গল্পঃ মৃত্যুর ডাক - সমীরণ দাস



ফটিকদা গম্ভীর মুখে বললেন, সে এক রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা, বুঝলি? আজও মনে পড়লে গা-হাত ঠাণ্ডা হয়ে যায়। শোন তবে, পুরো ঘটনাটা গোড়া থেকে বলি।
বছর উনিশ-কুড়ি আগেকার কথা। একদিন বাড়িতে বসে আছি, হঠাৎ পিয়ন এসে একটি চিঠি দিয়ে গেল। চিঠি খুলে দেখি নিলয়ের চিঠি। নিলয় আমার কলেজ লাইফের বন্ধু। বহুদিন তার সঙ্গে যোগাযোগ নেই। তবে এটুকু শুনেছিলাম যে সে একটি স্টেশন মাস্টারের কাজ পেয়েছে। আর তার পোস্টিংও হয়েছে বেশ দূরে। তাই হঠাৎ তার চিঠি পেয়ে বেশ ঘাবড়েই গেলাম। চিঠিতে যা লেখা আছে তা হল এই,
প্রিয় ফটিকচন্দ্র,
অনেকদিন হল তোমার খবর পায় নাই। তুমি কেমন আছ? আশা করি ভালো আছ। যার জন্য তোমাকে চিঠি লেখা, আমি জানি তুমি খুব ভ্রমণপিপাসু। তাই বলছি একদিন সময় করে এখানে ঘুরে যাও। জায়গাটা খুব মনোরম। দু’দিন থাকলে তোমার শরীর-স্বাস্থ্য ফিরে যাবে। চিঠির নিচে ঠিকানাটি লিখলাম। বেশি দূরে নয়। তাড়াতাড়ি চলে এসো।
ইতি
তোমার প্রিয় বন্ধু
নিলয়
বাড়িতে ক’দিন বসেই ছিলাম। তাই ভ্রমণের নিমন্ত্রণ পেতেই মনটা কেমন বাচ্চা ছেলের মতো আনন্দে নেচে উঠল। আর সত্যিই যদি ওই জায়গায় গিয়ে শরীর-স্বাস্থ্যটা ফেরে তাহলে তো আর কথাই নেই। তাই আর দেরি না করে তার পরদিনই বিকেলের ট্রেনে রওনা দিলাম। ট্রেনে তিন ঘন্টার পথ।
ট্রেন থেকে স্টেশনে নামতেই নিলয়কে নজরে পড়ল। নিলয় স্টেশনে দাঁড়িয়ে একটি লোককে কী যেন বলছে। আমি নিলয়ের কাছে এগিয়ে গেলাম। মৃদু কন্ঠে বললাম, “এই যে নিলয়, চিনতে পারছিস?”
নিলয় আমার দিকে ফিরে এক মুখ হেসে বললে, “তা আবার পারব না? তোর কথাই ভাবছিলাম যে। যাই হোক, বন্ধুর কথা রেখেছিস তাহলে। শোন, এ-জায়গা খুব মনোরম। এখানকার জল-হাওয়া খুব ভালো। ক’দিন এখানে থাক, তাহলে বুঝতে পারবি।”
নিলয়ের সাথে কথা শেষ করে আমি ঝটপট স্টেশনের চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিলাম। এ তো পাণ্ডব-বর্জিত জায়গায় স্টেশন! যতদূর চোখ যায় শুধু ধু ধু করছে ফাঁকা মাঠ আর মাঝে মাঝে বনবাদাড়, ঝোপঝাড়ের জঙ্গল। স্টেশনের কিছুটা দূরে পর্বতের মতো উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রেলের কোয়ার্টার। আর তাকে ঘিরে রয়েছে বাঁশ ও মেহগনিগাছ। তবে আশেপাশে কোনও জনবসতি দেখা গেল না। জায়গাটা বড়োই নির্জন। কেমন একটা থমথমে ভাব বিরাজ করছে যেন স্টেশনের চারপাশে। আকাশে সবে কালো কালো ছোপ ধরতে শুরু করেছে। এবার বুঝি ঝপ করে সন্ধে নেমে যাবে পৃথিবীর বুকে। শরতের সময় এসব অঞ্চলে এমনটাই হয়।
নিলয় আমাকে স্টেশন ঘরে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে দেখি একটি মাঝ-বয়স্ক, ছিপছিপে গড়নের লোক মেঝের কোণে গুঁড়ি মেরে পড়ে আছে। নিলয় কর্কশ গলায় বলল, “ঘেচুয়া, বাবুর জন্য চা বানাও জলদি।”
ঘেচুয়া, “জি, আজ্ঞে স্যার।” বলে মেঝে থেকে উঠে স্টোভ ধরাতে শুরু করল।
চা বানানো হলে পর চা-টা খেয়ে শরীরের ক্লান্তি অনেকটা দূর হয়ে গেল। নিলয়কে বললাম, “আচ্ছা, এই স্টেশনে আমি ছাড়া কাউকে তো নামতে দেখলাম না! তাছাড়া আশেপাশে কোনও জনবসতিও দেখলাম না। ব্যাপার কী?”
এর উত্তর ঘেচুয়া দিল। বলল, “বাবু, বিকেলের পর এই স্টেশনে আর কেউ নামে না। জনবসতি আছে, তবে সেটা স্টেশন থেকে বেশ কিছুটা দূরে। সূর্য পশ্চিম পাড়ে ঢলে পড়লে এদিকে আর কেউ আসার সাহস দেখায় না, বাবু। আপনি ক’দিন এখানে থাকুন, তাহলেই সব বুঝতে পারবেন।”
নিলয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি বেশ অবাক হলাম। দেখলাম তার চোখে মুখেও ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। বললাম, “ব্যাপারটা কী বল তো।”
নিলয় বলল, “এখানকার লোকের মুখে প্রচলিত আছে যে ওই রেলের কোয়ার্টারে নাকি অশরীরী থাকে।”
আমি হো হো করে হেসে উঠলাম। “তুই বলছিস এসব কথা! এসব তুই কবে থেকে মানতে শুরু করলি!”
বাইরের আকাশ এতক্ষণে কালো হয়ে গেছে। স্টেশন ঘরে টিম টিম করছে আলো। এমন সময় হঠাৎ দূর থেকে ভেসে এল একটি বীভৎস রকমের মেয়েলি কান্নার কন্ঠ যা আমাকে ক্ষণিকের জন্য স্তম্ভিত করে দিল। মনে হল যেন কোনও পৈশাচিক কান্না বারবার বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে এইদিকে ফিরে আসছে। ইতিমধ্যে আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। নিলয়কে জিজ্ঞাসা করলাম, “ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ঐরকম কে কাঁদছে?”
আমি প্রশ্ন করাতে ঘেচুয়া ফ্যাচ করে একটা বিশ্রীরকম হাসি হাসল। বলল, “বাবু, ডর পেলেন নাকি? তবে ডর পাবার কিছু নাই। ওটা মণি পাগলি। ও সন্ধ্যা হলে কোয়াটারের চারপাশে ঘুরে বেড়ায় আর ওইরকম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে।”
মনে মনে ভাবলাম এই সমস্ত নির্জন, থমথমে পরিবেশে সাধারণ ঘটনাগুলোও কেমন অলৌকিক বলে মনে হয় যেন নিজের কাছে। নিলয়কে বললাম, “তুই পাণ্ডব-বর্জিত এই স্টেশনে একা একা থাকিস কী করে? তোর বিরক্ত লাগে না?”
নিলয় একটু হেসে বলল, “প্রথম প্রথম একদম মন বসত না এখানে। তখন শহর থেকে বই এনে পড়তাম। তবে এখন আর এখান ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করে না। তাছাড়া ঘেচুয়া আছে, আমার দেখভাল করে। আমি দিব্যি আছি।”
রাতে নিলয় আমাকে শুতে বলেছিল স্টেশন ঘরে। কিন্তু ওই ছোট্ট স্টেশন ঘরে তিনজন গাদাগাদি করে আমার দ্বারা রাত্রিযাপন করা সম্ভব নয়। তাই নিলয়ের হাজারো আপত্তি সত্ত্বেও আমি রাত কাটাব ঠিক করেছিলাম কোয়ার্টারে।
বিকেলে নিলয় যে লোকটির সাথে স্টেশনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল, সেই লোকটি নিলয়কে রাতের খাবার দিতে এসেছিল। সেই খাবার ন’টার মধ্যে সাবাড় করে আমি হাতে একটি টর্চ ও জলের বোতল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম কোয়ার্টারের উদ্দেশ্যে।
ঘেচুয়া ও নিলয় বহু চেষ্টা করেও যখন দেখল আমি কোনও কথা শুনব না তখন হাল ছেড়ে দিয়েছিল। আমরা তিনজনে সাতটার মধ্যে কোয়ার্টারের রুমে গিয়ে সেটা ভালোভাবে পরিষ্কার করে এসেছিলাম।
আকাশে পূর্ণিমার গোল চাঁদ। আর তারই ঝকঝকে আলোয় রাস্তাটি পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। মাটির রাস্তাটি এঁকেবেঁকে কোয়ার্টারের দিকে চলে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন একটা ময়াল সাপ রাতের বেলা খাবারের সন্ধানে বেরিয়েছে। দু’পাশে বাঁশ ও মেহগনির বন থেকে ভেসে আসছে একটানা ঝিঁঝিঁর শব্দ। আর মাঝেমধ্যে দূরের মাঠ থেকে ভেসে আসছে শেয়ালের ডাক। আমার বুকটা কেমন একটা অজানা আতঙ্কে ছমছম করে উঠল। আমার বার বার মনে হতে লাগল, এই রাতের অন্ধকারে নিঃশব্দে কেউ যেন আমাকে অনুসরণ করছে। তার গরম নিঃশ্বাস আমার ঘাড়ে পড়ছে। আমি স্পষ্ট অনুভব করলাম। যেন একটা ছায়ামূর্তি আমার পিছু নিয়েছে। যাকে সবসময় দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়। মনে পড়ল নিলয়ের কথা। এখানকার মানুষের মধ্যে প্রচলিত কথা। এই কোয়ার্টারে অশরীরী থাকে।
আর ঠিক সেই সময় কোয়ার্টারের দিক থেকে ভেসে এল নারী কন্ঠে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ। যা সেকেন্ডের মধ্যে আমার দেহের সমস্ত রক্ত যেন জল করে দিল।
নিজের মনকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করলাম। এই সময় ভয় পাওয়া মানে নিজের ক্ষতি নিজে ডেকে আনা। কিন্তু এই নির্জন স্থানে নিশুতি রাতে কেন যেন নিজের হাঁটার শব্দেই বুকটা বারবার কেঁপে উঠছিল। যত কোয়ার্টারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি তত মেয়েলি কন্ঠে কান্নাটা স্পষ্ট হয়ে আসছে। মন বলছে একা একা এখানে শুতে না এলেই বোধহয় ভালো হত। এ বিভীষিকাময় পরিবেশ যেন আমার বোধবুদ্ধি সব ধীরে ধীরে লোপ পাইয়ে দিচ্ছে। সামনেই মৃত্যু  হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাকে। এ যে সাক্ষাৎ যমপুরী।
অনেক কথা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে এমন সময় হঠাৎ মাথার উপর দিয়ে তীক্ষ্ণ, কর্কশ  ডাক ছেড়ে একটি প্যাঁচা উড়ে গেল। আর আমিও এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌড় দিলাম কোয়ার্টারের দিকে। এবড়োখেবড়ো মাটির রাস্তা ভেঙে দৌড়াচ্ছি। পা ক্রমশ অবশ হয়ে আসছে, কিন্তু দৌড়ানোর গতি হ্রাস করার উপায় নেই। মৃত্যু যেন আমাকে স্বয়ং তাড়া করেছে।
বেশ কিছুটা দৌড়ানোর পর কোয়ার্টারের দরজার সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। তারপর দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলাম। উঠোন পেরিয়ে একটি ঘরের মধ্যে ঢুকলাম। তারপর সেটারও দরজা ভালো করে বন্ধ করে দিলাম। ঘরের ভেতর টিমটিম করছে কেরোসিনের আলো।
আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না। খাটের উপর বসে পড়লাম। বোতলের ছিপি খুলে বেশ কিছুটা জল খেলাম। তার ফলে শরীর ও মন দুই অনেকটা হালকা হল।
এমন সময় আবার কোয়ার্টারের বাইরে সেই মেয়েলি কন্ঠ শুনতে পেলাম। তবে এবার সেটা কান্না নয়। এবার যেন সে খিল খিল করে হাসছে।
এবার সে এমন করে হাসছে কেন? তবে কি হাতের কাছে শিকার পেয়েছে বলে তার অমন হাসি! মনটা আবার আতঙ্কে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। পঞ্চ ইন্দ্রিয় যেন আরও বেশি সজাগ হয়ে উঠল। আবার আমি মনকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, যে ওটা নিছকই আমার কল্পনা। ঘেচুয়া তো বলেছিল, রাত্রে কোয়ার্টারের চারপাশে মণি পাগলি ঘুরে বেড়ায়। তবে পাগলি কখন হাসবে কখন কাঁদবে সে কি কেউ বলতে পারে? এখন আমার কাজ হচ্ছে ওসব ভৌতিক কথাবার্তা চিন্তা না করা। যত ওসব উলটোপালটা কথা চিন্তা করব তত মনের মধ্যে আতঙ্ক বাসা বাঁধবে। তার থেকে রাত অনেক হল, এবার ঘুমিয়ে পড়ি।
চোখটা বুজে শুলাম বটে, কিন্তু ঘুম এল না। থেকে থেকে কোয়ার্টারের বাইরে থেকে আসা মণি পাগলির খিল খিল করে হাসি আর দূর থেকে ভেসে আসা শেয়ালের ডাক যেন আমাকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলল।
বেশ কিছুক্ষণ পর চোখটা খুলেছি, এমন সময় আধো আলো আধো অন্ধকার ঘরটার মধ্যে মনে হল কেউ যেন সাদা কাপড় পরে এক গলা ঘোমটা দিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ধড়মড়িয়ে খাটের উপর উঠে বসলাম। তারপর ভালো করে ঘরের চারপাশটায় তাকালাম। কই, কোথাও তো কেউ নেই। বুঝলাম ওটা মনের ভুল। কোনও জিনিসকে নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করলে ঘুমের মধ্যে তার প্রতিচ্ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমার ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। আবার শুয়ে চোখ বন্ধ করলাম। বেশ কিছুক্ষণ ভালোই কাটল, তারপর হঠাৎ আমি স্পষ্ট অনুভব করলাম আমার শরীরের উপর কার যেন গরম নিঃশ্বাস পড়ছে। আবার ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম, কিন্তু এবার আর স্বপ্ন নয়, চোখের সামনে স্পষ্ট দেখলাম একটা ছায়ামূর্তি সাদা কাপড় পরে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর হঠাৎ মূর্তিটা খিল খিল করে হাসতে শুরু করল। সে এক পৈশাচিক হাসি। শুনলে দম বন্ধ হয়ে আসে। সারা শরীর যেন অবশ হয়ে যায়। তাও যতটা পারা যায় মনে সাহস এনে আমতা আমতা করে বললাম, “কে তুমি?”
ছায়ামূর্তিটা কোনও উত্তর দিল না। কেবল তার পৈশাচিক হাসিটা বন্ধ করে মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল। সে দৃশ্য লিখে বর্ণনা করা মুশকিল। ঐরকম বীভৎস এবং সাংঘাতিক একজোড়া নীল চোখ আমি জীবনে কোনওদিন ভুলতে পারব না। ওই গাঢ় নীল চোখ ক্রমে আমাকে যেন সম্মোহিত করে ফেলল। আমি আমার নিজস্ব বোধবুদ্ধি, স্থান-কাল, সময় সবকিছু হারিয়ে ফেললাম। চিৎকার করতে গেলাম, কিন্তু মুখ দিয়ে গোঙানি ছাড়া আর কিছুই বেরলো না। আবার ওই ছায়ামূর্তিটি পৈশাচিক হাসি হেসে উঠল। তবে এই হাসিটা আগের হাসির থেকেও আরও অনেক বেশি তীক্ষ্ম এবং বিদ্বেষ মেশানো। তারপর ছায়ামূর্তিটা হঠাৎ ঘরের দরজার দিকে এগোতে থাকল। আমার শত বাধা সত্ত্বেও আমি নিজেকে আটকে রাখতে পারলাম না। আমিও খাট ছেড়ে উঠে পড়লাম। তারপর মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওই ছায়ামূর্তিকে অনুসরণ করতে শুরু করলাম।
এবার ঘরের বন্ধ দরজা আপনা হতেই খুলে গেল। আর ছায়ামূর্তিটি ঘর থেকে বের হয়ে উঠোনে গিয়ে দাঁড়াল। আমিও তাকে অনুসরণ করে উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার শরীর এখন আর মনের কথা শুনছে না। বাইরের উঠানে ঝকঝক করছে চাঁদের আলো আর সেই আলোতে পরিষ্কার দেখতে পেলাম ছায়ামূর্তিটা যেন আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আমার মাথার মধ্যে সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি, আজ রাতে আমার মৃত্যু নিশ্চিত। এমন সময় ছায়ামূর্তিটা আবার পৈশাচিক হাসি হেসে উঠল। তারপর হাওয়ায় ভেসে ভেসে এগিয়ে চলল রাস্তার দিকে। আমিও তাকে অনুসরণ করে রাস্তায় গিয়ে পড়লাম। মন বারবার বলে উঠল, ফটিকচন্দ্র, আর এগোস না। ওটা সাক্ষাৎ মৃত্যু। কিন্তু শরীর কোনও কথাই শুনল না। এ যেন এক বিরাট আকর্ষণ। চুম্বক যেমন লোহাকে আকর্ষণ করে, ঠিক তেমন ওই ছায়ামূর্তিটাও আমাকে প্রবল আকর্ষণ করতে থাকল। আমি প্রচণ্ড আতঙ্কে প্রাণপণে দৌড়ানোর চেষ্টা করলাম।
কিন্তু না। দৌড়োতে পারলাম না। ছায়ামূর্তিটা আবার মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল। সেই দুটি জ্বলজ্বলে নীলাভ চোখ। আমি আর সহ্য করতে পারছি না! আমার সমস্ত বিচারবুদ্ধি যেন ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে। ছায়ামূর্তিটা আবার এগোতে থাকল। আর আমার অতি আদরের শরীর তাকে অনুসরণ করতে লাগল। এ যেন নিশুতি রাতে মায়াবিনীর খেলা।
আকাশ, বাতাস, চারদিক থমথম করছে। গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে নিশ্চুপভাবে, যেন তারাও সব ভয়ে আড়ষ্ট। আমি রাস্তা ধরে বেশ কিছু দূর এগিয়ে চললাম। সামনে ফাঁকা মাঠ আর সেই মাঠের ওপার থেকে সমস্বরে ডেকে উঠছে বুনো শেয়ালের দল। তবে কি শেষে আমাকে শিয়ালের পেটে যেতে হবে নাকি? আমাকে কোথায় নিয়ে গিয়ে হত্যা করবে এই ছায়ামূর্তি? আমি শেষমেশ আবার প্রাণে বাঁচার একটি ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। কিন্তু না, এই পৈশাচিক আকর্ষণ ছিন্ন করে পালাবার ক্ষমতা আমার নেই।
মাঠের মধ্যে দিয়ে বেশ কিছু দূর হাঁটার পর ছায়ামূর্তিটা এবার মোড় ঘুরল। তারপর কাঁটা-খোঁচা ভরা রাস্তার উপর দিয়ে বেশ কিছুদূর এগিয়ে গেল। আমিও তাকে অনুসরণ করলাম। একটি কাঁটাগাছে লেগে আমার পায়ের বেশ কিছুটা জায়গা কেটে গেল এবং সেখান থেকে রক্ত ঝরতে লাগল। কিন্তু সেদিকে আমার কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। আমি হেঁটে চললাম যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো।
অবশেষে ছায়ামূর্তিটি একটি নদীর সামনে এসে দাঁড়াল। আর তার পিছনে আমিও দাঁড়িয়ে পড়লাম। তারপর আমার দিকে মুখ তুলে আবার সেইরকম পৈশাচিক হাসি হাসল। দেখলাম, তার নীল চোখ যেন আরও বেশি জ্বলজ্বল করে উঠল। তারপর আবার ধীরে ধীরে নদীর জলের দিকে এগোতে থাকল। আমিও তাকে অনুসরণ করে জলের দিকে এগোতে থাকলাম। ছায়ামূর্তিটি ক্রমে জলের গভীরে যেতে থাকল আর আমিও তাকে অনুসরণ করে চললাম। আমার এখন হাঁটু পর্যন্ত জল আর কিছু দূরে গেলেই আমি নদীতে ডুবে মারা পড়ব সেটাও বেশ বুঝতে পারছি। কিন্তু ওই সাংঘাতিক আকর্ষণ উপেক্ষা করার কোনও উপায় আমার জানা নেই। ছায়ামূর্তিটি আবার তার পৈশাচিক হাসি হেসে উঠল। আমার শরীর যেন কেমন অবশ হয়ে আসছে। চরম আতঙ্কে ধীরে ধীরে আমি জ্ঞান হারালাম। তারপর আর কিছু মনে নেই।
জ্ঞান ফিরল চোখে জলের ঝাপটায়। ধীরে ধীরে চোখ খুলে দেখলাম, আমি একটি কুঁড়েঘরের মধ্যে অবস্থান করছি। আমার সামনে বসে জটাধারী এক সাধুবাবা। ভারী গলায় বললেন, “জয় শিবশম্ভু। তা এ রাতের বেলা নদীর জলে একা একা কী করছিলে বেটা?”
অনুভব করলাম, তখনও আমার জামাকাপড় ভিজে জবজব করছে। যা যা ঘটনা ঘটেছে আগাগোড়া সমস্ত সাধুবাবাকে বললাম। তিনি কিছুক্ষণ গম্ভীর থেকে বললেন, “ও-কোয়ার্টারে অশরীরী থাকে কি না জানি না, তবে এখানকার লোকের মুখে ও-কথা প্রচলিত আছে। যাই হোক, ঈশ্বরের কৃপায় তুমি প্রাণে বেঁচে গেছ। জয় শিবশম্ভু। আমার যেতে আর একটু দেরি হলে শেয়ালের দল তোমাকে টেনে নিয়ে যেত। তবে একটা ঘটনা আমি জানি বেটা। ওই কোয়ার্টারে বছর কুড়ি আগে একজন  রেলের বাবু এসেছিল তার পরিবার নিয়ে। পরবর্তীকালে সে নাকি তার বউকে নিজের হাতে গলা টিপে হত্যা করে পালিয়ে যায়। আর তার ফুলের মতো মেয়েটা ওই শোকে পাগল হয়ে যায়। এখনও তো ঐ মেয়েটা কোয়ার্টারের চারপাশে রাতের বেলা ঘোরাঘুরি করে আর কাঁদে। স্থানীয় লোকজন এইসব কাণ্ডকে অশরীরী ব্যাপার ভেবে ভয় পায় হয়তো। জয় শিবশম্ভু। ভোর হয়ে গেছে বেটা, আর কোনও চিন্তা নেই।”
আমার তখনও নিজেকে বড়ো অসহায় লাগছিল। মনের মধ্যে বীভৎস আতঙ্ক তখনও যেন বাসা বেঁধে আছে। আমি জানি আমার সঙ্গে যেসব ঘটনাগুলো ঘটেছে সেসব পুরোটাই সত্যি। যদিও এসব কথা হয়তো কেউ বিশ্বাস করবে না। তবে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, এই কোয়ার্টারে কেন এই জায়গাতেই আর একদিনও নয়। ঈশ্বরের কৃপায় এবারের মতো প্রাণে বেঁচে গেছি। আর তারপর আমার মুখ থেকেও গোঙানির মতো একটা কথা বেরিয়ে পড়ল, ‘জয় শিবশম্ভু।’
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ মৈনাক দাশ

No comments:

Post a Comment