প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র

প্রচ্ছদ


সূচিপত্র

কচিপাতা
কমিকস
আঁকিবুঁকি


প্রথম গল্প
বিনোদবাবুর আসর অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
প্রার্থনা চুমকি চট্টোপাধ্যায়
ঠিকানার সন্ধানে জয়দীপ চক্রবর্তী
নেশা ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়
ময়ূর আর সূর্যের গল্প দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
ইচ্ছাপূরণ সৈকত মুখোপাধ্যায়


উপন্যাস
ত্রিকালচক্ষু সুদীপ চ্যাটার্জী
বনপর্ব নন্দিতা মিশ্র চক্রবর্তী
কেমিক্যাল বিভ্রাট সিদ্ধার্থ সিংহ


উপন্যাসিকা
উদ্বর্তন দৃপ্ত বর্মন রায়
টেক্কা দিলেন পিসিমণি অদিতি ভট্টাচার্য
টিয়া বাগান সুশান্ত কুমার ঘোষ
আবছা পৃথিবীটা রুমেলা দাস
ছদ্মবেশী শত্রু দেবদত্তা ব্যানার্জী


গল্প
অঙ্কিতার তুলি অনন্যা দাশ
মঈষাসুরের ইক্কুল অনুষ্টুপ শেঠ
ভূতনাথবাবুর ভূত অরিন্দম দেবনাথ
বার্মায় বুবাইমামা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
সহযাত্রী কিশোর ঘোষাল
কাকতাড়ুয়া কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
ঘূর্ণিপাহাড় দীপিকা মজুমদার
সম্রাট অশোকের কড়ি পবিত্র চক্রবর্তী
যদুবাবুর হাত পীযূষ হালদার
রমেনবাবুর আমগাছ পুষ্পেন মণ্ডল
রন্তিদেবের ডাকাত দর্শন প্রতীক কুমার মুখার্জি
চিংড়ি মণিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার
রূপকুমার মৃণালকান্তি সামন্ত
হেনরি গডফ্রের পাইপ সনৎকুমার ব্যানার্জ্জী
রূপকথা সায়নদীপা পলমল
মেলার মাঠে সুস্মিতা কুণ্ডু
ম্যান অব দ্য ম্যাচ সৌরভকুমার ভূঞ্যা
দুর্গামায়ের গয়না স্বরূপা রায়


জীবনের গল্প


রূপকথা
আশার আলো দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী


লোককাহিনি
অকৃতজ্ঞ স্যাকরা রাখি পুরকায়স্থ


অণুগল্প
নীল আকাশ বনশ্রী মিত্র
সেবক অরিন্দম দেবনাথ
রূপকথায় রবি ঠাকুর রূপসা ব্যানার্জী
লেবু-লজেন সুস্মিতা কুণ্ডু
ঘুড়ি বিভাবসু দে
সংকেত হীরক সেন
সাবধান অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
মাইন্ড চেঞ্জার সুদীপ চ্যাটার্জী


ছড়া
শরৎ এল দ্বারে সুজিত কুমার পাল
চল যাই মঙ্গল মধুমিতা ভট্টাচার্য
শরৎ আসে শংকর দেবনাথ
ছবি খুড়োর দুঃখ সুজাতা চ্যাটার্জী
পেটুক রাজার ডায়েটিং রূপসা ব্যানার্জী
লিমেরিকে সুকুমার শাম্ব চ্যাটার্জী
যেন রূপকথার দেশ তনয় ভট্টাচার্য
শরৎ এল ঝিল দত্ত
পাখিদের কথা শ্রীমন্ত দে
বাঘের বিয়ে প্রিন্স মাহমুদ হাসান
আয় বৃষ্টি ঝেঁপে সুদীপ্ত বিশ্বাস
প্রিয় খেলনা হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
ঐতিহাসিক হীরক সেন


স্মৃতির প্রজাপতিরা
স্মৃতিতে দুর্গাপূজা দীপঙ্কর চক্রবর্তী


দুষ্টুমিষ্টি
 বিশ্বাসঘাতক সঙ্ঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়
লক্ষ্মীমেয়ে শ্রাবণী গুপ্ত সরকার
ছয় ইঁদুর প্রকল্প ভট্টাচার্য
তিতলি যখন টিচার দেবদত্তা ব্যানার্জী
অবাক জলপান সুস্মিতা কুণ্ডু


বিজ্ঞানের পাঠশালা
আল্লা ম্যাঘ দে অমিতাভ প্রামাণিক
ডিম নকল করার কারিগর তপন কুমার গঙ্গোপাধ্যায়
যা দেখি, যা শুনি... (৪র্থ পর্ব) কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়
অতিপরিবাহিতা নীলোৎপল ঘোষ


প্রবন্ধ
পরমা প্রকৃতি দেবী দুর্গা সুশান্ত কুমার রায়
মেঘের দেশে সে এক স্কুল অরিন্দম দেবনাথ


চলো যাই
পাতাল শহর ডেরিনকুয়ু কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়


ধারাবাহিক
তুষার যুগ(৪র্থ পর্ব) অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়


বইকথা
চাঁদের পাহাড় অমৃতা বিশ্বাস সরকার


আমার স্কুল রঞ্জন দাশগুপ্ত



বিভাগীয় সম্পাদক
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
সুস্মিতা কুণ্ডু

কচিপাতাঃ কমিকসঃ শাশ্বত রায়


শাশ্বত রায় (১৬)
দুর্গাপুর আর.ই মডেল স্কুল

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ কৃষ্ণেন্দু মজুমদার


কৃষ্ণেন্দু মজুমদার (১২)
বিধাননগর গভঃ স্পনসর্ড হাই স্কুল
বিধাননগর, দুর্গাপুর

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ রূপকথা সরকার




রূপকথা সরকার (৫)
বাঁকুড়া গার্লস প্রাইমারি স্কুল
প্রি-প্রাইমারি
ভাদুল, বাঁকুড়া

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ সমৃদ্ধি ব্যানার্জী


সমৃদ্ধি ব্যানার্জী
দিল্লি পাবলিক স্কুল, কলকাতা
ক্লাস থ্রি

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ রাজন্যা ব্যানার্জি


রাজন্যা ব্যানার্জি (৮)
স্কুলঃ গসপেল হোম স্কুল
তৃতীয় শ্রেণী

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ আদিত্যকুমার রায়



আদিত্যকুমার রায়
বাংলাদেশ

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ মহীরুহ দাশ

আলাদিন
Rupanzel-এর চুল ধরে Witch উঠছে
এটা কে সে জানে না


মহীরুহ দাশ (৩)

কিডজি, নার্সারি
হায়দ্রাবাদ


কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ ঈশাণী ব্যানার্জ্জী




ঈশাণী ব্যানার্জ্জী (৬)
স্কুলঃ নিউ হরাইজন স্কলার'স স্কুল
প্রথম শ্রেণী
থানে, মহারাষ্ট্র

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ মাধুর্য মিত্র


মাধুর্য মিত্র
মাউন্ট লিটেরা জি স্কুল
তৃতীয় শ্রেণী
বহরমপুর
মুর্শিদাবাদ

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ শুভ্রজা চ্যাটার্জী


শুভ্রজা চ্যাটার্জী (৫)
স্কুলঃ St. Genevieve, Brussels, Belgium.
শ্রেণীঃ M3

উপন্যাসঃ বনপর্বঃ নন্দিতা মিশ্র চক্রবর্তী



এক


পাণ্ডবরা রাজপুত্র হয়েও এখন বনবাসী। তাদের পরনে সাধারণ তপস্বীদের মতো কাষায় বস্ত্র। থাকার জন্য রাজপুরীর বদলে গাছতলা। প্রখর সূর্যের তাপ থেকে বাঁচতে তাঁরা বনের গভীরে কয়েকটা কুঁড়েঘর বেঁধে নিয়েছেন। একেকদিন বনের ফলমূল পাওয়াও কঠিন হয়ে ওঠে। তখন সকলে কন্দ ও মূল সেদ্ধ খেয়ে থাকেন। তাদের সঙ্গী হয়েছেন দ্রৌপদী, তিনি পঞ্চপাণ্ডবের স্ত্রী। পাঞ্চাল রাজকন্যা হয়েও তিনি এখন বনের গাছতলায় থেকে বারাহীকন্দ মাটির তলা থেকে তুলে সকলের খাদ্য তৈরি করছেন। বারাহী অর্থাৎ বরাহ বা শূকর। একধরনের লতার শেকড়ের সঙ্গে এই কন্দ পাওয়া যায়। কন্দটি আকারে শূকরের মতো এবং বিরাট। বেড়ে ওঠে মাটির তলায়। খেতে অবশ্য তেমন সুস্বাদু নয়। কষাটে এবং খানিকটা তিতকুটে। খাবারের অভাবে সকলে এখন সেটাই শান্ত হয়ে খেয়ে নিচ্ছেন।
কিন্তু ছোট্ট বন্ধুরা, নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে এমন ভীষণ দুর্ভোগ কেন সহ্য করছেন রাজপুত্র পাণ্ডবেরা? কেনই বা বনবাসে এসেছেন? এই প্রশ্নের উত্তর অল্পকথায় দিয়ে পাণ্ডবদের বনবাসের গল্পই বলি আজকে তোমাদের। একটা দুটো দিন নয়, পাণ্ডবেরা এই বনবাসে কাটান একটানা বারো বছর। তখনকার দিনে বনের অভাব ছিল না। মানুষ নিজের প্রয়োজনেই বন সৃজন করতেন। অনেক বনের ভেতর তখন ছিল আশ্রম, সেখানে তপস্বীরা থাকতেন এবং তপস্যা করতেন।
অর্জুন তৃতীয় পাণ্ডব, আর ভীম হলেন মধ্যম পাণ্ডব। দু’জনেই পরম পরাক্রমী বীর। অর্জুন যেমন ধনুর্বিদ্যায় পারদর্শী, ভীম তেমন গদা চালনায় দক্ষ। পঞ্চপাণ্ডবদের পাঁচ ভাইয়ের সকলেই পরম বীর, তবে তাঁদের  মধ্যে অর্জুন এবং ভীম হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। কৌরবদের মধ্যে দুর্যোধনও গদাযুদ্ধে খুব পটু, বীরত্বে তিনিও কম নন। তিনি হলেন ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র। দুর্যোধন, দুঃশাসন এরা সবমিলিয়ে মোট একশো ভাই। অন্যদিকে পাণ্ডুর পুত্ররা সংখ্যায় পাঁচজন। তাঁরা পঞ্চপাণ্ডব নামে পরিচিত। বড়ো থেকে ছোটো তাঁরা যথাক্রমে হলেন যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব।
দুর্যোধন ছোটো থেকেই পাণ্ডবদের ভয়ানক হিংসা করেন, একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। কারণ, হস্তিনাপুরের সিংহাসনের প্রকৃত অধিকারী হলেন পাণ্ডবেরা। পাণ্ডবদের পিতা রাজা পাণ্ডু অকালে মারা যেতে তাঁর নাবালক পুত্রদের হয়ে রাজ্য চালাচ্ছিলেন তাঁদের জ্যাঠামশাই ধৃতরাষ্ট্র। তিনি অন্ধ হওয়ায় সিংহাসনের অধিকারী হননি। তাঁর ছোটোভাই পাণ্ডুই রাজা হয়েছিলেন।
পাণ্ডুর মৃত্যুর পর কুলপ্রথা অনুসারে রাজা হবেন বংশের জ্যেষ্ঠপুত্র। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র দুর্যোধন আবার বয়সে পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠিরের চেয়ে ছোটো। সুতরাং কুলপ্রথামতো রাজা হবেন যুধিষ্ঠির। সেইজন্যই ছোটো থেকে পাণ্ডুপুত্রদের কাউকেই দুর্যোধন পছন্দ করেন না।
ছোটোবেলায় তিনি ভীমকে সব ভাইদের মধ্যে বলিষ্ঠ ও শক্তিশালী দেখে তাঁকে একবার বিষ খাইয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন। ভীমকে বিষ মাখানো সন্দেশ খাইয়ে দুর্যোধন নদীর জলে ফেলে দিয়েছিলেন। তবে ভীমের তাতে মৃত্যু হয়নি। ভীম জলে পড়ে যাওয়ার পরে জলের তলায় নাগলোকে চলে গেছিলেন। সাপেরা তাঁকে সেখানে কামড়ালে তাঁর শরীরের আগেকার বিষের প্রভাব নষ্ট হয়ে যায়। সাপেরা ভীমকে জীবিত দেখে অবাক হয়ে তাঁকে তাদের রাজার কাছে নিয়ে যায়। সেখানে নির্ভীক ভীমকে অনেক উপহার দিয়ে আবার নদীর তীরে জলের উপরে পৌঁছে দেন সর্পরাজ। এইসব দেখে দুর্যোধন আরও রেগে যান।
এরপর দুর্যোধন পাণ্ডবদের বারাণবত নামক একটি জায়গায় পাঠিয়ে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সফল হতে পারেননি। পাণ্ডবরা সেখান থেকে কৌশলে পালিয়ে আসেন। তারপর বিরাট নগরে গিয়ে দ্রৌপদীকে স্বয়ম্বর সভায় লাভ করেন। বিরাট রাজা পরম পরাক্রমী রাজা। তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন হওয়ায় পাণ্ডবদের শক্তিও অনেক বেড়ে যায়।
এরপর পাণ্ডবরা খাণ্ডব বন দহন করে ইন্দ্রপ্রস্থ নামের এক অপরূপ রাজ্য গড়ে তুললেন। সেখানে কৃষ্ণের কথায় ময়দানব তাঁদের জন্য বানিয়ে দিলেন এক অনন্য সাধারণ রাজপ্রাসাদ। পাণ্ডবদের একের পর এক সাফল্য এবং তাঁদের রাজ্যলাভ দুর্যোধনের মনে হিংসার আগুন জ্বেলে দিল। পাণ্ডবদের ঐশ্বর্য দেখে দুর্যোধন রাগে আর হিংসায় জ্বলে পুড়ে যেতে লাগলেন। এদিকে রাজ্যলাভ করেই যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞ করলেন। তাতে তিনি বহু রাজ্যকে মিত্র হিসেবে পেলেন। বহু রাজা স্বেচ্ছায় না হলেও বাধ্য হলেন তাঁর অধীনতা মেনে নিতে। করদ রাজ্যগুলি থেকে যুধিষ্ঠির এত উপহার পেলেন যে তা শুধু দেখে উঠতেই একবছর সময় লেগে যায়। যজ্ঞের পরে যুধিষ্ঠির নিজেকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করলেন। আর সহ্য হল না দুর্যোধনের। তিনি যুধিষ্ঠিরের রাজ্য কেড়ে নেবার জন্য নানা ফন্দি আঁটতে লাগলেন।
কূট দুর্যোধন এরপর তাঁর মামা শকুনিকে দিয়ে একটি এমন পাশা-ছক তৈরি করালেন যাতে শকুনির কথা অনুযায়ী সেখানে সর্বদা ঘুঁটি চলবে। তারপর তাঁরা বিদুরকে দিয়ে যুধিষ্ঠিরকে অনেক মিষ্টি কথা বলে নিমন্ত্রণ করে হস্তিনাপুরে ডেকে আনলেন।
পাশাখেলায় যুধিষ্ঠিরের হার হল। পাণ্ডবরা ও দ্রৌপদী অনেক অপমান সহ্য করার পরেও দুর্যোধনের অনুরোধে দ্বিতীয়বার আবার পাশা খেলা হল। এই খেলায়ও যুধিষ্ঠির আবারও পরাজিত হলেন। খেলার শর্ত অনুযায়ী তাঁকে রাজপুরী ত্যাগ করে বারো বছরের জন্য বনবাস এবং একবছর অজ্ঞাতবাস স্বীকার করতে হল। অজ্ঞাতবাসে অজ্ঞাতে অর্থাৎ লুকিয়ে না থাকতে পারলে আবার বারো বছর বনবাস স্বীকার করতে হবে। যুধিষ্ঠির সত্যনিষ্ঠ। তিনি প্রতিশ্রুত হলেন। তারপর পরাজিত হয়ে মাথা নিচু করে রাজপুরী ত্যাগ করে উত্তরমুখে বনে চলে গেলেন।


দুই


পাণ্ডবরা এখন কাম্যক বনে আছেন। বিরাট বিরাট গাছের ঠাসবুনোটে গড়ে উঠেছে এই কাম্যক বন। দিনের আলোতেও এই বনের পথ গাছের ছায়ায় অন্ধকার থাকে। চারদিকে তমাল, তাল, অর্জুন, কেলী-কদম (নীপ), কদম, পারুল, সর্জ, কর্ণিকার, স্বর্ণচম্পক এইসব বড়ো বড়ো গাছের ভিড়। এছাড়া আরও কত যে লতা, কত যে বীরুৎ বনভূমিতে বিরাজ করছে তার ইয়ত্তা নেই। বনভূমিতে খাবার হিসেবে কন্দ ও ফলগাছের অভাব নেই। আছে নানাধরনের কলাগাছ, ফলসা (পরুষক), কাঁঠাল (পনস), আম, জাম, আমড়া, বেল (অমৃতফল), কতবেল (কপিত্থ) এইসব নানারকম ফলের গাছ। কন্দের মধ্যে ওল বা শূরণ, শটির কন্দ, (যা থেকে সুগন্ধি পালো পাওয়া যায়), শোলা কচুর বনে পাওয়া যায় বিরাট বিরাট কন্দ। তা যেমন সুস্বাদু তেমনই পুষ্টিকর। ঈশ্বর জীবের যেমন খিদে দিয়েছেন, তেমন তাদের অনেকরকম আহারেরও ব্যবস্থা করে রেখেছেন বনস্থলীতে। বনের ভেতর থাকে কত উপজাতির মানুষ। থাকেন তপস্বীরা, আশ্রমিকরা এবং আরও কত ধার্মিক মানুষেরা। বনবাসী হওয়ার পর কিছুদিন গঙ্গার তীরে থেকে পাণ্ডবেরা অবশেষে এই কাম্যক বনে এসে উপস্থিত হয়েছেন।
দুর্যোধন ও শকুনির চক্রান্তে পঞ্চপাণ্ডব পাশা খেলে তাঁদের সর্বস্ব হারিয়েছেন। তাঁদের এখন না আছে থাকার জন্য রাজপ্রাসাদ, না আছে ধনরত্ন। তবুও কিছু অনুগত দাসদাসী ও ব্রাহ্মণেরা তাঁদের এখনও ছেড়ে যাননি। মহারাজ যুধিষ্ঠির তাঁদের কীভাবে খাওয়াবেন পরাবেন ভেবে না পেয়ে ভয়ানক বিব্রত হলেন। একেই ভীমের খাবার জোগাড় করতেই সকলে অস্থির হয়ে যায়। মধ্যম পাণ্ডব ভীম মহা বলশালী এবং সেই সঙ্গে তাঁর খিদেও সেরকম ভয়ানক। ভীম নিজেই বলেন, তাঁর পেটে বৃকাসুর নামক এক অসুর সবসময় হাঁ করে থাকে। খাবার পৌঁছালেই তা এক নিমেষে হজম করে ফেলে।
বনের ফলমূল ইত্যাদি যা খাবার পাওয়া যায় তার সিংহভাগ ভীম একাই খেয়ে নেন। বাকি খাবার দ্রৌপদী ও বাকি ভাইদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হয়। তার উপর অনুগত লোকজনের জন্যও খাদ্য প্রয়োজন। এই বিপুল পরিমাণ খাদ্যবস্তু কোথা থেকে এবং কীভাবে রোজ পাওয়া যাবে? এছাড়া বন্ধু রাজারা সপরিবারে মাঝেমধ্যেই বনে তাঁদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করতে আসছেন। তাদেরও খাবার ও জল দিয়ে আপ্যায়ন করতে হয়। অতএব খাবারের চিন্তাই বনবাসী যুধিষ্ঠিরের বড়ো চিন্তা হয়ে দাঁড়াল।
পুরোহিত ধৌম্য যুধিষ্ঠিরকে চিন্তান্বিত দেখে বললেন, “মহারাজ আপনি চিন্তা করবেন না। আপনি সূর্যের অষ্টোত্তর শতনাম জপ করুন এবং সূর্যের উপাসনা করুন। সূর্য সকল প্রাণীর প্রাণস্বরূপ। তাঁর প্রভাবেই অন্ন উৎপন্ন হয়। তিনি না থাকলে প্রাণীকুল অনাথ।”
ধৌম্যের কথামতো যুধিষ্ঠির সূর্যের উপাসনা শুরু করলেন। সূর্যের একশো আটটি নাম তিনি জপ করতে লাগলেন। নদীর জলে অর্ধেক ডুবে তিনি কঠোর সাধনায় সূর্যকে সন্তুষ্ট করলেন। সূর্যদেব তাঁকে দেখা দিয়ে একটি ছোটো তামার থালা দিলেন। বললেন, “এই থালায় অন্ন উৎপন্ন হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত দ্রৌপদী অভুক্ত থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই থালাতে সকলের জন্য দুপুরের খাবার পাওয়া যাবে।”
এত ছোটো একটি থালাতে কী করে সকলের খাদ্য পাওয়া যাবে তা দেখতে যুধিষ্ঠির অত্যন্ত কৌতূহলী হলেন। তিনি নিজে দ্রৌপদীর সঙ্গে পাকশালায় এসে উপস্থিত হলেন। তবে সূর্যের আশীর্বাদে দ্রৌপদী না খাওয়া পর্যন্ত ছোটো থালাটি সর্বদাই খাদ্যে পরিপূর্ণ থাকায় কারও খাদ্যের অভাব আর রইল না। খাবারের সমস্যা মেটায় ভীমও খুব খুশি হলেন।
কাম্যক বনে আসার পরেই পাণ্ডবদের এক ভয়ংকর রাক্ষস আক্রমণ করেছিল। (সেই সময় কিছু অনার্য মানুষেরা বনে থাকতেন এবং তারা পশুপাখির মাংস ছাড়াও মানুষের মাংসও খেতেন। তাদের আকার আকৃতি ছিল বিরাট এবং ভয়ংকর। আর্যরা তাদেরই রাক্ষস বলে অভিহিত করেছেন। আসলে রাক্ষস বলে কিছু হয় না।) ভীম এই রাক্ষসদের একদমই ভয় পান না। অনার্য একজন এমনই রাক্ষস নারীকে তিনি বারণাবতের কাছে বনের ভেতর থাকার সময় বিবাহ করেছিলেন। তাঁর নাম ছিল হিড়িম্বা। ভীম ও হিড়িম্বার একটি ছেলেও হয়েছিল। তার নাম হল ঘটোৎকচ। হিড়িম্বাকে ভীম সেখানেই সন্তানসহ রেখে আসেন। অনার্য সন্তান আর্য পরিবারে প্রবেশের অধিকার পায়নি। তবে মহানুভব ভীম পুত্রকে প্রয়োজনে স্মরণ করবেন বলে জানিয়েছিলেন।
কাম্যক বনে আসতেই পাণ্ডবদের আক্রমণ করল কির্মীর রাক্ষস। আসলে সে হল নরমাংসভোজী এক অনার্য বনচারী মানুষ। সম্পর্কে সে বকরাক্ষসের ভাই এবং হিড়িম্বা ও তার দাদার আত্মীয় হয়। ভীম বকরাক্ষসকে একচক্রা নগরে মেরে এসেছিলেন, কির্মীর সে খবর জানত। সে প্রতিশোধ নিতেই ভীমকে এসে আক্রমণ করল। ভীমের সঙ্গে কির্মীর কিন্তু পারল না। ভীম অসীম শক্তিশালী। তিনি বনের বিরাট বিরাট গাছ উপড়ে তা দিয়ে কির্মীরকে আঘাত করে তাকে মেরে ফেললেন। সেই রাক্ষসের মৃতদেহ বনের মধ্যে বহুদিন পড়ে ছিল। বিদুর কাম্যক বনে একবার পাণ্ডবদের দেখতে এসে তা দেখতে পেলেন, আর তারপর ধৃতরাষ্ট্রকে গিয়ে তা গল্প করে বললেন। বিদুর পাণ্ডবদের বরাবর পছন্দ করতেন। তিনি বেশি করে ভীমের বীরত্বের গল্প করলেন যাতে দুরাত্মা দুর্যোধন অসহায় বনচারী পাণ্ডবদের হত্যা করার পরিকল্পনা বা আক্রমণ না করেন।


ভীমের বড়ো মাথা গরম। মাত্র তেরোদিন পার হতেই তিনি অধৈর্য হয়ে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, “তেরো বছর অনেক দীর্ঘ সময়। তার উপর শেষ বছরটা আবার অজ্ঞাতবাস অর্থাৎ লুকিয়ে থাকা। এ তো আরও কঠিন ব্যাপার। দুর্যোধনের চর সর্বত্র ঘোরাফেরা করছে। ঠিক সে আমাদের খুঁজে বের করবে। যদি সকলে লুকিয়ে থাকতে না পারি আর ধরা পড়ে যাই, তখন আবার আমাদের বারো বছর বনবাসে থাকতে হবে। এত কিছু করে যদি আমরা নিজেদের রাজ্য ফেরতও পাই, আপনি আবার দুর্যোধনের অনুরোধে পাশা খেলে সবকিছু হারিয়ে ফেলবেন। আপনার এতটুকু সচেতনতা নেই। আপনার দোষেই আজ সকলের বনে এসে এত দুর্দশা! এই তেরোটি দিনেই এই বনবাস আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছে। তার চেয়ে আমরা এখনই যুদ্ধ করে আমাদের রাজ্য ছিনিয়ে নিই। আপনি আজ্ঞা করলেই আমি আর অর্জুন কৃষ্ণের সাহায্যে ওদের বধ করব। পাপী এবং শঠ ব্যক্তিদের হত্যা করলে কোনও পাপ হয় না। তবুও পাপমুক্ত হতে আমরা না হয় পরে যজ্ঞ করব।”
যুধিষ্ঠির ভীমকে বললেন, “তুমি আর অর্জুন নিশ্চয়ই দুর্যোধনকে বধ করবে, কিন্তু তেরো বছর তো কাটেনি। আমি মিথ্যা বলতে পারব না।”
এমন সময় সেখানে এলেন মহর্ষি বৃহদশ্ব। যুধিষ্ঠির তখনই তাঁকে দুধ, মধু, ঘি, খই ইত্যাদি দিয়ে মধুপর্ক তৈরি করে নিবেদন করলেন। ঋষি বললেন, “তোমাদের দুঃখের কথা আমি সব শুনেছি। পাশা খেলায় সর্বস্ব হারানোর এমন একটি উদাহরণ আছে যা শুনলে তোমরা তোমাদের দুঃখ কিছুটা হলেও ভুলতে পারবে।” এই বলে ঋষি তাঁদের নল ও দময়ন্তীর গল্প বললেন।


এভাবেই বনবাসে পাণ্ডবদের দিন কাটতে লাগল। দেখতে দেখতে তেরো মাস কেটে গেল। ভীম এবার আবার অধৈর্য হয়ে উঠলেন। ভীম একদিন যুধিষ্ঠিরকে ডেকে বললেন, “আমরা ধর্ম অর্থ কাম ত্যাগ করে কেন এভাবে তপোবনে বাস করব বলতে পারেন? শিয়াল যেমন ছল করে সিংহের মাংস চুরি করে, তেমন করে দুর্যোধন আমাদের রাজ্য কেড়ে নিয়েছে। আপনি নিজের প্রতিজ্ঞা পালন করছেন। নিজের ধর্ম পালন করতে গিয়ে রাজ্য ত্যাগ করে দুঃখ ভোগ করছেন, আর আমরাও আপনার কথা মেনে নিয়ে শত্রুদের আনন্দ বাড়িয়ে চলেছি। ধর্মাচরণ করতে গিয়ে আপনি বীরত্ব ভুলে ক্লীব আর পঙ্গুর মতো আচরণ করছেন। মহারাজ, আপনি হয় সন্ন্যাস নিন, না হয় রাজ্যসুখ ভোগ করুন। এই দুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থা আতুরের জীবনের মতো দুঃখময়। কৃষক যেমন অল্প বীজ ছড়িয়ে অনেক ফসল পায়, আপনিও তেমন সামান্য বাক্যের সত্যপালন থেকে বিরত হয়ে যুদ্ধ করে রাজ্যলাভ করুন। কৃষ্ণ সাহায্য করলে আমরা নিশ্চয়ই রাজ্য উদ্ধার করতে পারব।”
ভীমের কথা শুনে যুধিষ্ঠির ক্রুদ্ধ হলেন না। তিনি শান্তভাবে বললেন, “তুমি আমাকে দোষ দিচ্ছ তাতে তোমার এতটুকু অন্যায় নেই। সত্যিই আমার মন্দ কর্মের জন্য তোমাদের সকলের বিপদ হয়েছে। আমিও তো অন্যায় করেছিলাম। দুর্যোধনের আহ্বানে কিছু না ভেবেই পাশা খেলায় অংশ নিয়েছিলাম। দুর্যোধন এবং শকুনি শঠতার দ্বারা আমাকে পরাজিত করেছে। আমি যখন পণ হিসেবে নানা জিনিসের প্রতিজ্ঞা করছিলাম, কেন তখন আমাকে তুমি বাধা দাওনি? দ্রৌপদীকে পণ নেওয়ার সময় তুমি একবার আমার হাত পুড়িয়ে দিতে চেয়েছিলে, অর্জুন তোমাকে শান্ত করেছিল। তোমাদের পণ নেবার সময় তুমি নিজের লোহার গদাখানা পরিষ্কার করছিলে। মনে আছে? কেন তখনই গদার এক আঘাতে আমার প্রাণহরণ করোনি?”
ভীম বললেন, “মহারাজ, তেরো বছর অনেক সময়। ততদিনে আমরা সকলেই বৃদ্ধ হয়ে যাব। সবসময় ব্রাহ্মণদের পরামর্শ শুনে শুনে আপনার বুদ্ধিও ব্রাহ্মণদের মতো কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে গেছে। আপনি কেন যে ক্ষত্রিয়কুলে জন্মলাভ করেছেন, তাই ভাবছি! ভেবে দেখুন, আমরা সবে তেরো মাস এই বনে কাটিয়েছি। এতেই আমি প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। তেরো বছর তাহলে আরও কত দীর্ঘ সময়! মহাত্মারা বলেন সোমলতার প্রতিনিধি হল পুঁইশাক। তেমন বছরের প্রতিনিধি হল গিয়ে মাস। আপনি তেরো মাসকেই তেরো বছর হিসেবে গণ্য করুন। যদি এই গণনা অন্যায় মনে হয়, তাহলে একটি সাধু স্বভাব যুক্ত ষাঁড়কে পেট ভরে খাইয়ে নিজের পাপ দূর করবেন।”
যুধিষ্ঠির বললেন, “সঠিক বিচার করে এগোলেই সাফল্য আসে। দৈবের সাহায্যও তাতেই পাওয়া যায়। কেবল বীরত্বের গর্বে চঞ্চল হয়ে এগিয়ে গেলে সাফল্য আসে না। দুর্যোধনকে তুচ্ছ জ্ঞান করো না। সে ও তাঁর ভাইয়েরা প্রত্যেকেই অস্ত্র প্রয়োগে সুশিক্ষিত। তাছাড়া আমরা দিগ্বিজয় করতে গিয়ে অনেক রাজাদের অসন্তোষ লাভ করেছি। তাঁরা সকলেই এখন দুর্যোধন অর্থাৎ কৌরবদের পক্ষে। ভীষ্ম, দ্রোণ এবং কৃপাচার্যও ধৃতরাষ্ট্রের পক্ষেই থাকবেন। এঁরা সকলেই মহান বীর। অভেদ্য কবচধারী কর্ণও আমাদের শত্রু। এঁদের জয় না করে তুমি দুর্যোধনকে কিছুতেই বধ করতে পারবে না।”
যুধিষ্ঠিরের যুক্তিপূর্ণ কথা শুনে ভীম বিষণ্ণ মনে চুপ করে গেলেন। যুধিষ্ঠির বুঝলেন, ভীমকে শান্ত করতে এখনই তাঁর সামনে সুখাদ্য পরিবেশন করতে হবে। তাঁর ইঙ্গিতে একজন দাসী একটি বিরাট ঝুড়িভর্তি নানারকমের সুপক্ক ফল ভীমের উদ্দেশ্য এগিয়ে দিল। ভীম সঙ্গে সঙ্গে তা খেতে শুরু করলেন। তাঁর মুখ এবার প্রশান্ত হয়ে গেল। যুধিষ্ঠির নিশ্চিন্ত হলেন। তিনি জানেন, ভীমের হৃদয় সরল ও মহান। সেখানে কলুষতার চিহ্ন নেই। তিনি কখনও মুখে আর মনে পৃথক আচরণ করেন না।
এমন সময় মহাযোগী ব্যাসদেব সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি বললেন, “তোমাদের ধীরে ধীরে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে। দুর্যোধন সহজে রাজ্য ছেড়ে দেবে না। আমি তোমাকে একটি বিশেষ মন্ত্র দান করতে এসেছি। এই মন্ত্রের নাম হল প্রতিস্মৃতি। এই মন্ত্রের প্রভাবে অর্জুন কার্যসিদ্ধি করবে। তাকে কয়েকটি বিশেষ অস্ত্রলাভ করতে হবে, এমন অস্ত্র যা এই পৃথিবীতে কোথাও নেই এবং দুর্লভ। তাতেই যুদ্ধে সে বিশেষত্ব লাভ করবে। অর্জুনকে ইন্দ্র, যম, বরুণ, কুবের, শিব এঁদের সকলের কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করতে হবে।”
যুধিষ্ঠির তখন অর্জুনকে গিয়ে বললেন, “ভীষ্ম, দ্রোণ, অশ্বত্থামা, দুর্যোধন এঁরা সকলেই অসীম শক্তিশালী বীর। এখন সমস্ত পৃথিবীর অধীশ্বর স্বরূপ দুর্যোধন বিরাজ করছে। তাকে পরাজিত করতে হলে তোমাকে কিছু বিশেষ অস্ত্রে পারদর্শী হতে হবে। তুমি উত্তরদেশে গিয়ে নির্জনে এই প্রতিস্মৃতি মন্ত্র জপ করে সাধনা করো এবং সিদ্ধিলাভ করে ইন্দ্রের কাছ থেকে সব দিব্য অস্ত্র লাভ করো। নাহলে যুদ্ধে আমরা জয়লাভ করতে পারব না।”
যুধিষ্ঠিরের কথামতো অর্জুন এরপর সকলের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। অর্জুন চলে যাচ্ছেন বলে রাজপুরী থেকে তাঁদের মা কুন্তীও বনে এসেছেন। সকলের মন বিষণ্ণ। অর্জুন দীর্ঘদিনের জন্য চলে যাচ্ছেন।
দ্রৌপদী অর্জুনের কপালে বিজয় তিলক এঁকে দিয়ে বললেন, “পার্থ, এখন আমাদের জীবন-মরণ, সুখদুঃখ, ঐশ্বর্য সবকিছুই তোমার উপর নির্ভর করছে। তোমার মঙ্গল হোক। মনে রাখবে তোমার চেয়ে বলবানদের সঙ্গে কখনও শত্রুতা করবে না। জয়লাভের উদ্দেশ্যে যাত্রা করো।”


তিন


অর্জুন হিমালয় ও গন্ধমাদন পর্বত পার হয়ে ইন্দ্রকীল পর্বতে এসে উপস্থিত হলেন। চারদিকে ভয়ানক জঙ্গল। কোথাও জন-মানুষ নেই। সেই ভীষণ বনে অর্জুন কোথায় যাবেন, কোনদিকে এগোবেন কিছুই বুঝতে পারলেন না। হতাশ হয়ে একটি গাছের নিচে বসে পড়লেন।
ঠিক তখনই তাঁর চোখে পড়ল, এক খুব কালো অনার্য বনচারী মানুষ একটু দূরে গাছের ছায়ায় বসে আছেন। তাঁর মাথায় জটা, পরনে সন্ন্যাসীর বেশ। তিনি অর্জুনকে বললেন, “অস্ত্র হাতে এই গভীর বনে কী করছ? এই তপোবনে সকলে সাধনা করতে আসে। এখানে অস্ত্রের প্রয়োজন হয় না।”
অর্জুন ভাবলেন, সত্যিই তো, তাঁর হাতে ধনুক আছে কিন্তু তিনিও সাধনার উদ্দেশ্যেই এখানে এসেছেন। তখন অর্জুন খুব বিচলিত হয়ে ধনুক বিসর্জন দিতে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্রদেব তাঁকে দেখা দিলেন। তিনি অনার্য তপস্বীর ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলেন। অর্জুন ইন্দ্রকে প্রণাম করে দিব্যাস্ত্র চাইলেন। ইন্দ্র বললেন, “তুমি তপস্যা করে শিবকে তুষ্ট করো। তাঁর কৃপাতেই তোমার সবরকমের অস্ত্র লাভ হবে।”
অর্জুন ইন্দ্রের কথামতো সেই বন থেকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন। সামনের উপত্যকা পার্বত্য শিখর যুক্ত এবং আরও গভীর জঙ্গলময়। অর্জুন বনের ভেতর ঢুকতেই শঙ্খ ও পটহের অনাহত ধ্বনি শুনতে পেলেন। বুঝলেন এই বন খুবই শুভ প্রভাব যুক্ত। এখানে সাধনা করলে সিদ্ধিলাভ সম্ভব। অর্জুন সারাদিন মন্ত্র জপ করতে লাগলেন। খিদে পেলে বনের ঝরে পড়া ফলমূল আর পাহাড়ি ঝরনার জল খেয়ে নেন। এভাবে দিন কাটতে লাগল। মহাদেব অর্জুনকে পরীক্ষা করার জন্য কিরাত বা ব্যাধের বেশে সেই বনে এসে উপস্থিত হলেন। মহাদেবের সঙ্গে দেবী পার্বতী ও তাঁর সহচরীগণও অনার্যা ব্যাধের বেশে সেই বনে এলেন।
অর্জুন সাধনা করছিলেন। এমন সময় নীল বর্ণের একটি শূকর তাঁর দিকে ধেয়ে এল। আসলে ওটি ছিল মূক নামের এক দানব। অর্জুন শরাঘাত করতে যাবেন, তখন একটি বজ্রকন্ঠ শুনে চমকে উঠলেন। উলটোদিকের একটি পাথরের উপর তিনি কিরাতরূপী মহাদেবকে দেখতে পেলেন। কিরাত অর্জুনকে বজ্রকন্ঠে বললেন, “সাবধান! ওই বরাহটিকে শরবিদ্ধ করো না। ওটাকে আমি বধ করব বলে ঠিক করেছি।”
অনার্য ব্যাধের এমন সাহস দেখে অর্জুন রাগে অন্ধ হয়ে বললেন, “আমিই আগে শরাঘাত করব বলে শর হাতে নিয়েছি। তুমি কে, এই বনে এত সঙ্গীসাথীদের নিয়ে বিচরণ করছ? এই বনে সকলে নির্জনে সাধনা করে, এখানে উৎপাত কোরো না।”
কিরাত বললেন, “সাহস থাকে তো এই শূকরটাকে বিদ্ধ করে দেখাও!”
অর্জুন এবং কিরাত এবার একসঙ্গে বরাহটিকে বিদ্ধ করলেন। অর্জুন বরাহটিকে দেখিয়ে ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন, “ইতর অনার্য! তুমি মৃগয়ার নিয়মও জানো না? তুমি নিয়ম লঙ্ঘন করেছ। এর শাস্তি আমি তোমাকে দেব।”
কিরাত বললেন, “তুমি জানো না, আমিই এই বনের অধীশ্বর? বালক, তুমি এই নির্জন বনে একাকী কী করছ?”
অর্জুন বললেন, “কিরাত, এখনও বলছি নিজের দোষ স্বীকার করো। নাহলে আজ আমার হাতে তোমার মৃত্যু লেখা আছে।”
কিরাত উচ্চৈঃস্বরে হাসতে হাসতে বললেন, “বেশ, তবে তাই হোক।”
অর্জুন তখন শর বর্ষণ করতে লাগলেন। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখলেন, কিরাত পাহাড়ের মতো অটল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর গায়ে শর লাগেইনি। অর্জুন হতবাক হয়ে আরও বাণ নিক্ষেপ করতে লাগলেন। তাঁর তূণীরের সব তির শেষ হয়ে গেল, অথচ কিরাত অক্ষতই থেকে গেল। অর্জুন তখন ধনুক দিয়ে কিরাতকে মারতে লাগলেন। কিরাত তাঁর ধনুক কেড়ে নিলেন। অর্জুন খড়্গ দিয়ে আঘাত করতেই খড়্গ লাফিয়ে উঠে মাটিতে পড়ে গেল। শেষে দু’জনের মুষ্টিযুদ্ধ শুরু হল। কিরাতের বাহুপাশে আবদ্ধ অর্জুনের শ্বাসরোধ হয়ে গেল। অর্জুন জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। তখন পার্বতী সেখানে ছুটে এসে শিবকে অনুনয় করলেন অর্জুনের জ্ঞান ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। কিরাত অর্জুনের চৈতন্য ফিরিয়ে দিলেন।
নিজের বিপর্যয়ে লজ্জিত অর্জুন শিবের পুজো করতে লাগলেন। তিনি লজ্জায় অধোবদন হয়ে ভাবতে লাগলেন, ছিঃ! মিথ্যেই নিজেকে বীর ভেবে অহঙ্কার করেছি। একজন অনার্য বনচারী ব্যাধও আমার থেকে বীরত্বে শতগুণ বড়ো। তবুও তাঁর ভারী কৌতূহল হল, তিনি ভাবতে লাগলেন, কে এই পরম বীর ব্যাধ। তিনি নিজের শক্তি ফিরে পেতে শিবের অর্চনা করবেন বলে ঠিক করলেন।
একটি শিবমূর্তি তিনি মাটি দিয়ে গড়ে নিলেন। তারপর শিবের সেই মাটির মূর্তিতে বুনো মল্লিকা ফুলের মালা পরিয়ে ভক্তিভরে প্রণাম করলেন। বললেন, “হে প্রভু, আমাকে শক্তি দাও। আমি তোমার ভক্ত, আমাকে এই অনার্য ব্যাধের কাছে পরাজিত কোরো না!”
হঠাৎ সামনে চেয়ে তিনি দেখলেন, কিরাতের গলায় তাঁর শিবমূর্তিতে নিবেদিত সেই মল্লিকা ফুলের মালাটি শোভা পাচ্ছে। অর্জুন এবার ছদ্মবেশী শিবকে চিনতে পারলেন। তিনি তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়ে প্রণাম জানালেন।
(বর্তমানে মহারাষ্ট্রের কাছে মহাবালেশ্বর যাওয়ার পথে ঘন জঙ্গলাকীর্ণ পথে মল্লিকার্জুন শিবের মন্দির আছে। মনে করা হয়, এখানেই কিরাতবেশী শিব ও অর্জুনের যুদ্ধ হয়েছিল।)
শিবের আশীর্বাদে অর্জুন পাশুপত অস্ত্রলাভ করলেন। তিনি অর্জুনের শরীর স্পর্শ করতেই তাঁর শরীর থেকে যুদ্ধের আঘাতজনিত সব ক্ষত ও বেদনা দূর হয়ে গেল। শিব তাঁকে বাকি অস্ত্র পেতে স্বর্গলোকে যাত্রা করতে বললেন। তখন সেখানে বরুণদেব, যম, কুবের এবং ইন্দ্র এসে উপস্থিত হলেন। যম তাঁকে দিলেন দণ্ড। বরুণ তাঁর পাশ অস্ত্র দিলেন অর্জুনকে। কুবের দিলেন অন্তর্ধান নামক অস্ত্র। ইন্দ্র আরও অস্ত্র পেতে তাঁকে দেবলোকে আহ্বান জানালেন।
তখন আকাশ থেকে বিরাট আলোর বন্যার মতো ইন্দ্রের রথ এসে দাঁড়াল। ইন্দ্রের রথের সারথি হলেন মাতলি। তিনি অমিত তেজ যুক্ত সেই বিরাট আলোকিত রথে করে অর্জুনকে দেবলোকে নিয়ে গেলেন। অর্জুন তীর্থ স্নান সেরে পবিত্র ও শুদ্ধ বস্ত্র পরে রথে উঠলেন। রথ তাঁকে নিয়ে আকাশে উঠতে লাগল। বহু পথ পার হয়ে রথ চলতে লাগল। গ্রহ-নক্ষত্রময় অনন্ত আকাশ দেখতে দেখতে অর্জুন পথ চলেছেন। রথও ভীষণ বেগে সামনে চলেছে। কত স্থান পার হয়ে রথ চলতে লাগল। একেক জায়গায় সূর্য ও চন্দ্রের আলো নেই, কেবল নক্ষত্রের ম্লান আলো। এইভাবে অর্জুন একসময় স্বর্গে পৌঁছালেন। পৌঁছানোমাত্র সিদ্ধ মহর্ষিরা ও দেব গন্ধর্বরা তাঁকে সংবর্ধনা জানালেন।
ইন্দ্র অর্জুনকে বললেন, “তোমাকে দিয়ে আমার গুরুতর কয়েকটি কাজ আছে। তার জন্য তোমাকে আমার কাছে থেকে কিছুদিন অস্ত্রশিক্ষা করতে হবে। তারপর তোমাকে অসুর নিবাতকবচদের বধ করতে হবে। তারা পৃথিবীর সমুদ্রের গভীরে বাস করে। এছাড়া মহাকাশে হিরণ্যপুরে দানবদের নগরী আছে। তোমাকে তাদেরও বধ করতে হবে। এরা দেবতাদের শত্রু। তুমি এদের নাশ করে আমাকে গুরুদক্ষিণা দেবে।”


চার


অর্জুন চলে যাওয়ার পর থেকে বাকিরা সকলেই বিষণ্ণ মনে দিন কাটাচ্ছেন। পাণ্ডবদের মা কুন্তীদেবী এখন কাম্যক বনে এসে আছেন। ভীম মায়ের খেয়াল রাখেন সবসময়। কুন্তীদেবীও তাঁর এই ছেলেটিকে বিলক্ষণ চেনেন। ভীম সাহসী, কিন্তু তার মাথা সহজে গরম হয়ে যায়। বুদ্ধির চেয়ে তার আবেগ বেশি। তবে ভীমের মন বড়ো সরল। এমন ছেলে কখন কী করে বসে, তাই নিয়ে মাও চিন্তায় থাকেন সবসময়। একদিন একটি ঘটনা ঘটল। সেকথা বলা যাক।
কাম্যক বনে শীতের প্রকোপ চলছে। মাঘ মাস। বনের ভেতর ছোটো কয়েকটি কুঁড়েঘর বেঁধে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাতে শীত ভালো করে আটকায় না। কুন্তীদেবী জপতপ করার জন্য একটি কুঁড়েতে একা থাকেন। তিনি ব্রতনিষ্ঠ বিধবা। তিনি খুব ভোরে শুদ্ধ বস্ত্র পরে পুজোয় বসেন। রোজই তাই ভোর না হতেই স্নান করে নেন কুন্তীদেবী। সেদিন বড়ো শীত পড়েছে। কুন্তীদেবী বসে বসে ভাবতে লাগলেন কেমন করে এই ঠাণ্ডায় স্নান করে শুদ্ধ হবেন।
এদিকে সময় বয়ে যাচ্ছে, শুদ্ধ না হলে পুজোপাঠ করতে পারবেন না। বাধ্য হয়ে তিনি কাঁপতে কাঁপতে নদীতীরে চললেন। চারদিকে ফিসফিস করে শিশির পড়ছে। বনের আঁকাবাঁকা পাতাঝরা পথটি ধরে কুন্তীদেবী সরস্বতী নদীর তীরে এসে উপস্থিত হলেন জলে ডুব দেবেন বলে।
দূর থেকে বনের পথ ধরে ভীম আসছিলেন। তিনি বনের ভেতর কাঠ সংগ্রহে এসেছিলেন। দ্রৌপদী তাঁকে শীত দূর করার জন্য শুকনো জ্বালানি এনে দিতে বলেছিলেন। সেকথা স্মরণ করে ভীম ভোর না হতেই শুকনো কাঠ নিয়ে ফিরছিলেন। তাঁর হাতে ছিল একটি কুঠার। তিনি দেখলেন তাঁর মা কাঁপতে কাঁপতে নদীতে ডুব দিতে যাচ্ছেন। তা দেখে ভীমের ভারি কষ্ট হল, জলের দেবতা বরুণদেবের উপর রাগও হল। তিনি হাতের কুঠারটিকে দু’হাতে ঘষতে লাগলেন। ঘষতে ঘষতে কুঠারটি বেশ গরম হয়ে গেল। তখন ভীম সেটিকে জলে ছুড়ে ফেলে বললেন, “জয় শ্রীকৃষ্ণ! শ্রীকৃষ্ণের জয়!”
বহুদূর থেকে শ্রীকৃষ্ণ বুঝলেন ভীম তাঁকে স্মরণ করেছেন। তখন স্মরণ করার কারণটি জেনে তিনি খুশি হলেন, কারণ ভীম মায়ের কষ্ট দূর করার জন্য নদীর জল গরম করতে চাইছেন। ভগবান ভীমকে সাহায্য করলেন। কৃষ্ণের কৃপায় সরস্বতীর জল দারুণ গরম হয়ে গেল। কুন্তীদেবী তখন পরম আরামে স্নান করলেন। ভীমকে তিনি কুঠার জলে ফেলতে দেখেছিলেন। তিনি বুঝলেন, ভীমের জন্যই জল এমন গরম হয়েছে। তিনি মনে মনে ভীমকে খুব আশীর্বাদ করলেন।
এদিকে জলের দেবতা বরুণদেব খুব রেগে গেলেন। তিনি সারাবছর সূর্যের তাপে কষ্ট পান। বরুণদেব জলের দেবতা, তাই ঠাণ্ডা তাঁর বেশি পছন্দ। হঠাৎ জল গরম হয়ে যেতে তিনি দারুণ কষ্ট পেলেন। এই শীতের সময়টাতে তিনি একটু আরামে থাকেন। এখন জলে এমন উষ্ণতা কেন? পরে আরও কষ্ট পেলেন একাজ কৃষ্ণ করেছেন বলে জানতে পেরে। কৃষ্ণ হলেন নারায়ণের অবতার। বরুণদেব কৃষ্ণকে নালিশ করে বললেন, “হে কৃষ্ণ! মায়ের জন্য জল গরম করতে গিয়ে মধ্যম পাণ্ডব ভীম আমার গায়ে কুঠার গরম করে ছেঁকা দিয়েছেন। এখন আমার সারা শরীর জ্বলছে। আপনি এর বিধান করুন।”
কৃষ্ণ বললেন, “বেশ। আজ শুক্লা একাদশী তিথি। এই দিনটিতে ভীম যদি একাদশী পালন করেন, তাহলে তোমার গায়ের জ্বালা সেরে যাবে, আর তোমাকে কষ্ট দিয়ে ভীমের যে পাপ হয়েছে তাও দূর হবে।”
বরুণদেব বললেন, “কিন্তু আমার কথা কি ভীমসেন শুনবেন? এমনিতেই এখন ঠাণ্ডা জল বলে দিবারাত্রি তিনি স্নান করার সময় আমাকে গালমন্দ করছেন।”
শ্রীকৃষ্ণ তখন হাসতে হাসতে বললেন, “বেশ, আমিই ভীমকে ব্রতপালনের জন্য রাজী করাব।”
কাম্যক বনে আছে মহর্ষি ব্যাসদেবের আশ্রম। ঋষির আশ্রমটি একেবারে নদীর তীরে। শ্রীকৃষ্ণ সেখানে আবির্ভূত হয়ে ঋষিকে ভীমকে ব্রতপালনে রাজী করাতে বললেন। ব্যাসদেব তক্ষুনি ছুটলেন ভীমের উদ্দেশ্যে।
ঋষি ভীমকে গিয়ে বললেন, “আগামীকাল একাদশী পালন করতে হবে তোমাকে। নাহলে ভয়ানক অনর্থ ঘটবে। তোমাকে সারাদিন জলও না খেয়ে থাকতে হবে। পরেরদিন নারায়ণ পুজোর পরে ব্রাহ্মণদের ভোজন করিয়ে তারপর খাবার খাবে।”
একথা শুনে একরোখা ভীম বললেন, “আমার অমঙ্গল হয় হোক। আমি খাবার ছাড়া এতক্ষণ থাকতে পারব না, কারণ আমি খিদে সহ্য করতে পারি না। এইজন্য আমার যা ক্ষতি হয় হোক। তিথিপালন আমার দ্বারা হবে না।”
ব্যাসদেব দেখলেন, মহা মুশকিল! এদিকে ভীম উপোস না করলে বরুণদেবের গায়ের জ্বালা সারবে না। তখন ব্যাসদেব বললেন, “ঠিক আছে ভীম, তুমি অন্তত একবেলা নির্জলা উপোস করবে। বিকেলে খাবার খেতে পারবে।”
একথা ভীমের পছন্দ হল। তিনি উপোস করতে রাজী হলেন। সেই থেকে মাঘ মাসের শুক্লা একাদশী তিথিকে ভীম একাদশী তিথি বলে। বরুণদেবও শান্ত হলেন।


পাঁচ


একদিন কাম্যক বনে নারদ এলেন। তিনি এসেই সকলকে তীর্থযাত্রায় যেতে বললেন। নারদ বললেন, “এক বনে বেশিদিন থাকলে সেখানকার গাছপালা ও পশুপাখিদের ক্ষয় হয়।”
নারদের কথায় যুধিষ্ঠির তখনই তীর্থযাত্রায় যাবেন বলে ঠিক করলেন। দুর্গম পথে যেতে হবে বলে যুধিষ্ঠির তাঁদের অনুগত সঙ্গী-লোকজনদের বিদায় দিয়ে বললেন, “আপনারা এখন আপনাদের নিজের রাজ্যে ফিরে যান। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র আপনাদের উপযুক্ত বৃত্তি দেবেন। যদি তিনি না দেন, আমাদের মিত্ররাজ্য পাঞ্চালরাজ দেবেন।”
এরপর পাণ্ডবেরা ও দ্রৌপদী অগ্রহায়ণ পূর্ণিমার শেষে পুষ্যা নক্ষত্রে শুভদিন দেখে কয়েকজন সঙ্গী ব্রাহ্মণ এবং লোমশ মুনির সঙ্গে তীর্থযাত্রায় বের হলেন। লোমশ মুনি বহু তীর্থ দর্শন করেছেন। তিনি হিমালয়ের বরফে ঢাকা গুহায় থেকে বহুবছর সাধনাও করেছেন। পথঘাট চেনেন বলে পাণ্ডবদের অনুরোধে তিনি তাঁদের সঙ্গী হয়েছেন। পথশ্রমে কষ্ট হবে বলে কুন্তীদেবী তীর্থে আসেননি। তবে তাঁর তীর্থে যাওয়ার বিশেষ ইচ্ছে ছিল। দ্রৌপদী তাঁকে ফিরে গিয়ে সব বিবরণ জানাবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
পাণ্ডবেরা প্রথম দর্শন করলেন নৈমিষারণ্য। সেখান থেকে গেলেন প্রয়াগে। এরপর তাঁরা অগস্ত্যদেবের আশ্রম মণিমতীপুরে এলেন। লোমশ মুনি পাণ্ডবদের সেখানকার গল্প বলতে লাগলেন।
এই তীর্থের কাছে এক ভয়ানক রাক্ষস বাস করত। তার নাম ইল্বল। সে আর তার ভাই বাতাপি সেখানে থাকত। ঋষিরা সেখানে এলে সে তার ভাইকে ছাগল বা মেষে রূপান্তরিত করে ঋষিদের মাংস রান্না করে দিত। ঋষিরা ভরপেট খেয়ে যখন ঘুমাতে যেত তখন ইল্বল তার ভাইকে ডাকত। সেই ডাক শুনে বাতাপি তাদের পেট ফুঁড়ে বাইরে বেরিয়ে আসত। দুরাত্মা রাক্ষস এভাবে বহু ব্রাহ্মণদের হত্যা করত। তারপর ব্রাহ্মণদের খেয়ে তাদের হাড়গুলো মাটিতে পুঁতে রাখত। সেখানে তখন কেবল বাতাপিলেবুর গাছ জন্মাত। এভাবে ওই বনে শত শত বাতাপিলেবুর গাছের বন গড়ে উঠতে লাগল। ধীরে ধীরে সেই বনের বদনাম সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল। কেউ সেখানে আর আসত না। কেবল বড়ো বড়ো বাতাপিলেবুর গাছে ফুল ধরে চারদিক অপূর্ব সুবাসে ভরে উঠত। পাকা ফল পড়ে গাছের তলায় বিছিয়ে থাকত। কেউ এসে ফল নিয়ে খেত না। দিনরাত্রি দুই ভয়ানক রাক্ষস একাকী বন পাহারা দিত।
এদিকে একবার অগস্ত্যদেব পত্নী লোপামুদ্রার কথায় ধন উপার্জন করতে বের হলেন। তিনি শ্রুতর্বারাজের কাছে এসে বলেন, “আমাকে অন্যের ক্ষতি না করে যথাশক্তি ধন দান করুন।”
রাজা বললেন, “আমার যত আয় তত ব্যয়। আমি আপনাকে ধন দিতে গেলে প্রজাপীড়ন করতে হবে।”
তিনি তাঁর অপর দুই বন্ধু রাজার নাম বললেন। তাঁরা হলেন ব্রধ্নশ্ব ও ত্রসদস্যু। অগস্ত্যদেব তাঁদের কাছে গেলেন। তাঁরাও অগস্ত্যদেবকে ধন দিলেন না। এদিকে ধন না দিলে ঋষি শাপ দেবেন। তাঁরা ইল্বল রাক্ষস আর বাতাপির গল্প শুনেছিলেন। সেই বনে রাক্ষসের ভয়ে কেউ যেত না। রাজারা অগস্ত্যকে বললেন ইল্বলের কাছ থেকে ধন সংগ্রহ করুন গিয়ে।
অগস্ত্য রাজাদেরও তাঁর সঙ্গী হতে বললেন। রাজারা ঋষির শাপের ভয়ে খুব অনিচ্ছায় তাঁর সঙ্গী হলেন।
ইল্বল তো অনেকদিন পরে মানুষ এসেছে দেখতে পেল। সে অতিথিদের খুব যত্ন করে বসাল, আর মনের আনন্দে মাংস রান্না করতে বসল। রাজারা জানতেন মাংস খেলেই তাঁদের মৃত্যু হবে। তাঁরা কেউ মাংস খেলেন না। পরম ধার্মিক এবং সাধন বিভূতিসম্পন্ন অগস্ত্যদেব একাই সমস্ত বাতাপি রাক্ষসের সেই মাংস খেলেন। তারপর অগস্ত্যদেব বিশ্রাম করতে গেলেই ইল্বল বাতাপিকে ডাকতে লাগল। সে অপেক্ষা করছে কখন ঋষির মাংস খাবে। কিন্তু প্রাণপণে ডাকার পরেও বাতাপি আর বেরিয়ে এল না। তখন ইল্বল খুব ভয় পেয়ে গেল। অগস্ত্য সেই ডাক শুনতে পেয়ে বললেন, “ইল্বল, বাতাপিকে ডেকে আর লাভ হবে না।” এই কথা বলে তিনি একটি বিশাল ঢেঁকুর তুললেন।
ইল্বল বলল, “আমার ভাই বাতাপি কোথায় গেল?”
অগস্ত্য বললেন, “আমি তাকে খাবার পর এখন হজম করে ফেলেছি।”
ইল্বল অগস্ত্যর হাত থেকে মুক্তি পেতে তাঁকে অনেক ধন দান করলেন। সে রাজাদের লুন্ঠন করে অনেক ধন গাছের তলায় মাটিতে পুঁতে রেখেছিল। সেগুলো সবই সে অগস্ত্যদেবকে দান করল। ধনলাভ করে অগস্ত্যর ইচ্ছাও এবার পূর্ণ হল এবং সেই বনও রাক্ষসমুক্ত হল।


লোমশ মুনি পাণ্ডবদের আশ্রমটি দেখিয়ে বললেন, “দেখুন রাজন! এই সেই আশ্রম। এখানেই পুণ্যবান অগস্ত্য সাধনা করতেন। পুণ্যসলিলা ভাগীরথী এখান থেকে কেমন সুতীব্র বেগে বয়ে চলেছে। পাথরের উপর বাজছে তার চলার গান। এখানে স্নান করে সকলে পুণ্য লাভ করুন।”
তীর্থস্নান করে পাণ্ডবেরা এগিয়ে যেতে লাগলেন। এরপর এল ভৃগুতীর্থ। তীর্থের নাম দীপ্তোদ তীর্থ। এখানে আছে পবিত্র বধূসর নদী। এখানে স্নান করে বিষ্ণুর শাপদুষ্ট পরশুরাম তাঁর পূর্বতেজ ফিরে পান। পাণ্ডবেরা এখানেও স্নান করলেন।
এরপর সকলে নন্দা এবং অপরনন্দা নদী এবং ঋষভকূট পর্বত পার হয়ে এলেন কৌশিকী নদীর তীরে। এখানে আছে মহর্ষি বিশ্বামিত্রের আশ্রম। বিশ্বামিত্র কেবল চতুর্থী ও চতুর্দশী তিথিতে দর্শন দেন। পাণ্ডবেরা তাঁর সঙ্গে দেখা করে তাঁর আশীর্বাদ নিলেন। এরপর তাঁরা আরও অনেক তীর্থ দেখতে দেখতে এগিয়ে যেতে লাগলেন।
তাঁরা গেলেন প্রসর্পণ, প্লাক্ষবতরণ তীর্থ, সরস্বতীর মোহনা, কুরুক্ষেত্র, সিন্ধুনদ, কাশ্মীর মণ্ডল, পরশুরামকৃত মানাস সরোবরের দ্বার ক্রৌঞ্চরন্ধ্র, ভৃগুতুঙ্গ, বিতস্তা নদী প্রভৃতি দেখার পর জলা ও উপজলা নদীর তীরে এসে পৌঁছালেন।
লোমশ মুনি সেই নদী দেখিয়ে বললেন, “এখানে বিখ্যাত রাজা উশীনর যজ্ঞ করেছিলেন। তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য একবার দেবলোক থেকে ইন্দ্র এবং অগ্নি এসেছিলেন। সেই গল্প শুনুনー
রাজার মহানুভবতা ছিল অসামান্য। রাজার কথা দেবলোকেও প্রচারিত হয়েছিল। তাই তাঁকে পরীক্ষা করতে একদিন দেবলোক থেকে ইন্দ্র তাঁর প্রাসাদে এলেন। তাঁর সঙ্গে চললেন অগ্নিদেব। দু’জনেই ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলেন। ইন্দ্র একটি বাজপাখি এবং অগ্নি একটি কপোত বা পায়রার রূপ ধরে রাজার প্রাসাদে এসে উপস্থিত হলেন।
রাজা রাজসভায় বসে আছেন। এমন সময় একটি ছোট্ট পায়রা শাবক তাঁর কোলে উড়ে এসে বসল। পায়রাটি ভয়ে কাঁপছে। রাজা দেখলেন, পায়রাটিকে তাড়া করে একটি বাজপাখি উড়ে আসছে। বাজপাখিটি এসে রাজাকে পায়রাটিকে ফেরত দিতে বলল। রাজা বললেন, “আমার শরণাগতকে আমি পরিত্যাগ করতে পারব না।”
বাজ বলল, “এটি আমার খাদ্য। আপনি আমাকে কেন বঞ্চিত করবেন?”
রাজা তখন পায়রাটির সমপরিমাণ নিজের মাংস কেটে দিতে চাইলেন বাজকে। বাজ তাতে সম্মতি দিল। রাজা তার হাত-পা এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে অনবরত মাংস কেটে দিলেও তা কিছুতেই পায়রার ওজনের সমান হল না। তখন রাজা রক্তাক্ত কলেবরে নিজেই ওজন যন্ত্রের অপর একদিকে দাঁড়ালেন। তা দেখে বাজরূপী ইন্দ্র এবং পায়রারূপী অগ্নি রাজাকে দেখা দিয়ে তাঁর মহানুভবতা এবং ধর্মবোধের অনেক প্রশংসা করলেন।
এরপর পাণ্ডবেরা শ্বেতকেতুর আশ্রম দর্শন করলেন। এখানে বইছে সমঙ্গা নদী। এই নদীতে স্নান করে বিকলাঙ্গতা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন ঋষি অষ্টাবক্র। সমঙ্গা নদীর অপর নাম মধুবিলা। বৃত্রাসুর বধের পর ইন্দ্র পাপ দূর করতে এই নদীতে স্নান করে পবিত্র হন।


ছয়


এবার পাণ্ডবেরা সকলে উত্তরদিকে চলেছেন। তাঁরা উশীরবীজ ও মৈনাক পর্বত, শ্বেতগিরি এবং কালশৈল অতিক্রম করে সাতটি ধারা বিশিষ্ট গঙ্গার উৎসের কাছে এলেন। লোমশ তাঁদের বললেন, “এখান থেকে আমরা মণিভদ্র ও যক্ষরাজ কুবেরের স্থান কৈলাশ পর্বতের দিকে যাব। এই প্রদেশ অতি দুর্গম। সকলে সাবধানে পথ চলবেন।”
অর্জুনের এই কৈলাশ পর্বতের পথেই স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে ফিরে আসার কথা। সকলেই তাঁকে দেখবেন বলে উৎসাহের সঙ্গে অপেক্ষা করছেন। তাই সকলেই এই পথে তাড়াতাড়ি এগিয়ে যেতে চান। প্রথমে সকলে পুলিন্দরাজ সুবাহুর বিশাল রাজ্যে উপস্থিত হলেন। এখানে পাণ্ডবেরা তাঁদের পাচকদের এবং ভৃত্যদের রেখে এলেন। তাঁদের সঙ্গে মোট চোদ্দজন পাচক ছিলেন তখন।
তারপর সকলে পদব্রজে দুর্গম পার্বত্য পথে চলতে শুরু করলেন। পাণ্ডবেরা গন্ধমাদন পর্বতে এসে পৌঁছালেই প্রবল ঝড় ও বৃষ্টি শুরু হল। সকলে কোনওরকমে গাছের তলায় আশ্রয় নিলেন। চারদিকে তুষারপাত হচ্ছে। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। এক ক্রোশ পথ চলতে না চলতেই দ্রৌপদী অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যেতে যুধিষ্ঠির মনের দুঃখে বিলাপ করতে লাগলেন। ধৌম্য ঋষি শান্তি মন্ত্র জপ করতে লাগলেন। সকলে চিন্তা করতে লাগলেন দ্রৌপদী কীভাবে যাবেন।
পাণ্ডবেরা যাবেন আরও উত্তরদিকের তুষারাবৃত হিমবন্ত প্রদেশে। সেখানে চারদিকে কেবল বরফের পাহাড়, পথ একেবারেই নেই। হিমালয়ের দুর্গম পথের কাছে সেখানে এক নিবিড় জঙ্গলে থাকে ঘটোৎকচ। ভীম একথা জানতেন। সে এখন বেশ বড়ো হয়েছে। ভীম ঘটোৎকচকে খবর দিলেন। ঘটোৎকচ তখন সঙ্গে সঙ্গে তার বন্ধুদের নিয়ে সেখানে এসে উপস্থিত হল। তারা সকলে পাণ্ডবদের তাদের পিঠে করে বয়ে নিয়ে চলল। ঘটোৎকচ দ্রৌপদীকে তার পিঠে নিয়ে পথ চলতে লাগল।
সকলে বদ্রিকাশ্রমে এসে পৌঁছালেন। সেখানে আছে নরনারায়ণের চমৎকার মন্দির। সকলের বিগ্রহ দর্শন হল। সেখানে এক সুবিশাল বদরীগাছের পাশ থেকে তীব্রবেগে ভাগীরথী নদী বইছে। তাই এই জায়গার নাম হয়েছে বদ্রিকা। যুধিষ্ঠির সেখানে নদীতে পিতৃপুরুষদের জন্য তর্পণ করলেন।
সকলে পূজাপাঠ করে সেখানেই ছ’দিন কাটালেন। কয়েকদিনের মধ্যেই অর্জুন এসে পৌঁছাবেন। তাই আর পথ অগ্রসর হলেন না কেউ।


একদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে দ্রৌপদী পদ্মের অপূর্ব গন্ধ পেলেন। এমন চমৎকার সুগন্ধী পদ্ম কোথায় ফুটেছে তা জানতে তাঁর খুব কৌতূহল হল। তিনি ভীমকে বললেন, “যাও আর্যপুত্র, আমার জন্য ওই পদ্ম নিয়ে এসো। আমি মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে ওই পদ্ম দেব, আর ওই অপরূপ পদ্মের কন্দ নিয়ে যাব কাম্যক বনে। সেখানে তা থেকে এই পদ্মের চারা তৈরি করব। তুমি পদ্মের সঙ্গে গাছের নিচ থেকে ওই কন্দও আমার জন্য নিয়ে আসবে।”
দ্রৌপদীর কথামতো ভীম সকাল হতেই পদ্ম আনতে বেরিয়ে পড়লেন। কিছুদূর যেতে এক বিরাট কলাগাছের বন দেখতে পেলেন ভীম। তিনি সেই বনের ভেতর গাছ ভেঙে পথ চলতে লাগলেন। যথাসময়ে কলাগাছ সরে যেতে সামনে একটি অপরূপ সরোবর দেখতে পেলেন ভীম। সেখানে হাজার হাজার পদ্ম ফুটে আছে। এক অপরূপ দৃশ্য। ভীম তখন মহানন্দে তাল ঠুকে চিৎকার করে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন। সেই শব্দ শুনে হিমালয়ের গুহায় নিদ্রিত সিংহরা জেগে উঠল। সিংহের গর্জন শুনে বনের হাতিরাও বিশাল রবে ডেকে উঠল।
সেই বনের ভেতর কলাগাছের বনে বসেছিলেন পবনপুত্র বীর হনুমান। তিনি ভীমকে চিনতে পারলেন। এই দুর্গম পথে তিনি ভীমকে যেতে দিতে চাইলেন না। কারণ, দেবলোকে যাবার সেই পথে বহু বিপদ আছে। হনুমান ভীমের পথের ধারে রাস্তা জুড়ে শুয়ে রইলেন। ভীম হনুমানকে বললেন, “পথ ছেড়ে দাও। আমি সামনে যাব।”
হনুমান বললেন, “তুমি কোথায় যাবে? এই পথ দেবলোকের দিকে গেছে। মানুষ সেখানে যেতে পারে না।”
ভীম নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, “আমি সামনে যাবই। তাতে আমার মৃত্যু হলেও যাব। তুমি পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াও।”
হনুমান বললেন, “আমি অসুস্থ। ওঠার শক্তি নেই। যদি নিতান্তই যেতে চাও, আমাকে ডিঙিয়ে যাও।”
“প্রতিটি প্রাণীর ভেতর ঈশ্বরের প্রকাশ। তাই আমি তোমাকে ডিঙিয়ে যেতে পারব না।”
“তবে আমার লেজটি সরিয়ে এগিয়ে যাও।”
ভীম তখন অবহেলা ভরে হনুমানের লেজটি সরাতে গেলেন, কিন্তু কিছুতেই পারলেন না। ভীমের শরীর থেকে ঘাম ঝরতে লাগল। তিনি সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেও হনুমানের লেজটিকে একচুলও সরাতে পারলেন না। তখন ভীম বুঝতে পারলেন এই হনুমানটি কোনও সাধারণ বানর নয়। তিনি তখন জোড়হাতে তাঁকে বন্দনা করলেন। জানতে চাইলেন তিনি কে।
হনুমান ভীমকে নিজের পরিচয় দিলেন। বললেন, “শ্রীরামের বরে আমি অমরত্ব পেয়েছি। জগতে যতদিন রামকথা প্রচারিত থাকবে, আমার মৃত্যু হবে না, আর সীতা মায়ের আশীর্বাদে আমার যাবতীয় ভোগ্য বস্তুরও কখনও অভাব হবে না। তুমি যে পদ্ম খুঁজতে এসেছ, এই সরোবরে সেই সুগন্ধী পদ্ম নেই। সেই পদ্মের সরোবর আরও সামনে আছে। সে পথ অগম্য বলেই আমি তোমার পথ আটকেছিলাম। ওই পদ্মবনে গিয়ে তুমি বলপ্রয়োগ করে কিছু কোরো না।”
হনুমানের বলে দেওয়া পথে ভীম এগিয়ে গিয়ে একটি অপূর্ব সুন্দর পাহাড়ি ঝরনা দেখতে পেলেন। ঝরনার জল নিচে নেমে এসে একটি নদীর সৃষ্টি করেছে। নদীটি স্থির ও সুশীতল জলে ভরা। সেখানেই অপরূপ সুগন্ধী সেই স্বর্গীয় পদ্ম ফুটে আছে। সাদা, লাল, গোলাপি, নীল, ফিরোজা, বেগুনি, ফিকে লাল, রক্ত লাল এমন কত রংয়ের পদ্ম যে ফুটে আছে সেখানে তার ইয়ত্তা নেই। আর সেইসব পদ্মের এমন সুমধুর গন্ধ যে সমস্ত জায়গাটি পদ্মের সুগন্ধে ভরে আছে। ভীম জলে নেমে পদ্ম সংগ্রহ করতে লাগলেন।
এমন সময় কিছু রাক্ষস তাঁকে এসে বলল, “এখানে কুবেররাজ স্নান করেন। মানুষেরা এখানে আসতে পারে না। বিনা অনুমতিতে যে এখান থেকে পদ্ম তোলে আমরা তাঁকে বন্দী করি।”
ভীম বললেন, “এই নদী পাহাড় থেকে নেমে এসেছে। এটি মর্ত্যের নদী, দেবলোকের নদী নয়। পদ্মও এখানকার নদীতেই ফুটেছে। তাই মর্ত্যের সকলেই তা নিতে পারে। তাছাড়া অনুমতি আমি কখনও প্রার্থনা করি না, আমি হলাম ক্ষত্রিয়। ক্ষত্রিয়রা কেড়ে নেয়, দুর্বলের মতো কখনও অনুমতি চায় না।”
একথা শুনে রাক্ষসেরা ভয়ানক রেগে ভীমকে আক্রমণ করল। ভীমও মহা তেজে লড়াই করতে লাগলেন। কয়েকজন রাক্ষস কুবেরের ভবনে গিয়ে নালিশ জানাল। সব শুনে কুবের হেসে বললেন, “ঠিক আছে, ভীম দ্রৌপদীর জন্য যত ইচ্ছে পদ্ম তুলুক।”
এদিকে ভীম আসছেন না দেখে যুধিষ্ঠির ও দ্রৌপদী ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তাঁরা তখন ঘটোৎকচকে ডেকে পদ্ম সরোবরের খোঁজ পেলেন। ঘটোৎকচ সকলকে কুবেরের পদ্ম সরোবরে নিয়ে গেল। সকলের আবার দেখা হল।


কিছুদিন কেটে গেল। পাণ্ডবরা জানতে পারলেন, বনবাসের পঞ্চম বছরে অর্জুন ফিরে আসবেন। তবে তিনি কৈলাশ পর্বতের কাছে আরষ্টিষেণের আশ্রমে সকলের সঙ্গে দেখা করবেন। একথা শুনে সকলে মাল্যবান পর্বত পার হয়ে ঋষি আরষ্টিষেণের আশ্রমে অতিথি হয়ে থাকতে লাগলেন। ঋষি তাঁদের খুবই আদর আপ্যায়ন করতে লাগলেন। সুস্বাদু ফল, মধু এবং মাংস খেয়ে তাঁরা মহানন্দে সেখানে বাস করতে লাগলেন।
একদিন দ্রৌপদী ভীমকে বললেন, “এই মাল্যবান পর্বতের উপরে শুনেছি ভয়ানক রাক্ষসদের উৎপাত। তুমি গিয়ে রাক্ষস মেরে এসো। আমরা সকলে পাহাড়ের উপরটা কেমন তা দেখতে যাব।”
দ্রৌপদীর কথা শুনে ভীম বললেন, “এ আর এমন কী ব্যাপার! আমি এখনই সব রাক্ষস মেরে ফেলছি।”
ভীম পাহাড়ের উপরে উঠে নির্বিচারে রাক্ষস মারতে লাগলেন। ভীমের অত্যাচারের কথা জানতে পেরে কুবেরদেব ক্রুদ্ধ হয়ে সেখানে এলেন। পাণ্ডবেরা সকলেই তাঁর কাছে ক্ষমা চাইলেন। কুবের বললেন, “আমার অনুচর এই রাক্ষসেরা তাদের মন্দকর্মের দোষে বিনষ্ট হয়েছে। একবার এরা আকাশ পথে রথে করে যাবার সময় যমুনাতীরে মহর্ষি অগস্ত্যের মাথায় থুতু ফেলেছিল। সেই পাপে অগস্ত্যদেব এদের অভিশাপ দেন, যে এরা সসৈন্য মানুষের হাতে মরবে। তাই ভীমের হাতে এদের মৃত্যু হয়েছে। তবে ভীম ধর্মজ্ঞানহীন, ভয়ানক গর্বিত, বালকবুদ্ধি সম্পন্ন, অসহিষ্ণু এবং ভয়শূন্য। একে অতি সাবধানে এবং শাসনে রেখো, যুধিষ্ঠির। ভীমের অহঙ্কার কয়েকদিনের মধ্যেই চূর্ণ হবে। সে কয়েকদিনের ভেতরে পরাজিত হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হবে। তবে কৃষ্ণের কৃপায় তাঁর প্রাণ শেষপর্যন্ত রক্ষা পাবে।”


সাত


দেখতে দেখতে আরও একমাস কেটে গেল। একদিন সন্ধ্যাবেলা সকলে বসে আশ্রমের কুটিরে বিশ্রাম নিচ্ছেন, এমন সময় পাণ্ডবরা সকলে দেখলেন আকাশ আলোকিত করে ইন্দ্রের বিমান আসছে। সেই আলোকিত বিমানে দিব্য সুগন্ধী মালা পরে ও সুন্দর পোশাকে সজ্জিত হয়ে অর্জুন বসে আছেন। রথ চালিয়ে নিয়ে আসছেন ইন্দ্রের সারথি মাতলি।
অর্জুন বিমান থেকে নেমে বড়োদের প্রণাম করলেন, ছোটোদের আলিঙ্গন করলেন। তিনি দ্রৌপদীর জন্য ইন্দ্রের দেওয়া নানারকম অলঙ্কার উপহার নিয়ে এসেছেন। আছে নবরত্নের মালা, মুক্তার চূড়, সোনার কারুকার্য করা মুকুট, পায়ের মল, হাতের বাজুবন্ধ ও বহুমূল্য নানারকমের রত্নের আংটি।
অর্জুনের উপহার পেয়ে দ্রৌপদী খুব খুশি হলেন। বহুদিন পরে সবাই আবার মিলিত হয়েছেন। স্বর্গ থেকে অর্জুন এখন অনেকরকম দিব্যাস্ত্র লাভ করেছেন। অর্জুন তাঁর স্বর্গবাস এবং তাঁর অস্ত্রলাভের গল্প বলতে লাগলেন সকলকে। অর্জুন বললেন, “প্রথমে বেশ কয়েক বছর ধরে আমাকে দেবরাজ ইন্দ্র অস্ত্রশিক্ষা দিয়েছেন। অস্ত্রশিক্ষা শেষ হতে তিনি বলেন, ‘আমি তোমার কাছে একটি অনুরোধ রাখব। সেটিই হবে আমাকে তোমার দেওয়া গুরুদক্ষিণা। পৃথিবীর সমুদ্রগর্ভে নিবাতকবচ নামে তিন কোটি দানব বাস করে। একসময় তারা দেবতাদের সঙ্গে দেবলোকে বাস করতে চেয়ে অনেক লড়াই করেছে। তারপর যুদ্ধে হেরে গিয়ে ওরা পৃথিবীর দুর্ভেদ্য স্থানে সমুদ্রের গভীরে আশ্রয় নিয়েছে। জলতলের গভীরে বিশেষ দক্ষতায় তারা প্রাসাদ তৈরি করে বাস করে। তারা কৌশলী এবং মায়াবী। ওদের হত্যা করতে হবে।’
“ইন্দ্রদেবের কথামতো বর্ম এবং দুর্ভেদ্য মুকুটে সজ্জিত হয়ে গাণ্ডীব নিয়ে আমি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলাম। আমাকে বিশেষ রথে করে বহুদূর পথ পেরিয়ে মাতলি গভীর সমুদ্রের ভেতর নিয়ে গেল। সেখানে হাজার হাজার দানব আমাকে আক্রমণ করল। তাদের পরনে লোহার বর্ম, মুখেও লোহার মুখোশ। তারা গদা মুষল নিয়ে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি অস্ত্র দিয়ে অনেক দানব হত্যা করলাম। দানবের শেষ নেই। আমাকে পাথর ও আগুন ছুড়ে মারতে লাগল তারা। আক্রমণ থেকে বাঁচতে সমুদ্রের তলায় আগে থেকে তৈরি করা একটি গর্তে আশ্রয় নিলাম। মাতলি বলল, ‘যদি জয়ী হতে চান রথে উঠে পড়ুন। যাওয়ার আগে এখানে ইন্দ্রদেবের বজ্র নামক অস্ত্র ছুড়ে দিয়ে যাবেন। এতে একসঙ্গে এখানকার সবার প্রাণ যাবে।’
“আমি জানি বজ্র অতি ভয়ংকর অস্ত্র। এর প্রভাবে নিবাতকবচেরা কেউ বাঁচবে না। প্রাণসংশয় না হলে বজ্র কখনও প্রয়োগ করা যায় না। আমারও প্রাণসংশয় উপস্থিত, অতএব আমি বজ্র প্রয়োগ করলাম। মুহূর্তের মধ্যে জায়গাটা তীব্র আলোর ঝলকানিতে ঝলসে উঠল তারপর গাঢ় তমিস্রা। তার মধ্যে দানবদের আর্তনাদ শোনা যেতে লাগল। আমি আর অপেক্ষা করতে পারলাম না। রথে করে সেই স্থান ছেড়ে চলে এলাম। যেতে যেতে দেখতে পেলাম দানবদের এই নগর স্বর্গের চেয়েও সুন্দর। বিরাট বিরাট অলিন্দময় প্রাসাদ দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম। মাতলি জানাল, এই নগর আগে দেবরাজেরই ছিল। ব্রহ্মার বর পেয়ে দানবেরা দেবতাদের তাড়িয়ে অধিকার করে নিয়েছিল। ব্রহ্মা দানব সংহারক হিসেবে তোমার নাম বলেছিলেন, তাই দেবরাজ তোমাকে এই কাজ দিয়েছেন।’
“আকাশপথে ফেরার সময় মাতলি আমাকে আকাশের বুকে এক অসাধারণ নগর দেখাল। সেই নগরের নাম হিরণ্যপুর। এই নগরটি একটি মহাকাশযানের মতো উপরে উঠতে পারে এবং নিচে নামতে পারে। এখানকার অধিবাসীদের সঙ্গেও আমার যুদ্ধ হল। কিছুতেই তাদের সঙ্গে আমি যুদ্ধে পেরে উঠছিলাম না। তখন বাধ্য হয়ে পাশুপত অস্ত্র প্রয়োগ করলাম। অস্ত্রপ্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে তিন মাথা ও প্রতিটিতে তিনটি করে চোখ নিয়ে মোট ন’টি চোখ এবং ছ’টি হাত বিশিষ্ট এক অদ্ভুত পুরুষের আবির্ভাব হল। তার চুলগুলি সূর্যের মতো জ্বলন্ত। সেই পুরুষ থেকে নানারকম প্রাণীর উৎপত্তি হতে লাগল। তারা কেউ তিন মাথা বিশিষ্ট যন্ত্র, কেউ চার মাথা যুক্ত অদ্ভুত প্রাণী। কারুর চারটি হাত। সবই ওই যান্ত্রিক অদ্ভুত পুরুষের থেকে সৃষ্টি হতে লাগল। তারপর সেই অদ্ভুত যন্ত্রেরা ওই নগরের সব দানবদের সংহার করল।
“মাতলির সঙ্গে এরপর আমি দেবলোকে ফিরে গেলাম। ইন্দ্রদেবকে প্রণাম করতেই তিনি আমার বহু প্রশংসা করলেন। দেবরাজ বললেন, ‘এরপর কৌরবদের সঙ্গে যুদ্ধ হলে কেউ তোমার ষোলো ভাগের একভাগেরও সমান হবে না।’
“তিনি আমাকে এরপর দেহরক্ষক অভেদ্য দিব্য কবচ, সোনার হার, দেবদত্ত নামক বিরাট শঙ্খ, মুকুট এবং দিব্য বস্ত্র ও আরও অনেক অলঙ্কার দিলেন।”
অর্জুনের কথা শুনে যুধিষ্ঠির ও বাকি সকলে খুব আনন্দিত হলেন। সকলে সেই অদ্ভুত অস্ত্রের প্রয়োগ দেখতে চাইলেন।
অর্জুন পরেরদিন সকালে একটি প্রান্তরে এসে দিব্যাস্ত্রের প্রয়োগ দেখাতে চাইলেন। সঙ্গে সঙ্গে সকালেই অন্ধকার নেমে এল। পাহাড় ফেটে গেল। ভয়ানক শব্দে ব্রহ্মণেরা বেদ মনে করতে পারলেন না। তখন নারদ এসে সকলকে বললেন, “বিনা কারণে এইসব অস্ত্রের প্রয়োগ করা যায় না। যখন যুদ্ধ হবে, সকলে তখন এর প্রয়োগ দেখতে পাবেন।”
এরপর সকলে সমতলে ফিরে চললেন। ফেরার পথেও ঘটোৎকচ এসে সকলকে বহন করে সমতলে পৌঁছে দিয়ে গেল। পাণ্ডবেরা এরপর যমুনার উৎপত্তি স্থলের কাছে এক বিরাট বনে এসে থাকতে লাগলেন। সেই বনের নাম বিশাখযূপ। এই বন মৃগয়ার জন্য আদর্শ। বনে নানারকম পশুপাখির বাস। তাই মৃগয়ায় নানারকম শিকার পাওয়া যায়। সকলে আনন্দিত মনে শিকার করতে লাগলেন এখানে।


একদিন ভীম শিকার করতে একা বেরিয়েছেন। তার কয়েকটি হরিণ ও বরাহ শিকার করা হয়েছে। এমন সময় একটি গুহার ভেতর থেকে হলুদ রংয়ের একটি চিত্রবিচিত্র অজগর সাপ বেরিয়ে এসে ভীমকে জড়িয়ে ধরল। এমন ভয়ানক জোরে সাপটি ভীমকে ধরল যে ভীম নিজেকে ছাড়াতে পারলেন না। ভীম বললেন, “তুমি কে? আমি ধর্মরাজের ভাই। আমার হায়ে অযুত হাতির শক্তি। আমাকে কী করে বশ করলে?”
সাপটি তখন ভীমের হাতদুটি মুক্ত করে দিল, কিন্তু শরীর ধরে রাখল। সে বলল, “আমি নহুষ। তোমার পূর্বপুরুষেরা নিশ্চয়ই আমার নাম শুনেছেন। আমি অগস্ত্যের অভিশাপে সাপ হয়ে গেছি। আমি বহুদিন কিছু খাইনি। এখন ভাগ্য করে তোমাকে পেয়েছি। আজ আমি তোমাকে খেয়ে আমার খিদে মেটাব।”
ভীম বললেন, “মরতে আমি ভয় পাই না। রাজ্যের লোভে আমি আমার ধর্মপ্রাণ দাদাকে অনেক কটু কথা শুনিয়ে কষ্ট দিয়েছি। আমার মৃত্যুতে সবাই দুঃখ পাবে। তবে সবথেকে কষ্ট পাবেন আমার মা আর আমার ছোটো দুই ভাই নকুল এবং সহদেব।”
এদিকে বিকেল হয়ে আসছে অথচ ভীম ফিরে আসছে না দেখে যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীকে বললেন, “ভীম কোথায় গেছে?”
দ্রৌপদী বললেন, “আজ ভোরে উঠেই মৃগয়ায় গেছেন।”
তখন যুধিষ্ঠির ধৌম্যকে সঙ্গে নিয়ে ভীমকে খুঁজতে বের হলেন। বহুদূর পথ বনের মধ্যে ঘুরতে লাগলেন তিনি। শেষে এক পাহাড়ের গুহার ভেতরে ভীমকে দেখতে পেলেন। অজগরের বন্ধনে ভীম তখন জ্ঞান হারিয়েছেন। যুধিষ্ঠির বললেন, “হে অজগর, আমার ভাইকে ছেড়ে দিন। আমি আপনাকে অন্য খাদ্য দেব।”
সাপ বলল, “এ আমার অভীষ্ট খাবার। একে ছাড়তে পারব না। তবে যদি তুমি আমার কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারো তাহলে তোমার ভাই মুক্তি পেতে পারে।”
যুধিষ্ঠির বললেন, “বেশ। আপনি আমাকে যত ইচ্ছা প্রশ্ন করুন। আমি উত্তর দেব।”
সাপ বলল, “কথা শুনে মনে হচ্ছে তুমি বুদ্ধিমান। বেশ, আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। বলো দেখি ব্রাহ্মণ কে। জ্ঞাতব্য কী?”
যুধিষ্ঠির উত্তর দিলেন, “যিনি চরিত্রবান এবং যাঁর কাছে সত্য, ক্ষমা, দান, অহিংসা, তপস্যা ও দয়ার মতো গুণ থাকে তিনিই ব্রাহ্মণ। জ্ঞাতব্য হল সুখদুঃখহীন পরমব্রহ্ম। সেই পরমব্রহ্মকে লাভ করলে সুখ এবং দুঃখ কোনোটাই থাকে না, তিনিই জ্ঞাতব্য।”
শুনে সাপ বলল, “শূদ্রদের মধ্যেও তো এমন ব্রাহ্মণের গুণ থাকতে পারে। তবে কি শূদ্রকে ব্রাহ্মণ বলা যাবে?”
যুধিষ্ঠির বললেন, “নিশ্চয়ই যাবে। যদি ওইসব লক্ষণ শূদ্রের মধ্যে থাকে তাহলে তিনি শূদ্র নন, ব্রাহ্মণ। আর যদি এইসব গুণ না থাকে তবে তিনি ব্রাহ্মণ নন। তখন তাকেই শূদ্র বলা উচিত।”
“হে যুধিষ্ঠির, জ্ঞাতব্যকে প্রকৃত জেনেছেন এমন ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ কি কেউ বাস্তবে আছেন?”
“হে সর্পশ্রেষ্ঠ! এমন ব্রহ্মজ্ঞ মহাপুরুষ আছেন বলেই আমার বিশ্বাস।”
যুধিষ্ঠিরের উত্তর শুনে সাপ খুশি হয়ে ভীমকে মুক্তি দিলেন। মুক্তি পেয়ে ভীমের কুবেরের অভিশাপের কথা মনে হল। তিনি নিজের অহঙ্কারের জন্য লজ্জা পেলেন। যুধিষ্ঠির সাপের সঙ্গে অনেক ধর্মালোচনা করতে লাগলেন। বললেন, “আপনি পরম জ্ঞানী। শুনেছি আগে স্বর্গের অধিবাসী ছিলেন। আপনি কেন সাপ হয়ে গেছেন?”
নহুষ বলল, “আমি অহঙ্কারী হয়ে বিচরণ করতাম। দেবতারা আমার পালকি বয়ে নিয়ে যেতেন। একদিন ঋষি অগস্ত্য যখন আমার পালকি বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, আমি তার মাথায় পা দিয়েছিলাম। তাতে ঋষি রেগে গিয়ে অভিশাপ দেন, ‘ওরে মূর্খ! তুই মাটিতে না নেমে দেবতাদের দিয়ে পালকি বহন করাস? তুই সাপ হয়ে মাটিতে বুক ঘষে চলবি।’ তারপর থেকে আমি সাপ হয়ে পৃথিবীতে আছি। শত শত বছর পরে যুধিষ্ঠির আমাকে মুক্তি দেবে একথা জানতাম। তাই আজ ভীমকে বন্দী করেছিলাম যাতে তোমার দেখা পাই। তুমি না এলে আমার শাপমুক্তি হত না।”
এই বলে সাপ একটি দিব্য দেহ ধারণ করল এবং তার মৃত্যু হল।


আট


বিশাখযূপ বন থেকে পাণ্ডবেরা আবার কাম্যক বনে ফিরে এলেন। সেখানে কৃষ্ণ এবং তাঁর স্ত্রী সত্যভামা পাণ্ডবদের দেখতে এলেন। দ্রৌপদীর পাঁচ সন্তান এবং অভিমন্যু এখন কৃষ্ণের তত্ত্বাবধানে এবং সুভদ্রার যত্নে সেখানেই থাকে। কৃষ্ণ দ্রৌপদীকে যাজ্ঞসেনী বলে সম্বোধন করতেন। কারণ, দ্রৌপদী যজ্ঞ থেকে উত্থিত হয়েছিলেন। কৃষ্ণ বললেন, “যাজ্ঞসেনী, তোমার ছেলেরা কুশলে আছে। তারা সকলেই খুব শান্তশিষ্ট এবং বীর হয়েছে। তারা তাদের মামাবাড়ি পাঞ্চালে যেতে চায় না। দ্বারকাতেই থাকতে চায়। সুভদ্রা সেখানে সবসময় তাদের সদাচার শেখাচ্ছে। আমার পুত্র প্রদ্যুম্ন ও অভিমন্যু তাদের রথ ও অশ্বচালনা শেখাচ্ছে। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো।”
তারপর যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মহারাজ, যাদবসেনা কেবল আপনার আদেশের অপেক্ষা করছে। আপনি পাপী দুর্যোধনকে সবান্ধবে পরাজিত করুন। আপনি বনবাসের প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, যদি তাই পালন করতে চান, তা করুন। আমরা আপনার পাশে আছি।”
যুধিষ্ঠির বললেন, “হে কৃষ্ণ, তুমি আমাদের ভরসা। উপযুক্ত সময়ে তুমি আমাদের সাহায্য করবে তাতে সন্দেহ নেই। তবে প্রতিজ্ঞা পালনে আর বেশি বাকি নেই। আমাদের বনবাসের বারো বছর প্রায় পূর্ণ হতে চলেছে। এরপর অজ্ঞাতবাস শেষ করেই আমরা সকলে তোমার শরণ নেব।”


পাণ্ডবেরা এরপর বনবাসের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছেন। সামনে বর্যাকাল আসছে দেখে তাঁরা কাম্যক বন ত্যাগ করে দ্বৈত বনে এসে থাকতে লাগলেন। এখানে বড়ো বড়ো গাছের ছায়ায় তাঁরা কয়েকটি পর্ণকুটির বেঁধে থাকতে লাগলেন।
এই সময় কর্ণ এবং শকুনি এসে একদিন দুর্যোধনকে বললেন, “দুর্যোধন, তুমি এখন মহাসুখে রাজ্যভোগ করছ, অথচ পাণ্ডবেরা শ্রীহীন হয়ে বনে থেকে কষ্ট করছে। এখন একবার তাঁদের সঙ্গে দেখা করে এসো। পাহাড়ের লোকজন যেমন সমতলের লোকেদের দেখে, কিংবা ধনী আত্মীয় যেমন দুর্দশাগ্রস্ত দরিদ্র শত্রুকে দেখে তেমন। এর চেয়ে আনন্দ আর কিছুতেই নেই। তোমার পত্নীদেরও সালঙ্কারা অবস্থায় দ্রৌপদীর সঙ্গে দেখা করাও।”
দুর্যোধনের তো একথা শুনে যাবার খুব শখ হল। তিনি বললেন, “বৃদ্ধ রাজা আমার পিতা আমাকে যেতে দেবেন না।”
শুনে কর্ণ বললেন, “রাজাকে বলবে, তুমি তোমাদের গোপালকদের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছ। কারণ, দ্বৈত বনের কাছেই থাকে গোপালকেরা। ঘোষযাত্রা তো রাজকর্তব্য!”
ধৃতরাষ্ট্রকে দ্বৈত বনে শিকার এবং গোপালকদের কাছে যাবেন বলাতে তিনি ভয় পেয়ে বললেন, “শুনেছি পাণ্ডবরা এখন সেখানেই আছে। তোমরা এখন সেখানে যেও না। অর্জুন দিব্যাস্ত্র নিয়ে ফিরেছে, তার উপর ভীম তো ভীষণ অসহিষ্ণু। কোথা থেকে কী হবে, না না, ওখানে গিয়ে কাজ নেই।”
শকুনি বললেন, “আমরা মৃগয়া করতে এবং গরুর সংখ্যা গণনা করতেই সেখানে যাব। পাণ্ডবদের সঙ্গে দেখাও করব না।”
শেষপর্যন্ত ধৃতরাষ্ট্র নিতান্ত অনিচ্ছায় মত দিলেন।


এদিকে দ্বৈত বনে এসে দুর্যোধন তাঁর ভৃত্যদের আদেশ দিলেন সেখানকার সরোবরের পাশে বহু স্নানঘর তৈরি করতে। সেই সময় গন্ধর্বরাজ চিত্রসেন সেই সরোবরে সঙ্গীসাথীদের নিয়ে স্নান করতে এসেছিলেন। চিত্রসেনের সঙ্গীদের সঙ্গে দুর্যোধনের লোকজনদের বিবাদ হল। দুর্যোধন একদল সেনা পাঠিয়ে দিয়ে বললেন, “চিত্রসেনের লোকজনদের হত্যা করো।”
দুর্যোধনের সেনারা পরাজিত হয়ে ফিরে এলে দুর্যোধন আরও বহু শত সেনা পাঠালেন। তারাও পরাজিত হতে দুর্যোধন, কর্ণ এরা সবাই যুদ্ধ করতে এলেন। যুদ্ধ করতে গিয়ে কর্ণের রথ ধ্বংস হয়ে গেল। কর্ণ তাড়াতাড়ি বিকর্ণর রথে করে সেখান থেকে পালিয়ে গেলেন। কর্ণ বুঝেছিলেন, গন্ধর্বদের সঙ্গে যুদ্ধে তিনি পারবেন না। এদিকে চিত্রসেনের লোকজন দুর্যোধন, দুঃশাসন ও তাঁদের পত্নীদের ধরে নিয়ে বন্দী করে রাখলেন।
পরাজিত সৈন্যরা যুধিষ্ঠিরকে খবর দিলেন। খবর শুনে ভীম বললেন, “ভালো হয়েছে। যেমন কর্ম তেমন ফল পেয়েছে সকলে।”
কিন্তু যুধিষ্ঠির বললেন, “কৌরবরা আমাদের জ্ঞাতিভাই। তাদের পরাজয় আমাদেরই লজ্জা। এখন ওদের সাহায্য প্রয়োজন। যাও, তোমরা গিয়ে ওদের মুক্ত করে আনো।”
একথা শুনে ভীম, অর্জুন, নকুল আর সহদেব রথে চেপে কৌরবদের উদ্ধার করতে গেলেন। অর্জুন আর ভীমের সঙ্গে চিত্রসেনের সেনাদের ভয়ানক যুদ্ধ হল। শেষে চিত্রসেন এসে অর্জুনকে বললেন, “তুমি আমাকে চিনতে পারছ অর্জুন? আমি তোমার সখা!”
অর্জুন চিত্রসেনকে আগেই চিনেছিলেন। বন্ধু পরিচয় দেওয়ায় তিনি অস্ত্র রেখে দিলেন। তখন চিত্রসেন বললেন, “দুরাত্মা দুর্যোধন আর কর্ণ তোমাদের উপহাস করতে এখানে আসছে জানতে পেরে ইন্দ্রদেব আমাকে বললেন, ‘যাও, দুর্যোধন ও তার মন্ত্রণাদাতাদের বেঁধে নিয়ে এসো।’ তাই আমি সকলকে বন্দী করে সুরলোকে নিয়ে যাচ্ছিলাম।”
এরপর যুধিষ্ঠিরের অনুরোধে চিত্রসেন দুর্যোধনদের মুক্তি দিলেন। যুধিষ্ঠির দুর্যোধনকে বললেন, “কখনও এমন দুঃসাহসের কাজ কোরো না। এখন নিরাপদে হস্তিনাপুরে ফিরে যাও।”
দুর্যোধন তখন লজ্জায় অপমানে মাথা নিচু করে ফিরে গেলেন। পথে একজায়গায় তিনি রথ থেকে নেমে গেলেন। তিনি এত অপমানিত হয়েছিলেন যে রাজ্যে আর ফিরে যাবেন না বলে জানালেন।
সকলে তাঁকে ফিরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করতে লাগল। কিন্তু দুর্যোধন কুশ শয্যায় শুয়ে মৃত্যুবরণ করবেন বলে জানালেন। তারপর পাতালের অসুরদের অনুরোধে শেষপর্যন্ত তিনি রাজ্যে ফিরে গেলেন।
শকুনি বললেন, “বৃথাই তুমি দুঃখ করছিলে। পাণ্ডবরা তোমাকে উদ্ধার করেছে তাতে কী এমন ক্ষতি হয়েছে? তারা তোমার প্রজা। তারা নিজের রাজাকে রক্ষা করেছে। তাছাড়া পাশাখেলায় হেরে তারা তোমার দাস হয়েছে। তোমাকে রক্ষা করে কী আর এমন মহান কাজ তারা করেছে?”


ফিরে এসে দুর্যোধন বললেন, “পাণ্ডবদের মতো আমিও রাজসূয় যজ্ঞ করতে চাই।”
কর্ণ ও অন্যান্যরা সকলে তাঁকে সমর্থন করলেন। কিন্তু পুরোহিত বললেন, “তোমার পিতা ও যুধিষ্ঠির বেঁচে থাকতে আর কেউ এই যজ্ঞ করতে পারবে না। তবে আরও একটি যজ্ঞ আছে। তাতে করদ রাজ্যের দেওয়া সোনা দিয়ে লাঙল তৈরি করে জমি চাষ করতে হয়। এর নাম বৈষ্ণব যজ্ঞ। এতে তোমার মনের ইচ্ছে পূরণ হবে।”
দুর্যোধন তখন অনেক অর্থ ব্যয় করে বৈষ্ণব যজ্ঞ করলেন। বহু মানুষকে নিমন্ত্রণ করলেন। অপমান করার জন্য বনবাসী পাণ্ডবদেরও নিমন্ত্রণ করলেন। বনবাসী হয়ে নিমন্ত্রণ রক্ষা করা যায় না। পাণ্ডবরা গেলেন না। যুধিষ্ঠির দূতকে বললেন তেরো বছর অতিক্রম না করলে তাঁরা যেতে পারবেন না।


নয়


একদিন দ্বৈত বনে রাত্রে ঘুমিয়ে যুধিষ্ঠির স্বপ্ন দেখলেন, বনের হরিণেরা তাঁকে বলছে, ‘দয়া করে আপনারা এই জায়গা ছেড়ে চলে যান। আপনারা বীর এবং অস্ত্র পটু। বনবাসের এখনও একবছর আট মাস বাকি আছে। আপনার ভ্রাতারা আমাদের প্রায় সকলকেই মেরে ফেলেছেন। যদি আপনারা চলে যান, তাহলে আমরা সংখ্যায় বাড়তে পারব। নাহলে আমরা সকলেই লোপ পাব।”
এই স্বপ্ন দেখায় পরেরদিনই পাণ্ডবেরা দ্বৈত বন ছেড়ে কাম্যক বনে গেলেন। কাম্যক বনে ব্যাসদেবের আশ্রম। বহুদিন পরে ফিরে এসে পাণ্ডবেরা সকলে তাঁকে প্রণাম করতে গেলেন। যুধিষ্ঠির ব্যাসদেবকে বললেন, “হে প্রভু, আমাদের কষ্টকর বনবাসের এগারো বছর পূর্ণ হয়েছে। আপনি আমাদের আশীর্বাদ করুন।”
ব্যাসদেব তাঁদের আশীর্বাদ করে একটি গল্প বললেন।
কুরুক্ষেত্রে একজন খুব ধর্মাত্মা মুনি থাকতেন। তিনি পায়রাদের মতো ফসল কেটে নেওয়ার পর ক্ষেতে যে শস্য পড়ে থাকত, তাই খেয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সেই সামান্য অন্ন থেকে তিনি অতিথি সেবা করতেন। এর জন্য প্রায়ই তিনি উপোস করে থাকতেন। একদিন দুর্বাসা মুনি তাঁর কাছে এসে অন্ন চাইলেন। মুদ্গলের কাছে যা অন্ন ছিল সবই খেয়ে বাকিটা শরীরে মেখে দুর্বাস চলে গেলেন। এমন করে পরপর ছ’দিন দুর্বাসা মুদ্গলের সব অন্ন খেয়ে গেলেন আর মুদ্গল উপবাসী থাকলেন। শেষদিন সন্তুষ্ট হয়ে দুর্বাসা বললেন, “তোমার মহৎ দানের জন্য তুমি সশরীরে স্বর্গে যাবে।”
যথাসময়ে দেবদূত রথ নিয়ে তাঁকে স্বর্গে নিয়ে যেতে এলেন। মুদ্গল বললেন, “আগে স্বর্গবাসের গুণ এবং দোষ শুনি, তারপর যাব কি না ঠিক করব।”
দেবদূত বললেন, “স্বর্গে রোগ, শোক, ক্লান্তি, মোহ ইত্যাদি নেই। দেব, সাধক এবং মহাত্মারা সেখানে নিজের নিজের ধামে বসবাস করেন। তাছাড়া স্বর্গে তেত্রিশজন ঋভু আছেন। দেবতারাও তাঁদের পূজা করেন। এই হল স্বর্গের গুণ। এবার দোষ বলছি শুনুন। স্বর্গে গেলে কৃতকর্মের ফল ভোগ হয়, কিন্তু নতুন কর্ম করা যায় না। সেখানে অপরের বেশি সুখ-সম্পদ দেখে অসন্তোষ হয় এবং কর্ম শেষ হলে আবার পৃথিবীতে জন্ম নিতে হয়।”
দেবদূতের কথা শুনে মুদ্গল বললেন, “নমস্কার, দেবদূত। তুমি ফিরে যাও। স্বর্গসুখ আমার প্রয়োজন নেই। যে অবস্থায় মানুষ দুঃখ শোক জয় করতে পারে এবং তার আবার পতন হয় না, আমি সেই অবস্থার অন্বেষণ করব।”
দেবদূত ফিরে গেলে মুদ্গল শুদ্ধ জ্ঞানমার্গে ধ্যানের মাধ্যমে নির্বাণমুক্তি পেলেন।


একদিন ভীষণ ক্রুদ্ধ তপস্বী দুর্বাসা দুর্যোধনের কাছে এলেন। দুর্যোধন তাঁর খুব সেবা করলেন। সেবায় তুষ্ট হয়ে দুর্বাসা বললেন, “কী বর চাও?”
দুর্যোধন কী চাইবেন তা আগেই পরামর্শ করে ঠিক করে রেখেছিলেন। তিনি বললেন, “প্রভু, আপনি শিষ্যদের নিয়ে কাম্যক বনে গিয়ে যুধিষ্ঠিরের আতিথ্য নিন। তবে দুপুরে যখন দ্রৌপদীর খাওয়া হয়ে যাবে তখন সেখানে যাবেন।”
দুর্যোধন জানতেন সূর্যের আশীর্বাদী থালার অন্ন দ্রৌপদীর খাওয়ার পর শেষ হয়ে যায়। ঋষি খাবার না পেলে অভিশাপ দেবেন এবং পাণ্ডবেরা ঋষির অভিশাপে ধ্বংস হয়ে যাবেন।
দুর্যোধনের কথামতো দুর্বাসা মুনি তাঁর দশ হাজার শিষ্য নিয়ে একদিন দুপুরবেলা কাম্যক বনে যুধিষ্ঠিরের কাছে উপস্থিত হলেন। যুধিষ্ঠির তাঁদের স্নান-আহ্নিক করতে পাঠালেন। সকলে নদীতে গেলেন। এদিকে ঘরে কোনও খাদ্য নেই। দ্রৌপদী পড়লেন ভয়ানক বিপাকে। এত মানুষের খাদ্য কীভাবে প্রস্তুত হবে ভেবে না পেয়ে তিনি একমনে শ্রীকৃষ্ণকে ডাকতে লাগলেন। দ্রৌপদীর আহ্বানে সখা শ্রীকৃষ্ণ ছুটে এলেন। অসময়ে দুর্বাসার আগমনের কথা শুনে কৃষ্ণ বললেন, “যাজ্ঞসেনী, আমি বড়ো ক্ষুধার্ত। আমাকে তাড়াতাড়ি কিছু খেতে দাও।”
দ্রৌপদী বললেন, “আমার কাছে যে কোনও খাবারই নেই!”
কৃষ্ণ বললেন, “তোমার সেই সূর্যের দেওয়া থালাটা নিয়ে এসো।”
দ্রৌপদী থালা আনলে কৃষ্ণ দেখলেন দুয়েকটি ভাত এবং শাকের দানা তাতে লেগে আছে। শ্রীকৃষ্ণ তাই খেয়ে জল খেলেন। কৃষ্ণের কৃপায় সমস্ত জীবের পেট ভরে উঠল। দুর্বাসা এবং তাঁর শিষ্যরা স্নান করে জলে আচমন করতে করতে দেখলেন তাঁদের পেট ভয়ানক ভারী লাগছে। আবার যুধিষ্ঠিরের কাছে অন্ন খেতে হবে এই ভয়ে তাঁরা তাড়াতাড়ি স্নান সেরে কাউকে কিছু না বলেই সেখান থেকে চলে গেলেন।
সহদেব নদীর ঘাট থেকে তাঁদের ডাকতে এসে দেখলেন নদীর ঘাটে কেউ নেই। রাত পর্যন্ত সেদিন আর কেউ ফিরে এল না। কৃষ্ণের কৃপায় পাণ্ডবরা সে-যাত্রায় মহাবিপদ থেকে রক্ষা পেল।


দশ


একদিন এক মহাবিপদ ঘটে গেল। সেদিন পাণ্ডবেরা সকলে মৃগয়া করতে গেছেন। কুটিরে কেবল দ্রৌপদী, ধৌম্য এবং দ্রৌপদীর অনুচর এক দাসীকন্যা আছে। এমন সময় সেখানে সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ এসে উপস্থিত হলেন। জয়দ্রথ হলেন কৌরবদের এক বোন দুঃশলার স্বামী। তিনি বিয়ে করতে শাল্বরাজ্যে যাচ্ছিলেন, পথে কাম্যক বন পড়েছে। দূর থেকে দ্রৌপদীকে দেখতে পেলেন জয়দ্রথ। দ্রৌপদীকে তাঁর পছন্দ হল। তিনি ঠিক করলেন, দ্রৌপদীকেই নিয়ে তাঁর রাজ্যে ফিরবেন, আর বিয়ে করতে অন্যত্র যাবেন না। এই ভেবে তিনি ও তাঁর অনুচর কোটিকাস্য দ্রৌপদীর কুটিরে এলেন। দ্রৌপদী তাঁদের পা ধোবার জল এবং নানারকম জলখাবার সাজিয়ে দিলেন। জয়দ্রথ সেগুলি গ্রহণ না করে দ্রৌপদীকে তাঁর রথে তুলে জোর করে রথ চালিয়ে দিলেন। দ্রৌপদী ভয়ানক রেগে বলতে লাগলেন, “ওরে দূরাচারী! এক্ষুণি ভীম আর অর্জুন এসে তোকে যমের বাড়ি পাঠাবে।”
দ্রৌপদীর কথা না শুনে জয়দ্রথ রথ চালাতে লাগলেন। এদিকে পাণ্ডবেরা ফিরে এসে সব শুনে ছুটলেন জয়দ্রথকে ধরতে। ভীম রথের পেছনে ধাওয়া করে জয়দ্রথের অনুচর কোটিকাস্যকে হত্যা করলেন। জয়দ্রথের সেনারা অর্জুনের বাণে দলে দলে মারা পড়তে লাগল। তা দেখে জয়দ্রথ দ্রৌপদীকে রথ থেকে নামিয়ে দিলেন। যুধিষ্ঠির তাঁকে রথে তুলে নিলেন। তারপর দ্রৌপদীকে ও নকুল-সহদেব সহ তিনি নিজেদের বাসস্থানে ফিরে গেলেন। যাবার আগে বলে গেলেন, জয়দ্রথ কৌরবদের জামাই, তাই দুঃশলার কথা ভেবে তাঁর প্রাণ যেন রক্ষা পায়।
পলায়নরত জয়দ্রথের রথের ঘোড়াগুলি অর্জুনের বাণে মারা পড়ল। তখন জয়দ্রথ রথ থেকে নেমে  দৌড়ে পালাতে গেলেন। ভীম তাঁকে ধাওয়া করে ধরে ফেললেন। তারপর তাঁকে মারতে মারতে অজ্ঞান করে দিলেন। অর্জুন জয়দ্রথের প্রাণ রক্ষা করতে বলায় ভীম তাঁর মাথা কামিয়ে মাথার চুলে পাঁচটি ঝুঁটি বেঁধে দিলেন। তারপর দ্রৌপদীর কাছে নিয়ে গিয়ে ক্ষমা চাইতে বললেন। অপমানিত জয়দ্রথ ক্ষমা চেয়ে সেখান থেকে কোনওরকমে পালিয়ে বাঁচলেন।


একদিন কাম্যক বনের এক আশ্রমবাসী ব্রাহ্মণ এসে পাণ্ডবদের বললেন, “আমার আশ্রমে বন থেকে রোজ একটি বিরাট শিংওয়ালা হরিণ আসছে। সেটি আমার যজ্ঞের আগুন জ্বালাবার কাঠ (অরণি ও মন্থ নামের যথাক্রমে নিচের উপরের দুটি কাঠ, এ দুটিকে পরস্পর ঘষে আগুন জ্বালানো হয়।) শিং দিয়ে ফেলে দিচ্ছে অথবা শিংয়ে জড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আপনাদের এর একটা বিহিত করতে হবে।”
পাণ্ডবরা পরেরদিন যথাসময়ে ব্রাহ্মণের আশ্রমে গিয়ে লুকিয়ে থাকলেন। তারপর দূর থেকে সেই হরিণটিকে দেখে সেটিকে তাড়া করলেন সকলে। হরিণ কিন্তু ধরতে পারা গেল না। হরিণ বনের ভেতর কোথায় যে লুকিয়ে গেল, কিছুতেই কেউ খুঁজে পেলেন না। সারাদিন বনের ভেতর ঘুরে সকলের খুব জলতেষ্টা পেল। নকুল একটি বিশাল উঁচু গাছে উঠে বললেন, “সামনেই জলাশয় আছে। আমি সারসের ডাক শুনতে পেলাম। জলজ গাছপালাও দেখতে পেলাম।”
যুধিষ্ঠির নকুলকে তূণে করে জল আনতে পাঠালেন। সকলে অপেক্ষা করতে লাগল।
নকুল কিছুদূর গিয়ে একটি পরিষ্কার জলের সরোবর দেখতে পেলেন। নকুল জল খেতে গেলেন, এমন সময় শুনলেন কে যেন আড়াল থেকে বলছেন, “এই জল আমার অধিকারে আছে। জল খাওয়ার আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।”
নকুলের ভীষণ জলতেষ্টা পেয়েছিল। তিনি উত্তর না দিয়ে জল খেলেন এবং মাটিতে পড়ে গেলেন, আর উঠলেন না। নকুলের দেরি দেখে গেলেন সহদেব। তিনিও সেই বাণী শুনলেন। কিন্তু কথা না শুনে জল খেয়ে পড়ে গেলেন। এরপর যুধিষ্ঠির ভীম এবং অর্জুনকে পাঠালেন। তারাও একইভাবে মাটিতে পড়ে গেলেন। কেউ ফিরে আসছে না দেখে সেই জনমানবহীন বনের পথ ধরে এগিয়ে গেলেন যুধিষ্ঠির। এগিয়েই তিনি সরোবর দেখতে পেলেন। সরোবরের সামনে তার ভাইয়েরা সকলে মৃতবৎ পড়ে আছে, এই দৃশ্য দেখে যুধিষ্ঠির আর্তনাদ করে কাঁদতে লাগলেন। তাঁর মনে হল, নিশ্চয়ই দুর্যোধন এবং শকুনি তাঁর ভাইদের মেরে ফেলেছে।
যুধিষ্ঠির জল খেতে সরোবরে নামতেই কে যেন উপর থেকে তাঁকে বললেন, “আমি বক। আমিই তোমার ভাইদের মেরেছি। তাদের আমি বহুবার বারণ করা সত্ত্বেও তারা আমার কথা না শুনে এই জল খেয়েছিল। এই সরোবরে আমার অধিকার। যে আমার কথা শুনবে না তাকেই আমি হত্যা করব।”
যুধিষ্ঠির বললেন, “আপনি কে?”
“আমি যক্ষ।” এই বলে বক এক ভয়ানক আকৃতির যক্ষ হয়ে দেখা দিল। যক্ষ বলল, “যুধিষ্ঠির, তুমি আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। তারপর জল খেও।”
“হে যক্ষ, আপনার অধিকারের বস্তু আমি নিতে চাই না। আপনি প্রশ্ন করুন, আমি যেমন জানি উত্তর দেব।”
প্রশ্নঃ পৃথিবীর থেকে ভারী কে?
উত্তরঃ মাতা পৃথিবীর থেকে ভারী।
প্রশ্নঃ আকাশের থেকে উঁচু কে?
উত্তরঃ পিতা আকাশের থেকে উঁচু।
প্রশ্নঃ বায়ুর থেকে দ্রুত কে? তৃণের চেয়েও বেশি কী?
উত্তরঃ মন বায়ুর চেয়ে দ্রুত। চিন্তা তৃণের চেয়ে বেশি।
প্রশ্নঃ ঘুমিয়ে কে চোখ বোজে না? জন্মেও কে নড়ে না? কার হৃদয় নেই? বেগ দ্বারা কে বৃদ্ধি পায়?
উত্তরঃ মাছ ঘুমিয়ে চোখ বোজে না। ডিম জন্মেও নড়ে না। পাষাণের হৃদয় নেই। নদী বেগ দ্বারা বৃদ্ধি পায়।
প্রশ্নঃ বার্তা কী? আশ্চর্য কী? পন্থা কী? সুখী কে? এই চার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে জল খেতে যাও।
উত্তরঃ মায়াও মোহরূপ কড়াইতে প্রাণীরা সর্বদা সেদ্ধ হচ্ছে। সূর্য তার আগুন, দিন ও রাত্রি তার জ্বালানি, মাস এবং ঋতু তার আলোড়নকারী হাতা। এই হল বার্তা।
প্রাণীরা রোজ মরছে, তবুও বাকিরা সবাই চিরজীবী হতে চায়। এর চেয়ে আশ্চর্য আর নেই।
ধর্মের তত্ত্ব নিহিত আছে গুহায়। মহান মানুষেরা যে পথে গেছেন সেটাই হল পন্থা বা পথ।
যিনি ঋণী নন, প্রবাসী নন, সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে যে শাক রান্না করে খান, তিনি হলেন সুখী।
যক্ষ বললেন, “একজন যেকোনও ভ্রাতার নাম বলো যাকে তুমি জীবিত দেখতে চাও।”
যুধিষ্ঠির নকুলের নাম বললেন। কারণ, নকুল মাদ্রীর সন্তান। তিনি কুন্তীর পুত্র। সুতরাং এতে দুই মায়ের সন্তানই জীবিত থাকবে পৃথিবীর বুকে।
এই কথায় যক্ষ খুশি হলেন। তিনি যুধিষ্ঠিরের বিচারবুদ্ধির প্রশংসা করলেন। তারপর নিজের পরিচয় দিলেন। বললেন, তিনিই হলেন ধর্ম। দেবলোক থেকে এসেছেন তাঁকে পরীক্ষা করতে। তিনিই ব্রাহ্মণের অরণি সরিয়ে দিতেন। ধর্মদেব যুধিষ্ঠিরকে বর দিতে চাইলেন। যুধিষ্ঠির বললেন, “অজ্ঞাতবাসে থাকার সময় তাদের যেন কেউ চিনতে না পারেন।”
ধর্ম বললেন, “তথাস্তু।”
এরপর সব ভাইদের প্রাণ ফিরিয়ে দিলেন ধর্ম। পাণ্ডবরা ফিরে গিয়ে ব্রাহ্মণের অরণি ফিরিয়ে দিলেন।


অবশেষে দীর্ঘ বারো বছর শেষ হল। পাণ্ডবরা কাম্যক বন ছেড়ে এবার চলে যাবেন অজ্ঞাতবাসে। তাঁদের বনবাসের সময় শেষ হয়েছে। তাঁরা সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বন থেকে বেরিয়ে নির্জন পথ ধরে এগিয়ে চললেন। প্রায় এক ক্রোশ পথ পার হয়ে একজায়গায় বসলেন। এখানে বসে তাঁরা ঠিক করবেন এরপর তাঁরা কোথায় গিয়ে থাকবেন। সব ভাইরা একসঙ্গে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, “আপনি আমাদের যা কাজ করতে বলবেন, যেমন বেশ ধারণ করতে বলবেন, আমরা তাই-ই করব। এই একবছর বড়ো কঠিন সময়। সকলে মিলে আমরা জোট বেঁধে এই কঠিন সময় পার করব।”
যুধিষ্ঠির খুশি হয়ে সবার কথায় সম্মতি জানালেন। তিনি বললেন, “অর্জুন, আমাদের কোথায় থাকা উচিত বলে তুমি মনে করো?”
অর্জুন বললেন, “কুরুদেশের চারদিকে অনেক সমৃদ্ধ রাজ্য আছে। যেমন পাঞ্চাল, চেদি, মৎস্য, সুরাষ্ট্র, অবন্তী, শূরসেন, মল্ল ইত্যাদি। এদের মধ্যে আপনার কোন রাজ্যে বাস করা ঠিক মনে হচ্ছে?”
যুধিষ্ঠির বললেন, “মৎস্যদেশের রাজা বিরাট শুনেছি মহানুভব এবং অতিথিবৎসল। ভাবছি এই একটি বছর তাঁর কর্মচারী হয়ে সকলে সেখানেই থাকব। পথে যেতে যেতে আমরা কে কী কাজ করব তা ঠিক করে নেব।”
পাণ্ডবেরা এবার প্রত্যেকে ছদ্মবেশ ধারণ করলেন। এমন নিখুঁত তাঁদের সেই ছদ্মবেশ যে পরিচিত কেউই আর তাঁদের দেখলেও চিনতে পারবে না। তাঁরা এখন সবাই ব্যাধের ছদ্মবেশ ধারণ করেছেন। বিরাট রাজ্যে পৌঁছানো না পর্যন্ত তাঁরা এই ছদ্মবেশেই থাকবেন। তারপর সূর্যের দিকে পিঠ রেখে তাঁরা বন ছাড়িয়ে নগরের দিকে এগিয়ে চললেন।


_____