বইকথাঃ ইতি রুদ্রট - রুমেলা দাস


ইতি রুদ্রট

লেখকবৃন্দঃ
শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়, কৃষ্ণেন্দু দেব, কিশোর ঘোষাল, পুষ্পেন মণ্ডল
রাজীবকুমার সাহা, সুদীপ চ্যাটার্জী ও দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

আলোচকঃ রুমেলা দাস
প্রকাশকঃ জয়ঢাক প্রকাশন
বাঁধাইঃ পেপার ব্যাক
পৃষ্ঠাসংখ্যাঃ ১৭৪
মূল্যঃ ২৫০ টাকা (ভারতীয় মুদ্রা)
প্রচ্ছদঃ জয়ঢাক গ্রাফিক্স
অলঙ্করণঃ শিমুল সরকার


খ্রিস্টপূর্ব চার হাজার শতাব্দী, দ্বাদশ শতাব্দী, ১৯৮৪ কলকাতা, ২০১৪ সতুরি গ্রাম গাড়োয়াল হিমালয়, ২০১৫ কলকাতা - সাত কলমের সুতো ঘোরাফেরা করেছে এই সময়সীমার পরতে পরতে। অতীত থেকে বর্তমান, বর্তমান থেকে পিছন ফিরে তাকানো টাইম-মেশিনে চলাফেরা খুবই সহজাত। পুরাণের আদ্যোপান্ত গন্ধ মেখে আমি, আমরা বাঁচি। শুধু কথার কথা নয়। ইতিহাস ঘিরেই পুরাণ আকর হয়ে উঠেছে। ফিকশনের স্তরে দানা বেঁধেছে রহস্য। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘন হয়ে আসা জমাট কালো মেঘ দুর্নিবার রুদ্ধশ্বাস এনেছে ঘটনার ঘনঘটায়। ছবির মতো ভেসে ওঠে। ক্লান্তির জায়গা নেই।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পড়তে গিয়ে দেখেছি, ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’ লক্ষ্মণসেনের সময়ে (আনুমানিক ১১৭৮ - ১২০৬ খ্রিস্টাব্দ) রচিত সংস্কৃত গ্রন্থ। কিন্তু সাল, তারিখের আড়ালেও থাকে অন্য এক আড়াল। ইতিহাস প্রতিনিয়তই তৈরি করে ভিন্ন মত, সমালোচনা। জোরের সাথে সেসব কেউ মানে, কেউ বা বিপক্ষে যায়। সাধারণ পাঠক হয়ে তবুও জানা যায়, এসব প্রাচীন পুঁথিতেই আছে ‘ঋতু প্রবাহ’, ‘অপদেশ প্রবাহ’, ‘উচ্চবাচ প্রবাহ’, ‘অমর প্রবাহ’, ‘শৃঙ্গার প্রবাহ’-এর ধাপ। আছে ভৌগোলিক বিশেষত্ব, সমুদ্র, নদ-নদী, সিংহ-হাতি, কোকিল, শুকের কথা। মনস্বী, দরিদ্র, জরা, বৃদ্ধ বাদ নেই। হয়তো এর কিছুটা সত্যি। বাকিটা আড়াল। আর সেই অবাক করা আশ্চর্য আড়ালের আড়ালে কী অদ্ভুত এক উন্মোচন সম্ভব হয়েছে! মুগ্ধ হতে হয়। এটাই ম্যাজিক। এটাই ফ্যান্টাসির আদিকথা। যেখানে মিথ হাত ধরেছে বিংশ শতাব্দী পেরিয়ে আমাদের পাশাপাশি চরিত্রের। পরিতোষবাবু, কাশীবাবু এসেছেন। এসেছেন দিবাকর, সুবল ভট্টাচার্য্য, অবিন সেনের মতো চরিত্রেরা। তাদেরই জড়িয়ে জাপটে উন্মাদ হয়েছে প্রকৃতি। কখনও আকাশছোঁয়া পাহাড়দের পাথুরে শরীরী ভাষায় আর্তনাদের রূপ নেয় অতিকায় দল। বোঝায় তাদের প্রাণ-শরীর। সেই প্রাণ-শক্তির অন্তর্নিহিত আয়ু গ্রন্থন আছে পুঁথির পাতায়।
কিন্তু এই আকস্মিকতার ভিত কোথায়? কোথায় এর সীমা? সত্যিই কি সৃষ্টির আদি কিংবা সমাপ্তি কোনও বিজ্ঞান দিতে পারে! পুরুষ, প্রকৃতিকে জানতে একজীবনও ক্ষুদ্র। বারে বারে জন্ম নেয় লোভ, লালসা। অনাকাঙ্খিতকে কাঙ্খিত করতে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে সবল শক্তি। তখনই রুদ্ররূপ দেখা দেয় প্রকৃতির।
আজ আমাদের হাতে সময় খুব কম। তবে এধরনের উপন্যাসের পাতায় মন বসে এক নয়, একাধিকবার। প্রশ্ন জাগে বারবার। কে ওই দ্বারপাল? সমগ্র ঈশ্বরভূমিতে সত্যিই কি কেউ আজও প্রতীক্ষায়? সত্যিই কি কারুর অজেয় কাহিনি নীরবে তুষারাবৃত পাহাড়ে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়? জিহুগাপতি, বার্তুকল্য কীভাবে ভারতভূমির প্রান্তরে উন্মুক্ত ইতিহাস লিখে যাচ্ছে? কীভাবে বিদেশ থেকে সূক্ষ্ম আকর্ষণ আকর্ষিত করছে কোনও শরীর!
ভালোলাগা, জানতে পারার অবয়বটুকু দাঁড় করাতে পারি। কিন্তু সমালোচনা! তা হয়তো আমার মতো সামান্য পাঠকের পক্ষে সম্ভব নয়। তবুও যাঁরা নিরন্তর চেষ্টা করেছেন আগামী সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রাখার, সাহিত্যের ছাত্রী হয়ে সাহিত্যকে ভালোবেসে সেই লেখকদের প্রণাম ছাড়া আর কীই বা করতে পারি! জোরের সাথে একথাও বলতে পারি, এমন অনেক উপন্যাস উঠে আসুক মিথ, ভারতের আনাচ কানাচ থেকে যা হীরকের মতো অম্লান থাকবে আগামীতেও।
সাত লেখকের সাতবাঁধন, এক বাঁধনে গ্রথিত করার এমন প্রয়াস চিরন্তন হোক।
_____

No comments:

Post a Comment