ভারে কাকা যেন বেঁকে ‘দ’ হয়ে গেছে। ভুরুর লোমগুলো পর্যন্ত দুধসাদা। আমায় দেখে ষষ্ঠীকাকা বলল, “খোকা আমাদের কত্ত বড়ো হয়েছেন, আজ মা-ঠাকরুন বেঁচে থাকলে কী যে আনন্দ পেতেন!”
বছর ছয়েক আগে বাবার শ্রাদ্ধশান্তির কাজ করতে এসেও কাকার মুখে আমি একই কথা শুনেছিলাম। তাই খানিকটা হেসে মৃদু আপত্তি জানালাম, “বড়ো কী গো? বলো বুড়ো।”
ষষ্ঠীকাকা, “বালাই ষাট ষাট,” করে উঠল।
মধ্য পঞ্চাশের আত্মীয়-পরিজনহীন ডাক্তারের জন্য এক অশীতিপর বৃদ্ধ চাকর যে সন্তানস্নেহ লালন করে বসে থাকতে পারে তা আমার বা আপনাদের কল্পনার অতীত হলেও এখানে চূড়ান্ত বাস্তব।

বাড়ীর ভেতরে ঢুকতেই একরাশ স্মৃতিগন্ধ আমায় ঘিরে ধরল। চা আর জলখাবার খেয়ে পুরনো দেরাজ ঘেঁটে আমি জমির কাগজপত্র বের করলাম। আমাদের ভিটের পশ্চিমে কিছু অংশে মুসলমানেদের গোরস্থান ছিল। সে প্রায় দেড়শো কি দুশো বছর আগের ব্যাপার। জায়গাটাকে আমরা নিচের বাড়ি বলতাম। বাড়ির মেয়েরা সেখানে যেত না। আর ছেলেমানুষদেরও ওখানে যাওয়া বারণ ছিলো। একবার ভরদুপুরে আমড়া পাড়তে গিয়ে ষষ্ঠীকাকা নিচের বাড়িতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল। পরে মেজকা চ্যাংদোলা করে তুলে আনে। জ্ঞান ফিরতে ষষ্ঠীকাকা বলেছিল, কে নাকি অদৃশ্য হাত দিয়ে ধাক্কা মেরে কাকাকে গাছের ডাল থেকে ফেলে দিয়েছিল।
ঘণ্টা খানেক পরেই ষষ্ঠীকাকা রাতের খাবার দিতে এল।
“বুঝলে কাকা, নিচের বাড়ির দিকটায় একটা হাসপাতাল করব ভাবছি। গ্রামে তো তেমন বড়ো হাসপাতাল নেই। তাছাড়া শহর থেকে ডাক্তার এসে বসলে লোকের উপকার বৈ অপকার তো হবে না! তা তোমার ভূতেরা কি আমায় পারমিশন দেবে? কী মনে হয়?”
আমার কথায় ষষ্ঠীকাকা কেমন যেন থম মেরে গেল। বলল, “ওসব নিয়ে ছেলেখেলা কিন্তু মোটে ভালো নয় গো খোকাবাবু! তুমি শিক্ষিত মানুষ হয়ে রাতবিরেতে ওসব নিয়ে ঠাট্টা করছ? এ বড়ো বাজে ব্যাপার। হাসপাতাল করবে তো ওই সুমুখের দিকেই করো না বাপু! ঠাকুরদালানের পাশে ডাক্তারখানা হবে, তোমার মায়েরও যে সেই স্বপ্নই ছিল।”
আমি হা হা করে খানিকটা হেসে বললাম, “কী যে বলো, কাকা! ডাক্তার আর ঠাকুরে যে চিরকালের ঝগড়া।”
ষষ্ঠীকাকা গজগজ করতে করতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
পরের দিন সকালে উঠে চা-টা খেয়ে আমি বেরিয়ে পড়লাম। ফুলবাগান, কলাবাগান পেরিয়ে আমবাগানের ভেতর দিয়ে পায়চারি করতে করতে নিচের বাড়ির দিকে যাচ্ছি, এমন সময় আমার ভালো নাম ধরে কে যেন ডেকে উঠল, “ও কে গো, পলাশ নাকি?”
ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখি পাঁচিলের ফুটো দিয়ে চশমার কাচে ঢাকা একজোড়া চোখ উঁকি মারছে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম।
“কে বলুন তো, ঠিক চিনতে পারলাম না তো!”
বাগানের গেট খুলে ভদ্রলোক ভেতরে এলেন। “কী করে চিনবে বলো? সেই দু’যুগ আগে তোমার সঙ্গে শেষ দেখা।”
ভদ্রলোককে চিনতে পেরে আমি উৎফুল্ল হয়ে খানিকটা চেঁচিয়েই বললাম, “আর-রে নিশিজ্যাঠা, আপনি! কেমন আছেন বলুন। শরীর ভালো তো আপনার?”
“এই কোনওমতে টেনেটুনে চলছি। তা তুমি কেমন দেখছ সেইটে বলো দেখি।”
টেনেটুনে! ভারি অবাক হলাম আমি। নিশিজ্যাঠা আমার বাবার চেয়ে বছর দশেকের বড়ো। বাবা মারা গেছেন আজ ছয় বছর হল। আর জ্যাঠা আমার চোখের সামনে দিব্যি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। সুস্থ, সবল, ঝকঝকে চোখমুখ, বয়সের চিহ্নমাত্র নেই। যে কেউ দেখলে বলবে পঞ্চান্ন কি বড়জোর ষাট বছরের লোক। বললাম, “বেশ ভালোই তো দেখছি! এই তো কেমন হাঁটতে বেরিয়েছেন।”
নিশিজ্যাঠা মাথা নেড়ে বললেন, “চার কুড়ি যোগ দশ বছর! কী বুঝলে?”
বললাম, “নব্বই।”
“এই যে আমাকে দেখছ, আমার বয়স এখন নব্বই বছর। এ বয়সে রাতে আমার ঘুম হয় না। খিদে পায় না। সারাক্ষণ মাথা টিপটিপ করে। আর তুমি বলছ বেশ ভালো? পারবে নাকি কোনও দাওয়াই দিতে?”
আমিও বড়ো মুখ করে বলে বসলাম, “এই বয়সে ওসব খুব স্বাভাবিক। আপনি আসুন না আমার বাড়ি। আমি কিছু ভালো ওষুধ দেব’খন।”
নিশিজ্যাঠা যুক্তিবাদী মানুষ। তাঁর গভীর বিশ্বাস, ডাক্তারের ভিজিট না দিলে রোগ সারে না। তাই সন্ধেবেলা মানিব্যাগ নিয়ে আমার কাছে আসবেন বললেন।”
সেই কোন ছোটোবেলায় বাড়ির বড়োদের চোখ এড়িয়ে একবার নিচের বাড়ির দিকে এসেছিলাম। ধরা পড়ার পর কী মারটাই না খেয়েছিলাম। এখনও স্পষ্ট মনে আছে। ভূতের ভয়ে নয়, বাবার রুলের ঘা খেয়েই আমার জ্বর এসে গিয়েছিল। আজ প্রায় চল্লিশ বছর পর এখানে এসে দাঁড়ালাম। জায়গাটা বনজঙ্গলে ভরে গেছে। তবুও ক’টা সবেদাগাছ আর পুরনো দু-তিনটে বাদামগাছ চোখে পড়ল।
কতক্ষণ হয়েছে ঠিক মনে নেই। হাতঘড়িটা ঘরেই ফেলে এসেছি। ষষ্ঠীকাকার ডাকে আমার সম্বিৎ ফিরল। বুড়ো খিড়কির দরজা পেরিয়ে পায়ে পায়ে আমাদের পুকুরের পাড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বুড়োর দৌড় ওই ওইটুকুই। আমি খুব ভালো করে জানি সে আর এগোবে না। পুকুরের ধার থেকেই কাকা আমায় দুপুরের খাবারের জন্য তাড়া দিতে লাগল।
সন্ধের ঠিক মুখেই নিশিজ্যাঠা এসে হাজির হলেন। “কই, পলাশ বাড়ি আছ নাকি?”
আমি তাড়াতাড়ি বারান্দায় বেরিয়ে গিয়ে জ্যাঠার হাতদুটো ধরে তাঁকে ভেতরে নিয়ে এলাম। নিশিজ্যাঠা বললেন, “এইবার তোমার আসল পরীক্ষা শুরু। দেখি তো কেমন ডাক্তারবাবু হয়েছ তুমি। এই নাও, নাড়ি টিপে বলো দেখি আমার খিদে কেন পায় না, কেন ঘুম হয় না।”
বাঁহাতটা আমার নাকের ডগায় বাড়িয়ে দিয়ে চশমার ফাঁক দিয়ে নিশিজ্যাঠা গোল গোল চোখ করে দেখতে লাগলেন। মুচকি হেসে আমি জ্যাঠার নাড়িটা টিপে ধরলাম। কিন্তু এ কী? এও সম্ভব! নিশিকান্ত বাঁড়ুজ্যের নাড়ির গতি একজন তরতাজা যুবকের থেকেও দ্রুততর। ব্লাড প্রেশার এক্কেবারে নর্মাল। মানুষটার শরীরের বয়স যে নব্বই, একজন ডাক্তার হিসেবে তার কোনও চিহ্নই আমি খুঁজে পেলাম না। কেবল মাথার চুলগুলো সাদা হয়ে গেছে।
গলাটা একটু ঝেড়ে নিয়ে আমি বললাম, “কেন ঠাট্টা করছেন, জ্যাঠা? এ বয়সে আপনার মতো সুস্থ আর ক’জন থাকতে পারে বলুন তো। এই তো আমিই হাই প্রেশারের রোগী। এ সবই আপনার শরীরচর্চার ফল, জ্যাঠা।”
যুবা বয়সে নিশিকান্ত জ্যাঠা মুগুর-টুগুর ভাঁজতেন। কুস্তির আখড়ায় যাবার অভ্যেসও ছিল একসময়। বাঘা বাঘা পালোয়ানকে একাই ঘায়েল করেছেন। সেসব গল্প আমার বাবার মুখে শোনা।
কথাগুলো শুনে দেখি নিশিবুড়ো অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে আছেন। খানিক বাদে ফিক ফিক করে ফিচেল হাসি হেসে তিনি বললেন, “শরীরচর্চা! তাতে বুঝি শরীর থাকে? না না না না, এসব শরীরচর্চার ফল নয় হে। এসব হল গিয়ে... থাক গে, তোমার আর জেনে কাজ নেই বাপু।” তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে মাথা চুলকে নিয়ে বললেন, “পারলে না তো? আমার ব্যারামের ওষুধ বলতে পারলে না তো?”
বললাম, “বেশি বয়সে অমন একটু আধটু সমস্যা হয়, জ্যাঠা। চিন্তার কোনও কারণ নেই। আর হ্যাঁ, বেশি ভাবনাচিন্তা করলেও কিন্তু ঘুম কমে যায়।”
ষষ্ঠীকাকা ইতিমধ্যে চা-জলখাবার নিয়ে হাজির। দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে নিশিজ্যাঠাকে দেখেই কাকার মুখটা কেমন বিবর্ণ হয়ে গেল। খাবারগুলো রেখে সে তাড়াতাড়ি রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। আর নিশিবুড়োও আমতা আমতা করে উঠে দাঁড়িয়ে বাড়ি ফেরার জন্য পা বাড়ালেন।
ব্যাপারটা কী হল ভাবতে ভাবতে যেই না চায়ে একটা চুমুক লাগিয়েছি, অমনি ষষ্ঠীকাকা রে রে করে তেড়ে এল। “দুপুর নেই, সন্ধে নেই, এ কাকে তুমি বাড়িতে ডেকে এনেছিলে খোকা?”
বললাম, “কাকে আবার কী গো কাকা? নিশিজ্যাঠা তো আমাদের প্রতিবেশী। একসময় তো উনি দু’বেলা আমাদের বাড়ি আসতেন। মাঝে জমিজমা নিয়ে গণ্ডগোল হয়েছিল বলে...”
ষষ্ঠীকাকা আমায় মাঝপথেই থামিয়ে দিল। “ব্যাটা একটা শয়তান সেকথা কি তুমি জানো? গ্রামের লোকে বলে এক এক করে বাচ্চা ছেলে মরে  আর এই বুড়োর আয়ু নাকি বাড়ে। ওহ্‌, তুমি তো আবার শহুরে ডাক্তারবাবু। এসব মানবে না। কিন্তু গ্রামের মুখ্যু চাষারা এসব মানে। আমিও মানি। তোমার বাবাও শেষের দিকে মানতেন।”

ভিটেয় এসে উঠলে অতি বড়ো সন্ন্যাসীর মনও নস্টালজিক হতে বাধ্য। আর আমি তো সামান্য ব্রহ্মচারী ডাক্তার। পাড়া বেড়ানোর নেশাটা ক’দিনেই আমায় পেয়ে বসেছে। হাসপাতাল যে করছি সেটা ফাইনাল। সামনের সপ্তাহেই কলকাতা থেকে আমার বন্ধু দীপেন আসছে। সে ইঞ্জিনিয়ার। হাসপাতালের কাজটা যে তাড়াতাড়ি এগোবে সে আশা রাখছি। ডাক্তারি কলেজের অনেক সহপাঠীই আমার হাসপাতালে এসে গ্রামের মানুষের জন্য কাজ করতে ইচ্ছুক। কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাহায্যও পাব। মনটা আনন্দে ভরে আছে আমার।
বিকেলের খানিক আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমি বামুনপাড়ার রাস্তা ধরে হাঁটছিলাম। হঠাৎ মনে হল, নিশিজ্যাঠাকে তো দিন সাতেক দেখিনি। সেই যে সেদিন সন্ধেবেলা গেলেন, কই আর তো দেখা নেই! বাড়ি থেকে না বেরিয়ে ঘর কামড়ে পড়ে থাকার লোক তো নিশিজ্যাঠা নয়। বামুনপাড়ার রাস্তা ধরে আমি সোজা নিশিকান্ত বাঁড়ুজ্যের বাড়ির দিকে এগোলাম।
মাঝপথে আমার এক্কেবারে ছেলেবেলার বন্ধু তিমিরের সঙ্গে দেখা। এত বছর পর আমাকে দেখে তিমির তো দারুণ খুশি হল। তবে আমার মনে হল বাল্যসখা নয়, হাতের কাছে একজন শহুরে ডাক্তারকে পেয়ে সে বেশি খুশি হয়েছে। সামান্য কুশল সংবাদটুকু বিনিময় না করেই তিমির বলল, “ভাই, আমার বাড়িতে একটিবার আসতে পারবি? বড্ড বিপদে পড়েছি রে।”
বললাম, “চল না, তোর সঙ্গেই যাচ্ছি। কিন্তু ঘটনাটা কী? বিপদ মানে?”
তিমির নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতেই উত্তর দিল, “আমার ছেলেটা বোধহয় আর বাঁচবে না রে। অনেকবার মানা করেছিলাম। যাসনি, শয়তানের বাড়িতে যাসনি। তা কিছুতেই আমার কথা শুনলে না।”
তিমিরের সঙ্গে সোজা ওর শোবার ঘরে গিয়ে ঢুকলাম। বছর চোদ্দর একটা ছেলে বিছানার ওপর কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। মুখ দেখা যাছে না। ছেলের মাথার কাছে বিবর্ণ মুখে তিমিরের স্ত্রী বসে রয়েছে।
জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে ওর?”
তিমিরের বউ জানাল, “তিনদিন আগে পর্যন্ত ছেলে একদম সুস্থ ছিল। কিন্তু গত পরশু বাঁড়ুজ্যেদের বাড়ি থেকে বুড়ো চাকর এসে পেয়ারার লোভ দেখিয়ে ওকে ডেকে নিয়ে গেল। ওই বাড়ি থেকে ফিরে ইস্তক ছেলে আমার আর উঠে বসতে পারেনি। জ্বরের ঘোরে সমানে ভুল বকে যাচ্ছে।”
তিমিরের স্ত্রী কাঁদতে লাগল। তার সঙ্গে তিমিরও বিলাপ করতে থাকল। আমি খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে ওদের দিকে চেয়ে রইলাম। তারপর পরিস্থিতি সামলাতে ক’টা হাই ডোজের অ্যান্টিবায়োটিক লিখে তিমিরের হাতে কাগজটা ধরিয়ে দিয়ে আমি বেরিয়ে এলাম। কিন্তু মনের মধ্যে নানারকম প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল। একটা বাচ্চা ছেলে, দুপুরের রোদে ঘুরে জ্বর বাধিয়েছে, অথচ দোষ হচ্ছে নিশিজ্যাঠার! অবাক কাণ্ড তো! নিশিজ্যাঠার বাড়ির দিকে আমার আর যেতে ইচ্ছে করল না।

রাত প্রায় দেড়টা বাজে। হঠাৎ সদর দরজার কড়া নাড়ার শব্দ হল। সেইসঙ্গে কে যেন আমার নাম ধরে ডাকছে। আমি জেগেই ছিলাম। ষষ্ঠীকাকা বুড়ো মানুষ। ভাবলাম, এই মাঝরাতে আর তাকে ডেকে কষ্ট কেন দেব, নিজেই উঠে যাই। দরজা খুলে দেখি, হাতে একটা বড়ো টর্চ নিয়ে তিমির দাঁড়িয়ে আছে। থমথমে চোখমুখ। আমায় কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই তিমির আমার পাদুটো জড়িয়ে ধরল। “আমার খোকাকে তুই বাঁচা পলাশ, একবারটি চল, তার যে খুব বাড়াবাড়ি!”
তিমিরের অবস্থা দেখে ওকে কোনও প্রশ্ন করার সাহস আমার হল না। আমার অ্যাটাচিটা সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
ঘরে ঢুকে দেখি, ছেলেটাকে ওরা খাটের সঙ্গে কষে বেঁধে রেখেছে। আর সে সমস্ত শক্তি দিয়ে ছটফট করছে। আমি তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে হাত-পায়ের বাঁধন খুলতে যাব, এমন সময় গাঁয়েরই একজন বয়স্ক মানুষ আমায় বাধা দিলেন। “পলাশ তুমি এইভাবেই চিকিৎসা করো, বাবা। এ-ছেলের এখন মাথার ঠিক নেই। ওকে খুলে দিলে আমাদেরই বিপদ বাড়বে।”
বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারছিলাম না আমি। হচ্ছেটা কী! একটা বাচ্চা ছেলের সামান্য জ্বর হয়েছে আর এরা বলছে শয়তানে ভর করেছে! মাথার ঠিক নেই? সিউড়ি কি এতটাই গ্রাম এখনও যে মানুষ যুক্তিতর্কেও কিছু বুঝতে চাইছে না? ওদের কথা না শুনেই আমি জোর করে বাচ্চাটার হাতের বাঁধন খুলে দিলাম। একটু কড়া গলাতেই বললাম, “দেখুন, আমায় যখন ডেকে আনা হয়েছে, তখন আমি আমার মতো করেই ট্রিটমেন্ট করব। কেউ মাথা ঘামাতে এলে আমি আর এ-ব্যাপারে থাকছি না।”
তিমিরের ছেলেটা নেতিয়ে পড়েছে। প্রায় অচেতন। থার্মোমিটার বলছে বডি টেম্পারেচার একশো চার। আমি ব্যাগ খুলে ইঞ্জেকশন বের করতে যাব, ঠিক সেই সময় ছেলেটা কাঁপতে শুরু করল। তারপর ধীরে ধীরে কম্বল সরিয়ে খাটের মধ্যিখানে হামাগুড়ি দেওয়ার ভঙ্গিতে উঠে বসল। ঝটকা মেরে মেরে নিজে পায়ের বাঁধন খুলতে লাগল। আমি তৎক্ষণাৎ বাধা দিতে গেলাম। আর চকিতে ছেলেটা অদ্ভুত শব্দ করে আমার ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়ল। আমার গলার ওপর চেপে বসেছে তিমিরের অসুস্থ ছেলে। আর প্রাণপণে আমি তার হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্য হাত-পা ছুড়ছি। একটা রোগাভোগা ছেলের গায়ে অত শক্তি! অবাক হচ্ছি আমি। আর গাঁয়ের লোকেদের কথাগুলো মনের মধ্যে পাক খাচ্ছে। গ্রামের চার-পাঁচজন জোয়ান ছেলে পেছন থেকে টেনে ধরেও বাচ্চাটাকে আমার বুকের ওপর থেকে নামাতে পারছে না। তিমির আর ওর স্ত্রী কান্নাকাটি করছে। ধস্তাধস্তিতে আমি বিছানার ওপর আধশোয়া হয়ে আছি। হঠাৎই ছেলেটা আমার গলার কাছটা কামড়ে ধরল। নখ দিয়ে আমার বুকের ওপর আঁচড় কাটতে শুরু করল। চেঁচাতে চেঁচাতে আমার গলা চিরে গেছে। সারা শরীরে অদ্ভুত ব্যথা ছড়িয়ে পড়ছে। শার্টটা ফালা ফালা হয়ে গেছে। গা থেকে রক্ত ঝরে পড়ছে। আমি প্রায় অজ্ঞান হব হব, সেই সময় ছেলেটা এক লম্বা লাফ মেরে আমার বুকের ওপর থেকে সোজা বারান্দায় গিয়ে পড়ল। ওর পেছনে রে রে করে লাঠি হাতে তেড়ে গেল সবাই। কোনওমতে আমি উঠে দাঁড়ালাম। শেষটা আমাকে দেখতেই হবে। আমার চোখের সামনেই তিমিরের ছেলে চারপায়ে লাফাতে লাফাতে উঠোনের কোণে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
গ্রামের ছেলেরা আমায় ধরাধরি করে বাড়িতে দিয়ে গেছে। ভোর হয়ে এসেছে। আমার গোটা গায়ে ব্যথা। একটা অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে র‍য়েছি আমি। আমার চোখের সামনে যা যা ঘটে গেছে আমার সম্পূর্ণ বোধ তাতে প্রশ্নজালে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। বিশ্বাস বা অবিশ্বাস করার মতো যুক্তি আমি খুঁজে পাইনি। গ্রামের মানুষের কথাই কি তবে সত্যি? এসব শয়তানের কাজ? কে সেই শয়তান? নিশিজ্যাঠা?
ঘটনাটার পর আমি আর বাড়ি থেকে বেরোইনি। শরীর খারাপের অজুহাত দিয়ে দীপেনকেও আসতে বারণ করে দিয়েছি। ষষ্ঠীকাকার মত, আমি যেন কলকাতা ফিরে যাই। আমি গ্রামে থাকলে শয়তান নাকি আমায় শেষ করে দেবে।

দু’সপ্তাহ কেটে গেছে। গায়ের কাটা ঘা অনেকটা শুকিয়ে গিয়েছে। তিমিরের ছেলেকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ষষ্ঠীকাকা আমাকে ক’টা মাদুলি আর কবজ পরিয়েছে।
শরীরটা সেদিন বেশ ভালো। আমি হাসপাতালের প্ল্যান নিয়ে বসেছি। গ্রামের জনা কুড়ি লোক হুড়মুড় করে আমার বসার ঘরে এসে ঢুকল।
“ডাক্তারদাদা, এবার একটা হেস্তনেস্ত করে তবেই আমরা ছাড়ব। দিনের পর দিন এইভাবে আর চলতে পারে না। কাল রাতে নিশিবুড়োকে তপনের বাড়ির জানালায় উঁকি মারতে দেখা গিয়েছিল। তার ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই তপনের এক সপ্তাহের ছেলেটা মুখ থেকে রক্ত উঠে মারা গেছে। এভাবে আর কতদিন?   বাঁড়ুজ্যেদের বাড়ি আমরা পুড়িয়ে দেব। এই নিয়ে ছ-ছ’টা ছেলে গেল। আর নয়।”
ওদের যে কী বলে শান্ত করব বুঝতে পারলাম না। শয়তানের ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দেবার মতো সাহস আর আমার নেই। ডাক্তার হয়েও মনে মনে অপদেবতায় বিশ্বাস করতে শুরু করেছি। শুধু বললাম, “আমার কাছেই যখন এসেছ, আমায় একটু ভাবতে দাও তোমরা। তোমাদের সমস্যার যদি কোনও সমাধান না করতে পারি, কথা দিলাম তখন আর তোমাদের আটকাব না।”

মাথার ভেতর দুশ্চিন্তা নিয়ে আমি ঘরে বসে থাকতে পারি না। ঠিক করলাম, ষষ্ঠীকাকাকে সঙ্গে নিয়েই নিশিকান্ত জ্যাঠার বাড়ি যাব। কিন্তু বহুবার ডাকাডাকি করেও ষষ্ঠীকাকার কোনও সাড়া পেলাম না। কী জানি, হয়তো কোনও দরকারে নিজের বাড়ি গেছে। অগত্যা গায়ে একটা পাতলা চাদর চাপিয়ে আমি একাই বাঁড়ুজ্যেদের বাড়ির দিকে হাঁটা লাগালাম। নিশিজ্যাঠার বাড়ির সামনে পৌঁছে বেশ অবাক হলাম আমি। সেই বিরাট বড়ো বাঁড়ুজ্যে-বাড়ি, বাগান, দালান সব যেন কেমন পুরনো পোড়ো বাড়ির মতো ম্লান হয়ে গেছে। আগের সেই ঝাঁ-চকচকে ভাবটা আর নেই। জ্যাঠার দুই ছেলেই বিদেশে থাকে। বুড়ো মানুষটা ভিটে আগলে একা একা পড়ে থেকে শেষে শয়তান বদনাম পেল! কী করুণ পরিণতি!
“নিশিজ্যাঠা, ও নিশিজ্যাঠা, বাড়ি আছেন?”
অনেকবার ডাকার পর একজন থুত্থুরে বুড়ো লোক এসে দরজা খুলে দিল। লোকটার আপাদমস্তক কালো চাদরে ঢাকা। অক্টোবরের শেষে এত ঠাণ্ডা লাগছে এঁর? অবাক হলাম। শিরা ওঠা হাতের কবজি দেখে আন্দাজ করলাম, আমাদের ষষ্ঠীকাকার বয়সীই হবে লোকটা। যাই হোক, খানিক ইতস্তত করে লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম, “নিশিজ্যাঠা আছেন?”
লোকটা কিচ্ছু না বলে কেবল ঘরের দিকে আঙুল তুলে দেখাল।
পর্দা সরিয়ে আমি জ্যাঠার ঘরে ঢুকলাম। সিনেমা হলের মতো অন্ধকার ঘর। জানালার কাচে পর্যন্ত মোটা মোটা কাপড় সাঁটা। চোখ খানিকটা অভ্যস্ত হলে দেখতে পেলাম, কালো কম্বল মুড়ি দিয়ে নিশিজ্যাঠা পালঙ্কে শুয়ে আছেন। পা টিপে টিপে মাথার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই নিশিজ্যাঠা নড়ে উঠলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “কে ও? পলাশ এলে নাকি?”
“হ্যাঁ, জ্যাঠা। আমিই এসেছি, কিন্তু আপনি বুঝলেন কেমন করে?”
জ্যাঠা বললেন, “গন্ধ, গন্ধ! মানুষের গন্ধ কি আর এত সহজে ভোলা যায় নাকি?”
রহস্যে আমার আশপাশ, আমার বোধবুদ্ধি ঢেকে গেছে। আর কত অবাক হতে বাকি আমার জানা নেই। চেয়ারটা টেনে নিয়ে আমি বিছানার পাশে বসলাম। কোনওরকম ভণিতা না করে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলাম, “গ্রামের লোকজন কী বলছে, জ্যাঠা?”
“কই, কী বলছে? জানি না তো।” ঘোলা চোখে বুড়ো আমার দিকে তাকাল।
“আপনি ভালো করেই জানেন, জ্যাঠা। তাই না লুকিয়ে বলুন। বাচ্চা খুন, শয়তান এসব কী?”
“তুমি যে কী বলছ পলাশ, আমার মাথায় তো কিছুই ঢুকছে না।”
আমি জ্যাঠার মুখের কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গিয়ে দু’হাত দিয়ে ওঁকে ঝাঁকিয়ে বললাম, “এরপর যদি ওরা আগুন জ্বালিয়ে দেয়, বাড়িসমেত আপনিও কিন্তু পুড়ে মরবেন! গোটা গ্রাম কিন্তু ক্ষেপে আছে। আর আপনার নিস্তার নেই।”
নিশিকান্ত কী একটা বলতে গিয়ে বিষম খেলেন। হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে সে কী কাশি! চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসার উপক্রম। যেন এখুনি মরে যাবে!
বুঝলাম ওখানে থাকাটা আর ঠিক নয়।

সন্ধে গড়িয়ে রাত হতে চলল। ষষ্ঠীকাকা ফিরল না। দুপুরের পর থেকেই আর তার টিকির চিহ্ন নেই। একে প্রবল দুশ্চিন্তা, তার ওপর ষষ্ঠীকাকা গায়েব। আমার মাথা যেন গুলিয়ে যেতে লাগল। খিদে-তেষ্টা মাথায় উঠেছে। চুপচাপ বিছানায় শুয়ে আছি আর ভাবছি, বেশ তো ভালোই ছিলাম কলকাতায়। কেন যে মরতে এই ভাগাড়ে এলাম কে জানে। সাতপাঁচ ভাবনা ভাবতে ভাবতে চোখ লেগে গিয়েছিল। হঠাৎ অনেক লোকের গলার আওয়াজে ‘মার মার’ চিৎকারে আমার তন্দ্রা ছুটে গেল। আওয়াজটা আমাদের নিচের বাড়ির দিক থেকে আসছে। কান খাড়া করে শুনলাম। মনে হচ্ছে, পঁচিশ-ত্রিশজন ছেলে-বুড়ো জড়ো হয়ে বিরাট কোনও ঝামেলা পাকিয়েছে। টর্চটা বগলদাবা করে নিয়ে পায়ে হাওয়াই চটির ফিতে গলিয়ে নিয়ে পড়ি কি মরি করে আমি দৌড়লাম।
নিচের বাড়ির এক্কেবারে শেষপ্রান্তে যেখানে একসময় মুসলমানদের কবর দেওয়া হত, সেইখানেই লোকজন জড়ো হয়েছে। তাদের হাতে লাঠি, বল্লাম আরও কত কী! আমাকে দেখে ওরা ভিড়ের একটা অংশ ফাঁকা করে জায়গা করে দিল। সকালে যে ছেলেগুলো এসেছিল, তাদেরই একজন বলে উঠল, “দেখুন পলাশদা, ব্যাটাকে এক্কেবারে হাতেনাতে পাকড়াও করেছি। আর সঙ্গে বুড়ো চাকরটাও আছে।”
দেখলাম, নিশিজ্যাঠা ঝোপের মধ্যে মাথা নিচু করে কুঁকড়ে বসে আছে। চোখে টর্চের আলো পড়ছে বলে ভয় পেয়ে কেমন যেন জড়সড়ো হয়ে আছে। কালো চাদর মুড়ি দেওয়া চাকরটাকে সকলে মিলে ধরে রেখেছে। আমার গলার আওয়াজ পেয়ে সে কেমন যেন অসাড় হয়ে আছে। আগে ছাড়া পাবার জন্য ছটফট করছিল; কিন্তু এখন আর নড়াচড়াই করছে না। হতভম্ব হয়ে আমি ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। দু’জন দুটো হাত ধরে নিশিবুড়োকে টেনে তুলল। বুড়োর চোখমুখ কেমন পালটে গেছে। ঠোঁটের কষে তাজা রক্ত লেগে আছে। বদ্ধ উন্মাদের মতো খিলখিল করে হাসছে বুড়ো।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এদের কোথায় পেলেন আপনারা?”
ভিড়ের ভেতর থেকে একজন বলে উঠল, “আমার বাড়ির গোয়ালঘরে। আমার গোরুটার আজ বাছুর হয়েছে। খবর পেয়ে অমনি শয়তানের নোলা সকসক করে উঠেছে।”
অজান্তেই আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “সে কি!”
লোকটা বলল, “তা নয় তো কী? দেখবেন চলুন, বাছুরটার একটা পা খুবলে খেয়েছে এই পিশাচ!”
বললাম, “চাকরটার মুখটা খোলো। ওর পরিচয়টা জানা দরকার।”
পাঁজাকোলা করে বুড়ো চাকরটাকে চেপে ধরে ওর মুখের চাদরটা সরিয়ে দেওয়া হল। লোকটাকে দেখে আমার তো বিস্ময়ে জ্ঞান হারানোর অবস্থা! আমার সামনে হাতখানেক দূরে দাঁড়িয়ে আছে আমাদেরই বাড়ির চল্লিশ বছরের পুরনো চাকর ষষ্ঠীকাকা!
আমায় দেখেই এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে অন্ধকারের মধ্যে দৌড়ে পালাল ষষ্ঠীকাকা। আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম।
ডাক্তারি বিদ্যে আমায় ভূতপ্রেত বা পিশাচে বিশ্বাস করতে শেখায়নি। সে রাতেই আমি পরেশকে ফোন করলাম। গ্রামের লোকদের সবকথা হেসে উড়িয়ে দিতে না পারলেও আমার বিশ্বাস যে নিশিকান্তজ্যাঠার মানসিক রোগের চিকিৎসা প্রয়োজন।

নিশিকান্ত ব্যানার্জীকে আমি কলকাতার নামকরা অ্যাসাইলামে ভর্তি করিয়েছিলাম। বিশেষজ্ঞরা নানাভাবে পরীক্ষা করে জানিয়েছিলেন, নিশিজ্যাঠা অসুস্থ। অতএব আমার সন্দেহ যে ঠিক সেটা নিয়ে আর কোনও দ্বিমত ছিল না। একা থাকতে থাকতে মানুষ নিজের মতো করেই নিজের জগতটাকে তৈরি করে নেয়। অনেক সময় কল্পনা আর বাস্তবের মাঝের সেই জগতে মানুষ নিজেকেই নানা চরিত্রে সাজিয়ে নিয়ে অভিনয় শুরু করে। মনোবিদরা বলেছিলেন, মাল্টিপল পার্সনালিটি ডিস-অর্ডার নামে একটা অসুখে নিশিজ্যাঠা আক্রান্ত।
অনেক চেষ্টা করেও নিশিজ্যাঠাকে আমরা বাঁচাতে পারিনি। উত্তেজিত হয়ে হাসপাতালের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে নিজেকে শেষ করে দেন নিশিজ্যাঠা। ষষ্ঠীকাকার ব্যাপারটা আমার কাছে আজও ধোঁয়াশা।
তবে সবচেয়ে খুশির ব্যাপার হল, আমাদের সেই নিচের বাড়ির জমিতেই আমার হাসপাতালটি এখন দিব্যি চলছে।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ অয়নদীপ চক্রবর্তী

1 comment:

  1. চমৎকার গল্প। প্রত্যেক চরিত্র জীবন্ত ।এক নিঃশ্বাসে পড়লাম ।শুধু একটা তথ্য ভুল আছে। সিউড়ি কোনো গ্রাম নয়। বীরভূমের জেলা শহর ।

    ReplyDelete