গল্পঃ তিতলির ডানা - বিশ্বরাজ ভট্টাচার্য



সকাল থেকেই আজ তিতলির ভীষণ জ্বর। স্কুলে যাওয়া হল না। তার ওপর জরুরি কাজে বাবাও বাইরে। দিম্মার শরীর ভালো না। ছোটো মামা ফোন করল। মাকে জলদি যেতে বলেছে।  সব মিলিয়ে তিতলির মন আজ সকাল থেকেই বড্ড খারাপ। মাকে দুয়েকবার বলেছে দিম্মাকে দেখতে যাবে। কিন্তু জ্বরের জন্য মা রাজী হননি। বললেন, শিগগিরই বাড়ি ফিরে আসবেন। মা  রাণুদিদিকে বলে দিয়েছেন তিতলির দিকে খেয়াল রাখতে। ওষুধ খেয়ে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লেও যেন ওকে বাইরে বেরোতে না দেয়। থার্মোমিটার রাখা আছে। জ্বর দেখে যেন খাতায় নোট করে রাখে।
সবকথাই একরাশ বিরক্তি নিয়ে শুনছিল তিতলি। অন্য সময় হলে সে চেঁচিয়ে উঠত। কিন্তু আজ জ্বরে সে কাবু। অগত্যা বিছানায় শুয়ে পড়ল। মা ওর কপালে আদর করে বেরিয়ে গেলেন। তার আগে বাবার সঙ্গে ভিডিও কলে কথাও হল। কিন্তু তাহলে কী হবে, মনের আকাশ তো সেই  মেঘলাই আছে।
ক্লাস সিক্সে পড়া তিতলি এমনিতে খুব মিশুকে। তবে একবার মন খারাপ হলে সেরেছে। তা সহজে ঠিক হয় না। রাণুদি তা ভালো করেই জানেন। তাই এমন সময় তিতলিকে তিনি বেশি ঘাঁটান না। আজও তাই করলেন। “তিতলি মা, তুমি এখন একটু শুয়ে পড়ো গিয়ে। আমি পাশের  ঘরে আছি। ওষুধ খেয়েছ তো?”
অভিমান মাখা চোখে রাণুদিকে দেখে গটগট করে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল তিতলি। রাণুদি মুচকি হেসে পাশের ঘরে চলে গেলেন।
তিতলিরা যে ফ্ল্যাটে থাকে তার ব্যালকনি থেকে আকাশ দেখা যায়। ফ্ল্যাট বাড়িটির উলটোদিকে এখনও কোনও কংক্রিটের ইমারত গড়ে না ওঠায় আকাশটাকে খুব কাছে মনে হয় ওর। ক’দিন পরই পুজো। চারপাশেই কেমন যেন একটা খুশি খুশি গন্ধ। কিন্তু জ্বর, দিম্মার অসুখ, বাবার ট্যুর, মায়ের ওপর অভিমান - সব মিলিয়ে তিতলির চোখে বৃষ্টি নামল। আর কালো হল মনের আকাশ।
“ওমা, তুমি কাঁদছ কেন গো?”
চমকে উঠল তিতলি। কার গলা? বাড়িতে এখন রাণুদি আর ও ছাড়া তো কেউ নেই। মনের ভুলই হবে। টিভিতে এখন নিশ্চয়ই ছোটা ভীম চলছে। স্কুলে না গেলে এই সময় সে কার্টুন দেখে। কিন্তু আজ বিন্দুমাত্র ইচ্ছে করছে না।
“আজকে কার্টুন দেখবে না?”
আবার সেই গলা। মিষ্টি একটা রিনরিনে গলা। ঘরের চারপাশে চোখ বোলাল তিতলি। না, কেউ চোখে পড়ল না।
“কী, দেখতে পাচ্ছ না? এই তো আমি ব্যালকনিতে।”
ওমা! একটা ছোট্ট নীল পাখি। ঠিক যেন হামিং বার্ড। কিন্তু এমন পাখি তিতলি আগে দেখেনি কখনও। পাখির চোখদুটো নজরকাড়া। যেন খুব যত্ন করে আঁকা। ঠিক কতক্ষণ তিতলি পাখিটার দিকে তাকিয়ে ছিল বলতে পারবে না।
পাখির ডাকেই সম্বিৎ ফিরল। উড়ে কখন তিতলির খাটের ওপর বসেছে সে টের পায়নি। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পাখিটাকে দেখল তিতলি।
“ভাবছ কী করে পাখি কথা বলছে! দিদিভাই, আমি কথা বলা পাখি। আমাকে কথা বলা শেখাতে হয় না।”
“এখানে কেন এলে? আগে তো তোমাকে দেখিনি কখনও!”
“কী করে দেখবে! আমি তো এখানে থাকি না। যাচ্ছিলাম তোমার বাড়ির পাশ দিয়ে, দেখি তুমি মন খারাপ করে বসে আছ। তাই টুক করে ঢুকে পড়লাম। তোমার জ্বর তো এখন নেই। আর দিম্মা তোমার এখন ভালো আছে গো।”
“তুমি কী করে জানলে আমার জ্বর আর দিম্মা অসুস্থ!”
“হি হি, আমি সব জানি। তোমার বাবা অফিসের কাজে বাইরে। দিম্মাকে দেখতে চাইলে, কিন্তু জ্বরের জন্য যেতে পারলে না।”
তিতলি এবারে কেঁদে ফেলল। সত্যি তার মন খারাপ ছিল। কাকে বলবে একথা। ওর বন্ধু বলতেও তেমন কেউ নেই। এই মুহূর্তে পাখিটাকেই খুব কাছের মনে হল।
“কাঁদছ কেন, দিদিভাই? এভাবে কেউ কাঁদে! আমি তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি।”
“আমার জন্য!”
“হ্যাঁ, দিদিভাই। তবে তোমাকে একটা কথা দিতে হবে।”
“কী?”
“তোমরা মানুষেরা তো আমাদের থাকার জায়গা মানে গাছপালাগুলো কেটে ফেলছ।  আকাশছোঁয়া বাড়ি বানাচ্ছ। আর আমাদের তো থাকার জায়গা নেই। মোবাইল টাওয়ারের বিকিরণে প্রাণ হারাচ্ছি। তাই কথা দাও, আমাদেরও বাঁচতে দেবে।”
এই টুকুনি পাখির মুখে এই কথাগুলো শুনে খুব অবাক হল তিতলি। “তুমি সত্যি বলেছ। কথা দিলাম, তোমাদের যাতে কোনও কষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখব। আচ্ছা, আমায় কী দেবে বলছিলে?”
“দিদিভাই, তোমার আকাশে উড়তে ইচ্ছে করে?”
“তা আর বলতে! ধুস, আমি কেমন করে উড়ব? আমার কি ডানা আছে?”
“না, ডানা তো নেই। কিন্তু আমি যদি দিই, তাহলে?”
“আমি তো মানুষ। তোমার মতো ডানা কোত্থেকে হবে আমার?”
“এত ভেব না, দিদিভাই।” একথা বলেই পাখিটা এসে তিতলির একেবারে কাছ ঘেঁষে বসল। “আমার ডানায় হাত রাখো।”
ডানায় হাত রাখতেই তিতলির পিঠটা হালকা ভারী মনে হল। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায়  দেখল তার পিঠে একটা নীল ডানা গজিয়েছে।
“দেখলে দিদিভাই, তোমারও আমার মতো ডানা হয়ে গেছে। চলো, এবার আকাশে ভেসে যাই।”
“সে কি! আকাশে কীভাবে উড়ব! আমি তো উড়তে পারি না।”
“কিচ্ছু হবে না। আমি তোমার হাতে এসে বসব। আর তারপরই উড়ে যাব নীল নীল আকাশে।”
তিতলির ভয় ভয় করছিল। ভয় তো করবেই। আকাশে উড়বে বলে কথা। সেবার যখন ছোটকাদের ওখানে বাবা নিয়ে গিয়েছিল, তখন তিতিলি বিমান থেকে মাটি দেখেছিল। দারুণ লাগে দেখতে। তাহলে আজও কি এমন কিছুই সে দেখবে?
ছোট্ট পাখিটার মুখে দুষ্টুমি লেগে আছে। তিতলির বুক অজানা ভয়ে ধুকপুক করছে। পাখিটাকে হাতে নিয়ে আকাশে গা ভাসাতেই তিতলির মনে হল সে কেমন যেন হালকা হয়ে গেছে। রাস্তাঘাট, বাজার, খেলার মাঠ - এসব কেমন যেন অচেনা লাগছে। নিজের স্কুলটা দেখে তো তিতলি খুশিতে নেচে উঠল।
কিন্তু আচমকা তিতলি দেখল এক জায়গায় একটা জটলা। তিতলি আর পাখি, দু’জনেই উঁকি দিয়ে দেখল, একটা বক ডানা ভেঙে পড়েছে। তাকে ঘিরেই মানুষের জটলা। কয়েকজন বকটাকে কিনবে বলে দরাদরি করছে। একজন সুন্দর বকটাকে কিনে নিল। যন্ত্রণায় পাখিটা কাতরাচ্ছে। মন খারাপ হয়ে গেল তিতলির। ছোট্ট পাখিটার চোখে জল।
“দেখলে দিদিভাই, মানুষ কেমন করে আমাদের কষ্ট দেয়?” কথাটা বলেই নীল পাখিটা কোথায় উড়ে চলে গেল। আর খুঁজে পাওয়া গেল না।
ঘাবড়ে গেল তিতলি। এত্ত বড়ো আকাশে সে পুরো একা। এদিকে নিচে থেকে কয়েকজন মানুষ তাকে দেখে ঢিল ছুড়তে শুরু করেছে। তিতলি চিৎকার করে বলল, “আমায় মেরো না, আমি মানুষ।”
কিন্তু কেউ কথাই শুনছে না। একটা বড়ো পাথর এসে তিতলির ডানায় লাগল। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল সে। ডানা ভেঙে যাওয়ায় নিচে পড়তে লাগল তিতলি। শুনল, কারা যেন উল্লাসে ফেটে পড়েছে।
“তিতলি, তিতলি!” মায়ের ডাকে ঘুম ভেঙে গেল ওর। লাফ দিয়ে উঠে বসল তিতলি। সে দরদর করে ঘামছে।
“রাণুদি, থার্মোমিটারটা দাও, তিতলির জ্বরটা দেখব। কী ঘামছে! মনে হয় জ্বরটা ছাড়ল।” মা কথাটা বলে রান্নাঘরের দিকে গেল।
তিতলি বুঝল, সে এতক্ষণ ঘুমোচ্ছিল। কিন্তু বালিশের পাশে যে দুটো ছোট্ট নীল রঙের পাখির পালক পড়ে আছে!

_____

5 comments:

  1. নীল পালক বেঁচে থাকুক নতুন প্রজন্মের স্বপ্নে...ভালো থাকুক তিতলিরা...

    ReplyDelete
  2. অসাধারণ। একশ্বাসে পড়েই নিলাম ভাত খেতে খেতে।

    ReplyDelete
  3. দারুণ লিখছিস

    ReplyDelete